কর্মক্লান্তি থেকে পালাতে – পাহাড়ের উল্টো পিঠে : পর্ব ৭

ডলু ঝরণা দেখিয়ে পালালো গাইড টনি (ছদ্মনাম)। আরেকটা ঝরণা দেখানোর কথা ছিল তার। অকুল পাথার থেকে উদ্ধার পাবার জন্য চারজন পাহাড়ির সঙ্গী হলাম আমরা। তাদেরকে অনুসরণ করে করে আমরা পাইন্দু খাল ছেড়ে উত্তর দিকের পাহাড়ে চড়েছি। কারা এরা, জানি না। উপরে উঠছি, তো উঠছিই। পথ আর ফুরায় না। লক্ষণ দেখে আমার মনে উঁকি দিলো একটা সন্দেহ। আরো কিছুক্ষণ মনে ভাজার পরে কথাটা মোহনকে বললাম।

মোহন দেখলাম ব্যাপারটা জানে না।

তারপর কামরুলের সেই বিখ্যাত গালি দেয়া ডায়লগটা ওকে বললাম, আমার সন্দেহ, আমরা একটা বম পাড়ার দিকে এগোচ্ছি। কামরুল শিখিয়েছিল, বমরা অনেক উঁচুতে থাকে। কথাটা, পাহাড়ে উঠার কষ্ট থেকে মনের সমস্ত ঝাল মিটিয়ে, সে একটা গালি দিয়ে বলেছিল।

মোহন বললো, যাক অন্তত একটা শান্তি, যতটা উঠছি, লস হচ্ছে না।

কষ্টের মাঝেও হাসলাম আমি। আসলেই, কিছু কিছু পাহাড়ে উঠার পথ হয়: উঠা, আবার নামা – উঠা, আবার নামা। কিন্তু এই পথটা অধিকাংশ জায়গাতেই উঠার পথে, নামছে না বললেই হয়। যতটুকু উঠছি, লাভের খাতায়ই যোগ হচ্ছে।

উঠার পথ যখন মনে হচ্ছিল আর কখনও ফুরাবেই না, তখনই হঠাৎ সামনে পাহাড় চূড়ায় সবুজ টিনের একটা ঘর চোখে পড়লো। বুঝলাম এটা একটা স্কুলঘর। আমরা পাহাড়ের উপর, পরিচ্ছন্ন একটা পাড়াতে উঠে এসেছি। ঐ যে দূরে, পাড়ার মাঝখানে আবু বকরকে দেখা যাচ্ছে। এগিয়ে গেলাম। কী হলো?

সামনে, দূরে আবু বকরকে দেখা যাচ্ছে - নিশাচর
সামনে, দূরে আবু বকরকে দেখা যাচ্ছে

আবু বকর জানালেন, কয়েকটা ঘরে খোঁজ নিয়েছেন তারা, খাওয়ার উপযোগী কোনো ফল পাওয়া যায়নি। সম্ভবত বিক্রী করে দিয়েছে ওরা। ঐ লোক (পথপ্রদর্শক) ঘরে গেছে, ওর ঘরে আছে কিনা দেখতে।

জিরিয়ে নিতে ইচ্ছে করছে। মোহন ওর ভারি ব্যাগটা নামিয়ে রেখেছে। হ্যাট মাথায় দিয়ে একজন লোক হেঁটে যাচ্ছিলেন পাশ দিয়ে, তাঁকে থামালাম। নাম ডনি। তাঁর কাছে জানতে চাইলাম পাড়ার বৃত্তান্ত, এবং আমি যে সন্দেহের কথা জানিয়েছিলাম মোহনকে – সেটাই ঠিক:

জুরভারং পাড়া – রুমা উপজেলার ১নং পাইন্দু ইউনিয়নের, ৪নং ওয়ার্ড, ২৫২নং খমংখ্যং মৌজার একটি পাড়া। গুগল ম্যাপ্‌স-এ এখন (জানুয়ারি ২০১৭) এই পাড়াটিই ভুলভাবে “মহাজন পাড়া” নামে উল্লেখ আছে। ভৌগোলিক স্থানাংক: 22.11381, 92.40416। (হালনাগাদ ২৩ জুলাই ২০১৭: যে উইকিপিডিয়া নিবন্ধের ভিত্তিতে^ “মহাজন পাড়া” নামটা ওখানে বসে আছে, লবিং করায়^ সেখানে পরিবর্তন এসেছে। আশা করি শিঘ্রই “জুরভারং পাড়া” স্থান পাবে গুগল ম্যাপ্‌স-এ) কারবারির নাম: রউনেম। এটি একটি বম পাড়া। অন্যান্য বম পাড়ার মতো এরাও খ্রিষ্টধর্ম চর্চা করে। পাইন্দু ইউনিয়ন তথ্য বাতায়নমতে, পাড়ায় দুটি গির্জা রয়েছে: জুরভারং পাড়া গির্জা এবং জুরভারং পাড়া ইসিজি গির্জা (ECG – Enlightened Christian Gathering)। পাড়াটা মাঝারি আকারের। পাড়ার ভিতরের দিকে, একটু নিচে একটা ছোট ঝিড়ি আছে, সেখান থেকে তারা খাবার পানি সংগ্রহ করেন।

জুরভারং পাড়ায় আমরা যখন, তখন নিম্নচাপের বৃষ্টির মেঘেরা হারিয়ে গেছে। শরৎকালের মতো সূর্যের ফকফকা আলো, আকাশে সাদা মেঘেদের আনাগোনা, আর শুভ্র, পরিচ্ছন্ন পাড়াটা সেই আলোতে অপূর্ব লাগছিল। পাড়ায় অনেক তেঁতুল গাছ, তেঁতুল ঝুলে আছে অগণিত। এর মধ্যেই ঐ পাহাড়ি আমাদেরকে সাদরে তার ঘরে আশ্রয় দিয়েছে, আমাদেরকে মেহমান করে নিয়েছে সে – ফল খাওয়ার দাওয়াত। এই যাত্রা পাহাড়ে এই প্রথম পাহাড়ি আপ্যায়নের দেখা পেলাম – পাহাড়ের উল্টো পিঠ দেখতে দেখতে মুষড়ে পড়া আমরা আবার যেন পাহাড়েই ফিরে এলাম। প্রশান্তির পাহাড়ে…

এটা হলো ভান লাল দুহ বম-এর ঘর, আর এ হলো তাঁরই বড় ছেলে। ঘরে তার গিন্নী আছেন, আছে ছোট একটা বাচ্চাও। আমরা জুতা, নীক্যাপ, অ্যাংকলেট খুলে বাইরেই বসলাম। ময়লা না শুকানো পর্যন্ত ভিতরে ঢুকলে ঘরটা নোংরা হবে। কিন্তু বারবার সে আমাদেরকে ভিতরে বসার কথা বলছিল। আমরাই ইচ্ছে করে বারান্দায় বসেছি একটু শুকিয়ে তারপর ভিতরে ঢুকতে। ওখানেই আমাদেরকে কমলা আর কলা দিয়ে আপ্যায়ন করলো ছেলেটা।

ভান লাল দুহ বম-এর বড় ছেলের সাথে আবু বকর - নিশাচর
ভান লাল দুহ বম-এর বড় ছেলের সাথে আবু বকর

আবু বকর, নেতার মতো, ভিতরে বসে তার থেকে পরবর্তি গন্তব্য সম্পর্কে ধারণা নিয়ে নিচ্ছিলেন। কথায় কথায়ই এক পর্যায়ে, তার ঘরে খাওয়া যাবে কিনা এব্যাপারে আগ্রহ জানালেন। সে তার স্ত্রীর সাথে কথা বলে আমাদেরকে মেহমান করে নিতে রাজি হওয়াতে আমরা একটু গা এলিয়ে বসলাম। দুপুরের খাবার এখানেই হবে ইনশাল্লাহ। কিন্তু আমাদের চাহিদামতো, ও’ বেচারা সারা পাড়া খুঁজেও একটাও মুরগি জোগাড় করতে পারলো না, কারণ সব ঘরের লোকই জুমে চলে গেছেন, দায়িত্বশীল কাউকেই পায়নি সে। তো মুরগি ছাড়াই দুপুরের খাবার খেতে হবে আমাদেরকে। তাতে কারোই কোনো সমস্যা নেই – খাবার যে পাওয়া গেছে, এটাইতো বেশি।

খাবার রেডি হতে হতে হাতে কিছুটা সময় আছে। আমরা গোসল করে নিতে চাইলাম। ব্যাগ ওখানে রেখেই নিজেদের কাপড়-চোপড়, গামছা নিয়ে গোসল করতে চললাম। ওদের দেখিয়ে দেয়া পথে পাড়া থেকে সামান্য একটু নামলে একটা ঝিড়ি আছে, ওখানেই একটা গর্তে পানি এসে জমছে, তার পাশে বসে গোসল সারতে হবে। কে যেন একটা মগ নিয়ে এসেছে আসার সময়, ওটা দিয়ে পানি তুলে তুলে গোসল করতে হবে। আমরা, একটু গা এলিয়েই বলা যায়, গোসল করলাম। অনেক খোশগল্পও হলো আমাদের মধ্যে। আমাদের খোশগল্পে প্রজাপতিরাও সামিল হলো।

কাপড়-চোপড় পাল্টে নিচ্ছি এমন সময় দেখি একটা পিচ্চি ছেলে এসেছে খাবার পানি নিতে। হাতে একটা জগ আর একটা মগ। আমরা যেখানে বসে গোসল করেছি, তার একটু উপরে একটা খাঁজের মধ্যে সে মগটা ডোবাচ্ছে, আর পানি নিয়ে জগে ভরছে। এগিয়ে গিয়ে দেখি, দারুণ ব্যাপার। পাহাড় থেকে নিংড়ে পড়া পানি চুইয়ে চুইয়ে জমছে ছোট্ট একটা গর্তে, পাহাড়ের খাঁজে – যেনবা একটা বেসিন। ওখান থেকেই খাবারের পানি সংগ্রহ করছে ছেলেটা।

গোসল শেষে ঘরে ফিরে যোহরের নামায শেষ করলাম আমরা। আমাদেরকে নামাযের প্রস্তুতি নিতে দেখে একটু তটস্থ হয়ে গেলো এঘরের বড় ছেলে। কিভাবে হেল্প করা যায় ব্যতিব্যস্ত হয়ে গেলো। আমরা আড়ম্বরহীনভাবে ক্যাম্পিং ম্যাটটা বিছিয়ে নামাযে দাঁড়িয়ে গেলাম। নামায শেষে খাবারের অপেক্ষা করতে করতে একটু পিঠ সটান করে শুয়ে থাকলাম অনেকেই – শুয়ে শুয়ে কথা বলছি আমরা।

ঘরটা তৈরি করেছেন ওর বাবা ভান লাল দুহ বম। বিশাল বিশাল গাছ কেটে এই পাহাড়ের উপর এনে তোলা চাট্টিখানি কথা নয়। আবার মেঝেতে বিশাল বিশাল বাঁশ ফালি করে পাটাতন দেয়া। ঘরের মধ্যে একটা কালো রঙের মশারি টাঙানো। কালো মশারির ভিতরে কিছুই দেখা যায় না। এই ঘরের এই একটাই মূল ঘর, ঘরের সব বাসিন্দা এই এক ঘরেই থাকেন। সুতরাং নিজেদের গোপনীয়তার এই ব্যবস্থা।

তখনই আবারও সামনের পথের ব্যাপারে কথা উঠলো, আমরা ঢাকা ফেরার পথপরিক্রমা জানালাম। কিভাবে কিভাবে যাওয়া যাবে তার বৃত্তান্ত বলতে থাকলো বড় ছেলে। আমি উঠে বসে নোট নিচ্ছি। আবু বকর বললেন, ওর কাছে দেন। আমি নোটপ্যাড আর পেনসিলটা এগিয়ে দিলাম ওর দিকে। সে সাদা পাতায় দাগ টেনে টেনে জুরভারং পাড়া থেকে পরবর্তি পথপরিক্রমাটা এঁকে দিলো। আমি ওটা নিয়ে পাড়া আর পয়েন্ট অফ ইন্টারেস্টগুলোর নাম লিখে নিলাম।

বম ভাষায় বাইবেল (ক্যামেরা সহায়তায়: তানভির)
বম ভাষায় বাইবেল (ক্যামেরা সহায়তায়: তানভির)

এদিকে চেয়ারের উপর একটা বই দেখে তানভির এনে উল্টাতে দেখি ওটা একটা বাইবেল। রোমীয় হরফে লেখা। কিন্তু ভাষাটা ইংরেজি না। “The Bible” কথাটা এভাবে লেখা:

THU TLUNGLÎ

দৈবচয়নে (র‍্যান্ডমলি) ভিতরের দুটো পাতার ছবি তুলে নিলাম তানভিরের মোবাইলে। ওল্ড টেস্টামেন্টের (পুরোন নিয়ম) লেভিটিকাস (লেবীয় পুস্তক)-এর ১৭-১৯ অধ্যায় দেখা যাবে ছবিটাতে। পাতার মাঝখানে তার বাবার চশমা রাখা। ভাষাবিজ্ঞানীদের জ্ঞাতার্থে আমি ১৯ অধ্যায়ের দুটো স্টানজা উদ্ধৃত করছি মূল হিব্রু, অনুবাদকৃত ইংরেজি, বম আর বাংলা ভাষায়:

ছত্র হিব্রু ইংরেজি বম বাংলা
১৯:০১ וַיְדַבֵּ֥ר יְהוָ֖ה אֶל־ מֹשֶׁ֥ה לֵּאמֹֽר And the LORD spake unto Moses, saying, LALPA nih Mosi chu প্রভু মোশিকে বললেন,
১৯:০৪ אַל־ תִּפְנוּ֙ אֶל־ הָ֣אֱלִילִ֔ים וֵֽאלֹהֵי֙ מַסֵּכָ֔ה לֹ֥א תַעֲשׂ֖וּ לָכֶ֑ם אֲנִ֖י יְהוָ֥ה אֱלֹהֵיכֶֽם׃ Turn ye not unto idols, nor make to yourselves molten gods: I
am the LORD your God.
“Hawng ka kaltâk lah u le, milem sawnh lah u, Kei hi LALPA nan Pathian chu ka si. “মূর্ত্তি পূজো করবে না। তোমাদের নিজেদের জন্য গলিত ধাতু দিয়ে দেবতার মূর্ত্তি তৈরী করবে না। আমি প্রভু তোমাদের ঈশ্বর!
সারণী: বাইবেলের লেবীয় পুস্তকের ১৯ অধ্যায়ের ১ এবং ৪, হিব্রু, ইংরেজি, বম আর বাংলা ভাষায়

বাইবেল রেখে, ম্যাপটা সযত্নে গুছিয়ে রেখে দিলাম। ততক্ষণে খাবার প্রস্তুত। খাবার আমাদের সামনে চলে এলো। গরম গরম জুমের চালের ভাত, মিষ্টি কুমড়ার তরকারি আর ডাল। এবং সেইদিন আমার একটা ইতিহাস রচিত হলো-

কুমড়ার তরকারি পাতে নিয়ে দেখি, শুঁটকি দিয়ে রাঁধা। হালাল জিনিসের মধ্যে শুঁটকি জিনিসটা আমি দুই চক্ষে দেখতে আর দুই নাসিকায় চাখতে পারি না। কিন্তু আজকে ফাঁদে পড়লাম, এটা সার্ভাইভাল পরিস্থিতি। যা পাবে, তা খাবে। চিন্তা করলাম, খেতেই হবে। কিন্তু নাকের কাছে নিতেই দুর্গন্ধটা আমায় আবার কষ্ট দিলো। যারা শুঁটকি খান তারা আমার কথায় বিরক্ত হতে পারেন, কিন্তু যারা খায় না, তাদের কাছে ব্যাপারটা এরকমই। তবু খেয়ে নেয়ার উদ্যোগই নিলাম। কিন্তু শুকিয়ে শক্ত হয়ে যাওয়া কাটার জন্য ঐ জিনিস ছাড়াই তরকারিটা খেতে ভালো লাগছিল। তাই শুঁটকিগুলো পাতের পাশে রেখে তরকারিটা খেয়ে নিলাম ডালের সাথে। ডালটা এতোটাই ভালো হয়েছিল, রীতিমতো কাটতি ফেলে দিলাম বলা যায়। মোহন তো শুঁটকি পেয়ে আর কোনোদিকে তাকানোর দরকার নেই, গপাগপ গিলছে – শুঁটকি খুব পছন্দ তার। আমার গিন্নী, মা শত চেষ্টা করেও যে আমাকে শুঁটকি খাওয়াতে পারেননি, সেই আমাকে শুঁটকি খাইয়ে দিল পাহাড় – এটা একটা ইতিহাস। ইতিহাস না? 😉

ইতিহাস গড়ে নিজেদের জিনিসপত্তর গুছিয়ে কিছুক্ষণ জিরিয়ে নিলাম আমরা। কিছুক্ষণের মধ্যেই চলে এলো এ ঘরের ছোট ছেলে। আমরা তারই জন্য অপেক্ষা করছিলাম। আবু বকর, বড় ভাইয়ের সাথে কথা বলে যে পরিকল্পনা করেছেন তা এরকম: আমরা এখন দ্বিতীয় ঝরণাটা দেখতে যাবো, আর রাতে থাকবো এদেরই একটা জুম ঘরে। পরদিন আমরা ওখান থেকে ঢাকার পথ ধরবো ইনশাল্লাহ, কারণ পরশু অবশ্যই, ডাক্তার মোহনকে হাজিরা দিতে হবে হাসপাতালে।

বিকাল ৩:৩০

কিছুক্ষণ জিরিয়ে আমরা বিদায় নিলাম ভান লাল দুহ বম-এর ঘর থেকে। এই পাড়া নতুন কোনো পাড়া না। আরো অনেক ট্রেকারই এখানে এসেছেন আগে। তবু এরা এখনও টাকার পিশাচ হয়নি – এটা আশাবাদ। আমরাও মেহমানের মতোই থাকলাম, টাকা ঢাললাম না। আবু বকর, বেরোবার সময় বাচ্চাটার হাতে সামান্য কিছু টাকা দিয়ে এলেন শুভেচ্ছাস্বরূপ। আবু বকর, আমার পাহাড়গুরু – অনর্থ করবার মতো টাকা ঢালবেন না এই বিশ্বাস আমার আছে। বেরোবার সময় এঘরের বড় ছেলে, আর ছোট বাচ্চাকে কোলে নিয়ে দোলনায় বসা তাঁর স্ত্রী’র একটা ছবি তুলতে চাইলাম, বৌদি মানা করায় তুললাম না। বেরিয়ে পড়লাম পড়ন্ত রোদে, বাইরে… জুমঘরের উদ্দেশ্যে। পথ দেখাচ্ছে এঘরের ছোট ছেলে, আলম বম। আলম চট্টগ্রামে থাকে, সেখানে সে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করছে।

রাস্তাটা গাড়ি চলার মতো চওড়া – পাড়ার প্রধান রাস্তা মনে হয়। কিছুদূরে এগিয়ে বামে চলে গেল। আরো কিছুদূর এগিয়ে বেড়া পার হয়ে যেতে হয়। পার হয়ে গেটটা আবার যথাস্থানে বসিয়ে রেখে এগোলাম আমরা। বিকেলের পড়ন্ত রোদটা মিষ্টি। খুব ভালো লাগছে হাঁটতে। পাহাড়ের গা বেয়ে চলা আঁকাবাঁকা পথ মাড়িয়ে আলমের দেখানো পথে চলছে দল। পাহাড়ে, অধিকাংশ জায়গায় কলার বাগান চোখে পড়ছে। বেশ অনেক দূর পথ পাড়ি দিলাম আমরা। একসময় সামনে দেখি একটা পাকা ব্রিজ। কিন্তু ব্রিজে উঠার পথটা মাটি দিয়ে জোড়া না, বরং দুই বাঁশের মধ্যে পাটাতন সেঁটে সেঁটে মইয়ের মতো পথ করা হয়েছে। এবং সেখানেই ওভার কনফিডেন্সের ধাক্কাটা খেলাম…

উঠলাম সহজেই। এগুলো তা আমি পারিই। কোনো ব্যাপার হলো? নামার সময়ও… হুহ! ধুর, কোনো ব্যাপা…

ধুপ!

আমি প্রপাতধরণীতল। আবু বকর কিছুটা এগিয়ে গিয়েছিলেন, উপর থেকে ফিরে তাকালেন। তানভির, মোহন সবাই তটস্থ হয়ে গেলো। আমি উঠে দাঁড়ালাম। ব্যাথা সামান্য পেয়েছি, তার থেকে বেশি পেয়েছি শিক্ষা। হাতে ক্যামেরা ছিল, ভাগ্য ভালো কোথাও আঘাত আমিও পাইনি, ক্যামেরাও না। বেঁচে গেছি এবার। ওভার কনফিডেন্স ইয অ্যা কিলার! আই রিপীট, কিলার!

শুকনা জায়গায় আছাড় খাওয়া দেখে দলের কেউ মিটিমিটি হেসেছিল কিনা খেয়াল করিনি। হাসাইতো উচিত। ব্যাটা ধাড়ি বুইড়া, এট্টুক জায়গা নামতে পারোস না, আসছিস ট্রেকে…

জিপিএস ট্র্যাক থেকে দেখলাম মোটামুটি দেড় কিলোমিটার এসেছি আমরা, একটা কলা বাগানের ভিতরে অনুচ্চ টিলায় পেলাম জুমঘরটা। আমি, আগে কখনও জুমঘরে থাকিনি। ছোট ছোট বিশ্রামঘরকে আমি জুমঘর বলেই জানতাম। আজকে এই বড়সড় জুমঘরটা দেখে একটু অবাকই হলাম। আলমকে বললাম, আপনার জুমঘরটা বেশ বড়! আমার কথায় আবু বকর আর মোহনের চেহারায় কোনো অভিব্যক্তি নেই। বুঝে নিলাম মৌন বার্তাটা – আমি জুমঘর বিষয়ে অজ্ঞ – জুমঘর এরকমই হয়।

জুমঘরটা দেখে আবু বকর খুব একটা খুশি না। একে তো এই পাহাড়টা অনুচ্চ, তাই আশপাশ কিছুই দেখা যাচ্ছে না, বাতাসও ঠিকমতো আসা-যাওয়া করতে পারবে না ঘরটাতে। এটাকে খোলামেলা একটা স্থানে থাকা জুমঘর কল্পনা করে বেচারা একটু আশাহতই হয়েছেন। এছাড়াও, জুমঘরটাতে দুই দিকে মাত্র বাঁশের দেয়াল, বাকি দুই দিক খোলা। এটা সাধারণত দেখা যায় না। কারণ জুমঘরে জুমের ফসল (ধান, আদা, ভুট্টা, কলা ইত্যাদি) তুলে জমা করা হয়, ধান শুকানো হয়। বৃষ্টি হলে সেই ফসল যাতে নষ্ট না হয়, তাই জুমঘরগুলোতে দেয়াল টানা থাকে, আবার ছোট্ট বারান্দাও থাকে। আলম জানালো, বাতাসের জন্যই তার ভাই এটাতে দুদিক খোলা রেখেছেন। আবু বকরের মতে, এটা কামের কথা না। ফসল ভিজে গেলে বাতাস ধুয়ে পানি খাবে নাকি!

যাহোক, আমরা এখানে ক্যাম্প করলাম। একটু জিরিয়ে নিচ্ছি, তারপর বেরিয়ে পড়বো পরের ঝরণাটা দেখতে…। তানভির জানালো সে যাবে না। পাহাড়ে এসে অলস সময় পার করার কোনো মানেই হয় না। আমি তো যাবোই ইনশাল্লাহ। কিন্তু মশার উপদ্রবে বসে থাকবে কিভাবে তানভির? তাই ওকে ওডোমসটা বের করে দিয়ে গেলাম। খালি গায়ে বসতে নিষেধ করলাম।

বিকেল ৪:৩০

আমরা ট্রেকে নেমেছি। পরের ঝরণাটার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েছি আমরা। পথ দেখাচ্ছে আলম বম; ওর পরনে হাফ প্যান্ট, পায়ে মোজা আর প্লাস্টিক/রাবারের ফিতা-বাঁধা-কেড্‌স, ফুলহাতা টিশার্ট, গলায় গামছা। একটু প্যাঁচপ্যাঁচে কাদা মাড়িয়ে ঝিড়িতে নামলাম। তারপর ঝিড়ি ধরে চলা শুরু – সব ঝরণার ক্ষেত্রেই যা হয়…

ঝিড়িতে থাকা পাথরগুলোতে শ্যাওলা ধরা। পানির পরিমাণও কম। দুই/তিন দিনের বৃষ্টি ঢল নেমে যাওয়ায় সময়ানুগ ঝিড়িগুলো যেই-সেইই হয়ে গেছে। পানির পরিমাণ কম দেখে বালি আর পাথর বেরিয়ে আছে। হাঁটা যাচ্ছে সহজে। পাহাড়ে যারা যান, তারা পাহাড়ে চলার দুটো মানদন্ড জানেন: ১. পাহাড়ি দূরত্ব, আর ২. বাঙালি দূরত্ব। পাহাড়িরা যেটাকে ১ ঘন্টার পথ বলেন, আসলে বাঙালি হিসাবে সেটা দেড় ঘন্টার পথ। অর্থাৎ, সোজা বাংলায় তাদের সাথে চলার গতিতে আপনি কখনও পারবেন না।

আমি তাই আলমের সাথে সাথে থাকলাম। ক্যামেরাটা হাতে, ভিডিও শুরু করলাম। ঠিক করেছি, ভিডিও করে করে হাঁটবো। আলম একটু ধিরেস্থিরেই এগোচ্ছে। আমিও ভিডিও করে করে এগোচ্ছি। পর্দায় নজর, মাঝে মাঝে রাস্তায়… থুক্কু, ঝিড়িতে নজর দেই। (এখন জিপিএস দেখে বলছি: আমাদের অবস্থান তখন সমুদ্রসমতল থেকে ৩৭৪ ফুট উঁচুতে)।

সামনে এগিয়ে বুঝলাম, এদিকে সচরাচর কেউ চলাচল করে না। এবং, এই তিনদিনের টানা বৃষ্টিতেই হোক, বা গেল বর্ষার তাণ্ডবেই হোক ঝিড়িটা রীতিমতো গাছেদের শ্বশান হয়ে আছে। এখানে গাছ পড়ে আছে তো ওখানে আরেকটা। কোথাও দেখেই বোঝা যাচ্ছে, গাছটা ঝিড়ির হড়কা বানে হোক কিংবা টানা ঢলে হোক, উজান থেকে এনে ফেলেছে। কোথাও আবার পাড়ের পাহাড়ধ্বসে গাছ পড়েছে।

এখানে পথ কোথায় আন্দাজ করতে পারেন? অথচ এটাই পথ
এখানে পথ কোথায় আন্দাজ করতে পারেন? অথচ এটাই পথ

আলম হাত দিয়ে ডাল ভাঙছে, গাছের নিচ দিয়ে ঝুঁকে পার হয়ে এগোচ্ছে, আমি চেষ্টা করছি ক্যামেরা চালু রেখেই সেভাবে পার হতে। অধিকাংশ জায়গায়ই পারছি, যেখানে ঝুঁকি মনে হচ্ছে, ক্যামেরা বন্ধ করে এগোচ্ছি। কোথাও পাথরের উপর দিয়ে, কোথাও পড়ে থাকা গাছের নিচ দিয়ে, কোথাও পাতার ফাঁক দিয়ে, কোথাও পড়ে থাকা গাছের উপর দিয়ে…। কোথাও কোথাও বাঁশ এমনভাবে পড়ে আছে, ভেঙে হোক কিবা নুয়ে হোক, দেখে বোঝাই যাচ্ছে না, এদিকে কি আদৌ কোনো পথ আছে কি নেই। আলম এগিয়ে গিয়ে পাতা আর বাঁশের ফাঁক দিয়ে গলে না এগোন পর্যন্ত বোঝাই দায় ওদিকে সামনে এগোন যাবে। তবে ঝিড়িতে পানি খুব কম। তার উপর বড় বড় পাথরের নিচে কোথাও কোথাও পানিও দেখা যাচ্ছে না। ঝরণাটা যে আহামরি হবে না, তা কিছুটা বোঝা যাচ্ছে।

আলম তো এগিয়েই চলেছে। আমিও তাকে অনুসরণ করেই চলেছি। পেছনে কেউ আছে কি নেই, সেই খেয়াল আমার নেই। আবু বকর আর মোহন যে বেশ অনেকক্ষণ থেকেই আমাদের থেকে অনেকটা পিছিয়ে পড়েছেন, সেটা আমি কিংবা আলম কেউই খেয়াল করিনি। আমি ভিডিও করে করে এগোতে মশগুল।

একটা ক্যাসকেড ভূমি ঝরণায় এসে পৌঁছলাম। এই নামটা আমার দেয়া। অর্থাৎ ঝিরি মেঝেটা এই জায়গায় পাথুরে, আর সেই পাথরের উপর দিয়ে স্বচ্ছ পানি কলকল করে এসে নামছে তার নিচের ধাপে, সেই পানি তার নিচের ধাপে… এরকম জায়গা আমার খুব প্রিয়। মালিখোলা ঝরণায়ও পেয়েছিলাম। এরকম পানি যাবার পথগুলো পিচ্ছিল মনে হয়, আসলে মোটেই তা নয়। অনবরত পানি যায় বলে শ্যাওলা জমতে পারে না। একটু এগোতে বামদিক থেকে পড়ছে ছোট্ট একটা ঝরণা। এরকম কত শত ঝরণা মিলে এসে এসব ঝিড়িতে – ভাবতেই বিষ্ময় জাগে।

আলম এগিয়েই চলেছে। পথ আর শেষ হয় না। ঝরণাও আসে না। এদিকে সন্ধ্যা হই হই। ঝিড়িতে, পাহাড়ের খাঁজে অন্ধকার আরো আগে পড়বে। সূর্যের সরাসরি আলোতো নেইই বরং প্রতিফলিত আলো যা আছে, তাও কমে আসছে। এতো ভিতরে ঢুকছি, পরে অন্ধকারে ফিরতে যদি না পারি? কিন্তু আর কত দূর!!

ঝরণার পথে উপড়ে পড়া গাছের উপর আলম বম। এই গাছের নিচ দিয়ে যেতে হবে...
ঝরণার পথে উপড়ে পড়া গাছের উপর আলম বম। এই গাছের নিচ দিয়ে যেতে হবে…

একটা পর্যায়ে বেশ পিছন থেকে আবু বকরের গলা শুনলাম, চিৎকার করছেন, ন-য়-ও-ন! আমিও চিৎকার করে জবাব দিলাম যে, সামনেই আছি। আমার আসলে এভাবে অনবরত হাঁটতে থাকা উচিত হয়নি। পিছনে সবাই আসছে কিনা দেখা উচিত ছিল। কিন্তু আবু বকর পিছানোর তো কথা না। আমরা একটু ধীরে এগোলাম। আবু বকরও এগিয়ে এলেন। শুনলাম দুর্ঘটনার কথা। তাঁর মোবাইলটা হাতেই ছিল। হঠাৎ পা পিছলে সামান্য একটু ইমব্যালেন্স হয়ে যান, মোবাইলটাতে পানি ঢুকে যায়। তিনি সাথে সাথে অবশ্য খুলে পরিষ্কার করেছেন, কিন্তু ওটা কাজ করছে না। অনেক প্রয়োজনীয় নাম্বার ছিল ওটাতে – তার খুব মন খারাপ। মনে মনে প্রার্থণা করছেন, মোবাইলটা যেন ঠিক হয়ে যায়। এই মোবাইলটা সেই ছোট বোয়ালিয়া, মালিখোলা অভিযানেও ছিল।

যাহোক আমরা এগিয়ে চলেছি, কিন্তু পথ যেন আর শেষই হয় না। (এখন জিপিএস দেখে জানছি, আমরা তখন সমুদ্রসমতল থেকে ৬০০ ফুট উচ্চতা পার করছিলাম) বড় বড় পাথর, হড়কাবান কিংবা ঢলে উপড়ানো গাছ, আর য়্যাব্বড় সব পাথর ঠেলে এগিয়ে অবশেষে… চল্লিশ মিনিটের ট্রেকে আমরা পৌঁছলাম ঝরণাটায়। পানি কম, কিন্তু ঝরণাটার উচ্চতা দেখে মন ভরে গেলো।

সানথিয়াম সাইতার (সানথিয়াম ঝরণা) – বান্দরবানের রুমা উপজেলার অন্তর্গত একটি উঁচু ঝরণা। মোহনের উচ্চতাকে একক ধরে মাপলে এর উচ্চতা মোটামুটি ৪১ ফুট। ঝরণা যেখানটায়, সেখানকার পাদদেশে, আমাদের এলিভেশন ৬৫৫ ফুট। ভৌগোলিক স্থানাংক: 22° 7’15.58″N, 92°23’1.35″E। যে পাহাড় থেকে ঝিড়িটা ধুপ করে নিচে পড়ছে (যাকে ঝরণা বলছি আমরা) সেই পাহাড়টা খাড়া, পাথুরে। তার মধ্যে গজিয়েছে গাছ, শ্যাওলা, আগাছা। “সানথিয়াম” এক পাহাড়ি মেয়ের নাম, সে পাহাড়টা থেকে পিছলে ঝরণায় পড়ে মারা যায়। তাকে স্মরণ করেই ঝরণার এই নাম – গাইড সেরকমই বললো। ঝরণার পানির ধারা দেখে অনুমান করা যায়, সব সময় সজীব থাকে না এই ঝরণা।

ঝরণা থেকে পিছলে পড়ে মারা যাওয়া মেয়ের নামে ঝরণার নাম আগেও শুনেছি আমরা রুমনা পাড়ার প্রসিদ্ধ তিনধাপ ঝরণা জিংসিয়াম সাইতার-এ। তাই এটার ঘটনা শুনেই আবু বকরেরও মনে পড়ে গেলো সেই ঘটনা।

কিন্তু ঝরণা দেখলেই তো হবে না। উচ্চতা মাপার জন্য এর পাদদেশে যেতে হবে। কিন্তু এগিয়ে দেখি, শেষ উঁচু পাথরটা থেকে নিচের পাথরটা এতোটাই নিচে আর দূরত্বে যে, ওটাতে যাওয়া যাবে ঠিকই কিন্তু ফেরা আর যাবে কিনা সেটা নিশ্চিত না। তাই দোমনা করছিলাম। আবু বকরের মেজাজ খারাপ, “কী হইছে?”

আমি কথাটা বলতেই আর্মির মেজরের মতো বললেন, “তাতে কী হইছে? যাবেন, আবার কী?”

আমার সব পিছুটান পোতায়া গেল (চুপশে গেল)। দ্বিধা না করে নেমে গেলাম উঁচু পাথরটা থেকে ঐ দূরের নিচু পাথরটায়, মাঝখানের তফাৎটুকুকে তোয়াক্কা না করে। মনে মনে বললাম, এভাবেই সেনা সদস্যরা শ্রেফ কোর্ট মার্শালের ভয়ে, কঠোর কিছু মানুষরূপী রোবটের দ্বিরুক্তিহীন আদেশে অজেয়কে জয় করে, অপথে পথ তৈরি করে। আবু বকর, জীয়ো দাদা, জীয়ো

এগিয়ে গেলাম ঝরণার নিচে। ভিজতে কোনো অসুবিধা নেই। ক্যামেরা রেখে গেছি গাইডের কাছে। আমি যখন বামদিক ধরে এগিয়েছি, মোহন তখন ডানদিক ধরে গিয়েছে। ঝরণার নিচে দাঁড়িয়ে দুজনেই ছবি তুললাম, যাতে পরে ঝরণার উচ্চতাটা মাপতে সুবিধা হয়। তারপর ডানদিক দিয়ে ফিরলাম আমরা। মোবাইলে জিপিএসটা ছেড়ে দিয়েছিল, আবার চালু করলাম। জিপিএস লগটা নিলাম। ফিরতি পথ ধরলাম। আবু বকরের মনে একটাই চিন্তা, চলবে তো মোবাইলটা? ঠিক আছে তো?

জুমে পরিত্যক্ত পাকা কলা
জুমে পরিত্যক্ত পাকা কলা

পুরো পথটা ঝিড়ি দিয়ে না এসে এবারে আলম আমাদেরকে নিয়ে বামদিকে একটা পাহাড়ে উঠে গেলো। তারপর, পাহাড় থেকে নিচের দিকে, জুমঘরের দিকে নামতে থাকা। নামতে নামতে হঠাৎ, কার নজরে পড়লো জানি না, মনে হয় আলমেরই — একটা গাছে পাকা কলা ঝুলে আছে। বেশ কিছুটা পাখি, বাদুড় খেয়ে গেছে, বাকি কিছু এখনও আছে। কিন্তু নামাবো কী করে? চিন্তা করতে দেরি, কাজে নামতে দেরি না। আলম দেখি, পকেট থেকে একটা ছুরিও বের করে ফেললো। পাহাড়ি ছেলে বলে কথা, দা-ছুরির গুরুত্ব বোঝে। ঐ ছোট্ট ছুরিটা দিয়ে শরীরের জোরে কলাগাছ কপাস কপাস করে কেটে নামিয়ে ফেললো। আধমরা কলার কাঁদি নামাতে আস্ত কলাগাছ নামিয়ে ফেলতে দেখলে আমাদের শহুরে প্রকৃতিবিদরা গেলো গেলো রব তুলতে পারেন। চিন্তা করবেন না, কলা একফসলি – ঐ গাছ একবার ফল দিয়েই মারা যায়, তখন ঐ গাছ কেটে ফেলা হয়। কাটা গাছ থেকেই আবার গাছ হয়। কলার কাঁদিটা নামিয়ে বহন করে নিয়ে যেতে হবে ক্যাম্পে। তাই আবু বকরের পরামর্শে আলম ওটা থেকে অবান্তর, পঁচে যাওয়া কলাগুলো ফেলে দিলো। মোহন, কষ্ট করে কাঁদিটা ক্যাম্পে নিয়ে চললো। সাড়ে পাঁচটার মধ্যে আমরা জুমঘরে পৌঁছে গেলাম।

সূর্য হারিয়ে গেছে অনেকক্ষণ আগে। মেঘমুক্ত আকাশে কিছুটা আলো এখনও আছে। আবুবকর রান্না চড়াতে উদ্যত হলেন। বিদায় দেবার আগে আলম বম-কে কিছু খাইয়ে বিদায় দিতে চান। আবু বকরের মোবাইলটা কি ঠিক হবে? ওটাকেও চুলার আঁচে গরম করার ইচ্ছা তাঁর।

আলম বিদায় নিবে। আজ রাতে শুধু আমরা চার বাউন্ডুলে… শহর ছেড়ে… এই পাহাড়ের কোলে… উন্মুক্ত এক জুমঘরে… জঙ্গুলে রাত! আশেপাশে পোকারা ইতোমধ্যেই সরব হতে শুরু করেছে। কালকের পথটা যে আমাদেরকে সানথিয়ামের উপরে নিয়ে যাবে, স্বপ্নেও ভাবিনি আমরা। কিন্তু সব তুষ্টি আর অ্যাডভেঞ্চার ছাড়িয়ে সবচেয়ে বড় আতঙ্ক – মশা! পাহাড়ে ম্যালেরিয়া বাঁধাতে চাই না।

আগামী কাল যে আমাদেরকে পাহাড়ের আরেক রূপ দেখাবে আমরা তখনও জানতাম না। এবং ভুলে যাবেন না, এবারই নায়ক আর ভিলেন নতুন করে সংজ্ঞায়িত হবে…

পাহাড়ে, রাত নামছে…

পরের পর্ব »

(আগামী পর্বে সমাপ্য)

– মঈনুল ইসলাম

nanodesigns

২ thoughts on “কর্মক্লান্তি থেকে পালাতে – পাহাড়ের উল্টো পিঠে : পর্ব ৭

মন্তব্য করুন