তরল স্বর্ণের দেশে ২০০১: কিস্তি ১

ধারাবাহিক:  তরল স্বর্ণের দেশে ২০০১ —এর একটি পর্ব

  • তরল স্বর্ণের দেশে ২০০১: কিস্তি ১

২০০১ খ্রিস্টাব্দে এসএসসি পরীক্ষা দিয়েই আমার প্রথম বিদেশ ভ্রমণ নিয়ে একটা পাণ্ডুলিপি লিখে রেখেছিলাম। আজ ১৫ বছর পরে, তখনকার চিত্রের সাথে এখনকার চিত্রের যদিও বিস্তর ফারাক, তখন সেলফি ছিল না, ডিজিট্যাল ক্যামেরা ঘরে ঘরে রমরমা হয়নি, মোবাইল ফোন সবার কাছে ছিল না, ঢাকার রাস্তায় গাছ ছিল না; কিন্তু এই বর্ণনায় সবসময়কারই বিদেশ-বিভূঁই-এর কিছু চিত্র উঠে এসেছে, যা সর্বজনীন। বয়স কম ছিল, তাই ক্ষেত্রবিশেষে আনাড়ি মনে হতে পারে আমাকে। কিন্তু অভিজ্ঞতা, অভিজ্ঞতাই। সুতরাং পুরোন স্মৃতি হলেও জ্ঞানের প্রশ্নে তরতাজা। ভ্রমণকালীন কোনো ডায়রি লিখিনি, তাই পাণ্ডুলিপিটা ছিল ফিল্ম থেকে ওয়াশ করা ছবি আর স্মৃতিচারণের মিশেল। সামান্য কাটছাঁট করে সেটাকেই তুলে দিচ্ছি…

চুঙ্গিঘর থেকে চুঙ্গিঘরে

২০ এপ্রিল ২০০১, সকাল ৭:৩০

ফ্লাইটের আড়াই ঘন্টা আগে, বাসা থেকে বিমানবন্দরে রওয়ানা করেছি, তখন থাকতাম রামপুরা টিভি সেন্টারের পিছনে একটা ভাড়া বাসায়। আম্মার থেকে বিদায় নিলাম রোবটের মতো, কারণ মাথায় টেনশন, সামনে অজানা-অচেনা পথ, যাত্রী আমি একা… কী হবে কী হবে…। আমাকে এগিয়ে দিয়ে আসতে সাথে রয়েছেন দু’জন: আব্বার বন্ধুর অফিসের পরিচিত একজন, আর আমার সেঝ মামা।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজাতে অনুষ্ঠিত হবে International Art Biennial, তার সুবাদে আমিরাত সরকার কিছু ভিসা ছেড়েছে, আমার বাবা থাকেন দুবাইতে, তিনি আবেদন করায় আমার একটা ভিসা হয়ে গেছে। সেই ভ্রমণ ভিসায় যাচ্ছি আমি। বয়স কত ছিল তখন আমার? মাত্র এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছি, বিপুল অবসর, তখনই এই বিদেশ-যাত্রা। এসএসসি দেয়া ছেলেরা যেমন জোয়ান, ইয়াব্বড় আকারের হয়, আমি মোটেই সেরকম নই। উচ্চতা পাঁচ ফুট ইঞ্চিখানেক হবো, শুকনা কাঠি – দেখে মনে হবে মাত্র ফাইভ-সিক্সে উঠেছি। তার উপর, বাংলা মাধ্যমের ছাত্র বলে ইংরেজিতেও পটরপটর করে কথা বলতে পারি না – বেশ বেকায়দাই বলা যায়।

জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছে গেটে আমার টিকেট দেখিয়ে ভিতরে ঢুকলাম, আমার সাথে রইলেন আব্বার বন্ধুর অফিসের সেই পরিচিতজন, আর মামা বাইরেই রয়ে গেলেন। আমার সাথে যাচ্ছে আমার একটি লাগেজ আর আব্বার দোকানের জন্য ওনার বন্ধুর গার্মেন্টের কিছু নমুনা ভর্তি একটি ট্র্যাভেল ব্যাগ। ব্যাগ দুটো ব্যাগেজ স্ক্রীনে দিলাম। ওপাশ দিয়ে বেরিয়ে যেতেই ব্যাগে ‘ব্যাগেজ পরীক্ষিত’ (“Baggage Screened”) লেখা একটা ট্যাগ সাঁটা হলো; মানে আমার ব্যাগ সন্দেহমুক্ত – এতে সমস্যা নেই। ব্যাগ দুটো নিয়ে গেলাম ইরান এয়ারের কাউন্টারে (যেহেতু আমি ঐ এয়ারলাইন্সের টিকিট করেছি)। সেখানে ব্যাগ জমা দিয়ে টিকেট আর পাসপোর্ট দেখালাম। তারা ওকে করে ফেরত দিলো ওগুলো। সাথে হাতে ধরিয়ে দিলো একটা ছোট্ট কার্ড, কার্ডটা পড়ে জানতে পারলাম ওটা ‘আরোহণের ছাড়পত্র’ (Boarding Pass)। এই কার্ডের একটি নাম্বার দেখিয়ে বলা হলো, এটা আপনার সীট নাম্বার, উপরে তা লেখাও আছে।

মুজতবা আলীর চুঙ্গিঘরের (বিমানবন্দর) আসল চুঙ্গিওয়ালার কাছে যাবার সময় এসে গেছে আমার; গেলাম ইমিগ্রেশনে (Immigration Desk)। আমার বুক ধুকপুক করছে। আমার সর্বশেষ পরিচিতজনকেও রেখে চলে এসেছি। ডানদিকে ইমিগ্রেশন কাউন্টার। কাস্টমসের সাদা রঙের পোশাক পরা দুজন লোক দাঁড়িয়ে। কাউন্টারটাও বেশ উঁচু (হয়তো আমি খাটো বলেই)। তাঁদের একজন আমার দিকে মুখ বাড়িয়ে তাকালেন। এই ভঙ্গিটা অনেকটা “Baby’s Day Out” চলচ্চিত্রে মাদার গূয কর্ণারের মহিলার মতো, যে বাচ্চার দিকে একটা অদ্ভুত মেকি দৃষ্টিতে তাকাচ্ছিল। আমার হার্টবিট হয়তো বেড়ে গেছে। তিনি আমার কাছে পাসপোর্ট আর টিকেট চাইলেন আর আমাকে প্রশ্ন শুরু করলেন: নাম, বাবার পেশা, কোথায় থাকেন বাবা, কতদিন থেকে আছেন ইত্যাদি ইত্যাদি। আমেরিকান এম্বেসিতে নাকি মুহুর্মুহু প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে অনেকে ভুল করে ফেলেন। আমিও সেরকমই যেন অনুভব করলাম। তার উপর আমার একটা জন্মগত স্বভাব হলো আমি কোনো কথা মস্তিষ্কে খুব দ্রুত গ্রহণ করতে পারিনা, তাই আমার জবাব দিতে দেরি হয়; এতে অনেকে ভাবতে পারেন আমি মনের মধ্যে কথাটাকে বানিয়ে নিচ্ছি। এখানেও হয়তো ব্যাপারটা ঘটলো, আর ‘চুঙ্গিওয়ালা’ আমার প্রতি সন্দিঘ্ন হয়ে পড়লেন। তিনি আমাকে যা বললেন তার সারমর্মটা হলো, যাও এভাবে পাস দেয়া যাবে না। আমি তো মহাশূন্য থেকে পড়লাম, এ’ বলে কী? কথাটা হজম করতে গেলো কয়েক মিনিট, তারপর অবনত মস্তকে হাতে পাসপোর্ট আর টিকিটসমেত ছোট হাতব্যাগটা নিয়ে আবার বেক টু দা প্যাভিলিয়ন। বাইরে উৎসুক আমার সেই পরিচিতজন। তিনি আঁচ করতে পারলেন হয়তো ঘটনাটা, আমায় জিজ্ঞেস করেই ধরতে পারলেন ব্যাপারটা।

আবার আমাকে নিয়ে হাজির হলেন ইরান এয়ারের কাউন্টারে। সেখানে যে ব্যক্তি আমার টিকিট ওকে করে দিয়েছিলেন, তাঁকে ব্যস্ত পাওয়া গেল। তাঁর ব্যস্ততা কমতেই তাঁর কাছে ঘটনা আরজ করা হলে তিনি তো মহাক্ষেপা, এটা কি মগের মুল্লুক নাকি, জেনুইন একটা ভিসা নিয়ে রঙ তামাশা, না দেয়ার তো কোনো কারণই নেই। তিনি আমাদের আশ্বস্থ করলেন, ব্যাপারটা তিনি দেখবেন। তবে তাঁকে তাঁর দায়িত্ব পালন করে তবেই সেখানে যেতে হবে, অর্থাৎ বাকি সময়টা আমাদের এখানেই দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। আমার চোখের সামনে থেকে তখন দুবাই নামক শহরের কল্পিত রূপরেখা মুছে যেতে থাকলো একে একে- আমার তো যাওয়া হবে না

আমরা দুজনেই চিন্তিত। মাঝে মাঝে আমার সঙ্গী আমাকে বলেন, ‘শালারা টাকা খাওয়ার জন্য এমনটা করেছে’, ‘শালারা কিছু খাইতে চায়’ ইত্যাদি। আমি ওসব শুনছি নীরব থেকে, অনেকটা যেন সায়ই দিচ্ছি। মাঝে মাঝেই তিনি কাউন্টারের সেই লোকটির দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু আমি বুঝতে পারছিলাম তিনি তাঁর দায়িত্ব শেষ না করে আমাদের সাথে যাবেন না। যাদের একটু আধটু অপেক্ষা করার অভিজ্ঞতা আছে, তারা জানেন অপেক্ষা কতটা বিরক্তিকর। আমার সময় যে কাটছে না, তা না। কারণ এখন গোনার সময়। এক মুহূর্ত গেলে মনে হচ্ছে আমার যাবার আশা একটু একটু করে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। আমি কী করবো, এদিক ওদিক তাকাচ্ছি, মনের মধ্যে ঘুর্ণি চলছে। পাইলট আর বিমান বালারা তাঁদের ছোট্ট স্যুটকেস টেনে টেনে হেসে হেসে চলে যাচ্ছেন সামনে দিয়ে, আমার কাছে তখন ব্যাপারটা হৃদয়বিদারক!

অপেক্ষার প্রহর গুণে গুণে ধীরে ধীরে শেষ হয়ে আসছে, অনেকটা টাইম বোমার টাইমারের মতো। অবশেষে একসময় সেই ব্যক্তি তাঁর পাশে দাঁড়ানো সহকর্মীকে কাজ বুঝিয়ে দিয়ে আমাকে সাথে নিয়ে চললেন ইমিগ্রেশন কাউন্টারে। আমি আমার সাথের পরিচিতজনের থেকে বিদায় নিলাম, মনে ক্ষীণ আশা: মনে হয় হয়ে যাবে। ইরান এয়ারের সেই ব্যক্তি বীরদর্পে এগিয়ে গেলেন ইমিগ্রেশন কাউন্টারে। গিয়ে বললেন, ‘এই ছেলের সমস্যা কী?’ ইমিগ্রেশনের লোক দুজন একটু যেন আমতা আমতা করছেন। ইরান এয়ারের লোকটি বললেন, ‘ও আমাদের বসের বন্ধুর ছেলে, সমস্যা বাদ দেন।’ একটু আমতা আমতা করে কিছু একটা বলতে যেয়েও না বলে নিমরাজি হয়ে আমাকে সামনে যেতে দিলেন ইমিগ্রেশনের লোক। আমি যেন দেহে প্রাণ ফিরে পেলাম। আমাকে পাশের আরেকটা কাউন্টারে যাবার জন্য ইশারা করলেন ইরান এয়ারের সেই ব্যক্তি। আমি চললাম।

তিনি আমার পাশে ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে থাকলেন। আমি একটু ভরসা পেলাম। এই কাউন্টারে আমার পাসপোর্টটা একটা সীল মেশিনে কিংবা ফ্ল্যাক্সো সিলের নিচে রেখে তাতে ছাপ দেয়া হলো। কী ছাপ দেয়া হলো, তা দেখার সাহস হলো না, যদি এই অজুহাতে আমাকে যেতে নিষেধ করে দেয়া হয়। তাই পাসপোর্টটা হাতে গুঁজে আমার ‘ছায়াসঙ্গী’র সাথে অগ্রসর হলাম। তিনি যে আমার এত উপকার করলেন আমি তাকে যে একটা সামান্য ধন্যবাদ দিব, সে বোধটাও কাজ করছে না আমার। আমি চাবি দেয়া যন্ত্রমানবের মতো সামনে এগোচ্ছি। এখন যতদূর মনে পড়ছে, আমি তখন লাল কার্পেটের উপর দিয়ে হাঁটছিলাম।

আমার ‘ছায়াসঙ্গী’ আমাকে নিয়ে চললেন সেই কার্পেটিং করা টার্মিনাল দিয়ে। একসময় সামনে দেখি একটা ছোট্ট মানবসারি। আমাকে সেই সারির পেছনে দাঁড় করিয়ে সামনে হাত ইশারায় কোনো একটা ঘর দেখিয়ে বললেন, ‘এখান থেকে ঐ রুমটাতে গিয়ে বসবে।’ আমি যেন কিছুটা আশ্বস্থ হলাম। অতঃপর সেই সারি ধরে সামনে এগোচ্ছি, সারি এগোচ্ছে, আমিও এগোচ্ছি। তখন একটু থিতু হওয়ায় মাথাটা একটু খুলেছে। আমার ছায়াসঙ্গীকে সামান্য ধন্যবাদ দেবার মতো মাথাটা কাজ করছে। মনে মনে তাঁকে খুঁজলাম। কিন্তু আশ্চর্য হয়ে আবিষ্কার করলাম সেই সেবাদাতা আমার ধন্যবাদ নেবার জন্য সেখানে দাঁড়িয়ে নেই। কিছুটা খারাপ লাগলো আমার, এতোটাই অকৃতজ্ঞ আমি!

আমি সামনে এগোচ্ছি আর দেখছি, সামনের লোকেদের কিভাবে কী করা হচ্ছে। সবার গায়ে মুগুরের আকৃতির একটা হ্যান্ড মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে পরীক্ষা করা হচ্ছে। আমি কাছে যেতেই আমাকে বলা হলো পাশের ব্যাগেজ পরীক্ষা করার যন্ত্রটার ভিতর আমার হাতব্যাগটা রাখতে (হাতব্যাগ বলতে মাঝারি একটা পাউচ বলা যায়, পাসপোর্ট-টিকেট গুছিয়ে রাখার জন্য নিচ্ছি এটা)। আমি ব্যাগটা রেখে সামনে এগোতেই আমার গায়েও সেই ‘মুগুর'(!) দিয়ে পরীক্ষা করা হলো আর লোক দুজন আমাকে প্রশ্ন করলেন, ‘কী বাবু, পুতুল কই?’ তাঁদের এই প্রশ্নটা হয়তো আমাকে স্বাভাবিক করার জন্য। কিন্তু তাঁদের মুখের হাসিটা দেখে আমার মনে হলো তাঁরা আমাকে অপমান করছেন (আর যাই হোক, মেট্রিক পরীক্ষা দিয়েছি, আমাকে ‘বাবু’ বলে অপমান করা যায়না)। কিন্তু তাঁদেরকে কিছু বলতে পারলাম না, পাছে তারা আমায় আটকে দেন। তাঁদের ফাড়া পার হয়ে আমার নিরীক্ষা হয়ে যাওয়া হাত-ব্যাগটা হাতে নিলাম। তারপর সোজা গিয়ে ঢুকলাম সেই কাচে ঘেরা ঘরটায়। এইতো নাইন-টেনেই বোধহয় বইতে পড়েছি, প্লেনে ওঠার আগে যাত্রীদের একটা ঘরে বসতে দেয়া হয়, যাকে বলা হয় ‘লাউঞ্জ’ (lounge)। ভিতরে ঢুকে আর-সবার মতো একটা খালি চেয়ারে গিয়ে বসলাম। আমার পাশে বসা এক যুবক, বয়স আন্দাজ আঠারো কি উনিশ, আমায় প্রশ্ন করলেন, তোমার ভিসা কি ট্রানজিট। আমি, ‘ট্রানজিট ভিসা কী’ না জেনেই বললাম, ‘জ্বি-না, ভিযিট।’ আমার পাসপোর্ট দেখতে চাইলে আমি তাঁকে পাসপোর্ট দেখালাম, তিনি তাঁর পাশের সমবয়সী যুবককে বললেন, এই ছেলে আসল (genuine) ভিসায় যাচ্ছে! তাঁর কণ্ঠে চরম অবিশ্বাস আর আশ্চর্য।

আমার বাড়ি সিলেটে, সেখানকার মানুষকে ছোটবেলা থেকেই দেখেছি কতটা বিদেশমুখী। তাই ভিসা, আর জেনুইন ভিসার পার্থক্যটুকু কিছুটা হলেও বুঝি। মানুষ অনেক কষ্ট করেও কোনোরকমে একটা ওয়ার্ক পারমিট সংগ্রহ করে বিদেশে যায় কামলা খাটার জন্য। খুব কম মানুষের ভাগ্যে শুদ্ধ ভিসা জোটে। তাই যারাই যায়, আতঙ্কের সাথে যায়। ওদেশে গিয়েও আতঙ্কে থাকে। কারণ তাদের উদ্দেশ্য ছিল ভিসা নিয়ে ওদেশে ঢোকা। তারপর পালিয়ে থেকে কাজ করে রোজগার করা। তাই কেউ প্রকৃত ভিযিট ভিসায় ঘুরতে যাচ্ছে, এটা সেরকম স্বদেশপলায়নপর ব্যক্তির কাছে আশ্চর্য হবারই বিষয়।

আমার বাবাকে দেখেছি, প্লেন ছাড়ার প্রায় আড়াই-তিন ঘণ্টা আগে চলে আসতে বাসা থেকে। পরে তিনি প্লেন ছাড়ার প্রায় দুই ঘন্টা আগে বাসায় ফোন করতেন যে, তাঁর সব পরীক্ষা নিরীক্ষা শেষ, তিনি প্লেনে ওঠার অপেক্ষায়। অথচ আমি লাউঞ্জে বসার মিনিট তিনের মধ্যে বিমানবালা সামনের একটা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে যা বললেন, তার সারমর্ম, আমাদের ধীরে ধীরে এই পথ ধরে যেতে হবে। তিন মিনিটে লাউঞ্জ আর কতটুকুইবা দেখা যায়? তাই লাউঞ্জ বলতে কী বুঝায়, তার বিস্তারিত বিবরণ এ-যাত্রায় আমার জানা হলো না। আমি আর-দশজনের পদাঙ্ক অনুসরণে হাতব্যাগটা কষে ধরে রেখে চললাম বিমান বালার নির্দেশিত পথে। একটা টানেল বললেই সে পথের যথার্থ বর্ণনা দেয়া হবে বলে মনে করছি। দেয়ালগুলো ভাঁজ ভাঁজ; রাবারের। তবে এই কৃত্রিম গুহার ভেতরটায় হালকা আলো। কিছুক্ষণ পরে আমি নিজেকে আবিষ্কার করলাম প্লেনের দরজায়, যেখানে দাঁড়িয়ে একজন সুদর্শন বিমান বালা। তিনি আর-সবার মতো আমার বোর্ডিং পাসটা চাইলেন, আমাকে বলে দিলেন কোন্‌ দিক দিয়ে যেতে হবে। আমি প্লেনে ওঠে আশ্চর্য হলাম, কারণ আমি ভেবেছিলাম আমাকে রানওয়ে দিয়ে হেঁটে গিয়ে সিঁড়ি বেয়ে প্লেনে উঠতে হবে। কিন্তু এই সুড়ঙ্গ (boarding bridge) দিয়ে আমাকে প্লেনে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে (যদিও আগে ছবিতেই শুধু এরকম সুড়ঙ্গ দেখেছিলাম)।

আমি একবার চারপাশটায় চোখ বুলিয়ে নিলাম, তারপর বিমান বালার নির্দেশিত পথে চললাম। তিন সারি সীট পুরো তলায়, আর প্রতি সারিতে তিনটি করে সীট সার বেঁধে বসানো। ওখানে গিয়ে ট্রেনের সীট দেখার মতো নাম্বার ধরে সীট খুঁজে বের করে আবিষ্কার করলাম, কোনো এক আল্লা’র আদম সন্তান আমার সীটটা আগে থেকেই দখল করে আছেন। বয়সে তিনি পঞ্চাশ থেকে পঞ্চান্ন। তাঁর দুপাশে দুজন শাড়ি পরা মহিলা (এখন আমি আন্দাজ করি, ওই দুইজনই তাঁর দুই স্ত্রী আর মনে মনে হাসি পায়)। যাহোক আমি তাঁর চেহারায় বাঙালি ভাবটা দেখে তাঁকে বাংলায় বললাম, ‘এটা আমার সীট’। ওমা তিনি যেন আরেকটু আয়েশী ভঙ্গিতে বসলেন, বললেন, ‘এটা আমার সীট’। কথাটায় কেমন যেন একটু দৃঢ়তা, এ অবস্থায় তর্ক করা চলে না। আমি কাছাকাছি বিমান বালার দৃষ্টি আকর্ষণ করলাম। বিমান বালা এসে একইভাবে ভদ্রলোককে সীট ছেড়ে দেয়ার কথা বললে ভদ্রলোক বললেন, ‘আমি এখানে বসেই যাবো’। ভালো সমস্যা তো! এমনিতেই আমি চুঙ্গিঘরে বিপর্যস্থ, তার উপর আবার এই ‘চোঙ্গা’র ভিতর (প্লেনের ভিতর) বিপর্যস্থ হতে চাইনা। বিমান বালা ভদ্রলোকের বোর্ডিং পাসটা চাইলেন। সেখানে দেখা গেল ভদ্রলোকের সীট নাম্বার এটা নয়। অথচ তিনি এই সীটে রাজার হালে বহাল তবিয়তে অবস্থান করছেন। অবশেষে ব্যাপারটার মিমাংসা হলো, বিমান বালা আমার অনুমতিসাপেক্ষে ভদ্রলোকের সীটটা আমাকে দিলেন আর আমার সীটটা ভদ্রলোককে (আমিতো আর গোয়াড় নই, না এখানেই বসতে হবে! :p )। আমি এবারে প্লেনের ডানদিকে চলে এলাম (এতক্ষণ প্লেনের বামদিকে বাকবিতন্ডা চলছিল)। এখানে এসে আমি আমার সীটটা খুঁজে পেতে দেখলাম, আমার সীটটা আগেরটার মতো মাঝখানেই অর্থাৎ দুই সীটের মাঝখানে পড়েছে। আমি আমার সীটে বসলাম।

বসে আবিষ্কার করলাম, আমার বামপাশে একজন যুবতি বসা আর ডানপাশে এক যুবক। যুবক, যুবতি দুজনকে দেখেই কেন জানিনা এক দেখায় বলে দেয়া যায়, এরা গ্রাম থেকে এসেছে। যুবতি চারপাশে কেমন যেন অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে। আর যুবক পাশের ছোট জানালা দিয়ে বাইরেটা দেখতে ব্যস্ত। আমি মনে মনে ওই যুবকের সীটটা প্রত্যাশা করলেও মুখ ফুটে বলতে পারছিলাম না। তবে জানালা দিয়ে যা দেখা যাচ্ছে, তা হলো এয়ারপোর্টের টার্মিনাল আর আমাদের ফেলে আসা লাউঞ্জ। কিন্তু এই দেখায় তৃপ্তি নেই বিধায় চোখ ফিরিয়ে প্লেনের ভেতর আনলাম।

একসময় যখন বুঝলাম, সব যাত্রী এসে বসে পড়েছেন ভেতরে, তখন একজন ইরানি বিমান বালা হাতে একটা কাচের বাটিতে কী যেন নিয়ে যাত্রীদের বিলাচ্ছেন। আমাদের সীটের কাছে আসতেই দেখলাম, বাটিতে চকলেট। আমার পাশের যুবতিটি হঠাৎ মিসাইলের গতিতে একটা ছোঁ মেরে একমুঠো চকলেট তুলে নিলো। ইরানি বিমান বালা হয়তো এরকমটা আশা করেননি, তাঁর কথা আর কী বলবো, আমি নিজেই তো আশ্চর্য! তবে বিমান বালা হেসে আবার বাটিটা যুবতির দিকে এগিয়ে দিলেন। এবারে যুবতি, চকলেটের প্রাচুর্য বিবেচনা করে, আর নিলো না। আমি তখন হাত বাড়িয়ে যথেষ্ট ভদ্রতার সাথে দুটো চকলেট নিলাম। আমার পাশের যুবকও নিলো। আমি কিভাবে যেন বুঝলাম [হয়তো ভুলই বুঝলাম], এই চকলেট দেয়া হচ্ছে কারণ বিমান আকাশে ওড়ার সাথে সাথে অনেকের বমির উদ্রেক হয়, হয়তো সেটা উপশম করার জন্য অথবা মনযোগ পরিবর্তন করার জন্য। যাত্রাপথে বমি করার আমার কোনো রেকর্ড নেই। তারপরও যেহেতু প্লেনে প্রথম যাত্রা, তাই ঝুঁকি নেয়া ঠিক না, মুখে পুরে দিলাম একটা চকলেট।

এবারে আমাদের প্লেনটাকে টেনে নিয়ে যাওয়া হলো রানওয়ে অবধি। সেখানে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করলো প্লেন, হয়তো কন্ট্রোল টাওয়ার ক্লিয়ারেন্সের জন্য। এই সময় [বা তার কিছু আগে] মাথার উপরের দিকে একটা ছোট্ট [এই এত্তটুকুন] আয়তাকৃতি মনিটরে লেখা ফুটে উঠলো ফ্যাসেন সীটবেল্ট (‘Fasten Seat Belt’)। আমি মনে মনে সন্দিঘ্ন ছিলাম, যদি এবারে সীটবেল্টটা বাঁধতে না পারি? যদি প্লেনের সীটবেল্ট গাড়ির সীটবেল্টের মতো না হয়? যাহোক, আমি খুব সহজে সীটবেল্ট দিয়ে নিজেকে সীটের সঙ্গে আটকে নিলাম। গাড়ির সীটবেল্ট দিয়ে পুরো বুক পর্যন্ত বেঁধে নিতে হলেও এখানে শ্রেফ কোমরটা বেঁধে নিতে হয়। তারপর জানালার দিকে দৃষ্টি দিলাম। সমস্যা হলো, আমার পাশের জানালাটার অনেকটা অংশ ডানার উপরে। তাই তেমন একটা বিস্তারিত দেখা যাচ্ছে না বাইরেটা।

আকাশ থেকে জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (নমুনা ছবি)
নমুনা ছবি: আকাশ থেকে জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (উৎস: পিবেস.কম^)

একসময় চলতে শুরু করলো প্লেন। শুরুতে ধীরগতিতে চলা শুরু করে, ধীরে ধীরে গতি বাড়তে লাগলো। গতি একসময় চরম পর্যায়ে পৌঁছলো। আমাদের পাশ দিয়ে রানওয়ের এক পাশের দেয়াল (বাউনিয়া এলাকা সংলগ্ন দেয়াল) খুব দ্রুত পেছনে যেতে থাকলো। আর হঠাৎ করে আবিষ্কার করলাম একটা লিফটের মতো এক ঝটকায় আমাদের প্লেনটা মাটি থেকে লাফ দিয়েছে। পুরোপুরি একটা লিফটের অনুভুতি। উপর থেকে ঢাকাকে পেছন ফেলে চলছি। হঠাৎ বুঝতে পারলাম, প্লেনটা ডানদিকে একটা তীক্ষ্ণ বাঁক নিচ্ছে। তারপরও আমার নিজের কোনো খারাপ লক্ষণ না দেখে আশ্বস্থ হলাম, যাক প্লেন যাত্রা কিছুই না। আমি ভেতরের দিকে তাকালাম, কিছুক্ষণ পরে টুং করে ফ্যাসেন সীটবেল্ট লেখা মনিটরের লাইটটা নিভে গেলো। আমি সীটবেল্ট খুলে নিলাম। বাইরে তাকিয়ে দেখলাম নিচে আইল দিয়ে ভাগ করা জমি দেখা যাচ্ছে। বুঝলাম, ঢাকার কাছে কোনো গ্রামের উপর দিয়ে যাচ্ছি। একসময় প্লেন উঠে গেলো মেঘের উপর আর আমার দৃষ্টি ঘোলা হয়ে এলো। তাকালাম ভেতরে।

কিছুক্ষণ পরে হঠাৎ একটা উত্তেজিত কণ্ঠস্বর শুনে বামপাশে তাকালাম। দেখি, সেই আল্লা’র আদম সন্তান (যিনি আমার সীট দখল করেছিলেন) একটা সিগারেট ধরিয়েছেন প্লেনের ‘ধুমপান নিষিদ্ধ অংশে’। বিমানবালা তাকে বারবার বলেও নিরস্থ করতে পারছেন না। সেই ব্যক্তি একরোখাভাবে সেখানেই সিগারেট খাবার জন্য পিড়াপিড়ি করছিলেন। অবশেষে তাকে ‘ধুমপানসিদ্ধ অংশে’ যাবার কথা বলেই হয়তো বিমানবালা এযাত্রা নিরস্থ করতে সক্ষম হলেন, সে আর সঠিক বলতে পারবো না। তবে বুঝতে আর বাকি থাকলো না, ব্যাটা একটা ধাড়ি বাঁদর।

এর মাঝে আমার একটা সমস্যা হতে থাকলো। বারবার আমার কান বন্ধ হয়ে যেতে লাগলো। ব্যাপারটা অনেকটা কানে পানি ঢুকে যাওয়ার পরের মুহূর্তের মতো, তবে তারচেয়ে একটু ভালো – অন্তত আমি ঢোক গিললে কানের স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসে। আবার খানিকক্ষণের মধ্যেই কান বন্ধ হয়ে যায়। পরে আন্দাজ করতে পেরেছিলাম, এটা হচ্ছিলো আমি প্লেনের ডানার কাছে বসায়। কোনো যন্ত্রের শ্রবণাতীত শব্দই হয়তো আমার এই অস্বস্থির কারণ ছিল।

ইরান এয়ার-এর ভিতর (নমুনা ছবি)
নমুনা ছবি: ইরান এয়ার-এর ভিতর (উৎস: ফ্লিকার^)

আমাদের সারির সামনে দেয়ালে একটা ছোট মনিটরে দেখানো হচ্ছে আমাদের প্লেনটা বর্তমানে বিশ্ব মানচিত্রের কোন স্থানটায়। নিচে অলটিচিউড বা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উচ্চতা, সময় ইত্যাদি দেখা যাচ্ছে। একসময় খাবার পরিবেশিত হলো। সামনের সীটের পিছনে হুক খুলে একটা ট্রে বের করে নিয়ে তাতে খাবারের ট্রে রেখে খাবার খেতে হয়। খাবার-দাবার শেষে একটা ট্রেতে করে আমাদের সবার হাতে দিয়ে দেয়া হলো একেকটা ইয়ারফোন। আমি ইয়ারফোনটা নিয়ে আবিষ্কার করলাম, আমার হাতলের সামনের অংশে একটা জ্যাক লাগানোর ছোট্ট ফোকর। আমি তাতে ইয়ারফোনটা লাগিয়ে গোলাকার বোতামটাতে ভলিউম আর চ্যানেল এডজাস্ট করতে শুরু করে দিলাম। একটা চ্যানেলে কোরআন তেলাওয়াত হচ্ছে। আর বাকি চ্যানেলগুলোতে হাবিজাবি। এমন সময় বুঝতে পারলাম, ইয়ারফোন দেয়ার মর্ম: তিন সারি সীটের মাঝের সারির সরাসরি সামনে উপর থেকে প্রজেক্টর দিয়ে বড় করে প্রতিবিম্ব ফেলে দেখানো শুরু হলো একটা ইরানি ছবি। আমাদের সারির সামনের ছোট মনিটরটাতেও চলছে একই ছবি। রেডিওর চ্যানেল ঘুরাতে গিয়ে পেলাম ইরানি ছবিটির সংলাপের একটা চ্যানেল। বুঝতে পারলাম, যাত্রীদের সমস্যা হবে ভেবেই আওয়াজটা প্রতিজন যাত্রীর কাছে আলাদা আলাদাভাবে পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে: ভালোই

ঘুমে আমার চোখ জড়িয়ে যাচ্ছে। তাছাড়া ফারসি ভাষায় চলছে ছবি, তাই কোনো আগ্রহ পাচ্ছিলাম না ছবি দেখায়। মনে মনে একবার বিটিভিকে ধন্যবাদ দিলাম। বিটিভি আগে অনেক ভালো ভালো ইরানি ছবি বাংলায় ভাষান্তর করে দেখিয়েছে। কিন্তু এযাত্রা কিছুই বুঝতে পারছি না। কান থেকে ইয়ারফোনটা খুলে নিয়ে কোলের উপর রেখে, দিলাম একটা ঘুম। ঘুম যখন ভাঙলো, তখন ছবি শেষ। সামনের মনিটরগুলোতে আবার প্লেনের বর্তমান অবস্থানের ছবি আর অলটিচিউড। কিছুটা পেশাবের বেগ বুঝতে পেরে টয়লেট খুঁজলাম মনে মনে। ভাবলাম পেছনের দিকে থাকবে টয়লেট। নিজে নিজেই খুঁজে নেবো বলে উঠে দাঁড়ালাম। পেয়েও গেলাম পেছনে গিয়ে। কিন্তু সমস্যা হলো বাতি নিয়ে। ভেতরে কোনো বাতি জ্বলছে না। ভালো সমস্যা তো! কোনো সুইচ খুঁজে পেলাম না বাইরে ভেতরে কোথাও। অনেকভাবে চেষ্টা করলাম, কিন্ত বিফল। অবশেষে ঘুটঘুটে অন্ধকারে, আন্দাজেই কৃতকর্মটি সারতে বাধ্য হলাম।

আবার সীটে গিয়ে বসলাম। মনের মাঝে প্রশ্ন, কোথায় থাকতে পারে সুইচটা? প্রশ্নটার কোনো সদুত্তর পেলাম না মন থেকে। মনের মাঝে খোঁচাতে থাকলো প্রশ্নটা। আপাতত জমিয়ে রাখলাম মস্তিষ্কে। সময় যায়। একসময় দেখলাম, সামনের দিকের একটি দরজা খুলে এক ব্যক্তি ভেতরে ঢুকলেন। দেখলাম, ওটা একটা টয়লেট। তিনি ভেতরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিতেই একটা ছোট্ট ফুঁটো দিয়ে দেখা গেলো ভেতরে বাতি জ্বলে উঠেছে। পেয়েছি! অনেকক্ষণ পরে আমি টয়লেটে গেলাম, এবার সামনেরটাতে। গিয়ে দরজার ছোট্ট ছিটকিনিটাকে জোরে ঠেলে ঢুকিয়ে দিলাম পাশের ছিদ্রটাতে। আর সাথে সাথে একটা বাল্ব জ্বলে উঠলো ভেতরে। আমি এই আবিষ্কারের মাধ্যমে মনে কিছুটা সাহস পেলাম, ধুর, প্লেন যাত্রা নস্যি।

দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (নমুনা চিত্র)
নমুনা ছবি: দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (উৎস: অ্যাসাইট.কম)

অবশেষে আবার এসে সীটে বসলাম। আর বুঝতে পারলাম, গন্তব্যস্থল দুবাই বিমানবন্দরের (Dubai International Airport) খুব কাছাকাছি আমরা। নিচে নীল সমুদ্র আর তার বালুময় সৈকতের আভা দেখা যাচ্ছে। এক সময় নিচে ফুটে উঠলো মরুময় এক নগর সভ্যতা আর বালু রঙের ঘরবাড়ি। ধীরে ধীরে আধুনিক স্থাপত্যের দিকে অগ্রসর হচ্ছি। একসময় দুবাই শহরের ডাকে সাড়া দিয়ে প্লেন অবতরণের প্রস্তুতি নিলো। আমরা নির্দেশমতো সীটবেল্ট বেঁধে নিলাম। প্লেন রানওয়ে স্পর্শ করতেই হালকা ঝাঁকি লাগলো। তারপর দ্রুততর গতি থেকে ধীরে ধীরে গতি কমিয়ে একসময় রানওয়েতে স্থির হয়ে দাঁড়ালো প্লেন। কিছু সময় পরে আমি সীটবেল্ট খুলে ফেললাম। আমাদের প্লেনটাকে দুবাই এয়ারপোর্টের বিশাল টার্মিনালের একটা বুথে এনে লাগানো হলো আর আরেকটা সুড়ঙ্গ দিয়ে আমরা বেরিয়ে এসে দুবাই এয়ারপোর্টে নামলাম।

দুবাই বিমানবন্দরে ট্র্যাভেলেটর (নমুনা ছবি)
নমুনা ছবি: দুবাই বিমানবন্দরে ট্র্যাভেলেটর (উৎস: কালারবক্স.কম^)

আমি সম্পূর্ণ আনকোরা যাত্রী। তাই আর-সবাইকে দেখে দেখে আমি আমার কার্যকলাপে পরিবর্তন আনলাম। সবাই যেদিকে চললো, আমিও সেদিকে চললাম। একসময় বিশাল টার্মিনালটায় এসে উঠলাম। সবাই সামনের দিকে হাঁটছে। আমিও তাই করলাম। হাঁটতে থাকলাম অজানা গন্তব্যে। পথ যেন আর শেষ হয়না, হাঁটছি তো হাঁটছিই। মাঝে মাঝেই চলার পথের মেঝেতে মেঝের সমান্তরালে এক্সেলেটর। এটা আসলে একটা বেল্ট। চলার পথকে কমিয়ে দেবার পাশাপাশি পথিককে খানিকটা বিশ্রাম দেবার জন্যই এই স্বয়ংক্রিয় এক্সেলেটর। পরে বই পড়ে শিখেছি এর নাম ‘ট্র্যাভেলেটর’। আমিও একেকটা ট্রাভেলেটরে করে খানিকটা পথ অগ্রসর হয়ে নিলাম। তবে ট্রাভেলেটরের গতি খুব ধীর আর আমার সঙ্গী-যাত্রীরা অনেক দ্রুত চলছেন, তাই ট্রাভেলেটরের উপর দিয়েও হাঁটছি আমি। ফলে সামনের দিকে দুটো ক্রিয়া এক হওয়ায় গতি আরেকটু বাড়ছে।

এভাবে চলতে চলতে আমি আর-সবার মতো একটা ডেস্কে একজন ফর্সা চুঙ্গিওয়ালাকে পেলাম। বাকিদের দেখাদেখি সেই ডেস্কেই সার বেঁধে দাঁড়ালাম। আমার পালা এলে আমি পাসপোর্ট আর টিকেট দিলাম। ও-দুটো দেখে আবার আমাকে ফেরত দিয়ে হাত ইশারায় উপরের দিকে দেখিয়ে দিলেন চুঙ্গিওয়ালা। আমি পেছন ফিরে দেখে বুঝতে পারি উনি আমাকে উপরের তলায় উঠতে হবে বলছেন। সবার এখানে, আমার ওখানে কেন, বুঝতে পারলাম না। হয়তো ব্যতিক্রম ভিসার কেরামতি। যাহোক, আর-সবাইকে এই সারিতে রেখে, আমি এবারে একটা এক্সেলেটর দিয়ে উপরে উঠেই সামনে কাচে ঘেরা আরেক তলাতে দেখতে পেলাম আব্বাকে। আমার মনে এক পরম আনন্দের বন্যা বয়ে গেলো। আমি শেষ পর্যন্ত আমার আব্বার কাছে দূর বিদেশে আসতে পেরেছি। আব্বা আমার দিকে হাত ইশারা করছেন তাঁর নিচের দিক দিয়ে একটা দরজা আছে দেখিয়ে। আমি তাঁর বোবা ইশারা (কাচে ঘেরা বলে আব্বার কথা আমার কানে পৌঁছাচ্ছে না) ধরতে পেরে সে পথেই চললাম। চার পাঁচটা ডেস্ককে পাশ কাটাতে গিয়ে হঠাৎ শুনলাম ‘এঃ’-জাতীয় কোনো অস্ফুট কণ্ঠস্বর। পাশের ডেস্কে তাকিয়ে দেখি এক বোরখা পরা মহিলা-চুঙ্গিওয়ালা আমার দিকে হাত বাড়িয়ে বসে আছেন। আমি বুঝতে পারলাম আমার কাছে চাইবার মতো তাঁর আর কিছুই নেই, আমার পাসপোর্ট আর টিকেটটা দিলাম। তিনি তাতে সীল দিয়ে ফেরত দিলেন। আশেপাশে অনেকগুলো ডেস্ক, কিন্তু এতোগুলো ডেস্কের অনেকগুলোতেই মানুষ নেই, আর থাকবেইবা কেন, পুরো ফ্লোরে যাত্রী আমি একাই। এই ডেস্কগুলো ছাড়িয়ে গিয়ে সামনে দেখি আমাদের লাগেজগুলো আসছে। চেহারায় পরিচিত কয়েকজনকে বেল্টের পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বুঝলাম, আমার ব্যাগগুলোও ওখান থেকে নিতে হবে। এগিয়ে গেলাম।

সেখানে গিয়ে আমার কালো রঙের লাগেজটা চিনতে পেরে তুলে নিলাম ট্রলিতে। কিন্তু সমস্যা অন্য জায়গায়। আব্বার বন্ধুর গার্মেন্টের নমুনা ভর্তি ট্র্যাভেল ব্যাগটাতো আমি খেয়াল করিনি। এখন উপায়? ওটা নিবো কিভাবে? হঠাৎ মাথায় এলো ব্যাপারটা। ব্যাগগুলো যখন ঢাকাতে নিরীক্ষা করা হয়, তখন ব্যাগেজ স্ক্রীন্‌ড নামে একটা ট্যাগ সেঁটে দেয়া হয় ব্যাগের গায়ে। আর ঐ একই ট্যাগেরই আরেকটা অনুলিপি আমার টিকেটেও লাগানো আছে। তাই ওখান থেকে নাম্বারটা দেখে নিলে হয়। আমি আমার ব্যাগের সাথে মিলিয়ে দেখি আমার ব্যাগের ট্যাগ ঠিকই আছে। এবারে বেল্টে আসা বাকি ব্যাগগুলোর ট্যাগ পরীক্ষা করতে লাগলাম। একসময় কাঙ্ক্ষিত ব্যাগটা পেলাম আর স্মৃতির সাথে মিলিয়ে নিয়ে মোটামুটি নিশ্চিন্ত হলাম।

ট্রলিটা নিয়ে সামনের স্বয়ংক্রীয় দরজা গলে বাইরে বেরিয়ে গেলাম। বাইরে বেরিয়ে আমি আব্বাকে জড়িয়ে ধরলাম পরম আনন্দে। এই খুশি এই আনন্দ লিখে বুঝাবার নয়, দেখে বুঝবার নয়- এ শুধু অনুভবের। আব্বা ঢাকায় ফোন করে আমার দুবাই পৌঁছার খবর জানিয়ে দিলেন। আর কিছুক্ষণ পরেই আমরা দুবাই চুঙ্গিঘর হতে বেরিয়ে পড়লাম।

-মঈনুল ইসলাম

___________________

ইনশাল্লাহ আগামী পর্বে থাকছে…

আগুনে পুড়ে যাওয়া! | এই পথ আমার ঠিকানা | যেভাবে বৃষ্টি ডেকে আনলো ওরা…

পুনশ্চ, নিশাচর-এর আর-সব লেখার মতো এই লেখায় ছবি সেরকম আহামরি থাকছে না, তাই না? এই পর্বটাই বিভিন্ন নমুনা-ছবি দিয়ে চালিয়ে দিলাম। কারণ তখন ছবি তোলার এরকম রমরমা সংস্কৃতি ছিল না। রিলের ক্যামেরায় মুষ্টিমেয় ছবি তোলা যেত। আমার ক্যামেরা তখনও ব্যাগের ভিতরে। পথ চলতে চলতে ছবি তোলার কায়দা কিংবা মানসিকতা কোনোটাই তখন ছিল না। আর এই ভ্রমণবৃত্তান্তে চকচকা ছবি আশা না করলেই ভালো হবে। 🙂 বুঝতেই পারছেন, রিল থেকে ওয়াশ করা ছবি আবার স্ক্যান করলে কী-ইবা থাকে সেগুলোতে!

_____________________

ক. ব্যাগেজ স্ক্রীন: যেখানে মালপত্র কম্পিউটার, এক্স-রে এবং মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে নিরীক্ষা করা হয়।

খ. কন্ট্রোল টাওয়ার: যে উঁচু স্থাপনা বা টাওয়ার থেকে প্লেনকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়া হয়। এ টাওয়ারের সাথে প্লেনের উঠা-নামা (take off, landing) ইত্যাদি সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয়ে প্রতিনিয়ত যোগাযোগ করা হয়। অনেক পরে জেনেছি, শুধু বিমানবন্দরেই এই টাওয়ারের কাজ সীমাবদ্ধ নয়, বরং এই আকাশসীমায় থাকা বিমানগুলোর প্রতিটার উপরেই নজর রাখা, এবং তাদেরকে ঐ আকাশেই প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়া এই টাওয়ারের নৈমিত্তিক চরম ব্যস্ততার কাজ।

প্রচ্ছদের ছবি: উইকিমিডিয়া কমন্স থেকে নেয়া। নাসা কর্তৃক ধারণকৃত আমিরাতের উপগ্রহ-চিত্র। (উৎস^)

One thought on “তরল স্বর্ণের দেশে ২০০১: কিস্তি ১

মন্তব্য করুন