জীবনে অনেক এতেকাফ দেখেছি, কিন্তু এমন এতেকাফ এই প্রথম দেখলাম…
আমার বাসার কাছেই একটা মাদ্রাসা-মসজিদে জুম’আ আর তারাবীহের নামায পড়তে যাই। মাদ্রাসাটা আমার পছন্দের বিভিন্ন কারণে। তারমধ্যে অন্যতম হলো এই মাদ্রাসার দাতব্য উদ্যোগ:
- এই মসজিদ ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকে
- এখানে তারাবীহ নামাযের জন্য কোনো অর্থের শর্ত নাই (এক টাকাও না)
- এখানে এতেকাফে থাকা মানুষদেরকে বিনে পয়সায় আপ্যায়ন করা হয় (আপনি চাইলে টাকা দিয়ে শরীক হতে পারেন, কিন্তু আপনি না করলে কারো কোনো অভিযোগ নেই)
- প্রতিদিন প্রচুর মানুষকে বিনে পয়সায় ইফতারি করানো হয়
- এরা সারা বছর রাস্তার মানুষকে বিনে পয়সায় ফিল্টার করা খাবার পানি বিলায়
- …আরো অনেক কাজ আছে, সেটা বলে এই পোস্ট লম্বা করবো না
যাহোক, সেখানে মসজিদে প্রতিবারের মতো এবারও প্রচুর মানুষ এতেকাফে বসেছেন। আজকে দীর্ঘ তারাবিহের নামাযের পরে ঘোষণা হলো: যারা এতেকাফে বসেছেন, দু’রাকা’আত নামায পড়ে মিম্বরের কাছাকাছি জড়ো হতে…
ভাবলাম, সুযোগ যখন এসেছে, বসে যাই…
মসজিদের মুহতমিম সাহেব মিম্বরে বসে শুরু করলেন, এই এতেকাফ যে আল্লাহ’র দরবারে কড়া নাড়ার পরে কড়া নাড়া— সেটা মনে করিয়ে দিয়ে। তারপর সবাইকে কিছু নিয়ম-কানুনের ব্যাপারে সচেতন করিয়ে দিলেন:
- মসজিদের বাইরে প্রয়োজন ছাড়া একবিন্দুও না
- প্রস্রাব-পায়খানার জন্য গেলে সেখানে দুজন গল্প করলাম— এতে এতেকাফ হয়ে যাবে ঠিকই, কিন্তু পঙ্গু সন্তানের মতো একটা ব্যাপার ঘটলো— পঙ্গু সন্তান তো সন্তান ঠিকই, কিন্তু কেউ আশা করে না
- গোসলও, প্রয়োজন না হলে মসজিদের বাইরে যাবার উসিলা— সুতরাং প্রয়োজন না হলে, সেটাও মূল উদ্দেশ্য না হওয়া। প্রয়োজন অনুভূত হলে প্রস্রাব-পায়খানার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে ওযু শেষে গোসল করে মসজিদে ফেরা
- মসজিদে ঢোকার সময় ডান পা দিয়ে ঢোকা, প্রবেশের দোয়া পড়া, এতেকাফের নিয়তে ঢোকা… (১০ দিনের নিয়ত তো আছেই, তবু প্রতিবার ঝালিয়ে নেয়া)
মনে করিয়ে দিলেন, একেকটা সুন্নতের অনেক দাম। একটা একটা করে সুন্নতকে আঁকড়ে ধরার চেষ্টায় থাকা…
নিয়মকানুন বাৎলে এবারে আসল মজায় এলেন:
প্রতি ২জন করে এতেকাফকারীকে নিয়ে একটা দল বানিয়ে দেয়া হলো। আর প্রতিটা দলের নেতৃত্বে থাকবেন মাদ্রাসারই একজন করে আলেম (ধর্মীয় বিষয়ে বিজ্ঞ একজন)। এরকম ১৫টা দল হলো সব মিলিয়ে। দলের ঐ ৩জন সব সময় একত্রে থাকবেন, চলবেন, ঘুমাবেন, আমলের মধ্যে থাকবেন…
এই দলের আলেমের জন্য দায়িত্ব হলো প্রতিদিন দলকে সাথে নিয়ে ২ পারা করে ক্বোরআন তেলাওয়াত করা। কোন ২ পারা, পরের দিন কোন ২ পারা— এগুলো সব ভাগ করে দেয়া হলো। তেলাওয়াত ছাড়াও ধর্মীয় বিষয়ে শুদ্ধতা, দিক-নির্দেশনা তো থাকবেই— মোটকথা আলেমের সংস্পর্শ দিয়ে এই ১০ দিনের মসজিদে থাকাকে আরো অর্থপূর্ণ করে দেয়া হলো।
এই ৩জনের একেকটা দল ২ ঘণ্টা করে পাহারার দায়িত্বে থাকবেন, সজাগ থাকবেন, যাতে মসজিদে ২৪ ঘণ্টা আমল জারি থাকে। দলীয় আমল (ইজতেমায়ী আমল) ছাড়া বাকি সময় তাঁরা এই দায়িত্ব পালন করবেন। যেহেতু ১৫টা দল হয়েছে, তার মানে প্রতি ৩০ ঘণ্টা পরপর আবার ডিউটি ফিরে আসবে।
মাদ্রাসার খেদমতের সাথীরা তো খেদমতে থাকবেনই। তবু সবাই সম্পৃক্ত থাকাটা আরেকটা বরকতের বিষয়। আপনি ভাবতে পারেন এই বয়স্ক মানুষগুলোর জন্য এটা খুব কষ্টের বিষয়?
বিশ্বাস করেন, আমি তাবলীগে দেখেছি, এই মানুষগুলো এই ১০টা দিনকে জীবনের শ্রেষ্ট অর্জন মনে করবে— বাসার চাইতেও বেশি সুস্থ থাকবেন। ও’, এবারের এতেকাফের দলে ১০-১২ বছরের ছোট একটা ছেলেও শামিল আছে, যুবকও আছেন, ডাক্তার আছেন, আইনজ্ঞ আছেন, আর বয়স্করা তো আছেনই।
এতেকাফ যে শ্রেফ মসজিদে থাকা না, বরং ওলামাদের সংস্পর্শে আরো ভালোর দিকে অগ্রসর হওয়া— আমার মনে হয় এই মডেলটা সব মসজিদে মসজিদে চালু হওয়া উচিত।
– মঈনুল ইসলাম