অজানা লেকের অভিযানে বান্দরবান ২০১৩ : দ্বিতীয়াধ্যায় : পর্ব ৫

ধারাবাহিক:  অজানা লেকের অভিযানে বান্দরবান —এর একটি পর্ব

« অজানা লেকের অভিযানে বান্দরবান : প্রথমাধ্যায়
« আগের পর্ব

তিন্দু থেকে পায়দল জিন্না পাড়ার পাশের ঔলাওয়া পাড়ায় রাত্রিযাপন শেষে পাহাড় বেয়ে পথচলা। সামনে পরপর দুইটা পাহাড় ডিঙাতে হবে অজানা লেকের কাছে যেতে হলে। একটা পাহাড় ডিঙিয়ে জিহ্বা বের করে এসে যখন রুনাজন পাড়ায় একটু প্রশান্তি খুঁজছিলাম, তখনই আমাদের জন্য ‘বাঁশ’ নিয়ে অপেক্ষা করছিল দ্বিতীয় গাইড থং প্রি মুং।

একটু ফ্ল্যাশব্যাক – তিন্দু পাড়ার চেয়ারম্যান আমাদেরকে গাইড নুং চ’র সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন; আর সাথে বোনাস হিসেবে মিলিয়ে দিলেন একই পথের যাত্রী থং প্রি মুং-কে। …এখন এই ব্যাটা তার পাড়ার কাছাকাছি চলে এসেছে, কিছুক্ষণের মধ্যেই সে বিদায় নিবে। এখন এব্যাটা বলে কিনা, আমি আপনাদের সাথে দুদিন ছিলাম, আমাকে ৳১,০০০ [টাকা] দিবেন। মাথা নষ্ট – ভেবেছিলাম, দু’চারশো টাকা দিয়ে বেচারাকে খুশি করে দিব, এখন সে হাজার টাকা দাবি করে বসে আছে। নানা কথা, চেয়ারম্যানের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া, অনুরোধ, অনুযোগ – কিন্তু তার একটাই গোয়ার্তুমি – টাকা এক হাজার। গাইড নুং চ’র কাছেও বিষয়টা ভালো ঠেকলো না। সেও সমাধানের জন্য বুক-পিঠ হাতালো। কিন্তু এব্যাটা টাকার মেশিনকে কোনোভাবেই আমরা নিরস্ত করতে পারলাম না। আরেকটা কথা চিন্তা করে নিরস্ত করলাম না যে, ভবিষ্যত ট্রেকারদের জন্য এটা একটা নেগেটিভ ইমপ্যাক্ট নিয়ে আসতে পারে। (হয়তো বিরাট ভুল করলাম অজান্তেই)

নিজেদের ঘটিবাটি এক করলাম দুজনে – কঠিন হিসাব, যদি থাকে, তবে তাকে দিব। দুজনেই কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেলাম। কিন্তু দুজনেই চাকরি করায় টাকাটা (৳১,০০০) গায়ে লাগলো না, তবে এখন আফসোস করি, ঐসময় টাকাটা দেয়া উচিত হয়নি। এটা এক প্রকারের ডাকাতি – দাবি করলাম, তো দিতে হবে-মার্কা।

রুনাজন পাড়ায় যার ঘরে খেলাম, তার ঘরের ঘরণী কোমর তাতে কাপড় বুনছিলেন, মেঝেতে রাখা দেখলাম। (ছবি: লেখক)
রুনাজন পাড়ায় যার ঘরে খেলাম, তার ঘরের ঘরণী কোমর তাতে কাপড় বুনছিলেন, মেঝেতে রাখা দেখলাম। (ছবি: লেখক)

রান্না হয়ে গেলে খাবার খেতে বসলাম চারজনে। বরাবরের মতোই আমি পাহাড়ি মরিচ দিয়ে ঝাল করে তরকারি রান্না করার পক্ষে – যদিও আমি বাসায় সাদা তরকারি খাই, ঝাল সহ্যই করতে পারি না।

রুনাজন পাড়ার বল্টু - এই বয়সেই কিছু বুঝে উঠার আগে কানে ফুটা করা হয়েছে। (ছবি: লেখক)
রুনাজন পাড়ার বল্টু – এই বয়সেই কিছু বুঝে উঠার আগে কানে ফুটা করা হয়েছে। (ছবি: লেখক)

আমার নিয়ম হলো, যেখানে এসেছি, সেখানকার রীতিতে খাবো – উফ্ উফ্ করবো, তবু খাবো। মজার বিষয় হলো আমার এই ঝালে কষ্ট না হলেও রাসেলের কষ্ট হচ্ছে বেশ। খাওয়া-দাওয়া শেষে ডেকচি সব ধুয়ে পরিষ্কার করে বুঝিয়ে দিয়ে আসা। খাওয়া শেষ করে দ্রুত রওয়ানা করার বদলে দেখা গেলো সবাই-ই বিশ্রাম নেয়ার পক্ষে।

স্কুলঘরের বারান্দায় শরীরটা এলিয়ে সূর্য খানিকটা ম্রীয়মান হবার অপেক্ষা করতে থাকলাম সবাই। প্রচন্ড রোদ উঠেছে। এই রোদ দেখলে কেউ বিশ্বাসই করবে না, রাতে এখানেই শীতের কারণে টেকা দায় হয়ে পড়ে।

রোদ কিছুটা কমে এলে চার্জে দেয়া ক্যামেরাটা নিয়ে এলাম। তাঁদেরকে এর বিনিময় দিতে চাইলে তাঁরা কোনোভাবেই এর বিনিময়ে কিছু গ্রহণ করবেন না, আমাদের উপকার করতে পেরে তাঁরা ধন্য। বেরোবার মুহূর্তে যে-ঘরে খেয়েছি, সে-ঘরের কর্তা-কর্তৃর সাথে ছবি তোলার পর ফের রওয়ানা।

এই ব্যক্তির ঘরেই দুপুরের খাবার খেয়েছি - তিনি এবং তাহার অলঙ্কারাচ্ছিদ পত্নী। (ছবি: লেখক)
এই ব্যক্তির ঘরেই দুপুরের খাবার খেয়েছি – তিনি এবং তাহার অলঙ্কারাচ্ছিদ পত্নী। (ছবি: লেখক)
হাতে পেষা চাল - নারীরা এখানে অনেক পরিশ্রমের কাজ করেন। (ছবি: লেখক)
হাতে পেষা চাল – নারীরা এখানে অনেক পরিশ্রমের কাজ করেন। (ছবি: লেখক)

ছবির মেটাডাটা অনুযায়ী ঘড়িতে ১৪:৫৩, হাতে ঘড়ি না থাকায় অবশ্য সময় জানি না, আমরা রওয়ানা করলাম রুনাজন পাড়া থেকে [ছবিতে ছায়া, আর সিমুলেটরে^ সূর্যের অবস্থান দেখে অনুমিত] সোজা দক্ষিণ দিকে। খানিকটা গিয়ে ডানদিকে, অর্থাৎ পশ্চিম দিকে নিচে নেমে গেলাম ঝিরিতে ফের।

ঝিরিপথে আরো অনেককে পাওয়া গেল, মাছ শিকার করে ফিরছে, কিন্তু তারা দেখা গেল রিক্ত হাতে – মাছ পাওয়া যায়নি। বিষয়টা দুঃখজনক। বামদিকে আবারও আফিম ক্ষেত। আরেকটু সামনে গিয়ে আমি যোহরের নামাজটা আদায় করে নেয়া জরুরি মনে করলাম। দুই মিনিট – নামাজ শেষ – ক’সর তো! 🙂

ঝিরিপথ ধরে চলতে চলতে গাইড নুং চ’র পরামর্শে আমরা থং প্রি-কে ছাড়তে চাইলাম না। কারণ ব্যাটা আজকের পুরো দিনের টাকাও নিয়ে নিয়েছে, অথচ এখন মাঝপথ থেকে কেটে পড়তে চাইছে। আমি বললাম তাকে আমাদের লক্ষ্য-পাড়া পর্যন্ত নিয়ে গিয়ে তারপর ফিরে আসতে, আর নাহলে পাহাড়ের উপর থেকে পাড়া দেখিয়ে দিয়ে চলে এলেও চলবে। কিন্তু এই ব্যাটা বড্ড ত্যাড়া, কোনোভাবেই রাজি করানো গেলো না। একজন মানুষ যেতে চাচ্ছে না, তাকে টাকা দিয়েতো আর কিনে নেইনি, কত আর জোর করা যায়, বাদ দিলাম। যাক, ব্যাটা টাকা নিয়ে ঘুমাকগে। পরবর্তি ট্রেকারদের জন্য শ্রেফ একটাই সাবধানবাণী:

থাংলং পাড়ার/থাইলং পাড়ার গাইড থং প্রি মুং একজন টাকার মেশিন। বাকিটা আপনার ইচ্ছা। আমি তাকে নিতে নিষেধ করছি না; কারো রুটি-রুজিতে লাথি মারা আমার কাজ না। সে, টাকার বিষয়টা ছাড়া, গাইড হিসেবে আমাদের সাথে কোনো অন্যায় করেনি – খুবই ভালো আচরণ করেছে।

আমাদের চারজনের শেষ ছবি, এখান থেকে বিদায় নেয় গাইড থং প্রি মুং। (ছবি: স্বয়ংক্রীয়)
আমাদের চারজনের শেষ ছবি, এখান থেকে বিদায় নেয় গাইড থং প্রি মুং। (ছবি: স্বয়ংক্রীয়)

যাহোক কিছুদূর যাবার পর বামদিকে একটা ঝিরি চলে গেছে, এদিকেই থাংলং পাড়া; থং প্রি মুং আমাদের থেকে বিদায় নিবে, তবে আমাদেরকে পাহাড়ে উঠার পথটা সে দেখিয়ে দিয়ে ফিরবে। কিন্তু সামনে আর পানি পাবো না, তাই এই ঝিরি থেকেই শেষ পানিটুকু সংগ্রহ করলাম সবাই (ঘড়িতে ১৫:২১)। আরেকটু সামনে গিয়ে চারজনে একটা গ্রুপ ছবি তুললাম (ঘড়িতে ১৫:৪৪)। থং প্রি’র ঘঢ়ে থাকা রাসেলের বোঝা এবার কিছুটা জুটলো নুং চ’র ঘাঢ়ে। এরপর গাইড থং প্রি মুং-কে বিদায় জানিয়ে ডানদিকের পাহাড় বেয়ে উঠতে থাকা – আমাদের ঐদিনের দ্বিতীয় পাহাড়ের গায়ে আরোহন শুরু… আমাদের সর্বশেষ দল – তিনজন।

পাহাড়ে এই শিমুল ফুল আমাকে এবার পুরো পথেই পাগল করে ছেড়েছে। (ছবি: লেখক)
পাহাড়ে এই শিমুল ফুল আমাকে এবার পুরো পথেই পাগল করে ছেড়েছে। (ছবি: লেখক)

পথটা যেভাবে গেছে, মনে হচ্ছে আমরা এখন দুটো পাহাড়ের চিপা দিয়ে যাচ্ছি। বেশিক্ষণ লাগলো না আমরা ভালো বেয়ারিংস পেয়ে গেলাম, আশপাশটা ভালো দেখা যেতে লাগলো, কিছুটা উপরে উঠে এসেছি। পড়ন্ত বিকেলে ম্রীয়মান সূর্যের চ্ছটা পাহাড়ের কোলে – সাথে যোগ হয়েছে মৃদুমন্দ বাতাস – বেশ লাগছে বটে। দূরের ঐ পাহাড়টা মনে হচ্ছে উঁচু… আরে না না, ঐটা… আর নাহ্‌, ঐ-যে ঐটা আরো বেশি উঁচু – সবগুলোকেই তো উঁচু মনে হয়। কিভাবে যে জিন ফুলেং প্রথমবার সাকা হাফং-কে সনাক্ত করে আন্দাজ করেছিলেন, এর অসাধারণ উচ্চতা – আল্লা’ মালুম!

পাহাড় ধরে চলতে একসময় হঠাৎ শুনি কল কল আওয়াজ। ঝরণা নাকি দেখার জন্য বরই গাছের কাঁটায় হাত চিরে একাকার হয়ে গিয়ে দেখি সামান্য একটু পাহাড় চুইয়ে পড়া পানি নামছে। তবে যেদিক দিয়ে নামছে, দেখে মনে হবে কোনো আর্কিওলজিক্যাল সাইট, কোনো প্রাসাদের পিলার। পানির কারণেই প্রাকৃতিকভাবে এরকম চেহারা ধারণ করেছে পাথরগুলো।

ঘ্রাণময় শাপলা হাতে নুং চ মং। (ছবি: লেখক)
ঘ্রাণময় শাপলা হাতে নুং চ মং। (ছবি: লেখক)

পরনের নী-ক্যাপ আর অ্যাংকলেটগুলো খুব যন্ত্রণা দিচ্ছে। নিজের জিনিস না পরলে এমনটাই হয়, ঢিলে হয়ে ভাঁজ হয়ে চাপ দিয়ে ধরছে পায়ে। বেশিদূর এগোন যায় না, ভাঁজ খুলে আবার সমান করতে হয়। ভবিষ্যতে, দলে থাকলে নিজের গিয়ার সবসময় নিরাপদ স্থানে নিজ হেফাজতে রাখার নিয়ত করলাম।

আরেকটু এগিয়ে দেখা পেলাম একটা পুকুরের। পুকুরে ফুটেছে শাপলা। গাইড নুং চ দেখলাম এগিয়ে গিয়ে একটা তুলে আনছেন। রাসেল, ফুলটা শুঁকে জানালো, দারুণ ঘ্রাণ ফুলটায়। আসলেই, শাপলা ফুলে এরকম সুঘ্রাণ থাকতে পারে আমার জানা ছিল না। আরো সামনে এগোতে থাকলাম। একসময় সামনে পড়লো বিশাল এক মহীরূহ – বটগাছ। বিশাল বপু শরীর আর ছড়ানো মাথা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কালের সাক্ষী হয়ে। একটু সামনে এগোতেই দেখি… গরু!

হ্যা, ঠিকই গরু! গয়াল না। পাহাড়ে চরে বেড়াচ্ছে গরু – এ’ সত্যিই আশ্চর্য হবার বিষয়। তাও একটা-দুটা না, অনেকগুলো গরুর পাল। তাদেরকে হুশ হুশ করে সরিয়ে পথ করে এগোতে হলো। এগিয়ে সামনে দেখা গেলো একটা পাড়া। আর-সব পাহাড়ি পাড়ার মতোই একটা – নাম জানা গেল: ঙুইখয় পাড়া। একটা স্কুলঘরের সাইনবোর্ড দেখা গেল: ঙুখয়পাড়া রুংনৈ প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয়; বাস্তবায়নে বলিপাড়া নারী কল্যাণ সমিতি (BNKS); সহযোগিতায়: সেভ দ্য চিলড্রেন, থানচি সদর ইউনিয়ন, থানচি। (যারা প্রথম থেকে এই ভ্রমণ-বৃত্তান্ত পড়ে আসছেন, তাদের নিশ্চয়ই বলিপাড়া বিজিবি ক্যাম্পের কথা মনে আছে?)

ঙুইখয় পাড়ার ভিতর দিয়ে সামনে এগিয়ে চলা। (ছবি: লেখক)
ঙুইখয় পাড়ার ভিতর দিয়ে সামনে এগিয়ে চলা। (ছবি: লেখক)

এবং, এই পাড়ায়ই প্রথম আমরা দেখলাম, উলঙ্গ মানুষ। ঠিক দিগম্বর না, পুরুষরা খুব ছোট্ট কৌপিন পরে আছেন। আর নারীদের বক্ষ উন্মোচিত। পাহাড়ে আগেও এসেছি, কিন্তু এতোটা আদিমতায় আগে কখনও আসা হয়নি। ধর্ম যেমন যার যার, তেমনি সংস্কৃতিও। পূর্ণ শ্রদ্ধা তাদের নগ্ন সংস্কৃতির প্রতি – ক্যামেরা বন্ধ!

"ঙুইখয় পাড়া কাঁঠাল সমিতি" - আমি তো এটাকে এভাবেই পড়ি। :) (ছবি: লেখক)
“ঙুইখয় পাড়া কাঁঠাল সমিতি” – আমি তো এটাকে এভাবেই পড়ি। 🙂 (ছবি: লেখক)

ঙুইখয় পাড়ায় আমার ক্যামেরার জিপিএস দিয়ে আরেকটা ট্র্যাক পেয়েছি। জিপিএস ফাইলটা দিয়ে দিলাম। গুগল আর্থে বসিয়ে নিলে আমাদের পথ-পরিক্রমা সম্পর্কে আরেকটু পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে।

এই সেই ভ্যালি - ঐ দূরে দাঁড়িয়ে নুং চ মং আর রাসেল। (ছবি: লেখক)
এই সেই ভ্যালি – ঐ দূরে দাঁড়িয়ে নুং চ মং আর রাসেল। (ছবি: লেখক)

এই পাড়ার ভিতর দিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়া। পাড়া পার হয়ে সামনে এগিয়ে তো আমি… বিষ্মিত! অভূতপূর্ব এক ভ্যালি – বিস্তৃত ঢালু এক স্থান, যেখানে গাছের আধিক্য নেই, কিন্তু কিছু একাঙ্গি গাছ প্রেইরি অঞ্চলের মতো ইতস্তত ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। প্রচুর বুলবুলি পাখি উড়ে বেড়াচ্ছে জায়গাটায়।kmz-icon জায়গাটা আহামরি হয়তো নয়, কিন্তু পড়ন্ত বিকেলের তীর্যক আলো, মৃদুমন্দ বাতাস আর আমাদের পরিশ্রমের পথে এই সামান্য প্রশান্তি আমাদেরকে যেন স্বর্গে এনে হাজির করেছে। অপূর্ব লাগলো জায়গাটা পার করতে। সামনেই একটা খাড়া পাহাড়, পথটা একেবেঁকে উঠে গেছে ওখানে। আমাদের গন্তব্যও সেদিকে। ভ্যালি থেকে পেছনে ফেলে আসা ঙুখয়পাড়া দেখা যায়, আর বাম দিকে আরো নিচে আরেকটা পাড়া: ফাদাপ পাড়া (Phadap paRa)।

ভ্যালির এই প্যানোরামাটা শেয়ার না করলেই নয়। (ছবি: লেখক)
ভ্যালির এই প্যানোরামাটা শেয়ার না করলেই নয়। (ছবি: লেখক)

পাহাড়ের কাছে যখন গেলাম, তখন দেখি একটু সমস্যা – পথটা একটু বেশিই খাড়া। কোনো কোনো জায়গায় পা রাখার জায়গাও খুবই কম। সেখানে দেখা গেল স্থানীয়রা গাছের বেরিয়ে থাকা শিকড় ধরে উঠার পথ করেছেন – আমরা রোমে এসে অ্যাক্ট লাইক অ্যা রোমান ছাড়া উপায়ান্তর দেখলাম না।

ভ্যালি পেরোতেই এভাবে শিকড় ধরে ধরে অল্প জায়গায় পা রেখে উঠতে হয়েছে খাড়া পাহাড়ের ঢালটা। (ছবি: লেখক)
ভ্যালি পেরোতেই এভাবে শিকড় ধরে ধরে অল্প জায়গায় পা রেখে উঠতে হয়েছে খাড়া পাহাড়ের ঢালটা। (ছবি: লেখক)

পাহাড়ের উপরটা প্রায়-সমতল; একটা পায়েচলা পথ সোজা চলে গেছে আধো ঢাল বরাবর। পড়ন্ত রোদের মধ্যে আমরাও সেপথ ধরলাম। পাখিদের বৈকালিক কুজনের মাঝ দিয়ে পথ চলা – নীল বরণ পাখি, সবুজ বরণ পাখি – নাম-না-জানা কত পাখি যে আছে এদিকটায়, তার ইয়ত্তা নেই। আরো সামনে যেতে পথটা বেশ খাড়া হয়ে উঠলো। রাসেলের তো খাড়া পথ দেখলেই দফারফা অবস্থা। সবই কিন্তু সে পারে, কিন্তু হা-হুতাশ বেশি করে – অযথাই করে। খাড়া পথে একটু উঠা, খানিকটা সমতল, আবার উঠা – এরকম বেশ কিছুদূর চললো। তবে এখানেই শান্তি, প্রথম পাহাড়টার মতো ভোগাচ্ছে না এটা। পথটা দুজনের কাছেই বেশ উপভোগ্য হয়ে উঠলো। রাত হলেও আপত্তি নেই, খুব ধীরে ধীরে পথ চলছি আমরা। এতোটাই ধীরে যে, আমাদের রাসেল বাবাজিও আমাদেরকে ধন্য করে তার সাধের এসএলআরখানা বের করেছে এবারে। আবু বকরের কথা মনে পড়লো আমার – ও’ বেচারা এভাবে ঢিমা তালে ট্রেক করতে দেখলে আমাকে কাচা খেয়ে ফেলতো।

পাহাড়ের উপরের পথটাও ছিল দেখার মতো। নুং চ এগিয়ে আসছেন। (ছবি: লেখক)
পাহাড়ের উপরের পথটাও ছিল দেখার মতো। নুং চ এগিয়ে আসছেন। (ছবি: লেখক)

ডানদিকে ঐতো নিচে, চমঈ পাড়া রেখে এগোচ্ছি সোজা। বাম দিকের ঐ দূ–রের পাহাড়টার দিকে একটু একটু করে নেমে যাচ্ছে সূর্যটা, একটু যেন বেশিই তাড়াহুড়া ওর – দেখার মতো দৃশ্য, কেননা আমরাও দাঁড়িয়ে আছি কোনো এক পাহাড়ে। এমন সময় তাকিয়ে দেখি চমঈ পাড়ার আকাশে ম্রীয়মান পূর্ণ শশী। বায়ে রবি, ডানে শশী – মাঝখানে মৃদুমন্দ সমীরণে আমরা একেকজন রবীন্দ্রনাথ!

একটা ভ্রমর ভনননন ভনননন করে কোথাও উড়ছে আশেপাশে, আমাদের নড়া পেয়েই উড়াল দিচ্ছে। আমি স্থির হয়ে দাঁড়ালাম, ব্যাটাকে ক্যামেরায় ধরতে হবে। রাসেল আমার পাশ কাটালো, “লাভ নাই। আমি একদিন সারাদিন কাটাইছি এই ব্যাটার ছবি তুলতে পারি নাই।” জেদ চাপলো – এমন কী আহামরি এই মহাশয়! জেদে কাজ হলো – ঝাপসা হলেও তুলতে পারলাম তাহার একখানা তসবির। ব্যাটা, তোর সারাদিন, আমার ১০ মিনিটের কাজ, হুহ! 🙂 তবে সেটা ফটো হলো বটে, ফটোগ্রাফির সাক্ষাৎ অপমান করলো।

সামনেই নাকি হ্যাংম্যান পাড়া। এখানেই আমাদেরকে পার করলেন উর্ধাঙ্গ উলঙ্গ মহিলারা। রাসেলের অভিযোগ, সে যখন ‘লজ্জায় মাথা কাটা’ যাবার উপক্রম, আমি নাকি তখন আড়চোখে তাদের দেখছিলাম। অভিযোগ প্রমাণ করার কোনো উপায় নেই – আমরা অভিযোগ গ্রহণ করলাম না – কী বলেন?

আরো সামনে এগোতে থাকলাম। একসময় সামনে গিয়ে আবার সেই আজব বেড়া, তবে এবারেরটা আজোবিয়োসো! কারণ, পথটাও এখানে খাড়া, তারউপর একটা গাছ, তার গায়ে খাড়া এই আজব বেড়া। এখানে ছবি তুলতে গিয়ে রাসেলের থেকে দারুণ একটা ফটোগ্রাফির টিপ্‌স পেলাম – আমি তুলি সাক্ষী ছবি, ফটোগ্রাফি আমাকে দিয়ে হবে না। তবু এই টিপ্‌সটা সাক্ষী ছবির জন্যও দারুণ:

সবসময় ছবি তুলবি পার্সপেক্টিভসহ। আমি একটা বেড়া পার হচ্ছি, এটা সিগনিফিকেন্ট না। বরং আমি বান্দরবানের উঁচু পাহাড়ের উপর একটা খাড়া পথের মধ্যে একটা বেড়া পার হচ্ছি সেটা এই দৃশ্যের প্রশ্নে বেশি সিগনিফিকেন্ট।

পাহাড়ের উপর থেকে দেখা সূর্যাস্তের পূর্বলগ্নে তোলা প্যানোরামা। (ছবি: লেখক)
পাহাড়ের উপর থেকে দেখা সূর্যাস্তের পূর্বলগ্নে তোলা প্যানোরামা। (ছবি: লেখক)

বুঝলাম, যুম করে রাসেলের, একটা বেড়া পার হবার ছবি তোলার বদলে আরেকটু যুম আউট করে পাহাড়-আকাশ-বৃক্ষ-ঢালুপথ -এর যতটা পারা যায়, যদি আনা যেত, তা-ই হতো কাজের কাজ। যাহোক, ভুল না করলে তো শেখা হতো না। ধন্যি ওস্তাদ রাসেল!

পাহাড়ের আড়ালে হারিয়ে যাওয়া সূর্য (ছবি:লেখক)
পাহাড়ের আড়ালে হারিয়ে যাওয়া সূর্য (ছবি:লেখক)

…আরো সামনে চললো পথ। সূর্যটা লাল হতে শুরু করেছে। ডানদিকে দূরে এবারে আরেকটা পাড়া: পাংখু পাড়া। …একসময় সূর্য অস্ত গেলো। এবং কী কারণে জানি না, গাইড নুং চ একটু দ্রুত হাঁটা শুরু করলেন। একটু যেন তাড়াহুড়া বেড়ে গেলো তাঁর। সামনেই চোখে পড়লো একটা পাড়া, আমাদের কাঙ্ক্ষিত সেই পাড়া। …কিন্তু না, নুং চ জানালেন – এটা কাইন্দং পাড়া (স্থানাঙ্ক: 21, 47.6271′ 0″ N; 92, 27.7548′ 0″ E; উচ্চতা: 242.3 m [794.9475′])। আমাদের লক্ষ্য পাড়াটা আরেকটু দূরে। তিনি এখানেই থাকার পক্ষপাতি। আশা করি বুঝে গেছেন, অন্ধকারে পথ চলতে পাহাড়িরা খুব ভয় পায় – এখানেও তা-ই ঘটেছে। যাহোক, কাছেই আমাদের লক্ষ্য-পাড়া, খুব ভোরে উঠে কালকে সেখানে গিয়ে লেকে অভিযান করা যাবে।

কিন্তু কাইন্দং পাড়ায় থাকার কথা বলতে গিয়ে জানা গেলো এই পাড়ায় কোনো থাকার জায়গা হবে না। লাও ঠ্যালা! আমি যখন হাল ছেড়ে দিচ্ছিলাম, তখন কোথায় যেন আশার আলো দেখে নুং চ এগিয়ে গেলেন। কাইন্দং পাড়াটা বেশ গরীব বলে মনে হলো – মারমা পাড়াগুলো মনে হয় সব সময়ই এরকম একটু বেশি গরীব। শেষ মাথার একটা ঘরে আমাদের থাকার ব্যবস্থা হলো। যাক বাঁচা গেলো। কারবারীর বড় ভাই তিনি, নাম: উ সাই খয়

একটা বড় তেঁতুলগাছের পাশেই তাঁর ঘর। পুরোপুরি সন্ধ্যা নেমে গেছে। ঘরের ভিতর ঢুকেই তাই বাক্স-পেটরা রেখে, নী-ক্যাপ, অ্যাংকলেট খুলে, গোসল করতে গেলাম। পাড়ার এক মাথায় এনজিও’র দিয়ে যাওয়া টিউবওয়েল চেপে পানি বের করে গোসল করতে হবে। কয়েকজন নারী গোসল করছেন। তাদের গোসল শেষ হলে গোসল করতে গেলাম। রাসেল, শেষ মুহূর্তে জানালো, গোসল করবে না।

উ সাই খয় - দাঁত কেলিয়ে হাসি; পিছনেই দেখা যাচ্ছে তাঁর পূজার সরঞ্জামাদি (ছবি: লেখক)
উ সাই খয় – দাঁত কেলিয়ে হাসি; পিছনেই দেখা যাচ্ছে তাঁর পূজার সরঞ্জামাদি (ছবি: লেখক)

টিউবওয়েলের ঠান্ডা পানিতে গোসল করতে গিয়ে শীতের বাতাসে কাঁপুনি এসে যাচ্ছিলো। কিন্তু গোসলটা দেবার পর বোঝা গেল এর মানে কী – প্রশান্তি। সব ক্লান্তি ধুয়ে-মুছে গেলো। গোসল শেষে গা মুছতে মুছতে যখন ঘরে এসে ঢুকলাম, উ সাই খয়, তখন ঘরের এক কোণে ইবাদতে মগ্ন। টেপরেকর্ডারে একটা মন্ত্র বাজছে গমমমম গমমমম কিংবা গননন গননন করে, ঘরের ঐ কোণটায় সিডি দিয়ে সাজানো, বিভিন্ন আসনে বসা বুদ্ধের কিছু ছবি, শোভা পাচ্ছে বিভিন্ন প্রাণীমূর্তি, একটা কাগজে সম্ভবত পালি ভাষায় কিছু মন্ত্র লেখা, আর… মরিচা বাতি দিয়ে কোণাটা সাজানো, এবং সেগুলো জ্বলুনিভু করছে। ঘরে সৌরবিদ্যুতের আলো থাকলেও দুটো মোমবাতি জ্বালিয়ে ইবাদতে মশগুল, বৌদ্ধমতানুসারী এই ব্যক্তিটি। আমি কাপড় পাল্টাতে পাল্টাতে তিনি ষাষ্টাঙ্গ প্রণাম দিয়ে প্রার্থণার ইতি টানলেন। আমি তাঁর ছবি তুলেছি দেখে এবারে ভালোমতো একটা পোয দিয়ে দাঁড়ালেন – আমি যেন তাঁর ছবি তুলে দেই। সে কী কেলিয়ে হাসি ছবিটা তোলার পরে!

উ সাই খয়-এর রান্নাঘরে রান্নার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত আমি আর গাইড নুং চ মং। (ছবি: রাসেল)
উ সাই খয়-এর রান্নাঘরে রান্নার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত আমি আর গাইড নুং চ মং। (ছবি: রাসেল)

সৌরবিদ্যুতে কিছুক্ষণ ক্যামেরাটা চার্জ দেবার সুযোগ হলো। রাসেলকে সাজগোজে রেখে আমি আর নুং চ গেলাম রান্নার আয়োজন করতে। রসদ যা আছে, ডাল, আলুর তরকারি – ভালোই খানা-খাদ্য হয়ে যাবে। বাড়তি হিসেবে আগের কেটে রাখা অর্ধেক বাঁধাকপি দিলেন আমাদেরকে উ সাই খয়। টাকা দিতে হবে না। আগের মতোই ঝাল করে তরকারি রাঁধার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম আমি। পরে রাসেল এসে খানিকটা কমিয়ে দিলো।

আমরা যখন এদিকে রান্নাঘরে রন্ধনকলায় ব্যস্ত, ওদিকে সামনের ঘরটায় সৌরবিদ্যুতে চালু করা হয়েছে টেলিভিশন: ডিভিডি প্লেয়ারে ঢাকাই বাংলা ছায়াছবি ছেড়ে পুরো পাড়ার পিচ্চি-পাচ্চি আর তাদের মা-সম্প্রদায় এসে জড়ো হয়েছেন দেখতে। আর সান্ধ্যকালীন এই শো পরিচালনার দায়িত্বে আছেন উ সাই খয়-এর সুন্দরী বৃদ্ধা স্ত্রী। ওদিকে যখন সান্ধ্যকালীন শো চলছে, এদিকে রান্নাঘরের একপাশে উ সাই খয়, পাড়ার আরো দুজনের সাথে সামাজিক বিভিন্ন বিষয়াদি নিয়ে আলোচনা করছেন।

উ সাই খয়-এর স্ত্রীর তত্ত্বাবধানে ঘরে বসেছে রাতের শো - মুগ্ধ শিশু আর তাদের মায়েরা। (ছবি: লেখক)
উ সাই খয়-এর স্ত্রীর তত্ত্বাবধানে ঘরে বসেছে রাতের শো – মুগ্ধ শিশু আর তাদের মায়েরা। (ছবি: লেখক)

রন্ধনকলা শেষে, তাদেরকে খাওয়ার সুযোগ করে দিলাম। তারপর আমরা খেয়ে নিলাম। সকালের জন্য কিছুই রাখলাম না, বিস্কুট আছে, ওগুলো খেয়েই পথ চলবো – গাইডের সাথে এরকমই পরিকল্পনা করেছিলাম। খাওয়া-দাওয়া শেষে ঘুমানোর পালা। কিন্তু শো তো আর শেষ হয় না – টিভিতে “ছেড়ে দে শয়তান” টাইপের স্টোরি এরা গোগ্রাসে গিলছে। অবশেষে কে কে যেন ঘুমে ঢলে ঢলে পড়ছিল দেখে শো ভন্ডুল করে দেয়া হয় সেদিনের মতো। একেবারে রাজার হালে ঘুমানোর ব্যবস্থা। এই ক’দিন প্রচণ্ড শীতে কাঁথা-কম্বলের যা ঘাটতি পড়েছিল, আজকে দেখা গেল তার ষোলকলা পূরণ হয়েছে, মেঝেতে পাতা তোষকের উপর বিছানা, মাথার নিচে বালিশ, উপরে কম্বল, তার উপর সুন্দর করে বেড়া দেয়া জানালাবদ্ধ ঘর – শীতের বাপের সাধ্য আছে নাকি এসে হানা দেয়! এমনকি প্রচন্ড শীতের মাঝে রাতে ঘেমেই উঠলাম শেষে। তবে বেশ তৃপ্তির একটা ঘুম হলো – দুদিনের ক্লান্তি সব ধুয়ে-মুছে গেল।

“আছে তো! তংক্ষিয়্যং পুকুর” – আদিবাসী কথার সুরে সুরে ঔলাওয়া পাড়ায় গতকাল কথাগুলো উচ্চারণ করছিলেন চাপা স্বভাবের সেই স্কুলশিক্ষক মংলীগিহ। তখনই আমরা বুঝে গেছিলাম, আমরা যে লেকের সন্ধানে বেরিয়েছি, তার অস্তিত্ব আছে। ঢাকায় বসে আবুবকর, নিজের জিপিএস থেকে হাব্রুহ্যাডম্যান পাড়া দেখালেন। সাকা হাফং যাবার পরিকল্পনা ছিল আমাদের – সংক্ষিপ্ত সময়ে ফিরতি পথ হিসেবে থানচি ছিল ভরসা। সাকা থেকে নেমে জিন্না পাড়া কিংবা ওদিকেরই কোনো একটা পাড়ায় একদিন থেকে পরদিন থানচি ফেরা। পথটা মার্ক করার জন্য পদ্মমুখ খুঁজতে থাকলেন আবুবকর। কিন্তু ঠাহর করতে না পেরে আন্দাজ করে একটা জায়গা চিহ্নিত করলেন, পদ্মমুখে ঝিরিটা একটু প্রশস্ত হয়েছে, সম্ভবত এই জায়গাটাই হবে পদ্মমুখ – মার্ক করলেন গুগল আর্থে। আমি দূরত্বটা একদিনে পার করা যাবে কিনা সন্দেহে একটা সোজা দাগ টানলাম জিনা পাড়া থেকে ঐ বিন্দুতে। বিশাল দূরত্ব, কিন্তু আবুবকরের বক্তব্য হলো একদিনে সম্ভব। আবুবকর বলছে সম্ভব, ব্যস সম্ভব। আবুবকর চলে গেলে মানচিত্রটা যুমইন করে দেখি একটা লেক – সরলরেখার নিচেই পড়েছে ওটা। ঐ অঞ্চলে দুটো জিপিএস রিডিং আছে, লেকে যায়নি কেউ। আবুবকরও সেরকমই বললেন। মনের মধ্যে তখনই পোকাটা ঢুকে যায় – শেষ পর্যন্ত সেদিকেই পথ চলেছি আমরা দুজন – আমি আর রাসেল, সাথে গাইড নুং চ মং।

প্রথমে এর অস্তিত্বের কথা জানান তিন্দু পাড়ার চেয়ারম্যান, তাঁরই পরামর্শে র‍্যুট পরিকল্পনা করি আমরা, প্রথম রাত জিনা পাড়ায়, পরের রাত তংক্ষ্যিয়ং পাড়ায়। সে লক্ষ্যেই পথ চলছিলাম, কিন্তু এখানে এসে পুকুরটা দেখা গেলো কাইন্দং পাড়ার বেশি কাছে। তাই সেখানেই রাত কাটানো।

২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ | ০৬:৩০

ভোরে উঠে রাসেল চলে গেল তার পরিচ্ছন্নতার কাজে, কোনো এক খোলা ঢালে। অবশ্যই কেউ একজন পাহারায় থাকলো, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোথায় পাতা চরচরের আওয়াজ শুনে কিংবা কোনো এক পাহাড়ি-ললনার বহিরাগমনে অসম্পূর্ণ রেখেই ফিরে আসে বেচারা। এই জায়গায় এই বেচারা একটু বেশি চ্যুযি, আর এখানেই তার সাথে ঘটে যত বিপত্তি। এর থেকে শিক্ষা এটাই পাওয়া গেল যে, কোনো বিষয়ে চ্যুযি হলে পাহাড়ে জঙ্গলে যাওয়ার দরকার নেই।

উ সাই খয়ের ছোট সন্তানই বোধহয় ঠু শুই তিন। বয়সে কিশোর, কিন্তু পাংক: ব্লেযার, মাফলার, জিন্স; হাতে মোবাইল, গান বাজছে জোরে জোরে – এই বাজলো হিন্দী গান, এই আবার সাবিনা ইয়াসমিন। পথ দেখিয়ে নিয়ে চলেছে আমাদের কাঙ্ক্ষিত তংক্ষ্যিয়ং পুকুরে। পাড়ার পিছনেই পুকুরটা, যখন সামনা-সামনি দেখলাম…

আমি পুরাই হতাশ! এই পুকুরের জন্য এতো কষ্ট করে এখানে আসার কোনো মানেই হয় না।

তংক্ষিয়্যাং পুকুর কিংবা থাইংক্ষ্যাং পুকুর (GE: 21°47’27.53″N, 92°27’33.57″E), মাটি কেটে বানানো একটা বড়সড় দিঘিমাত্র। গুগল আর্থে যেভাবে দুইভাগে ভাগ করা অবস্থায় দেখা যায়, সেভাবেই আছে। পুকুরের বিশেষ কোনো বৈশিষ্ট্য নেই। আগে আরেকটু ছোট আকারের ছিল, পরে মাংসায় হেডম্যান, পুকুরটা কেটে বড় করেছেন। মারমা উপকথা অনুযায়ী, কিংবা লোককথা অনুযায়ী যা জানা যায়, তা হলো [বর্তমান থানচি উপজেলার অন্তর্গত] এই পুকুরটা অনেক পুরোন, এবং অনেক দূরের [রুমা উপজেলার] (সরলরেখায় ২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত) বগা লেকের (বগাকাইন হ্রদ) সাথে এটি সংযুক্ত, মারমা ভাষায় যাকে বলে – জোটক (connected)।

তংক্ষ্যিয়ং পুকুর - আমাদের কাঙ্ক্ষিত সেই লেক - বগা লেকের সাথে জোটক যেই পুকুরটি। (ছবি: লেখক)
তংক্ষ্যিয়ং পুকুর – আমাদের কাঙ্ক্ষিত সেই লেক – বগা লেকের সাথে জোটক যেই পুকুরটি। (ছবি: লেখক)

ঠু শুইয়ের থেকে অনেক কাহিনী শোনা গেল – একটা বিরাট মাছের কথা শোনা গেল। মাছটা নাকি বগা লেক থেকে আসে। যখন এখানে আসে, তখন বিকট আর ভয়ংকর আওয়াজ করে। কোনো এক ব্যক্তি গরু চরাতে এলে মাছটাকে দেখে, পরে স্বপ্নে ভয় পায়। তারপর আরেকদিন মাছটাকে মারতে এসে নিজেই মারা যায়। অনেকদিন পুকুরে কেউ গোসল করেনি, এখন করে। …এগুলো ঠু শুইয়ের বলা কাহিনী; বাস্তব কিংবা কল্পনার সত্য-মিথ্যায় যাব না। তবে দুটো কথা: এক, বগা থেকে একটা বিশাল মাছ আসে বিষয়টা অযৌক্তিক, কারণ বগা লেকে এরকম বিশাল মাছের কোনো লোকগল্প শুনিনি (শুধু বগা’র, মানে ড্রাগনের লোকগল্প শোনা যায় সেখানে)। অবশ্য দুই, যেকোনো বড় জলাধারকে ঘিরে একটা না একটা বড়সড় মাছের একেকটা লোকগল্প শোনা যায়; আমার বাড়িতেই পুকুরের সমস্ত পানি সেচে দেখা না পেলেও এখনও অনেকে এরকম বিশ্বাস ধারণ করেন।

তংক্ষিয়্যাং পুকুরকে দেখে কি আমার ক্যামেরাও হতাশ হয়ে গেল নাকি! দুটো মাত্র ছবি তুলেছি – যেই না জিপিএস অন করেছি, অমনি “ব্যাটারি এগ্‌যহস্টেড”। শেষ পর্যন্ত রাসেলের ক্যামেরাই সার – আমরা তংক্ষিয়্যাং পুকুরের পাড়ে দাঁড়িয়েও জিপিএস রিডিং নিতে পারলাম না, জানতে পারলাম না কতটুকু উঁচুতে অবস্থিত এই পুকুর। তবে কাইন্দং পাড়ায় একটা ছবিতে জিপিএস লগ পেয়েছিলাম, (আগে উল্লেখ করা হয়েছে) তা দেখে অনুমেয় যে, গুগল আর্থে এই পুকুরের ২৩৫ মিটারের যে উচ্চতার উল্লেখ আছে (২০০৩ সালের পরিমাপ অনুযায়ী), তা খুব একটা ভুল না।


তংক্ষ্যিয়ং পুকুরকে আমি গুগল ম্যাপে যুক্ত করেছি।

যে অজানা লেকের অভিযানে বেরিয়েছিলাম, তা যে একটা ঐতিহ্যবাহী পুকুরের পাড়ে এনে দাঁড় করিয়ে দিবে – তা বুঝতেই পারিনি। তবে শুধু এতুটুকুই সান্তনা যে, কোথাকার বগা লেকের সাথে মারমা উপকথায় এই সামান্য পুকুরের সংযোগ আছে – তা এখানে না এলে জানা হতো না। আমাদের এই হতাশা ঠু শুই তিন আঁচ করতে পারলো কিনা জানি না, কিন্তু এখানে সান্তনা দেবার জন্যই কিনা জানিনা, হঠাৎই বোমা ফাটালো আমাদের ঠু শুই তিন: এখানেই একটা ঝরণা আছে, যেখানে ভর দুপুরে প্রতিদিনই রংধনু দেখা যায়। এ ব্যাটা বলে কী? তার উপর আমাদের আঁতে ঘা দিয়ে বলে কিনা এর আগে কোনো বাঙালি এটাতে যায়নি। মাথা নষ্ট ম্যান! …কিন্তু যেভাবে সময়ের হিসাব কষতে হচ্ছে, ভর দুপুর পর্যন্ত থাকা তো যাবে না এখানে। খুব বেশি সময় নেই হাতে। যা করার এক্ষুণি করতে হবে।

দুজনই চললাম ঝরণার দিকে, তংক্ষিয়্যাং পুকুরের দিকে মুখ করে দাঁড়ালে বাম দিকে একটু টিলায় উঠতে হয়, তারপর ঝিরিতে নামতে হয়। ঝিরিতে নামতে গিয়ে যখন রাসেল দেখলো পথটা তাকে লাথি মারছে, সে বললো: “থাক, আমি গিয়ে আর টীমকে স্লো করে দেয়ার দরকার নেই। তুই ওকে নিয়ে চলে যা, আর আমার ক্যামেরাটা নিয়ে যা।” আমার ঘুমিয়ে থাকা ক্যামেরাটা রাসেলস্থ করে ওর এসএলআরটা নিলাম। এই প্রথম হাতে একটা এসএলআর নেয়া – তাৎক্ষণিক দেখিয়ে দিলো কিভাবে কাজ করবে। কতটুকু বুঝলাম আল্লা’ মালুম – শুধু এতুটুকু বুঝলাম: যুম ক্যামেরার চেয়ে এসএলআর ক্যামেরার ব্যবহার একটু ব্যতিক্রম। মহা আবিষ্কার করে ফেলেছি!

পথচলা শুরু। রাসেল একা থেকে গেলো, হাতে আমার ক্যামেরাটা, এইমাত্র একটা গাছ থেকে ঠু শুইয়ের পাড়া একটা দারুণ পাকা পেঁপে আর গাছ থেকে হাত দিয়ে পাড়া বড়ই – সকালের নাস্তা হিসেবে মন্দ না! এই পথটা দিয়ে কেউ যায় না, এখানে-ওখানে গাছ পড়ে আছে, ঝোঁপ দিয়ে ঢাকা – আমি আর ঠু শুই তিন – দুজনেই দুই পাহাড়ি ছাগল; শুধু রাসেলের ক্যামেরাটা আগলে রাখতে গিয়ে একটু ধীর হয়ে পড়ছি আমি – এসএলআর বলে কথা! কোথাও থেমে থেমে ক্লিক করছি – ব্যস। ভালোই তো চালাতে পারছি!

এগিয়ে গিয়ে ঠু শুই বাম দিকে একটা পাহাড়ে উঠতে লাগলো। আমিও অনুসরণ করলাম তাকে। অনুচ্চ পাহাড়টা টপকে ওপাশে গিয়ে দেখি ছোট্ট ধারায় একটা মৃদু ঝরণা ঝরছে, আমরা এখন ঝরণাধারাটার উপরে আছি। “ঠু শুই; ঝরণা, কি, এইটা?” জবাবে ঠু শুই বললো, “না, ঝরণা আরো সামনে।” ছোট্ট ঝরণাটা বেয়ে আমরা আরেকটা ঝিরিতে নামলাম, এবারে ডান দিকে চলতে থাকলাম। একটা বিশাল গাছ পড়ে আছে ঝিরির উপর, ওটাকে টপকে এগোলাম। ঝিরিটা যেন পুরো একটা ইউটার্ন নিলো বাম দিকে। পথে নেমেই আমি একটা কাগজের উপর কম্পাস রেখে ম্যাপ আঁকতে শুরু করেছিলাম, কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই ব্যর্থ হলাম – অনভ্যস্থতা আর তাড়াহুড়ার কারণে চলার দিক, কম্পাসের পরিবর্তন আর হাতের রেখার সামঞ্জস্য আনতে তীব্র বেগ পেতে হলো। অগত্যা সময়কে গুরুত্ব দিয়ে মানচিত্র অংকনে ক্ষান্ত দিলাম। ইউলুপটা গিয়ে ঠেকলো একটা মাঝারি উঁচু পাহাড়ের সামনে – যেখানে টেপের পানির মতো একটা ঝরণা ঝরছে!

তিনদিকে পাহাড়বেষ্টিত একটা নোংরা ঝরণা – পাহাড়ের গভীরে অনুদঘাটিত ঝরণাগুলোর চেহারা এমনই হয়। একটা বিশাল গাছ এনে ফেলেছে নিচে, ওটা ওখানেই পড়ে আছে। এই ঝরণায় রংধনু দেখা যায়! এতো ছোট্ট ধারায়! ঠু শুই যেন আমার মনের কথাটা বুঝতে পারলো, যা বললো তার সারমর্ম হলো: দুপুরবেলা সূর্যটা মাথার উপর এলে পাহাড়ের ভিতরে আলো পড়ে, তখন ঝরণায় রংধনু দেখা যায়।

আমাদের আবিষ্কৃত ঝরণা - নাম দিয়েছি: কাইন্দং পাড়া ঝরণা। (ছবি: লেখক)
আমাদের আবিষ্কৃত ঝরণা – নাম দিয়েছি: কাইন্দং পাড়া ঝরণা। (ছবি: লেখক)

একটা ঝরণা দেখলাম, যা আগে আমাদের মতো কোনো এক্সপ্লোরার আবিষ্কার করেনি, মানে আমরাই প্রথম আবিষ্কার করলাম – অনুভুতিটা ভালোই। তবে আবিষ্কারটা খুব বুক ফুলিয়ে দেখানোর মতো সুরতের না, তবু ছবি তুলতে লাগলাম। এবং তখনই যুম করতে গিয়ে আবিষ্কার করলাম, এসএলআর-এর যুম করার ধরণটা ভিন্ন, ল্যান্স ঘুরিয়ে যুম করতে হয় – টিভিতে দেখেছি। কিন্তু সেখানে সমস্যা না, সমস্যা হলো ফোকাসিং-এ, যুম করতেই দেখি দৃশ্যপট ঘোলা হয়ে গেছে। মাঠে মারা! আবার যুমকে আগের অবস্থায় নিয়ে এলে দৃশ্য পরিষ্কার। কিছুক্ষণ ঘাটাঘাটি করার পর বুঝতে পারলাম, যুম স্লাইডারের সামনেই ফোকাসিং-এর আরেকটা স্লাইডার আছে। ওটাকেও ঘুরিয়ে নিলে দৃশ্যপট পরিষ্কার হয়। ততক্ষণে বেশ কিছু ঘোলা ছবিই তুলেছি অবশ্য। ফেরার পরে আফসোস করেছি, কেন ঠু শুইকে ঝরণার এক্কেবারে কাছাকাছি রেখে একটা ছবি তুললাম না! তাহলে ঝরণাটার উচ্চতা আন্দাজ করা যেত। তবে, অভিজ্ঞতা থেকে দেখে মনে হয়েছে, খুব বেশি উঁচু না – তিন তলা সমান হবে।

পরিষ্কার আরো কিছু ছবি তুলে অবশেষে ফিরতি পথ ধরলাম। ফেরার পথে ছোট্ট ঝরণাটার একটা ছবি তুললাম। আবার ফিরে এসে আগের পথ ধরেই শুড় শুড় করে উঠে এলাম রাসেল বাবাজির কাছে। রিপোর্ট করলাম ঝরণা সম্পর্কে। ক্যামেরা-দুর্ঘটের কাহিনী শুনে হেসে একসা। ঝরণাটা প্রথম আবিষ্কার করছি, একটা নাম তো দেয়া দরকার: পাড়ার নামেই হোক নাম – কাইন্দং পাড়া ঝরণা

আমরা আবার ফিরে এলাম কাইন্দং পাড়ায়। উ সাই খয় আর তাঁর স্ত্রী আমাদের সাথে গল্পে বসলেন। আমরা বসলাম নাস্তা খেতে – পেঁপে আর বিস্কুট দিয়ে নাস্তা করতে অপূর্ব লাগছে। আমাদের গল্পে থাকলো তংক্ষিয়্যাং পুকুর। দেখা গেল ঠু শুইয়ের বলা তংক্ষিয়্যাং পুকুরের অনেক কাহিনীই অতিরঞ্জন বৈ কিছু নয়।

রুনাজন পাড়া থেকে একটা বিশেষ পানপাত্র নিয়ে এসেছিল রাসেল, টাকা দিয়ে কিনে। এই পানপাত্রগুলো এরা বানায় একটা পাহাড়ি লাউ-জাতীয় ফলের ভিতরকার ফাঁপা অংশ ফেলে দিয়ে। তারপর সেটা চুলার উপরের আগুনের তাপে শুকিয়ে নেয়। আমরা সমতলের মানুষের কাছে বিষয় হলো, এই ফল-জলাধারে রাখা পানিতে কড়া একটা গন্ধ হয়, গন্ধটাকে কেমন যেন মাদকীয় নেশা ধরানো বলে মনে হয়। মারমারা একে ডাকে ম্‌ডয়, ত্রিপুরারা বলে ত্‌লাও, ম্রোরা বলে তুইহ। গন্ধ বিশ্রী হলেও এই অ্যান্টিক সংগ্রহের লোভ সামলাতে পারেনি রাসেল। সেই আগ্রহ দেখে উ সাই খয় তাঁর সংগ্রহে থাকা পুরোন একটা ছোট আকারের দেখে বের করে দিলেন। আমি তষ্কর, রাসেল বাবাজিকে ওটা থেকে বঞ্চিত করে ওটাকে নিজের কব্জায় নিয়ে নিলাম। 🙂

আমাদের অভিযান শেষ। গতরাতে ঔলাওয়া পাড়ায় বসে বসে আমরা সময়ের হিসাব কষছিলাম কিভাবে এবারে সেমতে কাজ করতে হবে। সময় বড্ড কম – রাসেলের আজকেই অফিস করার কথা – কিন্তু এরই মধ্যে আমরা একদিন পিছনে চলছি শিডিউল থেকে – ইচ্ছে করেই রাসেলকে বিরত রেখে আমাদের পথপরিক্রমা সাজিয়েছিলাম। কিন্তু এবারে আর একবিন্দুও দেরি করা যাবে না – প্রতিটা পথবিন্দুতে সময়ের মধ্যে পৌঁছাতে হবে আমাদেরকে। সেমতেই র‍্যুট সাজিয়েছি আমরা – আমাদেরকে যত দ্রুত সম্ভব রওয়ানা করতে হবে কাইন্দং পাড়া থেকে। কাইন্দং পাড়ার অবস্থান থানচি সদর থেকে খুব কাছেই। ঘন্টাখানেক হাঁটলেই পৌঁছানো যাবে। ঠু শুই তিন আমাদের সাথে যাবে সদরে, তার কী যেন কাজ আছে। না, পরে শুনি, সে আমাদেরকে এগিয়ে দিতে যাবে। একজন গাইড পেয়ে ভালোই হলো – নুং চ এদিকটা অত ভালো চেনেন না।

আন্তরিকতার অন্ত নেই, রাতের খাবারের কিংবা রাতে থাকার কোনো অর্থ নিলেন না উ সাই খয়। উল্টো ছেলেকে দিয়ে সদরে পাঠাচ্ছেন আমাদের। তাদের চাওয়া একটাই, তাদের ছবিগুলো যেন আমরা তাদেরকে পাঠাই। ফোন নাম্বার দিলেন নিজের, থানচির কাছে হওয়ায় তাঁর এখানে নেটওয়ার্ক আছে। আমরা, ঘরের সামনের বাড়তি অংশে (মারমা ভাষায় তামিয়াং) দাঁড়িয়ে শেষ বিদায় নিলাম, জানলাম মারমা ভাষায় “ধন্যবাদ” বলতে গেলে বলতে হয়: কিজু টাডে। …কিজু টাডে! কিজু টাডে!!

এই আন্তরিকতা, এই হৃদ্যতা, এই মমতার কোনো বিনিময় হয় না। ‘মানুষ’ শব্দটা এখনও বাঙালির আতিথেয়তায় আছে (হোক না পাহাড়ি বাঙালি) – এটা ঢাকা শহরের অমানুষ আমাদের জন্য অনেক বড় এক শিক্ষা বটে। গতকালকে যেখানে গোসল করেছিলাম, সেদিক দিয়ে আমরা ধানী জমিতে নেমে গেলাম। ধান চাষ করা হচ্ছে, সমতলে – এই বিষয়টা নির্দেশ করে আমরা এখন জল-সমতলে আছি। তারমানে কি এই তংক্ষিয়্যাং পুকুরটা সমতলের আর-দশটা পুকুরের মতোই একটা পুকুর! হতে পারে, জানি না আমরা। জিপিএস রিডিং নেয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি।

মুরগির এই দৃষ্টিনন্দন খাঁচাটা দেখেছি থানচির খুব কাছাকাছি শাজাহান পাড়ায়। (ছবি: লেখক)
মুরগির এই দৃষ্টিনন্দন খাঁচাটা দেখেছি থানচির খুব কাছাকাছি শাজাহান পাড়ায়। (ছবি: লেখক)

এবারে রাসেলের ক্যামেরা আমার হাতে। ও ব্যাটা হাঁটতে হাঁটতে ক্লিক করতে পারে না। তাকিয়ে দেখি একটা বিশালাকায় কালো শুকরকে চার পায়ে বেঁধে একটা বাঁশের খুঁটিতে ঝুলিয়ে দুজন লোক কাঁধে তুলে নিয়ে যাচ্ছে। ঠু শুই জানালো – এটাকে জবাই করা হবে খাওয়ার জন্য। শুকরের মাংস খাওয়া কোরআনের অনুসারী আমার জন্য নিষিদ্ধ হতে পারে, বৌদ্ধ ধর্ম কিংবা লৌকিক বৌদ্ধ ধর্মানুসারী এদের জন্য না। শুকর-যাত্রাকে পেছনে রেখে আমরা এগোলাম। পথটা এঁকেবেঁকে একটা পুকুরের পাড় ধরে গিয়ে উঠলো পাহাড়ে। দেখেই রাসেলের মেজাজ খারাপ হয়ে গেলো – পাহাড় কেন আসে ওর পথের মধ্যে? এই পথটা এভাবেই পাহাড়ে ওঠা, আবার একটু নামা, আবার একটু ওঠা, আবার একটু নামা – চলতে থাকলো। হাসতে হাসতে, গল্প করতে করতে, একটা পাড়া (সম্ভবত নামটা ছিল শাজাহান পাড়া) পার করে আমরা দূর থেকেই দেখতে পেলাম শঙ্খ’র ধার ঘেষা থানচি উপজেলা সদর। দূর থেকে অপূর্ব লাগছে শঙ্খকে, পাহাড়ের গায়ে আছাড় খেতে খেতে কী সাবলীল তার চলার গতি!

…গল্পের শুরুটা যেখানে হয়েছিল, সেখানেই শেষ হলে মজাটা দারুণ হয় – বিষয়টা যেন বিধাতা এভাবেই গুছিয়ে রেখেছিলেন আমাদের জন্য। ঠিক যে পথটা দিয়ে আমরা থানচি থেকে শঙ্খতে নেমে পথ চলেছিলাম নাফা খুমের দিকে, সেই পথেই এসে উঠলাম আমরা আবারো। মজাই লাগলো ঈশ্বরের এই খেলা দেখে। এখানে নির্মাণাধীন একটা ব্রিজে শ্রমিকরা বাঙালি চেহারার আমাদেরকে দেখে কথা বললো। এবং তিনদিন পর আজ আবার আমরা লোকালয়ে ফিরলাম বলতে গেলে – জানলাম কী দুর্ভোগ অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য:

হরতাল হয়েছে এর মধ্যে। ঢাকায় মারা গেছে কয়েকজন। বাসের র‍্যুটও অনিশ্চিত। বান্দরবানের শেষ গাড়ি চারটায় হলেও ওটা বোধহয় আজকে যাবে না, তারমানে এর আগের যে বাসটা, সেটা সাড়ে বারোটায়। দৌঁড়ে গিয়ে ওটাই ধরতে হবে। হাতে আছে মাত্র পয়তাল্লিশ মিনিট। যে করেই হোক, আজ রাতের মধ্যে ঢাকার পথ ধরতে হবে। সুতরাং… পা চালাও!

খুব দ্রুত চলতে শুরু করলাম আমরা। সময় নষ্ট করার সময় নেই একটুও। থানচি বাজারে ঢুকেই রাসেলকে নির্দেশ দিলাম, তুই দ্রুত নুং চ-কে নিয়ে খাবারের ব্যবস্থা কর, আমি ঠু শুইকে নিয়ে বাসের টিকেট করতে গেলাম। রাসেল কেন যেন খুব বেশি প্রত্যাশা করছে ঐ ব্যাটা পেইন ম্রো অরফে খইশামু মারমাকে – সে নাকি আমাদেরকে মারার জন্য দলবল নিয়ে রেডি থাকবে। কিন্তু কোথাও দেখা গেলো না পেইন ম্রো-কে। আমরা দ্রুত পার হলাম থানচির পাকা ব্রিজ। তারপর ওপারেই দাঁড়ানো বাস। বাসের টিকেট করলাম (জনপ্রতি ৳২০০)। আর আধা ঘন্টা আছে হাতে। দ্রুত খাবার শেষ করে ফিরতে হবে।

শেষবারের মতো সাঙ্গুকে দেখা (ছবি: লেখক)
শেষবারের মতো সাঙ্গুকে দেখা (ছবি: লেখক)

আবার অনেকটা পথ পাড়ি দিয়ে বাজারে এসে নুং চ’র বাছাই করা একটা দোকানে খেতে বসলাম। মাছ আর আলুর তরকারি দিয়ে জুমের ভাত – অপূর্ব লাগলো ক্ষিধের ঠ্যালায়। দ্রুত খাওয়া শেষ করলাম, নুং চ আর ঠু শুই তিনও আমাদের সাথে খেলেন (৳৩১০)। খাওয়া শেষে নুং চ’র গাইড-খরচ বাবদ তিন দিনে দিনে ৳১৫০০ দিলাম। আর, বেঁচে যাওয়া রেশনটুকু তাকেই দিয়ে দিলাম। আর নৌকা ভাড়া করে তিন্দু যাবার খরচটুকুও (৳২০০) দিয়ে গলায় গলা মেলালাম। রাসেলের পরামর্শে ঠু শুই-কেও টাকা দিলাম ৳১০০ হাত খরচের জন্য। এরপর বিদায় নিলাম এঁদের থেকে। আমরা যে ব্যাগের ভিতর থেকে খুঁজে খুঁজে টাকা বের করছি, তা দেখে নুং চ ভাবলেন, আমরা বোধহয় কথা রক্ষার্থে খুব কষ্ট করে হলেও টাকাটা দিচ্ছি তাঁকে। তিনি জানতে চাইলেন, “দা-দা, কষ্ট পাইছেন?” তাকে নানাভাবে বোঝালাম, নাগো দাদা, কষ্ট পাইনি। আমাদের কাছে টাকা আছে। এটা আপনার পাওনা। তিনি বুঝলেন কিনা বোঝা গেল না। শেষ পর্যন্ত ঠু শুইকে বিদায় দিলাম। কিন্তু নুং চ আমাদেরকে বাস পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে যাবেন।

বাসে উঠে যখন আমাদের নির্ধারিত সীটে বসলাম, তখন দুপুরের কড়া রোদ মাথার উপর। শেষমেষ আবারো গলায় জড়াজড়ি করে নুং চ-কে বিদায় দিলাম। খুবই ভালো মানুষ, বিশেষ করে যখন থং প্রি মুং-এর সাথে তাঁকে তুলনা করা হচ্ছে তখন। একজন মাটির মানুষকে শ্রেফ কিছু টাকা-পয়সার সম্পর্কে জড়িয়ে ফিরে যাচ্ছি – বিষয়টা মোটেই শুভকর না। কিন্তু সত্যি বলছি, মনের মধ্যে স্থান করে নিয়েছেন তিনি ইতোমধ্যেই। বিদায় নুং চ মং, বিদায়!

এই পাহাড়ের কোলে, শহুরে সময়নিষ্টতা থেকে অনেক অনেক দূরে, নির্জনে যে সময়কে এভাবে মেনে চলা হবে, ভাবিনি: কাটায় কাটায় সাড়ে বারোটায় বাস ছাড়লো থানচি থেকে বান্দরবানের উদ্দেশ্যে। আমাদের সীট পড়েছে বামদিকে, একটা সীট থেকে সামনেরটা এতো বেশি কাছে যে, আপনি বসার পর সামনের লোকটার মাথার গন্ধও যেনবা টের পাবেন। দুই সারি সিটের মাঝখানের করিডরটাও এতো ছোট্ট যে, ব্যাগগুলো কোলের উপর রেখে বসা ছাড়া কোনো উপায় নেই, অথচ সীটগুলো এতোটাই কাছাকাছি যে, কোলের উপরও পর্যাপ্ত জায়গা নেই। এরই মধ্যে আপনারা জানেন যে, রাতে যেমন প্রচণ্ড শীত পড়ে, দিনে ঠিক ততটাই গরম থাকে রোদ। তারউপর মরার উপর খাড়ার ঘা হয়ে সূর্যি মামা আমাদের দুজনকে দেখার জন্য বামদিক থেকে উঁকি-ঝুকি মারছেই। কোনোভাবেই তাকে ধুর ধুর করে তাড়ানো গেলো না। সারাটা পথ সে আমাদেরকে খুব মনোযোগ দিয়ে দেখলো।

বলিপাড়ায় গিয়ে আধা ঘন্টার বিরতি অসহ্য লাগলো, তবে চিম্বুকে গিয়ে আধা ঘন্টার বিরতিটা উপভোগ্য ছিল। মসজিদে যোহরের নামাযটাও পড়ে নেয়ায় বেশ চাঙা লাগছিলো। মোবাইলটা অন করে দেখি এখানে নেটওয়ার্ক আছে বাংলালিংকের। সাথে সাথে একটা ম্যাসেজ ঢুকলো – শান্ত পাঠিয়েছে: ড্যানিয়েলের মোবাইল হারিয়েছে, ওটা কেউ একজন পেয়ে চেয়ারম্যানের দোকানে রেখেছে, আমরা যেন ওটা সংগ্রহ করি। …কিছুই করার নেই এখন, ওখানে আমার মোবাইলে নেটওয়ার্কই ছিল না। রাসেল ফোন করলো তার অফিসে, আমাকে আশ্বস্থ করলো সত্য কথা বলে: অমুক ভাই, আমি এমন এক জায়গায় গিয়েছিলাম, ফোনের কোনো নেটওয়ার্কও ছিল না, কালকে অফিস করবো। ওপাশ থেকে নানাভাবে তাকে দোষারোপ করা হচ্ছে, কিন্তু সে তার অপারগতা প্রকাশে বিন্দুমাত্র কুন্ঠিত হচ্ছে না। অবশেষে সমাধান হয়েছে দেখে ভালো লাগলো। যাক, ট্যুরটা ভালোয় ভালোয় শেষ হয়েছে। এখন বান্দরবান ফিরে গিয়ে ঢাকার বাস পেলেই সব ঝামেলা মিটবে।

সূর্যি মামার উঁকিঝুকিসত্ত্বেয় মাঝেমাঝেই প্রচণ্ড ক্লান্তিতে ঘুমে তলিয়ে যাচ্ছি আমরা। টানা আড়াই ঘন্টা বাস যাত্রার পর অবশেষে আমরা বান্দরবানে ঢুকছি। নিজেদেরকে সজাগ করে প্রস্তুতি নিলাম। বাস থামলেই দ্রুত ঢাকার টিকেট করতে যেতে হবে। বাস ঢুকলো বান্দরবান বাসস্ট্যান্ডে। রাসেল উঠে দাঁড়িয়েছে, আমিও ব্যাগ নিয়ে উঠে দাঁড়াচ্ছি, হঠাৎই রাসেল চিৎকার করে উঠলো:

আরে প্রভা!

প্রথমে নিজের কানকে বিশ্বাসই করতে পারলাম না, পরে তাকিয়ে দেখি, পেছন থেকে ফিরে আসা আমাদের তৃতীয় অভিযাত্রী: নাদুশনুদুশ ফিলোসফার তানভির মোকাম্মেল প্রভা, অরফে হাঁস প্রভা ঠিকই দাঁড়িয়ে আছে বাসস্ট্যান্ডে। নিজের চোখকেও বিশ্বাস করাতে পারছি না – এই ব্যাটা এই দুই দিন পরও এখানে কেন?

(আগামী পর্বে সমাপ্য…)

-মঈনুল ইসলাম

wz.islam@gmail.com

শেষ পর্ব »

মন্তব্য করুন