ভ্রমণ ২০১২ : শস্য-শ্যামলা উত্তর বাংলার টিউবওয়েলের মুখে (শেষ)

« আগের পর্ব

আমরা বাংলাদেশের সর্বউত্তর সীমান্তে বঙ্গমাতার শীর চুমে ফিরেছি আবার তেঁতুলিয়ায়। ফিরে দেখি আমাদের ভ্যানওয়ালারা অপেক্ষা করছে। বেচারারা আয়ের আশা ছাড়তে পারছে না। কিন্তু ও ব্যাটা অটোওয়ালা লাগালো বাগড়া: ভাই তিনশ’ ট্যাকায় অয় না, আপনেরাইতো দেকলেন, কদ্দুর পত। আমরা আমাদের মিডলম্যান ভ্যানওয়ালার দিকে তাকালাম, কিন্তু শেষ পর্যন্ত বুঝলাম, একটু বাড়িয়ে দিয়েই শান্তি আনতে হবে, তাই আরেফিন আরো বিশ টাকা বাড়িয়ে অটোকে ৳৩২০ দিয়ে নিবৃত্ত করলো।

ঠিক করা হলো, এখন আর বাংলোয় ফিরে না গিয়ে দিনের আলো থাকতে থাকতে যদ্দুর পারা যায় দেখে আসতে হবে। তাই সামান্য একটু বিশ্রাম নিতে সবাই চললো রেস্টুরেন্টে। আমি তখন তেঁতুলিয়া তেমাথায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছি তেঁতুলিয়ার ১৯৭১-এর স্মৃতি-সৌধের: দুটো অসমান স্তম্ভের উপর একটা লাল টকটকে তেজস্বী কীরণ ছড়ানো সূর্য।

রেস্টুরেন্টে গিয়ে নাকিব আবিষ্কার করলো ক্যামেরার চার্জ এক্কেবারে নেই। চার্জার সাথেই ছিল, সাথে সাথে রেস্টুরেন্টের ম্যানেজারের ওখানে ক্যামেরাটা চার্জে দিলাম। আমাকে ব্যাটারি চার্জের সময় দিতে বিশ্রামকে আধাঘন্টায় স্থির করে দেয়া হলো। সবাই গরম গরম চা খেলাম আবারো (সাকুল্যে ৳৬০)। এবার বেরোবার পালা।

বাইরে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের ভ্যানওয়ালাদ্বয়, মামারা উঠেন। রওয়ানা প্রায় দিয়েই দিয়েছিলাম, হঠাৎ মাথায় খেললো, ভাড়া আগে ঠিক করে নেয়া সুন্নত: পরে ভাড়া নিয়ে তিক্ততার চেয়ে বিষয়টা আগেই মীমাংসা করা উচিত। ভ্যানওয়ালাদের বললাম, দেখেন, আপনারা কোথায় কোথায় যাবেন, কত নিবেন, আগে বলেন।

ভ্যানওয়ালা অত ঝক্কি চায় না, মামা আগে চলেন, আইসা ইনসাফ করে দিয়েন।

না মামা, ইনসাফ না। আগে বলে নেন, তারপর এসে যদি মনে হয় ন্যায্য হয়েছে কথা নাই, অন্যায্য হলে তখন আপনার ইনসাফ দেখা যাবে। আমরাও কিছু ঘুরাঘুরি করে বুঝছি ভাড়া কেমন। কতদূর যাবেন, সেটা ফিরে এসে বিবেচনা করে দেখা যাবে। কিন্তু আগে ভাড়া ফুড়ায়া নেন।

উত্তরবঙ্গে সাইকেল, নারীর সঞ্জীবনী শক্তির প্রতীক (ছবি: লেখক)
উত্তরবঙ্গে সাইকেল, নারীর সঞ্জীবনী শক্তির প্রতীক (ছবি: লেখক)

একজন তখন বললো, মামা আপনাদেররে চাবাগান, কমলা বাগান ঘুরা’য়া নিয়া আসবো, দুটা ভ্যান দুইশো ট্যাকা দিবেন।

এইত্তো সুন্দর। দুটো ভ্যানে দুদল ভাগ হয়ে গেলাম। এবারে ভ্যান, বাজারের তেমাথায় গিয়ে সোজাও গেল না, ডানে বাংলাবান্ধা কিংবা বাংলোর দিকেও গেল না, চললো বাম দিকের পথ ধরে। গ্রামের মেয়ে-মহিলারা বাইরে বসে রোদ পোহাচ্ছে, আর বৈকালিক বায়ুসেবন করছে, বাচ্চাকাচ্চারা রাস্তা ঘিরে খেলায় ব্যস্ত— গ্রামের এমন রূপ বহুদিন দেখি না। বিষ্ময় শুধু এতটুকুতেই না, বিষ্ময় আরো ছিল বাকি যখন দেখলাম নারী… চালাচ্ছে সাইকেল।

হ্যা, এটা খুবই আশ্চর্যের ব্যাপার যে, এখানকার মেয়েরা প্রকাশ্যে ছেলেদের মতোই সাইকেল দাবড়ে বেড়ায়। গ্রামাঞ্চলে এমন দৃশ্য কল্পনাই করা না গেলেও তেঁতুলিয়া গ্রামে এটা বাস্তব। ক্যামেরাটা তাক করা জরুরি, এমন দৃশ্য পাওয়া যায় না, কিন্তু লোকে কী বলবে? তবু একটা ছবি আমাদের ডকুমেন্ট হিসেবে হলেও দরকার।

গতপর্বে আপনাদের বলেছিলাম সামনে অপেক্ষা করছে ‘বাঁশ’, এবার সেই বাঁশ-এর পালা। …কী হলো, শুধু খাই-খাই অভ্যাস, না? ‘বাঁশ’ শুনলেই ‘বাঁশ খাওয়া’ ভাবেন কেন? ‘বাঁশ দর্শন’ও তো হতে পারে। হঠাৎ করেই আমাদের ত্রিচক্রযান ব্রেক কষে দাঁড়ালো, আর সামনেই সাক্ষাৎ বাঁশ। এ যেনতেন বাঁশ নয়, স্থানীয়রা বলে ‘বার্মিজ বাঁশ’। আমাদের লম্বু মিথুনে’র ফিগার আশা করি সবার এতক্ষণে বোঝা হয়ে গেছে, লম্বুর ছবিটা দেখলেই বুঝবেন, এ কেমন বাঁশ। একেকটার বেড় বিশাল। ঠিক এমন বাঁশই আমরা ২০০৮-এ বান্দরবানে বৌদ্ধদের শ্মশানে দেখেছিলাম। তবে বাঙালি প্রেমিকদের অত্যাচার থেকে এই বাঁশগুলোরও রেহাই নেই: এখানে ওখানে খোদাই করে লেখা ওমুক + তমুক, জে + ডি… হুমম! বুঝলাম, বড় প্রেম শুধু কাছেই টানে না, গাছেও তোলে।

আহা! কতদিন পরে... কতদিন পরে তোমায় আলিঙ্গন (ছবি: রিফাত)
আহা! কতদিন পরে… কতদিন পরে তোমায় আলিঙ্গন (ছবি: রিফাত)

বাঁশ হচ্ছে সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল উদ্ভিদ, এবং অনেক পরিবেশবান্ধব। দৈনিক একটা বাঁশ ১ মিটার (৩.২৮ ফুট) পর্যন্তও বাড়ে এবং অন্যান্য গাছের তুলনায় ৩৫% বেশি অক্সিজেন সরবরাহ করে। বার্মিজ বাঁশের হিসাব বলতে পারবো না, এটা সাধারণ যেকোনো বাঁশের বেলায় প্রযোজ্য বলে জানি।

বাঁশদর্শন শেষে আমরা বাঁয়ের পথ ধরে সামনে অগ্রসর হলাম। বেশ কিছুদূর যাবার পর দেখা মিললো কমলা বাগানের। একটু  বলে নেয়া ভালো: পঞ্চগড় আর তেঁতুলিয়ার ইতিহাস জুড়ে আছে একটা পরিবার- কাজী পরিবার, সেটা ঐ ‘খান বাহাদুর…’ সময়কার (বিস্তারিত ইতিহাস: ইংরেজি উইকিপিডিয়ার এই নিবন্ধে^)।

‘বাসর’ ফুল- মনে হচ্ছে বাসর করতে যেতে হবে তেঁতুলিয়ায় (ছবি: রিফাত)
‘বাসর’ ফুল- মনে হচ্ছে বাসর করতে যেতে হবে তেঁতুলিয়ায় (ছবি: রিফাত)

এই কাজী পরিবার তাঁদের অর্থবিত্তের বৈভব আজও ধরে রেখেছে। এখানকার চাবাগানগুলোর অধিকাংশের (নাকি সবগুলোরই?) মালিক এই কাজী পরিবার। আমরা বোধহয় অনেকেই ‘কাজী অ্যান্ড কাজী’ গ্রুপের নাম শুনে থাকবো, এরা ঐ বংশেরই প্রদীপ।আমাদের আলোচ্য কমলা বাগানও ঐ কাজী পরিবারের সম্পত্তি। কমলা বাগানে গিয়ে ছোট এক কুঁড়েঘর, তার পাশেই মাচার মধ্যে কী যেন এক ফুল ঝোলানো। একজন কর্মচারীকে জিজ্ঞাসা করতেই তিনি আমাদের জানালেন এগুলো কী। কিন্তু পাতার সাথে আমি কোনোভাবেই মেলাতে পারছিলাম না যে, এগুলো বাঁশের ফুল। তাছাড়া আমার জানামতে, বাঁশে যেবার ফুল ধরে সেবার বাঁশে মড়ক লাগে। তাই ডাবল-চেক করতে চাইলাম, আর তখনই ভেদ ভাঙালেন, বুঝলাম এটা বা•স•র ফুল (বাঁশ’র ফুল নয়)।

বাসর ফুল পেরিয়ে সামনে গেলেই কমলা বাগান। কমলা বাগান আহামরি কোনো দেখার কিছু হয়তো নয়, শ্রেফ এটুকুই: যে কমলা প্যাকেটজাত হয়ে ঢাকায় আসে, সে কমলাকে দল বেঁধে গাছে ঝুলে থাকতে দেখা যাচ্ছে। শাকিল বরাবরের মতোই মুগ্ধ হলো, কিন্তু আমি হলাম না। মনে পড়ছিল বড় মা-কে (আমার দাদার মা— আল্লাহ তাঁকে বেহেশ্‌ত নসীব করুন), তাঁর একটা কমলা গাছ ছিল, ঐ গাছ থেকে অনেক পাকা কমলা পেড়ে খেয়েছি ছোটবেলা— এখন স-বই অতীত।

কমলা বাগান (ছবি: রিফাত)
কমলা বাগান (ছবি: রিফাত)

কমলা বাগান থেকে পিচ্চিপিচ্চি ক’টা কমলা নিয়ে এসেছিল ওরা, মুখে দিয়ে শ্রেফ টক ছাড়া আর কিছুই আস্বাদন করার ছিল না। এর মধ্যে সাজ্জাদ একটা সাবাড় করেছে, কারণ ফরমালিনমুক্ত এমন বিশুদ্ধ টক আর কোথায়ইবা পাবে?

ভ্যান এবার আমাদেরকে নিয়ে চললো চা বাগানে। বাংলাদেশের এই একমাত্র জায়গা তেঁতুলিয়া, যেখানে অর্গানিক পদ্ধতিতে চা উৎপাদন হয়, এবং বাগানগুলো সমতলে। আগেই বলেছি, উত্তরবঙ্গ মানে সমতল আর সমতল, আর এই সমতলেই এসব চা বাগান— এ এক অন্যরকম দৃশ্য। অর্গানিক পদ্ধতিটা কী, তা আমাকে জানালো লম্বু মিথুন: এখানে কোনো কৃত্রিম রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করা হয় না, সার থেকে কীটনাশক পর্যন্ত সবকিছুই প্রাকৃতিক বর্জ্য থেকে নেয়া। এখানকার স্থানীয়দের থেকে নাকি পশুবর্জ্য সংগ্রহ করা হয় এবং সেগুলোকে সার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এছাড়া কীটনাশক হিসেবে ব্যবহার করা হয় বিভিন্ন গাছগাছড়া কিংবা তাদের নির্যাস। অর্থাৎ মোদ্দাকথা হচ্ছে, আমার সিলেটের চায়ের চেয়েও স্বাস্থ্যকর হবে এই চা, যদি পুরো বিষয়টা এই বর্ণনার মতোই স্বচ্ছ হয়।

চা বাগানটা দেখতে অপূর্ব: পুরোটা সমতল হওয়ায় আধোকুয়াশাচ্ছন্ন দূরের চা বাগানের অংশটুকুকে মনে হচ্ছে দিগন্তে মিশে যাওয়া অশেষ কোনো জগৎ যেন। মনে হয় হলিউডের ধোয়া দিয়ে তৈরি কোনো মুভির সেট। ভারতের ভিতরে যতদূর দেখেছি এই ভ্রমণে, তাতে ভিতরের দিকটায় ভারতেও প্রচুর চা বাগান, সম্ভবত এই অর্গানিক চা চাষের বিষয়টা ভারত থেকেই আমদানিকৃত।

চা বাগানের অপূর্ব দিগন্ত টানবে যে কাউকে (ছবি: রিফাত)
চা বাগানের অপূর্ব দিগন্ত টানবে যে কাউকে (ছবি: রিফাত)

আমরা যখন সর্বদর্শন শেষে ফিরছি বাংলোয়, তখন আমাদের পিছনে ছিল এক সাইকেলারোহী, তার পিছনে বসে আছে আরো একজন। আর ঠিক এই সাইকেলটার পাশেই সমান্তরালভাবে চলছে আরেকটা সাইকেল, কোনো চালক ছাড়া— দৃশ্যটা ভৌতিক বটে। কিন্তু একটু গভীরভাবে তাকালেই দেখা যায়, পিছনের আরোহীর একটা হাত পাশের সাইকেলটাকে ধরে রেখেছে। জানা গেল, ওটার চেইনে কী সমস্যা, তাই এভাবে ‘ভূতকে দিয়ে সাইকেল চালনা’।

ভূতের সাইকেল-চালনা (ছবি: লেখক)
ভূতের সাইকেল-চালনা (ছবি: লেখক)

বাংলোয় ফিরে তাদেরকে সবাই ‘ন্যায্য’ সম্মত হয়ে সাকুল্যে ৳২০০’র বদলে ৳২৫০ দিয়ে খুশি করা হলো। এবারে সবাই যখন বিশ্রামে, আমি, নাকিব, রিফাত আসরের নামায শেষ করলাম। এরপর বারান্দায় বেরিয়ে দেখি গাছে একটা ‘হাঁড়িচাচা’ পাখি (Tree Pie বা Tree Crow : Dendrocitta vagabubda)। খুব সুন্দর পাখি। দারুণ চটপটে আর ছটফটে। আশেপাশে আরো বহু পাখির কিচিরমিচির, যার বেশিরভাগই শালিক। কিন্তু আমার ক্যামেরাটা বেশিক্ষণ সহায় হলো না, মারা গেল। তাই ওটাকে চার্জে রেখে সাজ্জাদের ক্যামেরা নিয়ে বিকেলের সৌন্দর্য্য উপভোগের জন্য বেরোলাম। কোথাও গিয়ে আশপাশ না দেখে ঘরে বন্দী থাকা আতলেমি মনে হয়।

আদো শুকনো মহানন্দায় নেমে গেলাম। শুনেছি এই বাংলোই নাকি নো-ম্যান্‌স-ল্যান্ডে পড়েছে, সে হিসেবে নদীটাও। নদীর বালুচরে দাঁড়িয়ে পশ্চিমে তাকিয়ে দেখি অস্তমিত সূর্য। সেই সূর্যের লালিমা গিয়ে লেপ্টে গেছে মহানন্দার পানিতে। মিথুনের খুব শখ ঐ সূর্যটাকে সে হাতের তালুতে নিবে, তথাস্থ— ক্যামেরায় একটা ক্লিক: সূর্যটা মিথুনের হাতে অস্ত গেল।

মহানন্দা নদীর অপূর্ব মোহ (ছবি: নাকিব)
মহানন্দা নদীর অপূর্ব মোহ (ছবি: নাকিব)

নদীতে পাথর আর পাথর। এখানকার অনেক মানুষই এই নদী থেকে পাথর উত্তোলন করে জীবন নির্বাহ করে, পুরোপুরি জাফলং-এর জীবন। প্রথম পর্বে বলেছিলাম এদিককার মাটিতে প্রচুর নুড়ি, আর এসব নুড়ি থেকেই হয় পাথর। আমরা জানি বালি থেকে হয় কাচও। ক্যামেরা হাতে নেই দেখে বসে একটু বালি হাতে তুলে নিলাম, দেখি আশ্চর্য! ছোট্ট ছোট্ট কাচ। খুব পাতলা, কেলাসিত কাচ ঐ বালির দানার মধ্যে। দেখতে কেমন যেন পুঁটি মাছের আঁশ মনে হয়। বালির মধ্যে যেসব পাথর, সেগুলোতেও আছে নানা বৈচিত্র্য: কোনোটা পাক্কা শ্লেট পাথর, কোনোটা মোজাইক, কোনোটা পাতলা কাগজ তো কোনোটা ডোরাকাটা বাঘ। পাথর কুড়িয়ে যখন প্যাকেটবন্দী করে ঢাকা আনতে চাইলাম, তখন আরেফিনের ঠোঁটে তাচ্ছিল্যের হাসি: ব্যাটা, বাচ্চাই রইলি এখনও। তবে সে তার সিগারেটের প্যাকেট দিয়ে সহায়তা করলো আমাকে ওগুলো আনতে।

নদীর বালির মাঝে কাচ, আর নুড়ির মাঝে পাথরের খোঁজ আমার (ছবি: নাকিব)
নদীর বালির মাঝে কাচ, আর নুড়ির মাঝে পাথরের খোঁজ আমার (ছবি: নাকিব)

সূর্যাস্ত আস্বাদন আর শ্রমজীবি মানুষের ঘরে ফেরা দেখে যখন বাংলোয় ফিরেছি, তখনও কিন্তু সন্ধ্যা হয়নি। অথচ সূর্য অস্ত চলে গেছে। আমি জানতাম, পাহাড়ে সূর্যাস্ত হয় হঠাৎ, মনে হলো সমতলে সূর্যাস্ত হয় সুদীর্ঘ। বাংলোয় ফিরে দেখি গাতক সাজ্জাদ একটা আর রিফাত একটা গিটার নিয়ে বারান্দার সোফায়, আরেফিন সিগারেট ফুঁকছে (সে কি ‘বড়’ হবার ভান করছে? লাথি মার নোংরা খেয়ে বড়ত্ব জাহিরের); আমি, নাকিব, মিথুন আর শাকিল যোগ দিলাম তাদের সাথে। গাতকের কণ্ঠ যেই পাখা মেলতে চাইলো, তখন মাগরিব হলো।

নামায শেষ করে আবার বারান্দায় আমরা। এবার বারান্দা হয়ে উঠলো কনসার্ট। নাকিব একটা ননস্টপ গিটারিস্ট (রীতিমতো একটা তেলের খনি যেন), তার সাথে আছে সাজ্জাদ (সব গানের দুই লাইন গাইবে, তিন নম্বর লাইন থেকেই আলফাস্ক্র্যাম্বল শুরু করবে- এই চরণের জায়গায় ঐ চরণ, তো ঐ চরণের জায়গায় এটা; কখনও গানটা যখন তুঙ্গে, তখন হঠাৎ হো হো করে হেসে গানটা ছেড়ে দিয়ে সবার মেজাজটা খারাপ করে দেয়), আছে রিফাত (গানের চেয়ে তার কাছে গিটারই বেশি পছন্দের), আর আছে শাকিল (হৃদয় খান মিক্স থেকে হাবিব রিমিক্স ঘুরে রবীন্দ্রসংগীত পর্যন্ত সবই গাইতে চায়, ভালোই গায়, কিন্তু হঠাৎ শোনা যায় গানের কথা পাল্টে গানটাকে প্যারোডি করে ফেলেছে, তখন পড়ে হাসির রোল)। মিথুন আর আরেফিন হলো নীরব শ্রোতা, আর আমি তো… ‘এমনি এমনিই খাই!’

বারান্দায় গানের আসর, বাইরে বসা দুজন স্থানীয় শ্রোতা, বাংলো থেকে প্যানোরামা (ছবি: লেখক)
বারান্দায় গানের আসর, বাইরে বসা দুজন স্থানীয় শ্রোতা, বাংলো থেকে প্যানোরামা (ছবি: লেখক)

গানের পর গান চলছে, গানের আবহে একসময় দেখা গেল দুজন শ্রোতাও জুটে গেল: দুই যুবক; তাদের আবদার: ভাই অর্থহীনের একটা গান ধরেন না। আবদার বলে কথা, রক্ষা করা হলো। দুই যুবক তৃপ্তি নিয়ে উঠলো। কিন্তু গানে তো আর পেট ভরছে না, ক্ষিধে যে লেগেছে। সেই দুপুরে এককাপ চা খেয়েছিলাম, এরপর আর কিছু খাইনি। ঠিক করা হলো, চিপ্‌স, বিস্কুট, আর নাকিবের আনা তিলের খাজা খেয়ে পেটের ছুঁচোকে আপাতত শান্ত রাখা হোক, রাতে একটু তাড়াতাড়িই খেয়ে নিব রাতের খাবার, তাতে ক্ষিধা লাগলে তৃপ্তি সহকারে খাওয়াও যাবে। ব্যস, তা-ই সই।

খাওয়া শেষে আবিষ্কার করলাম, আমাদের রিযার্ভ খাবার পানি শেষ। এখন পানি কোথায় পাই? হাবিব সাহেবের কোনো ফোন নাম্বার রাখিনি, তাঁর ঘর অবশ্য এখানেই কাছে, কিন্তু গিয়ে বিরক্ত করতে আগ্রহ পেলাম না আমরা। অগত্যা ঠিক করলাম, বাংলো আর পিকনিক স্পটের নিচে যে দোকানটা দেখেছিলাম, ওটাতে যাওয়া যাক। কিন্তু টর্চ ছাড়া গাছের ছায়ায় ঘুটঘুটে অন্ধকারে হাঁটা সত্যিই একটা ঝামেলা হয়ে দাঁড়ালো। তবু গেলাম আমরা: আমি, আরেফিন, মিথুন। গিয়ে দেখি দোকান বন্ধ। তবে এই অন্ধকারে এতটুকু বুঝলাম, আমাদের নেতা অন্ধকারকে বড় ডরায়। দেখলাম, অন্ধকারে তার ভিযিবিলিটি শূণ্যের কাছাকাছি। ব্যর্থ মনোরথ ফিরে এলাম জলশূণ্য জনহীন জনারণ্যে!

ওদিকে অন্য দৃশ্য: সামনের ভারত-সীমান্ত তখন জ্বলজ্বল করছে— পুরো ভারত সীমান্তে নির্দিষ্ট দূরত্ব পরপর বিশাল বিশাল শক্তিশালী হলদে বাতি জ্বালিয়ে রাখা হয়েছে। এটা শক্তিমান ভারতের আরেকটা শক্তির পরিচায়ক: বাংলাদেশ থেকে পলায়নরত মানুষ ঠেকাতে পুরো বঙ্গ-ভারত সীমান্তেই আমাদের দেখামতে তারা কাঁটাতার বসিয়েছে। আর এখানে এসে দেখি, কাঁটাতারই শুধু নয়, সাথে বসিয়েছে বাতিও। সীমান্ত প্রহরায় এসব অস্ত্র ছাড়াও তাদের আছে হত্যাকারী এক বাহিনী: বিএসএফ। …তবে এটা সত্যি, এই সীমান্ত বাতির দৃশ্যটা বাংলো থেকে দেখতে অপূর্ব লাগে। ক্যামেরায় ধারণ করতে তাই কার্পণ্য করলাম না।

রাতের আঁধারে ভারতে প্রজ্জ্বলিত পাহারাদার সীমান্ত-বাতি (ছবি: লেখক)
রাতের আঁধারে ভারতে প্রজ্জ্বলিত পাহারাদার সীমান্ত-বাতি (ছবি: লেখক)

ধীরে ধীরে শীত জেঁকে বসতে শুরু করেছে। কনকনে ঠান্ডা বাতাস এসে আমাদের জমিয়ে দিতে চাচ্ছে। আমি আমার জিন্সের প্যান্টের উপরই একটা ট্রাউযার পরে নিলাম, গায়ে জ্যাকেট আর মাথায় কানটুপি জড়িয়ে একটু আরাম পেলাম। শীতের কোনো প্রস্তুতিই নিয়ে আসেনি রিফাত: বেচারার একটু কষ্টই হচ্ছে। তাই গানের আসর শেষে যখন তাশ খেলার আসর বসলো, তখন প্রস্তাব দিলাম ভিতরে গিয়ে দরজা আটকে খেলার জন্য, অযথা ঠান্ডায় জমে অসুখ বাঁধানোর কোনো মানে হয় না।

রাত নয়টায় কেয়ারটেকার হাবিব আমাদের জানালেন খাবার প্রস্তুত। আর দেরি কিসে, সবাই খাবার খেতে চলো। এরই মাঝে কেয়ারটেকারের এক আত্মীয়ের সাথে কথা হলো। তিনি এসেছেন বেড়াতে, আজকে এখানে পিকনিক করছেন সবাই, তাই আমাদের আমন্ত্রণ গ্রহণ করলেন না। কথা বলতে বলতেই জানালেন পৌষ-মাঘে তেঁতুলিয়ার শীত কী জিনিস। জানালেন বাংলোয় আসা ভিআইপি অতিথিদের কথা। জানালেন ভারত সীমান্ত দিয়ে বিএসএফ-কে হাত করে চোরাকারবারির কাহিনী— জানা গেল এখানকার চোরাকারবারির সিংহভাগই ভারত থেকে গরু পাচার, এবং এর বেশিরভাগই হয় ঐ যে দূরে দেখা যায় ব্রিজ, তার নিচ দিয়ে।

শাকিল জানতে চাইলো কাঞ্চনজঙ্ঘার ব্যাপারে। জানালেন, এই ক’দিন আগেও দেখা গিয়েছিল, কিন্তু আর দেখা যাচ্ছে না। ঐ যে দূরে ওদিকটায় দেখা যায়। রাতের বেলা পাহাড়ের আলো পর্যন্ত দেখা যায়, দেখা যায় গাড়ি আলো; গাড়ি পাহাড় ঘুরে ঘুরে উপরে উঠে, সবই এখান থেকে দেখা যায়। পাঠক নিশ্চয়ই এতোক্ষণে বুঝে গেছেন, আমাদের ভ্রমণের মূল্য উদ্দেশ্য কাঞ্চনজঙ্ঘা দর্শন সফল হয়নি। কারণ ক’দিন আগেই (নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে) একটা নিম্নচাপ হয়ে টানা প্রবল বর্ষণ কুয়াশা আর শীত দিয়ে গেছে; কাঞ্চনজঙ্ঘাকে আমাদের কাছে অদৃশ্য করে দিয়ে গেছে।

যাহোক খেতে বসলাম: এ দেখি মহা আয়োজন (টাকাটাও নিশ্চয়ই মহালঙ্কা!)— বেগুন ভর্তা, আলু ভর্তা, টাকি মাছের ভর্তা আরো কী একটা ভর্তা মনে নেই, ঘন ডাল, দেশি [একাধিক] মুরগির মাংসের ভুনা – রাজভোজ যাকে বলে। ক্ষিধা আর মেনু সবেতে মিলে যে খাওয়াটা হলো, সেটার জবাব নেই। জিজ্ঞেস করা হলো কে রান্না করেছে? কেয়ারটেকারের জবাব: আমি। বাহ, ফারুক সাহেব, আপনার রান্না তো লাজওয়াব! খুব ভালো হয়েছে! খুব তৃপ্তি ভরে খেয়েছি! —প্রশংসার অন্ত রইলো না।

পেটের ছুঁচোকে ঠান্ডা করে সবাই যখন বিছানায় যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছে, রাত তখন মাত্র দশটা। বিছানায় যাওয়া মানে অবশ্য ঘুম না, ঘুমাবে শুধু একজন, নিয়ত পাক্কা- সে হলো আমাদের লম্বু মিথুন। বাকিরা খেলবে তাশ: চারজন- নাকিব, রিফাত, আরেফিন, সাজ্জাদ। আমি আর শাকিল ঠিক করলাম, অন্ধকারে তেঁতুলিয়া দেখতে বেরোব। আরেফিন তো সাফ নিষেধ: না। আরেফিন যা বলবে, সাজ্জাদ তা-ই বলবে: না। এরা দুজনেই ভিতু জানি, কিন্তু এদের ভয় অন্য জায়গায়, অচেনা জায়গায়, ছিনতাই, ডাকাত; তারচেয়ে বড় কথা, বর্ডার এলাকায় আদমপাচার। এসব চিন্তা আমরাও করেছি, তাই কেয়ারটেকারকে আগেই জিজ্ঞেস করে নিয়েছিলাম, রাতে বেরোন নিরাপদ কিনা। একবাক্যে কেয়ারটেকার আর তাঁর সম্বুন্ধি নিরাপত্তার পক্ষে সায় দিয়েছিলেন। তাই নেতার ভয়কে অমূলক আখ্যা দিয়ে আমরা শীতের পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে, সবকিছু ঘরে রেখে শ্রেফ দুইশ’ টাকা আর আমার মোবাইল ফোনটা নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম টর্চ ছাড়া আলোবিহীন ঘুটঘুটে অন্ধকারে, অসীমের পথে…।

দিনের বেলা ওরা ঘুরপথে যেদিক দিয়ে এসেছিল, আমি এবার সেদিকে নিয়ে যেতে শাকিলকে বললাম। দুজনে সেদিকে চললাম। অন্ধকারের নীরবতায় পথ চলার এক অন্যরকম আনন্দ। রাতে ভূত খোঁজাটা আমার নেশা, তাই মনেপ্রাণে চাচ্ছিলাম এই যদি আবিষ্কার করতাম আমার পাশের শাকিল আসলে শাকিল নয়, একটা জিন্দা লাশ- ওফ্! ভ্রমণটাই থ্রিল্‌ড হয়ে উঠতো। শাকিলও দেখি একই আশা নিয়ে বসে আছে- হাসলাম দুজনে।

পাশ দিয়ে লোক পার হচ্ছে: ঢাকা শহরের সন্দেহবাতিকগ্রস্থতায় প্রত্যেকটা মানুষকে পরখ করছি আমরা। মজার ব্যাপার হলো যতগুলো লোকের সাথে পথে সাক্ষাৎ হলো, তাদের কথোপকথন যতটুকু শুনলাম, সেখানে ‘গরু’ শব্দটা ছিল। কেন ছিল? আর কী: ভারত থেকে গরু পাচার। রাত হলেই বোধহয় এরা চাঙা হয়ে উঠে।

এই পথটা বেশ ঘুরপথ। তবে পথটা সুন্দর। তেঁতুলিয়া পুলিশ স্টেশন পার করে আরো বেশ কিছুদূর গেছি, হঠাৎ দূরে করতালের আওয়াজ। আমার মনটা এক আনন্দে নেচে উঠলো: নিশ্চয়ই কোনো ভজন হচ্ছে কোথাও, যাক তেঁতুলিয়ার একটা স্থানীয় কলা দেখে যেতে পারবো। কিন্তু, আরো সামনে যেতেই…

বাংলোতে আমাদের মিথুন বাবাজি নাক ডাকছে। পাশের বিছানায় বসে আরেফিন, সাজ্জাদ, রিফাত আর নাকিব তাশ খেলছে: কলব্রিজ, সাধারণ খেলা। কিন্তু খেলা তো। এমন সময় নাকিবের মোবাইল ফোনটা বেজে উঠলো। দেখে নয়ন ফোন করেছে। ফোন ধরে শুনলো একটা উত্তেজিত কণ্ঠস্বর, কথা বলছে শাকিল। তার কথা ভেঙে ভেঙে আসছে; যা বোঝা গেছে, তা হলো: আমরা দিনে যেখানে নদী দেখছিলাম … এলাকার পোলাপাইন … ব্যাটট্যাট নিয়া … তোরা আয়… ট্যুঁট ট্যুঁট! শাকির উধাও! নাকিব কলব্যাক করলো, কিন্তু কল যাচ্ছে না। আবারও… যাচ্ছে না। আবারও… যাচ্ছে না। ডিসাইফার করলে সোজা বাংলায়: নয়ন বিপদে পড়েছে।

সাথে সাথে তাশ ছুঁড়ে ফেলে উঠে পড়লো চারজন, নয়ন বিপদে পড়েছে। আরেফিনের মুখ থেকে তখন কোনো ভালো শব্দ বেরোচ্ছে না, মেশিনগানের মতো বেরোচ্ছে অশ্রাব্য সব গালি: বারবার নিষেধ করাসত্ত্বেয় দুই পন্ডিত রাতের অন্ধকারে পন্ডিতী করতে গেছে। নানা ধরণের বিপদের কথা মাথায় আসছে… কিন্তু এখন করণীয় কী? বাংলোর কোনো চাবি ওদের কাছে নেই, তালাবদ্ধ করে গেলে এসে চাবি পাবে না। তাছাড়া সবাই একসাথে না বেরিয়ে আলাদা হয়ে বেরোবেইবা কিসের ভিত্তিতে? কী হয়েছে কে জানে?? কোন বিপদ সামনে, তা-ইবা কে জানে? চারজনেরই মাথা হ্যাং!

এদিকে দূর থেকে করতালের আওয়াজ মনে হলেও আরো সামনে যেতেই বোঝা গেল, আওয়াজটা ঐ সামনের ঘরটা থেকে আসছে। আর তখনই ভ্রম ভাঙলো, এ তো করতাল না, এ হলো ড্রাম্‌স। শুনলাম কে যেন বেসুরো গলায় কবিতা আবৃত্তি করছে: ‘আবার এলো যে সন্দা, শুদু দুজনে…’। হ্যাপি আখন্দ কবর থেকে উঠে এসে থাপড়াবে।

আমি যখন এদের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছি, দেখা গেল শাকিল বেশ উত্তেজিত: সে গিয়ে ঐ ঘরেই ঢুকে গেল। সেখানে পাওয়া গেল, আমাদের বাংলোয় যাওয়া দুই শ্রোতার একজনকে। পরিচয় দিলো শাকিল: আমাদের ব্যান্ড অ্যাইমার্স, আমরা গিটারও নিয়া আসছি, আমাদের একটা অ্যালবামও বের হইছে… (সত্যিই, শাকিল অ্যাইমার্স ব্যান্ডের কীবোর্ডিস্ট আর ভোকাল) ব্যস, ছেলেগুলো তো আহ্লাদে আটখানা: ভাই, আপনারা গিটার নিয়া আসেন না…। শাকিল ঠিক করলো সবাইকে খবর দিয়ে নিয়ে আসবে।

আমার ফোনটা বের করে ফোন দিলো নাকিবকে: নাকিব, আমি শাকিল। …শোন্‍, দিনে আমরা যেখানে দাঁড়ায়া নদী দেখছিলাম, ঐখানে এলাকার পোলাপাইন সব প্যাডট্যাড নিয়া গান গাইতাচ্ছে। তোরা গিটার নিয়া চ’লা আয়। খুব মজা অইবো… এহহে, লাইনটা কাইডা গেল।

আমার দেখি নেটওয়ার্ক নেই। শাকিল আবার ভিতরে চলে গেলে আমি নেটওয়ার্কের সন্ধানে ঘুরছি, ফোন বন্ধ করে চালু করছি – সব চেষ্টা বৃথা। ঠিক করলাম বাদ দেই। বাজারের দিকে চললাম। বাজার থেকে ডানদিকের পথ ধরে বাংলোয় ফিরবো। এমন সময় আমাদের সেই শ্রোতাও আমাদের সঙ্গী হলো। তাকে বললাম, ওরা আসবে না, বাদ দাও। সবাই টায়ার্ড, ঘুমাবে এখন।

এমন সময় আবার ফোনটা চালু করতেই নেটওয়ার্কটা পেয়ে গেল। আসলে ফোনটাই বিগড়ে গিয়েছিল। সাথে সাথে নাকিবকে কলব্যাক করলাম, নাকিব রাজি না। আমাদেরকে দ্রুত ফিরতে বললো। ফোন রাখতেই আরেফিনের ফোন: এই তোরা কই? শাকিল কী কইছে? আমি জানালাম, আমরা ফিরতেছি। যেজন্য ফোন দেয়া হয়েছিল, সেটা নাকিব নাকোচ করে দিয়েছে। আরেফিন আমাদেরকে কিছুই বললো না। সিচুয়েশন ইয আন্ডার কন্ট্রোল।

মজার ব্যাপার হলো, আমাদের এই শ্রোতার নামও নয়ন… অ্যানাদার কোইনসিডেন্স! শ্রোতার সাথে বিদায় নিয়ে বাজারে গেলাম, সেখানে হোটেল দোয়েলে মজার সেই চা আরেকবার খেলাম। রাতের তেঁতুলিয়া অনেকটাই নিঃস্তব্ধ, নিঝুম। মাঝে মাঝে হঠাৎ কোনো মোটরসাইকেলের আওয়াজ ছাড়া তেমন কোনো বড় আওয়াজ নেই।

বাংলোয় ফিরে আমাদেরকে আরেক দফা বকাঝকা শুনতে হলো। কী আর করা, ভাগ্যের ফের। ওদেরও যেমন দোষ নেই, নেই আমাদেরও। এবার ঘুমানো দরকার। কিন্তু বাংলো থেকে আমাদেরকে কোনো কম্বলজাতীয় কিছু দেয়া হলো না, শ্রেফ চারখানা চাদর। তাই গায়ে শীতকাপড় জড়িয়ে একেকজন ঘুমাতে গেল। ওরা চারজন সারারাতই নাকি খেলবে, রাত তখন সাড়ে এগারোটা।

ফযরেরও আগে ঘুম থেকে উঠে পড়লাম, তেঁতুলিয়ায় আলো ফোটার সৌন্দর্য্য দেখা চাই আমার। শীত থেকে বাঁচতে পুরো প্যাকেট হয়ে গেলাম, কিন্তু তবু যেন কোত্থেকে ঠান্ডা লাগছে। এখনই এই নভেম্বরে যদি এই অবস্থা হয়, জানুয়ারিতে কী হবে আল্লা’ মালুম। কিন্তু বারান্দা ছেড়ে বেরোতে পারলাম না: সবদিকের গ্রিল তালাবদ্ধ, চাবি আছে কেয়ারটেকারের কাছে। বিষয়টা ঠিক সুখকর না। যাহোক, ফযরের আযান হতেই কেয়ারটেকার এসে গেট খুলে দিলেন। বাইরে বেরোলাম আমি মুক্ত বিহঙ্গ।

ক্যামেরার শাটার স্পিড কমিয়ে অন্ধকারের ছবি তুলতে থাকলাম। পিছন দিকের লোহার মই বেয়ে বাংলোর ছাদে উঠে গেলে আশপাশটা আরো দারুণ। আলো ফুটছে, দিনের আলোয় ভারত-সীমান্তে জ্বলছে বাতি। পাখিগুলো আড়মোড়া ভেঙে টুঁইট টুঁইট, চিরিৎ চিরিৎ অপূর্ব কলকাকলীতে মুখর করে তুলতে থাকলো আশপাশটা। বাংলোয় একটা বিশালকায় গাছ আছে, ওটার গায়ে পাখিগুলো বেশ নিরাপদে ঘুরে বেড়ায়। আশেপাশের প্রত্যেকটা গাছেই পাখিদের ওড়াওড়ি… গ্রামের পাখিদের এমন ডাক বহুদিন শুনি না। ক্যামেরা চলছে অনবরত: উড়তে থাকা পাখিদের ক্যামেরাবন্দী করা বড় কষ্টের। তবু তুলতে থাকলাম।

বেশিরভাগই ‘শালিক’। তবে ক্যামেরায় ধরা পড়লো ‘ঘুঘু’ও। ঘুঘু দেখে অনেকেই কবুতর ভাবতে পারেন, কিন্তু এগুলো আসলে ঘুঘু। চোখে পড়লো ‘বুলবুলি’, লাল পাছা আর ঝুঁটি দেখে যাদের খুব সহজেই চেনা যায়। দেখলাম সুন্দরী পাখি ‘মাছরাঙা’ও, ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করছে কখন মাছটা উপরের তলে উঠে আসবে। হঠাৎ, দূরে গাছের অগ্রভাগে চোখে পড়লো ছোট্ট দুটো পাখি, পরে জেনেছি, ওগুলো মুনিয়া। শরীফ খানের পাখির ম্যানুয়ালের সাথে মিলিয়ে দেখি এরা ‘তিলা মুনিয়া’ (Spotted Munia: L. Punctulata)। সুন্দর এবং শান্ত পাখি, জেনেছি: উড়তে থাকা মুনিয়ার ঝাঁক লক্ষ করে গুলি ছুঁড়লে দুয়েকটা ভয়েই মাটিতে পড়ে যায়। আরেকটা বিষয়, কোনো মুনিয়াই নাকি মাটিতে নেমে হাঁটতে পারে না, লাফিয়ে লাফিয়ে চলে।

এই ভ্রমণের পাখির ছবি আর বিবরণ নিয়ে একটা আলাদা পোস্ট করার ইচ্ছা আছে ইনশাল্লাহ। সাথে একটা ভিডিও-ও দেয়ার পরিকল্পনা থাকলো।

পাখির ছবি তুলতে তুলতে খেয়ালই করিনি, পিছনে একটা টকটকে লাল সূর্য উঠছে গাছের আড়াল থেকে। সূর্যোদয় দেখা হয়নি একযুগ হলো, সাধ মিটলো আজ।

সদ্য উদিত সূর্যের সামনে একটি শালিক পাখি (ছবি: লেখক)
সদ্য উদিত সূর্যের সামনে একটি শালিক পাখি (ছবি: লেখক)

আমাদেরকে বেরোতে হবে। বিদায় নিলাম কেয়ারটেকারের থেকে। তাঁর রান্নার সুনাম আবারো করলাম, যে কাজটা আমি খুব একটা পারি না। এই বেচারা একটু লাজুক টাইপের মানলাম, কিন্তু কেন জানি এই লোক কোনোভাবেই সুনামটা গ্রহণ করতে পারছিল না, চেহারায় একটা অপরাধবোধ। আমি নিশ্চিত হলাম এবার: রাতের রান্নাটা অবশ্যই সে করেনি, করেছে তাঁর স্ত্রী। তো সেকথা আমাদের বললেই হতো যে, রান্না করেছে আমার পরিবার। ব্যস, ল্যাটা চুকে যায়। মানুষ যে সম্ভ্রমের খাতিরে একটা মিথ্যার কারণে এমন অপরাধবোধে ভুগতে পারে, সে বাঙালিকে না দেখলে জানা যাবে না।

দি এ টীম: লেখক, নাকিব, রিফাত, সাজ্জাদ, মিথুন, শাকিল আর আরেফিন (ছবি: কেয়ারটেকার)
দি এ টীম: লেখক, নাকিব, রিফাত, সাজ্জাদ, মিথুন, শাকিল আর আরেফিন (ছবি: কেয়ারটেকার)

বাংলো থেকে বিদায় নিলাম, বাংলোয় একরাত থাকার খরচ রুমপ্রতি দুইশ’ পঞ্চাশ (আকাশ থেকে পড়ার জোগাড়), তাই দুই রুম মিলিয়ে ৳৫০০। রাতের খাবার বাবদ চার্জ এসেছে ৳১৩০০, দলে সাতজন থাকায় গায়ে লাগলো না। বাংলো থেকে বিদায় নিয়ে হেঁটেই বাজারে পৌঁছলাম আমরা।

গাছের ক্যানোপিতে ছবিটা তুলতে আরেকটু সময় যদি দিত, আলো কম পড়েছে (ছবি: লেখক)
গাছের ক্যানোপিতে ছবিটা তুলতে আরেকটু সময় যদি দিত, আলো কম পড়েছে (ছবি: লেখক)

তারপর দোয়েল হোটেলে খেয়েদেয়ে (সাকুল্যে ৳৩১০) সাড়ে আটটায় শ্যামলীর বাসে চড়ে বসলাম। এই বাসটা হানিফের চেয়ে আরামপ্রদ। ভালোই হয়েছে, এতো দীর্ঘ যাত্রায় নাহলে কষ্ঠ হতো বেশি। পঞ্চগড় এসে প্রকৃতির সাথে মোলাকাত শেষ করে ১২ ঘন্টার যাত্রার জন্য প্রস্তুত হলাম।

এই যে পথের হলো শুরু, তা আর শেষ হয় না। ঠিক এমনটাই হাসি-তামাশারও শেষ নেই: পথিমধ্যে ‘বোদা উপজেলা’ আর ‘ধনবাড়ি’ জায়গার নাম দেখে একেকজন হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ে। এতো হাসির কী আছে তা আসলে বিশেষ গবেষণার বিষয়! আসলেই কী? …শহরের বাইরে গেলে স্থানীয় কিছু কিছু বিষয়ও অনেক মজাদার, যেমন সেখানে পঁচা সাবানের পাশাপাশি আছে ‘হাতি সাবান’, সেভেন রিংস সিমেন্টের পাশে আছে ‘ফাইভ রিংস সিমেন্ট’ ইত্যাদি। এরই ধারাবাহিকতায় রংপুরে পাওয়া গেল ‘নয়ন স্টোর’… অ্যানাদার কোইনসিডেন্স!

রাস্তায়, রাস্তার ধারে অনেক অনেক জীবন, অনেক অনেক সংস্কৃতি: কৃষি জমিতে মহিলারা কাজ করছেন পুরুষের পাশাপাশি, কচুরিপানায় ফোটা বেগুনি ফুল যেনবা বিলে বিলে বাগান তৈরি করেছে, ইটভাটা, আদার ক্ষেত, রংপুরে কলার হাট (ট্রাকের পর ট্রাক ভর্তি কলা আর কলা), ধান সিদ্ধ করার প্ল্যান্ট… কিন্তু একটা জিনিস দেখে বেশ আশ্চর্য হলাম: আখ ক্ষেতে কেন জানিনা আখগাছগুলোকে প্যাঁচিয়ে বেণী করে রাখা হয়েছে।

বেণী করা আখ গাছ, কী কারণে, জানি না (ছবি: লেখক)
বেণী করা আখ গাছ, কী কারণে, জানি না (ছবি: লেখক)

এসবের উত্তর খুঁজতে খুঁজতে কখনও ঘুমাই, কখনও জাগি, আড়মোড়া ভাঙি, আবার ঘুমাই, জেগে দৃশ্য দেখি, ওরা হাসালে হাসি, আবার জানালা গলে বাইরে তাকাই… পথ আর শেষ হয় না। পথে একটু কলা আর শসা কিনে খেলাম আমরা (৳৩৫)। চলমান গাড়ি থেকে ছুঁড়ে না ফেলে আমরা শসার পলিথিন ব্যাগে আবর্জনা নিজেদের সাথেই রেখে দিলাম (ভ্রমণে পরিবেশ রক্ষা আমাদের অন্যতম একটা লক্ষ্য)। শেষে সিরাজগঞ্জ গিয়ে আমাদের প্রথম এবং একমাত্র যাত্রাবিরতি। যোহরের শেষ লগ্নে আমরা যোহর পড়ে খাওয়া-দাওয়া (সাকুল্যে ৳৯০০) শেষে আসর পড়ে গাড়িতে উঠলাম।

বঙ্গবন্ধু সেতু এবার দিনের আলোয় দেখছি, অপূর্ব দৃশ্য: বিশাল নদী, তার মাঝে চর, তার মধ্যে গাছ-ঘাস আর মানুষের বসতি, তার উপর দিয়ে বাংলাদেশের এক মহাকীর্তির উপর দিয়ে চলছি আমরা। সন্ধ্যালগ্নে সেতুর উপর অস্তমিত সূর্যের তীর্যক আলো যখন আমাদের বিদায় জানালো, তখন হঠাৎ মনে পড়লো, গত বছরের ঠিক এই সময়টায় এই দিনে নাকিবের বাবা মারা গিয়েছিলেন। খুব ভালো একজন মানুষ ছিলেন, আল্লাহ তাঁর বেহেস্ত নসীব করুন।

সেতুও বিদায় জানালো আমাদের, বঙ্গবন্ধু সেতু পূর্ব’ রেল স্টেশন ছেড়ে, উত্তরবঙ্গ থেকে নাঁড়ি ছিঁড়ে চললাম আমরা ঢাকা শহরে জীবন-জীবিকার টানে… আমাদের সাত ভাই চম্পা হয়ে থাকলো উত্তরবঙ্গের এই টিউবওয়েলের মাথা।

মুগ্ধ হয়েছি এই সমতল দেখে, শুধু ঈশ্বরের সুদৃষ্টি দরকার এই মঙ্গাকবলিত মানুষগুলোর উপর -এই দোয়া থাকলো।

-মঈনুল ইসলাম
wz.islam@gmail.com

এই ভ্রমণের যাবতীয় বিষয়াদি, প্রস্তুতি ও সাজ-সরঞ্জাম সম্বন্ধে জানতে হলে দেখুন: প্রস্তুতি পর্বটি

One thought on “ভ্রমণ ২০১২ : শস্য-শ্যামলা উত্তর বাংলার টিউবওয়েলের মুখে (শেষ)

মন্তব্য করুন