মশা নিরোধক ওডোমস: পাহাড়ে-জঙ্গলে

এই পোস্টের উদ্দেশ্য কোনো প্রচার নয়, বরং পাহাড়ে-জঙ্গলে অভিযানকারীদের ব্যবহার্য একটা ফার্স্ট-এইড উপাদান সম্পর্কে জ্ঞাত করানো, এবং ভুল ধারণার অবসান করানো।

টিউবের ভিতর ওডোমস ক্রিমওডোমস (Odomos) হলো মশা নিরোধক মলমবিশেষ (mosquito repellent cream), যা ক্রিম ছাড়াও লোশন, জেল, স্প্রে হিসেবেও পাওয়া যায়। এটা কোনো ঔষধের নাম নয়, বরং ভারতের দাবুর (Dabur India Ltd.) কোম্পানীর একটা ব্র্যান্ডের নাম। ঔষধ হিসেবে একে ‘মশা নিরোধক’ গোত্রে ফেলা যায়। ওডোমস, টুথপেস্টের মতো টিউবের ভিতর বিক্রী করা হয়। এই মলম শরীরের উন্মুক্ত অংশে মেখে নিতে হয়, তাই এটি হলো বাহ্যিক ব্যবহার্য ঔষধ। এই মলম ব্যবহারে মশা থেকে নিজেকে মুক্ত রাখা যায়।

সাধারণ্যের ধারণা, এবং অতি অবশ্যই ভুল ধারণা, এই মলমে ক্ষতিকর কোনো রাসায়নিক উপাদান দেয়া আছে, যা শরীরে মাখা ঠিক নয়, এবং ঐ রাসায়নিক উপাদানের কারণেই মশা [কয়েল কিংবা অ্যারোসলের মতো] গন্ধ পেয়ে কামড়াতে আসে না, কিংবা কামড়ালে মারা যায়। কিন্তু, বাস্তবে, এই ক্রিমটি শিশুদের জন্য পর্যন্ত নিরাপদ।

আসলে, এই ক্রিমটি সাধারণ ভ্যানিশিং ক্রিমের মতোই শরীরের নাক, ঠোঁট এবং চোখ ব্যতীত অন্যান্য সকল অঙ্গে মাখা যায়। এই ক্রিমে ব্যবহৃত ক্যামিক্যাল কম্পোজিশন বা রাসায়নিক মিশ্রণ আসলে ত্বকে একটা প্রলেপের তৈরি করে, শরীরের নিজস্ব গন্ধকে ঢেকে ফেলে। মশা, মূলত শরীরের সেই গন্ধটা শুঁকেই মানুষকে সনাক্ত করে থাকে। যেহেতু মশার কাছে তখন আর শরীরের গন্ধ পৌঁছে না, তাই মশার কাছে মানুষ আসলে আক্ষরিক অর্থেই অদৃশ্য হয়ে যান। ফলে মশা কামড়ানোর জন্য কাউকে খুঁজে পায় না।

সাধারণ মশা নিরোধক, যেমন অ্যারোসল কিংবা কয়েল যেখানে কোনো আবদ্ধ অবস্থায় কার্যকর, ওডোমস সেখানে বাইরে, চলমান অবস্থায়ও খুব কার্যকর। তাই যেখানে মশার উৎপাত খুব বেশি, বিশেষ করে মশার কামড়ে ম্যালেরিয়া, মারাত্মক সেরেব্রাল ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, ফাইলেরিয়া, এন্‌সেফালাইটিস, চিকুনগুনিয়া ইত্যাদির রোগের জীবাণুবাহিত মশার উৎপাত রয়েছে, সেখানে গমনকারীদের কাছে ওডোমস বেশ জনপ্রিয়। পাহাড়ে, জঙ্গলে (যেমন: বাংলাদেশের বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, …) ট্রেক করতে যাওয়া অভিযাত্রীরা তাই ওডোমসের উপর খুব বেশি নির্ভরশীল। যদিও অতিরিক্ত নিরাপদ থাকার স্বার্থে অভিযাত্রীরা এখন অ্যান্টিবায়োটিক ঔষধ খেয়ে অভিযানে যেয়ে থাকেন।

ওডোমস, ভারতের National Integrated Medical Association (NIMA) কর্তৃক সনদপ্রাপ্ত, সম্পূর্ণ নিরাপদ, এমনকি শিশুদের জন্যও নিরাপদ মশা নিরোধক হিসেবে সমাদৃত (সনদের PDF সংস্করণটা এখানে^ দেখা যাবে)। এই ক্রিমে কোনো ঔষধ-ঔষধ গন্ধ নেই, বরং রয়েছে মিষ্টি একটা সুবাস। এছাড়া এর ক্রিমের রয়েছে আরো দুটো সংস্করণ: সিনট্রোনেলা আর অ্যালো ভেরা সমৃদ্ধ ওডোমস ন্যাচারাল্‌স, এবং গোলাপ এবং গোলাপের সুবাসসমৃদ্ধ ওডোমস ন্যাচারাল্‌স রোয। এই ক্রিম ব্যবহারে চুলকানি, খাঁজলি, বমি কিংবা সর্দি হয় না।

দাবুর কোম্পানির দাবি, এই ক্রিম ব্যবহারে ১২ ঘন্টা পর্যন্ত সুরক্ষা পাওয়া যায় (NIMA’র পরীক্ষায় অ্যানোফিলিস-এর বিরুদ্ধে ১১ ঘন্টা এবং এজিপ্টাই’র বিরুদ্ধে ৬ ঘন্টা সুরক্ষা প্রমাণিত^)। কিন্তু পাহাড়ে অভিযানকারী অভিযাত্রীদের বক্তব্য হলো, এতে বড়জোর তিন থেকে চার ঘন্টা সুরক্ষা পাওয়া যায়। এব্যাপারে আমার যুক্তি হলো: দাবুর কোম্পানি সম্ভবত স্বাভাবিক শারীরিক উষ্ণতার কথা উল্লেখ করেছে। কিন্তু অভিযানকালীন একজন অভিযাত্রীর শরীরের তাপমাত্রা অনেক বেড়ে যায়, তাছাড়া শরীরের ঘামের কারণে ক্রিমের আবরণ পাতলা হয়ে যায়। তাছাড়া অভিযানকালীন একজন অভিযাত্রীকে সাঁতার কাটা ছাড়াও পানি দিয়ে হাত-মুখ ধুতে হতে পারে।

বাংলাদেশে, ওডোমস, আশেপাশের ফার্মেসিতেই কিনতে পাওয়া যায়, কিন্তু খুব বেশি মানুষ এসম্বন্ধে জানেন না বা খুব বেশি চাহিদা নেই বলে পাড়ার ফার্মেসিগুলো এই পণ্য রাখতে আকর্ষিত হয় না। [ফেব্রুয়ারি ২০১২ অনুযায়ী] এই ক্রিমের দাম ৳১০০ (বাংলাদেশী টাকা)।

বাংলাদেশের ঔষধ কোম্পানীগুলো, আমার জানামতে, এখন (এপ্রিল ২০১২) পর্যন্ত এরকম সহজ-ব্যবহার্য এবং নিরাপদ কোনো ঔষধ তৈরি কিংবা বাজারজাত করেনি।

ওডোমস সম্পর্কে একটা সমস্যা, এর ব্যবহারকারীদের থেকে জানা যায়, তা হলো, এর টিউবের আকার-আকৃতি-নকশা পুরোপুরি টুথপেস্টের মতো। তাই কেউ কেউ ভুল করে একে টুথপেস্ট মনে করে বিপদ ঘটাতে পারেন (ঘটিয়েছেন —এমন ঘটনা থাকলে নিচে মন্তব্য অংশে শেয়ার করতে পারেন)। এই সমস্যা রোধকল্পে এর টিউবের সম্মুখভাগ ভোঁতা, গোলাকৃতি, বড় মুখ দিয়ে আটকানোর ব্যবস্থা থাকলে ভালো হতো, বাংলাদেশের [অ্যান্টিসেপ্টিক] ‘স্যাভলন’ ক্রিমে যেমনটা করা হয়েছে।

ব্যবহারবিধি:

ক্রিম অল্প একটু হাতে নিয়ে, নাক, চোখ, ঠোঁট-ব্যতীত শরীরের উন্মুক্ত অংশে ঘষে ঘষে মেখে নিতে হবে। মাথা টাক হলে মাখা যেতে পারে। মাখার পরে হাতের কব্জি ধুয়ে নেয়া যেতে পারে, যদিও কোথাও একাজটি করতে হবে বলে উল্লেখ দেখিনি। তবে এই ক্রিম মাখার পর হাত না ধুয়ে কিছু খাওয়া ঠিক হবে বলে মনে হয় না। সবসময় ব্যবহারের আগে মেয়াদোত্তির্ণের তারিখ দেখে নিন, সাধারণত এর উৎপাদনের তারিখ অনুযায়ী মোটামুটি ৫ বছর পরের কোনো সময়ে এর মেয়াদোত্তির্ণের তারিখ দেয়া থাকে। মেয়াদোত্তির্ণ ক্রিম ব্যবহার না করাই উত্তম।

ওডোমস, Odomos

মশা নিরোধক

উপাদানসমূহ: N,N-Diethyl benzamide-১২% w/w। Cream base-q.s.

প্রস্তুতকরণ লাইসেন্স নং: JK/01/06-07/106 (ভারতীয়)

-মঈনুল ইসলাম

wz.islam@gmail.com

বহিঃসংযোগ

nanodesigns

২ thoughts on “মশা নিরোধক ওডোমস: পাহাড়ে-জঙ্গলে

মন্তব্য করুন