অফ-ট্র্যাক বান্দরবান ২০১২: সাজ-সরঞ্জাম

এই ভ্রমণের পরিকল্পনা ছিল (প্রথম পর্বে বলেছি) বগা লেক আর কিওক্রাডং পর্বত। সে হিসাবে যে পরিকল্পনা করা হয়েছিল, তা ছিল এরকম^। কিন্তু বাস্তবে সে পরিকল্পনা যে ধোপে টিকবে না এবং শেষ পর্যন্ত আমূল পরিবর্তন হয়ে গেছে, সেটা আপনারা অফ-ট্র্যাক বান্দরবান-এর ধারাবাহিক পড়তে পড়তে জেনে গেছেন। যাহোক, এই ভ্রমণের কিছু জিনিস আমাদেরকে খুব সহায়তা করেছে, আমরা মনে করি, সেগুলো আপনাদেরকেও ভবিষ্যতে সহায়তা করবে।

আমার সরঞ্জামাদি, (১) নী-ক্যাপ, (২) অ্যাংকলেট, (৩) গ্রিপওয়ালা রাবারের নমনীয় জুতা, (৪) ওডোমস ক্রিম, (৫) এলইডি টর্চলাইট (ছবি: লেখক)
আমার সরঞ্জামাদি, (১) নী-ক্যাপ, (২) অ্যাংকলেট, (৩) গ্রিপওয়ালা রাবারের নমনীয় জুতা, (৪) ওডোমস ক্রিম, (৫) এলইডি টর্চলাইট (ছবি: লেখক)

এই ভ্রমণে আমার সঙ্গী ছিল একটা এক-পেন্সিল-ব্যাটারির এলইডি টর্চ। বায়তুল মোকাররম-এর ফুটপাত থেকে কিনেছিলাম মাত্র ৳১৭০ [টাকা] দিয়ে। ঢাকা থেকে কিনে নিয়ে গিয়েছিলাম মশা নিরোধক ক্রিম ওডোমস, দাম পড়েছিল ৳১১০ [টাকা]। রুমা বাজার থেকে কিনেছিলাম রাবারের গ্রিপওয়ালা জুতা, যা পুরো ট্যুরেই ঈশ্বরের কৃপায় আমাদেরকে অসম্ভব সহায়তা করেছে। একেক জোড়ার দাম পড়েছিল ৳১১০ [টাকা]। রুমা বাজার থেকে কিনে নিয়েছিলাম নী-ক্যাপ আর অ্যাংকলেট। এগুলোর দাম মনে নেই, তবে ৳৪০-৳৮০ [টাকার] মধ্যে হবে।

আমার পরনে ছিল হাফ হাতা টি-শার্ট, যা আমাকে অনেক সহায়তা করেছে, কিন্তু সার্ভাইভাল গাইড থেকে শিখেছি, ফুলহাতা পোষাক রাফ পরিবেশের জন্য ভালো (আবুবকর কিন্তু সেরকম পোষাকই পরে ছিলেন)। আমরা পায়ে নী-ক্যাপ পরেছিলাম যাতে অতিরিক্ত হাঁটার ফলে হাঁটুর বাটিতে পড়া চাপ কিছুটা হলেও শুষে নিতে পারে তা। একইভাবে অ্যাংকলেট পরেছিলামও হাঁটুকে রক্ষা করতে। তাই থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্ট আপনার জন্য উপকারী, নী-ক্যাপ আর অ্যাংকলেট বাকিটা ঢেকে রাখবে।

জোঁক উপদ্রুত এলাকায় সাথে লবণ রাখা যেতে পারে। জোঁককে গ্রাহ্য করে চলা যায় না। তবু যদি নজরে চলে আসে লবণ ঢেলে দিলে তা ছাড়াতে সুবিধা হয় আরকি। সাপ উপদ্রুত এলাকায় অ্যাংকলেটের ভিতরে শক্ত কোনো কিছুর খোল কিংবা স্নেকগার্ড পুরে নেয়া যেতে পারে। আমাদের অবশ্য সেরকম কোনো প্রস্তুতি ছিল না।

দৈনিক ইত্তেফাক এবং দৈনিক প্রথম আলোর ভ্রমণ-উপাদানের প্রতিবেদন
পত্রিকার রিপোর্ট: যদিও “ভ্রমণসঙ্গী”র বিজ্ঞাপনই বেশি, তবু তালিকা হিসেবে মন্দ না। (সংগৃহীত)

আমার সাথে ছিল সুইস আর্মি নাইফ, ভালো এরকম একটা ছুরি আপনার অনেক প্রয়োজনে কাজে লাগবে। তবে সাথে ক্যাম্পিং নাইফ থাকা তারচেয়েও বেশি উপকারি, কারণ ক্যাম্পিং নাইফ অনেক ভারি কাজেও ব্যবহার করা যায়। সাথে একটা হাতলওয়ালা মগ রাখা শিখেছি ডিসকভারি চ্যানেলের বিয়ার গ্রীল্‌স-এর থেকে। এরকম একটা কন্টেইনার ছোট্ট অথচ রান্নাসহ অনেক কাজে লাগতে পারে।

আবুবকরের সাথে ছিল একটা স্লিপিং ব্যাগ। ছোট আকারের এরকম স্লিপিং ব্যাগ খুব বেশি ওজন হয় না অথচ বিপদে অনেক উপকারে আসে। তাছাড়া সাথে ছিল ডোম টেন্ট বা গম্বুজাকৃতির তাবু। ছোট্ট, বহনযোগ্য এজাতীয় তাবুও বেশ হালকা আর রাতযাপন কিংবা বিশ্রামে বিশেষ উপকারি।

পাহাড়ের উপযোগী একটা ব্যাগ (ব্যাক-প্যাক, Knapsack) কিনেছিলাম যাবার মাস-দশেক আগে। ওটা কিনেছিলাম বায়তুল মোকাররমের নিচতলা থেকে। দামটা ভুলে গেছি, তবে ৳১৫০০ [টাকার] মতো, যতদূর মনে পড়ছে (গায়ে যদিও 70 L বা সত্তুর লিটার লেখা আছে, কামরুলের তাতে সন্দেহ আছে)।

কামরুল আর আবুবকর, তাদের ব্যাগকে নিরাপদ রাখতে ব্যাগের গা জুড়ে বানিয়ে নিয়েছেন কাপড়ের কভার, যা রাবার দিয়ে আটকে রাখা যায় ব্যাগের গায়ে। এতে ব্যাগ থাকে আবর্জনামুক্ত, নোংরামুক্ত।

আমাদের সাথে ছিল নানান কাজের কাজী “গামছা”। ভ্রমণ বৃত্তান্তে আমি সেটা বহুবার উল্লেখ করেছি। কামরুলের পরামর্শ হলো: একাধিক গামছা সাথে রাখা উচিত।

আমরা রুমা থেকে ইয়াং বম এসোসিয়েশন-এর গাইড নিয়েছিলাম। সেখানে আছে সুমন দত্ত। আমাদের সাথে ছিল বিকাশ দত্ত আর আপেল মল্লিক।

আপেল মল্লিক, গাইড, রুমা বাজার (ছবি: রাসেল)
আপেল মল্লিক, গাইড, রুমা বাজার (ছবি: রাসেল)

পুরো ট্যুরে সাকুল্যে আমি নিয়ে গিয়েছিলাম ৳৪,৭৩৪ [টাকা] (বগা-কিওক্রাডং বাবদ)। সেখানে এই ট্যুর থেকে ফেরত এসেছে ৳৬৮৯ [টাকা]। সুতরাং খরচ হয়েছে আমার ৳৪,০৪৫ [টাকা]। কোথায় কত খরচ হয়েছে, তা আমি ধারাবাহিকটির বিভিন্ন জায়গায় উল্লেখ করেছি। তাছাড়া রুমা বাজার থেকে নৌকা ছাড়ার সময়সূচি দেখা যাবে এখানে-

রুমা বাজার থেকে নৌকা ছাড়ার সময়সূচী (ছবি: লেখক)
রুমা বাজার থেকে নৌকা ছাড়ার সময়সূচী (ছবি: লেখক)

ঢাকায় ভ্রমণের উপযোগী এসব উপকরণ বা সামগ্রী পাওয়া যায় “ভ্রমণসঙ্গী” নামক দোকানে। তবে কামরুল জানিয়েছে, সেখানে পণ্যের দাম একটু বেশি। তাই আপনাদেরকে হয় বিভিন্ন স্থান ঘুরে নিজের জিনিসটা খুঁজে এবং কিনে নিতে হতে পারে, কিংবা বিভিন্ন উপকরণ মিশিয়ে নিজের জিনিস তৈরি করে নিতে হতে পারে। তবে যা-ই বানান, মানসম্মত জিনিস বানালে বিপদে নিজেই উপকৃত হবেন।

সবচেয়ে জরুরি প্রস্তুতি হলো, পরিবেশ রক্ষার প্রস্তুতি। যেখানেই যাচ্ছেন, সেখানকার পরিবেশকে কলুষিত করা যাবে না। যেমন: বিস্কুট খেলেন, তার পলিথিন সেখানে ফেলে আসা যাবে না; কোল্ডড্রিংক্স খেলেন বা পানি খেলেন, তার বোতল সেখানে ফেলে আসা যাবে না। যদি বহন করা সম্ভব হয়, তাহলে অবশ্যই ময়লা বহন করে নিয়ে আসুন, তারপর ডাস্টবিনে ফেলুন। আর যদি বহন করা একান্তই সম্ভব না হয়, তাহলে ছুঁড়ে ফেলে না দিয়ে পুড়িয়ে ফেলুন। তবে সর্বাবস্থায়ই সঙ্গে নিয়ে আসাটা সর্বোত্তম। তাই পরিবেশ রক্ষার প্রস্তুতিটা পরিকল্পনা করার সময়ই মাথায় রাখতে হবে, আর অভিযানকালীন কাজে প্রয়োগ করতে হবে।

আরো যদি কোনো প্রশ্ন থাকে, অবশ্যই নিচে মন্তব্য করে জানান, আন্তরিকভাবে চেষ্টা করবো যথাসাধ্য উত্তর দেয়ার, যেখান থেকে দিতে পারি। আর আপনাদেরও যদি কোনো পরামর্শ থাকে, অবশ্যই শেয়ার করুন।

ভ্রমণে বেরোলে আজই বেরিয়ে পড়ুন। কাল বেরোলেও চলবে। পরশু আবার বেশি দেরি হয়ে যাবে। কারণ প্রতিদিনই খরচ বাড়ছে। আর আপনার আগে কেউ একজন আরেকটা ট্র্যাক আবিষ্কার করে ফেলছে।

-মঈনুল ইসলাম

nanodesigns

মন্তব্য করুন