মন্দের ভালোয় নরম গরম সিলেট ভ্রমণ ২০০৭ ৩/৩

মন্দের ভালোয় নরম গরম সিলেট ভ্রমণ ২০০৭: প্রথম পর্ব | দ্বিতীয় পর্ব

সিলেট শহর-পথে শুরু হলো নতুন অন্তর্দ্বন্ধ। এখন গাড়িতে দুই পক্ষ অবস্থান করছে, দুই পক্ষই অপরাপর পক্ষকে ভাবছে বিপদজনক। তাই শুরু হলো নতুন নাটক। আমি ভাবছি, সিলেট শহরে যেহেতু পণ্ডিত বাদলের ব্যবসাক্ষেত্র, তাই পরিচিত লোক দিয়ে আমাদের জন্য পিটুনি-ফাঁদ তৈরি করে রাখতে পারে। তাই আমরাও ঠিক করলাম পাল্টা চাল চালবো। ছোট চাচা ট্রাম্প কার্ড ছাড়ার ধাঁপ হিসেবে নিজের মোবাইল ফোনটা কানে তুলে নিলেন। কথা বলতে শুরু করলেন তাঁর কোনো একজন বন্ধুর সাথে, ‘দুস্তো, সিলেট আইয়ার; বাস স্ট্যান্ডোর ওনো থাকিস।’ কিছুক্ষণ জোরে জোরে কথা বলে ফোন রাখলেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘কে?’ আমাকে চোখ টিপলেন তিনি। বুঝতে পারলাম, নিখুঁত অভিনয় করেছেন এই কিছুক্ষণ, ফোন করার ভান করেছেন মাত্র।

ট্রাম্পের উপর ওভার ট্রাম্প মারার লোভটা পণ্ডিত বাদল সামলাতে পারলো না। সে জোরে জোরে সামনের সিট থেকে বলতে লাগলো, ‘সিলেটের মেয়র আছে না, কামরান? তার ছোট ভাইয়ের কাছে আমি গাড়ি সাপ্লাই দিছিতো।’ তারপর নাটকের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশটা ঘটলো। পণ্ডিত বাদল তার মোবাইল থেকে মেয়র কামরানের ছোট ভাইকে ফোন করলো, ভালো কথা। সে মোবাইলের লাউডস্পীকার চালু করে দিলো, যাতে আমরা তাদের কথোপকথন শুনতে পারি। ওপাশ থেকে কেউ একজন কথা বলছে, তার সাথে পণ্ডিত গাড়ি বিক্রয় সংক্রান্ত বিষয়ে কথা বললো। কথা শেষে মোবাইল রেখেই পেছন ফিরে বললো, ‘[অমুক] ভাইরে চিনছেন?’

ছোট চাচাও কম যান না, তিনি বললেন, ‘হ্যা, চিনছি। চিনবো না কেন?’

এভাবেই অন্তর্দ্বন্ধে, মৌনযুদ্ধে আমরা পৌঁছলাম সিলেট শহরে। সেখানে তাদের বাকি টাকা দিয়ে দিলাম আমরা। তাদেরকে ছেড়ে দিলাম সিলেট বাস স্ট্যান্ডে। বাস স্ট্যান্ড আর সিলেট রেলস্টেশন পাশাপাশি। সেখানে নেমে আমরা হাফ ছাড়লাম। ছোট চাচা শেষ মুহূর্তে ওদের থেকে রিসিপ্টে ‘পেইড’ লিখিয়ে নিলেন। পণ্ডিত বাদল পকেট থেকে কলম বের করে ‘পেইড’ লিখে দিয়ে গেছে। কাগজটা চোখের সামনে ধরে আমি হেসে বাঁচিনে; কারণ পণ্ডিত বাদল ‘পেইড’ বানানটি লিখেছে: পি-এ-ডি-ই। বোধহয় আমাদের পণ্ডিত বাদলের পাণ্ডিত্যপূর্ণ মস্তিষ্ক ধরতেই পারেনি, কেন এখানে পি-এ-ডি-ই না হয়ে পি-এ-আই-ডি হওয়া উচিত।

সেখানে দাঁড়িয়ে আমরা তিন যুবক ভাবছি, কী করবো এখন। সবগুলো সম্ভাব্য সুযোগই ভাবা হলো, যেমন রাতে হোটেল ভাড়া করে থাকা যায়; কিন্তু ভোরে উঠেই আবার ট্রেন ধরতে হবে, তারমানে এই উদ্বেগে রাতে ঘুম হবে না। তারমানে এখনই কোনো একটা গাড়িতে করে রওয়ানা দেয়া যায়। স্টেশনে ট্রেন দাঁড়িয়ে আছে। আমরা ভাবছি, হাতে টাকা ভালোই আছে, সুতরাং গেলে বাসে ভালো সীট বুক করেই যাওয়া উচিত। তখনই সোহাগ পরিবহনের কথা মাথায় এলো। সোহাগে যাবো বলে যখনই প্রস্তুতি নিতে যাচ্ছি, তখনি সেজ চাচা বললেন, ‘দাড়া, আগে ট্রেনটা চেক করে আসি।’

ট্রেনের টিকিট কাটতে যাবার আগে আমাদের মনোভাব ছিল, টিকেট কাউন্টারের লোক যদি “টিকেট নেই” বলে, শিওর তার চান্দি ফাটিয়ে দিব অথবা র‌্যাব ডাকবো। কিন্তু যখন গিয়ে সত্যিই শুনলাম, ‘টিকেট নেই’, তখন কিছুই করলাম না। বাঙালির হুজুগ বোধহয় এরকমই। হুজুগে বাঙালি সব করতে পারে, কিন্তু হুজুগে ভাটা পড়লে বাঙালি গলে মিশে যায়। জানা গেলো, মাত্র একটা সীট আছে। আমরা হিসাব কষলাম, মাত্র একটা সীট নিয়ে সারারাত জেগে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে যাওয়া যাবে না। তাই ট্রেন-যাত্রার ইতি টানা হলো।

আবার বাসের চিন্তায় ফিরে এলাম। এবার প্রস্তাব উঠলো রাতের খাবার খেয়ে নেয়া উচিত, সেই দুপুর ১টার সময় খেয়ে বেরিয়েছিলাম, তারপর থেকে শুধু চা-ই খেয়ে চলেছি। ভাত না খেলে কি বাঙালির চলে? কিন্তু কী করবো, বাস, হোটেল, না ট্রেন… এই ত্রিদুল্যমানতায়(!) কেটে গেলো আরো প্রায় দশ মিনিট। হঠাৎই আবার সেই হুজুগ, এবার হুজুগ উঠলো সেজো চাচার, জেদ ধরেই বললেন, ‘যাহ, ট্রেনেই যাব।’ কিসের ভিত্তিতে বললেন, জানি না; তবে কথার মধ্যে একটা ‘সম্ভব’ ‘সম্ভব’ ভাব ছিল।

আবার গেলাম স্টেশনে। সেখানে গিয়ে জানলাম, পুরো ট্রেনে একটা সীটও খালি নেই, পুরো ট্রেন ভর্তি করে ঢাকা যাচ্ছে ছাত্র-ছাত্রীরা। আমি মিলাতে পারলাম না কিছুই। ঢাকাতে বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, মেডিকেল, সব পরীক্ষাই শেষ… তাহলে এখন কী জন্য ছাত্র-ছাত্রীরা ট্রেন বোঝাই করে ছুটেছে রাত জেগে!

চাচা কাউন্টার ছেড়ে এগিয়ে গেলেন আরো সামনে, স্টেশনের ভিতরে। সেখানে একজন লোক উৎসুক হয়ে এগিয়ে এলো, ‘টিকেট লাগবোনি? কয়টা?’ সে আমাদেরকে ট্রেনের একটা কামরায় নিয়ে গেল। সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা এটেনডেন্টকে ইশারা করতেই সে যা বুঝার বুঝে নিল। এটেনডেন্ট আমাদেরকে তিনটে সিটের ব্যবস্থা করে দিলো। আমরা সিটে বসলাম। আমার মনে তখনও ব্যাপারটা স্বপ্নের মতো; কোত্থেকে কী হয়ে গেল। জীবনে কখনও খারাপ কাজে অগ্রণী হবো না- এরকম একটা নীতিবাক্যে বিশ্বাসী হলেও হুজুগে বাঙালি হিসেবে সেই অন্যায় কাজেই আমিও নিজে একজন অংশীদার হয়ে গেলাম আজ।

“পুরো ট্রেন ভর্তি ছাত্র-ছাত্রী” —কথাটা পুরোপুরি সত্যি। ট্রেন বোঝাই করে তারা চলেছে ঢাকার উদ্দেশ্যে, কিন্তু কেন? প্রশ্নটার উত্তর জানতেই আমি আমার সামনের সীটে বসা ছাত্রটিকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলাম। সে উত্তরে জানালো, আজকে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা ছিল। তাই সবাই পরীক্ষা দিয়ে ফিরছে। আমি আমার উত্তর পেলাম। শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিতে উদ্বাস্তু এই ছাত্র-ছাত্রী-অভিভাবকেরা সবাই আজকে ভোরেই এসেছিল সিলেটে, সারাদিন পরীক্ষা-কার্যক্রমে থেকে আবার রাত জেগে কষ্ট করে ফিরছে এখন। জয় হোক, ছাত্রজীবনের জয় হোক।

যাক, অন্তত ‘ঢাকা ফেরা’ সমস্যার সমাধান হলো। টিটি আমাদের টিকেট চেক করতে এলে অন্য একজন তাকে হাত ইশারায় সরিয়ে নিলো, অনিয়মসিদ্ধ বাঙালির কাছে অনিয়মই নিয়ম; কেউ কিছুই বুঝলো না, বা বুঝলেও মনে করলো না। টিটি সরে যেতেই চোখে পড়লো তাকে… হ্যা তাকে।

একটি মেয়ে… না না দুইটি মেয়ে। তারা বেশ কয়েক সীট সামনে বসেছে, ঠিক আমাদের সারির দিকে মুখ করে। কেন জানি মনে হলো, তারা দুজনে আমার দিকে তাকাচ্ছে [মানে আমাদের দিকে তাকাচ্ছে]। তারপর দুজনেই কোনো একটা বিষয়ে আলাপ করছে; বোধহয় দুজনে বান্ধবী। আমি তাদেরকে আড়চোখে দেখলাম। তাদের মাঝে সরাসরি বসা মেয়েটার প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ হলো। কিন্তু মেয়েটা এদিকে তাকাতেই আমি [লজ্জায় কিংবা সংস্কারে] দৃষ্টি সরিয়ে নিলাম। হয়তো আমি মেয়েটার দৃষ্টিসীমার মধ্যে পড়ে যাওয়ায় মনে হচ্ছে মেয়েটি আমার দিকে তাকিয়ে আছে, আসলে হয়তো মেয়েটি আমার প্রতি [অজ্ঞাত কারণে] চরম বিরক্ত।

কী আর করি, মাঝে মাঝে আমারও দৃষ্টি পড়ে যাচ্ছে মেয়েটার উপর। নানান রকম ধারণা করার চেষ্টা করলাম। যেমন মেয়েটা সিলেটে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিতে এসেছিল, তারমানে মেয়েটা সদ্য এইচএসসি পাস করেছে; বয়স হবে আনুমানিক আঠারো থেকে বিশের মধ্যে। মেয়েটা যেহেতু আবার ঢাকায় ফিরছে, তারমানে তার বাসস্থান ঢাকায়। মেয়েটা অবশ্যই আমার থেকে বয়সে ছোট। তবে আমার শারীরিক গঠন, কাঠামো, উচ্চতা দেখে মেয়েটা নিশ্চয়ই ভাবছে আমিও তারই মতো শাহজালালে পরীক্ষা দিতে এসেছিলাম, এখন ঢাকা ফিরছি। এভাবে ভেবে থাকলে সে আমার প্রতি আকর্ষণবোধ না করারই কথা।

কিন্তু আমি মেয়েটার প্রতি আকর্ষিত হলাম। বাইরে অন্ধকার রাত, জানালা বন্ধ। আমার পাশের সীটে সেজ চাচা বসে। আর-সব ট্রেন-যাত্রায় আমি জানালার পাশে বসা পছন্দ করতাম দৃশ্য দেখার জন্য। কিন্তু রাতের ট্রেনে বাইরে অন্ধকার কালো ছাড়া আর কিছুই থাকে না। তাই জানালার কাছের সীটে না বসে বসেছি করিডরের কাছের সীটে। তাই সুযোগ পেলেই আড়চোখে দেখছি সেই মেয়েটিকে। ভালো লাগছে তাকে দেখতে। মনের মধ্যে প্রেমই বোধহয় জাগ্রত হলো নিজের অজান্তে। পাঠকদের যারা ‘প্রেম’ আর ‘ভালোবাসা’ শব্দ দুটিকে এক করে দেখেন, তাদের অবগতির জন্য জানাচ্ছি, আমার কাছে প্রেম এবং ভালোবাসা দুটো আলাদা বিষয়।

মুগ্ধতা, রূপানুরাগ, গুণানুরাগ, সান্নিধ্য থেকে ‘প্রেম’ হয়। আর সেই প্রেমের সাথে যখন শ্রদ্ধা শব্দটা যুক্ত হয়ে যায়, তখনই তা হয়ে যায় ‘ভালোবাসা’। এছাড়া বাকি সব আবহই এ দুয়ের মাঝে বর্তমান। প্লেটো যথার্থই বলেছিলেন, ‘প্রেমে পড়লে সবাই কবি হয়ে ওঠে।’ সুন্দরের ভালোবাসায় নয়, প্রেমে পড়ে আমিও প্লেটোকে সত্যি করে দিলাম। পকেট থেকে ছোট্ট নোটবুক বের করে তাতে পেন্সিল দিয়ে লিখলাম কবিতা; বলাই বাহুল্য, আমার জীবনের প্রথম প্রেম বিষয়ক কবিতা। আশ্চর্য হয়ে আবিষ্কার করলাম, যে আমি প্রেম বিষয়ক কবিতাকে অবজ্ঞার চোখে দেখতাম, সেই আমি বসে বসে প্রেমের কবিতা লিখে চলেছি। প্লেটোর প্রতি শ্রদ্ধায় অবনত হয়ে আসে আমার মন।

সময় যায়, দুপুর থেকে ভাত খাইনি, তবু ক্ষিধে লাগছে না। বোধহয় প্রেমাবহে ক্ষিধেও মরে গেছে। ট্রেন শ্রীমঙ্গল পার হতেই ছোট চাচা একটা মিনারেল ওয়াটার আর একটা পাউরুটি নিয়ে হাজির (শ্রীমঙ্গল স্টেশন থেকে কিনেছেন)। আমরা একসাথে বসলাম কোনোরকমে ক্ষিধেটাকে ধামাচাপা দেবার জন্যে। কিন্তু নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাস, যথেষ্ট উৎসুক তিন জোড়া চোখের সামনে যে কয়টা পাউরুটি বেরিয়ে এলো, প্রত্যেকটাতেই পিঁপড়া বাসা বেঁধেছে। শেষ পর্যন্ত মিনারেল ওয়াটারখ্যাত বোতলজাত পানীয় দিয়ে গলাটা ভিজিয়ে শরীরকে জানিয়ে দিলাম: তোমাকে কিছু খাবার দিলাম, নাও ঠান্ডা হয়ে যাও কেন জানিনা রাতে আমরা কোনো ধরণের খাবারই গ্রহণ করলাম না আর।

ইতোমধ্যে রাত বারোটা পার হয়ে গেছে, তারমানে আরেকটা দিনের শুরুও হয়ে গেছে। বাকিটা পথ সেজ চাচা আমার পাশে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে রইলেন, পুরোপুরি ঘুম আসছে না। আমার চোখে ঘুম নেই। রাত তখন দুটা বাজে। মেয়েটাও ঘুমিয়ে পড়েছে। এবারে আমি তার দিকে সরাসরি তাকালাম (বোধহয় কোনো পর-নারীর প্রতি এই প্রথম এভাবে সরাসরি তাকালাম)। না, কোনো কুশ্রী ভাবনায় নয়, কোনো বিশ্রী কামনায় নয়; তাকালাম শ্রেফ প্রেমাবিভূত হয়ে, মুগ্ধতা ভরে, কাব্য মহিমায়, রূপানুরাগে।

তার অবাধ্য আড়ম্বরহীন ঋজু চুলগুলো ঘুমে বোজা চোখ দুটির উপর এলোমেলোভাবে পড়ে রয়েছে। ঐ সুশ্রী মুখটা আরো সুন্দর লাগছে ঘুমের মাঝে। এই রূপের একটা নাম হতে পারে ‘ঘুমরূপ’। মানুষকে ঘুমালেও যে সুন্দর লাগতে পারে, আমি বোধহয় এই মেয়েটিকে না দেখলে এই সত্য বুঝতাম না। তার সুন্দর আকৃতি দেয়া ভ্রু-জোড়াও যেন চোখের ঘুমকে আরো প্রশান্ত করেছে। শীতের তীব্রতা থেকে বাঁচতে শাল দিয়ে পুরো শরীরটা মুড়িয়ে পা সীটের উপর তুলে ঘুমিয়ে পড়েছে। জড়োসড়ো অবস্থায় ঘুমরূপবতী পরীকে দেখে মুগ্ধ আমি আরো একটি কবিতা লিখে শেষ করলাম রাত তিনটায়। কামরায় সবাই-বোধহয় ঘুমিয়ে, আমি একা জেগে আছি এক নারীর ঘুমরূপে হারিয়ে।

ভাবলাম যতটুকু ড্রয়িং জানি, তা দিয়ে মেয়েটির একটা স্কেচ করি। কিন্তু না, মেয়েটিকে ছবির ফ্রেমে বন্দি না করে কবিতার খাতায় বন্দি রাখাই শ্রেয় মনে করলাম; হয়তো ছবির সেই ক্ষমতা নেই, কবিতার যা আছে। তখনই মনে হলো একটা কাজ করলে কেমন হয়, মেয়েটাকে একটা কবিতা লিখে উপহার দিয়ে দিই। কিন্তু দিলাম না। কারণ মেয়েটির অভিভাবকরা যদি ব্যাপারটা দেখে ফেলেন, ব্যাপারটা আর ‘কবির প্রেম’ থাকবে না, ব্যাপারটাতে মেয়েটাকেও জড়ানো হবে, তার বান্ধবীকে জড়ানো হবে, মেয়েটার পারিবারিক ভাবমূর্তি আমূল পরিবর্তিত হয়ে যাবে। না, আমার রূপমুগ্ধতায় তার ক্ষতি হোক, সে আমি কী করে চাই?

ভাবলাম, পাশ দিয়ে যাবার সময় একটা কাগজে কবিতা লিখে জানিয়ে দিব আমি তার রূপে মুগ্ধ, [চলছে] একুশে বইমেলায় আমি তার অপেক্ষা করবো কোনো এক স্থানে; তাকিয়ে তারই পথপানে। কিন্তু আমার মন সব পরিকল্পনাই বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নানারকম পাল্টা যুক্তি দাঁড়া করালো, যা খন্ডানোর জন্য আমি কোনো নতুন যুক্তি খুঁজে পেলাম না। মেয়েটিকে আমি শুধু মুগ্ধ হয়ে দেখলাম। তার প্রেমে পড়ে রইলাম। তার প্রতি সেই প্রেমটুকুকে দুটো কবিতায় জিইয়ে রাখলাম। তার প্রতি সেই অনুরাগটুকু আজ এই কাহিনীতে তুলে ধরলাম।

ট্রেন কমলাপুর রেলস্টেশনে এসে থামলো ভোর ৬টায়। এখনও সূর্যই উঠেনি। ঘুমরূপবতীর ঘুম ভাঙলো। তাদের পরিবার প্রস্তুতি নিলো নেমে পড়ার। আমার ঘুমরূপবতী তার বান্ধবীর দিকে তাকিয়েছে কোনো কথা বলার জন্য হয়তো। আমি আর সেদিকে তাকিয়ে থাকতে পারলাম না। জীবনের বাস্তবতার আবহে আমি আর আমার দুই চাচা ট্রেন থেকে নেমে ব্যস্ত ঢাকার ভোরের ব্যস্ততাহীনতায় পা বাড়ালাম।

এক নাগাড়ে এতোটুকু যাত্রার ক্লান্তি মোটেই স্পর্শ করলো না আমাকে শ্রেফ সেই প্রেমাবহে। আমি প্রেমের নৌকায় ভেসে ভেসে এসে একটা রেস্টুরেন্টে ঢুকলাম চাচাদের সাথে। আর আবিষ্কার করলাম, আমি যে বলেছিলাম, ‘ভাত ছাড়া কি বাঙালির চলে!’- কথাটা একেবারে মিথ্যা; ভাত ছাড়াও বাঙালির চলে। গতরাতে কিছুই খেলাম না, অথচ এই ভোরে রুটি দিয়ে নাস্তা সারছি।

কিন্তু আমার কোনোই আক্ষেপ নেই। এতো কষ্টের পরও আমার বিন্দুমাত্র আক্ষেপ নেই; কারণ আমার কবিতার খাতায় সেই মেয়েটি দুটি কবিতা উপহার দিয়ে গেলো। আরো প্রাপ্তির বিষয় হলো, আমার এতোদিনের কবিতার প্যাটার্নের বাইরে রচিত ও-দুটি কবিতা আমাকে কবিতার রাজ্যে নতুন করে বিচরণ করতে শেখালো। মেয়েটি আমার চোখ থেকে হারিয়ে গেলেও কবিতায় জিইয়ে থাকলো। ঝামেলাপূর্ণ, গরম-সরম, এই মন্দে ভরা ভ্রমণে এটুকু ভালো কি আমি জিইয়ে রাখতে পারি না?

ভালোবাসা নিও তুমি, ওগো ঘুমপরী,
যাত্রাপথের সেই অচেনা নারী;
আজো আমি কাব্যে যে তোমারেই স্মরি ॥

~ সমাপ্ত ~

-মঈনুল ইসলাম
[email protected]

মন্তব্য করুন