কর্মক্লান্তি থেকে পালাতে – পাহাড়ের উল্টো পিঠে : পর্ব ৪

কোমর পানি দিয়ে পাইন্দু খাল পার হয়ে পাড়াবাসীদের একপ্রকারের ঠেলে সরিয়ে দেয়াকে উপেক্ষা করে আমরা আশ্রয় পেয়েছিলাম পাইন্দু হেডম্যান পাড়ায়। রাতভর চললো অঝোর ধারায় বৃষ্টি। সকালেও সেই ধারা অব্যাহত থাকলো। কিন্তু বৃষ্টির প্রস্তুতি না থাকাসত্ত্বেয় এই পাড়াবাসীরা আর আমাদেরকে রাখতে রাজি না। মানে মানে বুঝিয়ে দিয়েছেন কারবারি, আমাদের বেরিয়ে পড়া উচিত। বৃষ্টির মধ্যেই বেরোতে হবে আমাদেরকে।

কিন্তু জিনিসপত্তর তো ভেজানো যাবে না। আমি, যদিও শরতে ট্রেক করতে নেমেছি, তবু, আমার রাকস্যাকের ভিতরের কাপড়গুলো বড় একটা পলিথিনে ঢুকিয়ে এনেছিলাম। ক্যামেরাটাও একটা পলিথিনে পুরে তারপর ক্যামেরার ব্যাগে পুরে নিয়ে এসেছি। কিন্তু র‍াকস্যাকটা ভিজে গেলে, চুইয়ে চুইয়ে ভিতরের অন্যান্য জিনিসপত্র তো ভিজতে থাকবে। তাছাড়া কাপড়-চোপড় ছাড়াও ব্যাগে বহু জিনিস আছে, কোনোটা থেকে কোনোটাই কম দরকারি না। এখন যে অবস্থা দাঁড়িয়েছে, তাতে তো ভেজাতেই হবে দেখছি।

আমি তো যাহোক কিছু জিনিস পলিথিনে নিয়ে এসেছি, বাকিদের অবস্থা কী? জানা গেল তানভিরের ব্যাগটা জলরোধী, আর আবু বকরের ব্যাগে বৃষ্টিমোড়ক (রেইন কভার) আছে। কিন্তু মোহনের রাকস্যাকে বহু জিনিস, কোনোভাবেই বৃষ্টিতে ভেজানোর কোনো মানে হয় না। কিন্তু কিভাবে কী?

অবশেষে আল্লা’র অশেষ কৃপায় ব্যবস্থা একপ্রকারের হয়ে গেলো। নিচের দোকানটা থাকায় উপকার হলো আমাদের। চিপ্‌স নিয়ে আসা হয়েছে যে বড় ব্যাগে পুরে, সেরকম দুটো ব্যাগ পাওয়া গেল। এঘরের জামাই আমাদেরকে সেগুলো জোগাড় করে দিলেন। বড় ব্যাগগুলো দিয়ে আমাদের রাকস্যাক দুটো পুরোপুরি ঢেকে ফেলা যাবে। কিন্তু পিঠে নেবার জন্য তো বেল্ট কাঁধে পরতে হবে – তাহলে পলিথিনে মোড়াবো কী করে? হঠাৎ বুদ্ধিটা মাথায় খেলে গেলো: রাকস্যাকের বড় দুটো কাঁধ-ফিতা যেখান থেকে বেরিয়েছে, সেখানে পলিথিনটা কেটে ফিতাটা ওদিক থেকে বের করে নিলেই কাজ সাবাড়। আবু বকর, এই বুদ্ধিমতো ব্লেড দিয়ে সামান্য একটু পলিথিন চিরে ওখান দিয়ে ফিতা দুটো বের করে দিলেন। তারপর ফিতার নিচের দিকটা ক্যাট করে ক্লিপে ক্লিপে বসিয়ে নিতেই অসাধারণ একেকটা বৃষ্টিমোড়ক হয়ে গেলো। বোতল যা আছে, সেগুলোতে কারবারির কলসগুলো থেকে পানি নিয়ে নিলাম। পুরাই পাংখা!

আমার ব্যাগের ঐ দুটো ক্লিপই ভেঙে গেছে। গতকালকে যখন বলেছিলাম ‘ব্যাগের ফিতা ছিঁড়ে গেছে’, আসলে দ্বিতীয় ক্লিপটাও ভেঙে গেছে। আর, আগেরটা ছিঁড়েছিল অজানা লেকের অভিযানে, পদ্মঝিড়িতে। তাই আমারটা আসলে একই পদ্ধতিতে ফিতা বের করে নিচের অংশে গিঁট দিয়ে চলছে। ক্যামেরার ব্যাগটা, ক্যামেরাসহ আবু বকরের ব্যাগের ভিতরে পুরে নিলাম। ওটা বাইরে রাখলে ভিজে যাবে। ছোট একটা পলিথিন ব্যাগ আবু বকর মাথায় পরে নিলেন। তানভিরও একই কাজ করলো। মোহনের মাথায় হ্যাট আছে। আর, আমি গামছাটাকে দুই প্যাঁচ দিয়ে মাথায় বেঁধে নিলাম। লজিক হচ্ছে, বেশি ভিজে গেলে নামিয়ে নামিয়ে চিপে ফেলবো, তাহলে দুই স্তর ভেদ করে বৃষ্টির জল মাথায় লাগার আগেই আটকে যাবে।

সবকিছুই সুন্দরমতো হয়ে গেছে আল্লা’র দয়ায়। আমরা ডিম, ডাল আর গতকাল কেনা বিস্কুটের দামটুকু দিয়ে বেরিয়ে পড়লাম কারবারির ঘর থেকে। বেরোবার আগে আবু বকর আদর করে ঐ বাচ্চাটাকে কিছু টাকা দিয়ে এলেন – আমরা তো এঁদের আপ্যায়নের কোনো বিনিময় দিতে পারবো না, আর পাহাড় টাকা ঢালবার জায়গাও নয়।

গুড়িগুড়ি বৃষ্টি চলছে অনবরত।

সবার থেকে বিদায় নিয়ে আমরা পাকা সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে যেতে শুরু করলাম। পাড়াবাসীর বর্ণনা থেকে জেনেছি, এই দিক দিয়ে রুমা যাওয়া যায়। আবার এটাও জেনেছি, পরের পাড়াতেও এদিকে দিয়েই যাওয়া যায়। তাই আমরাও পাহাড়ের চড়াই পেরোতে থাকলাম। উপরে উঠার সময় ডানদিকে এই পাড়ার খিয়াং ঘর, আর আরো একটু উপরে বামদিকে এই পাড়ার প্রাইমারি স্কুলের নতুন ভবন। আরেকটু সামনে এগোতে, বামে একটা বাঁধানো বট গাছ – বুঝতে বাকি রইলো না, গৌতম বুদ্ধের নির্বাণপ্রাপ্তির সাথে সাযুজ্য তৈরি করার প্রয়াস। গাছটার ডানদিকে একটা স্তূপ।

পাইন্দু হেডম্যান পাড়ায় বৌদ্ধ স্তূপ - নিশাচর
পাইন্দু হেডম্যান পাড়ায় বৌদ্ধ স্তূপ – নিশাচর

স্তূপ (stupa) স্থাপত্য (স্তূপ পালি শব্দ) ভারতীয় উপমহাদেশের সবচেয়ে প্রাচীন স্থাপত্য নিদর্শনের একটা। এটাতে নিচের বেদিটা চারকোণা, আর উপরে বৃত্তের আকারে ছত্র-গম্বুজ দেখা গেলেও, আগে স্তূপ এরকম ছিল না। ‘মহাপরিনির্বাণসূত্র’ সংকলন থেকে জানা যায়, মহাপরিনির্বাণের (মৃত্যুর) আগে গৌতম বুদ্ধ, তাঁর অনুগামীদের, তাঁর দেহভষ্মের উপর স্তূপ নির্মাণের ইঙ্গিত করে গিয়েছিলেন। তারপর তাঁর দেহভষ্ম ৮টি ভাগে ভাগ করে ৮টি জনপদে পাঠানো হয়েছিল, এবং প্রত্যেক স্থানেই দেহভষ্মের উপরে স্তূপ নির্মিত হয়েছিল। জৈনধর্ম থেকে স্তূপ বানানোর রীতি এলেও কালের আবর্তে বৌদ্ধ ধর্মের অনুষঙ্গ হয়ে উঠে। গৌতমবুদ্ধের কিংবা শিষ্যদের দেহভষ্মের স্তূপ এদেশে নেই, তাই এদেশে সব স্তূপই ভোটিভ স্তূপ – সেই প্রাচীন স্তূপকে প্রতীকাকারে স্মরণ এবং পূজনীয় হিসেবেই এখন স্তূপ বানানো হয়। এটাও যে কোনো পূরাতাত্ত্বিক স্তূপ নয়, বরং সেরকমই একটা আধুনিক স্তুপ – তা এর নির্মাণশৈলী দেখেই বলে দেয়া যায়।

পাহাড়ি পায়েচলা পথ (পাহাড়ি হাইওয়ে) ধরে চড়াই বেয়ে ওঠা। রাকস্যাকের উপরের পলিথিনে বৃষ্টির শব্দ, আমাদের পায়ের শব্দ, আর মাঝে মাঝে দুয়েকটা পাখির আওয়াজ ছাড়া পুরো পরিবেশ সুনসান নীরব, নিঃস্তব্দ। বাতাসে বৃষ্টির সোদা গন্ধ, প্রকৃতির অপূর্ব সবুজ আস্তরণটা যেন বড্ড বেশি মায়াবী। এই সবুজ প্রকৃতি দেখার জন্যই তো শহর ছেড়ে আসা। নাহ্, বেরিয়ে মন্দ লাগছে না।

বাতাস হয়তো নেই, কিন্তু তবু গরম তেমন লাগছে না। পরিশ্রমের উষ্ণতা ছাড়া আর কোনো গরম লাগছে না। পাহাড়ে উঠতেও খুব একটা কষ্ট হচ্ছে না, সহজ রাস্তা। পাহাড়ের উপর থেকে বামদিকে অপূর্ব দৃশ্য – কলাগাছের বাগান, জুমে কলা চাষ করা হয়েছে। ঠিক মাঝখানে একটা জুমঘর – পাহাড়িদের বিশ্রাম নেবার স্থান, ফসল তুলে জমিয়ে রাখার স্থান। দূর পাহাড়ের গায়ে পেঁজো তুলার মতো মেঘেদের ওড়াওড়ি – বৃষ্টিতে সিক্ত কচি সবুজ পাহাড়ি চেহারা যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে আমাদেরকে – বড় মায়াময়, বড় মধুময় এই প্রকৃতি, এই দেশটা। এর কতটুকুইবা দেখেছি আমি!

পাহাড়ের উপর থেকে বৃষ্টিসিক্ত পাহাড়ের অপূর্ব দৃশ্য - নিশাচর
পাহাড়ের উপর থেকে বৃষ্টিসিক্ত পাহাড়ের অপূর্ব দৃশ্য – নিশাচর
পাইন্দু হেডম্যান পাড়া থেকে রুমা যাবার পথে - নিশাচর
আবু বকর আর তানভিরকে দেখা যাচ্ছে ট্রেইল ধরে হাঁটতে (ছবির ডানদিকে একটা পাকা ব্রিজ দেখা যাবে) – নিশাচর

পাহাড় থেকে নামার পথে বেশ কিছুদূর এগিয়ে গিয়ে আমরা আশ্চর্য হয়ে আবিষ্কার করলাম, পথে একাধিক পাকা পুল। আশ্চর্য হবারই কথা, পাহাড়ের ট্রেইলে আবার পাকা ব্রিজ! ব্রিজের নিচ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে পাহাড় থেকে নামা প্রমত্তা জলধারা। আবু বকর তখন বললেন, “নয়ন, আমাদের মনে হয় একজন গাইড নিয়েই আসা উচিত। ঐ পাড়াতেই ফিরে যাওয়া উচিত।” এতোদূর এগিয়ে এখন এই কথাটা আসলেই বড্ড বেমানান লাগছিলো আমার কানে। আবার এও চিন্তা করলাম, ট্রেইলে যেহেতু উঠেই গেছি, আর, সড়কপথে পরের পাড়াতে যাওয়া যায় আমরা জানিও, তাহলে আর পিছুটান টানাটা কোনো বুদ্ধিমানের কাজ হতে পারে না। আবু বকরকে বললাম, “এতোদূর যেহেতু চলেই এসেছি, আর পিছনে না, সামনে এগোনো যাক, যা হয় হবে।”

সামনে এক জায়গায় গিয়ে রাস্তাটা দুভাগ হয়ে গেলো – ডানদিকের রাস্তাটা নিচে নেমে গেছে, আর বামদিকেরটা পাহাড়ের উপরে উঠে গেছে। আবু বকরের মত, ডানদিকে হওয়া উচিত রাস্তাটা। মোহন হয়তো ভাবছে, পরের পাড়াটা যেহেতু খালের উজানে, আর খালটা এখান থেকে বামদিকে রয়েছে, সুতরাং বামদিকের রাস্তাটাই হওয়া উচিত – সে বলছে বামদিকে হবে। আমরা বামদিকের চড়াই ধরলাম। এগিয়ে গিয়ে দেখি রাস্তায় টায়ারের দাগ এবং রাস্তাটা গাড়ি চলাচল সড়ক – কেন যেন আমার মনে হতে থাকলো, এটা বিজিবি’র ক্যাম্পে ওঠার রাস্তা। আবু বকরকে বললাম, যে বিজিবি’র চোখ এড়িয়ে যাবার পরিকল্পনা করেছি, উপরে উঠে দেখতে পারি সোজা বিজিবি’র হাতেই গিয়ে যেচে পড়ে ধরা দিলাম। আবু বকর হাসলেন। …এবং কথাটাই ফলে গেলো, উপরের দিকে গিয়ে দূর থেকেই দেখলেন আবু বকর, বাঁশের তৈরি ফটকের উপরে লেখা: বি জি বি।

গ্যারিসন ব্রিজের পাশ দিয়ে ট্রেইল - নিশাচর
ডানদিকে পাতার ফাঁক দিয়ে গ্যারিসন ব্রিজ দেখা যাবে – নিশাচর

মুচকি হেসে নেমে এলাম আমরা। প্রশাসনের সাথে মোয়ামেলাতের কোনোই ইচ্ছা আমাদের নেই। ডানদিকের রাস্তাটাই ধরলাম আমরা। একটা নির্মাণাধীন ব্রিজের পাশে একটা ট্যাংকে পানি আছে। আবু বকর বললেন, সম্ভবত সুুপেয় জল না, কাজের জন্য আনা। তাই আমরা না খেয়ে, হাতমুখ ধুয়ে সামনে এগোলাম। আর, তখনই আবিষ্কার করলাম আমার দ্বিতীয় বোতলটাও পথে কোথাও ব্যাগ থেকে পড়ে গেছে। মনটা খুবই খারাপ হয়ে গেলো: পানির মতো দরকারি জিনিসে আমি কখনও কার্পণ্য করি না। তাই দুটো বোতল নিয়ে এসেছিলাম। এখন তার একটাও আমার সাথে নেই। অন্যের থেকে বোতল ধার করে পানি খেতে হবে – দুঃখজনক!

সামনে আরো এগিয়ে, ব্রিজ পার হয়ে কিছুটা এগিয়ে হঠাৎ আবু বকর মাটিতে কিছু একটা কুড়িয়ে নিলেন – আমলকি। আহা! গাছ থেকে পাড়া টাটকা আমলকি। শহুরে ফর্মালিন আর সার দেয়া বিস্বাদ জাম্বু জাম্বু আমলকির ভিড়ে ঐ ছোট ছোট আমলকিগুলোর স্বাদ আমি বলে বোঝাতে পারবো না। অনেকগুলো কুড়িয়ে নিয়েছিলাম। সত্যি বলছি, মোহনের ভাষায় ঐ কষ্‌টে ফলটাও অপূর্ব স্বাদের ছিল। কিছুদূর গিয়ে ওখান থেকে আমরা গ্যারিসন ব্রিজ দেখতে পেলাম। আরো সামনে এগিয়ে এবারে রাস্তাটা গিয়ে মিশলো আরেকটা রাস্তায়, বামদিকের রাস্তাটা ইট স’লিং করা, উপরের দিকে উঠে গেছে, আর ডানদিকেরটা ভাঙা…।

এই তিন রাস্তার সমাহারে একটা ব্যক্তিগত সম্পত্তির সাইনবোর্ড টাঙানো দেখে বুঝলাম, এটা একটা চৌহদ্দি:

উত্তরে: পাইন্দু সীমানা;
দক্ষিণে: রিজাম্রং ঝিড়ি মাথা;
পূর্বে: মংশৈপ্রু সীমানা;
পশ্চিমে: চান্দা পাড়া সরকারি চলাচল রাস্তা।

আবু বকর বুঝলেন, একটু আগে যে পথে উপরে বিজিবি ক্যাম্প দেখেছি, বামদিকের উপরের রাস্তাটা সেদিকেই গেছে, এবং রাস্তাটা ক্যাম্পের ভিতর দিয়েই গেছে। এদিক দিয়ে পরের পাড়ায় এগিয়ে যাওয়া মানে বিজিবি’র হাজারো প্রশ্নের সামনে দাঁড়ানো। তাই আমরা ডানদিকের ভাঙা রাস্তা ধরে কিছুদূর এগোলাম। সামনে গিয়ে ডানদিকে একটা খিয়াং ঘর দেখা গেলো, জনমানবশূণ্য, তাই এগিয়ে গিয়ে ছবি তুললাম। গ্যারিসন ব্রিজের সাথে রাস্তার দিকের হিসাব মিলিয়ে আবু বকর বুঝলেন, এই রাস্তাটা রুমার দিকে গেছে। তাই এদিকে এগোন বৃথা। উল্টো পথই ধরতে হবে।

খিয়াং, খ্যাং বিভিন্নভাবে ডাকা হলেও এগুলো বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের উপসনালয়। আরাকানী আর মগদের মাধ্যমে আঠারশ শতকের শেষাংশে বাংলায় এই স্থাপত্যের আগমন ঘটে। এতে ক্রমশ সরু হয়ে ওঠা একাধিক ধাপের টিনের চাল দেখা যায়।

খিয়াংঘরের ছবি তুলে আমরা একটু জিরোচ্ছি, মোহনের ক্যাপে তাকিয়ে দেখি একটা প্রজাপতি বসেছে। হিন্দু ধর্মমতে, প্রজাপতি, প্রেম আর বিয়ের দেবতা (ব্রহ্মা)। তাই মোহনকে নিয়ে হাসলাম কিছুক্ষণ – “শিঘঘিরই তোর জন্য সুসংবাদ আসছে – তোর বিয়ে”। গলায় পানি ঢালছি আর মজা করছি – এমন সময় একটা গাড়ির শব্দ। বামদিকের যে ইট স’লিং করা রাস্তাটা ছিল, ওদিক থেকে এগিয়ে আসছে বিজিবি’র একটা গাড়ি। এখন কোথায় যাই? কোথায় পালাই?

আবু বকর, খিয়াং-এর টিনের বেড়ার আড়ালে চলে গেলেন দৌঁড়ে, কিন্তু আমরা ব্যাগ গুছিয়ে ওখানে যেতে যেতে গাড়ির নজরবন্দি হয়ে গেলাম। এখন উঠে দৌঁড় লাগালে উল্টো সন্দেহের মধ্যে পড়ে যাবো। তাই আগের মতোই ঠাঁয় দাঁড়িয়ে পানির বোতল হাতে, পালিয়ে যাবার বদলে, উল্টো জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে গাড়ির দিকেই তাকিয়ে থাকলাম চোখ বড় বড় করে। ভাবটা এমন- এই, ভিতরে কে রে? 😜

গাড়িটার গতি একটু ধীর হলো, কিংবা আমাদের মনের ভ্রমও হতে পারে। কিন্তু হয়তো ভাবলো, পর্যটক হয়তো এসেছে রুমা থেকে – হয়তো ওদের গাইড ওদেরকে দাঁড় করিয়ে খিয়াং-এ ঢুকেছে পূজা দিতে। যাক না সামনে, সামনেই বিজিবি ক্যাম্প, সুতরাং এগুলোকে নিয়ে টেনশনের কোনো কারণ নেই। চলে গেলো গাড়িটা। জানে পানি পেলাম। আর ওখানে দাঁড়িয়ে থাকার কোনো মানে হয় না। উল্টো পথ ধরলাম।

পাইন্দু পাড়ায় ফিরতি পথ ধরা
পাইন্দু পাড়ায় ফিরতি পথ ধরা

এবং, এবারে আবু বকর মোক্ষম সিদ্ধান্ত নিলেন, চরম ভুল হয়ে গেছে। আমাদের আবার পাইন্দু পাড়ায় ফিরে যাওয়া উচিত। আগেই আমাকে সেটা বলেছিলেন, আমিই সেটা নাকচ করে দিয়েছিলাম অন্য চিন্তা করে। কিন্তু এখন অবস্থাদৃষ্টে এর কোনো বিকল্প খুঁজে পেলাম না আমরা। আবার, যে পথে এসেছিলাম, সে পথে ফিরে চললাম।

ফিরতি পথটা আমাদের চেনা, তাই খুব দ্রুতই পার করে আসতে থাকলাম। এবং বিজিবি ক্যাম্প থেকে দূরে এসে পথে এক ব্যক্তির সাথে দেখা হয়ে গেলো আমাদের। ছাতা মাথায় দেয়া ঐ পাহাড়ি যাচ্ছেন আমাদের লক্ষের সেই পরবর্তি পাড়াতেই। তিনি ঐ পাড়ারই বাসিন্দা। আবু বকর জেনে নিলেন ঐ পাড়ায় যাবার পথ, এবং আমরা যে হিসাব-নিকাশ করেছিলাম – তা-ই সত্যি। বিজিবি ক্যাম্পের সামনে দিয়ে গেছে পাকা সড়ক – ওদিক দিয়েই যেতে হয় ঐ পাড়ায়। আর, আরেকটা পাহাড়ি পথ আছে, বাম দিকে দেখালেন তিনি, কিন্তু এপথে সময় বেশি লাগবে। আমরা হয়তো ওনাকে গাইড দেখিয়ে ওনার সাথে চলে যেতে পারি। কিন্তু রুমাতে গাইড এসোসিয়েশন আছে, সেখানে তালিকাবহির্ভূত একজনকে গাইড হিসেবে নিয়ে গেলে ধরাই খেয়ে যাবো। তাই ঐ ব্যক্তিকে বিদায় দিলাম।

গতকাল রাতে যেসব হিসাব-নিকাশ পেয়েছি, তাতে ঐ পাড়ায় গিয়ে রাত কাটাতে হবে আজকে আমাদেরকে – দূরত্বটা এরকমই। তাছাড়া মাঝি জহিরও যে টাকা দাবি করেছে, তাতে দূরত্বটা সেরকমই মনে হচ্ছে। মোহনের বক্তব্য হলো, আমরা যে চিন্তা করছি, আমরা কি আসলেই সঠিক কোনো চিন্তা করছি? তাই আমি আবু বকরকে ডাকলাম। শোনেন, আমাদের মনে হয় একটা সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আবু বকর হয়তো একটু রাগ করলেন। আমি বললাম, না, সিদ্ধান্ত আপনার। আমরা একটা পরামর্শ করতে চাই। মোহনকে শনিবারের আগে চট্টগ্রামে পৌঁছাতে হবে। আমরা যেভাবে পরের পাড়ায় যাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছি, সেটা কি ঠিক হচ্ছে? আবু বকর চিন্তায় পড়লেন। এবং মনে মনে একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলেন।

বৃষ্টিটা ধরে এসেছে, ছিটা ছিটা বৃষ্টিও এখন আর নেই, কিন্তু আকাশ মেঘলা।

রাকস্যাক মাথায় আটকানোর কৌশল কাজে লাগালাম
রাকস্যাক মাথায় আটকানোর কৌশল কাজে লাগালাম

আমরা পাইন্দু পাড়ায় ফিরে চললাম। পথিমধ্যে আমি একটা কৌশল কাজে লাগালাম। অজানা লেকের অভিযানে পাহাড় বাইবার সময়ই আমার মাথায় বুদ্ধিটা খেলে গিয়েছিল: আমার সিলেটে চা বাগানে ঝুড়িতে কেজি কেজি চা পাতা বহন করেন চা বাগানের কুলিরা, আর সেই ঝুড়ি কাঁধে নয়, আটকান মাথায়। এই বান্দরবানেও পাহাড়িরা ঝুড়ি আটকান – কাঁধে নয়, মাথায়। অজানা লেকের অভিযানে পাহাড় বাইবার সময় যখন ব্যাগটা পিছন দিকে টানছিল, তখনই আমার মনে হয়, যদি কোনোভাবে ব্যাগটা কাঁধের পাশাপাশি মাথায়ও আটকানো যায়? যাবার আগে আমার গিন্নির সাথে পরামর্শ করি বিষয়টা নিয়ে। অবশেষে সেই পরামর্শের সিদ্ধান্ত মোতাবেক আবু বকরের সহায়তায় আমার কাঁধের দুই ফিতার ভিতর দিয়ে আমার মাথার গামছাটা ঢুকিয়ে দুপাশ থেকে বের করে নিলাম। তারপর দুপাশ টেনে এনে একটা হালকা গিঁট দিয়ে তা আটকালাম মাথার সম্মুখভাগে। এবং আশ্চর্য হয়ে আবিষ্কার করলাম, আসলেই তা ব্যাগের ওজন কাঁধ থেকে অনেকটা কমিয়ে আনে আর বেশ খানিকটা লিভারেজ বাড়ায়। ভবিষ্যৎ ট্রেকারদের প্রতি অনুরোধ থাকবে নিজেদের ব্যাগের মধ্যে এরকম কোনো সুযোগ রেখে দেবার জন্য, যাতে প্রয়োজনমতো ক্যারাবিনারজাতীয় কিছু দিয়ে খুব দ্রুত একটা চওড়া বেল্ট লাগিয়ে এভাবে মাথায় আটকে ফেলা যায়। কৌশলটা পাহাড়ে চড়ার সময় আসলেই কাজে দেয়।

ফেরার পথে অনেক খুঁজেও আমার হারিয়ে যাওয়া পানির দ্বিতীয় বোতলটা খুঁজে পেলাম না। …আবারও শিখলাম, কোনো জিনিস, শুধু কোনো একটা পকেটে ঢুকিয়ে স্ট্র্যাপ দিয়ে আঁটোসাটো করে চেপে রাখাই যথেষ্ট না, বরং কোনো না কোনোভাবে সেটাকে বেঁধে আটকে রাখা উচিত। যেমন: পানির বোতলগুলো যদি পাশের ব্যাগে ঢুকিয়ে যেমনটা চেপে রেখেছিলাম স্ট্র্যাপ দিয়ে, তারপর যদি গলায় একটা রশি দিয়ে বেঁধে আটকে রাখতাম, তাহলে ব্যাগ থেকে খুলে এলেও রশিতে ঠিকই ঝুলে থাকতো। যাহোক, ভুল হয় শিখার জন্য – আজীবন মনে থাকবে ইনশাল্লাহ।

দুপুর ২:২৮

আমরা আবারও পাইন্দু হেডম্যান পাড়ায় ফিরে এলাম। নিজেদের মধ্যে আলাপ করছি, আমাদের দেখে পাড়াবাসীর মাথায় বাজ পড়বে – আপদগুলোকে তাড়িয়ে দিয়েও শান্তি নাই – আবার এসে জুটেছে কপালে। আবু বকর তো মজা করার জন্য যেন মুখিয়ে আছেন, “গিয়া কমু, আইজও তোমাদের ঘরে থাকুম, ক্ষিধা লাগছে, এখন খাওন দেও।” ☺️ আমরা সবাই হা হা হা করে হাসলাম।

পাড়ার কাছে গিয়ে মোবাইলে নেটওয়ার্ক পাওয়ায় তানভির, আবু বকরের পরিকল্পনামতো মাঝি জহিরকে ফোন দিতে শুরু করলো। কারণ হিসাব-নিকাশ করে দেখা গেছে, জহির যে টাকাটা চাইছে, সেটা দেবার প্রশ্ন না উঠলেও, আমরা এখন সময়ের হিসাবে পিছিয়ে পড়েছি – উপায়ান্তর নেই আমাদের। ওকে নিয়েই আমরা একটু দ্রুত পরের পাড়ায় যেতে পারবো হয়তো। কিন্তু তানভির যতই চেষ্টা করছে, ততই বিফল – ব্যাটা জহিরের ফোন বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।

অগত্যা আমরা পাড়ায় ঢুকলাম। কারবারির ঘরের নিচের দোকানে গিয়ে জানতে চাইলাম জহিরের খবর। জানা গেলো, সে দোকানে নেই। নিচে নেমে গিয়ে নাম ধরে ডাকলে সাড়া দিবে। আমরা দ্বিতীয়বারের মতো পাড়াবাসীর থেকে বিদায় নিয়ে নিচের এঁটেল মাটির শুকরের খোয়াড়ের মতো কাদা পেরিয়ে আবারও পাইন্দু খালের দিকে নামলাম। নিচে নেমে, বামদিকে একটা খাড়ি দিয়ে পানি বেরোচ্ছে। কতটা গভীর না জেনেই উরু পানিতে নেমে গেলাম একেকজন। মোহন আর তানভির পিছনে থেকে গেলো, আমি আর আবু বকর এগিয়ে গেলাম।

নৌকার মাঝিকে ডাকতে পাইন্দু হেডম্যান পাড়া থেকে সামান্য একটু ভাটিতে গেলাম আমরা
নৌকার মাঝিকে ডাকতে পাইন্দু হেডম্যান পাড়া থেকে সামান্য একটু ভাটিতে গেলাম আমরা

সামনে এগিয়ে গিয়ে দেখি আরেক পাহাড়ি দম্পতি ওদিকে যাচ্ছেন। আরেকটু সামনে এগিয়ে গিয়ে আবু বকর খালের ওপাড় লক্ষ করে হাক দিলেন, “জহির?” কোনো সাড়াশব্দ নেই। আল্লায় দিলে আমার একখান বাজখাই গলা আছে। তাই এবারে ডাকলাম আমি: “জহীর?” দুই তিনবার ডাকার পরে একটা আওয়াজ পাওয়া গেল। ওপাশ থেকে একটা বল্টু এগিয়ে এলো নদীর পাড়ে। জানালো জহির, মোটর ঠিক করছে। আমরা ঐ পাহাড়ি দম্পতিকে অনুসরণ করে একটু উঁচু স্থানে উঠতেই জহিরকে দেখতে পেলাম। মেশিন ঠিক করে সে দশ মিনিটের মাথায় নেমে এলো। আমরা তাকে নৌকা প্রস্তুত করতে বললাম, আমাদেরকে পরের পাড়ায় নিয়ে যেতে হবে। পারবে? অবশ্যই পারবে। টাকা পেলে পাথরও হা করে। সে যে টাকা চেয়েছিল, আমরা সেই টাকা দিতে চাইনি। কিন্তু বাধ্য হচ্ছি। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে, পরের পাড়ায় এগিয়ে যাওয়া দরকার, খুব দ্রুত।

জহির, নৌকা নিয়ে এলে দেখা গেল সাথে আরেকটা ছেলে। আমাদের জানালো, খালে স্রোত বেড়েছে, সেজন্য সে সহায়তাকারী নিয়েছে। আর, আমাদের মাথায় কাঁঠাল ভাঁঙার মতোই সে এবারে সেই শাপে-বর-করা অ্যামাউন্টের উপরও আরো কিছু বাড়তি চেয়ে বসলো। আবু বকর, জীবনেও পাহাড়ে টাকা ঢালার পক্ষপাতি না। আমিও না। কিন্তু পাইন্দু পাড়ায় আমাদের অভিজ্ঞতা, প্রশাসনের চক্ষু থেকে দূরে থেকে চলা আর সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার প্রাক্কালে আমাদের পরবর্তি পাড়ায় এগিয়ে যাওয়া বড্ড বেশি দরকার হয়ে পড়েছিল। আবু বকর, জিবে কামড় দিয়ে রাজি হলেন। ঘাট থেকে মোহন আর তানভিরকে তুলে নিয়ে পাইন্দু খালের স্রোত ঠেলে রওয়ানা করলাম আল্লা’র নামে।

বিকাল ৪:০০

ভটভট আওয়াজ তুলে স্টার্ট নিলো জহিরের নৌকার ইঞ্জিন। আওয়াজটা প্রতিধ্বনি তুললো পাইন্দু খালের উঁচু দুই পাড়ে আর দুই পাড়ের গাছগাছালিতে। হাল ধরলো জহির নিজেই। চোখা নৌকাটা পাইন্দু খালের উজান থেকে নেমে আসা স্রোতের ধাক্কাকে ঠেলে সূঁচের মতো বিঁধে বিঁধে এগিয়ে যেতে চাইছে। জহির মনে করিয়ে দিয়েছে, [সাম্প্রতিক রেকর্ড অনুসারে] পথে দুই জায়গায় নৌকা উল্টানোর সম্ভাবনা আছে।

মনে মনে আল্লা’র নাম যপলাম। পাহাড়ে যেন এবার পাহাড়ের উল্টো পিঠ দেখার জন্যই এসেছি। এবার আবার পাহাড়ি ঢলের ধাক্কায় তলিয়ে না যাই… নৌকার ঠিক মাঝ বরাবর চারজনই বসলাম সামনে-পিছে চারটা পাটাতনে। আর, পাইন্দু খালের বুক চিরে, আমরা চলছি, অচিন এক পাড়ার পানে…

এতো চিন্তান্বিত অজানা ভবিষ্যতের দিকে এতোটা টাকা অপচয় করে মরিয়া হয়ে এগোনর যে আরেকটা উদ্দেশ্য আছে, সেটা নিশ্চয় পাঠক ঠিকই আন্দাজ করে ফেলেছেন। আপনাদের আন্দাজ ঠিক। ঐ সব অজুহাত মিছা বাহানা। উদ্দেশ্য অন্য কিছু। ধৈর্য্যই ধর্ম্ম!!

(চলবে…)

মঈনুল ইসলাম

পরের পর্ব »

মন্তব্য করুন