যোগী হাফং – একটি ব্যর্থ অভিযান – ৩

যোগী হাফং সামিট করবার অভিপ্রায়ে বেরিয়ে পড়া ৬ জনের দল থেকে একজন একটা পাহাড় চড়েই বিদায় নিলো। দ্বিতীয় জন যোগী হাফং আরোহণ করবার সময় হাল ছেড়ে দিয়ে বসে পড়েছে — সে আর যাবেই না। পুরো দল হল্ট হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলো স্থানুর মতো। কোরেশী – আমাদের পুরো দলের মধ্যে ভিলেনরূপে আবির্ভূত হলো। কিন্তু দলের সবার প্রেষণায় সেই ভিলেন কী মনে করে নায়ক হবার মতো কিছু একটা নিজের মনের গহীন কোণে থাকা ট্রেকার সত্তার কাছে ধার পেল, এবং তেতে উঠলো। সে ঐ খাড়া দেয়ালটা অনায়াসে উঠে এলো – বাঘের বাচ্চা!

বাঘের এই বাচ্চা যখন দলের সাথে আবার একাত্মতা ঘোষণা করলো, তখন আমার অবস্থা ক্রমশ খারাপ হতে চলেছে। আমার ডান পা এখন আর বাঁকা করতেই পারছি না, মনে হচ্ছে হাঁটুর জোড়ায় একটা হাঁড় ভেঙে গেছে, আর সেই ভাঙা হাড়টা একটা আরেকটার মধ্যে ঢুকে লক করে দিয়েছে পুরো পা-টা। বাঁকা করতে গেলেই এতো তীব্র ব্যাথা হচ্ছে যে, সেটা সহ্যই করতে পারছি না। তাই ডান পা আর বাঁকা করছিই না গত প্রায় দশ/পনেরো মিনিট থেকে।

তো, কিভাবে উঠছি?

বাম পা বাঁকা হচ্ছে, সেই পা উপরের ধাপে ফেলছি, তারপর শরীরের পুরো ভার ঐ পা দিয়ে টেনে তুলে নিচ্ছি উপরের ধাপে, ডান পা সটান সোজা রেখে প্যারালাইয্‌ড রোগীর মতো টেনে টেনে তুলছি। এভাবেই উঠে চলেছি। স্বাভাবিকভাবেই এভাবে উঠার গতি স্মূদ হবার কথা না। মোহনকে আর দেখতে পাচ্ছি না। ইতি আপু সাথে ছিলেন, কিন্তু আমার পূর্ব অভিজ্ঞতা বলে, পাহাড় চড়বার সময় ধীরে চলা কারো পিছনে থাকলে আপনি আরো দ্রুত হাঁপিয়ে উঠবেন — আপনি স্বচ্ছন্দে পাহাড়ে চড়তে পারবেন যখন আপনি আপনার মতো পাহাড়ে চড়বেন। ইতি আপু আমার সাথে চলতে থাকলে একসময় উনাকেও পাহাড় পেয়ে বসবে। তাঁকে অনেকক্ষণ কাছাকাছি দেখতে পাচ্ছিলাম।

এক পর্যায়ে আমরা বাঁশবনে ঢুকলাম। বাঁশবনে কচি কচি বাঁশ বেশ ঘন হয়ে জন্মেছে। সব যোগী অভিযাত্রীর কাছেই বাঁশবনের খুব দুর্নাম শুনেছি। বাঁশবন আমার কাছে যদিও ধাঁধাময় মনে হয়েছে, কিন্তু কেন জানি না সেরকম বিশ্রী লাগেনি। ‘বিশ্রী’ মানে দেখার শ্রীহীন না, বরং ট্রেক করার পথে জঘন্য বাধা অর্থে ‘বিশ্রী’ — আমার কাছে মনে হয়নি। অবশ্য এর একটা কারণ থাকতে পারে: আমার পায়ের জঘন্য ব্যাথা সম্বল করে চলার সময় জগতের বাকি সবই এরচেয়ে ভালো মনে হওয়াটা স্বাভাবিক — আইনস্টাইনের থিওরি অফ রিলেটিভিটি

পথটা খাড়া, কোথাও ধরার মতো হাতের কাছে কিছু পাওয়াও যায় না। নিজের জান হাতে নিয়ে উঠা — কোনো কারণে কোনো একটা পদক্ষেপ মিস হলে খাড়া এই পাহাড়ে অনেক নিচে গিয়ে পড়তে হবে — সেই “অনেক নিচে”, যদি অজায়গা হয়, তাহলে সোজা পাহাড় থেকে নিচে পড়ার সামিল হবে — পাথুরে এই পাহাড়ে এই পতন শ্রেফ মৃত্যু ছাড়া আর কোনো উপহারই দিবে না। এর মধ্যে এক পা দিয়ে উঠাটা রীতিমতো কষ্টকর। তাছাড়া শুধু বাম পায়ের উপর পুরো শরীরের ভর ছেড়ে দেয়াটা এই পাঁচ ঘন্টা আপ আর পাঁচ ঘন্টা ডাউন পথে কতটা উপভোগ্য সে আর নাহয় না-ই বললাম। আমি ট্রেকে কক্ষণও ট্রেকিং পোল (ট্রেকে সহায়ক লাঠিবিশেষ) জিনিসটা ব্যবহারের যৌক্তিকতা খুঁজে পাইনি। আমার কাছে মনে হতো ট্রেকিং পোল একটা বোঝা ছাড়া আর কোনো উপযোগই যোগ করে না আমার ক্ষেত্রে। কিন্তু দেখা গেল সেই আমিই বাঁশবন বা কোথা থেকে যেন একটা বাঁশ কুড়িয়ে নিয়ে তাতে ভর দিয়ে নিজের পায়ের জখমকে খানিকটা হলেও স্বস্থি দেয়ার চেষ্টা করছি। বাম পা উপরের ধাপে তুলে বাঁশ ধরে ঠ্যালা দিয়ে ডান পা টেনে তুলছি — ল্যাংড়া ট্রেকিং বলে যদি কিছু থাকে, তবে এটা সেটা।

এই কথাগুলোই আরেকজন বললে সেটাকে “অভিযোগ” হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু নিজের দোষ নিজে বলে যাচ্ছি বলে হয়তো আপনাদের দয়া হচ্ছে। আমি বলবো, আপনারা এটাকে আবেগ দিয়ে নয়, অভিযোগ হিসেবেই গ্রহণ করুন। কারণ, সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে আমি দলকে দেরি করিয়ে দিচ্ছি। যদিও অতি সহনশীল এই দল আমাকে একটিবারের জন্য গালি দেয়নি, তীরষ্কার করেনি, ত্যাগ করেনি, বরং ধীরে ধীরে পা টেনে টেনে উঠতে থাকলেও তাঁরা আমাকে সঙ্গ দিয়েছেন। ব্যাপারটা তাঁদের কাছে কেমন লেগেছে আমি জানি না, কিন্তু আমার কাছে নিজের পাপে অন্যকে পোড়াতে ভালো লাগেনি।

ঘড়িতে ১৫:০০ প্রায়

যোগী উঠার পথে ডানদিকে জ-ত্লং
যোগী উঠার পথে ডানদিকে জ-ত্লং

কোরেশী হাল ছেড়ে দিলেও এখন সে নায়কের মতো হেঁটে চলেছে — অবশ্য হেঁটে চলেছে কথাটা এখন আর উপযুক্ত না, কারণ সেই খাড়া দেয়ালটা উঠার পর থেকে পাহাড়টা ক্রমশ খাড়াই উঠে গেছে। সেই খাড়া বেয়ে উঠতে কোরেশীরও কষ্ট হচ্ছে, কিন্তু সে দমে নেই, উঠেই চলেছে – দেখেই ছাড়বে যোগীর চূড়া, পায়ের নিচে ফেলবেই ওর মাথাটা। …একটা পর্যায়ে আমরা পাহাড়টার ডানদিকে মোটামুটি একটা ক্লিয়ারিং পেয়ে গেলাম। এদিক দিয়ে আমরা জো-ত্লং (বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পাহাড়)-এর চূড়া দেখতে পাচ্ছিলাম। কিন্তু যোগীর গায়ে গজানো গাছের কারণে জ-ত্লং-এর সামনে আয়ান ক্ল্যাং চূড়ার পিরামিড আকৃতির রিজটা (ridge: চূড়ার খাড়া ঢাল – শির কিংবা শিরা) দেখা যাচ্ছিলো না। কিন্তু যোগী থেকে যারা আয়ান ক্ল্যাং আর জ-ত্লং-এর ছবি দেন, সেগুলোতে এতো গাছ থাকে না, তারমানে সেই ছবি পেতে হলে আরো বেয়ারিং (উন্মুক্ত দৃশ্যপট) দরকার, আরো উপরে উঠতে হবে। মজার ব্যাপার হলো, এতক্ষণ জঙ্গলের মধ্যে, গাছের ক্যানোপি’র আড়ালে থেকে উন্মুক্ত আকাশের নিচে সূর্যালোকে আশপাশটা দেখতে পারার মধ্যে যে একপ্রকারের ‘মুক্তি’ ‘মুক্তি’ ব্যাপার আছে, সেটা এই প্রথম বুঝতে পারলাম। বাকিদের এতো সাহিত্যিক অনুভূতি হয়েছিল কিনা কে জানে।

আমরা এবারে পানি পান করছি, খেজুর খাচ্ছি — বোঝাই যাচ্ছে, এতক্ষণে আমাদের প্রকৃত পাহাড় আরোহণ শুরু হয়েছে। দুয়েকবার ডান পা বাঁকানোর চেষ্টা করলাম, কিন্তু যেই সোজা করতে যাই আবার, তখন এত তীব্র ব্যাথা হয়, মনে হয় হাড়ে হাড়ে লাগা প্যাঁচ পরস্পর ঘষে ঘষে ছাড়িয়ে সোজা হতে চাচ্ছে। …মোহন অনেকটা সামনে এখন। ইতি আপুও এগিয়ে গেছেন। যে কোরেশী আটকে গিয়েছিল একটা সময়, সেই কোরেশীও আমাকে ছাড়িয়ে চলে গেছে আরো সামনে। আবু বকর আছেন কাছাকাছি। এমন সময় একটা কাজ করলাম যা আমি কক্ষণও করতে শিখিনি, করিও না — লজ্জা-শরমের মাথা খেয়ে আবু বকরকে একটা অনুরোধ করেই বসলাম, “বকর, কাছাকাছি থাইকেন। আপনারা চোখের আড়াল হলেই আমি আরো পিছিয়ে পড়তে থাকি।”

আবু বকর সহমর্মীতা দেখালেন, “হুম বুঝতে পারতেছি। আমি জানি।” কাছাকাছিই থাকার চেষ্টা করছেন আবু বকর। কিন্তু এভাবে কতক্ষণ?

ঘড়িতে ১৬:০০ প্রায়

যোগী হাফং-এর পথে সিদ্ধান্তের দোলাচলে আমি (ছবি: ইতি আপু)
যোগী হাফং-এর পথে সিদ্ধান্তের দোলাচলে আমি (ছবি: ইতি আপু)

আমি এখন দলের সবচেয়ে পিছনে, যেখানে একটা সময় কোরেশী ছিল। গাইড ডান বুয়াই আমার পিছনে। লাঠিতে ভর দিয়ে, বাম পায়ে ভর দিয়ে বন্ধুর পথ মাড়িয়ে চলেছি। এই সাড়ে পাঁচ ঘন্টা ট্রেইল রান করে আমরা এখন যে যোগীর চূড়ার খুব কাছাকাছি – সেটা জানতে গণক হওয়া লাগে না। কিন্তু বিপদগ্রস্থ পরিস্থিতিতে মানুষ কতটা বিপর্যস্থ হতে পারে, সেটা আমি সেনাবাহিনীদের ট্রেনিং দেখে দেখে আর বিভিন্ন বিপদগ্রস্থতার সত্যঘটনা দেখে, পড়ে বুঝতে শিখেছি: বিপদে পড়বার আগে বিপদ থেকে বেরোও — ওয়াইল্ডারনেসের কাছে বিপদের পরীক্ষা দিয়ো না — ওয়াইল্ডারনেস তোমায় হারিয়ে দিবে। তক্ষুণি সিদ্ধান্তটা নিলাম — সেই সিদ্ধান্ত, যা আমি শিখেছি প্রভার কাছে

গলা বাড়িয়ে আবু বকরকে ডাক দিলাম, ওরা সবাই তখন একটা সরু পথ বেয়ে অনেকটা এগিয়ে গেছে ঘন গাছ, বাঁশের ভিতরে। ডেকে চিৎকার করে বললাম, “আবু বকর, আমি ফিরে যাচ্ছি।”

কেউ খুশি হয়েছিল কিনা জানি না, আমি কারোও চেহারা দেখতে পাইনি; কিন্তু কেউই আমার ফিরে যাওয়াটা সমর্থন করছে না। আবু বকর মানা করছেন। মোহন মানা করছেন। কিন্তু আমি জানি আমাকে কেন ফিরতে হবে: “একটা পা গেছে। যে একটা পা আমার এখনও ভালো আছে, সেটা খোয়ালে আমি বিপদে পড়ে যাবো।”

কথাটার মধ্যে আবু বকর যুক্তি খুঁজে পেলেও আবারও সাহস দিলেন, “আরে, উঠেন, কিচ্ছু হবে না।”

মোহন আবেগের বশে বলছে, “আরে, পা গেলে আমরা কোলে কইরা নামামু।”

আবেগ কি আমার নেই? আমার কি পাহাড় চড়ার সাধ নেই? এজীবনে আমি কী করেছি?

আমি আজ পর্যন্ত কোনো শীর্ষ পাহাড়-চূড়ায় উঠিনি — এজন্যই আমি কেউ না এই জগত পারাবার। এই পৃথিবী থেকে আবু বকর চলে গেলে আমি আমার শিক্ষক হারাবো, ভ্রমণপিয়াসীরা একজন সংগঠককে হারাবে। ইতি আপু চলে গেলে বাংলাদেশ একজন ক্রিড়াবিদ হারাবে। কিন্তু আমি মরে গেলে আমার লেখা পড়ে পাহাড়ে যাবার জন্য হা-হুতাশ করা এতো এতো পাঠকের কেউই আমার জানাযায়ও শরীক হবে না। ফেসবুকে হয়তো RIP লিখেই ভাবের উত্তম প্রকাশ ঘটবে তাদের। মাঝে মাঝে আমার কাছে যুদ্ধাপরাধীদেরকে অনেক শক্তিমান মনে হয়, যখন তাদের জানাযায় লাখো লাখো মানুষকে জড়ো হতে দেখি।

পাহাড় আবেগের স্থান নয়, পাহাড় কঠিন বাস্তব। যোগীর কঠিন পাথুরে তটে দাঁড়িয়ে কঠিন সিদ্ধান্তটা তাই নিতেই হলো। উপরে ঈশ্বর আর নিচে এই একটা পায়ের উপর ভর করে এখন ফেরার পথ ধরতে হবে। কঠিন যে পথ দুই পায়ে মাড়িয়ে এসেছি দিনের আলোয়, এখন সেই একই কঠিন পথে নামতে হবে এক পায়ে, রাতের ঘুটঘুটে অন্ধকারে।

ফিরতে যাবো এমন সময় মনে পড়লো, আমার ব্যাগে আবু বকরের হেডল্যাম্প। জোরে চিৎকার করে কথাটা আবু বকরকে জানালাম। কিন্তু আবু বকর জানালেন “লাগবে না”। ভুল সিদ্ধান্ত। আমি আবারও বললাম; আবু বকর আবারও জানালেন, “লাগবে না”। ব্যাগের খেজুর দিতে চাইলাম, তাও রাখলেন না তাঁরা। খুবই ভুল সিদ্ধান্ত। ডান বুয়াইকে বললেই আরেকটু এগিয়ে গিয়ে জিনিসগুলো পৌঁছে দিতে পারতেন ওঁদের কাছে। অগত্যা ওখান থেকেই ওঁদের সবাইকে, “আল্লাহ হাফেয” (আল্লাহ নিরাপত্তাপ্রদায়ক) বলে ফিরতি পথ ধরলাম।

সঞ্জীবও ফিরে গেছে — ওর কী হয়েছে, তাও জানি না। আগের দলটা কোথায় গেল? ওরাও নিশ্চয়ই এখনও সামিট করেনি। হয়তো আবু বকররা ওদেরকে উপরেই পাবে। ফেরার পথে মোহনের কথাটা মনে পড়লো; মোহন বলেছিল: পাহাড় চড়তে পা লাগে না, মনের জোর লাগে। কথাটা এখন অলীক মনে হচ্ছে। কোরেশীর কথাটাই ঠিক: পাহাড়ে তোমার মাথা লাগবে না, লাগবে দুখানি পা। …দুখানি পা। …দুখানি পা…

🌿

পাহাড়ে উঠার চেয়ে নামাটা সব সময়ই কঠিন হয়। এবারে সেই কঠিন পরীক্ষাটা দিতে হবে আমাকে। গাইড ডান বুয়াই আমার সঙ্গী, প্রথম গাইড ওদের সাথে রয়েছে, আর এঁকে আমি একাই নিয়ে চলেছি। ভেবেছিলাম যে পথে এসেছি, সেই পথে নামবো, আশা করি সমস্যা হবে না পথ চিনতে। কিন্তু যেখানটাতে আমরা জ-ত্লং দেখেছিলাম, সেখানে এসেই আমি ভুলপথে চলছিলাম, গাইড পথ সংশোধন করে দিলেন। মনে মনে প্রমাদ গুণলাম – এই লোকটা যদি এখন বিট্রে করে, এই গহীন পাহাড়ে আমাকে পথ হারিয়ে ঘুরপাকই খেতে হবে কতদিন, তা আল্লা’ মালুম।

আমি ডান পা-টাকে শুধু দাঁড়ানোর সময় ব্যবহার করছি, বাম পা ভাঁজ করে করে নামছি লাঠির উপর ভর দিয়ে দিয়ে — বুড়ো মানুষের মতো। যোহরের নামাজ পড়া হয়নি। সময় হয়তো চলেই গেছে। মোবাইল চালু করলাম সময় দেখার জন্য। নামাযটা পড়ে নিতেই হবে। গাইডকে বলামাত্র সে শশব্যস্ত হয়ে পড়লো। উঁচুমতো একটা জায়গা আমাকে দ্রুত পরিষ্কার করে দিলেন বেচারা। আমি সূর্য দেখে পশ্চিম আন্দাজ করে নিলাম। গামছাটা বিছিয়ে দিলাম ওখানে। নামাজে দাঁড়ানোর পরে বুঝলাম, আমি বসতে পারবো না। অগত্যা পানি নেই দেখে তায়াম্মুম করে জায়গায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই যোহরের দুই রাকা’ত কসর নামায (ভ্রমণকালীন সংক্ষিপ্ত নামায) আদায় করলাম। আসর আরেকটু পরে পড়বো। আবার পথ ধরলাম।

যোগী হাফং-এর পথে শতপদীর শরীরের একাংশ। ভালো করে তাকালে ছবির একেবারে বাম দিকে সামনের অংশের দুটো পা দেখা যাবে।
যোগী হাফং-এর পথে শতপদীর শরীরের একাংশ। ভালো করে তাকালে ছবির একেবারে বাম দিকে সামনের অংশের দুটো পা দেখা যাবে।

কিছুদূর নেমেছি এমন সময় হঠাৎই পাতার নিচ থেকে লাল টকটকে কিছু একটার নড়াচড়া। তাকিয়ে দেখি, ঘাসের নিচে লুকিয়ে পড়তে চাচ্ছে একটা “শতপদী” (Centipede), আমরা সাধারণ্যে যাকে “চ্যালা” নামে চিনি। এটাতো পুরো ১হাত লম্বা হবে। চরম বিষাক্ত এক কীট এটা – কে না চিনে। ‘শতপদী’ বা ১০০ পা-ধারী বলা হলেও মজার ব্যাপার হলো এদের সব সময় ১০০টা পা-ই হয় না, এদের পায়ের জোড়া হয় বিজোড় সংখ্যক, এবং সেটা সংখ্যায় ৩০টা যেমন হতে পারে, ৩৫৪টাও হতে পারে। যত প্রকৃতিপ্রীতিই থাকুক না কেন, এই জিনিসটাকে বোধহয় ভালোবাসা যায় না। তবু আমার ওকে মারার ইচ্ছা ছিল না। কিন্তু ডান বুয়াই আমার হাত থেকে লাঠিটা নিয়ে বেধম পেটাতে থাকলেন। সেও লুকিয়ে বাঁচতে চাচ্ছে। ক্যামেরাটা বের করে ছবিও ঠিকমতো তুলতে পারছি না ওদের চরম দ্রুতগতির জন্য। অবশেষে ডান বুয়াই’রই জয় হলো – বিছের প্রাণ গেলো। তিনি বাঁশটা দিয়ে ওটাকে পথ থেকে সরিয়ে দিলেন। একদিকে ভালোই হয়েছে, এপথ দিয়েই দল ফিরবে, তখন যদি এটার কামড় খায় কেউ…!

যোগী হাফং থেকে ফেরার পথে বাঁশবনে আমি (ছবি: গাইড ডান বুয়াই)
যোগী হাফং থেকে ফেরার পথে বাঁশবনে আমি (ছবি: গাইড ডান বুয়াই)

আমার লাঠিটা আর হাতে দিলেন না গাইড, তিনি বাঁশবন থেকে নতুন আরেকটা বাঁশ কেটে, পরিষ্কার করে দিলেন আমাকে। জীবনে একটা ট্রেকিং পোলের উপর এতটা নির্ভরশীল হতে হবে আমাকে কখনও, কল্পনাও করিনি। অনেকটাই অন্ধকার হয়ে গেছে তখনই, তাছাড়া আমরা পাহাড় থেকে নিচের দিকে, জঙ্গলের ভিতরে যাচ্ছি ক্রমাগত। অথচ ঘড়িতে মাত্র সাড়ে চারটা বাজে, শুধু সূর্যটা পাহাড়ের আড়াল হয়েছে মাত্র, তাতেই এই অবস্থা। বাঁশবন পেরিয়ে নেমে আসছি। কোথাও কোথাও ঝুলে ঝুলে নামতে খুব কষ্টই হচ্ছে, কিন্তু যত কষ্টই হোক, এখন নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরে যাওয়া ছাড়া এই ব্যাথার কোনো সমাধান হবে না, তাই সব ব্যাথাকে তুচ্ছ করে এগিয়ে যাচ্ছি আমি। নামার সময় কষ্টটা অন্যরকম: ডান পা বাঁকা করতে পারছি না, অথচ উঁচু পাথর থেকে নেমে নেমে চলতে হচ্ছে, তাই ডান পা-ই নিচে ফেলছি থ্যাক্‌ করে, আর বাম পা বাঁকিয়ে উঁচু জায়গা থেকে নিচে নামছি। সেই থ্যাক্‌ করা ধাক্কাটা যেন মারাত্মক না হয়, সেটা নিশ্চিত করার যথাসাধ্য চেষ্টা করছি পা ফেলার সময় ট্রেকিং পোল দিয়ে মেঝেতে ধাক্কা দিয়ে শরীরের ভার কমিয়ে। তার উপর ঐ পায়েরই গোড়ালি মচকে গিয়েছিল একবার। 😧

এভাবে নামতে নামতে কখন যে আমরা ঐ খাড়া দেয়ালটা নেমে চলে এসেছি, আমি টেরই পাইনি। অথচ উঠার সময় কত বিচিত্রই না লেগেছিল ঐ খাড়া দেয়ালটা। একটা সময় আমরা পানির সর্বশেষ উৎসের কাছে চলে এলাম; অন্ধকার এখন অনেকটাই ঘিরে ধরেছে আমাদেরকে। ওখান থেকে ওযু করতে গিয়েও টের পেলাম, আমি নিচু হয়ে পানি ছুঁতে কষ্ট হচ্ছে, তখন ডান পা লম্বা করে পেছনে দিয়ে বাম পায়ের উপর ভর দিয়ে কোনো রকমে ওযু সেরে ওখানেই পশ্চিম আন্দাজ করে আসরের কসর নামায আদায় করলাম আগের মতোই। পানি খাবার জন্য ব্যাগ থেকে বোতল বের করতে গিয়ে আবিষ্কার করলাম: আমার ব্যাগে দুটো ‘হানিব্রেড’ রয়েছে। আবু বকরের সিদ্ধান্তকে অপছন্দ করে সেই সাত সকালে যে নাস্তা খেয়েছিলাম, তারপর আর কোনো ডিসেন্ট মীল পড়েনি সারাদিন ধরে পেটে। এই ক্ষুধা পেটে খেজুরের বাইরে এরকম একটা খাদ্য হাতে পেয়ে রীতিমতো উচ্ছসিত আমি। একটা দিলাম ডান বুয়াইকে আর একটা নিলাম আমি। খাওয়া শেষে ব্যাগের ভিতরে দেখি আরো একটা আছে — এ-তো রীতিমতো আকাশের চাঁদ! ভাগ করে দুজনে খেলাম। গাইডের খুব পছন্দ হয়েছে খাবার। দুজনে ঝিড়ি থেকে পানি খেয়ে পেটপূজার সমাপ্তি টানলাম।

🌿

আলো এতোটাই কমে গেছে যে, গাইড উনার টর্চ বের করে ফেললেন। কিন্তু আমি আমার নামের (নয়ন) সার্থকতার কারণেই হয়তো তখনও দেখছিলাম ভালোই। পথটা কিভাবে নামছি তার বিবরণ দেবার আর কিছুই নেই — ক্ষতিগ্রস্থ ডান পা থ্যাক্‌ করে ফেলছি, ডান হাতে ধরা লাঠিতে ভর দিয়ে ওজনটা যতটা সম্ভব হালকা রাখার চেষ্টা করছি, বাম পা বাঁকা করে করে নামছি — ডানে, বামে, গাছ ধরে, বাঁশ ধরে, শিকড় ধরে, পাথর মাড়িয়ে, পাথর গলে — সেই একই বন্ধুর পথ মাড়িয়ে, যে বন্ধুর পথ আমরা মাড়িয়ে উঠে গেছিলাম দিনের আলোয়। জীবনে রাতে ট্রেক করার ইচ্ছা ছিল অনেক, সেই ইচ্ছা পূরণ করছি এবার; তবে দুর্দশাগ্রস্থভাবে।

নাহ, আর চলা যাচ্ছে না আলো ছাড়া। তার উপর গাইডের টর্চের আলো, আমার আলোকসংবেদী চোখের দৃষ্টিসীমা আরো সংযত করে দিচ্ছে। টর্চ বের করা উচিত। কিন্তু এমন সময় মনে হলো আবু বকরের হেডল্যাম্পটার কথা। আমার একটা হাত দখল করে রেখেছে লাঠিটা (যেজন্য সারাজীবন একে বোঝা ভেবেছি), এখন দ্বিতীয় হাতটাও যদি টর্চলাইট দিয়ে জুড়ে রাখি, তাহলে সমস্যা। আবু বকর যেহেতু হেডল্যাম্পটা নেননি, অথচ চার্জ আছে, তাহলে ওটা ব্যবহার করাই উচিত হবে — যদিও তাঁর অনুমতি নেইনি, কিন্তু আশা করি তিনি মাফ করবেন। আমি জীবনে কখনও হেডল্যাম্প ব্যবহার করিনি, কিন্তু গতকালকে চার্জ দেবার সময় রেমাক্রিতে আবু বকর দেখিয়ে দিয়েছিলেন কোথায় কী; ওটা জ্বেলে নিয়ে মাথায় পরে নিলাম। ডায়াল ঘুরিয়ে আলো বড়-ছোট করা যায়, আলোর ধরণও (বীপার, ডিমলাইট, ফোকাল লাইট) পরিবর্তন করা যায়। ঠিকঠাক করে নিলাম। বেল্ট টেনে মাথায় পরে নিলাম। অল সেট। আমার উপকার হলেও, আবু বকর এটা না নিয়ে চরম ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

বাতিটা বন্ধ করে মাগরিবের নামায আদায় করে ফের ট্রেকে উঠলাম আমরা। আরো নামতে থাকলাম, আরো নামতে থাকলাম। ঘুটঘুটে অন্ধকার, ঘন গাছগাছালির ফাঁক দিয়ে আকাশ অল্প যা একটু দেখা যাচ্ছে, সেই আকাশের মৃদু আলো এই টর্চে সয়ে যাওয়া চোখ আর ধরতে পারছে না। অন্ধকারে গহীন পাহাড়ে হাঁটছি, আমার মধ্যে কোনো বীকার নেই, কোনো ভয় পাচ্ছি না – বাঘে খেয়ে ফেলবে, ভূতে ছেয়ে ফেলবে – কোনো ভয় নেই। ভয় কেবল একটাই, দলিয়ান পৌঁছার আগে একমাত্র সচল পা-টা মেয়াদোত্তীর্ণ না হলেই হলো।

গাইডের সাথে কথা বলছিলাম। বারবারই ক্ষমা চাচ্ছিলাম আমাকে নিয়ে তাঁকে কষ্ট করতে হচ্ছে বলে — যদিও একটিবারের জন্যও আমি নিজের ভার ওঁর উপর ছাড়িনি, সহায়তা চাইনি। কিন্তু যত যা-ই হোক, সে তো আর অসুস্থ একজনকে প্রোটোকল দিয়ে উঠা-নামা করার জন্য আসেনি, সুস্থ একঝাঁক তরুণকে পাহাড়ে তুলবে, নামিয়ে আনবে, টাকা পাবে – ব্যস। আমার সমস্যা শুনে তিনিও জানালেন, ছোটবেলা তাঁর একবার ম্যালেরিয়া হয়েছিল। অনেক ভুগিয়েছে। তখনই তাঁর পা-কে অকেজো করে দিয়ে গেছে। খুব বেশি পরিশ্রম করলে তাঁরও কষ্ট হয়। ভাবতে পারছেন, সেই “খুব বেশি”র মাত্রাটা ওঁর ক্ষেত্রে কতটা!! 😶

যোগী হাফং ট্রেইল থেকে ধরা মাছ হাতে গাইড ডান বুয়াই
যোগী হাফং ট্রেইল থেকে ধরা মাছ হাতে গাইড ডান বুয়াই

নামতে নামতে গাইড বাবাজিকে আমি চিংড়ির কথা বলতেই সে নতুন খেলা পেয়ে গেলো। চিংড়ি তো আর ধরতে পারলেন না, কিন্তু চিংড়ি ধরতে গিয়ে দা দিয়ে কোপ মেরে টর্চের আলোয় মাছ ধরে ফেললেন উনি। ব্যস, এটা ছিল শুরু। এরপর বেচারা টর্চ জ্বালেন, আর মাছ ধরেন, কিংবা ব্যাঙ ধরেন, কিংবা চিংড়ি ধরেন — চলতেই থাকলো। আমি আর তাঁর জন্য অপেক্ষা করি না, আমি আমার মতো এগিয়ে যাই, ও’ বেচারা মাছ, ব্যাঙ ধরেন আর সাথে থাকা ঝোলার মধ্যে পোরেন, তারপর আমাকে আবারও পার করে চলে যান। হেডল্যাম্পটা খুব উপকার করলো, পথ দেখছি ওটা দিয়ে, ডান হাতে লাঠিটা ধরা – পথ চলছি। এক জায়গায় গাইড এমনই বেশি ব্যাঙ ধরলেন যে, তাঁর এক হাতের পাঁচ আঙ্গুলের ফাঁকে চারটা ব্যাঙ আটকে রেখে আমাকে দেখালেন। কিন্তু ক্যামেরা বের করার অবস্থায় তখন ছিলাম না বলে ছবিটা নেয়া হয়নি।

আগের দলটার কোনো দেখাই পেলাম না। ওরা কি ফিরেনি আজকে? আমাদের দলটার কী হয়েছে, তাও জানি না। কোরেশী কি শেষ পর্যন্ত সামিট করতে পেরেছে? এদিকে আমি অনন্তকাল ধরে নেমেই চলেছি, নেমেই চলেছি — একই দৃশ্য: পাথর, ঝিড়ির পানির কলকল শব্দ, আর ঘুটঘুটে অন্ধকার জঙ্গল, আর তাতে জঙ্গলের মৃদু শব্দ — মৃদু, কারণ আমরা থামছি না, অনবরত হাঁটছি, আমাদের চলাচলের শব্দে ঢাকা পড়ে গেছে আশপাশের শব্দ। জঙ্গলকে অনুভব করবার জন্য কোথাও থেমে একটু জিরিয়ে নেয়া, কান পাতা — এসব রোমান্টিকতা তখন পালিয়ে গেছে বহু, বহুদূরে।

রোমান্টিকতা আমার না থাকলে কী হবে, আমার গাইডের বেশ আছে। গাইড যেমন পানির দিকে টর্চ মেরে মেরে এগোচ্ছেন, তেমনি কিছুক্ষণ পর পরই আকাশের দিকেও টর্চ তাক করেন। জঙ্গলের আকাশ তো আর ‘আকাশ’ না, গাছের মগডাল। আমি অনেকক্ষণ দেখতে দেখতে জানতে চাইলাম, “দা-দা উপরে কী দে-খেন?” উনি জানালেন, জঙ্গলের বিভিন্ন প্রাণীদেরকে দেখা যায় গাছে বসে থাকতে। মনে মনে বেচারার প্রশংসা না করে পারলাম না, এই নাহলে প্রকৃতিবিদ। প্রকৃতি আস্বাদন করে করে হাঁটছে ব্যাটা।

নামছি, নামছি, নামছি, পথ যেন আর শেষই হয় না। যাবার পথে যেসব জায়গা পার করে গেছি, আসার পথে সেই সব জায়গাই পার করছি। যেমন, গাছের শিকড় ধরে ঢালু পাথরটা উঠেছিলাম, এবারে সেখান দিয়ে নামলাম একটা পা সটান করে। কিন্তু বাঁশ কেটে কেটে যে জায়গাটায় আমরা বাম পাশ দিয়ে বাঁশ ধরে ঝুলে এসেছিলাম, সেই জায়গাটা এবার কেন জানি পেলাম না। আমি তখনই বলেছিলাম, গাইড লাল তুয়াই একটু বেশি অ্যাডভেঞ্চারাস — সহজ পথ রেখে ত্যাড়া পথে যায়।

ডান বুয়াই’র কাছে শুনলাম, একবার একটা বড় দলকে নিয়ে মহা বিপদে পড়েছিলেন তিনি। তখন তিনি একাই গাইড ছিলেন। দলের একজন ছাড়া আর কেউই টর্চ আনেনি। তাই গাইডের একটা টর্চ আর ঐ একজন পর্যটকের টর্চের আলোয় পুরো দলকে নিয়ে এই পথ মাড়ানোটা উনার জন্য রীতিমতো দুঃস্বপ্ন ছিল। সেই দলকে নিয়ে অবশেষে তিনি পাড়ায় পৌঁছেছিলেন, কিন্তু সেটাকে “রাত” না বলে “ভোর” বলাই ভালো – কারণ ঘড়িতে তখন ৪টা বাজে।

ঝিড়ি, ভেজা স্যাঁতস্যাতে পাথর পাড়ি দিয়ে চলতে হচ্ছে। এক জায়গায় আর টাল সামলাতে পারলাম না, ধুপ করে পড়ে গেলাম পাথুরে মেঝেতে। ক্যামেরাটা ব্যাগের ভিতরেও আছাড় খেয়েছে স্পষ্ট শুনতে পেয়েছি। গেছে নিশ্চয়ই ক্যামেরাটা। আওয়াজ শুনে গাইড দ্রুত ছুটে এলেন কী হয়েছে দেখার জন্য। আমি সাথে সাথে উঠে দাঁড়িয়েছি। ব্যাগটার নিচের অংশ ভিজেছে নিচের প্যাঁচপ্যাঁচে পানিতে। ব্যাগের ভিতরে তেমন কিছুই ভিজেনি, ক্যামেরাটাও ভিজেনি – যা একটু পানি ছুঁয়েছে, ব্যাগটাই শুষে নিয়েছে। তারপরও স্যুপের প্যাকেটগুলো নিচে দিয়ে ক্যামেরাটা রাখলাম; বেঁচে গেছে ওটা অন্য অনেকবারের মতোই। ব্যাথা পাইনি, কিন্তু পেতেও পারতাম। কত আর সাবধান হবো? পথটাই এমন — আনফরগিভিং!

আমার ঘড়িতে সময় চলছে টিকটিক করে, কিন্তু এই অনন্ত পথ যেন টিকটিক করেও চলছে না। ফুরোচ্ছে না। নিজেকে নিজে একা চীয়ার আপ করার চেষ্টা করা ছাড়া এই পথে আর কী প্রেষণাইবা পেতে পারি? নিজেকেও মোটিভেশান দেয়ারও কিচ্ছু নেই, একটা ছাড়া: পাড়ায় গিয়েই তুমি বিশ্রাম নিতে পারবে। এই একটা কথাকে পূঁজি করেই পাথরের পর পাথর মাড়িয়ে চলেছি, টপকে চলেছি, যখন পা একটা ঈশ্বরের ইচ্ছাধীন হয়ে আছে।

যে পথে গেছি, তার কী পয়েন্টগুলো মাথায় আছে: যেমন জায়গাটা ধরে ওভাবে গেছি, সেই জায়গাটা ধরে সেভাবে গেছি; কিন্তু এখন তার অনেক জায়গাই চিনতে পারছি না। চিনতে না পারায় পথ আর সময়ের হিসাবটাও করতে পারছি না যে, আর কতদূর পথ আছে, কিংবা আর কতক্ষণের পথ আছে। ভয়ে কতদূর পথ বাকি আছে সেটা জিজ্ঞেসও করছি না, কারণ “চারঘন্টা” “তিনঘন্টা” ইত্যাদি উত্তর শুনলে আরো ডিমোটিভেটেড হয়ে যাবো; তারচেয়ে হাঁটা পথ, হেঁটে চলতে থাকাই শ্রেয়। …পথে এক জায়গায় গাইড জানালেন একটা সাপ দেখেছেন। আমি অবশ্য দেখলাম না ওটা, হয়তো আমার ধীরগতির জন্য। বলা হয়নি, আমরা উপরে উঠার সময়ও একটা সাপ দেখতে পেয়েছিল মোহন। সাপখোপের ভয়ও কেন যেন পাচ্ছি না আমি; এগিয়ে যেতে হবে, নেমে যেতে হবে – এটাই এখন একমাত্র লক্ষ্য।

একটা পর্যায়ে আমরা ঝিড়ির এমন একটা জায়গায় চলে এলাম, আমার মনে হতে লাগলো আমরা বোধহয় যোগী ট্রেক শুরুর জায়গাটাতে চলে এসেছি। কিন্তু তবু পথ শেষ হয় না। আমিও “সামনে কী আছে” না চিন্তা করে একটাই চিন্তা করি: সামনে পাড়া আছে; আছে আশ্রয়; আছে বিশ্রাম। এক হাতে বাঁশ ধরে ভর দিতে দিতে সেই হাতটাতেও ব্যথা করতে শুরু করেছে এবারে। এই হাতটা আবার ভাঙা — মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় হাতের বাটি ভেঙে গিয়েছিল শরিয়তপুর ভ্রমণে। কিন্তু বাঁশ হাতবদল করে তেমন একটা জুৎ করতে পারছি না কারণ ডান পায়ে সমস্যা, সুতরাং ডান পা-কে বিশ্রাম দিতে হলে ডানদিক দিয়েই ঠ্যাক দিতে হবে। এদিকে আবু বকরের রিচার্জেবল হেডল্যাম্পের আলোও মৃতপ্রায়; এখন আর ওটা ব্যবহার করে এই পিচব্ল্যাক জঙ্গুলে পথে কিচ্ছু আঁচও করা যাচ্ছে না। থেমে ব্যাগ থেকে এবারে আমার টর্চটা বের করলাম। পুরো চার্জটাই জমা পড়ে আছে ওটাতে। ফকফকা আলোয় আবার পথ ধরলাম।

কোনো দলেরই দেখা নেই: না আগের দলের, না আমাদের দলের। আমার মাথায় একটাই চিন্তা এখন ঘুরপাক খাচ্ছে: শহুরেদের কাছে রাত ১২টা, ১টা বাজলে ‘রাত’ হয়, আর পাহাড়িদের কাছে সূর্য ডোবা মানেই রাত। তার মানে দলিয়ান পাড়ার লোক সব ঘুমিয়ে পড়েছেন এতক্ষণে। হেডম্যানের পুত্রবধুরও নিশ্চয়ই জেগে থাকার কথা না। দুটো দলের কোনোটাই ফিরেনি, তিনি নিশ্চয়ই তাদের জন্য অনির্দিষ্টকাল ধরে অপেক্ষা করে বসে থাকবেন না, যেখানে রাত ৪টা বাজেও দল পাড়ায় পৌঁছার কথা শুনেছি। …প্রথম দলটা এখনও পৌঁছেনি — এটা আমাদের জন্য এলার্মিং: কারণ ওরা না গেলে মুরগি জবাই করা হবে না, আর যদি পাড়াবাসী সেটা জবাই করে ফেলেন সেই মুরগী আমাদের জন্য খাওয়া ধর্মীয়ভাবে নিষিদ্ধ (হারাম) হবে, সুতরাং আমরা মুরগি খাবো না। মুরগি জবাই না হলে আলুভর্তা আর ডাল দিয়ে খাওয়া যাবে অবশ্য, কিন্তু সারাদিন না খেয়ে থেকে ঐ খাওয়াটুকু বড্ড অনভিপ্রেত হয়ে যাবে। তাই আমার এখন একটাই কাজ, যত দ্রুত সম্ভব পাড়ায় পৌঁছে আগে গিয়ে মুরগিটা জবাই করা। তারপর রান্না হতে হতে অনেক সময় লাগবে জানি, কিন্তু তবু একটা ‘ডিসেন্ট মীল’তো পাতে জুটবে।

এবারে গাইড আমাকে ডানদিকে পাহাড়ে উঠার পথে নিয়ে এলেন। শুরু হলো পাহাড়ে চড়া। যোগী উঠার মতো করেই আবার চড়াই উঠা শুরু হলো এবারে। গাছের ঘনত্বের কারণে বুঝতে পারিনি, কিছুটা ক্লিয়ারিং পেলে যখন আশপাশটা দেখতে পাচ্ছিলাম, তখন বুঝতে পারলাম আকাশে শুক্লপক্কের চাঁদ উঠেছে। ফকফকা আলোয় পাহাড়টা অন্ধ-সাজে সেজেছে। রহস্যময় তার সৌন্দর্য্য। কিন্তু উপভোগ করবার জন্য কোথাও দাঁড়াবার নেই সময়, নেই অবস্থা, নেই পরিস্থিতিও – কারণ দাঁড়ালেই শিশিরে ভেজা ঘাস থেকে জোঁক বাবাজিরা রক্তের লোভে এই অধমের গায়ে আশ্রয় নিবে। অনবরত হাঁটছি, পাহাড়ে উঠছি, পাহাড়ে উঠে হাঁটছি, পাহাড় থেকে নামছি — এর মাঝেও পিঠে, কোমরের পিছনটায় হাত দিয়ে এক জোঁক বাবাজিকে ছাড়ালাম। কে জানে আর কোথায় কোথায় কয়টা উঠেছে। দাঁড়িয়ে চেক করারও উপায় নেই।

দলিয়ান পাড়ার কাছে বনবিড়ালের ঝাপসা অবয়ব দেখা যাচ্ছে
দলিয়ান পাড়ার কাছে বনবিড়ালের ঝাপসা অবয়ব দেখা যাচ্ছে

পাহাড় থেকে নেমে একটা ঘাসে ঢাকা সমতল জায়গা পার হচ্ছি, এমন সময় হঠাৎ গাইড আমাকে জানালেন, ডানদিকে ঐ দূরের গাছটায় একটা কিছু আছে। তিনি নাম বলেছিলেন, কিন্তু নাম মনে নাই। বর্ণনা শুনে যেটা বুঝলাম সেটা একটা বনবিড়াল-জাতীয় কিছু একটা। গাইডের টর্চের আলোয় ওটার দুটো চোখ জ্বলজ্বল করা ছাড়া আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না। আমি চিন্তা করলাম, আমার ক্যামেরার আইএসও’র কল্যাণে নিশ্চয়ই ওটার একটা ছবি তোলা যাবে। তাই ওখানে দাঁড়িয়ে ক্যামেরাটা যুম করে তাক করলাম। কিন্তু এই এতো অল্প আলোয় ছবি তোলার প্রথম শর্ত হচ্ছে স্ট্যাবল পযিশনিং – দরকার একটা ট্রাইপড, এরকম শরীরে এতো পরিশ্রমের পর খালি হাতে সেটা নিশ্চিত করা আমার জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। তাই ব্লারি একটা ঝাপসা অবয়ব ছাড়া ক্যামেরায় আর কিছুই তুলতে পারলাম না। ক্ষ্যান্ত দিলাম। কারণ ইতোমধ্যেই যা হবার হয়ে গেছে, জোঁক বাবাজিরা আমাকে পেয়ে বসেছে। দ্রুত ক্যামেরা ব্যাগে পুরে পথ ধরলাম।

আরো অনেকটা পথ পাড়ি দিয়ে আমরা ঝিড়িতে পৌঁছলাম। গাইড জানতে চাইলেন, ঝিড়ি থেকে গোসল করে যাবো কিনা। আমি “না” করে দিলাম। এখন গোসলের চেয়েও দরকার বিশ্রাম। তার উপর পাড়ায় গিয়ে কাজ আছে। আরো নাকি অনেকটা পথ আছে। ও আল্লা’ এই পথ কি শেষ হবে না! এমন সময় সামনে এগিয়ে গাইড বাবাজিকে আর দেখি না। হাক দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “দা-দা, কুন দিকে?” উত্তরে আওয়াজ শুনে সেদিকে চললাম। সামনে গিয়ে দেখি আরো ক’জন লোক, এক জায়গায় আগুন জ্বালিয়ে শীত পোহাচ্ছেন। কাছে গিয়ে হাবেভাবে বুঝতে পারলাম এরা দলিয়ানেরই লোক, শিকার করে ফিরেছেন। পাখি শিকার করেছেন বিভিন্ন রকমের। পাশেই দোনলা বন্দুক রাখা। সাথে গাইড না থাকলে এই রাতের অন্ধকারে এঁদেরকে ফ্র্যান্ডলি এনটিটি ভাবার মতো পরিবেশ পরিস্থিতি কোনোটাই আমার ছিল না।

এমন সময় ডান বুয়াই আমাকে জানালেন, তিনি এখন এদেরকে নিয়ে ঐ বনবিড়ালটা শিকার করতে যাবেন। আমি কি এখানে ততক্ষণ অপেক্ষা করবো কিনা। কী বিপদে পড়া গেল! আমি কাতর হয়ে বললাম, “দা-দা, আমার কষ্ট হোয়ে যা-বে যে।” মায়া হলো বোধহয়। দলের অন্য একজনকে আমার দায়িত্ব দিয়ে তিনি ঐ দলের একজনকে নিয়ে, আবার যে পথে এসেছি, সেপথে গেলেন বনবিড়াল মারতে। বুঝলাম, যে ব্যাটাকে “প্রকৃতিপ্রেমী” বলে সুনাম করেছিলাম, ব্যাটা আসলে শিকার করবার জন্য বন্যপ্রাণী খুঁজছিল। বলিনি হয়তো, ডান বুয়াই’র ব্যাগ ভর্তি এখন মাছ, ব্যাঙ আর চিংড়িতে। ফ্রিজ থাকলে তিন/চার দিনের খাবারের নিশ্চিত যোগান হয়ে যেত তার পরিবারের।

ঐ দলেরই এক যুবক এবারে আমার গাইড। সে পথ দেখিয়ে নিয়ে চললো। চলতে চলতেই ওর সাথে কথা হলো। সে জানালো গতমাসে সে নাকি একটা দলকে নিয়ে গেছে যোগীতে, ফিরতে ফিরতে অনেক রাত হয়ে যাওয়ায় ওরা রাতে পাহাড়েই থেকেছে। পরদিন সকালে ফিরেছে। ওর কথা যদি সত্যি হয়, তাহলে আমাদের আগের দলটা এই সিযনের প্রথম দল না, ওদের আগে গত মাসে আরেকটা দল তাহলে এসেছে! ☹️ ওর কাছেই প্রথম শুনলাম, যোগী থেকে ফেরার আরেকটা পথ আছে। জুমের পথ বলেই সবাই চিনে ওটাকে। ঐ পথটা নাকি সহজ পথ, আর ওপথে সময়ও কম লাগে। তার মানে আগের দলটা যদি ফিরেও আসে তারা ঝিড়ির পথটাতে ফিরেনি। সে হিসাবে আমাদের দলটাও হয়তো ঐ পথেই চলে এসেছে, কে জানে। (আগের বর্ণনাকারীরাও জুমের পথটার কথা বলেছেন, আমি মিস করে গেছিলাম বলে জানতাম না)

হাঁটতে হাঁটতে ঘাসে ঢাকা উন্মুক্ত একটা প্রান্তরে এলাম, চাঁদটা এতো মায়াবী একটা পরিবেশ তৈরি করেছে যে, দাঁড়িয়ে উপভোগ করবার মতোই একটা জায়গা। কিন্তু জানি, দাঁড়ালেই জোঁক এসে ধরবে। এবং হলোও তাই। পায়ের আঙ্গুলের ভাঁজ থেকে একটা ছাড়ালাম। চাঁদের আলোয় পথ চলছি। এভাবে পাড়ার খুব কাছাকাছি চলে আসতেই আমার নতুন গাইড তার ঘরে ঢুকলো হাতের জিনিসপত্তর রেখে আসবার জন্য। তখন ডান বুয়াই চলে এলেন। চললাম আবারো তাঁর সাথে। জানালেন, তাঁরা নাকি বনবিড়ালটা শিকার করেছেন। বেচারার পাতে মাছ আর ব্যাঙের সাথে এবার একটা বনবিড়ালও যোগ হলো তাহলে।

🌿

আমরা পাড়ায় চলে এসেছি। আবারও উপরে উঠা। ঘাসহীন মাটিতে চাঁদের আলো পড়ে এক অপার্থিব দৃশ্য তৈরি করেছে। দেখার মতো দৃশ্য বটে। কিন্তু আমার মনে তখন নীড়ে ফেরার তৃষ্ণা। সেই তেষ্টাটা যে এতোটা প্রবল হয়েছে বুঝতেই পারিনি, এবার বুঝতে পারছি, পাড়ার ভিতরেই যখন হেডম্যানের ঘরটা আর আসছেই না, তখন। অবশেষে নিচে হেডম্যানের ঘরটা দেখে তৃষ্ণাটা তৃপ্তিতে পর্যবসিত হলো। তবে ভিতরে কোনো আলো নেই, সবাই ঘুমিয়ে গেছে।

ঘড়িতে ২৩:০০

গাইড পিছন দিকে গিয়ে হেডম্যানের পুত্রবধুকে ডেকে তুললেন ঘুম থেকে। তিনি এসে দরজা খুলে দিলেন আমাকে। ভিতরে ঢুকে দেখি তিনজন মানুষ ঘুমিয়ে আছে। তারমানে আগের দল চলে এসেছে আমাদের আগেই। ঝিড়ি পথে যেহেতু দেখা হয়নি, তারমানে ওরা জুমের পথে এসেছে। যাহোক, চলে এসেছে এটা আশার কথা। ঐ পাহাড়, এই শীতে, কোনোভাবেই বিশ্রামের আদর্শ স্থান না। আরেকটা ব্যাপারও পরিষ্কার, ওরা এসেছে তারমানে মুরগিও জবাই করা হয়েছে। তবু দিদিকে জিজ্ঞেস করে নিশ্চিত হয়ে নিলাম। ঘরে সৌরবিদ্যুতের বৈদ্যুতিক বাতি জ্বলছে, এর মধ্যেও তাঁরা ঘুমাচ্ছেন, কতটা ক্লান্ত হলে এভাবে ঘুমানো সম্ভব!

গাইড জানতে চাইলেন খাবো কিনা। আমি জানালাম, ওরা ফিরে এলে একসাথে খাবো। গাইড বাবাজি আর অপেক্ষা করতে চাইলেন না, তাঁর ক্ষিধে লেগেছে। আমাকে তিন/চারটা কলা এনে দিয়ে তিনি খেতে গেলেন ভিতরবাটিতে। অবস্থাদৃষ্টে বুঝলাম, গাইডরাও বোধহয় ফিরে এসে এখানেই খাওয়া-দাওয়া করেন। …আমি পা থেকে অ্যাঙ্কলেটটা খুলতেই দেখি ওটা রক্তে ভিজে আছে। যা বোঝার বুঝে নিলাম। দ্রুত বেরিয়ে বাড়ির পিছন দিকে গেলাম। ওখানে নাকি একটা হাউযে পানি আছে, গাইড জানিয়েছেন। ওখানে গিয়ে টর্চের আলোয় তিনটা জোঁক ছাড়ালাম পা থেকে। পানি দিয়ে পা ভালো করে পরিষ্কার করে ফিরে এলাম ঘরে। ট্রেকের প্যান্টটা বদলে মোটা একটা শীত ঠেকানো প্যান্ট পরে নিলাম। নীক্যাপটা খুলে দেখি এক পায়ে বেশি প্রেশার দেয়ায় বাম পায়ের পিছনের অংশে সেটা ঘষে ঘষে ক্ষতই করে ফেলেছে। জোঁকের চার/পাঁচটা কামড় থেকে রক্ত ঝরা বন্ধ হচ্ছে না। টিস্যুর পরে টিস্যু দিয়ে চেপেও রক্ত বন্ধ হচ্ছে না। অবশেষে সাথে করে নিয়ে যাওয়া ব্যান্ড-এইডগুলো লাগিয়ে রক্ত বন্ধ করার ব্যবস্থা করলাম- ওগুলোর চাপে যদি রক্ত বন্ধ হয়।

এশার নামায পড়ে নেয়া দরকার। ওযু করা হয়নি, তাই আবার ওযু করতে গেলাম। ওযু করতে গিয়ে আবিষ্কার করলাম আগেরবার ছাড়িয়ে আসা জোঁকের একটা এরই মধ্যে আমার পায়ে হয়ে আবার ভিতরে চলে গিয়েছিল — বিশ্রী ব্যাপার। ওটাকে ছাড়িয়ে নিলাম আবারও। সাবধান হতে হবে। ঠান্ডা হীম পানিতে ওযু সেরে ভালোমতো চেক করে ঘরে ঢুকলাম। ব্যাগের জিনিসপত্রগুলো বের করে ব্যাগটা শুকাতে দিচ্ছি এমন সময় বাইরে কথাবার্তা শুনতে পেলাম।

ডাক দিলাম: “কে?”

ইতি আপুর গলা শুনলাম, “নয়ন নাকি?”

ঘড়িতে ২৩:১৫

আহ! দল ফিরে এসেছে। একে একে সবাইই চলে এলেন। আমাদের চলাফেরায় আগের দলের ঘুম যেন না ভাঙে এজন্য সবাই ধীরে ধীরে চলছেন। সবাই পরিষ্কার হতে হতে আমি নামায পড়ে নিতে লাগলাম, সেযদা দিলাম কিন্তু ডান পা পেছন দিকে সটান লম্বা করে ফেলে রেখে নামায পড়তে হচ্ছে। খাবার দেয়ার কথা জানালাম দিদিকে। যাদের নামায বাকি, তারা নামাযও পড়ে নিলেন। আমি তখন পা দুখানকে গরম পাহাড়ি কাথা-কম্বল দিয়ে প্যাঁচিয়ে বসেছি জ্যাকেট গায়ে দিয়ে। পা এখন যত উষ্ণ হবে, তত আরাম হবে পায়ের। আমার ঢের সন্দেহ: অস্ট্রিওপরোসিস-জাতীয় কোনো একটা সমস্যা আমার হয়েছে, ক্ষয়রোগ। হাঁটুর বাটিতে ক্ষয় হয়েছে, আর সেই গোল বাটির বদলে চোখা কোণা তৈরি হয়েছে, যেখানে টিবিয়া-ফিবুলা ঘষা লেগে লেগে এই অবস্থা করেছে আমার। ডান হাতটা প্রচণ্ড ব্যাথা হয়েছে, সেটাকেও সোজা করে রেখেছি। প্রত্যেকেই সারাদিনের ধকলে ক্লান্ত। এবারে দরকার একটা পেটভর্তি খাবারের।

অবশেষে খেতে বসলাম সকলে। গরম গরম ভাতের সাথে গরম গরম তরকারি। মুরগির মাংস, আলু ভর্তা আর ডাল। পাতে খাবার নিয়ে এবারে শোনা যাক কী করেছে আমাদের দল…

🌿

অসাধ্য সাধন করেছেন কোরেশী - প্রথম চূড়ার পথে দল (সেলফি: ইতি আপু)
অসাধ্য সাধন করেছেন কোরেশী – প্রথম চূড়ার পথে দল (সেলফি: ইতি আপু)

দলের বীরত্বগাঁথা শুরু হলো আমাকে গালি দিয়ে। “গালি” মানে অশ্রাব্য বুলি না, এরা ভদ্র ঘরের সন্তান, “গালি” মানে ভর্ৎসনা: “ধুর মিয়া, আপনে আরেকটু হাঁটলে কী হইতো!” যেখান থেকে আমি ফিরে এসেছি, আর ১৫ মিনিট উঠলেই নাকি আমি যোগী সামিট করতে পারতাম। যদিও আবু বকর, ইতি আপু সবাই আমার সিদ্ধান্তের সুনাম করছিলেন, কিন্তু সেটা তাঁরা ভদ্রতা করে করছিলেন কিনা আমার জানা নেই। যাহোক, যা হয়নি, তার কথা আর না বলি; যা হয়েছে, এবার তার কথা শুনি। বর্ণনা করছেন আবু বকর:

আমি চলে আসার পর দল আরো দুটো টিলা-মতন পাড়ি দিলো। তারপরই যোগী হাফং-এর প্রথম চূড়াটায় উঠে পড়লেন তাঁরা। এখান থেকে আরো এগিয়ে গেলে (সরলরেখায় দূরত্ব মোটামুটি ৮০০-৯০০ ফুট) একে একে ২, ৩ আর ৪ নম্বর চূড়ায় উঠা যাবে। চূড়ায় পৌঁছা গেছে, এবারে একটু বিশ্রাম করাই যায়। কিন্তু এখানেই যোগীর পার্থক্য বাংলাদেশের অন্য সব পাহাড়ের সাথে: যোগীর চূড়াটা মোদক রেঞ্জের রিজের (শিরা) একটা অংশ ধারণ করছে, এবং এই একটা কারণে এই পাহাড়কে সকল অভিযাত্রীই খুব ভালোবাসেন। পাহাড় বা পর্বতের রিজ যে দেখার মতো একটা বিষয় ব্যাপারটা প্রথম অনুধাবন করি ডি-ওয়ে এক্সপেডিটর্‌স-এর আকাশ ভাইয়ের সাথে কথা বলে। তিনি যে বিষ্ময় নিয়ে যোগীর রিজের বর্ণনা করছিলেন, তাঁর চোখ চকচক করতে দেখেই প্রথম আবিষ্কার করলাম যে, পাহাড়ের রিজ একটা দর্শনীয় বস্তু। এমনকি ফিরে আসার পর আমার কাছে তাঁর প্রথম প্রশ্ন ছিল: “রিজ কেমন দেখলেন?” যদিও সেটা দেখার সৌভাগ্য আমার হলো না, কিন্তু আমার দলের চোখে তো অন্তত দেখতে পারছি।

যোগীর ঐ রিজটা এতটাই খাড়া যে, প্রথম চূড়ার শিরাটায় দুইজনের বেশি পাশাপাশি দাঁড়াতেই পারবে না। শিরাটার বর্ণনা এভাবে চিন্তা করা যাক: একটা এক বাঁশের সাঁকো, পা সরলেই, হয় ডানে, নয়তো বামে পড়ে যাবেন আপনি। সাঁকোর ক্ষেত্রে সেই পতন বড়জোর হবে পানিতে, কিন্তু পাহাড়-পর্বতের ক্ষেত্রে এই পতন হবে পাহাড়ের বা পার্বতের পাথুরে তলে, আর সেটা যে অনেক অনেক নিচে হবে, তা কি আর বলতে? যোগীর শিরাটা বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত বরাবর। ঐ শিরা ধরে হাঁটতে থাকাকালীন আপনি যদি পড়ে যান, তাহলে বামদিকে পড়লে আপনি বাংলাদেশে মরবেন, আর ডানদিকে পড়লে মিয়ানমারে আপনার থ্যাঁতলানো হাড্ডি-মাংস পড়ে থাকবে। নিশ্চয়ই বুঝে গেছেন, ঐ খাড়া শিরা থেকে পড়লে আপনার ভবলীলা সাঙ্গ হবে নিশ্চিত।

যোগী হাফং-এর প্রথম চূড়ায় দল (ছবি: মোহন)
যোগী হাফং-এর প্রথম চূড়ায় দল (ছবি: মোহন)

১নং চূড়াটার ঐ রকম খাড়া শিরায় বিশ্রাম নিতে বসলো কোরেশী। সে প্রচণ্ড ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত। তাঁর সাথে যোগ দিলেন আবু বকরও। বাকি দুজন বসে থাকার বান্দা নয়, তাঁরা গাইড লাল তুয়াইকে নিয়ে পরবর্তি চূড়াগুলোর দিকে চলতে শুরু করলো। যোগীর চূড়া থেকে চূড়ায় যাওয়া মানে পর্বতের ঐ শিররেখা (রিজলাইন) ধরে হাঁটা। আবু বকর বর্ণনা করছিলেন, এর আগে যখন তিনি আকাশ ভাইদের সাথে যোগী গিয়েছিলেন, তখন ছিল ভর শীতকাল, পাহাড়ে গজানো সব কাঁশ, ঘাস মরে গিয়ে পুরো পাহাড়টাই নাঙ্গা ছিল। তখন উপর থেকে দুপাশের খাড়াটা স্পষ্ট বোঝা যেত। দেখা যেত কতটা খাড়া পথ ধরে হেঁটে যাচ্ছেন পরের চূড়ায়। কিন্তু এখন, এই ডিসেম্বরে ব্যাপারটা ভিন্ন — সদ্য বর্ষা পেরোন পাহাড়ে এখনও তাজা ঘাস, কাঁশ রয়েছে। ফলে দুপাশের খাড়া পতনটা দেখা যায় না। এর ইতিবাচক-নেতিবাচক দুদিকই আছে: খাড়া পতনটা না দেখা গেলে ভয়টা তৈরি হয় না, ফলে পথটা চলা সহজ হয়। কিন্তু ঘন ঘাসের কারণে পথটা অস্পষ্ট হওয়ায় ঝুঁকি হয়ে যায় মাত্রাহীন – কোথায় পা দিচ্ছেন, সেটাই বুঝতে পারছেন না; যদি ভুল জায়গায় পা পড়ে…।

যোগীর প্রথম চূড়ায় যেখানে সর্বোচ্চ দুজন কোণঠাসা হয়ে দাঁড়াতে পারবেন, সেই তুলনায় যতই পরের চূড়াগুলোর দিকে যাওয়া যায়, ততই সরু হতে থাকে শিরা। আর ঐ শিরা ধরে হাঁটাটা কী যে বিপদজনক, তা বিপদে না পড়লে কেউ বুঝবে না। প্রত্যেকটা দল ধুমসে যোগী যাচ্ছে, ধুপধাপ পাহাড়ে চড়ছে, বুকে ধুকপুকানি নিয়ে যোগী জয় করে পতাকা টানিয়ে সেলফি তুলে এসে ফেসবুকে শেয়ার দিয়ে অশেষ নেকী হাসিল করছে শ্রেফ একটা “কিন্তু”কে অগ্রাহ্য করে। ঐ “কিন্তু”টা হচ্ছে মৃত্যু। যোগী চড়ে আজ পর্যন্ত (জানুয়ারি ২০১৮) কেউ মরেননি, তাই ব্যাপারটা এখনও গোণায় ধরা হচ্ছে না; কিন্তু বিশ্বাস করুন, ঐ খাড়া অংশে কারো যদি বিন্দুমাত্র মাথাও ঘুরায়, তাঁকে বিসর্জন দিয়েই ফিরতে হবে টীমকে। আর তখন কিচ্ছু করার থাকবে না, কিচ্ছু না। আপনি ব্যক্তিগত দল নিয়ে যান কিবা বাণিজ্যিক দল নিয়েই যান, আবু বকরের গত ট্রেকের কথাগুলো পুণরুচ্চারণ করছি:

অ্যাডভেঞ্চার আর ঝুঁকির মধ্যে আকাশ পাতাল পার্থক্য। অ্যাডভেঞ্চার হচ্ছে সেই রোমাঞ্চ, যাতে যথাযথ নিরাপত্তা (সেফ্‌টি) এনশিওর করা হয় – যেমন: বাঞ্জি জাম্পিং, স্কাই ডাইভিং, স্কুবা ডাইভিং…। কিন্তু হঠাৎ দৌঁড় দিয়ে রাস্তা পার হওয়াটা অ্যাডভেঞ্চার নয় – ঝুঁকি।

আপনি যোগীর চূড়া দাপড়ে বেড়াচ্ছেন, কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়া, নিজের উপর প্রচণ্ড কনফিডেন্স নিয়ে; কিন্তু… যদি একটা “কিন্তু” ঘটে, তখন কী হবে?

…ভাবুন।

এখনও সময় আছে, ভাবুন। বেঁচে থাকতে ভাবুন। ব্যক্তিগত কিংবা বাণিজ্যিক অভিযান পরিচালনা করবার আগে ভাবুন।

ঝুঁকিপূর্ণ সেই খাড়া পথে মোহন আর ইতি আপু এগিয়ে চললেন দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ চূড়ার দিকে। যতই সামনে এগোচ্ছেন শিররেখাটা ক্রমশ সরু হচ্ছে। দ্বিতীয় চূড়াটা মোটামুটি সহজেই চলে যাওয়া যায়। কিন্তু ২নং থেকে ৩নং আর ৩নং থেকে ৪নং শিরা এতোটাই খাড়া আর সরু যে, একজন একজন করে যেতে তো হবেই, তারচেয়ে বড় কথা দাঁড়িয়ে যাওয়ার মতো আরামদায়ক কিংবা কষ্টদায়কও পথ সেটা না। একেবারে খাড়া একটা ব্লেড যেন (পুলসিরাত’ নাকি?) – ঐ ব্লেডের সাঁকো ধরে হেঁটে যাবার সময় আপনার পতন ঠেকানোর একটাই সহজ পথ — বসে পড়ুন। শিররেখার দুই দিকে দুই পা ছড়িয়ে দিন। এবার দুই হাত দিয়ে ঘষটে ঘষটে নিজের কোমরটা টেনে টেনে এগিয়ে নিন সামনের দিকে। এভাবে চলার কারণ হচ্ছে, আপনি তো আর একটা রশির উপরে হেঁটে যাওয়া সার্কাসের দড়িবাজ না।

যোগীর চূড়ায় গাইডসহ দল (ছবি: আবু বকর)
যোগীর চূড়ায় গাইডসহ দল (ছবি: আবু বকর)

জীবনকে বাজি রেখে পরের চূড়াগুলোতে এগিয়ে যাচ্ছে যখন দল, ক্লান্ত কোরেশী তখন ক্লান্তিতে শুয়ে পড়েছে প্রথম চূড়ায়। আবু বকরও উঠে পড়েছেন দলের বাকিদের সাথে যাবার জন্য। কিন্তু কোরেশী মানা করে দিয়েছে সে আর সামনে এগোবে না। কিন্তু একা একা করবেটা কী? বিশ্রামের জন্য সে একটু গা এলিয়ে দিলো পাহাড়ের উপরেই। কিন্তু যোগীর চূড়ায় শিরা ছাড়া আর কোনো জায়গা নেই। সে ঐ শিরার উপরেই শুয়ে পড়লো। প্রচণ্ড ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে গেলো কোরেশী পুলসিরাতের পুলে। ঘুমের মধ্যে যদি ও’ পাশ ফিরে, তাহলে…।

যোগী হাফং-এর চূড়ায় ভ্রমণ বাংলাদেশ দল (ছবি: লাল তুয়াই)
যোগী হাফং-এর চূড়ায় ভ্রমণ বাংলাদেশ দল (ছবি: লাল তুয়াই)

ওদিকে দল ধীরে ধীরে নিজেদের নিরাপত্তা খালি হাতে যথাসম্ভব নিশ্চিত করে একে একে ৩নং পার হয়ে ৪নং সামিটে পৌঁছেছে। সফল! যোগী হাফং চূড়ায় আরোহণ বলতে এই ৪নং চূড়ায় নিজের পদক্ষেপ রচনা করাকে বোঝায়। তাঁরা তা সফলভাবে করতে পেরেছেন এটা তৃপ্তির কথা। ইতি আপু জানেন, পর্বতারোহণ কী জিনিস। বিশাল দল রওনা করে, আর শেষে চূড়া চুমুতে পারে মুষ্টিমেয় ক’জন — আমি বলবো: those are the chosen

বাংলাদেশের পাহাড়ে চড়ার পর একটা রীতি আছে। কে এই রীতি তৈরি করেছেন, বিশ্বব্যাপী এই রীতি অনুসৃত হয় কিনা আমি জানিনা — বিশ্বভ্রহ্মাণ্ড সম্বন্ধে আমার জ্ঞান খুব সীমিত। রীতিটা হলো: উপরে ‘সামিট নোট’ লিখে নিজেদের কৃতিত্বের জানান দেয়া। রীতিটা প্রথম প্রথম এরকম শুনতাম: একটা ইট বা পাথরের নিচে কাগজে নিজেদের নাম লিখে রেখে আসা। আগে কেউ রেখে এলে, নিজেদেরটা সেখানে রেখে অন্য দলেরটা সাথে করে নিয়ে আসা। এখন অবশ্য প্লাস্টিকের বোতল মাটিতে আধেক ঢোকানো থাকে, তার মুখ খুলে তার ভিতরে কাগজ পুরে দেয়া হয়। কিন্তু আবু বকর জানালেন, রীতিটা এখন আরো খানিকটা বদলেছে: এখন আর আগের সামিট নোট নিয়ে আসা হয় না, বরং আগেরটার সাথে নিজেদের সামিট নোটটা রেখে আসা হয়।

বলাই বাহুল্য আমাদের আগে চূড়ায় চড়েছেন আগের তিনজনের দল, তাঁদের সামিট নোটটা দেখা গেল মোহনের মোবাইলে তোলা ছবিতে — তাঁরা সকাল ৭টায় বেসক্যাম্প (দলিয়ান পাড়া) থেকে যাত্রা শুরু করেন, আর সামিট করেন দুপুর ১৩:৪০। দলের সদস্যরা হলেন:

যোগী হাফং-এ আগের দলের সামিট নোট (ছবি: মোহন)
যোগী হাফং-এ আগের দলের সামিট নোট (ছবি: মোহন)
  1. Mohammad Jahirul Islam
  2. Hassan Nion
  3. Shamim Reza
  4. Ram Thang (Guide)
  5. Lal Lian Sang (Guide)

তাঁদের যে জিনিসটা আমার কাছে অপূর্ব লাগলো, তাঁদের দলের কোনো নাম নেই — তাঁরা তিনজন ঐ চাইল্ডিশ কাজ করেননি। এই জন্য আমি ব্যক্তিগতভাবে তাঁদেরকে সাধুবাদ জানাই। দেখা যায়, এ যায়, ও’ যায়, সবাই দুইতিন জন মিলে কিছু একটা কাজ (কিংবা আকাম) করে বলে এটা “তমুক ট্রেকিং ক্লাব” “অমুক অ্যাডভেঞ্চার ক্লাব”। ফেসবুকে এমন ভুরিভুরি ক্লাব আর তাদের ফেসবুক পেজ আছে, যারা ঐ একটা কাজই করেছিল, তারপর তাদের আর কোনো নাম-নিশানা নেই। এটা হয়। কিশোর বয়সে বেনামে কিংবা অন্য কারো নামের ছায়াতলে থাকতে ভালো লাগে না, একটা আহামরি (নাকি আহাম্মকি) নাম না দিলে “কাজ”কে কাজ মনে হয় না। আর সেই সব দল থেকে শুরু হয় দলাদলি, তৈরি হয় বিভক্তি। সেই বিভক্তি আমি বাঙালি জাতিকে রাজনীতির ময়দান থেকে পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্ঘ পর্যন্ত বিভাজিতই করেছে — আজও শ্রেফ দেশের জন্য আমরা সবাই একই পতাকাতলে একত্র হতে পারিনি। স্যালুট ঐ তিনজনের দলকে, নাম ছাড়াও দল হতে পারে শিক্ষাটা আমার পাঠকদেরকে দেবার জন্য।

আমাদের দলের সামিট নোট দেখে টাশকি খেলাম:

যোগী হাফং-এ ভ্রমণ বাংলাদেশ দলের সামিট নোট (ছবি: নিশাচর)
যোগী হাফং-এ ভ্রমণ বাংলাদেশ দলের সামিট নোট (ছবি: নিশাচর)
  1. Sifat Fahmida Eti
  2. Abu Bakker Siddeak
  3. Md. Mahfuzur Rahman
  4. Mahmud Shafayet Zamil
  5. (কে? কেন?)
  6. Lal Tuai (Guide)
  7. Dan Buai (Guide)

আমার দল আমাকে সম্মান করে হোক, ভালোবেসে হোক আমাকে দুটো সম্মান দিয়ে দিয়েছে একাধারে। সামিট নোট বলছে, ভ্রমণ বাংলাদেশ দল আজ অদ্য ২ ডিসেম্বর ২০১৭ তারিখে বিকেল ১৬:২০-এ যোগী আরোহণ করেছেন, তাঁদের বেসক্যাম্প থেকে যাত্রা শুরু হয়েছিল ১০:৩০। পাহাড়ের চূড়ার পথ থেকে পাহাড়ের লাথি খেয়ে ফিরে আসা আমার নামটাও তাঁরা সম্মান জানিয়ে সামিট নোটে লিখে দিয়েছেন। আর, আমি জীবনেও ভ্রমণ বাংলাদেশ দলের সাথে একটি সভাও করিনি, কোনো চাঁদা থেকে থাকলে তাও দেইনি, ভ্রমণ বাংলাদেশ আয়োজিত কোনো ভ্রমণে অংশগ্রহণও করিনি, অথচ ভ্রমণ বাংলাদেশ আমাকে আপন করে নিয়েছে। কৃতজ্ঞতা দলের প্রতি। সালাম তাঁদের সম্মানের প্রতি। কিন্তু আমি যোগী হাফং আরোহণ করিনি।

পাহাড়ে আরোহণ যদি চূড়ায় পা রাখা আর সামিট নোট লিখে দাঁত খিঁচিয়ে ছবি তোলা হয়, তাহলে গল্প এখানেই শেষ। পিকচার — দি এন্ড। আর যদি পাহাড়ে যাওয়ার অর্জনটা আপনার কাছে অন্য কিছুও হয়ে থাকে, তাহলে সেই অন্য কিছুর সন্ধান আমরা এই কাহিনীর শেষ পর্যন্ত করে যাবো, কিংবা বিয়ৌন্ড দ্যাট সিলি এন্ডিং… এখনও জ-ত্লং আরোহণ করা বাকি, আগামীকাল আমরা জ-ত্লং যাবো।

🌿

যোগী হাফং থেকে দেখা প্যানোরামিক দৃশ্য (ছবি: মোহন)
যোগী হাফং থেকে দেখা প্যানোরামিক দৃশ্য (ছবি: মোহন)

পাহাড়ে আরোহণে আমার সবচেয়ে অপূর্ব লাগে যে বিষয়টা, সেটা হলো পাহাড় থেকে পৃথিবীটাকে পায়ের তলায় দেখতে: এই দৃশ্য আমি যতবার দেখবো, খোদার কসম, উপভোগ করতে চাই। আপনি উড়োযানে বসে এই দৃশ্য হয়তো দেখবেন, কিন্তু নিজের পায়ে হেঁটে উঠে পাহাড়-চূড়ায় দাঁড়িয়ে দৃশ্যটা দেখার মধ্যে যে কী আছে, সেটা শুধু ট্রেকার ছাড়া আর কেউ বুঝবেন না। আমার সৌভাগ্য, আমাকে সেই সুযোগ কিছুটা হলেও করে দিয়েছেন মোহন আর ইতি আপু। তাঁদের তোলা ছবিতে আমি যোগী থেকে যে ধরণী দেখতে পাই, সেটা অন্যান্য সকল ভ্যালির চেয়েও অপূর্ব। কারণ আর-সব পাহাড়ের আশপাশে (আমি অবশ্য দুর্গম পাহাড়গুলোর কোনোটাতেই যাইনি) মানুষ প্রাকৃতিক বনভূমি সাফ করে জুম চাষ করেছে। ফলে পাহাড়গুলো হয় তুলনামূলক ন্যাড়া কিংবা জুমের ফসলে সাজানো। কিন্তু যোগী হাফং থেকে আশপাশটা দেখলে ঘন প্রাকৃতিক বনাঞ্চলে ঢাকা পাহাড়ের পর পাহাড় দেখা যায়। অপূর্ব সে দৃশ্য! অপূর্ব!! আমি জানি না, আমার শরীরের যে হাল হয়েছে, এজীবনে এই দৃশ্য আর কখনও স্বচক্ষে দেখা আমার পক্ষে সম্ভব হবে কিনা।

বিকেল করে পাহাড় চড়ে যে আকাম দল করেছে, তাতে তাদের ফিরতে হবে রাতে — এর একটা সুন্দর দিকও আছে: পাহাড় থেকে দেখা যাবে সূর্যাস্ত। আমাদের দল সামিট শেষ করে নামার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। কেন? তাদের না চূড়ায় গিয়ে নুডল্‌স খাওয়ার কথা? আরে রাখ্‌ তোর নুডল্‌স, রাইতের আগে পাড়ায় তো গিয়া পৌঁছি…। চতুর্থ চূড়া থেকে জুমের পথে নেমে আসাটা সহজ। কিন্তু কোরেশীকে ১নং চূড়ায় রেখে এসেছে দল; ওঁর জন্য পিছনে ফিরতে হবে দলকে। অগত্যা সবাই আবার ১নং চূড়ার পথ ধরলো।

ওদিকে কোরেশী শিরার উপরে শুয়ে আছে, ঘুমিয়ে পড়েছে। সারা দিনেও একমুঠোও ভাত না খেয়ে দেয়া ‘ভাতঘুম’। ঘুমের মধ্যেই পাশ ফিরলো কোরেশী, আর সাথে সাথে…

ঈশ্বরের অশেষ কৃপা: ঘুম ভেঙে গেলো তাঁর। নিজেকে পুলসিরাতের পুলে শুয়ে থাকা অবস্থায় আবিষ্কার করলো সে। বুঝতে পারলো আরেকটু হলেই মিয়ানমারে ওর থ্যাতলানো মাংস শকুনের খাদ্য হতো। শুয়ে থেকে উপরে আকাশটা অপূর্ব লাগলো তাঁর। এই অল্প সময়ের ঘুমে শরীরের সব ক্লান্তি ধুয়ে মুছে গেছে। দারুণ উপভোগ করছে এখন সে যোগীর চূড়া।

দল পৌঁছে গেলো কোরেশীর কাছে। সবেতে এক হয়ে এবারে নামার পথ ধরলো। সেই একই পথে, ঝিড়িপথে, ঠিক আমি যেভাবে অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে এসেছি, সেভাবেই, ঘুটঘুটে অন্ধকারে…।

আবু বকরকে বললাম, রাত হবে জেনেও আপনি হেডল্যাম্প ফিরিয়ে দেয়াটা ছিল চরম বোকামী। যদিও তাতে আমার উপকার হয়েছে, কিন্তু তবু কাজটা ঠিক করেননি। আবু বকর জানালেন, তাঁর কোমরের পাউচে ছোট আরো দুটো টর্চলাইট ছিল। যাক, তবু ছিল। তারপরও হেডল্যাম্প যথেষ্ট কাজের — অন্তত আমি ঠেকে শিখেছি।

দল নেমে আসছে: একই দৃশ্য (অবশ্য অন্ধকারকে যদি আপনি ‘দৃশ্য’ বলেন), একই অনুভূতি, একই পরিশ্রম, একই লক্ষ্য। এক সময় পাড়ার কাছাকাছি চলে এলেন তাঁরা। তখন পথে দুই কিশোরের সাথে তাঁদের দেখা। তারা একটা অজগর সাপ শিকার করেছে। ঝুড়িতে ভরে নিয়ে যাচ্ছে খাবার জন্য। অজগর এজীবনে চাক্ষুষ করাটা বিশাল ব্যাপার। তাদেরকে বলে ঝুড়ি থেকে সাপটা বের করালো দল: মাথা কেটে ইতোমধ্যেই কোথাও ফেলে দিয়েছে ওরা। বিশাল সাপ!

ছবিগুলো নিয়ে আমি Bangladesh Python Project-এর Shahriar Caesar Rahman-এর শরণাপন্ন হলাম। বাংলাদেশ পাইথন প্রোজেক্ট, ক্রিয়েটিভ কনযার্ভেশন অ্যালায়েন্সের (CCA) হয়ে, বাংলাদেশে অজগরের গায়ে রেডিও ট্রান্সমিটার লাগিয়ে তাদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে, আর দেশব্যাপী, বিশেষ করে সিলেটের লাউয়াছড়া সংরক্ষিত বনে অজগর সংরক্ষণ নিশ্চিতে কাজ করে। এছাড়া চট্টগ্রামের সীমান্তবর্তী গহীনেও তাঁরা বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে কাজ করেন। তাঁরা স্থানীয়দেরকে প্রশিক্ষণ দিয়ে প্যারাবায়োলজিস্ট তৈরি করেন, বন্যপ্রাণীর গুরুত্ব বোঝান, আর বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে উদ্বুদ্ধও করেন। CCA’র সিইও, সিজার নিশ্চিত করলেন, এটি একটি বার্মিজ পাইথন (Python bivittatus)। তাঁদের অভিজ্ঞতা থেকে জানালেন, “সংরক্ষিত বন” সত্যিকার অর্থে সংরক্ষণ করা উচিত, যেখানে শুধু বন্যপ্রাণী থাকবে আর জল ব্যবস্থাপনা থাকবে — কোনো পর্যটন হবে না। তাঁর কথা থেকে বুঝলাম: মানুষ আর অজগরের সহাবস্থানটা খুব কঠিন — তবে অসম্ভব নয়। অজগরের মজার বিষয় হচ্ছে, এরা বিষাক্ত না (neither poisonous, nor venomous)। এদের অস্ত্র হচ্ছে কন্সট্রিকশন, মানে চেপে পিষে ফেলা; তারপর গিলে খাওয়া। তাই খুব বড় আকারের না হলে এদের অনায়াসে হ্যান্ডেল করা যায়। দুঃখের বিষয় হচ্ছে, বার্মিজ পাইথন আইইউসিএন-এর লাল তালিকায় এখন “অরক্ষিত” (vulnerable) হিসেবে চিহ্নিত।

আমি নেমে আসার সময় আমার গাইডকে ব্যাঙ, মাছ ধরতে দেখে জিজ্ঞেস করেছিলাম, সাপ খান কিনা? তিনি জানালেন, সাপ খেতে ভালো না। সাপ ঠান্ডা!

🌿

ভাত খাওয়া শেষ। সারা দিনে একটা তৃপ্তির ঢেকুর তোলা গেছে। খাওয়া-দাওয়া শেষ করে হেডম্যানের পুত্রবধুকে ধন্যবাদ দিয়ে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিলাম আমরা। হেডম্যানের ঘরে যেহেতু থাকা-খাওয়া একটা প্যাকেজ হয়ে গেছে, তাই ওখানে বালিশ, কাথা-কম্বল সবই অঢেল রাখা আছে। তারই কয়েকটা নিয়ে প্যাঁচ দিয়ে দল ঘুমানোর বন্দোবস্ত করলো। আমি পা-কে আরো বেশি উষ্ণতা দেবার জন্য নিজের স্লীপিং ব্যাগটা বের করে তার ভিতরে সেঁধিয়ে গেলাম।

শুয়ে শুয়ে ভাবছি: কালকে দল জ-ত্লং যাবে। আমি হয়তো যাবো না, কিন্তু তবু আমি যেতে চাই। আরো একটা প্রশ্ন মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে: আচ্ছা, সঞ্জীব কি শেষ পর্যন্ত যেতে পেরেছিল রেমাক্রি? আগের দলটা আমাদের পাশেই ঘুমিয়ে, অথচ ওদের সাথে হাই-হ্যালোও পর্যন্ত করা হয়নি।

জোঁকের জড়িবুটি

জোঁকের কামড়গুলো, ফিরে আসার পরও আরো এক সপ্তা’ ধরে ভুগিয়েছে। প্রচুর চুলকায়। চুলকানো কোনোভাবেই ঠিক না, কারণ তাতে ঘা শুকাতে পারে না। ডাক্তার মোহনের বক্তব্য, যেকোনো এন্টি-ইচিং ঔষধ সেবন করাটা বুদ্ধিমানের কাজ। তবে বাসায় এসে বড় ফুফু’র কাছে যে জড়িবুটি পেলাম, সেটা হলো, পেঁয়াজ কেটে, কাটা মাথাটা আগুনে গরম করে নিয়ে সেই উষ্ণ পেয়াজটা যতটুকু সহ্য করা যায়, জোঁকের কামড়ে লাগালে চুলকানি উপশম হবে। তবে সেটা নৈমিত্তিকই করতে হয়েছিল।

বাতি বন্ধ করে সবাই আমরা গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলাম। ঘুমোনর আগ পর্যন্ত আমাদের প্রত্যেকেরই একাধিক জোঁকের কামড় থেকে রক্ত পড়া বন্ধ হচ্ছে না।

🌿

সকালে, শুয়ে শুয়েই আগের দলটাকে সালাম দিয়ে, দিন শুরু করলাম। গতকালকে আমাদের মুরগি জবাই করে দেবার জন্য কৃতজ্ঞতা জানালাম। রাত-বিরাতে আলো জ্বালিয়ে বিরক্তি উদ্রেকের জন্যও ক্ষমা চাইলাম। তারপর একে একে সবার সাথে পরিচয়ও হলো। আবু বকরের নাম শোনার পরে দল জানতে চাইলো, “আপনি কি পাড়ায় এসে কোনো ঝগড়া…?”

আমি আকাশ থেকে পড়লাম। আবু বকর হাসলেন; ভেঙে বললেন, না, সেই আবু বকর তিনি না।

দলের একজন আমার পরিচয়ও জেনে ফেললেন কোত্থেকে জানি, “আপনি তো বোধহয় লেখালেখি করেন?”

আমি ভয়ে ভয়ে মাথা নাড়লাম। আল্লাহই জানেন, লেখায় কী দোষ করেছি। বেচারা নেহাৎ ভদ্দরনোক, নইলে হয়তো ঝাড়িই দিয়ে বসতো: হই মিয়া, কী ছাইপাশ লেখো!

দলটা জানালো তাঁরা গতমাসের কোনো সামিট নোট পাননি। সুতরাং হয় আমি ভুল শুনেছি, নয়তো ও’ ব্যাটা গাইড গুল মেরেছে। আমারই ভুল হতে পারে।

আমাদের জ-ত্লং যাবার কথা। এবার তার প্রস্তুতি শুরু করা উচিত। কিন্তু যে কথাটা আগের কোনো লেখায়ই পাইনি, সেটা হলো:

রবিবার – ধর্মবার – বিশ্রামের দিন

দলিয়ান পাড়া একটা খ্রিষ্টান পাড়া, আর খ্রিষ্টধর্মাবলম্বীরা “রবিবার” দিনটিকে উপাসনার দিন, আর সেকারণে বিশ্রামের দিন হিসেবে পালন করেন। বাইবেলের ওল্ড টেস্টামেন্টের জেনেসিস-এ (২:২) দেখা যায়: ঈশ্বর, পৃথিবী সৃষ্টির প্রাক্কালে ৭ম দিনে বিশ্রাম নিয়েছেন (অর্থাৎ সৃষ্টিকর্ম থামিয়েছিলেন); ইহুদিরা তাই সাবাত (বিশ্রাম[-এর দিন]) পালন করেন। খ্রিষ্টীয় মধ্যযুগে বিশ্রামের দিনটি সাবাত-এর সাথে মিলেমিশে যায়। আধুনিক খ্রিষ্টানরা যিশু’র পুণরুত্থান দিবস হিসেবে রবিবার দিনটিকে ইবাদতের বা উপাসনার দিন হিসেবে বেছে নিয়েছেন। ৩২১ খ্রিষ্টাব্দের ৭ মার্চ রোমীয় সাম্রাজ্যের প্রথম খ্রিষ্টান রাজা, প্রথম কনস্ট্যান্টাইন, সূর্যপূজারীদের “সূর্য বার” (রবি বার)-কে খ্রিষ্টানদের জন্য ছুটির দিন হিসেবে ঘোষণা করেন। ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে শুক্রবার দিন একটা ছুটির দিন হিসেবে দেখা গেলেও এটা শাস্ত্রীয়ভাবে কোনো ছুটির দিন (holiday) না, তবে এটা পবিত্র দিন (Holy day) কোনো সন্দেহ নেই।

শাস্ত্র বলুক চাই না বলুক, দলিয়ান পাড়ার পাদ্রি বলেছেন, রবিবার “ধর্ম বার”, বিশ্রাম বার — সুতরাং নিজেদের জাতিধর্মত্যাগী বমরা সূর্য পশ্চিম দিকে উঠলেও নতুন আনীত ধর্মের বিধানকে এতোটা শক্তপোক্তভাবে নিয়েছে যে, ঐদিন তারা কোনোভাবেই গাইড হিসেবে যাবে না। ধর্ম পালন করা ভালো। কিন্তু সেটা আমাদের জন্য সমস্যার সৃষ্টি করলো। বিকল্প অবশ্যই অনুসন্ধান করা যায়। বিকল্প অনুসন্ধানে বেরোবার ইচ্ছে ছিল আমারও, আবু বকর সব সময়ই এরকম কাজে আমাকে পাশে পান, কিন্তু এবারে আমার পা আমাকে বিরত রাখলো। বিকল্প অনুসন্ধানে বেরোলেন নেতা আর ইতি আপু। …ব্যর্থ হয়ে ফিরলেন। আশেপাশের পাড়াগুলো যেতে রাজি, কিন্তু পরে তা সমস্যা তৈরি করবে।

সমস্যাটা সমাধান করতে পারতেন যিনি, সেই হেডম্যানকে আমরা এসে পাইনি। তিনি বান্দরবান গেছেন গতকালকেই, সেখানে থেকেছেন। হয়তো আজকে ফিরতে পারেন। কিন্তু দিন শেষে ফেরার পরে তাঁকে দিয়ে আর কোনো উপকারই হবে না। বিকল্প পরিকল্পনা আমার ছিল। আবু বকর তাতেও রাজি: আমার মোবাইলে আগের ট্রেকারদের জিপিএস ট্র্যাক নিয়ে এসেছি। মোবাইলের জিপিএস চালু করে সেই ট্র্যাক ধরে ধরে ট্রেক করে চলে গেলে জ-ত্লং সামিট করে ফেরা সম্ভব। আবু বকর তাঁর স্বভাবসিদ্ধ “ব্যাপ্পার না” ভাব নিয়ে প্রস্তুত। কিন্তু মোহন কোনোভাবেই এই ফাৎরামিতে রাজি না। জিপিএসকে সে কক্ষণোও একজন স্থানীয়’র চেয়ে বেশি নির্ভরশীল বলে মনে করে না। ভ্যাজিটেশনের জন্য সামান্য ডান আর বামের রাস্তা, ট্র্যাককে আকাশ-পাতাল বদলে দিতে পারে। কোরেশী সব সময়ই নীরব — সে খেলোয়াড় না, দর্শক। আজকে খেলা হলে সে খেলতে যেত কিনা তাও বোঝার উপায় নেই।

কী আর করা, খেলায় ইস্তফা দিয়ে দল সিদ্ধান্ত নিল: আজকের দিনটা পাহাড়ের কোলে স্থবিরতা দিবস হিসেবে পালন করলে কেমন হয়? আমি ব্যাটা ঠ্যাং ছাড়া মানুষ — যাহা সহাও, তাহাই সয়। সিদ্ধান্ত হলো, যেহেতু আজকের দিনটা শুয়ে-বসেই কাটাতে হবে, তাহলে আজকের, রেমাক্রিতে ফিরে যাবার ট্রেকটা হোক রাতে – চান্নি পসর রাইতে। আকাশে থাকবে পূর্ণিমার ভরা যৌবন, ভূমিতে থাকবে পাঁচ পদচারীর মুগ্ধতা। ভোট একটাও মাটিতে পড়লো না। এদিকে প্রথম দল আজকে চলে যাচ্ছে। তাঁরা এখান থেকে নাফা কুম যাবে, তারপর রেমাক্রি হয়ে ঢাকা ফিরে যাবে। বিদায় দিলাম আমরা তাঁদের।

দলিয়ান পাড়ায় অলস সময়
দলিয়ান পাড়ায় অলস সময়

সারাটা দিন আমরা অলস সময় কাটালাম। আমি আমার পা-কে যথাসম্ভব বিশ্রাম দিয়ে ধাতে আনার চেষ্টা করতে থাকলাম। মোহন ওর ছিঁড়ে যাওয়া জুতাটা সেলাই করতে বসলো। কোরেশী মুরব্বির মতো বসে বসে গল্প শুনছে, আর কদাচিৎ তাতে একটা দুটো পাঞ্চলাইন দিচ্ছে — অবশ্য ওর পাঞ্চলাইনগুলো না শুনলে কেউ বুঝবে না, কোরেশী যে আমুদে একজন মানুষ। ইতি আপু মাঝে মাঝে একটা-দুটা কথা বলেন, তবে সব বকবক আমি, মোহন আর আবু বকরই করে যাচ্ছি। মোহনের কথা বলার ভঙ্গিটা আবার একটু বিজ্ঞ-বিজ্ঞ টাইপের: চোখ বন্ধ করে বলে: “বকর, বকর, নারে বকর, এটা ওরকম না।” কথাটার ভাবটা হলো, আরে ব্যাটা আমি যা কইছি, এইটাই…। যদিও বেচারা অযৌক্তিক কিছু বলে না।

হেডম্যানের ঘরে বসে ঘরটাই বেশি দেখা হলো: গ্রামের মানুষের, সার্টিফিকেট টাঙিয়ে রাখার একটা বাতিক দেখা যায় – এখানেও সেটা আছে। বিভিন্ন সার্টিফিকেট টাঙিয়ে যেমন নিজেদের কৃতিত্ব জাহিরের চেষ্টা আছে, তেমনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সাথে ছবি তুলে তাও টাঙিয়ে নিজেদের প্রতিপত্তি প্রকাশের চেষ্টাও আছে। বিভিন্ন পাখি আর লতাপাতার, জলরঙে আঁকা ছবিও ঘরে টাঙানো আছে, সেখানে একটা ধনেশ পাখির ছবিও আছে। ঘরে টিভি আছে, কিন্তু ব্যাটারি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় আপাতত অকেজো। তবে হেডম্যান, পুত্র, পুত্রবধু সবাই শিক্ষিত মানুষ। সেজন্য পাড়াতে এই পর্যটনকেন্দ্রীক ব্যবস্থাপনাটা (কিংবা ব্যবসা) গুছিয়ে ফেলেছেন বেশ।

দলিয়ান পাড়ায় পাখিরা গাছ থেকে পাকা পেঁপে খাচ্ছে
দলিয়ান পাড়ায় পাখিরা গাছ থেকে পাকা পেঁপে খাচ্ছে

ঘরটা পাহাড়ের ঢালে, তাই বসে উপভোগ করবার মতো যথেষ্ট ভালো দৃশ্যপট সেখানে নেই। তবে ঐ যে পেঁপে গাছটা দেখা যাচ্ছে, ওটাতে ধরা পাকা পেঁপেটা আমাদের পেটে আর গেলো না, দু-তিনটে পাখি ওটাতে ঝুলে ঝুলে পেট কুঁদে খেয়ে চলেছে। তাই আবু বকরের নজর গেলো উঠানের জাম্বুরা গাছে। অনুমতি নিয়ে গাছে চড়ে বসলাম আমি। দুটো জাম্বুরা টুপটাপ পেড়ে নিয়ে ইতি আপু আর আমি শুরু করলাম ভর্তা, আবু বকর সেটাতে শেষ ছোঁয়া দিলেন। রসুন-পোড়া ছাড়া হলেও শরীরে ঝাঁকুনি দেয়া টক জাম্বুরা ভর্তাটা দ্রুতই গলাধঃকরণ শেষ করলাম আমরা।

দলিয়ান পাড়া হেডম্যানের ঘরের নারীমুখগুলো, মাঝখানে বসা হেডম্যানের পুত্রবধু
দলিয়ান পাড়া হেডম্যানের ঘরের নারীমুখগুলো, মাঝখানে বসা হেডম্যানের পুত্রবধু

হেডম্যানের ঘরের পিছনে একটা হাউযে পানি জমা হচ্ছে, জমা হতে হতে উপচে পড়ছে। লহ্ ঝিড়ি থেকে এখানকার ৮টা পাড়াতে ফিল্টার (GFS) করে পানি নিয়ে আসার একটা প্রকল্পের সাইনবোর্ড দেখেছিলাম যোগী যাবার সময়, এটাও হয়তো তারই অংশ। কিন্তু তা সত্ত্বেয় পাড়াবাসীকে দেখলাম ঝিড়ি থেকে পানি বয়ে নিয়ে আসতে। ব্যাপারটা কষ্টদায়ক! …হেডম্যানের টয়লেটটাকে আমি বলবো ফাইভস্টার মানের। স্থানীয় এনজিও, বিশেষ কায়দার প্যান [কোমড] বসিয়েছে টয়লেটে, যেখানে টয়লেটের ছিদ্রের মুখে একটা ঢাকনা, ফলে দুর্গন্ধ বের হতে পারে না, আর মানববর্জ্য জমা হয়ে ভার হলে টুপ করে কাত হয়ে যায় ঢাকনাটা, বর্জ্য পড়ে যায় গর্তে; আবার ঢাকনাটা স্বস্থানে ফিরে এসে বন্ধ করে দেয় মুখটা। বুদ্ধিটা দারুণ! এক ফোঁটাও দুর্গন্ধ নেই টয়লেটে।

দলিয়ান পাড়ার রেজিস্টার খাতা (ভেতরটা দেখতে ক্লিক করুন)
দলিয়ান পাড়ার রেজিস্টার খাতা

দুপুরে, রাতেরই মেনু দিয়ে খাবার শেষ করে, বিকেল ঘনিয়ে দল বেরিয়ে পড়লো রেমাক্রি’র উদ্দেশ্যে। বেরোবার আগে পাড়ার নিয়মানুযায়ী হেডম্যানের ঘরে রাখা রেজিস্টার খাতায় নিজেদের আগমনের সাক্ষ্য রেখে বেরোলাম আমরা। কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে, এই রেজিস্টার খাতাটা নতুন — এই খাতায় ২০১৪ খ্রিস্টাব্দ থেকে আগমনের তথ্য আছে। আগের রেজিস্টার খাতা অনেক খুঁজেও বের করে দিতে পারলেন না দিদি। কী আর করা, অগ্রজদের স্মৃতিটা না পাবার দুঃখ নিয়েই ফিরলাম। (নতুন রেজিস্টার খাতার পাতাগুলো দেখতে এখানে ক্লিক করুন^। পর্যটকদের মোবাইল নম্বর আর স্বাক্ষর ঝাপসা করা হয়েছে)

🌿

সন্ধ্যা ১৭:৩৩

দলিয়ান পাড়া থেকে ফেরার সময় অনেক ছবি ছিল, কিন্তু এই ছবিটা আমার খুব প্রিয় - ভাগ্যিস ক্যামেরাটা ভুল করেছিল (ছবি: স্বয়ংক্রীয়)
দলিয়ান পাড়া থেকে ফেরার সময় অনেক ছবি ছিল, কিন্তু এই ছবিটা আমার খুব প্রিয় – ভাগ্যিস ক্যামেরাটা ভুল করেছিল (ছবি: স্বয়ংক্রীয়)

আমার পা কিছুটা ধাতস্থ হয়েছে, কিন্তু গতকালকের মতোই ডান পা সোজা রেখে হাঁটতে হচ্ছে। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলে যেতে হবে ঢাকা অবধি। কোনো তাড়াহুড়া নেই, ধীরে চলো, সময়টা উপভোগ করো নীতি। এই ট্রেকের বর্ণনা আর দিবো না, শ্রেফ একটু ভাবালুতা: সূর্য অস্ত যেতেই আকাশ সাজলো তারায়। আর আশপাশ উজ্জ্বল করে চাঁদমামা নিজের সব রূপ ঢেলে দিল। সেই রূপে মুগ্ধ হয়ে আমরা সবাই নিজেদের অস্তিত্বকে ভুলে গিয়ে গত ট্রেকের মতোই মুনস্ট্রাক হয়ে ছিলাম অনেকক্ষণ। পথে উন্মুক্ত স্থানগুলোতে আমরা টর্চ ছাড়াই চাঁদের সীমাহীন আলোয় পথ দেখে চলেছি। চাঁদের গগনবিদারী আলোয় দেখা যাচ্ছিলো, কালো কালো পাহাড়গুলো কিভাবে কুয়াশার জমাট টুপি পরে ডাকছে আমাদেরকে। মোহনের অতি আলোকসংবেদী ক্যামেরা কেন গোলাকার চাঁদকে জ্বলজ্বলে সূর্য বানিয়ে দিচ্ছে, এটা নিয়ে আবু বকরের বিরাট অভিযোগ। তবে, এই ট্রেকটা কোরেশীর জন্য ছিল অসাধারণ অভিজ্ঞতা: কারণ পুরো পথটাই সে হেঁটেছে খালি পায়ে।

এই ট্রেকের বটমলাইন হলো: সেই যে ‘ক্রো’ বিড়ালটাকে আদর করেছিল মোহন, ঐ দোকানের বুড়ি মহিলাকে ইতি আপু ঐ বিজ্ঞাপন করা বয়স্ক লোকটার গার্লফ্রেন্ড ভেবেছিলেন – মনে আছে? এখন দেখা গেল, ইতি আপা গণকগিরির নতুন ব্যবসা খুলতে যাচ্ছেন শিঘ্রই: কারণ ঐ বুড়া-বুড়ি আসলে পরস্পর স্বামী-স্ত্রী। ঘটনা আরো মজারু হয়ে উঠলো, যখন ঐ বুড়া, ইতি আপু’র মোবাইল নাম্বার চেয়ে বসলো। হাসতে হাসতে গড়াগড়ি: আপা, শেষ পর্যন্ত একটা বুইড়া আপনারে টীয করলো! 😆😵

🌿

আবু বকরের, কেরোসিনচালিত মিনি স্টোভ (ছবি: মোহন)
আবু বকরের, কেরোসিনচালিত মিনি স্টোভ (ছবি: মোহন)

আমরা রেমাক্রি পৌঁছে আগের কটেজের, আগের রুমটার পাশের রুমটাই পেলাম। রেমাক্রির আগের চম্বুক পাড়াটা থেকে রেমাক্রি যে অতটা দূর সেটা যাবার দিন টেরই পাইনি আমরা, উত্তেজনায়। চম্বুক পাড়ায় সুন্দর একটা খিয়াং ঘরও যাবার সময় কুয়াশার কারণে দৃষ্টিসীমা থেকে হারিয়ে গিয়েছিল। রেমাক্রি পাড়ায় রবিবারে পর্যটক নেইই হয়তো, সবাই ঘুমিয়ে গেছে। আমাদের খাবার ব্যবস্থা কী? আর কী, নুডল্‌স। রান্না হবে কিসে? আবু বকরের পোর্টেবল স্টোভে, সঞ্জীবের খাওয়া কেরোসিন দিয়ে।

কিন্তু চুলার মালিক কোথায়?

একজন কাঠুরে কাম রং ব্যবসায়ীর কাছ থেকে পাহাড়ের টিপ্‌স-ট্রিক্‌স নিচ্ছেন। ঐ কাঠুরে কাম রং ব্যবসায়ী একটা জরুরি টিপ্‌স দিলেন:

বিচ্ছিন্নতাবাদীদের এড়িয়ে চলুন। যদি কখনো কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী কারো সাথে দেখা হয়েই যায়, তাহলে চোখ নামিয়ে চলে যাবেন। [ওদেরকে] দেখে ফেললে সমস্যা।

দুর্ধর্ষ যে ব্যাপারটা বলতে ভুলে গেছি, সেটা হলো গাইড লাল তুয়াই যোগী যাবার সময় আমাদেরকে জানিয়েছে, বিচ্ছিন্নতাবাদীরা এখন (ডিসেম্বর ২০১৭) সাকা হাফং-এ অবস্থান করছে। দলিয়ান পাড়া থেকে চাল নিয়ে গিয়ে দিয়ে এসেছে তারা ১ ডিসেম্বর। সাধু সাবধান!

কোত্থেকে দীর্ঘদেহী এক ব্যক্তি এসে আমাদের ঘরে ঢুকলো। আবু বকর ভুবন-ভুলানো হাসি হেসে তাকে বরণ করে নিলেন। সে এসেই আমাদের হেন, তেন খবর নিতে শুরু করলো। ওঁর চুলের কাটিং দেখে মনে হলো, উর্দি পড়া ইন্টেলিজেন্স নাকি? আমাদের পিছনে ফেউগিরি করে কী বের করতে চাইছে? পরে পরিচয় দিয়ে সংশয় দূর করলো বেচারা: যোগী আর জ-ত্লং আরোহণে যাচ্ছেন, একাই। ভোরে উঠে দলিয়ান যাবেন। আইটিতে ব্যবসা। যত শক্তিমত্তাই থাকুক, আর কনফিডেন্স থাকুক, রবীন্দ্রনাথ ডাক দিলেন বলেই একা একা কোনো কিছু উদ্ধার করতে যাওয়াটা কখনোই ঠিক না। এজন্যই সেনাবাহিনীতে buddy system বলে একটা কথা আছে, দলের দুজন দুজন করে মিনি দল বানিয়ে দেয়া হয় — নে, একসাথে মর

রেমাক্রিতে নুডলস রান্না করছেন শেফ মোহন, আর কাঙালের মতো তাকিয়ে আছি আমি আর আবু বকর (ছবি: ইতি আপু)
রেমাক্রিতে নুডলস রান্না করছেন শেফ মোহন, আর কাঙালের মতো তাকিয়ে আছি আমি আর আবু বকর (ছবি: ইতি আপু)

এই ব্যক্তিও যখন আবু বকরের নাম শুনে সেই ঝগড়ার বিষয়টা নিয়ে এলেন, তখন বুঝলাম, ব্যাপারটা সিরিয়াস মোড় নিয়েছে ট্রেকিং কম্যুনিটিতে। আবু বকর আবারও পরিষ্কার করলেন, সেই আবু বকর তিনি না। পরে আমিও ঘটনাটা শুনেছি ভাসাভাসা। যে ঝগড়ার ঘটনাই ঘটুক না কেন, যা-ই রটুক না কেন, কে সঠিক ছিলেন, কে বেঠিক ছিলেন — তা তো আর আমরা জানি না। কিন্তু কথাটা এখন ট্রেকিং কম্যুনিটিতে ছড়িয়ে গেছে ‘”আবু বকর” ঝগড়া করেছেন’। সেই “আবু বকর” আর এই আবু বকর যে ভিন্ন মানুষ – তা অনেকেই জানেন না। একই ট্রিপে দ্বিতীয় ব্যক্তির কাছে সংশয়টা শুনে কষ্টই হলো — আমরা ক’টা ভালো খবর এভাবে ছড়াই? (প্রসঙ্গত বলে রাখি:  আবু বকরকেও আমাদের ভ্রমণ বাংলাদেশ-এর, ইকো ট্র্যাভেলার্স-এর এই আবু বকরের জন্য প্রযোজ্য অনেক প্রশ্নও শুনতে হয়)

চুলা ধরাতে বেশ সময় গেল। তবে অবশেষে ধরলো। সেই চুলায় নুডল্‌স রেঁধে খাওয়া হলো, কিন্তু কোরেশী ঘুমিয়ে পড়েছে। আর সেই চুলায়ই কফি রেঁধে, প্লাস্টেকের বোতল কেটে তাতে পান করা হলো, তখন আমিও ঘুমিয়ে গেছি।

🌿

ভোরে প্রথম নৌকায় আমরা থানচি রওয়ানা। ব্যর্থতায় ভরা এই অভিযান দিয়ে কি কোরেশী নিজের ট্রেকার সত্তাকে কবর দিতে চাইছে! ফেরার পথে নিজের ট্রেকের ভালো প্যান্টটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বিদায় জানালো ট্রেকিংকে। ব্যর্থতার গ্লানি আমি বুঝি। এই অভিযান আমার জন্য একটা ব্যর্থ অভিযান অনেকগুলো কারণে:

  1. যোগী হাফং-এর উপর থেকে ধরণীকে পায়ের তলে ফেলা হয়নি
  2. আসার আগে পাড়াগুলো সম্পর্কে ১০১টা তথ্য সংগ্রহ করার জন্য বিশাল একটা ফর্দ আমি নিজেই চেয়ে এনেছিলাম সালেহীন আরশাদী’র থেকে। তার সিঁকিভাগ দায়িত্বও পালন করতে পারিনি আমি
  3. আসার আগে ডি-ওয়ে এক্সপেডিটর্‌স-এর আকাশ ভাইয়ের থেকেও দায়িত্ব চেয়ে নিয়েছিলাম, তাও পালন করতে পারিনি
  4. শেষের একটা দিন দলিয়ান পাড়ায় ঘরের মধ্যে শুয়ে-বসে জাবর কেটেছি, অথচ পাড়াবাসীর সাথে বসে কত তথ্যই না পাওয়া যেত। কিংবা গির্জায় বসে সার্মন শুনলেও তো লৌকিক খ্রিষ্টধর্ম সম্পর্কে নতুন কিছু জানা হতো — করিনি

যদিও পাহাড়ের চূড়ায় চড়াকেই সফলতা কিংবা ব্যর্থতার মাপকাঠি বলতে নারাজ প্রকৃত অভিযাত্রীরা। কিন্তু বিশ্বাস করাতে পারবো না, আমি এই ট্যুর থেকে আর কিছু অর্জন করি বা না করি, রেমাক্রি থেকে থানচি যাবার পথটা আমার আত্মা ভরিয়ে দিয়েছে। আমি এজীবনেও এই পথটুকুতে দেখা ঐ সৌন্দর্য্যটুকু ভুলতে পারবো না।

প্রচন্ড কুয়াশা কেটে চলেছি আমরা। পেছন থেকে সূর্য উঠছে। কুয়াশার চাদরটা ছিঁড়ে ফালাফালা করে সূর্যকীরণটা বেরিয়ে আসার ব্যর্থ চেষ্টা করছে। চলন্ত ইঞ্জিনচালিত নৌকায় বসে আমরা জল থেকে বল্‌কে বল্‌কে উঠা লু হাওয়ায় জমে যাচ্ছি। পাখিরা বেরিয়েছে নীড় থেকে একটুকু খাবারের খোঁজে। পাহাড়ের গাছগুলো রাতের কুয়াশায় স্নাত হয়ে সবুজের টুপি পরে ডাকছে হাতছানি দিয়ে। বড় পাথর এলাকায় ঢুকে যখন ইঞ্জিন বন্ধ করে দেয়া হলো, প্রকৃতির সকল নীরবতা, সজীবতা ঘিরে ধরলো আমাদেরকে। তার মাঝে ডানদিকে, কুয়াশার চাদরের উপর দিয়ে আবছায়াভাবে, উদিত সূর্যের হলদে আলোয় সিক্ত হয়ে যখন লাংলপ তং উঁকিঝুকি মেরে আমাদের দেখার চেষ্টা করছিল, আমি বলে বোঝাতে পারবো না, আমি লিখেও বোঝাতে পারবো না — ক্ষণিকের জন্য আমি যেনবা কোনো স্বর্গ দেখছিলাম।

উদিত সূর্যের সেই হলুদ আলোয় উদ্ভাসিত তিন্দুকে বড় মায়াবী লাগছিল। সেই মোহে অন্ধ হয়ে গেল আমার ক্যামেরা — বন্ধ হয়ে গেল।

বসে বসে রোমন্থন করলাম আসার আগে মাথার কোপট্রোনে ভাজা চিন্তাটা: আমরা পাহাড়ে কেন যাই? সেদিন মাশুক উর রহমান, সৈয়দ মুজতবা আলী’র “অবিশ্বাস্য” থেকে উদ্ধৃতি দিচ্ছিলেন:

…শরীরকে বাদ দিয়ে চলতে হয় – আমাকে এক নিমিষে নিয়ে যায় দূর হতে দূরে যেখানকার শেষ নীল পাহাড় বলে, ‘আরো আছে, আরো দূরের দূর আছে’; সে যেন ডাক দিয়ে বলে, তুমি মুক্ত মানুষ, তুমি ওখানে বসে আছ কী করতে – চলে এসো আমার দিকে।

থানচি ব্রিজে দাঁড়িয়ে দল - চোখ থাকবে ঐ দূরের পাহাড়ে (ছবি: মোহন)
থানচি ব্রিজে দাঁড়িয়ে দল – চোখ থাকবে ঐ দূরের পাহাড়ে (ছবি: মোহন)

বাড়তি পঠন

সহায়তা চিত্রণ

প্রচ্ছদের ছবি তুলেছেন মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান (মোহন)। বিভিন্ন তথ্যের জন্য অগ্রজদের এতো ভালোবাসা পেয়েছি, যা বলে বোঝানো যাবে না।


ইতিকথার ইতি কথা

সঞ্জীব, রেমাক্রিতে ফিরে যায়নি। সে ওখান থেকে আরেকটা পাড়া হয়ে চলে গিয়েছিল নাফা কুম-এ। সেখানে গিয়েও ঐ দলকে পায়নি। পরে একা একাই রেমাক্রি, থানচি চলে যায়। তারপর ওখান থেকে আলিকদম পগারপার। ওর ফেরার পথে তোলা সাঙ্গুর একটা ছবিও এই পর্বে রাখা হয়েছে – আফটার অল সে এই অভিযানের একজন অভিযাত্রী ছিল।

মনে আছে? থানচিতে ঘাটের যে সিঁড়িটা আমি উড়ে উড়ে নেমে গিয়েছিলাম, ফেরার পথে সেই সিঁড়িই আমি এক ধাপ এক ধাপ করেও উঠতে পারছিলাম না। হাত তুলে দোয়া তো আর ভার্চুয়াল কোনো লেখকের জন্য কোনো পাঠক করবে না; আপনাদের RIP লেখার আগে, আবারও আমি সুস্থ হয়ে পাহাড় দাঁপড়ে বেড়াতে চাই… পাহাড় ডাকছে আমায়: চলে এসো আমার দিকে।

ঈশ্বরের কাছে দয়াপ্রার্থী।

৩ thoughts on “যোগী হাফং – একটি ব্যর্থ অভিযান – ৩

    1. বই ছাপানোর খুব শখ। ব্লগার তকমাটা এখন জঙ্গী পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। লেখক হইতে মুঞ্চায় :p।
      কিন্তু বইয়ের লাইন-ঘাট বুঝি না। তাই আর বই ছাপানো হয় না। 🙁
      আপনি অভয় দিলেন। আবার চিন্তা করা যাবে মনে হচ্ছে। অনেক ধন্যবাদ ধৈর্য্য ধরে পড়ার জন্য।

মন্তব্য করুন