অফ-ট্র্যাক বান্দরবান ২০১২ (শেষ কিস্তি)

আমরা আছি কেওকারাডং পর্বতেই, পাসিং পাড়ায়। রাসেল ইস্যুতে কামরুল আর আবুবকর একটু দ্বিমত পোষণ করায় কামরুল রাগ করে বেরিয়ে গেছে পথে। উদ্দেশ্য জানা আছে, কিন্তু একা… কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। তাই আমি নিয়েছি পিছু। যেহেতু পথটা একটাই, সামনে এগিয়েছে, ধরে নিলাম কামরুল সামনেই কোথাও আছে। এবারে আমরা কেওকারাডং-এর পথ ধরেছি। আমি খুব দ্রুত চলছি। নাকিবের ক্যামেরাটা আমার কাছে, কিন্তু ছবি তোলার চেয়ে হাঁটাই শ্রেয় মনে হচ্ছে, কামরুলকে ধরতে হবে। ক্যামেরাটা দিয়ে ছবি তুলছি, হাঁটছি— দ্রুত হাঁটছি। পাশে কেওকারাডং চূঁড়া, একটা বাঁধানো সিঁড়ি বেয়ে অনেক সৌখিন পর্যটক হাঁপিয়ে হাঁপিয়ে উঠে ইতিহাসের পাতায় নাম লেখাচ্ছেন। ওখানে এখন সিমেন্টে বাঁধানো ঘর রয়েছে, পর্যটকরা সেখানে দাঁড়িয়ে মার্কো-পলো টাইপের একটা হাসি দিয়ে ছবি তুলতে খুব গর্ববোধ করেন। অনেক যুবক-যবতী-কিশোর-কিশোরী পর্যটকের ভিড়। কিন্তু আমার মাথায় কেন জানিনা কেওকারাডং চূঁড়ার জায়গা হলো না। কেওকারাডংকে ডানে ফেলে রেখে আমি দ্রুতগতিতে সোজা ঢালু পথটা ধরে নামা শুরু করলাম। পেছন ফিরে একবার দেখলাম, আবুবকর উঠে যাচ্ছেন সিঁড়ি বেয়ে, কেওকারাডং চূড়ার বাঁধানো ঘরটায়, জিপিএস ট্র্যাক নিতে।

কিওক্রাডাং চূড়ায় বাঁধানো ঘর, আর সামনে দেখা যাচ্ছে কামরুলের (!) ল্যাট্রিন (ছবি: লেখক)
কিওক্রাডাং চূড়ায় বাঁধানো ঘর, আর সামনে দেখা যাচ্ছে কামরুলের (!) ল্যাট্রিন (ছবি: লেখক)

কেওকারাডং, বইয়ে-পত্রে, সিআইএ ফ্যাক্টবুকে, বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ, কিন্তু অভিযাত্রীদের হিসাবে তৃতীয় সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ। মারমা ভাষায় কিও মানে পাথর, ক্রো মানে পাহাড় আর ডং মানে সবচেয়ে উঁচু— তিনে মিলিয়ে এর মূল নাম কিওক্রাডং, বা কিওক্রাডাং বা কেওক্রাডাং। সিআইএ ফ্যাক্টবুকে এর উচ্চতা লেখা ৪,০৩৫.৪৩ ফুট (১,২৩০ মিটার)। কিন্তু রাশিয়া পরিচালিত এসআরটিএম উপাত্ত অনুসারে এর উচ্চতা ৩,১৯৬ ফুট (৯৭৪ মিটার) পরিমাপ করা হয়েছে। চূড়ায় সেনাবাহিনীর লাগানো ফলকে এর উচ্চতা এসেছে ৩,১৭২ ফুট (৯৬৬.৮৩ মিটার)। আর আবুবকরের নেয়া সাম্প্রতিক রীডিং-এ এসেছে উচ্চতা ৩,১৬৯ ফুট (৯৬৫.৯১ মিটার)। “তাজিং ডং” বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পর্বত হিসেবে স্বীকৃত হলেও, অনানুষ্ঠানিকভাবে সাজ্জাদদের ন্যাচার অ্যাডভেঞ্চার ক্লাব পরিচালিত সমীক্ষায় বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ হিসেবে দাবি করা হয় “সাকা হাফং” (বা “ত্লাংময়”)-কে (৩,৪৮৮ ফুট)।

পথটা ঢালু হয়ে নেমে গেছে। চলার গতি বাড়িয়ে দিলাম। দৌঁড়ে নামতে থাকলাম পথ। কামরুলকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। ঢালু রাস্তায় দৌঁড় দেয়াটা যে কী বিপদের তা আর বলা লাগে না। যদি কোনো রকমে পা প্যাঁচ খায়, তাহলে আর টাল সামলানো যাবে না, গড়িয়ে হাড়গোড় সব এক হয়ে যাবে। ঢালু পথে দৌঁড় দেয়াতে গতি দ্বিগুণ হয়ে গেল। অনেকদূর পথ পাড়ি দিয়ে চলে এলাম। কিন্তু কামরুলকে কোত্থাও চোখে পড়ছে না। বিপদে পড়লো না তো!

এদিকে নাকিব যে কিওক্রাডাং-এর পাদদেশ থেকে আমাকে তারস্বরে চিৎকার করে ডাকছে, সেটা তো আমি জানিনা। ওর ক্যামেরাটা নিয়ে চলে এসেছি। আমার নাহয় মার্কো-পলো হবার শখ জাগেনি, কিন্তু এত কাছে এসে কিওক্রাডাং চূড়া থেকে একটা ছবি না নিয়ে যাওয়াটাও রাম-বোকামী। কিন্তু নাকিবের কিছুই করার ছিল না। এতটাই দূরে ছিলাম আমি, কিছুই শুনছিলাম না। ওর মেজাজ খুব খিচড়ে গেল আমার উপর। মেজাজ খারাপের কাজই একটা করেছি বটে, তবে আত্মপক্ষ সমর্থনের স্বার্থে বলি, ইচ্ছে করে করিনি, নাকিব। এই লেখার মাধ্যমে আমি নাকিবকে বলছি, ভাই, ক্ষমা করে দিস!

অনেক অনেক দূর পাড়ি দিয়ে এলাম, কামরুলের দেখা আমি কিছুতেই পাচ্ছিলাম না। চলার গতি বাড়িয়ে দিয়েছি কয়েকগুণ। কিওক্রাডাং পর্বত থেকে এই পথটা গিয়ে নেমেছে সোজা বগালেকে। পথ আশা করি ভুল করিনি আমি। সামনেই কোথাও আছে কামরুল। সামনের বাঁকটা ঘুরতেই ঐ যে দূরে কামরুলকে দেখা গেল। মাথাটা গামছা দিয়ে রোদ থেকে ঢেকে চরম গতিতে চলছে সে। পা চালিয়ে গিয়ে ধরলাম ওকে।

বললাম, ভাই, এতো রাগ করলে তো চলে না। টীমমেটদের সাথে ভুল বুঝাবুঝি হতেই পারে। রাগ করলে কি সমাধান হবে?

কামরুল অনুযোগ করলো, না নয়ন, আবুবকর যা বলছে এটা বেশি বেশি। রাসেলের যে অবস্থা, ও যেকোনো বিপদেও পড়তে পারতো। বিপদে পড়লে কে উদ্ধার করবে? তাছাড়া তুমিইতো দেখেছো, কোথাও কোথাও ওকে ধাক্কা দিয়ে তুলে দিতে হচ্ছে বেশি খাড়া ঢাল। ওর সাপোর্টেরও দরকার।

আমি কী বলবো বুঝতে পারছিলাম না। কামরুল অসত্য বলছে না। কামরুলের অবস্থানে কামরুল ঠিক, আবুবকরের অবস্থানে আবুবকর ঠিক। মাঝখানে, যে রাসেলকে নিয়ে এতোকিছু, সে এসবের কিছুই কি বুঝছে না? নাকি বুঝতে চাইছে না? কামরুলের রাগ হয়েছে, কিন্তু সে তা বেশিক্ষণ ধরে রাখার কোনো মানে খুঁজে পেলো না। আমরা আবার পথে ফিরে এলাম।

কিওক্রাডাং থেকে বগায় নামার পথটা এভাবেই ঢালু (ছবি: লেখক)
কিওক্রাডাং থেকে বগায় নামার পথটা এভাবেই ঢালু (ছবি: লেখক)

কামরুল এপথে আগেও গিয়েছে বগালেক। তাই ঠিক পথেই আছি আমরা। পথের ডান পাশে দূ-রে একটা পাড়া দেখা যাচ্ছে। কোন পাড়া, জানি না। হাঁটতে হাঁটতে একসময় আমরা পৌঁছে গেলাম দার্জিলিং পাড়ায়। ‘দার্জিলিং’ শুনলেই ভারতের যে স্থানটার কথা মনে আসে, সেখানকার সাথে এর হয়তো কোনো মিল নেই, তবে দার্জিলিং পাড়াও কম সুন্দর নয়। বায়ে একটা স্কুলঘর রেখে যাচ্ছি, স্কুলের সাইনবোর্ডে লেখা: দার্জিলিং পাড়া বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, স্থাপিত ৬-৭-২০১০; ৩ নং রেমাক্রি প্রাংসা ইউনিয়ন, রুমা উপজেলা। সামনে গিয়ে পড়লো ২০০৬-এ প্রতিষ্ঠিত দার্জিলিং পাড়া ব্যাপ্টিস্ট চার্চ, নাম: Independent Baptist Church, Darzeling। এখানেই একটা ঘরে (পান্থশালায়) ঢুকে কামরুল আর আমি নিজেদের তৃষ্ণা নিবারণ করলাম। ঠান্ডা পানিতে প্রাণটা জুড়িয়ে গেল।

যারা শেঁকড়ের সাথে এখন আর যোগাযোগ রাখেন না, তাঁদের অবগতির জন্য বলি, মাটির কলসিতে রাখা পানি যথেষ্ট ঠান্ডা থাকে। তাই যারা দাপিয়ে ফ্রিজ কিনছেন, তাদেরকে পানি খাবার জন্য দুটো মাটির কলসি কেনার পরামর্শ দিব। লাভ দুটো— এক: কুমারের নব-জীবনদান; দুই: প্রাকৃতিক ও পরিবেশবান্ধব হওয়া।

একসময় নাকিব এগিয়ে এলে আপেল গিয়ে জুড়লো কামরুলের সাথে। নাকিব আর আমি গল্প করে করে হাঁটছি, পিছিয়ে পড়েছি, এমন সময় পড়লাম গিয়ে দ্বিমুখী এক রাস্তায়। ডানদিকের পথটা গেছে, দেখে মনে হচ্ছে গাড়িপথ, আর বাম দিকের পথটা গেছে কাঁশবনের ভিতর দিয়ে, হাঁটাপথ। হাঁটাপথ ধরে যাবার জন্য পা বাড়াতেই সামনে দেখা গেল আপেল আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। আবার আমরা এগোতে থাকলাম। চড়াই-উৎরাই, চড়াই-উৎরাই, … পথ আর শেষ হবার নয়। একসময় আমরা গিয়ে পড়লাম এক ভাঙা ব্রিজে। সাঁকোটা কাঠের তৈরি। জায়গায় জায়গায় ভেঙে গেছে। ঝুলে আছে ভাঙা কাঠগুলো। গর্ত তৈরি করে আমাদেরকে ভূত্বক দেখার আমন্ত্রণ জানাচ্ছে যেন।

কামরুল ব্যাগ নিয়ে পার হতে ইতস্তত করলো। পরে আপেল সাঁই সাঁই করে পার হয়ে যাচ্ছে দেখে সাহস হলো। ধীরে ধীরে প্রথমে কামরুল, তারপর নাকিব, হলিউডের চলচ্চিত্রের মতো এই ভাঙা সাঁকো দিয়ে পার হলো। আমি মানুষটা একটা পাখি, সাঁই সাঁই করে পার হয়ে গেলাম বাধা ছাড়াই। তারপর আবার হাঁটা।

ঝরণার স্বচ্ছ পানিতে নাকিব অনেক কিছু দেখে, আপনিও কি? (ছবি: লেখক)
ঝরণার স্বচ্ছ পানিতে নাকিব অনেক কিছু দেখে, আপনিও কি? (ছবি: লেখক)

একপর্যায়ে কামরুল অনেকদূর একা একাই এগিয়ে গেল। নাকিব, আমি, আপেল একসাথে চলতে থাকলাম। মাঝখানে পড়লো একটা শুকনো ঝরণা। পরে কামরুলের থেকে শুনেছি, এটা চিংড়ি ঝরণা ছিল। অপূর্ব স্বচ্ছ পানিতে ভাসতে থাকা পোকাগুলোর ছবি না তুলে পারলাম না। যে ছবিটা উঠলো, সেটা নাকিবের খুব পছন্দ। ছবিটার ডান কোণে প্রথমে সে যুম করে সবাইকে দেখায়, দেখো কী স্বচ্ছ পানি! তারপর ছবির বাঁ পাশে নিয়ে গিয়ে দেখায়, দেখো, চারটা ফোঁটা দেখা যায়, এটা হলো এই পোকাটার পায়ের ছাপ। তখন সবাই খুব মজা পায়, আর তা দেখে সেও মজা পায়। পানির পৃষ্ঠটানের কারণে এসব পোকা পানিতে হেঁটে বেড়াতে পারে, একটু সাবান দিয়ে দিলেই পৃষ্ঠটান কমে আসে, তখন বিপদে পড়ে যায় পোকাগুলো। কিন্তু সে পরীক্ষার কোনোই ইচ্ছা আমার এখন নেই। আরো সামনে এগোলাম আমরা। ক্লান্ত নাকিব এবার সিরিয়াস একটা বিশ্রাম চায়। তাকে মোটিভেট করেও আর উঠানো গেলো না। …আর তখনই, পিছন থেকে আপেল বাবাজি নিয়ে এলো একটা পেঁপে। আমি জানি, যারা এর স্বাদ জানেন, তাদের জিবে জল এসে যাচ্ছে। স্বাদ নামক জিনিসটা আপেলের মুখে আছে বোঝা গেল, কচকচে পাঁকা পেঁপে এক বাগানের গাছ থেকে (চুরি করে!) কেটে নিয়ে এসেছে। আমি এতো নীতিবান, কিন্তু ঐ সময় নীতির কথা মনে ছিল না, রাস্তা সংলগ্ন সেই সম্পদ যেনবা সব পথিকেরই সম্পদ— এমন একটা ভাব নিয়ে সঙ্গী হলাম পেঁপে ভক্ষণে। আপেলও যেনবা বুঝলো আমাদের মতো শহুরে ফরমালিনদের প্রকৃতি-ক্ষুধা। নিজে খুব অল্প খেয়ে বেশিরভাগই আমাদেরকে খেতে দিল সে। ঐ স্বাদ যে কী, তা আর বলতে চাই না আমি। তবে এতটুকু বলি, এটা ‘দিল্লি কা লাড্ডু’ না যে, খেলে পস্তাবেন!!

পাগলু পাঁকা পেঁপে খায়— আপেলকে ওর টিশার্টের লেখা দেখে নাকিব ডাকে ‘পাগলু’ (ছবি: লেখক)
পাগলু পাঁকা পেঁপে খায়— আপেলকে ওর টিশার্টের লেখা দেখে নাকিব ডাকে ‘পাগলু’ (ছবি: লেখক)

কামরুলের জন্য নিতে চাইলে আপেল বাধা দিল, বললো বগা লেকে পাবে উনি। কচকচে পাঁকা পেঁপে সাবাড় করে আমরা আবার ঢাল ধরে নামতে থাকলাম। আর তখনই… তখনই দূর থেকে চোখে এলো লেকটা— দ্যা মাঈটি বগা লেক। কক্সবাজারের কলাতলি ঢোকার মুখ থেকে প্রথম যখন সমুদ্র দেখেছিলাম, সেদিনকার অনুভূতির মতোই একটা অনুভূতি হলো আমার। অপূর্ব নীল হ্রদটা যেন কী এক অমোঘ আকর্ষণে আমাদের ডাকছে কাছে। কিভাবে উপেক্ষা করি বলুন?

কিওক্রাডাং থেকে বগায় নামার পথে দূর থেকে বগা (ছবি: লেখক)
কিওক্রাডাং থেকে বগায় নামার পথে দূর থেকে বগা (ছবি: লেখক)

এগিয়ে গেলাম ছোট্ট বগালেক পাড়ায়। এই নামটা আনঅফিশিয়ালি সবাই বলে আরকি। রাসেল, আবুবকর আর বিকাশ রয়ে গেছে পিছনে। তারা আসা অবধি আমরা বগার সৌন্দর্য্য দেখলাম খানিকক্ষণ, আপেল নিয়ে গেল আমাদেরকে একটা রেস্টুরেন্টে। এটা ওদের ট্যুর গাইড এসোসিয়েশনের সাথে চুক্তিবদ্ধ একটা রেস্টুরেন্ট। বেলা তখন প্রায় দেড়টা। কামরুল, রেস্টুরেন্টের লোককে পাঁকা পেঁপে কেটে দিতে বলে সময়ের হিসাব করতে বসলো। এই মুহূর্তে রওয়ানা দিয়ে এখান থেকে রুমা বাজারে যেতে লাগবে কমপক্ষে আরো দুই-আড়াই ঘন্টা, মানে সাড়ে তিনটা। অথচ শেষ নৌকা, রুমা থেকে ছাড়েই সাড়ে তিনটায়। আবুবকররা এখনও পৌঁছেনি বগায়। কোনোভাবেই আজকে রুমা ছাড়া সম্ভব না। গিয়ে শেষ পর্যন্ত থাকতে হবে রুমা বাজারের হোটেলে। কাটাতে হবে নিরস একটা সময়। আর পরদিন ঐ বাস ধরতে ধরতে হবে বিকেল। তাহলে অযথা তাড়াহুড়া না করে থেকে যাইনা আজ রাত বগাতেই?

কামরুলের কথা মাটিতে পড়ার আগেই লুফে নিল নাকিব। সেও রুমায় রাত কাটাতে চায় না। বগায় থাকলে দিনটা যাবেও ভালো। কী লাভ আগে গিয়ে? আমিও সম্মত হলাম। আমাদের সামনে ফুলের মতো করে কেটে পেঁপে সার্ভ করা হলো। কিন্তু আপেল তা খেতে অস্বীকৃতি জানালো, কেননা এগুলো কচকচে পাঁকা না, মজে যাওয়া পাঁকা। নরম পেঁপে সে পছন্দ করে না। মুখে দিয়ে মধুর স্বাদ পেয়েও আমাদেরও মুখে লেগে থাকলো ঐ কচকচে পাঁকা পেঁপেটাই।

এমন সময় একটা চান্দের গাড়ির পিছনে ঝুলে দাঁড়িয়ে এগিয়ে এলেন আবুবকর আর রাসেল। ওদিকে বিকাশ বেচারা এই খবর জানে না, মাঝখানে পঁচে মরছে। পরে সিয়ামদি’র কটেজে ফোন করে আবুবকরের পৌঁছার খবর পেয়ে সে রওয়ানা করেছে মাঝপথ থেকে। আবুবকর নেমে গিয়ে রাসেলকে ঐ গাড়িতেই পাঠিয়ে দিলেন রুমা বাজার। আমরা থেকে যেতে চাইলে আবুবকর তাঁর ব্যাগটাও পাঠিয়ে দিলেন গাড়িতে করে। তারপর বসলো আমাদের বৈঠক। আমাদের থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্তে এবং কামরুলের দেয়া সময়ের হিসাবে সন্তুষ্ট হতে পারলেন না আবুবকর। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত জানালেন, ঠিক আছে, আপনারা থাকেন, আমি রুমায় চলে যাবো, যাতে কালকে ভোরেই ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিতে পারি। আবুবকরের মেজাজ দুটো কারণে খারাপ: এক, সম্পূর্ণ ট্র্যাক শেষ করা হয়নি; দুই, এখানে এসে দলটা দুভাগ হয়ে যাচ্ছে।

তিনি সেই রাগ ঠিক ঝাড়লেন না, তবে ইঙ্গিতে বলে ফেললেন, আমাদের জন্যই ট্র্যাকটা সম্পূর্ণ করা গেল না। কথাটা সত্যি, আমরা যদি না জুড়তাম, তাহলে আবুবকর আর কামরুল ট্র্যাকটা সম্পূর্ণ করেই ফিরতেন। কিন্তু আমাদের জুড়ে যাওয়াটাও আসলে দৈবাৎ নয়। উভয়পক্ষেরই কিছু দোষ ছিল, হয়তো এখনও আছে— সেটা আমাদের শ্রদ্ধা ভরে মেনে নেয়াই উচিত। কিন্তু যেখানে ট্র্যাক শেষ হলো না, সেখানে কেনইবা আজকের রাতটাকে রুমায় গিয়ে পানশে করতে হবে, তা আসলে আমাদের মাথায় ঠিক কাজ করছে না। তবু আমরা বন্ধু, পাহাড়ে-জঙ্গলে, বাংলাদেশে, বিশ্বের মানচিত্রে সর্বত্র, সর্বাবস্থায় আমরা বন্ধুই, আমরা ট্রেকার। নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব থাকলে দেশের জন্য তো দূরের কথা, নিজেদের জন্যও কিছু করা যায় না। জড়িয়ে ধরে আবুবকরকে বিদায় জানালাম। সবাই আমরা হাসিমুখ।

শেষ বেলায় আমরা আমাদের হিসাব-নিকাশগুলো চুকিয়ে নিলাম। আবুবকর ভাই একটা কাগজে হিসাব লিখে ভাগাভাগি করে দিলে, আমরা সবাই যার যার হিসাব মিটিয়ে নিলাম। রাসেলের সাথে যেহেতু রুমায় গিয়ে দেখা হবে, তাই ওরটা ওখানেই ক্লিয়ার করবেন তিনি। …আমি, নাকিব, কামরুল যেখানে ভেবেছিলাম আপেল আমাদের সাথে হয়তো থেকে যাবে, সেখানে দেখা গেল, বিকাশ থাকবে আমাদের সাথে, আর আপেল এখন আবুবকরের সাথে ঝিরিপথে হেঁটে রুমায় চলে যাবে। বিদায় নিলাম আপেলের থেকে।

বগা লেক নামের এই হ্রদটির প্রকৃত নাম বগাকাইন হ্রদ, শুধু একটা মিঠা পানির হ্রদই না, বরং অনেক উঁচুতে অবস্থিত বলেই এর এত নামডাক। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা ২,০০০ ফুট (৬০৯.৬ মিটার)। আবুবকর ভাইয়ের রিডিং-এ এসেছে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১,২২৭ ফুট উঁচু। বগার সামনে একটা ফলক লাগানো, তাতে এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটাই নেই। স্থানীয় আদিবাসীদের উপকথা অনুসারে এখানে এক বগা (ড্রাগন) থাকতো গুহার ভিতর, সেখানে কেউ যেত না। একবার সেই নিষেধ অমান্য করলে বগা রেগে গিয়ে প্রচন্ড অগ্নি-গর্জন করে আর তা থেকেই উৎপত্তি হয় এই হ্রদের (এই গল্পের অনেক ভ্যারিয়েশন পাওয়া যায়)। গবেষকগণ ধারণা করেন, এটি হয় কোনো আগ্নেয়গিরির মৃত জ্বালামুখ, অথবা মহাকাশ থেকে পড়া উল্কা-সৃষ্ঠ গর্ত। বছরের অধিকাংশ সময় এর পানি প্রায় একই রকম থাকে। সাকিব-সাজ্জাদরা বছর-দশেক আগে বগা ঘুরে এসে তাদের ধারণা জানিয়েছিল, সম্ভবত এর তলাটা বাটি বা বোল আকৃতির, এবং পাথুরে। যে বিষয়টা রহস্যমন্ডিত, তা হলো বছরের এপ্রিল-মে মাসে এর পানির রঙ বদলে যায়।

আমরা আর দেরি করতে চাইলাম না, বগায় আছি, আর গোসল করবো না, তা কী করে হয়? সেই লাবাখুম-এ সাঁতার কেটেছিলাম, ঐ পর্যন্তই। বিকাশ দেখলাম, যে রেস্টুরেন্টে বসেছি, তার ঠিক উল্টো দিকের একটা বাঁশের ঘরে আমাদের থাকার ব্যবস্থা করলো। ভিতরে গিয়ে দেখলাম, অনেকগুলো খাট, এটা একটা বোর্ডিং। মানে, অনেকের সাথে থাকতে হবে। কিন্তু আমাদের ভাগ্য ভালো, এখানে নেই আর-কেউ, আর কেউ আসার সম্ভাবনাও নেই আজকে, তাই পুরোটা জুড়ে আমরা-আমরাই। এক্কেবারে বগার গা ঘেঁষে বোর্ডিংটা। জানালা দিয়ে লাফ দিলেই বগার পানিতে পড়া যাবে আরকি। এগুলো হলো এখন প্যাকেজ সিস্টেমের একটা অংশ— অন্তত সেরকমটাই মনে হলো। ওদের ইয়াং বম এসোসিয়েশনের সাথে চুক্তিবদ্ধ এরা, আর এটা তাদেরই একটা বোর্ডিং। (আপনাদের হয়তো বলতে ভুলে গেছি, আপেল আর বিকাশ দুজনেই এই সংগঠনের গাইড)

ব্যাগ-ট্যাগ সব রেখে গোসলের জিনিসপত্র নিয়ে চললাম বগার ঘাটে। বগায় গোসল করতে নেমে আবিষ্কার করলাম, শীতের সময় বলে পানির মধ্যে প্রচুর শ্যাওলা। গোসলটা আর মনমতো করা হলো না। কারণ বেশিক্ষণ পানির মধ্যে থাকলে এই দ্রবীভূত শ্যাওলা শরীরে, কাপড়ে লেগে আরো ময়লা করে দিবে আমাদেরকে। তাছাড়া বেশিদূর সাঁতারও কাটা গেল না, পানি তুলনামূলক কম থাকায় নিচের জলজ-আগাছার বাগান লাগে গায়ে। ওগুলোতে প্যাঁচিয়ে গেলে আবার মহাবিপদ হয়ে যাবে।

গোসল শেষে নামায-পর্ব শেষ করে খাবার খেলাম আমরা ঐ রেস্টুরেন্টে। মেনু কী ছিল, ভুলে গেছি; কত খরচ হয়েছিল, তাও ভুলে গেছি— ক্ষিধার ঠ্যালায়ই কিনা, কে জানে। খাওয়া-দাওয়া শেষে চললাম বগা লেক আর্মি ক্যাম্পে। আমরা যে আজকে থাকবো, তার রিপোর্ট করতে হবে। যাবার পথে একটা মহৎ কাজ করতে গেলাম। বগায় আসার আগে ফিনল্যান্ড থেকে সাজ্জাদ ফোন করে বলেছিল রবার্টের নতুন কটেজের ছবিটা যেন ওর জন্য হলেও তুলে নিয়ে যাই। বিকাশের দেখিয়ে দেয়া একটা কড়ি কাঠ বর্গা কাঠওয়ালা নির্মানাধীন ঘরের ছবি খুব ঘটা করে তুললাম। ঢাকায় এনে ফেসবুকের মাধ্যমে সাজ্জাদকে পাঠিয়ে যখন পরম তৃপ্তি অনুভব করছিলাম, তখন সাজ্জাদ একটা টাশকি খাওয়া কমেন্ট করলো, তোমাদের গাইড কচু চেনে! দেখে তো আমিও টাশকি। এটা নাকি সিয়াম-লারাম-এর আত্মীয় রবার্টের কটেজ, যে থাকে দার্জিলিং পাড়ায়। আসল রবার্টের কটেজটার ছবি আমরা তুলিইনি। রাগে-দুঃখে-ক্ষোভে বিকাশকে হত্যা করতে মনে চায় পরে আমার।

বগা সেনা ক্যাম্পে একটা টেবিলের ওপাশে একজন সেনা সদস্য বসা, সামনে একটা মোটা টালি খাতা। কামরুল এ্যাপ্রোচ করলো। বললো, আমরা এখানে থেকে গেছি, আর একজন সদস্যের পায়ে ব্যাথা পেয়েছে, তাই ওকে নিয়ে বাকিরা চলে গেছে রুমায়। অনুমতিপত্রের কাগজটা ওদের সাথে রয়ে গেছে, ওদের ব্যাগে। ঐ সেনা, বিকাশকে একটু জেরা করলেন, কিন্তু কামরুল ট্যাকল দিয়ে দিল। শেষে উনি বললেন, বাদ দেন, আপনাদের আর নাম এন্ট্রি করার দরকার নেই (কারণ রুমাতে তো ওরা এন্ট্রি করবেই, আমাদের ব্যাপারটা মাথায় থাকলো আরকি)। কামরুল আবার গল্প জমাতে ওস্তাদ। ওর পরনের প্যান্টটা সেনা পোষাকের সাথে যথেষ্টই মিলে যায়, ক্যামোফ্লেজের জন্য দরকার। সেটা দেখিয়ে বেশ গল্প জমিয়ে ফেললো, আর নিজের পরিচয় দিল পাখির আলোকচিত্রী হিসেবে। (অফ দ্যা রেকর্ড বলছি, কামরুল আসলেই পাখির ছবি তুলে, মন্দ তুলে না।)

বগাকাইন হ্রদের সামনে দুই সাধু! (ছবি: লেখক)
বগাকাইন হ্রদের সামনে দুই সাধু! (ছবি: লেখক)

ব্যস, এবার আমাদের নিজস্ব সময়। সেনা ক্যাম্পের সামনে একটা বেঞ্চ পাতা। ওটাতে গিয়ে বসলাম আমরা। ক্যামেরা চলছে পটাপট। তখনই পুরোন বুদ্ধিটা চাগিয়ে উঠলো মাথায়। কামরুলকে বললাম, এক স্ন্যাপে পুরো বগাকে ধরা না গেলে এক কাজ করা যায়, অনেকগুলো ছবি তুলে জোড়া লাগিয়ে একটা প্যানোরামা বানিয়ে ফেলা যায়। কামরুল কিছুটা সন্দিঘ্ন হলেও আমি সেই উদ্যোগটা দৃঢ়ভাবে নিলাম আর ফলাফল? —সে আপনারাই বিচার করুন (ছবিটা উইকিপিডিয়ার জন্য ক্রিয়েটিভ কমন্স শেয়ার এ্যালাইক লাইসেন্সের অধীনে আপলোড করা হয়েছে^)।

পড়ন্ত বিকেলের রোদে বগাকাইন হ্রদের প্যনোরামা (ছবি ও এডিটিং: লেখক)
পড়ন্ত বিকেলের রোদে বগাকাইন হ্রদের প্যনোরামা (ছবি ও এডিটিং: লেখক)

রাতটা ভালোই কাটলো বগার সামনে। আকাশে লক্ষ তারার মেলা। উরসা মেজর দেখে দিক নির্ণয় আমার প্রিয় একটা শখ। আকাশে তাকিয়ে আমি যখন উল্কাপাত (তারা খসা) দেখছি, নাকিব তখন তার সদ্যপ্রয়াত বাবার স্মৃতিতে হারিয়ে গিয়ে উপলব্ধি করে বাবা’র কোনো বিকল্প নেই এই পৃথিবীতে। …এদিকে বিকাশ কোত্থেকে একটা দুই তার ছেঁড়া গিটার নিয়ে এসেছে, আর বিডিগিটার ওয়েবসাইটের কর্ণধার নাকিব তার গিটারবাদনের অভিজ্ঞতা দিয়ে সেটাতেই সুর তোলার চেষ্টা করছে। কিন্তু কামরুল কোথায়?

কামরুল ওদিকে রেস্টুরেন্টের পিছন-ঘরে পেয়ে গেছে গাইড সুমন দত্তকে (বিকাশের বড় ভাই, যে বিকাশকে ঠিক করে দিয়েছিল: ২য় কিস্তি দ্রষ্টব্য)। ব্যস, পাহাড়ে-পর্বতে-ঝরণায়-ঝিরিতে কোথায় কী আছে, তার খোঁজ-খবর নিতে লেগেছে। তারপর বেরিয়ে এসে বাইরে পেয়েছে কয়েকজন যুবককে, তাদেরকে বেশ রসিয়ে গল্প করলো কিভাবে কঠোর পরিশ্রম করে একটা অফ-ট্র্যাকে ট্যুর দিয়েছে সে এবং তার দল… সেই বর্ণনা শুনে বাকিরা তখন কামরুলকে মহান অভিযাত্রী ভাবছে হয়তো —কামরুল কি তবে গল্পবাজ? বানোয়াট গল্প ফাঁদে?

না, বরং কামরুল গাল্পিক। সত্যটাকেই মধুর করে বলতে জানে। রসিয়ে আকর্ষণ আনতে জানে। এটা তার গল্পবাজি না, বরং তার ট্রেকিং-এর প্রতি আকর্ষণ আর শ্রদ্ধার বহিঃপ্রকাশ।

রাতে ঐ রেস্টুরেন্টে খেয়ে-দেয়ে নিজেদের হিসাব-নিকাশ শেষ করে ঘুমিয়ে পড়লাম এগারোটা নাগাদ। দেরি হয়ে গেছে। তবু বগার ঠান্ডা মিষ্টি হাওয়া এসে জানালা গলে ভিতরে ঢুকছে, বোর্ডিং-এর সবগুলো কম্বল আমাদের জন্য বরাদ্দ। বেশ জম্পেশ ঘুম হলো একখান। তবে পেইনকিলার ঠিকই খেয়ে নিয়েছি, কালকেও পথ চলতে হবে, ঝামেলা বাড়িয়ে লাভ নেই।

২০ ফেব্রুয়ারি ২০১২; ভোর ৫টা

অন্ধকার থাকতেই ঘুম ভাঙলো মোবাইলের অ্যালার্মে। উঠে গোছগাছ করে বেরিয়ে পড়লাম। রাতেই বোর্ডিং-এর পাওনা মিটিয়ে দিয়েছি। আর্মি ক্যাম্পের সামনের রাস্তা ধরে একটু চড়াই উঠেই শেষবারের মতো উপর থেকে দেখে নিলাম বগাকে। তারপর আবার ঢালু পথে নামার পালা। তাকিয়ে দেখি, আকাশের মাঝে তিনটা মূর্তি, অপূর্ব সে দৃশ্য।

আকাশে হেলান দেয়া তিন রকস্টার, বাঁ থেকে বিকাশ, কামরুল, নাকিব (ছবি: লেখক)
আকাশে হেলান দেয়া তিন রকস্টার, বাঁ থেকে বিকাশ, কামরুল, নাকিব (ছবি: লেখক)

তারপর ধপধপ করে নামা। বেশ দৃঢ়তার সাথেই নামছি আমরা। নাকিবও দেখলাম বেশ শক্তিমত্তার সাথে নামছে। দ্রুতই আমরা উৎরাই পেরিয়ে বগাকাইন হ্রদের উচ্চতা থেকে নিচে নেমে এলাম। এটা কিন্তু সমতল না, এটাও সমতল থেকে উঁচুতে। এখানে তিন রাস্তার সমাহার, আর এখানেই আসে রুমার চান্দের গাড়ি। আজকে বাজার দিন, তাই গাড়ি আসবে অনেক ভোরেই। কিন্তু তখনও পৌঁছেনি গাড়ি। আমরা ঠিক করলাম নাস্তাটা সেরে নেয়া যায়।

সেখানেই এক পাহাড়ী পরিবার চুলায় কী যেন রান্না করছিলেন, আমরা অনুমতি নিয়ে তাদের থেকে একটা ডেকচি নিলাম। তারপর নিজেদের সাথে থাকা অব্যবহৃত নুডল্‌সগুলো একত্র করে অব্যবহৃত পেঁয়াজগুলো বের করলাম। কামরুলের আনা ছুরি দিয়ে পেঁয়াজ কাটা হলো, তারপর নুডল্‌স রান্না করা হলো। কিন্তু কিসে রেখে খাওয়া হবে? পরামর্শ দিলাম: প্রাকৃতিক পরিবেশে প্রাকৃতিক হওয়াই সবচেয়ে সুন্দর— কলাপাতা। বিকাশ গিয়ে কলাপাতা কেটে নিয়ে এলো। তা কয়েক ভাগ করে তাতে নুডল্‌স ভাগ করা হলো, আর ডেকচিতে ঐ পরিবারের জন্যও কিছু রেখে দেয়া হলো। …পেঁয়াজ, নুডল্‌স আর টেস্টিং সল্ট— কিন্তু আহামরি স্বাদ!

কলাপাতায় সকালের নাস্তা - কী আর, ম্যাগি নুরুল! (ছবি: নাকিব)
কলাপাতায় সকালের নাস্তা – কী আর, ম্যাগি নুরুল! (ছবি: নাকিব)

একটা চান্দের গাড়ি এলো। ইতোমধ্যে বগায় থাকা আরো দুটো দল নেমে এসেছে নিচে। গাড়ি আসতেই জুৎসই জায়গার জন্য যখন তাড়াহুড়া করছিলাম সব্বাই, তখন কে যেন জোরে বললো, আগে পাহাড়িদের অধিকার।

ব্যস, সেই নিয়ম মেনে আমরাও জায়গা নিলাম। কামরুল আর নাকিব চলে গেলো ড্রাইভারের পাশে সামনে। বিকাশ উঠলো উপরে আর আমি এক্কেবারে পিছনে, সীটে। চান্দের গাড়ি— আমি সবসময়ই বলি, নাম শুনে অনেক আকর্ষণীয় কিছু মনে হলেও পৃথিবীর নিকৃষ্টতম একটা গাড়ি এই চান্দের গাড়ি। ঠাসাঠাসি করে মানুষ নেয়। উপরে বসে যাবার পরামর্শ দিয়েছিলেন এক কলিগ, কিন্তু ধুলার কারণে আর একটা হাত ভাঙা বলে ঝুঁকিটা নিলাম না।

গাড়ি এঁকে-বেঁকে চলছে। কখনও রাস্তার পাশের ঝোঁপ ঘাঢ়ের মধ্যে ঠাশ করে থাপ্পড় দেয়। আরো কয়েকজনকেও দিয়েছে। তাই জ্যাকেটের ক্যাপটা মাথায় পরে নিলাম। এরপর শুরু হলো ধুলার অত্যাচার। চোখ বন্ধ না করলে নিশ্চিত অন্ধ হয়ে যেতে হবে। একবার ধুলার জগৎ পার হবার পর শরীরটা হলুদ হয়ে যায় ধুলায়। এভাবে এলাম আমরা চরম স্থানে, এক্কেবারে খাড়া ঢাল, গাড়িকে চারটা চাকা চালিয়ে একটানে উপরে উঠে যেতে হবে। গুম্‌মমমমমম করে ইঞ্জিনের উপর অত্যাচার করে গাড়িটা ধীরে ধীরে উপরে উঠছে, আমি শ্বাস বন্ধ করে বসে আছি, ফিঙ্গার ক্রস্‌ড। মাঝপথে যদি স্টার্ট বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে হ্যান্ডব্রেক দিয়েও রক্ষা হবে না, শ্রেফ পেছন দিকে উল্টে যাবে। কে যেন বললো, এরকম একটা দুর্ঘটনা নাকি এদিকে ঘটেওছিল, উঠার মুহূর্তে কার্বুরেটরের পানি শুকিয়ে গিয়েছিল, আর…

যাক, অবশেষে চড়াই উঠতে পারলো। উঠেই ব্রেক কষে বনেট খুলে কার্বুরেটরে পানি ঢালা। অতঃপর আবার যাত্রা। রাস্তার যা অবস্থা, আর যে গাড়িখানাও যে আহামরি— তা নাহলে যেসব দৃশ্য ফেলে যাচ্ছিলাম, এগুলো পয়সা দিলেও পাওয়া যাবে না।

এভাবে একসময় যখন আমরা রুমা বাজারের ব্রিজে গিয়ে থামলাম (জনপ্রতি ৳৮০), তখন কালো পোষাকগুলো সব হলুদ হয়ে গেছে। নেমে পোষাক ঝাড়তে ঝাড়তে একসময় পৌঁছলাম হোটেল হিলটনে। সেখানে, আমরা ভেবেছিলাম, রাসেলকে তৈরিই পাবো, কিন্তু রাসেল… বেশ বিরক্ত হলাম আমরা। প্রতিটা মুহূর্তে যেখানে হিসাবের সেখানে এভাবে সময়ানুগ না চললে খুব খারাপ অবস্থা হয়। ওকে সময় দিয়ে আমরা চলে গেলাম মামুন ভাইয়ের হোটেলে। সেখান থেকে নিজেদের ব্যাগ বুঝে নিলাম। তারপর ব্যাগ গোছাতে গোছাতে গরম এক কাপ চা দিতে বললাম। বিকাশ গিয়ে সেনা ক্যাম্পে রিপোর্ট করবে।

চা খেয়ে বিকাশ আর আপেলের থেকে আবার বিদায় নিয়ে ফের রওয়ানা ঘাটে। ফিরতি পথ ধরতে হবে। সবাই যখন ঘাটে নামছে, আমি তখন মোবাইলে আরেকটা জোড়াতালি দেয়া প্যানোরামার প্রস্তুতি নিচ্ছি; ফলাফল কী, সেটা দেখা যাক—

রুমা বাজার ঘাটের প্যানোরামা (ছবি ও এডিটিং: লেখক)
রুমা বাজার ঘাটের প্যানোরামা (ছবি ও এডিটিং: লেখক)

ঘাটের নৌকার সময়-সূচী অনুযায়ী এই মুহূর্তে কোনো নৌকা নেই। তাই অপেক্ষা। একটা নৌকায় উঠে অপেক্ষা করতে থাকলাম আমরা। আমাদের সাথে বগা থেকে আসা একটা দল নৌকায় যোগ দিল। সেই নৌকা ছাড়লে আমি গিয়ে বসলাম দুপাশে পা ছড়িয়ে, গলুইতে। পানিতে পা ভিজিয়ে হাওরের ছেলে হাওরের স্বাদ পেতে লাগলাম (যদিও আমি নিজেও এখনও হাওরে যাইনি)।

অপূর্ব সব দৃশ্য, কামরুল, রাসেল, টপাটপ ক্লিক করে চলেছে। আপনাদের হয়তো একটা কথা বলা হয়নি, রাসেলের আব্বা সরকারি একজন কর্মকর্তা ছিলেন, ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে। সেকারণে রাসেলের ছোটবেলা কেটেছে এই বান্দরবানে। আর তাই রাসেল, বান্দরবানে এসে বেশ নস্টালজিক হয়ে গেছে। সাঙ্গুর যৌবনের বর্ণনা দেয়, লুক্কায়িত ঝরণার বর্ণনা দেয়, পাহাড়িদের সাথে বিবাদের বর্ণনা দেয়, পাহাড়িদের সহায়তার বর্ণনা দেয়। তাই এখন যখন হঠাৎ দূর থেকে ধ্রিম ধ্রিম কিসের আওয়াজ আসছিল, তখন আমি বললাম, গ্যারিসনে সম্ভবত আর্মিরা বোমবার্ড করছে; রাসেল বললো, হুহুঁ এতো কাছে বোমবার্ডমেন্ট হলে আরো জোরে আওয়াজ আসতো।

গ্যারিসন ব্রিজের নিচে নৌকায় আমি, তাকিয়ে কোনো দূর গহীনে (ছবি: রাসেল)
গ্যারিসন ব্রিজের নিচে নৌকায় আমি, তাকিয়ে কোনো দূর গহীনে (ছবি: রাসেল)

আমাদের নৌকা গ্যারিসনের নির্মীয়মান ব্রিজের নিচ দিয়ে পার হলো, রাসেল আরেকটা স্ন্যাপ নিল। এদিকে দেখা গেল নদীতে সারি বেঁধে গাছের লগ-এর বাহিনী তৈরি করা হয়েছে। এগুলো এভাবে একসাথে জোড়া দিয়ে সপ্তাহ খানেক ধরে এভাবে পানির মধ্যে দিয়ে চালিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় বান্দরবান। অবশ্য যারাই দেখেছেন তারা বলেছেন, বাঁশের বার্জগুলো হয় আরো দীর্ঘ।

আমাদের নৌকা কাইক্ষ্যংঝিরি ঘাটে গিয়ে লাগলে (জনপ্রতি ৳৪০) পটাপট আমরা সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেলাম। তারপর কামরুল দ্রুত গিয়ে বাসের টিকেট করলো (জনপ্রতি ৳৮০)। টিকিট কাউন্টার আমাদের সাথে একটু বাটপারি করে ভালো কিছু সীট থাকাসত্ত্বেয় রোদের মধ্যে ড্রাইভারের পাশের কিছু সীট দিলো। কিছু খেয়েদেয়ে বাসে চড়লাম। আর দীর্ঘ আড়াই ঘন্টার এই বাসযাত্রার অর্ধেকটাই কাটলো ঢলে ঢলে পড়ে যাওয়ার মধ্যে। আর তার সাথে চরম বিরক্তি তৈরি করলো সামনের এক পাহাড়ী মহিলার মুহূর্মুহূ বমির ওয়াক্‌ ওয়াক্‌

অবশেষে দুপুর আড়াইটা নাগাদ রুমা বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে পৌঁছলাম আর তারপর ইযিবাইক নিয়ে চললাম বাসস্ট্যান্ডে। সৌদিয়ার টিকিট কেটে অবশেষে শান্তি (জনপ্রতি ৳৫৫০)। বাস ছাড়বে সন্ধ্যা সাড়ে আটটায়। ততক্ষণ বান্দরবান সদরে থাকতে হবে।

আমাদের যাত্রার আকর্ষণ হয়তো এখানে শেষ, কিন্তু কিভাবে আমাদের, ব্রুস লী’র সাথে দেখা হয়ে গেল, সেটা না বলে তো লেখা শেষ করা যায় না! …নামায শেষ করে কামরুল নিয়ে গেলো ওর পেট্রোল-পাম্প মালিক এক বন্ধুর সাথে দেখা করাতে। সেখান থেকে বান্দরবানের একটা হোটেলে পেটপুরে খাওয়া-দাওয়া সেরে নিয়ে বেশ তৃপ্ত হলাম (চারজনে ৳৩০০)। এদিকে একটা দোকান থেকে মোবাইলটা চার্জ করে নিয়ে যেই অন করেছি, ওমনি অফিস থেকে ম্যাসেজ এসে হাজির। ম্যাসেজ পড়তে না পড়তেই ফোন। কানে তুলে সত্য কথাই বললাম, রাসেল ভাইয়ের পায়ে জখম হয়েছে, আমরা মোবাইল নেটওয়ার্কের বাইরে ছিলাম, যোগাযোগ সম্ভব হয়নি। অফিস সমবেদনা জানালো। বাসাকেও শান্ত করে দিলাম ফোন করে।

কিভাবে বাকি সময়টা কাটানো যায়? রাসেল কখনও বৌদ্ধ ধাতু জাদি যায়নি, কামরুলও যায়নি। তাই ওখানে যাওয়া মনস্থ করলাম। একটা মারুতি ইযিবাইক ঠিক করে চললাম সেখানে। ওখানে গিয়ে দেখি টিকিটের ব্যবস্থা (জনপ্রতি ৳১০) করায় অনেকেই অনুযোগ করছে। তার উপর থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্ট, হাফ প্যান্ট, গেঞ্জি পরে ঢোকা যাবে না— ইত্যাদি বিধিনিষেধে অনেকেরই মনোরথ ব্যর্থ হতে দেখলাম। আমি যেহেতু দুবার দেখেছি, তাই ভিতরে গেলাম না, ওরা তিনজন টিকেট কেটে ভিতরে গেল।

এদিকে আমি তাকিয়ে থাকলাম একজনের দিকে, অবাক বিষ্ময়ে, অপলক চোখে… ধুত্তরি! শুধু কি নারীর দিকেই তাকানো যায়? …আমি তাকিয়ে ছিলাম ব্রুস লী’র দিকে। ব্রুস লী কী সুন্দর করে হাসছে, সঙ্গীদের সাথে কথা বলছে, টিকেট বিক্রী করছে…

কামরুলরা যখন বেরিয়ে এলো, আমি ঐ কিশোরকে দেখিয়ে বললাম, কামরুল বলতো কার মতো দেখতে? কামরুল কোনো ইনটেনসিভ ছাড়াই এককথায় বললো, ব্রুস লী। …বললাম, ভাই, নাকিবের ক্যামেরায় একটা ছবির জায়গাও নাই, তুই ওর ছবি তোল। কামরুল তখন দূর থেকেই অপূর্ব একটা ছবি তুললো তার।

একসময় আমরা আবিষ্কার করলাম, পুকুর কিয়াং আর জাদি বৃক্ষ দেখে ফিরে কিভাবে যেন আমরা ব্রুস লী’র সাথে কথা বলছি। ব্রুস লী আদো বাংলায় খুব নম্র গলায় বুঝিয়ে বলছে কেন এই টিকেটের ব্যবস্থা, কেননা তাদেরকে এর দেখভাল করতে হয় আর তার একটা খরচ আছে। নাকিবের মনে প্রশ্ন জাগলো, আচ্ছা বৌদ্ধদের কিভাবে সৎকার করা হয়? সে শুনেছে খাড়া গর্ত করে লাশ খাড়া ঢুকিয়ে দেয়া হয়। (এই প্রশ্নটা আমাদের মনে সাড়া জাগিয়েছিল সেই ২০০৮ খ্রিস্টাব্দের অতর্কিত বান্দরবান ভ্রমণে)

শুনে তো আমাদের ব্রুস লী’র সে কী হাসি! আদো বাংলায় বললো, এটা সোত্‌তি নয়। বৌদ্ধদের ইচ্ছা অনুযায়ী কাউকে পোড়ানো হয়, কাউকে কবর দেয়া হয়। আর কেউ যদি মৃত্যুর আগে সৎকার পদ্ধতির কথা বলে যেতে না পারেন, তখন ভিক্ষু সেটা ঠিক করে দেন কিভাবে সৎকার হবে। আমরা যখন কথা বলছিলাম, তখন দোতলা দিয়ে গেরুয়া চীবর পরে একজন ভিক্ষু হেঁটে গিয়ে ভিতরে ঢুকলেন। ব্রুস লী আমাদেরকে তাঁর পরিচয় মুখ ভরে দিলো, ইনি এই জাদি’র প্রতিষ্ঠাতা উপঞা জোত মহাথের (পূর্বনাম: উপহ্লা মং)। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ থেকে পাশ করে জ্যেষ্ঠ সহকারি জজ ছিলেন, কিন্তু ধর্মের টানে সংসার-ত্যাগী হয়েছেন। তিনি খুবই ভালো একজন মানুষ— বারবার এমন কথাই বলছিল আমাদের ব্রুস লী। ব্রুস লী-কে আমি বৌদ্ধধর্মের হীনজানি আর মহাজানী মতবাদের ব্যাপারে প্রশ্ন করলাম, সে তার উত্তর জানেনা বলে বুঝলাম।

কিন্তু কে এই ব্রুস লী? ব্রুস লী এখানকার একজন ছাত্র, স্থানীয় ছেলে, মারমা উপজাতির একজন। আসলে ওর নাম লা-হাই সিং মারমা। তার নামটা আমি ঠিকমতো উচ্চারণ করতে পারলাম বলে সে যে কী খুশি! তাকে তবু বলিনি তার সাথে ব্রুস লী’র এই সাযুজ্যের কথা। দেখুন তো আমি মিথ্যা বলছি কিনা…

বৌদ্ধ ধাতু জাদি’র ব্রুস লী (ছবি: কামরুল)
বৌদ্ধ ধাতু জাদি’র ব্রুস লী (ছবি: কামরুল)

লা-হাই সিং মারমা-কে হাসতে রেখে আমরা ফিরে এলাম বান্দরবান সদর। এখানে রাসেল তার ছোটবেলার অভিজ্ঞতা অনুসারে আমাদেরকে প্রস্তাব করলো বান্দরবান ক্যান্টনমেন্টের উন্মুক্ত রেস্টুরেন্টে বসার জন্য— নাম: অনির্বাণ তিরিশ ক্যান্টিন। ওখানে বসলাম। এবং সস্তা কিন্তু মুখরোচক খাবারগুলো একটার পর একটা সাবাড় করতে থাকলাম। আসর, মাগরিব পড়লাম ওখানেই। আসর-মাগরিব পেরিয়ে গেলেও আমরা বিভিন্ন ধরণের খাবার খাচ্ছি সেখানে। শেষটায় আমরা অত্যন্ত তুলতুলে এবং মুখরোচক বসনিয়া রুটি পার্সেল করে নিয়ে নিলাম। এবং অবশেষে উঠলাম। ৳২৭০ [টাকা] দিয়ে তিনজনে রীতিমতো আহামরি খাবার খেয়ে ফেলেছি।

ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে থাকলাম বাসের দিকে। যাবার সময় দৃষ্টি গেল বামদিকের বান্দরবান কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের দিকে। কাল ভাষা শহীদ দিবস। তাই আলোকসজ্জাসহ ফুলেল প্রস্তুতি সেখানে। কিন্তু সে দৃশ্য দেখার সৌভাগ্য আমাদের হবে না। এগোলাম সৌদিয়া’র কাউন্টারে। ব্যাগ রেখে গিয়েছিলাম। সৌদিয়া’র বাস চড়ে যখন আমরা চট্টগ্রাম ছাড়ছি, তখন রাত বারোটা এক মিনিটে শত শত মানুষ ঢাকায় শ্রদ্ধা জানাতে জড়ো হয়েছে শহীদ বেদীতে।

আর, আমরা শ্রদ্ধা জানাই সেই সব পরিশ্রমী পাহাড়ীদের, যাদের সরলতা আজও পাহাড়ে আছে বলেই পাহাড় আছে, আছে জঙ্গল। মানুষ যেন তাদের মতোই সরল হয়, তাদের মতোই হয় নির্মল— এই আমাদের কামনা।

শেষটায় একটা কথা না বললেই নয়, আমরা যে পথে ট্রেক করেছিলাম, সেটা কোনো অধুনা ট্র্যাক নয়, সেপথে আগেই বড়ভাই, আপুরা ট্রেক করে এসেছেন। সুতরাং এটা বোধহয় শেষ পর্যন্ত কোনো অফ-ট্র্যাক রইলো না। তাই ভ্রমণ বাংলাদেশ, আমাদের ট্যুরের বিভিন্ন নিখুঁত ডিটেইল প্রকাশ করার অনুমতি দিয়েছে। আবুবকর ভাই আমাকে তা সরবরাহ করেছেন। আমি আগের পোস্টগুলোতে তা যোগও করে দিয়েছি। …আর যেহেতু এটা আমার জীবনে প্রথম অফ-অ্যাডভেঞ্চার, তাই এটা আমার জন্য অফ-ট্র্যাকই। এই মোহ আমার রক্তে মিশে গেছে। হয়তো শিগগিরই আবার বেরিয়ে পড়বো কোনো অফ-ট্র্যাকে… আল্লাহ জানেন এবং আমি জানি না।

-মঈনুল ইসলাম

________________________________

বিশেষ দ্রষ্টব্য: যাবতীয় ভৌগোলিক কো-অর্ডিনেট “ভ্রমণ বাংলাদেশ”-এর সদস্য আবুবকর-এর থেকে প্রাপ্ত।

পুরো ট্যুরের পরিকল্পনা থেকে শুরু করে বিভিন্ন সাজ-সরঞ্জাম সম্বন্ধে জানতে হলে যেতে হবে এই লেখায়

৫ thoughts on “অফ-ট্র্যাক বান্দরবান ২০১২ (শেষ কিস্তি)

    1. আপনি ভুল বলেননি। আমার তথ্যটা বাংলা উইকিপিডিয়া থেকে নেয়া দৈনিক সমকালের একটা প্রতিবেদনের রেফারেন্সে। ভুল যেটা করেছি, সেটা হলো, আবুবকর ভাইয়ের রিডিংটা না দিয়ে। সেটা যোগ করে দিলাম। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

  1. অনেক সময় নিয়ে আপনার সব গুলা লেখা পরলাম, ভালো লেগেছে, আপনার লেখার হাত ভালো, তবে কিছু জায়গায় একটু বেশি কথন মনে হয়েছে । যাই হোক সব কিছু গুছিয়ে লিখেছেন, আপনার সৃতি সক্তি এবং পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা ভালো । বগা লেক, কেওকারাদং, তাজিংদং যাবার অভিজ্ঞতা আমার আছে, নিজের অনেক সৃতি মনে পরে গেলো । ভ্রমণ বাংলাদেশের সদস্য হিসেবে কামরুল ভাই, আবু বক্কর ভাইদের সাথে কয়েকটা ট্যুর করার সৌভাগ্য হয়েছে, তাই বুজতে পারছি ভালো অভিজ্ঞ লোকের সাথেই ছিলেন সৌভাগ্য ক্রমে । আবু বক্কর ভাইয়ের ষড়যন্ত্রের কথা যখন বললেন তখনই বুঝতে পেরেছি উনি কি করতে চাচ্ছেন, তখন এছাড়া আর উপায় ছিল না । আসলে পাহাড় একটা নেশা, যত যাবেন তত জেতে মন চাইবে । লেখা চালিয়ে যান, আশা করছি ভ্রমণ বাংলাদেশের সাথে কোন একটা ট্যুর এ দেখা হবে কোন একদিন, ভালো থাকবেন ।

    1. অনেক সময় নিয়ে আপনার সব গুলা লেখা পরলাম

      আপনার ধৈর্য্যের জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।

      তবে কিছু জায়গায় একটু বেশি কথন মনে হয়েছে ।

      অতি কথনের স্থানগুলো ধরিয়ে দিলে অনেক উপকৃত হতাম, হয়তো ভবিষ্যতে সেগুলো সংশোধন করতে পারতাম। (আমি নিজের ক্রিটিসিয্‌ম শুনতে পছন্দ করি)

      আপনার সৃতি সক্তি এবং পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা ভালো ।

      ক্ষমা চাই ভাই, আমার স্মৃতিশক্তি খুব খারাপ। মানুষের নাম আমি খুব সহজে ভুলে যাই। স্মৃতিশক্তির অনেক কিছু ক্যামেরার ছবি থেকেও নেওয়া। ডিজিটাল যুগে হাতে ক্যামেরা থাকা মানে অনেক অনেক ছবি। তখন দেখতে না পারলেও পরে দেখা যায়। 🙂

      আর, ভ্রমণ, অবশ্যই ইনশাল্লাহ দেখা হবে।
      ভালো থাকবেন।

মন্তব্য করুন