জলপ্রপাতের খোঁজে – ছোট বোয়ালিয়া আর মালিখোলা ২

~ রজ্জু তীরোপার ~

আমাদের চারজনের দলটা মিরসরাইয়ের খইয়াছড়া ঝরণায় গেল পানির ঢলে গা ডুবাতে, কিন্তু সেখানে গিয়ে হতাশ হতে হলো। সেই হতাশা ঢাকতে আমরা যখন সঙ্গে করে আনা রশি দিয়ে রজ্জু তীরোপার করবার উদ্যোগ নিতে যাচ্ছিলাম, তখন দলনেতা, অভিজ্ঞ আবুবকর করছিলেন দোনমনা। নেতার এই সিদ্ধান্তহীনতায় আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল এক অশুভ পরিণাম।

নেতার জায়গাটি কিভাবে যেন তুহিন ভাই নিয়ে নিলেন- ‘ভাই, আমারে দেন; আরে গ্রামে কত বাঁনছি রশি।’ তারপর কিভাবে রশি বাঁধলে কিভাবে কী হবে সেটা নিজ দায়িত্বে নিয়ে রশি বাঁধার কাজটি হাতে নিলেন। মূল রশিটা (rappelling rope) বেশ দামি, মূল জিনিসপত্রগুলো হলো ট্রেকার দল TrekkersBD’র, আর র‍্যাপলিং রোপটা Dhaka Divers-এর সভাপতি, স্কুবা ডাইভার আর জলতলের আলোকচিত্রী মুজিব ভাইয়ের (এই লেখা মারফত আমি তাঁদের কৃতজ্ঞতা স্মরণ করছি)। এজাতীয় রশিগুলোতে ভিতরে রাবারের ফাইবার থাকে, আর উপরে ঘন বুননে দেয়া থাকে সিনথেটিক ফাইবারের নরম প্রলেপ। এই রশিটা ডানদিকের একটা গাছে বাঁধা হলো। তারপর ওপাড়ে গিয়ে আরেকটা গাছ বাছাই করা হলো ওখানে বাঁধা হবে বলে।

আমি একটা বিষয় বুঝতে পারছিলাম না, বিপদসংকুল পরিস্থিতিতে, যেখানে এধরণের রজ্জু তীরোপার দরকার, সেখানে অপর পাড়ে যাবার কাজটা কে করবে? আবুবকর বললেন, প্রথমে একজনকে ঝুঁকি নিয়ে পার হতেই হবে। সে গিয়ে ওপাড়ে রশিটা বাঁধলে তারপর রজ্জু তীরোপার শুরু হবে। আমার মনে পড়লো, এভারেস্টে চড়ার বিষয়টা: এভারেস্ট যারা জয় করেন, তাদের সবার আগে উঠেন কিন্তু শেরপারা…। তারা গিয়ে স্পাইক গেঁথে রশিকে প্রস্তুত করে এলেই তবে অভিযাত্রীরা পথ বেয়ে উঠেন। সে হিসেবে প্রত্যেকটা এভারেস্ট অভিযানে প্রথম যে ব্যক্তি এভারেস্ট জয় করেন, সে আসলে কোনো না কোনো শেরপা। …তবে যত যা-ই হোক, পদ্ধতিটা আমার মনোঃপূত হলো না।

এদিকে একজন দায়িত্ব নিয়ে নেয়ায় আবুবকর আর নাক গলালেন না, কারণ তিনি এখনও তাঁর শিখে আসা হিসাবটা ঠিকমতো মিলাতে পারছেন না, তাছাড়া দেখে মনে হচ্ছে, তুহিন ভাই ঠিক মন্দ পথে এগোচ্ছেন না – মনে তো হচ্ছে ঠিকই আছে। আর, এসময়ই ঘটলো ঘটনাটা, বলেছিলাম না, নেতৃত্বহীন দলে অপেক্ষা করছিল অশুভ পরিণাম, তা-ই হলো:

গাইডের হাত থেকে দা নিয়ে ঠাশ্‌ ঠাশ্‌ করে আঘাত পড়তে থাকলো বামদিকের একটা ছোটখাটো গাছের গায়ে। আমি আর আবুবকর একটু দূরে দাঁড়িয়ে, দুজনেই চিৎকার করে উঠলাম, আরে, গাছ কাটা লাগবে না। প্রথমে ভেবেছিলাম হয়তো আলগা ডাল কাটছেন তুহিন ভাই। পরে তো পরিণাম দেখে আক্কেল গুড়ুম- পুরু গাছটাই বুকসমান উচ্চতা থেকে কেটে ফেলেছেন উনি। হায় হায়, এ কী হলো! আবুবকরও থ’, আমিও থ’। গাছটা কেটে ফেলে ওনার কোনো অনুভূতিই নেই। দা পাশে রেখে রশি বাঁধতে লেগে গেলেন।

একটা গাছ কেটে ফেলেছেন – এতে আবার অশুভ পরিণামের কী হলো – যারা বুঝতে পারছেন না, তারা দয়া করে লেখাটি পড়া বন্ধ করে বেরিয়ে যান। আপনাদের বোঝানো আমার কম্ম নয়। এই ছবি ফেসবুকে প্রকাশ হবার পরে যে তীব্র প্রতিক্রীয়া জানিয়ে অনেকে আমাদের পুরো দলকে হুজুগে ভর্ৎসনা জানিয়েছিলেন, তাদেরকেও বোঝানো আমাদের দ্বারা অসম্ভব। প্রকৃতি থেকে কিছু শুষে নেবার জন্য গিয়েছি আমরা, প্রকৃতিকে কেড়ে নেবার জন্য যায়নি। খুব মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল আমাদের দুজনেরই। কিন্তু যা হয়ে গেছে, তার তো আর শোধ হয় না, আমরা তো আর, তিনি কামড় দিয়েছেন বলে তাঁকেই কামড়াতে যেতে পারি না…। তাই এর পরিত্রাণের পথ আবুবকর অন্যভাবে করেছিলেন ফিরে এসে – ১টা গাছের বদলে দল বেঁধে ভ্রমণ বাংলাদেশ এবং সবুজ শহরের জন্য‘র থেকে উদ্যোগ নিয়ে লাগিয়েছিলেন ৫০০’রও বেশি গাছ। ঈশ্বর তবু যেন আমাদেরকে ক্ষমা করেন।

আমার একটা মনোঃস্তাত্ত্বিক মতবাদ আছে: বিজ্ঞানীরা একমত যে, পৃথিবীর আদীমতম মানব সভ্যতার সূত্রপাত হয়েছিল কোনো এক নদীর মোহনায়। অর্থাৎ মানব জাতির প্রথম দিককার মানুষটি নদীমাতৃক জীবন ব্যবস্থায় অভ্যস্থ ছিল। নদী মানেই কিন্তু আশেপাশে পাহাড় না, বরং নদীর ঘষে মেজে ধুয়ে দিয়ে যাওয়া বিরান সমতল। তাই তাদের মনঃস্তত্ত্ব তৈরি হয় এরকম করে যে, মানুষের আবাস হতে হবে এরকম পরিষ্কার জায়গায়, যেখানে কোনো আগাছাও থাকতে পারবে না। সেকারণেই বাড়িঘর থেকে আগাছা দূর করা আমাদের সব বসতঘরেরই একটা নৈমিত্তিক কাজের অংশ (collective unconscious – Jung)। এখন, এই মানুষটি যখন হাঁটতে হাঁটতে একদিন তুলনামূলক উঁচু স্থানে, যেখানে নদীর ছোবল পড়েনি, সেখানে গাছগাছালি ঘেরা একটা জায়গায় গেল, তার মনে হলো: এ কী? এতো দেখি জংগল! পা ফেলার জায়গাইতো নেই। এখানে থাকা তো অসম্ভব। কাটো গাছ, পরিষ্কার করো। গাছ, আগাছা – সব সাফ না করলে তো মানুষ থাকতে পারে না। …সেই থেকেই মানুষ, খোলামেলা সাফসুতরো বিরানভূমিকে কিংবা সমতলকে মনুষ্য আবাসযোগ্য কিংবা বিচরণযোগ্য জায়গা বলে মানতে থাকলো, আর গাছপালাপূর্ণ জায়গাকে ‘জংগল’ বলে সাফ করার মানসিকতা অর্জন করলো। যদি মানুষের শুরুটা হতো জঙ্গল থেকে, তাহলে তারা নদীর ধারে গিয়ে সেখানটায়ও গাছগাছালি লাগিয়ে জঙ্গল বানানোর চিন্তা করতো…

কাটা গাছে ছিল পিঁপড়ার বাসা - তাদের শুরু হলো ত্রাহী অবস্থা (ছবি: নিশাচর)
কাটা গাছে ছিল পিঁপড়ার বাসা – তাদের শুরু হলো ত্রাহী অবস্থা (ছবি: নিশাচর)

এগুলো সবই হয়তো যুক্তির সুতায় যুক্তির সুতা বাঁধা ছাড়া বেশি কিছু নয়, তবু এই মতবাদটা আমাকে তুহিন ভাইয়ের মনঃস্তত্ত্ব বুঝতে সহায়তা করে। আমিও যখন গ্রামে ছিলাম আমিও গাছ কাটতে দ্বিধা করতাম না। অথচ এখন শহরবাসী হয়ে বুঝতে পারছি, গাছের কদর কী? একটা টিস্যুপেপার পারতপক্ষে ব্যবহার করিনা, কারণ আমি একটা টিস্যুপেপার সমান একটা গাছ কল্পনা করি। গ্রাম থেকে (জংগল মতবাদী) বেরিয়ে এসে শহরে, দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাবার পরে যে মনঃস্তত্ত্বে আমি পৌঁছেছি, আমি চাই দেয়ালে পিঠ ঠেকার আগেই এই ‘জংগল মতবাদ’ পরিত্যাগ করে আমরা সত্যিকার ‘মানুষ’ হই।

এতো কথার পরে তুহিন ভাইকে অমানুষ ভাবার কোনো কারণ নেই, কিংবা আমাদের একটা ছোট্ট ভুলকে নিয়ে গলাবাজি করারও আসলে কিছু নেই। সবচেয়ে বড় কথা হলো, আমরা আমাদের ভুলের জন্য অনুতপ্ত। ভুল হয়ে গেছে, হয়ে গেছে, ওটাকে ঢেকে রেখে শুদ্ধ কিভাবে হওয়া যায়, তার কথা বলা যাক। (বিস্তারিত: কেন শুধু ভালো’র কথাই বলতে হয়)

যাহোক, অনেক নীতিকথা হয়ে গেছে, কাজে ফিরে আসি। কাটা গাছের মাথাটা ওভাবেই হুমড়ি খেয়ে পড়ে থাকলো। গাছে বাসা বেঁধেছিল পিঁপড়ার একটা বিশাল ঝাঁক (সিলেটি ভাষায় পিঁপড়ার ঢুল), পুরো বসতটাই কামাল ভাই ঝরণার একটু উজানে নিয়ে ফেলে এলেন। পিঁপড়াগুলোর শুরু হলো ত্রাহী অবস্থা।

ক্যারাবিনারের ভিতর দিয়ে দেখা যাচ্ছে, ওপারে তুহিন ভাইকে, রজ্জু তীরোপারের প্রস্তুতিতে (ছবি: নিশাচর)
ক্যারাবিনারের ভিতর দিয়ে দেখা যাচ্ছে, ওপারে তুহিন ভাইকে, রজ্জু তীরোপারের প্রস্তুতিতে (ছবি: নিশাচর)

যাহোক, দলগতভাবে কাজ করে মূল রশিটা শক্ত করে, যথাসম্ভব সর্বোচ্চ টানটান করে বাঁধা হলো। সেই রশিটার নিচে বাঁধা হলো আরেকফালি রশি, এটা হলো সাপোর্ট। তুহিন ভাই একটা অপকর্ম করে ফেললেও রশি বাঁধার কাজটা পোক্তভাবেই করে নিজের স্বকীয়তা প্রমাণ করতে সক্ষম হলেন। রশিগুলো ক্যারাবিনার (ফরাসি carabine নামক অস্ত্রে এগুলো হুক হিসেবে ছিল, সেই থেকে এগুলো নাম পেয়েছে carabiner কিংবা জর্মন karabiner) নামক এক প্রকারের আংটা দিয়ে কষে আটকানো হলো। দ্বিতীয় রশিটা সাপোর্ট হিসেবে কাজ করবে, যদি প্রধান রশিটা কোনো কারণে ব্যর্থ হয়। তাছাড়া অন্যপাশ থেকে কাউকে প্রয়োজনে টেনেও নেয়া যাবে। যাহোক, রশির এই মারপ্যাঁচ লিখে বোঝানো বেশ কষ্টসাধ্য ব্যাপার। মূল বিষয়ে আসি:

যে ব্যক্তি পারাপার হবেন, তিনি হার্নেস নামক একপ্রকার ফিতাপোষাকের মধ্যে নিজেকে আটকাবেন। প্যান্ট পরার মতো করেই ফিতা দিয়ে বানানো এই ফিতাপোষাকে নিজের দুপা ঢুকিয়ে দিলে ফিতাগুলো পায়ের উরু প্যাঁচিয়ে খুব সুন্দর করে আটকে রাখে। বাকিটা বুক-পিঠ মিলিয়ে ব্যাগের মতো করেই ব্যক্তিকে ঝুলে থাকতে সহায়তা করে। এই জিনিসটা প্রথম ব্যবহার করেছিলাম নন্দন পার্কে, সেনাবাহিনী-পরিচালিত একপ্রকারের রজ্জু তীরোপারে- একটা টাওয়ার থেকে পুলি দিয়ে ধীরে ধীরে অপেক্ষাকৃত নিচু স্থানে গিয়ে নামা।

যাহোক, এক পর্যায়ে আমার পালা এলো। হার্নেস নামক ফিতাপোষাকে ঢুকে তার সাথে ক্যারাবিনার আটকে নিজেকে ঝুলিয়ে দিলাম পুলিতে (কপিকল)। সেই পুলির চাকা গড়াবে মূল রশিকে আঁকড়ে ধরে। নিজেকে ঝুলিয়ে নিয়ে, এবারে মূল রশি ধরে ধরে টেনে টেনে নিজেকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া… পা ভাঁজ করে নিজেকে টানছিলাম দেখে আবুবকর চিৎকার করে বললেন, পা টানটান করে রাখেন। সাথে সাথে আমি বিছানায় শোয়ার মতো করে নিজেকে ভূমি সমান্তরালে ঝুলিয়ে নিয়ে টানতে থাকলাম, এবং সত্যিকার অর্থেই গতির সঞ্চার হলো। আমি রশি ধরে, পুলির চাকায় ভর করে নিজেকে টেনে টেনে অপর পাশে নিয়ে এলাম। …এরপর একে একে সবাই-ই চড়লো রশিতে। কিন্তু তুহিন ভাই যখন রশি থেকে নামলেন, দেখা গেলো ক্যারাবিনারই টান খেয়ে ছড়িয়ে গেছে।

কিন্তু এই রজ্জু তীরোপারে কেমন জানি তৃপ্তি পেলাম না আমি। আবুবকরকে জানালাম, আমি আবার উঠতে চাই। তবে এবার এই প্যাকেজ পদ্ধতিতে রাজি না আমি, জঙ্গলেই যেহেতু আছি, তাহলে সার্ভাইভাল প্রস্তুতি নেয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে। ঠিক করলাম, বিয়ার গ্রিল্‌স যেভাবে রশি দিয়ে পারাপার হন, সেভাবে পার হবো— নিজেকে রশিতে ঝুলিয়ে না, …নিজেকে রশির উপর তুলে দিয়ে।

ব্যস, চলে গেলাম একপাড়ে। তারপর রশির উপরে উঠতে গিয়েও নিজের প্রথম প্রচেষ্টা যেহেতু, তাই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আগের মতোই হার্নেস, ক্যারাবিনার, পুলি সব আটকে নিলাম। যদি পড়ে যাই, অন্তত এগুলোতে যেন আটকে থাকতে পারি। এবারে নিজে, পুরো শরীর নিয়ে রশির উপরে উঠে গেলাম।

বিয়ার গ্রিল্‌স তাঁর Man vs. Wild-এর একাধিক পর্বে সার্ভাইভাল শিখাতে গিয়ে দেখিয়েছেন, কিভাবে রশির উপর দিয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। তাঁকে রশির উপর দেখলে মনে হবে খুব সহজেই এভাবে রশির উপর দিয়ে সামনে যাওয়া যাবে। এই পদ্ধতিটা বিয়ার শিখেছিলেন, যখন তিনি সেনাবাহিনীতে ছিলেন। পদ্ধতিটা হলো, রশির উপরে নিজেকে বসিয়ে নিতে হবে, এক পা ঝুলিয়ে দিতে হবে, আর আরেক পা ভাঁজ করে রশির অপর পাশে নিয়ে শরীরের পিছনে রশির উপরে রাখতে হবে। তারপর নিজেকে রশির উপর দিয়ে টেনে টেনে সামনে এগিয়ে নিতে হবে। পদ্ধতিটা এতোবারই দেখেছি যে, আমার ঝাড়া মুখস্থ। তাই অনুসরণ করতে বিন্দুমাত্র কষ্ট হলো না।

কিন্তু রশির উপরে নিজেকে জুৎসই অবস্থায় বসাতে গিয়ে আবিষ্কার করলাম, রশিটা আমার পাতলা প্যান্ট ভেদ করে উরুসন্ধিতে বেশ কামড়ে বসেছে – এতে আমার ব্যথা লাগছে। এ অবস্থায় না পারছি নিজেকে সামনে নিতে, না পারছি ঠিকমতো শান্তিতে রশির উপর জিরাতে। কোমর একটু সরিয়ে আবিষ্কার করলাম, যদি আমি শরীরটা পুলির উপর রাখি, তাহলে আর কষ্ট হচ্ছে না। এবার যখন আমি নিজেকে টানলাম, পুলির পিচ্ছিল চাকার কারণে আমি সরসর করে এগিয়ে গেলাম। কিন্তু, এটাতো বিয়ার গ্রিল্‌সের পদ্ধতি না। বিয়ার তো আর পুলি নিয়ে জঙ্গলে যান না।

আবিষ্কার করলাম, বাস্তবে এভাবে রশির উপর দিয়ে পার হতে হলে উরুসন্ধির ঐ জায়গাটায় শক্ত কোনো খোল (গাছের খোল হতে পারে) বা কিছু বেঁধে নেয়া উত্তম হবে। জিন্সের প্যান্টও হয়তো কাজে দিবে, কিন্তু ট্রেকিং-এর জন্য জিন্সের প্যান্ট আবার অনুপযুক্ত— এটাও মাথায় রাখতে হবে।

বিয়ার গ্রিল্‌সের অনুসরণে আমার রজ্জু তীরোপার (ছবি: কামাল উদ্দিন)
বিয়ার গ্রিল্‌সের অনুসরণে আমার রজ্জু তীরোপার (ছবি: কামাল উদ্দিন)

যাহোক, এভাবে এগোতে এগোতে মাঝ বরাবরও যেতে পারিনি, সবচেয়ে বিপদজনক যে বিষয়টা আবিষ্কার করলাম, তা হলো, রশির দুলুনি। রশিটা মোটামুটি ভালোই ডানে-বামে দুলছে। বিয়ার গ্রিল্‌স এরকম অবস্থায় কী করেন জানি না, আর বিয়ার গ্রিল্‌সের রশিইবা এভাবে দুলেছিল কিনা লক্ষ করিনি। কিন্তু আমরা যথাসম্ভব টানটান করাসত্ত্বেয় রশিটা যদি এভাবে দুলে, তাহলে একাকী সার্ভাইভাল পরিস্থিতিতে না জানি কী অবস্থা হবে! দুলাদুলিতে আমার মতো সাহসী মানুষেরই বেশ ভয় হতে থাকে, যদিও আমার যুক্তিবাদী মন স্পষ্ট জানে যে, আমার শরীর ক্যারাবিনার আর হার্নেস দিয়ে আটকানো আছে, চাইলেও পড়ে যেতে পারবো না। ভয়টাকে আমলে না নিয়ে রশিটাকে শান্ত হতে দিলাম। কিন্তু নিচে থেকে আবুবকর এতোটাই নির্দেশনা দিচ্ছিলেন যে, রশিটা শান্ত হবার মতো সময় পেলাম না। হাল ছেড়ে দিয়ে হার্নেসের উপর ঝুলে পড়লাম। কিন্তু শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত খুব বুঝবার চেষ্টা করছিলাম, কিভাবে এরকম পরিস্থিতিতে নিজেকে আটকে রাখা যায় বিয়ার গ্রিল্‌সের পন্থায়। পরে, ফিরে এসে, আমার নিজের রজ্জু তীরোপারের ছবির সাথে বিয়ার গ্রিল্‌সের ছবি মিলিয়ে আন্দাজ করলাম, সম্ভবত আমি, প্রথম প্রচেষ্টা কিংবা অজানা আশঙ্কায়, নিজের ঝুলিয়ে দেয়া পা-খানা পুরোপুরি ঝুলিয়ে পেন্ডুলামের মতো করিনি, বরং একটু বাঁকা করে রেখেছিলাম, ভয়ে। আর সেকারণেই হয়তো দোলাদুলি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি আমার পক্ষে।

বিয়ার গ্রিল্‌স যেভাবে রজ্জু তীরোপার করেন (ছবি: সংগৃহীত)
বিয়ার গ্রিল্‌স যেভাবে রজ্জু তীরোপার করেন (ছবি: সংগৃহীত)

অভিজ্ঞতাগুলো নিজেদের ঝুলিতে ভরে এবারে রজ্জু তীরোপারের সব সরঞ্জামাদি গুটিয়ে নিলাম। একটা ঝরণার সামনে দাঁড়িয়ে কেউ কি গোসল না করে পারে? এবারে হলো গোসল পর্ব। ঝরণার ঠিক নিচে একটু যা গভীরতা, বাকি জায়গায় গভীরতা তেমন একটা নেই। তবু ঝরণার শীতল জলে অবগাহনে বিন্দুমাত্র কার্পণ্য নেই করোও। চারজনেই একজোট হয়ে নেমে গেলাম ঝরণার পানিতে। আবুবকর আবার একটা পানিরোধী ক্যামেরা নিয়ে এসেছেন ধার করে, ওটা দিয়ে ছবি না তুললে কি হয়? ওটা দিয়েও ছবি তোলা হলো। আবুবকর আবার ঝরণার গায়ের পিচ্ছিল পাথরে খুব সন্তর্পনে একধাপ উঠে বসলেন ধ্যানী বুদ্ধ হয়ে। বর্ষার শীতল জলে খইয়াছড়া ঝরণার নিচে চার বুভুক্ষু’র কান্ড দেখছেন বসে আমাদের গাইড আবু তালহা (ছদ্মনাম)।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, আমি গাইডদের নামের বদলে তাদের ছদ্মনাম ব্যবহার করা কেন শুরু করেছি, তা বলে নেয়াটা জরুরি। আবুবকরের বক্তব্য হলো, বান্দরবানের রুমা’র পিচ্চি গাইড আপেল মল্লিককে নাকি আমি ব্লগ লিখে পরিচয় করিয়ে দিয়েছি। ফলাফল: কাচা টাকার গন্ধ… এবং সাম্প্রতিক খবর, সে মদে ডুবে থাকে; এবার এসএসসি পরীক্ষাও দেয়নি। তাই কঠিন সিদ্ধান্তটা নিতেই হলো, স্থানের বর্ণনা দিতে বসেছি, সেটাই হবে, গাইডরা উপকার করেছিল, বিনিময় এবং কৃতজ্ঞতা দুটোর প্রথমটা তাৎক্ষণিক এবং দ্বিতীয়টা আজীবন দেয়া হবে – কিন্তু তাদের প্রচার করবো না আর। এ প্রচারে যে হীতে বিপরীত হয় – তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না, বাঙালিরা পাহাড়ে টাকা ঢালতে যায়; ফলাফল: পাহাড়ের একগাদা নাক-মুখ-চোখ গজায়!

খইয়াছড়া ঝরণায় গোসল করা - ক্যামেরা অন করে দৌঁড়ে গিয়েছি আমি (ছবি: স্বয়ংক্রীয়)
খইয়াছড়া ঝরণায় গোসল করা – ক্যামেরা অন করে দৌঁড়ে গিয়েছি আমি (ছবি: স্বয়ংক্রীয়)

যাহোক, অনেক পরিশ্রম হয়েছে, এবারে একটু জিরিয়ে না নিলে কি হয়? গাইডসহ সবাইকে, ব্যাগে করে নিয়ে যাওয়া, শুকনা খাবার দিলাম- বেচারা সকাল থেকে কিছু খাননি। যাহোক, জিরিয়ে নেয়ার জন্য আবুবকর নিয়ে গেছেন, হ্যামক (উচ্চারণ: হেমোক্‌, hammock)— একগাছি কাপড়, যার এমাথা-ওমাথায় রশি বাঁধা, গাছের ডালে বেঁধে নিয়ে ঝুলে ঝুলে ঘুমিয়ে থাকা যায় আয়েশ করে। ট্রেকে গিয়ে তো আয়েশ করা চলে না, এটা হলো প্রকৃতির কোলে শুধু একটু অভিজ্ঞতা ঝুলিতে ভরা আরকি।

আবুবকর আর তুহিন ভাই মিলে হ্যামকটা ঝুলিয়ে দিলে একে একে কামাল ভাই, তুহিন ভাই, আবুবকর আর আমি উঠে পড়লাম অভিজ্ঞতা নেয়ার জন্য। অভিজ্ঞতা যা হলো, তা হলো: হ্যামকে উঠার বিষয়টাই একটু ঝক্কির – ঐ যে ঝুলন্ত রশির মতো – একদিক থেকে আরেক দিকে দুলতে থাকে, আর এর উপর জোর খাটিয়ে যদি উঠে পড়েন, তবে নিশ্চিত পরক্ষণেই আপনি প্রপাতধরণীতল হয়ে যাবেন। তাই, হ্যামক্‌কে যথাসম্ভব দুলতে না দিয়ে সন্তর্পনে উঠতে হবে। তারপর অযথা নড়াচড়া না করে শুয়ে পড়তে হবে। একবার শুয়ে পড়লে উঠে বসতেই ভালো রকম দোলাদুলি করে এই ঝুলন্ত বিছানা।

অভিনয় করতেই হোক, কিংবা অভিজ্ঞতা নিতেই হোক, হ্যামকে শুয়ে চোখটা বুজতেই মনে হলো আমি বোধহয় সত্যিই স্বর্গে আছি: কানের কাছে ঝরণার জলপতনের শা শা শব্দ হচ্ছে, আর চারপাশে প্রকৃতির অপূর্ব নীরবতা… আহ, বড় মধুর এ বেঁচে থাকা, বড় মধুর এই জীবন!

ঘড়িতে ১৩:৩৩, হ্যামক থেকে নামতেও পারিনি, তুহিন ভাইয়ের ফোন এলো: তাঁর জ্যাঠা মারা গেছেন। বাদ আসর বা বাদ মাগরিব জানাযা হবে। তাঁকে এক্ষুণি ঢাকার পথ ধরতে হবে। হরতালের দিন কিভাবে যাবেন, সে চিন্তাই করছেন তিনি। দলছুট হয়ে তাঁকে একাই ফিরতি পথ ধরতে হবে এখন। অনবরত ফোনে কথা বলছেন, এই এর সাথে তো, আবার ওর সাথে – তাঁকে ফিরতেই হবে। তাই দ্রুত সব গুছিয়ে নিলাম আমরা। দলেরও ফিরতে হবে খইয়াছড়া থেকে। যোহরের নামায পড়া হয়নি, দ্রুত ওযু করে যোহরের দুরাকা’আত কসর নামায আদায় করে নিয়েই দে ছুট।

খইয়াছড়া ঝরণা থেকে এভাবে ঝিরি ধরে হেঁটে ফিরছে দল (ছবি: নিশাচর)
খইয়াছড়া ঝরণা থেকে এভাবে ঝিরি ধরে হেঁটে ফিরছে দল (ছবি: নিশাচর)

তুহিন ভাই এবার পা চালিয়ে দলের বেশ আগে আগে চলছেন। একই পথে ফিরছি আমরা। আবার সেই ধানী জমির আইল ধরে গ্রামে ফেরা, তারপর গাইড আবু তালহার বাড়িতে রাখা নিজেদের জিনিসপত্তর কাঁধে নেয়া। ফেরার পথে গাইডকে আবুবকর ৳১০০ [টাকা] দিলেন আমাদের গাইড খরচ বাবদ। বেচারার একটু মন খারাপ হলো, কিন্তু কিচ্ছু বললেন না। বিষয়টা আবুবকরও লক্ষ করেছেন (নাহলে আর নেতা কেন?)। আমি ফিরে এসে আবুবকরকে বলেছিলাম, আরেকটু বাড়িয়েই দিতেন, বেচারার মন খারাপ হয়ে গেছে। আবুবকর আমাকে মারতে উদ্যত হলেন (ঠাট্টাচ্ছলে), ‘আপনে এই কথা কন, আপনে জানেন না?’ আমিও হাসলাম, সবই জানি, পাহাড়ে অর্থের লোভী সংস্কৃতি চাঙা করা ট্রেকারদের মানায় না। একশ’ টাকা ন্যায্য হয়নি ঠিক, কিন্তু অন্যায্যও হয়নি। সারাদিন কাজ করেও এই কৃষিজীবি লোকটা একশ’ টাকা পেত না। তাই যেখানে একশ’ দিয়ে কাজ হবে, ভ্রমণকারীরা সেখানে একশ’ দশ টাকাও দিবেন না। খুশি করার অনেক উপায় আছে – অর্থই একমাত্র প্রণোদনা নয়।

হাঁটতে হাঁটতে, পাহাড়, গ্রামকে পিছনে ফেলে আমরা আবার উঠলাম এসে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে। তুহিন ভাই এখানেই একটা বাসে চড়লেন, উদ্দেশ্য সামনের কোনো একটা বাজার কিংবা ফেনী। ওখান থেকে কোনো একটা উপায় বের করবেন ফিরবার পথ করবার। আমরা তিনজন একটা সিএনজিতে চড়ে মিরসরাই বাজার পর্যন্ত চললাম (সাকুল্যে ৳২৫)।

ধানী জমির আইল ধরে এভাবেই প্রকৃতির কোল ঘেষে ফিরছে দল (ছবি: নিশাচর)
ধানী জমির আইল ধরে এভাবেই প্রকৃতির কোল ঘেষে ফিরছে দল (ছবি: নিশাচর)

মীরসরাই বাজারে একটা গলির ভিতরে ডোবার পাশে একটা ছোট্ট খুপরি হোটেল পেলাম, যেখানে ভাত পাওয়া যাবে (ঘড়িতে ১৫:১০)। তিনজনে পেট পুরে খেলাম (সাকুল্যে ৳২০০)। এবারে আবুবকর লেগে গেলেন তাঁর কাজে… আমাদের আরো একটা ঝরণার খোঁজে বের হতে হবে…

হোটেল মালিককে ঝরণাটার শ্রুত অবস্থান বলার পরে একটু সময় নিয়ে ভেবে বললেন, হ্যা, আছে। ব্যস, আবুবকর সাথে সাথে তাঁর থেকে জেনে নিলেন কিভাবে কিভাবে যেতে হবে ওখানে। তারপর হোটেলে আমাদের ব্যাগগুলো রাখতে পারবো কিনা জানতে চাইলে মালিক জানালেন, রাখা যাবে। আমরা মালিকের ফোন নাম্বার নিয়ে নিজেদের ব্যাগ থেকে শুকনা খাবার পকেটস্থ করে পথ নিলাম।

একটা ঝরণা আছে আশেপাশেই… আবিষ্কার করবার বাকি…

(আগামী পর্বে সমাপ্য…)

-মঈনুল ইসলাম

পরের পর্ব »

______________________________

বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই পর্বে একটা ভিডিও যুক্ত করবার কথা ছিল, কিন্তু নানা বাধার কারণে তা সম্ভব হলো না। কথা দিচ্ছি, ইনশাল্লাহ, যখনই ভিডিও’র সম্পাদনার কাজ শেষ হবে, আপলোড করে আমাদের ফেসবুক পেজ^ (fb.com/nishachorblog) এবং গুগল পেজে^ (plus.google.com/+Nishachorblog) জানিয়ে দেয়া হবে।

২ thoughts on “জলপ্রপাতের খোঁজে – ছোট বোয়ালিয়া আর মালিখোলা ২

  1. সালাম ভাই, আপনার প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক। আপনার লেখাগুলো প্রতিদিন গোগ্রাসে গিলছি। এর পরেরবের কোন এডভাঞ্চারে গেলে এই গুনাহগারকে সাথে নিয়ে যাইয়েন ভাই প্লিজ।

মন্তব্য করুন