ট্যুর টু শরিয়তপুর: পর্ব ৩

~ হাওয়া খাওয়া, ফাটানি খেলা, ফিরতি পথ ~

পোল্টারগাইস্ট আক্রান্ত বাড়িতে রাত্রিযাপন শেষে নদীতে দাপাদাপি আর এলাকায় ক্রিকেট খেলে, পরদিন, মার্চের ২৩ তারিখ ভোরবেলা উঠেই শাকিল ভাই আর আমি চললাম খেজুরের রস খেতে। নাকিব আর রবিনকে তুললাম না ঘুম থেকে, তাই ওদের জন্য নিয়ে আসবো বলে ফুফুর থেকে একটা বোতল চেয়ে নিলাম। দুজনে মোটর সাইকেল হাঁকিয়ে জায়গামতো গিয়ে খেলাম ভিরমি: ঐ ব্যাটা খেজুর রসওয়ালা খেজুর রস নিয়ে ভেগেছে।

আমরা না থেমে আরেকটু সামনে গিয়ে দেখলাম। কিন্তু আরেকটু সামনেও নেই। শাকিল ভাই বললেন, শিওর বাজারে নিয়ে গেছে বিক্রীর জন্য। যেই কথা সেই কাজ। সাথে সাথে মোটর সাইকেল ছুটিয়ে দিলাম আমরা বাজার অভিমুখে। সকালের ঠান্ডা বাতাস এসে লাগছে গায়ে…সূর্য উঠছে গাছের আড়ালে…অপূর্ব সে ক্ষণ। গ্রামের মানুষ অনেক ভোরে উঠে, আমরাও আজ গ্রামের মানুষের সাথী হয়ে গেলাম। মোটর সাইকেল বেশ গতি পাচ্ছে, কারণ পিচঢালা রাস্তাটা পুরোপুরি খালি। হঠাৎ একজন মানুষ আমাদের পাশ কাটালো: মাথায় একটা গামছা বেঁধে তাতে একটা কলসি চড়িয়ে নিয়ে উল্টো দিকে যাচ্ছে। মোটরসাইকেল বেশ জোরসে তাকে পাশ কাটিয়ে পার হলো। আমরা তারপরও না থেমে বাজারেই চললাম। কিন্তু বাজারে আবিষ্কার করলাম, গ্রামের মানুষ যত তাড়াতাড়ি উঠে, অত তাড়াতাড়ি বাজার জাগে না। বাজার তখনও নাক ডাকছে। তাই আবার ফিরতি পথ ধরলাম। আমরা এবার শিওর হয়ে গেলাম ঐ লোকটাই মাথার কলসে করে খেজুর রস নিয়ে যাচ্ছিলো। মোটর সাইকেল হাঁকিয়ে আবার এলাম ওখানে, পেলাম একটা দোকান। দোকানিকে জিজ্ঞাসা করলাম, খেঁজুর রস আছে কিনা। দোকানি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে আমাদেরকে নিরাস করে বললো, না।

এখন একমাত্র আশা খেজুর রসওয়ালার বাড়ি চলে যাওয়া। এবারে আমরা আগের পথ দিয়ে গিয়ে বায়ে মোড় নিয়ে খেজুর রসওয়ালার বাড়ি খুঁজতে থাকলাম। গ্রামের বাড়িগুলো এখানে বেশ কাচা। তবে খাঁটি গ্রাম বলতে যেমন স্বাদ পাবার কথা, এই অংশটাতে তা পাওয়া যায়। কিন্তু খেজুররসওয়ালাতো আর বাড়িতে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেয়নি, তাই খুঁজে পাওয়া গেলো না তাকে। হাতে ধরা বোতলটার দিকে তাকালাম। ফুফু সেভেন আপের একটা ২ লিটার বোতল খুঁজে পেয়ে ধরিয়ে দিয়েছেন। দুই লিটার পানি দিয়ে গোসল করা যেতো। অথচ সেই দুই লিটার খেজুরের রসের জায়গায় দুই লিটার বাতাস, আই মিন হাওয়া নিয়ে যাচ্ছি। আমরা মোটর সাইকেলে ঘুরে যেই হাওয়া খেয়েছি, নাকিব আর রবিনকেতো আর সেই হাওয়া খাওয়ানো যাচ্ছে না, তাই দুই লিটার হাওয়া অন্তত যাচ্ছে ওদের জন্য। …কিন্তু রবিন যখন আমাদেরকে ব্যর্থ মনোরথ হয়ে ফিরতে দেখলো, বোম ফাটালো যেন: আরে আমারে নিয়া যাইতি, আমি তো লোকটার বাড়ি চিনতাম। …সামলাও ঠ্যালা!

নাস্তা সেরে দুই মোটর সাইকেল হাঁকিয়ে বাজারের দিকে যাবার সময় দারুণ একটা উদ্ভাবনী কাজ দেখলাম গ্রামের এক যুবকের। একটা জায়গায় পুকুর কেটে যেভাবে মাটি জমা করা হয়, সেভাবে মাটি তুলে রাখা হয়েছে। এগিয়ে গিয়ে দেখা গেলো ওটা পুকুর ঠিক না, মাটিতে এক প্রকারের ট্রেঞ্চ খোদাই করেছেন তিনি। সেখানকার মাটিগুলো তুলে রেখেছেন পাশে। কিন্তু সেখানেও কেরামতি, শুধু তুলেই রেখে দেননি, মাটিগুলোকে পিটিয়ে সমান করে বেশ একটা সৌন্দর্য এনেছেন। মোদ্দা কথা তিনি আঁকাবাঁকা করে গভীর করে মাটি কেটে বাকি অংশটুকু ভরাট করেছেন। গভীর অংশে রয়েছে পানি, তখন ছিল চ্যাপচ্যাপে পানি। তাঁর পরিকল্পনা হলো তিনি এই পানিতে মাছ চাষ করবেন। কিন্তু যতটুকু গভীর তিনি করেছেন, তাতে পানি থাকবে না, মাটি চুষে নিয়ে যাবে। তাই তিনি পাশেই একটা টিউবওয়েল বসাচ্ছেন, দেখে এলাম। সেটা থেকে পানি দিয়ে গর্তের পানিকে সব সময় একটা গ্রহণযোগ্য উচ্চতায় রাখা হবে। পরিকল্পনার বাকিটুকু হলো: উঁচু করে আঁকাবাঁকা যে পাড় তিনি তৈরি করেছেন, সেখানে লাগাবেন “বাউ কুল”জাতীয় বড়ইয়ের গাছ। এজাতীয় গাছগুলোতে ছোট্ট আকৃতির মধ্যেই বিপুল পরিমাণ বড়ই ধরে, বেশ লাভবান চিন্তাধারা। এখানেই শেষ নয়, পানির বেশ কিছুটা উপরে, কিন্তু পাড় থেকে খানিকটা নিচে, পাড়ের ঢালু অংশে লাগানো হবে পুঁই শাক। সেগুলো এই ঢালু জায়গায় যাতে পানিতে না গিয়ে পড়ে সেজন্য পাড় থেকে পাড়ে লাগানো থাকবে জাল বা জালিকা। এতে ফাঁক গলে সূর্যের আলোও পানি ছুঁবে, গাছ-মাছ দুই বাঁচবে। অল্প জমিতে এরকম একটা দারুণ উদ্ভাবন যে সত্যিই সোনায় সোহাগা, সেটা আর বলা লাগে না। খুশি হয়ে যখন সে খবর অন্যান্যদের সাথে শেয়ার করতে গেলাম, তখনই কেউ কেউ বেশ নিরুৎসাহের ভঙ্গি দেখালো। কারণ আর কিছুই না, ঐ যুবক আমারই মতো মহাজ্ঞানী (!)। বহু সুন্দর সুন্দর প্রজেক্ট শুরু করে সে, কিন্তু কোনোটিই পূর্ণতা পায় না। মহাজ্ঞানী অজ্ঞান!

সারা সকাল বাজারের ঐ ব্রিজ পার হয়ে চন্ডি’র পাঠার মতো ঘুরলাম আমরা পুরো এলাকার অনেকখানি। নিভৃত ছোট্ট দোতলা স্কুল, পাকা রাস্তায় ছড়ানো ধান, ধানী জমি আর সবুজ গাছপালাময় সরু পথ, তবে মেঠো পথ নয়, পাকা রাস্তা। আবারও ব্রিজে এসে দাঁড়ালাম। বাতাসের উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া উপেক্ষা করে যখন আমরা নিচে তাকালাম, তখন দেখি সেখানে দারুণ এক খেলা জুড়ে দিয়েছে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা। অল্প পানিতে কখনও হেঁটে, কখনও দৌঁড়িয়ে একটা রাবারের বল একজন আরেকজনের গায়ে ছুঁড়ে মারছে। এই খেলার কী নাম হতে পারে? …“জ্বালানি খেলা:ফাটাইয়া ফালা”। নামটা এরকম কেন দিলাম, বলছি: কেউই কারো গায়ে বলটা লাগাতে পারছে না। কেউ হয়তো পানিতে ডুব দিয়ে ছুঁটে আসা বল এড়াচ্ছে, মেয়েটার ছুঁড়ে দেয়া বলটা ছেলেরা হাত দিয়ে ক্যাচ লুফে নেয়। কিন্তু একবার বল গিয়ে পড়লো মেয়েটার খুব কাছাকাছি, ছেলেটাও বেশ কাছাকাছি দাঁড়িয়ে, ব্যস, মেয়েটা তাই এবার ক্যামাকাযি এ্যাটাকের সিদ্ধান্ত নিলো। বল নিয়ে দিলো দৌঁড়, একটা ছেলের কাছাকাছি এসে তারপর… ব্রিজে তখন প্রচুর দর্শক, শাকিল ভাই তো রীতিমতো চিৎকার দিয়ে উঠলেন, মার মার, ফাটায়া ফালা… বলে তাঁর সেই বিখ্যাত হাসি… মেয়েটা ধাওয়া করে সর্বশক্তি দিয়ে বলটা মারলো ছেলেটার গায়ে এবং লাগিয়ে দিলো, তাতে ব্রীজের দর্শকদের মাঝে সে কী আনন্দ। সবাই খুশিতে হৈ হৈ করে উঠলো। ..এবার তাহলে বলুন, এই খেলার এর চেয়ে সুন্দর নাম আর কী হতে পারে?

কিন্তু এই ঘটনা এখানেই শেষ হয়ে গেলো না। আমাদের ভিতরকার বাচ্চাটাকে আরো তেতিয়ে দিলো। বাজার থেকে টিপেটুপে নরম দেখে একখানা বলও কিনে নিলাম আমরা। ঠিক করলাম, ঢাকা ফেরার আগে আজকেও নদীতে নামবো। বাজার থেকে যাবার আগে মোটর সাইকেলের ফুয়েল গেজ দেখে শাকিল ভাই আর ঝুঁকি নিতে চাইলেন না। আমরা বাজার থেকেই বাড়তি দামে এক লিটার তেল কিনে দিলাম।

মোটর সাইকেলের তেলের হিসাব রাখতে হচ্ছিলো দুই চালককেই। শাকিল ভাইয়ের ১২৫ সিসি’র হিসাব হলো ১ লিটারে ৪০ কিলোমিটার আর রবিনের ১৫০ সিসি’র হিসাব হলো ১ লিটারে ৩২ কিলোমিটার যাবে। যদিও শাকিল ভাইয়ের রিযার্ভ ট্যাঙ্কে আরো দুই লিটার তেল আছে, তার পরও পথের হিসাব তো আর বলা যায় না!

বাড়ি ফিরে ঠিক করলাম এই অত্যাশ্চর্য কান ঝালাফালা ঝিঁঝিঁ পোকাগুলোর ডাক রেকর্ড করে না নিলে ঢাকার মানুষকে বোঝানো যাবে না। নাকিবকে বলতেই সে তার mp3 প্লেয়ারটা বের করে দিলো, ওটা দিয়ে রেকর্ড করা যায়। আমি রেকর্ড শুরু করলাম। ঢাকায় ফিরে সেই রেকর্ড বাজিয়ে তাজ্জব বনে গেছি। এতো পরিষ্কার রেকর্ড হয়েছে ঐ ছোট্ট বল্টু দিয়ে। আর বাড়তি হিসেবে রেকর্ড হয়ে গেছে কোকিল পাখির ডাকও। একটু এডিট করে দুটো ডাককে আলাদা করে ফেললাম।

আপনাদের জন্য ঐ দুটো অডিও ফাইলই ইন্টারনেটে দিয়ে দিয়েছি। নিচের ঠিকানায় ক্লিক করে সেগুলো নামিয়ে নিতে পারবেন। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাকটা শুরু থেকে শেষ অবধি না শুনলে বুঝবেন না। প্রথমে কম, শেষের দিকে চূড়ান্ত রূপ নিয়েছে আওয়াজ।


ঝিঁঝিঁ পোকা সম্বন্ধে রবিনের কাছে যা জানতে পারলাম, এরা মাটি থেকে জন্মায়। গাছের মধ্যে খোলস ছাড়ে, তারপর গাছের কোনো খোলের ভিতর গিয়ে আশ্রয় নেয়। প্রমাণস্বরূপ গাছে গাছে বেশ শক্ত হয়ে লেগে আছে শুকনো চামড়া। পরে ডিসকভারি চ্যানেল থেকে জেনেছি, ঘটনা সত্যি: এরা মাটি থেকে বের হয়ে দলে দলে গিয়ে গাছে চড়ে। তারপর সেখানে খোলস ছাড়ে, আর তারপর জীবন পার করে ঠুস করে গাছ থেকে পড়ে গিয়ে মারা যায়।

ঝিঁঝিঁ পোকা - বামদিকেরটা মাটি থেকে উঠে আসার পর ছেড়ে দেয়া খোলস, আর ডানদিকেরটা সজীব নতুন ঝিঁঝিঁ পোকা - প্রাকৃতিকভাবে স্টাফ হয়ে গেছে (পিঁপড়া খেয়ে ফেলেছে ভিতরটা)
ঝিঁঝিঁ পোকা – বামদিকেরটা মাটি থেকে উঠে আসার পর ছেড়ে দেয়া খোলস, আর ডানদিকেরটা সজীব নতুন ঝিঁঝিঁ পোকা – প্রাকৃতিকভাবে স্টাফ হয়ে গেছে (পিঁপড়া খেয়ে ফেলেছে ভিতরটা)

দুপুর সাড়ে বারোটা বাজে গেলাম নদীতে। আজকে যে সময় এসেছি, তাতে নদীতে পানি তখনও কিছুটা বেশি। গতদিন যেখানে মাটি ভেসে ছিল, আজ সেখানে কিছুটা পানি আছে। শুরু হলো বল দিয়ে ফাটানি খেলা। কিন্তু আমরা কেউই প্রতিশোধের আগুনে দাউদাউ করে জ্বলছি না, তাই কিছুক্ষণের মধ্যে সেটা ক্যাচ লুফালুফিতে পর্যবসিত হলো। ওদিকে কিছুক্ষণের মধ্যেই শাকিল ভাই শামুকে পা কেটে ফেললেন। বাকিরাও বেশিক্ষণ চালালো না সে খেলা। তারপরও নদীর মধ্যে সাধ মিটিয়ে গোসল করে আমরা বাড়ি ফিরলাম।

দুপুরের খাবার খেয়ে আমাদের রওনা করার পালা। যোহর পড়ে রওয়ানা করলাম ২টার দিকে। ফুফা-ফুফু’র থেকে বিদায় নিলাম। ফুফু শেষ মুহূর্তে একটা বোতলে করে খাঁটি মধু দিলেন শাকিল ভাই আর আমাকে। শেষ মুহূর্তে আমি চলে গেলাম গাছের কাছে, গাছের গায়ে আটকে থাকা ঝিঁঝিঁ পোকার শুকনো চামড়া তুলে নিয়ে এলাম। ফুফার সিগারেটের প্যাকেটে গতকালকের সংগ্রহ করা পোকার মরদেহ আর শুকনো চামড়াটা পুরে নিয়ে তা ব্যাগে ভরে নিলাম। ফুফা-ফুফু শেষ বিদায় দিলেন। আমরা বেরিয়ে পড়লাম।

রাতভর যে পথ দিয়ে সেদিন এসেছিলাম, আজ সেই পথে দিনের বেলায় দেখে দেখে যাচ্ছি। গ্রামের দৃশ্য নতুন করে দেখার বোধহয় কিছু নেই। সব একই জিনিস, কিন্তু তবু কোথায় যেন একটা বৈচিত্র্য আছে, একঘেয়ে লাগে না। তাই বাংলাদেশের গ্রামের দৃশ্যের বৈচিত্র্যটুকু বর্ণনা করে বোঝানো যায় না, ঘুরে দেখতে হয়। সেই দৃশ্য দেখতে দেখতে আমরা চলছি।

শাকিল ভাই আসার দিনই তাঁর গাড়ির হাইড্রোলিক ব্রেকের ব্রেক শু’টা দুর্বল হয়ে যাওয়ার খবর দিয়েছিলেন, এবারে জানালেন, সেটা সম্পূর্ণ ক্ষয়ে গেছে। এখন ওটা চাপলে খশখশ আওয়াজ হচ্ছে। যাহোক, পায়ের ব্রেকের উপর ভরসা করে আমরা পথ চলছি। সোয়া ৫টার দিকে কাঁঠালবাড়ি গিয়ে আবিষ্কার করলাম, আজকেও ফেরি মিস।

সেদিন আর ঘরে ফেরা হলো কি আমাদের? পেলাম কি ফেরি সেদিন? এতো সুন্দর ট্যুরের একটাও ছবি কেন দেয়া হলো না লেখার সাথে? …প্রশ্নকে ঘুরতে দিতে হয়। তাহলে তা নিজেই উত্তর দিয়ে দেয়।

(চলবে…)

-মঈনুল ইসলাম

পরের পর্ব »

মন্তব্য করুন