যোগী হাফং – একটি ব্যর্থ অভিযান – ২

পাহাড়ে চড়ার আর নিজেদের ছুটির চুলচেরা বিশ্লেষণ মাটি করে দিয়ে কাটা কাটা হিসাবের প্রথম দিনটা আয়েশ করে কাটিয়ে দিলেন দলনেতা। রেমাক্রিতে ঘুমই সার হলো। আর হেলাফেলার সময় নেই – দুনিয়া উল্টে গেলেও ভোর ০৪:৩০-এ উঠতেই হবে সবাইকে। মোহনের মোবাইলে অ্যালার্ম বাজতেই ঘুম ভেঙে গেলো আমার আর কোরেশী’র। কটেজের নিচেই পাম্প করে সাঙ্গুর পানি এনে ফেলা হচ্ছে ড্রামে। ঠান্ডা, হীমশীতল জলে যখন ওযু করছি, তখন প্রচণ্ড কুয়াশার মধ্যে সৌরবিদ্যুতের আলো ছাড়া কোনো আলো নেই আশেপাশে। নাফা কুম দলও উঠে গেছে, ওরাও আজকেই আবার ঢাকার দিকে ফিরতি পথ ধরবে। পাশের ঘরে ইতি আপু’রও নড়াচড়া পাওয়া গেল।

ঘড়ি আর দেখিনি, মোবাইল বন্ধ করা। ফযরের নামাযও পড়া শেষ আমাদের দুজনের – এমন সময় মোহন ঘড়ি দেখে জানালো, ফযরের ওয়াক্ত এখনও আসেনি। অগত্যা তাই নিজেদের ব্যাগ গুছিয়ে ফেলতে শুরু করলাম। এদিকে মোহন, আমাদের দলের রেশন কিনে, বয়ে নিয়ে এসেছিল চট্টগ্রাম থেকে – ট্রেকে নামার আগে সেগুলো দলের মধ্যে ভাগ করে নেবার দরকার পড়লো। ক্যামেরার ব্যাগটা বের করে নুডল্‌স, খেঁজুর আর স্যুপের আমার ভাগটা পুরে নিয়ে ব্যাগ প্রস্তুত করে নিলাম।

সবাই উঠে গেছে। টয়লেটও সারা শেষ। আর কটেজে ফিরবো না, তাই ওয়াক্ত এলে নামায আবার পড়ে, পুরোপুরি প্রস্তুত হয়ে রাকস্যাক পিঠে বেঁধেই বেরিয়ে পড়লাম কটেজ থেকে। এখনও অন্ধকার, কোরেশী, মোহন আর আমি টর্চ জ্বেলে রেমাক্রি বাজার-পাড়ায় গেলাম, তারপর সেই ঘর-দোকানটা খুঁজে বের করে দেখি, নাস্তা প্রস্তুত। আমরা সময়মতো এসে গেছি দেখে স্বামী-স্ত্রী আর ছোট্ট একটা বল্টুর পরিবারটা বেশ আশ্চর্যই হয়েছে বোঝা গেল।

নাস্তাতো অতি উচ্চমানের রাজকীয় খাবার – নরম তুলতুলে পরোটা, সুস্বাদু ভাজি-ডাল আর ডিমভাজি। ঠান্ডার মধ্যে গরম-গরম নাস্তা খাওয়া – কিন্তু সেখানেও আবু বকর বেশ ধীরে চলছেন। বিষয়টা মোটেই সাধুবাদ দেবার মতো নয়। গত বছর ট্রেকেও তাকে দেখেছি সেই আবু বকর আর নেই। মোহনও বিষয়টা এবার অনুভব করছে। কোরেশী বহু বছর পর ট্রেকে নেমেছে সেই বন্ধু-শিক্ষক আবু বকরের সাথে — সেও চমকিত এই ধীর, ঝিমিয়ে পড়া আবু বকরকে দেখে। কতটা ধীর সহজেই বুঝতে পারবেন, যখন জানবেন একই দলের মোহন নাস্তা খেয়ে আবার কটেজে গেছে মুরুব্বি আপুকে ডেকে আনতে। সে গিয়ে আবার ফিরে এসেছে, তখন দল বেরিয়েছে আবু বকরের নাস্তা শেষ করে। এই আবু বকরকে কখনোই আমরা ক্ষমা করবো না।

সবার থেকে বিদায় নিয়ে আমাদের দলটা বেরিয়ে পড়লো। কিন্তু হায় – অন্ধকারে বেরোনর কথা ছিল, দিনের আলো ফুটতে শুরু করেছে যে। ট্রেকে নামবার আগে আবু বকর সবাইকে নিয়ে হাত তুলে দোয়া করলেন। এবারে যাত্রা হলো শুরু।

🌿

পথ কে চিনে? আমি চিনি। কিভাবে? আমি কি জীবনেও গিয়েছি এদিকে? না। আসার আগে গুগল আর্থ আর পুরোন ট্রেকারদের লেখা আর ট্রেক রেকর্ডগুলো এতোবার দেখেছি যে, কনফিডেন্স চলে এসেছে। যাবার পথে একটাই মাত্র চড়াই, তাই কষ্টসাধ্যও হবার কথা না পুরোন এই ট্রেকার দলের। পথটাও খুব ব্যবহৃতই মনে হয়েছে, তাই নিশ্চয়ই খুঁজে বের করতে কষ্ট হবে না। কিন্তু আমি দায়িত্বটা নিলাম না, আবু বকরই জানালেন তিনি চিনেন। ভালোই হলো – আবু বকর চিনেন। আর যদি একান্তই বিপদে পড়ি, তাহলে মোবাইল চালু করে জিপিএস চালু করে আগের ট্র্যাকের মধ্যে আমার অবস্থানটা মিলিয়ে নিলেই আশা করি সঠিক পথে ফেরত আসতে পারবো – কারণ যাবার আগে মোবাইলের জিপিএস অ্যাপ-এ wikiloc-এ অনিক সরকার-এর প্রকাশ করা একটা ট্র্যাক রেকর্ড নিয়ে গিয়েছিলাম।

পথে নেমে দেখা গেলো, কোনদিকে যেতে হবে, সেটা আসলে পথই বলে দিচ্ছে। তাই পথ নিয়ে কোনো ঝামেলা হবে না মনে হচ্ছে। কুয়াশায় সামনের দৃশ্যপট সাদা হয়ে আছে, দূরে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। ট্রেক করতে নেমে শরীরের দিকে নজর দিলাম তাই: এই ট্যুরে যাবার আগে আমি মানা করে দিয়েছিলাম মোহন আর আবু বকরকে। গত বছরে পাহাড়ে ট্রেক করার পরে ফিরতি পথে আমার পায়ের হাঁটুতে যে অবস্থা হয়েছিল, তা স্মরণ করে উঁচু পাহাড়ের মতো কঠিন কাজে নিজেকে আনফিট মনে করছিলাম আমি। তখন আবু বকর বলেছিলেন, প্রতিদিন ব্যায়াম শুরু করেন, আর হাঁটেন – ঠিক হয়ে যাবে। মোহন সাহস যুগিয়েছিল:

হাঁটতে পা থাকা লাগে না। মনের জোর লাগে।

কথাটার সত্য-মিথ্যা যাচাই করার দরকার ছিল না, সাহস জুগিয়েছিল। পরদিন থেকে পুরোদমে হাঁটাহাঁটি শুরু করেছিলাম, অফিস থেকে হেঁটেই ফিরলাম দুয়েকদিন। বাসার সাত তলায় মাঝে মাঝে সিঁড়ি বেয়ে উঠলাম। পা ভাঁজ করে বিভিন্ন ব্যায়াম শুরু করলাম – নিজেকে ফিরে পাচ্ছি বলে আশ্বস্থ হয়ে ট্রেকে নামলাম। এখনতো হাঁটতে ভালোই লাগছে।

বেশিক্ষণ লাগলো না, আমরা একটা পাড়ায় পৌঁছে গেলাম। পাড়ার নাম: চম্বুক পাড়া। পাড়ার লোকজনকে জিজ্ঞেস করে করে পথ বাৎলে নিলাম কোনদিকে যেতে হবে – দেখা গেলো আমরা সঠিক পথেই আছি। পাড়ার ভিতর দিয়েই এগোচ্ছি। আবু বকর, কোরেশী আর সঞ্জীব একটু ধীরে ধীরে হাঁটছেন। হাঁটার গরমে সঞ্জীব সম্ভবত শীতের কাপড় ছেড়েছে পথে, তাই একটু পিছিয়ে পড়েছে ওরা। এদিকে আমরা তিনজন এগিয়ে, পাড়ার একটা জায়গায় এসে দেখি পথটা সোজা চলে গেছে, আর আরেকটা পথ বামদিকে নিচে নেমে গেছে। একজন দেখিয়ে দিলো, কোনদিকে যেতে হবে।

রেমাক্রি সংলগ্ন চম্বুক পাড়া পেছন ফেলে চলছে দল
রেমাক্রি সংলগ্ন চম্বুক পাড়া পেছন ফেলে চলছে দল

মোহন বললো, “দাঁড়া। বকর আসুক।” সে, বন্ধুকে পরখ করতে চায়, কতটা চেনে আবু বকর। আবু বকর এগিয়ে এলে মোহন জানতে চাইলো, “বস্‌, কোন দিকে?” আবু বকর দ্বিধাহীনভাবে দেখিয়ে দিলেন সোজা চলতে। হাসলাম আমরা তিনজন – মোহন বুঝে ফেললো, গুরুর উপর আজকে ভরসা করলে খবরই আছে। আমরা পাড়ার লোকের দেখানো পথে বামদিকে নিচের দিকে নেমে গেলাম। আবার উপরের দিকে উঠা শুরু…।

দূরে কুয়াশাস্নাত পাহাড় দেখতে অন্যরকম এক ভালোলাগায় ভরে উঠছে মন। সামনের পথটা খাড়া উঠে যাচ্ছে। মোহন বরাবরের মতো সামনে সামনে চলছে। ইতি আপুকে মনে করেছিলাম কথাই বলবেন না, তিনি দেখছি ট্রেকে নামার পর থেকেই বিভিন্ন গল্প করে চলেছেন। মোহন এবারে আগেরবারের মতো না, মাঝে মাঝেই গল্প করছে। চলতে চলতে মুরুব্বি আপু’র প্রসঙ্গ এলে আবারও প্রশ্ন করলাম, কী তাঁর পরিচয়? আবু বকর পরিচয় করিয়ে দিলেন:

পর্বতাভিযাত্রী বদরুন্নেসা রুমা (ছবি: সিফাত ফাহামিদা)
পর্বতাভিযাত্রী বদরুন্নেসা রুমা (ছবি: সিফাত ফাহামিদা)

বদরুন্নেসা রুমা: আমাদের এই ট্যুরের মুরুব্বি আপু — বাংলাদেশের ভ্রমণ-পাগলদের অন্যতম এই নারী, এভারেস্ট বেসক্যাম্প-এ (১৭,৬০০ ফুট) যাওয়া দ্বিতীয় নারীদলের সদস্য ছিলেন (তাঁর সাথে আরো ছিলেন পরবর্তিতে এভারেস্টজয়ী নিশাত মজুমদার; এছাড়া সাদিয়া সুলতানা শম্পা, আফরিন খান, জেসমিন আলী – সকলেই তখন BMTC’র হয়ে অভিযানে যান)। তিনি অন্নপূর্ণা বেসক্যাম্পসহ হাই অল্টিচিউড ট্রেকিংও সম্পন্ন করেছেন। পেশায় এখন একজন শিক্ষিকা – ভাওয়াল বদরে আলম সরকারী কলেজ-এ পদার্থবিদ্যার সহকারী অধ্যাপক। এছাড়া এখন ভ্রমণ বাংলাদেশ-এর কোষাধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।[১][২]

আলোকিত একজন মানুষের সাহচর্য সত্যিই সুন্দর – কিন্তু কোনো কথাই হয়নি রুমা আপুর ইতিহাস নিয়ে। বাংলাদেশ দাপিয়ে বেড়ানো তিনি এখন পর্যটকদের সাথে এসেছেন পর্যটন স্পট নাফা কুম দেখতে – সময় কাটাতে। কিন্তু যত যাই হোক – পাহাড় আর প্রকৃতি ছাড়তে পারেননি তিনি – পারবার কথাও না। পাহাড় একটা মোহ, এক অমোঘ মোহে আজীবনই বেঁধে রাখবে, যারা এর কাছে একবার হলেও এসেছে।

🌿

একটা সময় আমরা উপরে উঠে এলাম – আগের ট্রেকারদের ট্রেক-রেকর্ড দেখে এখন বুঝতে পারছি মাত্র ৫০০ ফুট উঠেছি। চূড়ার উপরে উঠার ক্লান্তিতে বিশ্রাম আর পানিপানের বিরতি নিতে যাবো আমরা, এমন সময় ইতি আপু দেখালেন উপরের দিকে – পথের বামদিকে একটা ছাউনি দেয়া বিশ্রামঘর। আহা! সাধু সাধু! শিশিরস্নাত পিচ্ছিল পথ বেয়ে ঘরটায় উঠে দেখি তিনদিকে তিনটা কাঠের বেঞ্চ বসানো। ব্যাগ রেখে বসলাম সবাই হালকা হতে। পানিপান আর খেজুর ভক্ষণ প্রায় শেষ, তখন নিচে এসে হাজির হলো সঞ্জীব। ওকে দেখে যতটা ক্লান্ত লাগছে, মনে হচ্ছে ৫০০ ফুট উঠেনি, বরং তিনদিন থেকে সে হাঁটার উপরই আছে। নিজের উপর এতটুকু পরিমাণ আত্মবিশ্বাসও নেই বলেই হয়তো পিচ্ছিল ঢালু পথটা বেয়ে সে বিশ্রামঘরটায় পর্যন্ত উঠতে চাইলো না। সন্দেহ হলো – সঞ্জীব কি পর্বতসম পাহাড়ে চড়তে যাচ্ছে!

মিনিট দশেক কাটিয়ে শক্তি পুণর্জীবিত করে আমরা নামার পথ ধরলাম।

পথে আমাদেরকে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছেন ক’জন পাহাড়ি। তাদেরই কয়েকজন যে তাদের পিঠের ঝুড়িতে হরিণের মাথা ঝুলিয়ে আর ঝুড়ি ভর্তি করে হরিণের মাংস নিয়ে যাচ্ছেন – সেটা আমি তখন খেয়ালই করিনি। ফিরে এসে ক্যামেরায় তোলা ছবিগুলো দেখতে গিয়ে আবিষ্কার করলাম ঘটনাটা। দলের আরো কয়েকজনও নাকি খেয়াল করেছে, আমি আসলে ছবি তোলার ধান্দায় খেয়ালই করিনি। শিখলাম, নিজেকেই প্রবোধ দিলাম:

আগে নিজের চোখে দেখো, পরে ক্যামেরার চোখে – কারণ ক্যামেরা তোমার পেশা নয়। ক্যামেরা যাদের পেশা, তারা আগে-পরে কথা না, সারাক্ষণই ক্যামেরার চোখে দেখবে।

পথে আরো অনেক পাহাড়ির সাথে দেখা হলো – তারা রেমাক্রি যাচ্ছেন – সেখান থেকে হয়তো থানচি যাবেন। কোনো কোনো মেয়েকে দেখলাম সাজগোজ করে যাচ্ছে – মনে হলো কোনো অনুষ্ঠানে যাচ্ছে হয়তো। প্রথম ট্রেক হলে এতটুকু রাস্তারও বর্ণনা দিতাম নিশ্চিত – কিন্তু এখন ব্যতিক্রমী বৈচিত্র্য না থাকলে ট্রেকের সব ট্র্যাকই মনে হয় উঠা আর নামা।

একটা পর্যায়ে পথটা নেমে ঝিড়ির কাছাকাছি চলে এলো। ইতি আপু উনার HMI ট্রেনিংয়ের সময়কার কথা বলে বলে হাঁটছিলেন। কিভাবে সামান্য একটা ঢালে পড়ে গিয়েছিলেন তিনি, আর তার পর থেকে ঢালে কিভাবে তিনি সাবধান থাকেন, সেটাই বলে বলে হাঁটছিলেন। তখন একজন বয়স্ক লোক আমাদের পাশ কাটানোর সময় ইতি আপুকে বলে গিয়েছিলেন সামনে দোকান আছে, চা, কলা, পেঁপে সব আছে। উৎরাইটা নামতেই দেখি দু-তিনটা দোকান দেখা যাচ্ছে। তারই প্রথমটাতে থামলাম আমি, মোহন আর ইতি আপু। বয়স্ক মহিলা দোকানে বসা – বাংলা বলতে পারেন না, আর বোঝেনও খুব কম। মোহন চা খাবে, আমরা না করলাম। কলা খেলাম আমরা সবাই-ই। কোরেশীও এসেছে ইতোমধ্যে।

বিড়ালপ্রেমী মোহন
বিড়ালপ্রেমী মোহন

দোকানে অনেকগুলো বাচ্চা বসে আছে, তারা স্কুলে যায়। মোহন মূলত ওদের মাধ্যমেই বয়স্ক মহিলার সাথে কথোপকথন চালাচ্ছে। দোকানে একটা বিড়াল দেখতে পেয়ে আদর করতে গেলো মোহন। বাচ্চাদেরকে জিজ্ঞেস করলো বিড়ালের নাম কী? ওরা বললো: ক্রোও। নামের অর্থ কী সেটা আর জিজ্ঞেস করা হয়নি যদিও, তবু নামটা শুনে খুব মজা লাগলো ওর। …ইতি আপু মজা করে বলছিলেন, “ঐ বয়স্ক লোকটা যেভাবে পাশ কাটাবার সময় দোকানের অ্যাডভার্টাইয করে গেলো, এই বয়স্ক মহিলা কি তার গার্লফ্রেন্ড নাকি!” হাসলাম সবাই। 😆

আবু বকর এলেন আরো পরে। তারও পরে এলো সঞ্জীব। খুড়িয়ে খুড়িয়ে আসছে সে… শু-তেই নাকি সব গণ্ডগোল – পায়ের গোড়ালি জখম করে ফেলেছে। আবু বকর ওনার ব্যাগ থেকে অতিরিক্ত একটা রাবারের চপ্পল বের করে দিলেন ওর পা-কে আরাম দিতে। সে পা-ই ফেলতে পারছে না। ডাক্তার মোহন পায়ের অবস্থা দেখে ঘোষণা দিলো – হবে না। কিন্তু হাল ছাড়ছে না সঞ্জীব – সে এখনও মনে করছে সামনে যাওয়া সম্ভব। কিন্তু সে ঐ পা ফেলার সাথে সাথে যেভাবে লাফ দিয়ে এগোচ্ছে – যে-কেউ দেখলেই বলবে, পাহাড় ওর জন্য না। কিন্তু তবু সে ফেরার সিদ্ধান্তে আসতে পারছে না। সে নাকি যেতে পারবে। ঠান্ডা মাথার মানুষ কোরেশী তখন ফ্লোর নিলো:

পাহাড়ে তোমার শরীর আর মাথা আছে কিনা জানার দরকার নাই, তোমার পা দু’খান লাগবে।

কথাটার মধ্যকার সূক্ষ্ম কৌতুকে সবাই হাসলেও কথাটা সবার খুব মনে ধরলো। আর তক্ষুণি সঞ্জীবও বুঝে ফেললো তার অলীক কল্পনার জগত থেকে বেরোবার সময় এসেছে। সিদ্ধান্ত জানালো – সে ফিরে যাবে।

সঞ্জীবকে বিদায় - দলের ছবি (ছবি: স্বয়ংক্রীয়)
সঞ্জীবকে বিদায় – দলের ছবি (ছবি: স্বয়ংক্রীয়)

আবু বকর তাকে পরামর্শ দিলেন কষ্ট করে হলেও পাহাড়টা ডিঙিয়ে সে যেন রেমাক্রি চলে যায়, সেখানে নাফা কুম দল ঝরণা দেখে ফিরে এলে ওদের সাথেই সে ঢাকা চলে যেতে পারবে। সবাই মিলে শেষ একটা ছবি তুলে সঞ্জীবকে বিদায় জানালাম আমরা।

দলের একজনকে বিদায় জানানোর পরে সবার মন খারাপ হবার কথা ছিল – কিন্তু কেন জানি সেটা দেখা গেলো না। সঞ্জীবের হয়তো কথাটা শুনে খারাপ লাগতে পারে, কিন্তু ব্যাপারটা সত্যিই হলো। বাস্তব সত্য হচ্ছে, সঞ্জীব এপর্যন্ত পর্বতসম পাহাড়ে চড়ার উপযোগী কোনো সক্ষমতাই দেখায়নি এই ক’ঘন্টার ট্রেকে। মাত্র ৫০০ ফুট উঠে যে জিহ্বা বের করে ফেললো, তাকে নিয়ে ৩,০০০ ফুট উঠার চিন্তা করাটা কি সমিচীন হচ্ছে? তবে সঞ্জীবকে ফেরত যেতে দেখে আমার অজানা লেকের অভিযানে প্রভার ফেরৎ যাওয়ার কথাটা মনে পড়ে গেলো — শুভস্য শিঘ্রম – শুভ সিদ্ধান্ত যত দ্রুত নেয়া যায় ততই উত্তম। সামনে যে কঠিন পর্বতসম ট্র্যাক আছে, সেখানে ট্রেক করার জন্য একজোড়া পায়ের যে কোনো বিকল্প নেই, সেটা টের পাবার আগে সিদ্ধান্তটা নিয়ে ফেরৎ যাওয়াটা সবার জন্যই মঙ্গলকর। তবে, খারাপ লাগলো একটা কারণে – প্রভা আর সঞ্জীবের মধ্যে অদ্ভুত একটা মিল — দুজনের মজার মজার ডায়লগ ডেলিভারি দিতে পারে; ট্রেকে সেটা মিস করবো।

🌿

বাকি পথটাতে আর কোনো চড়াই-উৎরাই নেই বলেই আগের ট্রেকারদের লেখা পড়ে জেনে গিয়েছিলাম। এবারে পথটা যখন সরাসরি ঝিড়িপথ ধরে চললো, তখন মোহন আফসোস করছিল – ইশ, সঞ্জীব দলিয়ান পাড়া পর্যন্ত চাইলে আসলে যেতে পারতো। কিন্তু তবু ওর আবদারে ভোট দিতে পারলাম না। সঞ্জীব ভুল করেনি।

মোহন, আবু বকর, কোরেশী - পাহাড়ের কোলে তিন বন্ধু
মোহন, আবু বকর, কোরেশী – পাহাড়ের কোলে তিন বন্ধু

সকাল ৯টা বাজে। কিন্তু আজকে সূয্যি মামাকে জড়িয়ে ধরে কুয়াশা ঘুমাচ্ছে বেলা করে। আমাদের জন্য সেটা ট্রেক করার উপযোগী অপূর্ব একটা দিন উপহার দিচ্ছিলো। এক সময় আমি আর ইতি আপু সামনে এগিয়ে গেলাম; তিন বন্ধু পিছনে পড়ে গেলো। আমরা হাঁটতে হাঁটতে বেশ খানিকটা এগিয়ে একটা পাড়ার নিচে চলে এলাম। সবজিক্ষেতে কাজ করছেন দুই পাহাড়ি তাদেরকে জিজ্ঞেস করে জানলাম দলিয়ান পাড়া যাবার পথ এখন ডানদিকে, ঝিড়ি থেকে উপরে উঠে গেছে। তাই ঠিক করলাম ওদের জন্য অপেক্ষা করবো – মোহন তাই শিখিয়েছে। কিন্তু এই তিন বান্দার আর দেখাই পাওয়া যাচ্ছে না। আমার মতো বাজখাই গলায় হাক ছেড়ে ডেকেও প্রত্যুত্তর নেই। পাহাড়ি আমাদেরকে জিজ্ঞেস করলো, আপনাদের গাইড কোথায়? গাইড না থাকলে আমাকে নিয়ে যাইয়েন। বোঝা গেলো, টাকা ইনকামের ধান্দা পেয়েছে ব্যাটা। আপুও বলে দিলেন – গাইড পিছনে। ভুল বলেননি, আবু বকরই তো আমাদের গাইড। 😁

অনেকক্ষণ পর তিন বন্ধু আমোদে গল্প করতে করতে এগিয়ে এলো – যেন কিছুই হয়নি। পাড়াবাসীকে জিজ্ঞেস করে নোট নিলাম পাড়ার নাম: চেনহাও পাড়া। সন্তুষ্ট। উপরে বাচ্চাদের মার্চপাস্টের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে – বাম-ডান-বাম, বাম-ডান-বাম। উপরে উঠে দেখি একটা স্কুল, একজন পুরুষ আর একজন নারী শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে, স্কুলের উঠানে একটা বরই গাছের নিচে ১০জন শিশু সকালের অ্যাসেম্বলি করছে – তার মধ্যে সামনের বল্টুটাকে সবার সাথে তাল মিলিয়ে পা ফেলতে দেখে দারুণ মজা লাগলো! কিন্তু স্কুলের সাইনবোর্ডের দিকে তাকিয়ে চক্ষু ছানাবড়া — পাড়ার নাম: চাইহ্লাউ পাড়া। বাংলা উচ্চারণরীতিতে উচ্চারণটা হলো – চাইলাউ, কিন্তু আসলে এদের (মারমা) বানানরীতিতে এরা চাইহাউ বলে — কিন্তু ঐ ‘ল’ যে কোন্‌ অন্তঃস্থল থেকে এসেছে আল্লা’ মালুম। গত ট্রেকের মতোই আবারও শিখলাম- নিজের কানকে বিশ্বাস করো না। সবজি ক্ষেতে বরবটি দেখিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম কী নামে ডাকে ওরা? যা লিখে নিয়ে এসেছি সেটা হলো: পিসহি (কিংবা পিসি) – কিন্তু এখন মনে হচ্ছে – নিজের কানকে বিশ্বাস করে ঠকিনি তো?

চাইহ্লাউ পাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়
রেমাক্রী ইউনিয়ন, থানছি, বান্দরবান
স্থাপিত: ১৫ এপ্রিল ২০০৪

চাইহ্লাউ পাড়া, রেমাক্রি
চাইহ্লাউ পাড়া, রেমাক্রি

সুইযারল্যান্ডের কো-অপারএইড-এর সহযোগিতায় আর হিউম্যানিটারিয়ান ফাইন্ডেশন-এর তত্ত্বাবধানে UPASSHAK প্রকল্পের আওতায় স্কুলটি পরিচালিত। …উপরে পাড়াটা অন্যান্য মারমা পাড়ার মতোই- কাঠের খুঁটিতে মাটি থেকে উঁচুতে দাঁড়ানো বাঁশের ঘর, টিন কিংবা খড়ের ছাউনি, তেঁতুল গাছ, নারকেল গাছ – আহামরি কিছু না – তবু পাহাড়ি সুন্দর!

ক্যানোপিতে দেখা দূরে একটা পাহাড় (ছবি: মোহন)
ক্যানোপিতে দেখা দূরে একটা পাহাড় (ছবি: মোহন)

পাড়া ছাড়িয়ে আবার আমরা ঝিড়িতে নেমে এলাম। একটা সময় আশ্চর্য হয়ে আবিষ্কার করলাম ঝিড়ির পাড়েই, মেঝেতে লম্বাটে তিনটে পাথর একত্র করে চুলা বানানো, পাশাপাশি দু-তিনটা। হয়তো ঝিড়ির পাশে কিছু রান্না করার দরকার হয়ে পড়েছিল ওদের। পাশ কাটিয়ে এগিয়ে গেলাম আমরা। সামনে একটা জায়গায় এগিয়ে দেখি গাছের ক্যানোপি দিয়ে দূরে একটা সুউচ্চ পাহাড় দেখা যাচ্ছে – দৃশ্যটা অপূর্ব! কিন্তু কোন পাহাড় এটা? জ-ত্লং? যোগী হাফং? খুব অভাব বোধ করলাম রাতুল ভাইকে – তাঁর একটা উদ্যোগ মানুষ যেন পাহাড়ের চূড়া দেখে পাহাড় চিনে। …কিংবা নিদেনপক্ষে একজন স্থানীয় গাইড থাকলেও তথ্যটা জানা যেত।

পাহাড়ের কোলে প্রকৃতি
পাহাড়ের কোলে প্রকৃতি

সামনে এগিয়ে চললাম। একটা গাছ পড়ে আছে পথে। আবু বকর এমনভাবে দাঁড়িয়ে ছবিতে পোয দিলেন, মনে হলো অ্যামেরিকার কোনো কাউন্টির শেরিফ যেন। বেশিক্ষণ লাগলো না, আবু বকর ঘোষণা দিলেন এই যে ডানদিকে রয়েছে ফাইভ স্টার মানের টয়লেটের ব্যবস্থা। মানে!! জীবনে এই প্রথম আবু বকরকে, কোনো পাড়াকে তার টয়লেট দিয়ে ইনট্রোডিউস করতে দেখছি। হ্যাঁ, তিনি দলিয়ান পাড়া প্রাইমারি স্কুলের টয়লেট দেখিয়ে কথাটা বলছিলেন। টয়লেট ফাইভ স্টার কিনা জানি না, তবে যে বেসরকারি স্কুল ‌১৯৯৭ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত, সেই পাড়াতে যে শিক্ষার আলো পৌঁছে গেছে বহু আগে, তা বুঝতে গণক হওয়া লাগে না।

আমরা দলিয়ান পাড়া স্কুলের সামনে গিয়ে চিন্তা করছি, কোনদিকে পাড়াটা? বামে, নিচেও ঘর দেখা যাচ্ছে, সিঁড়ি দিয়ে উপরেও। অনিশ্চিত সবাই। দল থেমে গেলো, আর আবু বকর বামদিকে গেলেন খবর নিতে। কিন্তু আমি কেন জানিনা নিশ্চিত ছিলাম পাড়াটা উপরে হবে। সবাইকে রেখে আমি খানিকটা উঠে গেলাম উপরে। নিশ্চিত হবার কারণ দুটো: ১. আগের জিপিএস রেকর্ডগুলো বামে বাঁক নিয়েছে বলে দেখিনি। ২. আমরা পর্বতসম পাহাড়ে যাচ্ছি, আর দলিয়ান পাড়া তাদের বেসক্যাম্প – বেসক্যাম্প নিচে হবে না। আমার যুক্তিগুলো কোনো অকাট্য যুক্তি না, তবু সিক্সথ সেন্স কেন জানিনা ওদিকে টানছিল। মোবাইলটা সক্রীয় করে জিপিএস-এ পিনটা যখন দেখলাম আগের ট্র্যাকের বরাবরই আছে, তখন হাঁক দিলাম – “উপরে।” ততক্ষণে আবু বকরও নিশ্চিত হয়ে এসেছেন উপরে যেতে হবে।

উপর থেকে পেছন ফিরে আশপাশের দৃশ্যটা অপূর্ব লাগছে। উঠার পথে একটা অদ্ভুত গাছ দেখলাম – দুনিয়ার যত প্যাঁচগোছ আছে, সব সে নিয়ে বসে আছে। আমি গাছ, মাছ চিনি না, তাই আপনাদেরকেও পরিচয়টা দিতে পারলাম না। …উপরে ওঠার পথে খেয়াল করিনি, ইতি আপা উনার বাচ্চা কাচ্চাগুলোকে নিয়ে, থুক্কু, পাড়ার বাচ্চা-কাচ্চাগুলোকে নিয়ে এ প্যাঁচগোছের মধ্যে দোলও খেয়ে নিয়েছেন একবার। 😉

ঘড়িতে ১০:০০

উপরে উঠতেই একটা ছোট বাচ্চা জীবনের যাবতীয় আন্তরিকতা দিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরলো – আমাদেরকে স্বাগত জানাচ্ছে। আমিও জড়িয়ে ধরলাম ওকে। যে রাস্তায় উঠে এলাম, তার ঠিক নিচেই একটা ঘর, এটাই হেডম্যানের ঘর – কাকে যেন জিজ্ঞেস করে নিশ্চিত হলাম। আসার আগে সালেহীন আরশাদী আমাকে জানিয়েছেন এখানে হেডম্যানের ঘরেই থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা। একজন নারী আমাদেরকে ঘরের দরজা খুলে দিলেন। আমরা জুতা খুলে কাঠের তক্তা দেয়া বারান্দায় উঠলাম। আবু বকর আর আমি ভিতরে গেলাম।

লালরাম বম
হেডম্যান
দলিয়ান পাড়া, ৩৭১নং রেমাক্রি মৌজা, ১নং রেমাক্রি ইউনিয়ন পরিষদ, থানছি উপজেলা

তিনি জানালেন, আরো একটা দল অবস্থান করছে ঘরে, তারা এখন যোগী হাফং গেছে। গত কালকে তারা জ-ত্লং ঘুরে এসেছে। জানা তথ্যের সাথে মিলে যাচ্ছে – একদিন জ-ত্লং, আরেকদিন যোগী। বুঝলাম, তিনি হেডম্যানের পুত্রবধু। আবু বকর নিজের পরিচয় দিলেন, আর ডি-ওয়ে এক্সপেডিটর্‌স-এর আকাশ ভাইয়ের কথাও জানালেন যে, তিনি অসুস্থ। মহিলা আকাশ ভাইকে চেনেন, আফসোস করলেন। মহিলা ভালো বাংলা বলেন। আমরা কিছু খেয়েছি কিনা জিজ্ঞেস করলেন। জানানো হলো আমরা সকালে নাস্তা করেই এসেছি। এখন শুধু গাইড দরকার, তারপর রওয়ানা।

হেডম্যানের ঘরতো আর ঘর না, আস্ত একটা পাহাড়ই যেন। না, পুরোন ট্রেকারদের কোনো দলের স্মৃতিচিহ্ন নেই, নতুন ট্রেকারদের আছে: দেয়ালে বিশাল ব্যানার ঝুলিয়েছে Extreme Trekker Bangladesh (ETB); কালপুরুষ অপু’র Living with Forest – অপু’র দূরারোগ্য রোগের সাথে যুদ্ধ করে হেরে যাওয়া সন্তান ক্যাসপারের স্মৃতিও আছে ঘরটাতে। এক কোণে একটা পাখির বিশাল ঠোঁট ঝুলিয়ে রাখা – দেখেই কিভাবে যেন পাখিটার নাম মনে চলে এলো: হর্নবিল পাখির ঠোঁট – বিশাল বড়। বাংলায় একে বলে ধনেশ – বড় আকারেরগুলোকে বলে রাজধনেশ — ইংরেজিতে Hornbill। শক্ত, লম্বা, বাঁকানো ঠোঁটের জন্য এদেরকে দেখলেই চেনা যায়। মানুষের মতো পাখিদেরও মেরুদণ্ডের হাড়গুলো আলগা থাকলেও একমাত্র ধনেশেরই মেরুদণ্ডের প্রথম দুটো হাঁড় একত্রে লাগানো – সম্ভবত বিশাল ঐ ঠোঁটের ভারসাম্য রক্ষার জন্যই প্রকৃতির এই ব্যবস্থা। পাখিগুলোর বিভিন্ন প্রজাতি বিপদগ্রস্থ হলেও পাহাড়িদের ঘরে পাখির ঠোঁটটা আপাতদৃষ্টিতে পরিবেশের প্রতি হুমকি মনে হলেও, আমরা আসলে জানি না এটা মরা পাখির ছিল কিনা… সুতরাং মাফ করে দেয়াই যায়।

একজন গাইডকে খবর দিয়েছেন হেডম্যানের পুত্রবধু, গাইড আসতেই আবু বকর শুরু করে দিলেন তাঁর স্বভাবসুলভ তথ্য সংগ্রহ — তথ্যই মুক্তি। আবু বকর ইতোমধ্যে খাবারের অর্ডার দিয়ে দিয়েছেন – পাড়ার মুরগি, আলুভর্তা, ডাল – রাজকীয় খাবার। তবে যেহেতু “আল্লাহ-ভিন্ন অন্য কারো নাম নিয়ে জবাই না করলে সে পশু মুসলমানদের জন্য সিদ্ধ (হালাল) হয় না” তাই আবু বকর মুরগি জবাই করে দিতে চাইলেন। কিন্তু হেডম্যানের পুত্রবধু জানালেন, মুরগি এখনও ধরা হয়নি। এক কাজ করা যাক, ঐ দল তো আপনাদের মতোই (মানে একই ধর্মের), ওরা এলে ওদেরকে দিয়ে জবাই করিয়ে দিবো? নেতা রাজি হলেন।

আমরা দুটো ডে-প্যাকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্তর নিয়ে নিলাম; পুরো ব্যাগ নেয়ার প্রশ্নই উঠে না। কিন্তু কী কী দিয়ে ডে-প্যাকটা তৈরি করতে হবে, এর কোনো পরিকল্পনা আমি আগে থেকে করিনি। ☹️ তাই চোখের সামনে যা কিছু পড়লো, প্রয়োজনীয় মনে হলো, কিন্তু অতিরিক্ত হবে না, সেরকম কিছু জিনিস নিয়ে নিলাম। আবু বকরের আনা ব্যাগটা আমি নিলাম, আর ইতি আপু আরেকটা নিবেন। আবু বকর আর মোহন দুজনেই কোমরে বাঁধার উপযোগী ছোট্ট পাউচ নিয়েছে। বাধ্যতামূলক প্রত্যেকেই টর্চ নিলাম, আবু বকর একটা হেডল্যাম্প নিয়ে এসেছেন, সেটাও ব্যাগে পুরে নিলাম। আসার সময় ঢাকা থেকে ৮টা হানিব্রেড কিনেছিলাম, ৫টা আমরা গতকালকে পথে খেয়েছি, বাকি ৩টা ব্যাগে পুরে নিলাম। কিছু নুডলস নিয়েছি, চূড়া উঠে নাকি খাওয়া হবে। পানির দুটো ছোট বোতল নিয়ে এসেছিলাম আমি, ও-দুটো নিয়ে নিলাম। আর অতি অবশ্যই আমার ক্যামেরাও নরম এই ব্যাগটাতে পুরে নিলাম ক্যামেরার কোনো নিরাপত্তার তোয়াক্কা না করেই – GoPro মানুষ তো, ক্যামেরা গোপ্রো না-ইবা হলো! 😉

🌿

ঘড়িতে ১১:০০

আমরা যাত্রা শুরু করলাম যোগী হাফং জয় করবার অভিপ্রায়ে। আমাদেরকে গাইড করছেন লাল তুয়াই, আর ডান বুয়াই। এই পাড়াই বোধহয় একমাত্র পাড়া, যেখান থেকে দুজন গাইড নিয়ে যেতে হয় – এটাই নাকি পাড়ার নিয়ম। হেডম্যানের ঘরটা পাড়ার একটু নিচের দিকে, তাই আমরা পাড়ার একটু উপরে উঠে আবার পূর্বদিকে নিচে নামতে থাকলাম। অনিক সরকারের প্রকাশিত ট্র্যাক রেকর্ড দেখে জানতে পারছি, তখন আমরা মোটামুটি ±৬১৫ ফুট উচ্চতায় ছিলাম। যোগী হাফং কিংবা জ-ত্লং যাবার বেসক্যাম্পের উচ্চতা তাই বলা যায় ৬০০ ফুটের মতো।

যোগী হাফং বা কন্‌দুক/কংদুক বা ন্যাড়া পাহাড় – ত্রিপুরা ভাষায় যোগী অর্থ বাতাস, আর হাফং অর্থ পাহাড়। বাংলাট্রেক-এ উল্লেখিত উচ্চতা ≈৩,২৪১ – ≈৩,২৫২ ফুট (প্রেক্ষিত ২০১৭), এবং প্রমিনেন্স[টীকা] ৫২৮.২১৫ ফুট।[৩][৪] হেডম্যানের ঘরে রক্ষিত রেজিস্টার খাতায় উচ্চতা লেখা ৩,২৫৪ ফুট। উচ্চতার বিচারে বাংলাদেশের চতুর্থ উচ্চতম পাহাড় এটি। বান্দরবান পার্বত্য জেলার থানছি উপজেলার, ১নং রেমাক্রি ইউনিয়নের দলিয়ান পাড়ার পূর্বদিকে মোদক রেঞ্জে অবস্থিত – ভৌগোলিক স্থানাংক: 21°42’13.0″N 92°36’5.38″E। আরোহীদের অভিমত, এখন (২০১৭) পর্যন্ত বাংলাদেশের সবচেয়ে দুর্গম ট্রেকিং র‍্যুট হচ্ছে যোগী। আর বাংলাদেশের পাহাড়গুলোর মধ্যে এটিই সবচেয়ে খাড়া। পাহাড়টিতে চারটি উল্লেখযোগ্য চূড়া আছে যেগুলোকে ট্রেইলের উঠতি পথ থেকে [দক্ষিণ থেকে উত্তরে] ক্রমান্বয়ে ১, ২, ৩ আর ৪ দিয়ে সূচিত করা হয়; তার মধ্যে চতুর্থ চূড়াটি সবচেয়ে উঁচু আর সেটিকেই আরোহীরা মূল যোগী চূড়া হিসেবে উল্লেখ করে থাকেন।

গাইডদের একজন মোটামুটি ভালো বাংলা জানে, তার সাথে কথা বলে বলে আবু বকর হাঁটছেন। এই গাইড তুলনামূলক যুবক-বয়সী, কিন্তু চেহারায় বেশ ‘জানি জানি’ ভাব – নাম লাল তুয়াই। আমরা নামতে থাকলাম। তারপর একটা বেড়া ডিঙালাম। পাহাড়ি বেড়াগুলো খাঁজ কাটা গাছের উপর দিয়ে ডিঙানো একটা পাহাড়ি রীতি। 😛 এরপর ঝিড়িতে নামলাম – ঝিড়ির নাম লহ্‌ ঝিড়ি। পাড়া থেকে যে তথ্য জেনেছি, তা অ্যালার্মিং – দলিয়ান থেকে যোগী হাফং যেতে লাগে মোটামুটি ৫ ঘন্টা। OMG!! 😶 আমরা নাকি একদিনে দুটো পাহাড় চড়বো! 😆 …মাথায়ই ঢুকে না, এই তো দেখা যাচ্ছে পাহাড়টা, অথচ পাঁ–চ ঘন্‌–টা! ফিরতে যে রাত হবে, তা কি আর বলতে!

লহ্‌ ঝিড়িতে বিশাল বপু পাথর (ছবি: মোহন)
লহ্‌ ঝিড়িতে বিশাল বপু পাথর (ছবি: মোহন)

আমাদের পথটা ঝিড়ি পেরিয়ে এবার ঘন ঘাসের দঙ্গলে ঢুকলো। সদ্য বর্ষা পেরোন পাহাড়ে এখনও প্রচুর সবুজ বর্তমান। তাই ঘাসগুলো এখনও কিছুটা বেয়াড়া। ঘাস পেরিয়ে এবারে উৎরাই শুরু হলো। জলশূণ্য একটা ঝিড়িপথ – ছায়াঢাকা, তাই পাথরে শ্যাওলা জমে আছে, দেখে-বুঝে পা দিতে হয়। কিছু কিছু জায়গায় খাড়া, পিচ্ছিল পাথরগুলো ছায়ার মধ্যে থাকায় কুয়াশাভেজা স্যাঁতস্যাতে, সেগুলোতেও গাইড বাবাজিরা অনায়াসে তিড়িংবিড়িং করে কিচ্ছু না ছুঁয়েই উঠে যায়, আমাদেরকে উঠতে হলে মাটিতে হাত রেখে সাপোর্ট নিতে হয় — আসলেই পাহাড়িরা রিয়্যাল ভার্টিক্যাল অ্যাসেন্ডার। 👍

উপরের দিকে উঠছি দেখে আমি ভাবলাম যোগীতে উঠা বোধহয় শুরু। একটু পরেই পাহাড়টার উপরে উঠে এলাম, সামনে নিচে গাছপালা দেখা যাচ্ছে, বুঝলাম নামতে হবে আবার। এমন সময় ইতি আপা জানালেন ওনাকে জোঁকের ছোট্ট বাবুরা খুব পছন্দ করেছে। টেনে ছাড়িয়ে নিলেন দুটা পা থেকে, একটা আবার পায়ের আঙ্গুলের ভিতর থেকে। আবার ঝিড়ির দিকে নামতে হলো; বুঝলাম, এইটুকু অ্যাসেন্ড আসলে লস প্রজেক্ট ছিল।

যে পথে নামছি, পথটা ঘাসে আবৃত। তবে মানুষ চলা ট্রেইল আঁচ করা যাচ্ছে। একটা জায়গায় গিয়ে মোহন দেখি সাবধানে পা ফেলছে। দেখে ভিরমি খেলাম, শুধু একজনের পা জায়গা হচ্ছে, ট্রেইলে এতটুকু জায়গা আছে। এক পা ডানদিকে দিলেই খাড়া পাড় বেয়ে পড়ে যেতে হবে অনেক নিচে। বড় সমস্যা, জায়গাটা যে এত খাড়া, বোঝাই যাচ্ছে না ঘাসের কারণে – ব্যাপারটা বিপদজনক!

একটু সামনে নামতেই সামনে একটা বিশাল একাঙ্গি গাছ – গাছটা অদ্ভুত চেহারার – দেখে মনে হবে বুকটা নিচ থেকে উপর পর্যন্ত কেউ খোদাই করে খেয়ে ফেলেছে যেন। খাড়া পথটা নেমে আমরা ঝিড়িতে পড়লাম। ঝিড়িতে নেমেই পানির কথা মনে পড়লো – পানি কি এখানেই শেষ? গাইড জানালো, না, পানি আরো উপরেও পাওয়া যাবে। তাই পানি নিলাম না আমরা। এবারে ঝিড়ি পথ ধরেই পথটা এগোচ্ছে। বিশাল বপু সব পাথর কোথাও ডিঙিয়ে, কোথাও পাশ কাটিয়ে এগিয়ে চলেছি আমরা – বুঝতেই পারিনি আসলে যোগীতে উঠা শুরু হয়ে গেছে এই ঝিড়ির আপস্ট্রিম ধরেই। গাইডকে জিজ্ঞেস করলাম, জ-ত্লং যাবার ওয়াই জাংশনে কি চলে এসেছি? জানা গেল সেটা আরো সামনে। ঘড়ি দেখিনি তখন – এখন জানি, ইতোমধ্যে দেড় ঘন্টা পেরিয়ে গেছে।

ঝিড়ি আর ঘন ঝোঁপ পার হতে গিয়ে আবু বকর ছাড়া বাকি সবার সাথেই দেখা গেলো জোঁকের খুব প্রেম হয়েছে। কারো রক্ত খেয়েছে, কারো মাত্র ধরেছে। এই শীতেও জায়গাটা ছায়াঢাকা আর স্যাঁতস্যাঁতে বলেই আসলে জোঁকের এই উপদ্রব। বুঝলাম ঝোঁপঝাড়, জলা থাকলে একটু দ্রুত এগিয়ে যাওয়াই বাঞ্ছনীয় হবে। আবু বকরকে ধরেনি, কারণ আবু বকরের পায়ে বুট ছিল।

একসময় আমরা জ-ত্লং-এর পথটা ছাড়িয়ে যোগীর আলাদা পথ ধরেছি। ঝিড়িপথ — কিন্তু উপরের দিকে উঠছি আমরা। উপর থেকে কলকল করে পানি নেমে আসছে পাথর বেয়ে। কলকল আওয়াজটা শুনেই বুঝতে পারছেন, পানির পরিমাণ কম। কোথাও পাথর, কোথাও মাটি, কোথাও পাথুরে ঢাল। পাথুরে ঢালগুলো বিপজ্জনক, কারণ ভিজা স্যাঁতস্যাঁতে থাকায় জায়গাগুলো পিচ্ছিল হয়। আমি এর মধ্যেই কোথাও ছবি তুলে, কোথাও ভিডিও করে করে এগোচ্ছি। এক জায়গায়তো ভিডিও করতে করতে পা পিছলেই গেল। সাবধান হলাম।

পথটা ঝোঁপ-জঙ্গলে আচ্ছাদিত। কোথাও গাছ উপড়ে পড়েছে, কোথাও বাঁশ – সেগুলোকে ঘিরে ঘাস, লতাপাতা তো নিজেদের বাড়ি বানিয়ে ফেলেছে। এখনও গাছ-ঝোঁপ কাটতে হয়নি অবশ্য, পথ তুলনামূলক পরিষ্কার, শরীর আর মাথা বাঁচিয়ে চলতে পারলেই হয়। আগে আগে যাচ্ছি যুবক গাইড, মোহন, ইতি আপু আর আমি। আবু বকর, কোরেশী আর দ্বিতীয় গাইড পিছনে। চলতে চলতে ইতি আপুকে বলছিলাম, ২০১৩-তে গোড়ালি মচকে গিয়েছিল, সেই ব্যাথাটা আবার মনে হচ্ছে মাথাচাড়া দিতে চাইছে, গোড়ালিতে ব্যাথা করছে খানিকটা। ব্যাথাটাকে আমলে নিতে চাইলাম না, তবে ডান পায়ের গোড়ালিটা যথাসম্ভব গ্রাউন্ড কন্টাক্ট থেকে মুক্ত রাখার চেষ্টা করলাম।

পড়ে থাকা বিশাল গাছের পথ ধরে পথ চলা (ছবি: মোহন)
পড়ে থাকা বিশাল গাছের পথ ধরে পথ চলা (ছবি: মোহন)

এক জায়গায় একটা লম্বা গাছ লম্বালম্বি পড়ে আছে, সেটার উপর দিয়ে যেতে হয়। সামনে এগিয়ে ঝিড়িতে পাথরের খাঁজে জমানো স্বচ্ছ পানিতে দেখি কিসের ডিম যেন জমাট বেঁধে আছে। কাছে যেতেই পাশে ব্যাঙাচিগুলোকে ঘুরতে দেখে বুঝলাম, এটা ব্যাঙের ডিম। আরেকটু সামনে তিন ধাপে একটা পাথুরে জমিন নেমে এসেছে, জায়গাটা দিয়ে পানিও পড়ছে, স্যাঁতস্যাঁতে আর মারাত্মক পিচ্ছিল – এদিক দিয়েই উপরে উঠতে হবে। জুতা নিয়ে উঠাটা একটু মশকিলই। মোহন আগে উঠে গেলো। আমার গলায় ক্যামেরা ঝোলানো – উঠতে গিয়ে পিছলে নেমে এলে ক্যামেরার দফারফা হয়ে যাবে। মোহন তাই আমাদেরকে টেনে তুললো জায়গাটায়। উপরে উঠার পর মনে হলো, খালি পা হলেই বোধহয় ভালো হতো, ছোট্ট ছোট্ট খাঁজে বুড়ো আঙ্গুল আটকিয়ে তরতরিয়ে উঠে পড়া যেত।

দুপুর ১টা নাগাদ আমরা একটা জায়গায় গিয়ে পৌঁছলাম, ডানদিকে খাড়া নিচে নেমে গেছে, গাইড বামদিকে পাহাড়ে বাঁশ কাটতে কাটতে এগোচ্ছে। এখানটায় বাঁশ ধরে শরীরের ভর রেখে এগোতে হবে। পথের দুর্গম অবস্থা আর কোত্থাও আগের কাঁটা বাঁশ না দেখে ইতি আপু নিজেকেই যেন বললো, “আগের দল গেল কিভাবে এদিক দিয়ে!”

এই পর্যন্ত ট্রেক করে উঠে এসে আমার পর্যবেক্ষণ ছিল, যোগীতে উঠার পথের মধ্যে এটা একটা পথ, আর উঠার পথটা গাইডভেদে বিভিন্ন হয়। সামনের এই যুবক গাইডকে এপর্যন্ত আসতে দেখে আমার কেন জানিনা মনে হয়েছে, সে একটু বেশি অ্যাডভেঞ্চারাস। হয়তো এর চেয়েও সহজ র‍্যুট ছিল, সামান্য ডানে, কিংবা সামান্য বামে, কিন্তু সে চ্যালেঞ্জিং র‍্যুটটাই বেছে নেয়।

পাড়া থেকে যে তথ্যটা জেনেছি, সামনের তিনজনের দলটা এই মৌসুমের প্রথম দল, যারা যোগী যাচ্ছে। তারা এতক্ষণে উপরে উঠেছে কিনা আমরা জানি না। চূড়ায় উঠুক কিংবা না, ওরা নেমে এলে দেখা হবে ওদের সাথে। …পথটা অন্যান্য সব ঝিড়ির মতো একঘেয়ে। কিন্তু পার্থক্য হচ্ছে, পথটা তুলনামূলক দুর্গম আর খাড়া। কোথাও বাঁশ ধরে, কোথাও পাথর ধরে উপরে উঠতে হচ্ছে। একটা গাছ থেকে অদ্ভুত একটা শিকড়-ঘরানার কিছু একটা নেমে এসেছে — বড় মোটা সাপের মতো আঁকাবাঁকা আর চ্যাপ্টা, কিন্তু শক্ত।

পাথরের আকারগুলো বিশা-ল বিশাল। সেই সব পাথরে পা রেখে রেখেই উঠে যাচ্ছি আমরা। পথটা ধীরে ধীরে উপরের দিকে উঠছে, আর আমাদেরও গতি স্বাভাবিক, তাই তেমন একটা কষ্ট হচ্ছে না আমার — মানে টানা খাড়া পাহাড় বেয়ে উঠার মতো কোনো কষ্টই হচ্ছে না এখনও। পাথর আর পাথর, সামান্য জল কোথাও; কিন্তু পাথরগুলো বড় বড় হওয়ায় খাড়াটা বেশিই একটু। এক জায়গায় পাহাড়ের সামান্য খাঁজে পা রেখে উপরে একটা গাছের মোটা শিকড় ধরে, নিচে পড়া থাকা একটা গাছের গুড়ি মাড়িয়ে এগোতে হয়। সামনের দলটা যে এদিক দিয়ে গেছে, বোঝা যাচ্ছে, কারণ গাছের গুড়িটা দৈবচয়িত না – মনুষ্যসৃষ্ট।

স্পঞ্জ পাথর (ছবিটার ফোকাস ঠিক হয়নি)
স্পঞ্জ পাথর (ছবিটার ফোকাস ঠিক হয়নি)

পথটা ক্রমশ খাড়া হচ্ছে। এক জায়গায় একটা গাছের গুড়ি পড়ে থাকতে দেখলাম – উঁই বা অন্যকিছু গুড়িটাকে শুঁষে খেয়ে স্পঞ্জ বানিয়ে ফেলেছে — দেখে মনে হবে প্রবাল পাথর একটা। কোথাও ঝিড়ির পানি জমেছে একটু গভীর কোনো খাঁজে, সেখানে চিংড়িরা তাদের রাজত্ব তৈরি করেছে। চিংড়িগুলো কিনারার দিকে এগোতে চাইছে, সম্ভবত গভীর পানির চেয়ে সেখানটায় ভাসমান খাদ্যকণা থাকে। কিন্তু হাত বাড়াতে গেলেও ওরা সটকে পড়ে। বিয়ার গ্রিল্‌সের কাছে শিখেছিলাম, যে পানিতে চিংড়ি আছে, সে পানি পরিষ্কার। অবশ্য জানি, আবু বকরের বিয়ার গ্রিল্‌সের ব্যাপারে একটু অ্যালার্জি আছে।

যোগীর পথে বিশ্রাম; আমি চিংড়ির ভিডিও করছি (ছবি: আবু বকর)
যোগীর পথে বিশ্রাম; আমি চিংড়ির ভিডিও করছি (ছবি: আবু বকর)

আমাদের চলার গতি বেশ ধীরই, তাই আলাদা করে জিরিয়ে নেয়ার ব্যাপারটা নেই। তবু মোহনের কোমরের পাউচ থেকে খেজুর নিয়ে চিবোচ্চিলাম থেকে থেকেই। পানি খুব কমই খাওয়া হয়েছে। আবু বকর আর কোরেশী একটু বেশিই পিছনে পিছনে আসছে। তাদের অবস্থা দেখে আমাদের লিজেন্ডারী আবু বকরের তো ইজ্জতহানীই করে বসলো যুবক গাইড, বলে কিনা: অনেক লেট হবে। ঐ দুজনও (আবু বকর আর কোরেশী) যদি আপনাদের মতো হাঁটতো, তাহলে আরো তাড়াতাড়ি উঠা যেত। 😜

শুনে আমি আর মোহন অট্টহাসিতে ফেটে পড়লাম: ব্যাটা তুই জানিস না, কী মেশিনরে তুই কী বলছিস! এ হলো আমাদের লিজেন্ডারী আবু বকর, যে আমাদেরকে পাহাড় চড়তে শিখিয়েছে। তবে ও-বেটার কথাটাকে ফেলেও দিতে পারছি না। আগের আবু বকরকে আমরা আসলেও পাচ্ছি না। ভুঁড়ি বেড়ে যাওয়ায় পিছিয়ে পড়ছেন, আলসেমী ধরেছে, দেখে নেবো এক হাত, ব্যাপ্পার না-টাইপের সেই মনোভাব এখন আর মাথাচাড়া দিয়ে উঠে না। কথাটা মোহন তার বন্ধু আবু বকরকে যে ভাষায় বললো, তা আর আমি না বলি। 😄 বন্ধু, বন্ধুকে অনেক কিছুই বলতে পারে।

ঢালু পাথর বেয়ে শিকড় ধরে উঠা (ছবি: মোহন)
ঢালু পাথর বেয়ে শিকড় ধরে উঠা (ছবি: মোহন)

পথটা ক্রমশ দুর্গমতর হচ্ছে। একটা জায়গা অধিকাংশ যোগী অভিযাত্রীর অ্যালবামে দেখেছি পরে, সেটা হলো: দুপাশে পাথরের খাড়া পাড় ঘিরে ধরেছে, নিচে ছোট্ট একটা খাঁদ, সেখানে পানি আছে, আর ডানদিকের পাড় ঘেষে একটা ঢালু পাথর, সেটা বেয়েই উঠতে হবে। জায়গাটা বর্ষা মৌসুম না হয়েও শ্যাওলায় ঢাকা, আর পিচ্ছিল। আর সেখানেই প্রকৃতি তার ব্যবস্থা করে দিয়েছে, গাছের দুটো শেঁকড় ডানদিক থেকে এমনভাবে বের হয়ে আছে, মনে হচ্ছে রেলিং দিয়ে দিয়েছে যেন ধরে ধরে উঠবার জন্য। যুবক গাইড আগেই উঠে গেছে, ইতি আপু প্রথমে, তারপর মোহন, আবু বকর, আমি আর কোরেশী। সেখানে আবার আল্লা’র কোনো দয়াবান বান্দা ভুল বানানে লিখে রেখেছে: (6) সাবধান ধিড়ে ধিড়ে উঠুন। (সিক্স কী ডিনোট করছে, বুঝিনি)

মোহন বেচারা উঠার সময় ভিডিও চালু করলাম, কিন্তু ও-বেচারা কি মোটা হয়ে গেছে নাকি, সামান্য একটা ঢাল বেয়ে উঠতে এতো হাচড়াচ্ছে-পাচড়াচ্ছে কেন!! পরে আমি উঠতে গিয়ে বুঝলাম, মূল কারণ পাথরটা শ্যাওলার কারণে পিচ্ছিল, আর পানিতে পা পড়ে আমাদের জুতার তলাও ভিজে আছে। অবশ্য আমার মতো শুকনা কাঠি নিজেকে তুলতে কোনো কষ্টই হয় না, শিকড়ে ধরে ঝুলে গেলেই হয়। মোহনের হাচড়-পাঁচড় ভিডিওতে উঠে যাওয়ায় বেচারা তো লজ্জায় লাল! 😗

যোগী হাফং আরোহণ - মোহনকে দেখা যাচ্ছে
যোগী হাফং আরোহণ – মোহনকে দেখা যাচ্ছে

একটু অপেক্ষা করলাম এখানে। ডানদিকে তাকিয়ে দেখি অপূর্ব পাথুরে খাঁজ পাহাড়টার। পাথরের দঙ্গল বেয়ে উঠে যাচ্ছি আমরা। গাছের জঙ্গলে যেমন করে গাছ আর গাছ থাকে, পাথরের দঙ্গলে তেমনি থাকে পাথর আর পাথর। ১৩:৪০ নাগাদ আমরা একটা বড়সড় ফাঁকা জায়গায় উঠে এলাম। ফাঁকা জায়গা মানে খোলা মাঠ না, বরং পাহাড়ের আরেকটা খাঁজ, যেখানে এই পাহাড়ের অন্য সব জায়গার মতোই পাথুরে পাহাড়ের গায়ে উলম্ব হয়ে ঝুলে গজিয়েছে গাছ, তবে জায়গাটাতে পাথরের দঙ্গলে একটু ক্লিয়ারিং তৈরি হয়েছে। জায়গাটা আলাদা কিছু না, দাঁড়িয়ে উপভোগ করার মতো কোনো জায়গা না, তাই আমরাও এগিয়েই চলছিলাম। কিন্তু…

আমাদের সবাইকে আশ্চর্য করে দিয়ে কোরেশী বলে কিনা, “তোমরা যাও, আমি এখানে থাকি।” এই ‘থাকি’ মানে কিন্তু ‘সামান্য একটু বিশ্রাম নিই’ না বরং এর অর্থ হলো: আমি আর যাচ্ছি না। সাথে সাথে প্রতিবাদ করে উঠলাম দলের প্রত্যেকেই। বুঝলাম বেচারা বেশি ক্লান্ত হয়ে গেছে। এতক্ষণ খেয়ালই করিনি, কোরেশী যে পুরোটা ট্রেইলই সবার পিছনে ছিল। সে দুর্বল হয়ে পড়ছিল এই ট্রেইলের প্রতিটা ধাপে। সেই দুর্বলতা এবার ওকে জেঁকে ধরেছে – সে পাহাড় চড়ায় ইস্তফা দিতে চাইছে।

তখনই আমার মনে পড়লো, কতটা বোকার মতো একটা কাজ করেছি, ডে-প্যাকে ওডোমস রাখিনি। আফসোস। পরিকল্পনার অভাব থাকলে যা হয়। এখন যদি কোরেশীকে এখানে রেখে যেতেই হয়, সে নিশ্চিত মশার কামড়ে ম্যালেরিয়া বাঁধাবে। সবাই যার যার জায়গায় অপেক্ষা করলাম। ওর পাশে আবু বকর আছেন। তিনি বোঝানোর চেষ্টা করছেন তাকে – এটা বসার জায়গা না। ওপর থেকে মোহনও বোঝানোর চেষ্টা করলো, এটা বিশ্রাম নেয়ার কোনো জায়গা না।

ব্যাপারটা কোরেশীও বুঝতে পারছে। জায়গাটা এই সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য উপযোগী না। যারা জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারির দিকে যোগী গিয়েছেন, তারা ডিসেম্বরের পরিবেশটা বুঝতে পারবেন না। ডিসেম্বরে ঝিরিতে কলকল করবার মতো পানি আছে, রাতে কুয়াশা পড়ে নিচের মাটি ভিজে স্যাঁতস্যাতে থাকে, শীতকালীন সূর্যের তীর্যক আলো আর বাতাসের তুলনামূলক আর্দ্রতাহীনতা তেমন কোনো বিপুল শুষ্কতা আনতে পারে না মাটিতে, তাই সামান্য একটু ঘাস গজানোর সুযোগ পেলেই সেখানে জোঁক থাকছে, আর সাথে থাকছে মশাও – যদিও পরিমাণে কম।

কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেয়ার পর, আর আবু বকরের প্রেষণায় কোরেশী উঠে দাঁড়ালো – দল উপরে যাবে। গাইডকে একটু পর পরই কতক্ষণ লাগবে জানতে চাইলে যে উত্তরটা আমরা আশা করি সেটা হলো: এইতো দশ মিনিট। কিন্তু গাইড বলে তিন ঘন্টা, আড়াই ঘন্টা, এক ঘন্টা। এই অনন্ত পথ যেন আর শেষই হতে চায় না। একটা চূড়ায় আরোহণ যে এতো দূর আর এতো সময়ব্যাপী হতে পারে কোনো ধারণাই ছিল না। নিজেকে মোটিভেট করবার আকাল থাকলে, এই ট্রেক আপনাকে ভোগাবে।

এবারে একটা বড়সড় গর্তে পরিষ্কার পানি থাকাসত্ত্বেয় চিংড়ি না থাকায় আবু বকর বলে উঠলেন, “চিংড়ি নাই, তার মানে পানি ভালো না।” আমি চমকে উঠলাম, আবু বকর, বিয়ার গ্রিল্‌স আওড়াচ্ছেন! ভূতের মুখে রাম-নাম! 😮 একটু উপরে উঠতেই সবাই চাক্ষুস করলাম কেন চিংড়ি ছিল না ডাউনস্ট্রিমে — কোনো এক আল্লা’র মাল আদম সন্তান প্রাকৃতিক বড় কর্মটি 💩 করে রেখেছে ঠিক ঝিড়ির জল পথেই একটা পাথরের উপরে। আবু বকর বললেন, “আর জায়গা পেল না ব্যাটা!” 😠

খাবার উপযোগী নয় এমন গোটা/ফল (ইনসেটে ফলটা বড় করে দেয়া আছে)
খাবার উপযোগী নয় এমন গোটা/ফল (ইনসেটে ফলটা বড় করে দেয়া আছে)

আরো সামনে এগিয়ে দেখি মেঝেতে কী একটা ফল পড়ে আছে, অনেকটা সিলেটি ভাষায় ডাকা “মেড়ুক” ফলটার মতো। “মেড়ুক”-কে সিলেটিরা ‘ফল’ বলেন না, বলেন ‘গুটা’ (গোটা)। আমাদের গাইডদের অভিব্যক্তি দেখেও তা-ই বোঝা গেলো, এই নাম-না-জানা ফলটাকেও এরা খাবার-উপযোগী বলে মনে করেন না – খান না। গাছভর্তি গোটায়, থোকায় থোকায় ঝুলে আছে, যেনবা ফুটফুট আপেল কোনো।

যোগী ট্রেইলের টারজানহীন জেন ইতি আপু (ছবি: মোহন)
যোগী ট্রেইলের টারজানহীন জেন ইতি আপু (ছবি: মোহন)

এবারে ঝিড়িটা নালার মতো হয়ে গেছে, দুপাশ থেকে পাথুরে পাহাড়টা এমনভাবে চেপে এসেছে যে, পথটা সরু হয়ে গেছে। পথটা আরো জঙ্গলাকীর্ণ হয়ে গেছে, গাইডকে প্রায়ই বাঁশ, ডাল কেটে পথ পরিষ্কার করা লাগছে, যদিও আগের দল এদিকেই গেছে। এক জায়গায় একটা লত ঝুলে থাকতে দেখে আমাদের টারজানহীন জেন – ইতি আপুর, দোল খাওয়ার শখ হলো। মানা করলাম আমি। কারণ, গাছের লতা ধরে ঝুলাঝুলিতে আমার অভিজ্ঞতা ভালো না। ছোটবেলায়, নানুবাড়িতে একটা গাছের নিচে একাধিক লতা ঝুলে থাকতে দেখে আমারও এমনি টারজান হবার শখ হয়েছিল। যেইনা, একটা ধরে আআআ… রবে ঝুলেছি, ওমনি ধপাশ। নানু’র আরেকটু হলে কাঁদতে বাকি — তাঁর সুন্দরলাউ-এর লতা ছিড়ে ফেলেছি! ইয়া মোটা লতাটাকে দেখে কে বুঝেছিল এটা শ্রেফ হালকা একটা পরজীবি! …ইতি আপু ক্ষ্যান্ত দিলেন ঝুলাঝুলিতে, কিন্তু মোহনের ক্যামেরায় বেশ একটা ঝুলুনি পোয দিয়ে দিলেন ঠিকই।

আমার ডান পায়ের গোড়ালির ব্যাথাটা টের পাচ্ছি না। কিন্তু ডান পায়ের হাঁটুটা ব্যথা করছে। প্রতিবার ভাঁজ করতেই ব্যাথা করছে। আর ভাঁজতো করতেই হচ্ছে, কারণ সিঁড়ি উঠবার ব্যাপারটাই উপরের ধাপে পা রেখে নিজের পুরো শরীরটা এবার ঐ পায়ের উপর ভর দিয়ে টেনে তোলা। আর আমরা তো সিঁড়িই বাইছি, এক্সট্রিম সিঁড়ি – সাত তলা নয়, দশ তলা নয় – ১২ ফুট যদি বিল্ডিংয়ের একেকটা তলা হয়, তাহলে আমরা এখন বাইছি ৩২৫০ ফুট ÷ ১২ = ২৭০তলা।

অদ্ভুত এক গোটা দেখলাম গাছের শিকড়ে আটকানো
অদ্ভুত এক গোটা দেখলাম গাছের শিকড়ে আটকানো

আরেকটু উপরে হঠাৎই মাটিতে একটা ফলের দিকে চোখ আটকে গেল — ফল/গোটা/শেকড় যে নামেই ডাকুন না কেন জিনিসটা অদ্ভুত। একটা শিকড়ের গোড়ায় যেনবা কেউ কাদামাটি হাত দিয়ে মোটা করে লেপে রেখেছে – একটা বড়সড় গোটা তৈরি হয়েছে। গাইডরা তখন দূরে, জিজ্ঞেস করা হয়নি কী এটা।

ঝিড়ির এক জায়গায় গাইড আমাদেরকে জানালেন, এটাই পানির সর্বশেষ উৎস। এর উপরে আর পানি পাওয়া যাবে না। এখানে ঝিড়ির পানি খুব সরু ধারায় নেমে যাচ্ছে। পানিটা নষ্ট না করে খাবার উপযোগী করে তুলে নেয়ার জন্য পাহাড়িরা দুটো বাঁশ পরস্পরের সাথে লাগিয়ে পানি পরিবহনের ব্যবস্থা করেছে। শেষ বাঁশের-ফলাটার সামনে বোতল ধরলে পানি ভরা যায়। আমরাও পানি পান শেষে বোতল ভরে নিলাম। সত্যি বলতে কি পানির জন্য টীমকে একটি বারের জন্য হাসফাঁস করতে দেখিনি, তার মূল কারণ শীতকাল আর আমাদের ধীর গতি। ধীরে ধীরে উঠায় পাহাড়টার উচ্চতার তুলনায় আমাদের পরিশ্রম তেমন হচ্ছে না। জলপান শেষে আবার [বি]পথচলা।

আগে অনেকবার বলেছি, বাংলাদেশের ‘অন্যতম বিপদজনক’ না, বরং ‘সবচেয়ে বিপদজনক’ ট্রেক র‍্যুট এই যোগী। এবার সেইসব বিপদজনক চেহারা সে একে একে দেখাতে শুরু করলো। আমরা একটা জায়গায় হাজির হলাম, গাইড আমাদের ডানদিকে খাড়া, ন্যাঁড়া দেয়ালটা বেয়ে তরতর করে উঠে যাচ্ছে। আমরা কোনো ক্লাইম্বিং রোপ নিয়ে আসিনি – আমরা হেঁটে হেঁটে পাহাড় জয় করতে এসেছি — এ কোন আপদ এসে হাজির হয়েছে! 😶 কয়েক সেকেন্ডের জন্য প্রত্যেকের চেহারাই বাংলার পাঁচ হয়ে গেল।

ভয়কে জয় করে আমরা একে একে ঐ খাড়া দেয়ালে প্রথমে হাত রাখলাম, পাথুরে মেঝে কামড়ে কামড়ে উঠতে হবে। আমি আমার ক্যামেরাটা পিঠে দিয়ে দিলাম। পাথুরে দেয়ালে ছোট্ট ছোট্ট খাঁজ, তাতেই হাত, পা আটকে উঠতে হবে। আল্লা আল্লা করে মাকড়সার মতো পাহাড়ি দেয়াল বাওয়া শুরু করলাম – মাথায় শুধু একটাই কথা: পড়লে শেষ। কোথাও ছোট্ট একটা/দুটা বাঁশ পাওয়া যাচ্ছে, কোথাও হয়তো কোনো গাছের শেকড়ের সামান্য মোটা অংশটা আলতো করে ছুঁয়ে মনকে প্রবোধ দিয়ে উপরে উঠছি। উঠছি আর ভাবছি, ফেরার সময় এই পথ ধরে নামবো কিভাবে? 😱 নামাতো দ্বিগুণ কঠিন হবে – সব সময় দেখেছি উঠার চেয়ে নামাটা বেশি কঠিন হয়।

যোগী আরোহণে পরিশ্রান্ত কোরেশী (ছবি: সিফাত ফাহামিদা ইতি)
যোগী আরোহণে পরিশ্রান্ত কোরেশী (ছবি: সিফাত ফাহামিদা ইতি)

কিন্তু কিভাবে জানি না, খাড়া দেয়ালটা বেয়ে আমরা উপরে উঠে গেলাম। কিন্তু কোরেশী এখনও নিচে। সে আর কোনোভাবেই যাবে না সামনে (উপরে)। এতক্ষণ আবু বকরকে নিয়ে মজা করার সময় আমরা কেউই খেয়াল করিনি যে, কোরেশী সময়ে সময়ে আরো পিছিয়ে পড়ছে, তার চেহারায় বিরক্তি তৈরি হয়েছে, তাকে ক্লান্তি জেঁকে ধরেছে, এবং ধীরে ধীরে তা তাকে দখল করে বসেছে। একারণেই সে সবার পিছনে ছিল, পিছনেই পড়ে ছিল, কারো সাথে তেমন গল্প-গুজবও করেনি, মোটিভেশনও ধার করেনি।

বেলা আড়াইটার মতো বাজে। ঘড়িতে সূর্য অস্ত যায় সোয়া পাঁচটার দিকে, কিন্তু পাহাড়ের কারণে সেই সূর্যটা আসলে ৪টার দিকেই অস্ত যায়। জায়গাটাও গাছ-গাছালিতে ঘেরা, ছায়া-ঢাকা, আর তাই জায়গাটা মশার জন্য আদর্শ। জোর গলায় প্রতিবাদ করলাম, এখানে কোনোভাবেই ওকে বিশ্রামে রেখে যাওয়া যাবে না – এটা বিশ্রাম করার জায়গাও না।

কিন্তু কোরেশী অনড়। সে আর কোনোভাবেই পারবে না।

পিকচার আভি বাকি হ্যয় ম্যারে দোস্ত!

(আগামী পর্বে সমাপ্য)

-মঈনুল ইসলাম

পরের পর্ব »

_______________________________________

টীকা

টপোগ্রাফিক প্রমিনেন্স বা সমুন্নতি উচ্চাংশ বা তুলনামূলক উচ্চাংশ বা স্বাতন্ত্র: একটা পাহাড় চূড়া কতটা স্বতন্ত্র সেটা নির্ভর করে ঐ চূড়া থেকে কতটা কম নেমে আপনি তার চেয়ে উঁচু কোনো চূড়ায় যেতে পারবেন — এটাই কোনো চূড়ার তুলনামূলক উচ্চাংশ বা প্রমিনেন্স (Topographic prominence)

Topographic prominence (তথ্যচিত্র: রাতুল ভাই)
Topographic prominence (তথ্যচিত্র: রাতুল ভাই)

প্রমিনেন্স দরকার হয় কারণ, পাহাড় কিংবা পর্বতারোহণে প্রকৃত সামিট (main summit) আর উপসামিট (sub summit) বিষয়টা নির্ধারণ করবার ব্যাপার থাকে। অর্থাৎ একটা চূড়া নিজেই স্বতন্ত্র কোনো চূড়া না অন্য চূড়ার অংশ সেটা বুঝতে প্রমিনেন্স জানার দরকার হয়। দুইটা চূড়া পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে — এরা দুটোই আলাদা দুটো চূড়া হতে পারে আবার এমনও হতে পারে ছোট চূড়াটা নিজে আলাদা/স্বতন্ত্র কোনো চূড়া না বরং বড় চূড়াটারই একটা অংশ কিংবা সাবসিডিয়ারী পিক বা উপচূড়া (Sub Peak)। দুইটা চূড়া পাশাপাশি থাকলে প্রমিনেন্স মাপা হয় ছোট চূড়াটার — বড়টার না।[৫] কোন চূড়াকে স্বতন্ত্র চূড়া বলতে হলে এর সর্বনিম্ন প্রমিনেন্সের কিছু মাপকাঠি UIAA (International Climbing and Mountaineering Federation) নির্ধারণ করে দিয়েছে: যেমন, দুটি চূড়ার মধ্যকার প্রমিনেন্স ৩০ মিটারের কম হলে তাকে উপচূড়া, ৩০ থেকে ৩০০ মিটারের মধ্যে হলে ইন্ডিপেন্ডেন্ট পিক আর ৩০০ মিটারের বেশি হলে আলাদা পর্বত বলা হয়।[৬]

তথ্য সহায়তা

  1. পর্বতারোহণে বাংলাদেশী নারী^মীর শামসুল আলম বাবু; পর্যটনবিচিত্রা
  2. রুমা আপা সম্পর্কে তথ্য দিয়ে সহায়তা করার জন্য রবিউল হাসান খান মনা ভাইয়ের কৃতজ্ঞতা স্মরণ করছি
  3. [বাংলাদেশের পাহাড়] চূড়ার তালিকা^ – বাংলাট্রেক
  4. যোগী হাফং^জাহিদুল ইসলাম জুয়েল – বাংলাট্রেক
  5. টপোগ্রাফিক প্রমিনেন্স বুঝিয়ে বলার জন্য রাতুল (লেখনীনাম: রাতুলবিডি) ভাইয়ের কৃতজ্ঞতা স্মরণ করছি
  6. প্রমিনেন্স বিষয়ে UIAA’র তথ্যে সোয়াইব সাফি’র কৃতজ্ঞতা স্মরণ করছি

২ thoughts on “যোগী হাফং – একটি ব্যর্থ অভিযান – ২

  1. পড়তে ছিলাম। বেশ অ্যাডভেঞ্চারাস লাগছিলো। কিন্তু কৃতজ্ঞতা অংশে আমার মত অর্বাচীনের নাম দেখে ইয়ে মানে “মুই কি হনুরে” টাইপ ভাব চলে আসছে।

মন্তব্য করুন