আবহমান বাংলার গ্রাম: পরিচিতি

ভারতের দিল্লী থেকে বন্ধুবর অমিত রায় বাংলাদেশের গ্রাম সম্পর্কে জানতে চাইলে যদি সেখানে আশ্চর্য হওয়ার কিছু থাকে, তাহলে বাংলাদেশী হওয়াসত্ত্বেয় আমার এবিষয়ে না লেখায় আশ্চর্যের সীমা থাকে না। তাই দেরিতে হলেও বাংলাদেশের তথাকথিত ৬৫,০০০ গ্রামের-খুব-অল্পটাই-দেখা-এই-আমি এই লেখায় ব্রতী হলাম। এজন্য যাবতীয় কৃতিত্ব অবশ্যই অমিত রায়ের। কিন্তু আমি আসলে হাবুডুবু খাচ্ছি, কী রেখে কী লিখব। তবু কিছু লেখার প্রয়াস। যেহেতু লেখার আছে অনেক কিছু, তাই কখনও কখনও লেখা অপ্রাসঙ্গিক বিষয়ে আবর্তিত হতে পারে -আগে থেকেই ক্ষমা চাচ্ছি।

পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন জাতিটির জন্ম কোথা থেকে হয়েছে? উত্তরটা খুব সহজ: কোনো এক নদীর তীর থেকে। এমনকি আধুনিক বস্তুবাদী বিজ্ঞান [বাইবেলের বর্ণনাকে প্রামাণ্য ধরে] পৃথিবীর আদি মানব-মানবীর (আদম-হাওয়া:Adam-Eve) বাসস্থানকে স্বর্গে নয়, বরং এই পৃথিবীতেই আবিষ্কার করছে। এবং মজার ব্যাপার বিজ্ঞান বলতে চাইছে Garden of Eden (স্বর্গোদ্যান) আসলে মধ্যপ্রাচ্যের চারটি প্রাচীন প্রধান নদী পিশ’ন (Pishon), গিহন (Gihon), তাইগ্রিস (Hidekel) ও ইউফ্রেতিস (Phrath)-এর তীরেই অবস্থিত (পিশ’ন আর গিহন বাইবেল বর্ণিত দুটি নদী, তাইগ্রিস-ইউফ্রেতিসের বাস্তব অস্তিত্ব প্রমাণিত)। যাহোক, সেই নদীর তীর থেকে উদ্ভূত মানুষগুলো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়লো গুহায়, পাহাড়ে, পর্বতে, বনে। সুতরাং উন্মুক্ত, নদীবিধৌত প্লাবন সমভূমির মানুষগুলো যখন গাছপালা আচ্ছাদিত পাহাড়, বনে গেলো, তখন স্বভাবতই তারা সেগুলোকে জংলা, জঙ্গল ইত্যাদি উপধায় ব্যাখ্যা করে ফেললো। তারা জঙ্গল পরিষ্কার করা, গাছ কেটে সাফ করাকেই নিজেদের কাজ মনে করলো। সেকারণে বনে বাস করলেও সভ্যতার কিংবা সভ্য জাতির একটা নিদর্শন হলো “জঙ্গল সাফ করা”, মানে লতা-গুল্মজাতীয় গাছ-গাছড়াসহ বাড়ির উঠান থেকে গাছ কেটে সাফ করা, পাহাড় কেটে সমান করা।

বাংলাদেশকে বলা হয় নদীমাতৃক দেশ, কথাটার মানে হলো নদী এই দেশের সব জায়গায়ই আছে। এমনকি সবচেয়ে শহুরে অঞ্চল রাজধানী ঢাকাও বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত। প্যাঁচিয়ে থাকা নদীর এই দেশে মানুষ তাই নদীকে ঘিরেই নিজেদের জীবন গড়ে তুলেছে। আর নদী থেকে যারা দূরে আছে, তারা আছে পাহাড়ে, বনে, বিস্তীর্ণ মরুময় এলাকায়ও (তবে সেগুলো মরুভূমি নয়)।

এই দেশের গ্রামই এই দেশের মূল ক্ষেত্র, সেখান থেকেই উত্থান ঘটেছে আজকের বিবর্তিত জাতির, যারা আজ গর্ব করে নিজেদেরকে “শহুরে” বলে। সেই গ্রামের সংস্কৃতি আবর্তিত হয়েছে এই দেশের ইতিহাসের সাথে সাথে। আর্য জাতির পরে এই দেশে বৌদ্ধদের আগমন ঘটেছিল। বৌদ্ধ ধর্মের দাপটকে দমিয়ে দিয়ে একসময় আসে হিন্দু রাজত্ব, বৌদ্ধধর্ম বিলুপ্ত না হয়ে বিবর্তিত হয়ে স্থান করে নিল হিন্দুত্বের ছত্রছায়ায়। তারপর সেই হিন্দুধর্মের দাপট চললো দীর্ঘদিন। এরপর এলো মুসলমান শাসন, আবারো হিন্দু ধর্ম বিলুপ্ত না হয়ে বিবর্তিত হয়ে স্থান করে নিল [আরবীয় মৌলিক ইসলাম নয় বরং] ইরান-ইরাক থেকে আসা সুফিবাদী ইসলামের ভিতর। এমনকি ধর্মের দোহাই দিয়ে পরবর্তিতে ইংরেজরা এদেশকে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ট পাকিস্তানের ভিতরে রেখে দিয়েছিল। ইংরেজ আমলে আবার খ্রিস্টান ধর্ম প্রসার পেতে থাকে গ্রাম-বাংলার আনাচে-কানাচে বিভিন্ন খ্রিস্টান মিশনের মাধ্যমে। কিন্তু তাসত্ত্বেয় হিন্দুধর্ম আর ইসলামই এখানে বেশি দাপট দেখিয়ে গেছে। হিন্দুধর্ম আর ইসলামের দাপটসত্ত্বেয় কিছু বৌদ্ধ, কিছু হিন্দু, কিছু খ্রিস্টান এখানে টিকে থাকলো সব সময়ই। তাই এই দেশে বৌদ্ধ, হিন্দু, খ্রিস্টান আর মুসলমানদের এক অপূর্ব সম্মিলন দেখা যায়। যদিও মুসলমানই (ধর্মকর্মে না হলেও নামে অন্তত) এদেশে সংখ্যাগরিষ্ট। এর পাশাপাশি সুর্যবাদ, শিখ ধর্ম, জৈন ধর্ম, কিংবা আদীবাসীদের স্ব স্ব ধর্মও সমানভাবে ছিল, আজও কিছু মরে গেছে, কিছু আছে। ধর্মের এই টানাপোড়েনে এই দেশের আবহমান কালের গ্রামের সংস্কৃতির অনেকটাই আবর্তিত হয়েছে, আজও হচ্ছে।

শহরের মানুষগুলো যেখানে গ্রেগরীয় ক্যালেন্ডারে অভ্যস্ত, সেখানে গ্রামের মানুষগুলো আজও বাংলা পঞ্জিকা মেনে চলে। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় এগুলো স্বীয় আঞ্চলিক ভাষায় বিভিন্ন নামে পরিচিতি পেলেও সেগুলো বাংলা পঞ্জিকাই। এই দেশে এখন যে ছয়টি ম্রীয়মান ঋতু আছে, সেই ছয়টি ঋতু আবহমান কাল থেকে এই দেশটাকে তিলে তিলে গড়ে তুলেছে। এদেশের পাঠ্যবইতে ছয়ঋতুর যে ছবিগুলো আঁকা থাকে সেগুলো একসময় ঠিক এমনটাই বাস্তব ছিল:

গ্রীষ্মকাল (বাংলা বৈশাখ ও জ্যৈষ্ঠ মাস জুড়ে): প্রচন্ড রোদ, পানির স্তর অনেক নিচে, নদীর পানি শুকিয়ে কাঠ, মাটি ফেটে ঝাঁঝরা হয়ে যায়, কিন্তু তখনই গাছে গাছে পাকে মৌসুমী ফল আম-জাম-কাঁঠাল, কাঁঠাল এই দেশের জাতীয় ফলও বটে। গ্রীষ্মের শেষ ভাগে মাঝে মাঝেই বিকেল বেলা উত্তপ্ত ভূমি বায়ুর তীব্র ছোটাছুটির কারণে ধেয়ে আসে এক প্রচন্ড ঝড়: কালবোশেখী বা কালবৈশাখী।

বর্ষাকাল (বাংলা আষাঢ় ও শ্রাবণ মাস জুড়ে): কালবৈশাখী ছোটাছুটি করতে করতেই আকাশটা কালো মেঘে ছেয়ে যেতে থাকে। প্রচন্ড আওয়াজে বিদ্যুৎ চমকায়। আকাশ ভেঙে নামে ঝুম বৃষ্টি। ফেটে যাওয়া মাটি আবার জোড়া লাগে, নদীর পানি বাড়ে, গাছের প্রাণ ফিরে আসে, জমিতে জমিতে লাগে চাঞ্চল্য। আবার কখনও দেশের ভিতরে কিংবা ভারতে অতিবৃষ্টির কারণে নদীগুলো বিপুল পানি নিয়ে যেতে পারেনা, উপচে পড়ে পানি, দেখা দেয় বন্যা। বন্যা একদিকে যেমন রোগব্যাধী আর পানির কষ্টে মানুষকে ভোগায়, ফসল নষ্ট করে ভোগায়, তেমনি আরেক দিকে উজাড় করে দিয়ে যায় উজান থেকে বয়ে নিয়ে আসা পলি মাটি। এই পলি মাটির উর্বরতা বাকি ঋতুগুলোতে ফসলের বাধভাঙা উৎপাদন দিয়ে সব দুঃখ ভুলিয়ে দেয়।

শরৎকাল (বাংলা ভাদ্র ও আশ্বিন মাস জুড়ে): পরিষ্কার আকাশ। সেই নী–ল আকাশে সাদা সাদা মেঘগুলোতে সূর্যের আলো ঠিকরে তৈরি করে অপূর্ব এক আলোকচ্ছটা, উজ্জ্বল আলোয় ভরিয়ে থাকা দিনে তখন থাকে মৃদু বাতাস, প্রাণ জুড়িয়ে যাওয়া সেই বাতাসে কখনও গান গেয়ে ওঠে আবহমান বাংলার চাষীরা।

হেমন্তকাল (বাংলা কার্ত্তিক ও অগ্রহায়ণ মাস জুড়ে): প্রচন্ড গরমে বাংলার প্রধান ফসল ধান পেকে গেছে মাঠে মাঠে। সোনালী-হলুদ সেই রঙে তখন পুরো গ্রামটাই যেন স্বর্ণভাণ্ডার হয়ে যায়। বাতাসে ধানে ধানে ঘষা লেগে অপূর্ব এক সুর বাজে, যা আজ এই যান্ত্রিক [কানে ইয়ারফোন লাগানো] জীবনে কেউ আর শোনে না। ঘরে ঘরে তখন ফসল তোলার ধুম। সেখানেও বিচিত্র সব আয়োজন।

শীতকাল (বাংলা পৌষ ও মাঘ মাস জুড়ে): গরমের এই দেশে কোথা থেকে যেন ধোয়ার মতো কুয়াশা ধেয়ে আসে। দেখতে না দেখতেই ঠান্ডা লাগতে থাকে, মাঘ মাসে সেই ঠান্ডা তীব্র হয়ে পড়ে। শীতপ্রধান দেশের মতোই গাছগুলো ন্যাড়া মাথা হয়ে যায় পাতাশূণ্য হয়ে, কিন্তু তুষারপাত হয় না। তখন চাদর মুড়ি দিয়ে উত্তরাঞ্চলের গ্রামগুলোতে শুরু হয় আরেক উৎসব: খেজুর গাছ থেকে রস তুলে নিয়ে ঘরে ঘরে তৈরি হয় পিঠা, সে আরেক মহা উৎসব: পিঠা উৎসব।

বসন্তকাল (বাংলা ফাল্গুন ও চৈত্র্য মাস জুড়ে): শীত যখন জেঁকে বসতে চায়, ঝিমিয়ে দেয় গ্রাম্য জীবন, তখন আবার সূর্য বেরিয়ে আসে আপন মহিমায়, কিন্তু পৃথিবীতে তখনও ঠান্ডার আমেজ থাকে, পাক্কা নাতিশীতোষ্ণ, মানে না-শীত-না-উষ্ণ অবস্থা বিরাজ করে সর্বত্র। তাই এই সুযোগে শীতে ন্যাড়া হয়ে যাওয়া গাছে গজায় নতুন কুঁড়ি, গাছে গাছে ফোটে নতুন ফুল, পাখিরা-প্রজাপতিরা পেতে শুরু করে খাদ্য। প্রকৃতি যেন তার রূপ মেলে ধরে।

…তারপর একসময় ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে থাকে ঠান্ডা বাতাসটুকু, আবার ঘুরে আসে প্রচন্ড তাপময় গ্রীষ্মকাল।

গ্রাম মানেই কাচা ঘর। কাচা ঘর মানে হলো: মাটি, বাঁশ, কাঠ, ছন, খড় ইত্যাদি দিয়ে  তৈরি ঘর। তারপর সেখানে জায়গা করে নিতে থাকে টিনের ঘর। এখন গ্রাম যেখানে মফস্বল হবার পথে, সেখানে সিমেন্টের ঘর দেখা দিচ্ছে, সিমেন্টের ঘর-দালান জায়গা করে নিচ্ছে গ্রামে-গ্রামে। গ্রামে-গ্রামে সবজি চাষ, গবাদি পশু পালন, হাঁস-মুরগি-তিতির-কবুতর পালন, মাছ চাষ গ্রাম-বাংলার স্বাভাবিক চিত্র।

কত আর বলবো? পরিচিতি দিতে গিয়েও দেখি একটা বই হয়ে যাচ্ছে, অথচ কিছুই লেখা হয়নি। আর কথা না বাড়িয়ে আজকের মতো বাদই দেই বরং। অনেক পরিচিতি হয়েছে। বাকি পরিচিতিটা আমরা সামনের দিনগুলোতে দেখবো, ইনশাল্লাহ।

চলবে…

-মঈনুল ইসলাম

wz.islam@gmail.com

nanodesigns

মন্তব্য করুন