পাহাড়ে-জঙ্গলে যাবার আগে

পাহাড়ে-জঙ্গলে ট্রেক (Trek) করা, মানে পাহাড়-জঙ্গলের বন্ধুর পথে কসরত করে চলার জন্য চাই কিছু প্রস্তুতি, বিশেষ করে আমরা সমতলের মানুষরা যখন সেখানে যাই, তখন সেই প্রস্তুতিটা না থাকলে বেশ খানিকটা কষ্টের মধ্যে পড়তে হয়। আর ভ্রমণের প্রস্তুতি হতে হয় ভ্রমণের আগে।

বন্ধুরা সবাই যাবে বগাকাইন হ্রদ ঘুরতে, তো তাদেরকে কিছু পরামর্শ দিতে গিয়ে তথ্যগুলো গোছানো হলো। ভাবলাম, সবার সাথেই শেয়ার করি, কাজে লাগবে:

প্রস্তুতি এবং করণীয়

যাবার আগে:

  • যাবার দু-একদিন আগে থেকে প্রচুর সিঁড়ি উঠা-নামার প্র্যাকটিস করলে ট্যুরে কোনো কষ্টই হবে না।
  • নখ কেটে যেতে হবে।
  • দুহাত ফ্রি থাকে এরকম পিঠ-ব্যাগ সবচেয়ে স্বচ্ছন্দ্যের, ব্যাক-প্যাক (knapsack) কিনে নেয়া সবচেয়ে ভালো। ব্যাগে যত বেশি ফিতা, তত বেশি ব্যাগের ওজন ভাগ হয়ে যাবে, ওজন কম মনে হবে।
  • কাপড়-চোপড় যথাসম্ভব কমিয়ে নিতে হবে। “পাহাড়ে উঠতে [খুব জরুরি হওয়াসত্ত্বেয়] একটা পানির বোতলকেও অবাঞ্চিত ওজন মনে হয়।” -বন্ধু নাজমুস সাকিব
  • পায়ে পরার জন্য নী-ক্যাপ এবং অ্যাংকলেট খুব উপকারের। পাহাড়ে চড়ার কষ্ট অর্ধেক করে দিবে। মাত্র ৳৭০-৳৮০ (২০১৩)।
  • মশা নিরোধক “ওডোমোস” সাথে রাখা ভালো এবং ব্যবহার করা শ্রেয়। পাহাড়ে সেরেব্রাল ম্যালেরিয়ার প্রকোপ বেশি, বিশেষ করে বর্ষাকালে। তাছাড়া ম্যালেরিয়া প্রতিরোধক Malarone, Doxycycline-জাতীয় ওষুধ খেয়ে নেয়া উত্তম। (ওডোমোসের পাশাপাশি পাহাড়ের প্রাকৃতিক নিদান ব্যবহার তো করাই যায়)
  • ভালো গ্রিপওয়ালা, স্লিংব্যাক জুতা খুব কাজে দিবে। পেছন খোলা জুতা না হলে খুব ভালো হয়; পাহাড়ে উঠতে বারবার ঝামেলা করবে।
  • স্টাইলিশ না হলেও গামছা খুব কাজের জিনিস। বাংলাদেশের এই একটা উপাদান আসলেই ট্রেকারদের ব্র্যান্ড। ট্রেকে বেরোবার আগে একাধিক প্রস্থ গামছা থাকতে পারে।
  • প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র, ফার্স্টএইড এবং গ্লুকোজ নেয়া জরুরি।
  • চিবানোর জন্য চকলেট (উচ্চ চিনি প্রদায়ক), খেজুর (কার্বোহাইড্রেট, ক্যালরি ও চিনি প্রদায়ক), ম্যাংগো বার (মুখকে রসালো রাখতে) নেয়া যেতে পারে; কিন্তু চ্যুইংগাম নয়, কারণ তা গলা শুকিয়ে দেয়।
  • পেইন কিলার নেয়া জরুরি। কাজে লাগে। 🙂 শরীরটা চাঙা করে দেয়।

যাবার প্রাক্কালে:

  • প্রতি পদক্ষেপে পরের পদক্ষেপের হিসাব করতে হবে, এবং খরচের আনুপাতিক হিসাব কষতে হবে।
  • টাকা আছে, টাকা কোনো ব্যাপ্পার না, খরচ কর, দিয়ে দে, আরে দে না -এরকম নীতিতে দয়া করে ট্যুর দিবেন না। এতে ট্রেকারদের পরিবেশ নষ্ট হয় এবং পাহাড়ে অর্থের লোভী সংস্কৃতি দিনে দিনে চাঙা হয়। ইতোমধ্যেই সেই বীজ অনেকে বুনে দিয়ে গেছে, যার খেসারত এখনকার ট্রেকারদের বহন করতে হচ্ছে।
  • বান্দরবানের স্বর্গে এখন অর্থ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। বাঙালিরা তাদের লোভ শিখিয়ে দিয়েছে পাহাড়িদের। তাই যেকোনো ক্ষেত্রেই আগে খরচ কেমন হবে সেটা ঠিক করে নেয়া দরকার। নাহলে বিপদে পড়তে হতে পারে।

যাবার পরে:

  • পাহাড়, প্রকৃতি, সেখানকার অধিবাসীদের এবং তাঁদের সাংস্কৃতিক পার্থক্যকে শ্রদ্ধা করতে হবে। আমি যা দেখে এলাম, তা সুন্দর করে না রাখলে আমার সন্তান সেই সৌন্দর্য্যটুকু দেখতে পারবে না।
  • পৃথিবীতে যেমন জোব্বা পরে, বোরখা পরে জীবন পালনকারী মানুষ আছেন, তেমনি খুব কম বস্ত্র পরে জীবন লালনকারী সমাজ-সংস্কৃতি আছে এই পৃথিবীতে, বাংলাদেশে। তাই নিজের সংস্কৃতি দিয়ে সারা পৃথিবীটাকে বিচার করা চলবে না। নিজের সংস্কৃতির সাথে মিলে না এমন সংস্কৃতির সামনে পড়লে যেমন হাসাহাসি করা যাবে না, ক্যামেরা তাক করে বিব্রত করা যাবে না, তেমনি অশ্রদ্ধাসূচক কোনো উচ্চারণও করা যাবে না।
  • কোনো প্রকারের ময়লা যেখানে-সেখানে ফেলা যাবে না, একটা চকলেট কিংবা চিপ্‌সের খোসাও না। সব ব্যাগে ভরে ঢাকায় নিয়ে আসতে হবে। বগা লেকেও আবর্জনা ফেলে যা-তা অবস্থা করে রেখেছে সবাই, ও-কাজে ভুলেও যাবো না।
  • বগা লেকের পানিতে প্রচুর শ্যাওলা হয় শীতে। তাই গোসল করে পরিষ্কার হবার বদলে নোংরা হবারই সম্ভাবনা থাকবে। তবুও দ্রুততার সাথে গোসল করাই যায়।
  • তবে, বগা হ্রদের পানির গুণাগুণ রক্ষণে সাবান ব্যবহার না করার অনুরোধ থাকলো।
  • পাহাড়ে, জঙ্গলে “নীরবতা” হলো পাহাড় এবং জঙ্গলকে দেখার সবচেয়ে শ্রেয় উপায়। কানে একটা ওয়াকম্যান লাগালে আসলে ঢাকায় বসেই তা করা যায়। কানটা খোলা রাখি, নাক দিয়ে বুক ভরে শ্বাস নেই। আমার মনে হয় ভবিষ্যত আমাদেরকে এজন্য ধন্যবাদ দিবে।
  • ট্যুরে, ট্রেক-এ যেকোনো ট্র্যাকেই “টীম” হলো সবকিছু। লীডার বা দলনেতাকে মেনে চলতে হবে এবং চোখ-কান খোলা রাখতে হবে।
  • প্রচুর পানি খেতে হবে। নাহলে মাসল ক্র্যাম্প করতে পারে, মানে মাংস পেশী আড়ষ্ট হয়ে যেতে পারে। পাহাড়ে ওঠার সময় পানি মনে করে নিয়ে যেতে হবে। কারণ সেখানে পানি পাওয়া যাবে না। অবশ্য কিওক্রাডাং-এ সমস্যা হবে না, দার্জিলিং পাড়া, পাসিং পাড়া আছে। তবুও নিজের ব্যবস্থা নিজে করতে হবে।
  • ট্রেকিং-এ আন্ডারওয়্যার পরা যাবে না, এতে উরুতে ঘষা লেগে ক্ষতের সৃষ্টি হবে।
  • আবহাওয়া অনুযায়ী পোষাক নিতে ভুল করা যাবে না: শীতকাল হলে প্রচন্ড শীতের প্রস্তুতি থাকা বাঞ্চনীয়।
  • সম্মিলিত কোনো বোঝা থাকবে না, সবার নিজের বোঝাই নিজে বহন করবে। দলের প্রয়োজনীয় যা যা লাগবে, তা সবাই নিজের বোঝায় ভাগ করে নিবে।
  • তাবলিগের শিক্ষা: কেউ কারো কাছে সহায়তা প্রার্থণা নয়, নিজের কাজ নিজেকে করতে হবে, পড়ে গেলে নিজেকে নিজে টেনে তুলতে হবে। পাহাড়ে এর পূর্ণ সমীকরণ মেলাতে হবে।

 

সবশেষে…

ভ্রমণে বেরোলে আজই বেরিয়ে পড়ুন। কাল বেরোলেও চলবে। পরশু আবার বেশি দেরি হয়ে যাবে। কারণ প্রতি দিনই খরচ বাড়ছে। আর আপনার আগে কেউ একজন আরেকটা ট্র্যাক আবিষ্কার করে ফেলছে।

 

এছাড়াও দেখা যেতে পারে নিচের লিংকগুলো:

 

-মঈনুল ইসলাম

One thought on “পাহাড়ে-জঙ্গলে যাবার আগে

মন্তব্য করুন