তিন গোয়েন্দা – একটি সমৃদ্ধ শৈশবের নাম

ঢাকায় আসার পরে তিন গোয়েন্দার নাম প্রথম শুনলাম, তখন পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ি। মামার মুখে শুনতাম, তিনি পত্রিকায় পড়েছেন, তিন গোয়েন্দা পড়ে বাচ্চারা হারিয়ে গেছে। বাচ্চারা গোয়েন্দাগিরি করার জন্য কাউকে কিছু না বলে বাসা থেকে বেরিয়ে পড়ে হারিয়ে গেছে। বুঝে নিয়েছিলাম, তিন গোয়েন্দা একটা অভিশাপের নাম।

সপ্তম শ্রেণীতে উঠে আইডিয়াল কোচিং-এ যেতাম, সেই খিলগাঁও-এ। সেখানে আমাদের স্কুলেরই আরেক বন্ধুর সাথে প্রতিদিন দেখা হতো, নাম তার সজীব। সজীব একদিন ক্লাস শেষে আমার দিকে নিউজপ্রিন্টের কাগজের একটা তাড়া বাড়িয়ে ধরলো – এটাকে বই বলার প্রশ্নই উঠে না। কারণ তখন বই মানে ছিল, স্কুলের চ্যাপ্টা পাঠ্যবই, বড়জোর চাচা-চৌধুরি আর বিল্লু-পিংকি’র বর্গাকৃতির চকচকে কমিক বই। এই বইটার না ছিল কোনো কভার পাতা, না ছিল কোনো চকচকে ভাব, না ছিল সাদা কাগজ। শুধু বাইন্ডিং, তাও শতচ্ছিন্ন, দেখে আন্দাজ করে নিতে হয় এটা একটা বই। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কী? সজীব বললো, এটা নে, পড়ে দেখিস, ভাল্লাগবে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কিসের বই? সে বললো, তিন গোয়েন্দা। আমার তো মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো। মাথা খারাপ নাকি! সজীব আমাকে ধ্বংস করার জিনিস দিচ্ছে!! আমি নিতে অস্বীকৃতি জানালাম। সজীব একটু জোর করেই গছিয়ে দিল, আমি বলছি, পড়ে দেখ্‌, তোর ভাল্লাগবে। …কী মনে করে জানিনা, কাগজের তাড়াটা নিলাম আমি; ব্যাগে পুরে বাসায় এলাম। মনের মধ্যে দ্বৈততা – ধ্বংসের কারিগর তিন গোয়েন্দা এখন আমার ব্যাগে, পড়বো কি পড়বো না। পড়লে আমার ধ্বংস নিশ্চিত!

বাসায় এসেই ব্যাগটা কোনোরকমে রেখেছি, মনের তীব্র নিষেধাজ্ঞার বশেই কিনা জানিনা কাগজের তাড়াটা নিয়ে, ড্রয়িংরুমে একটা বিছানা পাতা ছিল, মামাতো ভাই ঘুমাতেন, সেখানে গিয়ে শুয়ে পড়লাম। সেদিন সম্ভবত স্কুল ছিল না, সেকারণেই বই নিয়ে পড়ে থাকতে পারলাম। কাগজের তাড়াটার এক পাতা উল্টাতেই লেখা দেখলাম:

তিন গোয়েন্দা

হ্যালো, কিশোর বন্ধুরা-
আমি কিশোর পাশা বলছি, আমেরিকার রকি বিচ থেকে।
জায়গাটা লস অ্যাঞ্জেলেসে, প্রশান্ত মহাসাগরের তীরে,
হলিউড থেকে মাত্র কয়েক মাইল দূরে।
যারা এখনও আমাদের পরিচয় জানো না, তাদের বলছি,
আমরা তিন বন্ধু একটা গোয়েন্দা সংস্থা খুলেছি, নাম:
তিন গোয়েন্দা।

আমি বাংলাদেশী। থাকি চাচা-চাচীর কাছে।
দুই বন্ধুর একজনের নাম মুসা আমান, ব্যায়ামবীর,
আমেরিকান নিগ্রো; অপরজন আইরিশ আমেরিকান,
রবিন মিলফোর্ড, বইয়ের পোকা।
একই ক্লাসে পড়ি আমরা।
পাশা স্যালভিজ ইয়ার্ডে লোহা-লক্কড়ের জঞ্জালের নিচে
পুরনো এক মোবাইল হোম-এ আমাদের হেডকোয়ার্টার।

তিনটি রহস্যের সমাধান করতে চলেছি আমরা-
এসো না, চলে এসো আমাদের দলে!

জীবনে এই প্রথম নতুন স্বাদের কথাবার্তা শুনলাম। মনে হচ্ছিল আসলেই স্বয়ং কিশোর পাশা আমার সাথে কথা বলছে, তার উপর ভালো লাগলো একজন বাঙালি ছেলে বিদেশে বসে আমার সাথে কথা বলছে – এটা ভেবে। যদিও বুঝতে পারিনি কোথায় লস অ্যাঞ্জেলেস, আর কোথায় সেই রকি বীচ; তবে এতটুকু বুঝতে পারছিলাম, জায়গাটা আমেরিকায়। আমেরিকা মানেই আমার কাছে খ্রিষ্টান, অথচ কিশোর, মুসা দুজনই মুসলমান। নিজের সাথে মিলে যাওয়ায় কী যে ভালো লাগলো, বলার মতো নয়। তার উপর ‘রবিন’ নামটা পড়তেই আমার গ্রামের বাল্যবন্ধু রবিনের চেহারা ভেসে উঠলো মনের পর্দায়। ঐ বয়সটাই মনের মধ্যে প্রশ্নে ভরা, তার উপর ‘গোয়েন্দা’, ‘হেডকোয়ার্টার’ – শব্দগুলো যেন আমাকে তিন গোয়েন্দার একজন করে ফেললো। সবচেয়ে বড় মিলটা ছিল, ওরাও কিশোর বয়সী, আমিও কিশোর বয়সী।

সামনে এগিয়ে গেলাম। শিরোনাম লেখা: ভীষণ অরণ্য ১। অনেক কিছুই বুঝতে পারছি না, কিন্তু কী যেন একটা আকর্ষণ আছে… পড়ে যাচ্ছি, পাতার পর পাতা… পড়ে যাচ্ছি… একটা অভিযানে বেরোচ্ছে ছেলেগুলো… ওরাতো আমারই বয়সী… কী দারুণ না ব্যাপারটা! ওরা এই বয়সে আমাজন জঙ্গলে কী মারাত্মক অভিযানে বেরিয়ে যাচ্ছে! পড়ে গেলাম… মাঝে মাঝে শুধু পাশ ফিরে শু’লাম মাত্র… কিন্তু পড়া চলছে ননস্টপ। পাতা উল্টাতে কসরত করতে হচ্ছে, কারণ বাইন্ডিং ছেঁড়া। একটা বিষয় বিরক্তি লাগছে, ছবি নেই কেন? পাঠ্য বইয়ে আমাদের তখন ছবিতে ঠাশা। ছবি ছাড়া বই পড়তে অভ্যস্থ নই মোটেও। ছবিগুলো আমাদের গল্পের মজা বাড়িয়ে দিতো। গল্পে ডুবতে পারতাম। …কিন্তু তিন গোয়েন্দায় দেখা গেলো আমি আরো বেশি ডুবে যাচ্ছি, কারণ ছবি নেই দেখে, আমি আমার মতো করে আমেরিকার আমাজন জঙ্গলের অবস্থা ভাসিয়ে নিচ্ছি মনে। মারাত্মক সব প্রাণীর নাম পড়ছি, দেখিনি জীবনেও (তখন ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের অত জয়জয়কার ছিল না, স্যাটেলাইট টিভিরও তেমন প্রচলন ছিল না), সেসব প্রাণীরও ছবি ভাসছে কল্পনায়, আমার মতো ছবি – আমি সেই জঙ্গলেই হারিয়ে গেলাম যেন। আমাজন জঙ্গলের গহীনে আমিও বিচরণ করতে শুরু করলাম, যেন আমিও ওখানকার মশার কামড় খাচ্ছি, আমিও জাগুয়ারের জন্য ফাঁদ পেতে অপেক্ষা করছি, বোয়া কন্সট্রিক্টর সাপের নার্ভ সেন্টারে চাপ দিয়ে ওটাকে নিস্তেজ করছি …একেবারে বাস্তব জঙ্গুলে স্বাদ বিছানার উপর শুয়ে…। …যারা তিন গোয়েন্দা পড়েছেন, তারা বুঝে ফেলেছেন, তিন গোয়েন্দা সিরিযের অসাধারণ বইগুলোর একটাই পড়েছে আমার হাতে, আর ওটা ছিল তিনটা আলাদা আলাদা বইয়ের একটা ভলিউম বা সংকলন।

বইটা শেষ করে যখন ফেরত দিলাম সজীবকে, তখন চোখ জ্বলজ্বল করছে, চিকচিক করছে এই অসাধারণ অভিজ্ঞতার স্বাদটা নেয়ায়। সজীবকে অসাধারণ একটা বই দেয়ার জন্য ধন্যবাদ দিলাম। সজীব তেমন একটা উত্তেজনা দেখালো না, নিজের গৌরব জাহির করলো না, যেন সে জানেই আমার ভালো লাগবে। আমি হার মানলাম সজীবের দাবির কাছে, আর সেই হারের লজ্জার মাথা খেয়ে সজীবের থেকে একে একে আনতে থাকলাম তিন গোয়েন্দার আরো আরো বই। পাক্কা বই পড়ুয়া হয়ে গেলাম। ছবিহীন পেপারব্যাক নিউজপ্রিন্টে সাদামাটা কালো অক্ষরের উড়োজাহাজে চড়ে ঘুরে আসতে লাগলাম কত নতুন নতুন স্থানে। কত আজব পরিবেশ, সংস্কৃতির মাঝে তিন গোয়েন্দা আমাকে নিয়ে গেলো তার ইয়ত্তা নেই – কখনও গহীন অরণ্যে, কখনও সাগরতলে অক্টোপাসের আঁকশির মধ্যে, কখনও উর্ধ্বাকাশে বেলুনের ঝুড়িতে বসিয়ে, কখনও সাদা বরফে ঢাকা হিমশীতল মেরু কুঁড়েতে – কতনা বিচিত্র অভিজ্ঞতা, একের পর এক, বিছানায় শুয়ে কিংবা বারান্দায় চেয়ারে বসে, কিংবা পড়ার টেবিলে পড়ার বইয়ের তলায় তিন গোয়েন্দা রেখে, কখনও টয়লেটে বিনা প্রয়োজনে কোমডের উপর বসে তিন গোয়েন্দার বই হাতে নিয়ে…।

কিন্তু এইসব অনৈতিক পন্থায় বাবা-মাকে ফাঁকি দিয়ে তিন গোয়েন্দা পড়াও টিকলো না বেশিদিন। তিন গোয়েন্দার বইয়ের পিছনে মাঝে মাঝে আমারই মতো আসক্তদের চিঠি ছাপা হতো। তারাও তাদের এসব অনৈতিক পন্থার কথা জানিয়ে ভালোবাসা জানাতো তিন গোয়েন্দা, লেখক রকিব হাসান আর সেবা প্রকাশনীর সকলকে। কিন্তু ফুলানো-ফাঁপানো ধন্যবাদের পরেও সেবার কর্ণধাররা কিংবা স্বয়ং লেখক উত্তরে এসব অনৈতিক আচরণ ত্যাগ করে ক্লাসের পড়ায় মনোযোগ দিতে বলতেন। আমি শিখতাম, কী করে নিজের ব্যবসায়ের বিজ্ঞাপন না করে নৈতিকতাকে বড় করে দেখতে হয়। এবারে পড়ার অবসরে তিন গোয়েন্দাকে সঙ্গী করলাম।

তিন গোয়েন্দার তিন কিশোর নিজেদের মধ্যে ‘তুমি’ সম্বোধন করে কথা বলে, বড়দের সম্মান করে, অন্যায়কে ঘৃণা করে, সত্যকে প্রতিষ্ঠা করে – এইসব সুশিক্ষাই গ্রথিত হলো, হতে থাকলো মনের গহীনে। ভালোবাসার গল্পের বই ‘তিন গোয়েন্দা’, ঈশপের গল্প ছাড়াই নৈতিকতা শেখালো, আইনের বই ছাড়াই আইনের প্রতি শ্রদ্ধাভাজন করলো, মনের মধ্যে স্কেপ্টিসিয্‌ম (ঘেঁটে দেখার মনোস্পৃহা) ঢুকিয়ে দিয়ে আরো বেশি বাস্তববাদী করে তুললো – যৌক্তিক করে তুললো।

মুসা আমানের ভূতের ভয় আমার গভীর মনে গ্রথিত ভয়কে জাগ্রত করলো, পরক্ষণেই কিশোর পাশার বিজ্ঞানমনষ্ক দৃষ্টিভঙ্গি চুরমার করে দিলো ফালতু ভূতের ভয়কে, বের করে আনলো সাধারণ ভূতুড়ে ঘটনার বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা। রবিন মিলফোর্ড নিয়ে গেলো লাইব্রেরির কোঠায় কোঠায়, ঘুরিয়ে নিয়ে এলো আর্কাইভে। তিন গোয়েন্দা পড়ে পড়ে সেই বয়সেই উপলব্ধি করতাম, আমাদেরও যদি প্রতিটা এলাকায় এলাকাভিত্তিক একেকটা পাঠাগার থাকতো – রামপুরার পাঠাগার, খিলগাঁওয়ের পাঠাগার – যেখানে দেশ-বিদেশের খবরের পাশাপাশি স্থানীয় ঘটনার সংকলন থাকবে।

বইয়ের মধ্যে ছবি থাকতো না বলে, মনের মতো কিশোর পাশা, মুসা আমান আর রবিন মিলফোর্ড বানিয়ে নিতাম, আর ভিত্তি হিসেবে নিতাম বইয়ের রঙিন প্রচ্ছদের কিশোর ছেলেগুলোর ছবি। একবার একটা বইয়ের প্রচ্ছদের এক কিশোরের ছবি স্কেচ করে তুললাম সাদা কাগজে, নিচে লিখলাম: কিশোর পাশা। ছবিটা আর লেখাটা দেখে সজীব জানতে চাইলো, ‘সত্যি’? ওর ঐ অনাকাঙ্ক্ষিত প্রশ্নটা শুনেই আসলে প্রথম উপলব্ধি করলাম, চরিত্রগুলোর চেহারা আমার ফ্যান্টাসি জগতের উপজীব্য। কিন্তু তবু থেমে থাকলো না এই স্পৃহা।

কোচিং ছেড়ে আসার পর সজীবের থেকে আর বই নেয়ার সুযোগ থাকলো না। জুটলো নতুন দোসর – স্কুল বন্ধু – নিঝু। নিঝুর কাছে তিন গোয়েন্দার বিশাল সংগ্রহ – এনে এনে পড়তে থাকলাম।

কিশোরসুলভ উন্মাদনায় সেবা প্রকাশনীর ঠিকানায় রকিব হাসানের কাছে তিন গোয়েন্দার সম্বন্ধে জানতে চেয়ে চিঠি লিখলাম। উত্তরটা যেন বইয়ের পেছনে না ছেপে আমাকে লেখেন তাঁরা, সেজন্য খামের দাম বাবদ ৳২ [দুই টাকা] পাঠিয়ে দিলাম খামের ভিতর পুরে (তখন ডাক বিভাগের দুই টাকা দামের হলুদ খামের প্রচলন ছিল)। মামাতো বোন সোমা আপু, এই পাগলামো দেখেও মানা করলেন না আমায় – যেন এই বয়সের পাগলামিতেও শেখার কিছু আছে।

RDT - আমাদের তিন গোয়েন্দা - ১৯৯৮-৯৯'র দিকে হাতে এঁকেছিলাম। নাকিবের চেহারা হুবহু হয়েছে, নিঝুও মোটামুটি, কিন্তু নিজেকেই আঁকতে পারিনি (অংকন: নিশাচর)
RDT – আমাদের তিন গোয়েন্দা – ১৯৯৮-৯৯’র দিকে হাতে এঁকেছিলাম। নাকিবের চেহারা হুবহু হয়েছে, নিঝুও মোটামুটি, কিন্তু নিজেকেই আঁকতে পারিনি (অংকন: নিশাচর)

তিন গোয়েন্দা যারা পড়েছে, তার একটিবারের জন্যও গোয়েন্দা হয়নি – এ’ আমি বিশ্বাস করবো না। আমরাও হয়েছিলাম। আমরাও ঠিক করেছিলাম, আমাদেরও একটা গোয়েন্দা দল থাকবে। উদ্যোক্তা আমিই। আমিই উদ্যোক্তা, আর আরেকজন হবে কিশোর পাশা – এটা কিভাবে হয়? আমিই কিশোর পাশা। বন্ধু নাকিব আগে মোটাসোটা আর অনেক কালো ছিল, তাই ওকে বানালাম মুসা আমান, আর নিঝুর যেহেতু অনেক বই ছিল, তাই ও’ হলো রবিন মিলফোর্ড। দলের নাম কী? নাম দিলাম: Royal Goyenda Dol। কিছুদিন কাগজে-পত্রে লেখার পরে বুঝলাম, এটা কেমন নাম হলো! ভুলভাল! শুধরে নিয়ে করলাম: Royal Detective Team, সংক্ষেপে RDT। বন্ধুদের মধ্যে RDT’র একটা কুৎসিৎ সুনাম ছিল! মানে কী? মানে হলো, ওরা আরডিটি বলতো আর মুচকি হাসতো – এই পুচকাগুলা নাকি আবার গোয়েন্দা! …আমাদের গোয়েন্দাগিরি কী হতো? পড়তাম মতিঝিল সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ে, যেখানে অন্যান্য সময় শাহজাহানপুরের গুন্ডা-বদমাশগুলো হেরোইন, ফেনসিডিল খেতো। স্কুলপড়ুয়া বদমাশগুলো ইঞ্জেকশন পুশ করে নেশা করতো। আর, আমরা স্কুলের চিপায় চিপায় ঘুরে স্বচ্ছ পলিথিনে সেসব আলামত সংগ্রহ করতাম (এসব আবার শিখেছিলাম তখন বিটিভিতে চলা ভৌতিক গোয়েন্দা-কাহিনী দি এক্স-ফাইল্‌স দেখে)। অবস্থা এমন হতো যে, স্যার যদি কখনও ব্যাগ খুঁজে দেখেন, নিশ্চিত ভাববেন, আমরাই বোধহয় নেশাখোর, সিরিঞ্জ নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি। 🙂

আত্মীয়-স্বজনরা একসাথে হলে সমবয়সী কারো সাথেও একই ঘটনা ঘটতো। যেমন: একপর্যায়ে আমরা পরামর্শক্রমে RDT-তে আমার মামাতো ভাই শাওনকে নতুন সদস্য নিলাম। সে আর আমি রাত-বিরাতে, টর্চ নিয়ে বেরিয়ে পড়তাম। তাই বলে আমরা বাড়ির বাইরে যেতাম না, বিল্ডিং-এর বাউন্ডারির ভিতরেই টর্চ জ্বেলে বিল্ডিং-এর চারপাশে চক্কর দিতাম। মেঝেতে পড়ে থাকা এটা-ওটা কুড়িয়ে নিয়ে তাতে রহস্যের গন্ধ পেতাম। একদিন তো নিচতলার এক বাসিন্দা ‘চোর চোর’ চিৎকার করে দিলো সব ভন্ডুল করে। এরপর থেকে আর ভুলেও এই কাজ করিনি। সেকথা মনে হতেই এখন আমার মুখের হাসি একান-ওকান হয়ে গেছে। 😀

RDT’র সদস্যদের প্রত্যেকের আলাদা প্রোফাইল ছিল (সেগুলো এখনও আমার কাছে আছে), সেগুলোতে গোয়েন্দাদের উভয় হাতের ছাপ নেয়া ছিল। হাতের ছাপ নিতে গিয়ে স্ট্যাম্প প্যাডের কালি পুরো হাতে মাখাতে হয়েছিল। ছাপ দেয়ার পর হাত ধুয়েও তা আর তুলতে পারি না আমরা। সারাদিন এই অবস্থায় ক্লাস করাটা রীতিমতো দুঃসহ ছিল। এখন সেকথা মনে পড়ে দমকে দমকে হাসি পাচ্ছে কেবল। 🙂

তিন গোয়েন্দার কার্ড ছিল, আমাদেরও থাকতে হবে। তিন গোয়েন্দার কার্ডে তিনটা প্রশ্নবোধক চিহ্ন ছিল (???), আমাদের কার্ডে সেটা থাকলে তো নকল হয়ে গেল, আমরা তাই আশ্চর্য্যবোধক চিহ্ন (!!!) বসালাম আমাদের কার্ডে। কিন্তু আমাদেরতো আর জঞ্জালের ভিতরে পাওয়া মিনি ছাপাখানা ছিল না, তাই শক্ত সাদা কাগজকে কেটে তা দিয়ে কার্ড বানাতাম। এক্স-ফাইল্‌স দেখে আইডি কার্ড বানানোর ইচ্ছা হলো: আমি টেলিফোন কার্ড জমাতাম, সেখান থেকে কয়েকটা নিয়ে ঘষে রং তুলে তাতে ব্লেড দিয়ে খুঁচিয়ে লিখতাম। তারপর কলম দিয়ে গর্তের মধ্যে কালি ঢুকিয়ে কার্ড বানিয়ে দেখতাম, একটা ছাইপাশ হয়েছে, ছুড়ে ফেলে দিতাম। সবই এখন সুখস্মৃতি।

তিন গোয়েন্দার থেকে দারুণ একটা কৌশল শিখেছিলাম: ভূত-থেকে-ভূতে। যখনই তিন গোয়েন্দা কোনো কিছুর সন্ধান পেত না, তারা এই কৌশল কাজে লাগিয়ে সন্ধান বের করে ফেলতো। কৌশলটা হচ্ছে, যার খোঁজ চাইছে ওরা, তার বিবরণ জানিয়ে কিশোর ফোন করতো একজন বন্ধুকে। সেই বন্ধু নিজে খোঁজ রাখার পাশাপাশি কথাটা জানিয়ে দিতো তার দুজন বন্ধুকে। তারা দুজনে প্রত্যেকে জানাতো আরো দুজন, দুজন, চারজনকে… এভাবে ক্রমাগত সংখ্যাটা বেড়ে যেত এবং অনেকগুলো ইন্দ্রিয় সক্রীয় হয়ে ঐ বিষয়টার খোঁজ নিতে শুরু করতো – পালিয়ে আর যাবে কোথা? খোঁজ মিলে যেত। এখন আমরা ফেসবুকে বন্ধু থেকে বন্ধুতে শেয়ার করে তথ্যগুলো এভাবেই জ্যামিতিক হারে ছড়িয়ে থাকি কিন্তু।

তিন গোয়েন্দার অনেক বই পড়েছি, সব কাহিনী মনে নেই। তবে কয়েকটা গল্প আজীবনেও ভুলবো না: ভীষণ অরণ্য ১, ২ (আমাজন জঙ্গলের অভিজ্ঞতা), জলদস্যুর দ্বীপ ১, ২ (গুপ্তধন সন্ধানের ইতিকথা), অথৈ সাগর ১, ২ (নির্জন দ্বীপে আটকে পড়ে বেঁচে থাকার অভিজ্ঞতা), তিন গোয়েন্দা (তিন গোয়েন্দার প্রথম বই), কাকাতুয়া রহস্য (কাকাতুয়ার মধ্যে লুকিয়ে থাকা ধাঁধার সমাধান), পোচার (জন্তু পাচার আর আদিবাসী আচারের অভিজ্ঞতা) – এরকম আরো বহু বহু… কাহিনী মনে আছে, নাম মনে নেই।

তিন গোয়েন্দা সম্বন্ধে অনেকেই ভুল জানতেন, মাসুদ রানার সাথে গুলিয়ে অনেকেই সেবার সব পেপারব্যাক বইকে এক কাতারে ফেলতেন – বলতেন এগুলো নষ্ট করার জিনিস। দুবাই ভ্রমণে যাবার সময় তিনটা বই কিনে নিয়ে গিয়েছিলাম, সেখানকার এক চাচা আমাকে সরাসরি মানা করে দিলেন, এসব বই পড়ো না। আমি তখন তিন গোয়েন্দার ‘পোচার’ পড়ছিলাম। আমার একটা অভ্যাস ছিল, যখনই নতুন তথ্য জানতাম, একটা ডায়রিতে তা লিখে রাখতাম। পোচারে অনেক নতুন তথ্য ছিল, আব্বার থেকে একটা কাগজ নিয়ে সেটাতে লিখে রেখেছিলাম: অ্যাকোক্যানথেরা গাছের বিষ আদিবাসীরা ব্যবহার করে শিকার করতে… ইত্যাদি। কাগজটা চাচার হাতে দিয়ে দাবি করলাম, এতো কিছু যদি জানতে পারি একটা বই থেকে, কেন পড়বো না। সে-ই প্রথম হয়তো, আমি প্রমাণসহকারে দাবি জানানো শিখতে শুরু করেছিলাম। চাচাও তিন গোয়েন্দার দুষ্ট প্রভাবের বিষয়টা ভুলে যেতে বাধ্য হলেন।

তবে শামসুদ্দিন নওয়াব তিন গোয়েন্দা ধরার পর থেকে আর তিন গোয়েন্দা পড়া হয়নি – হয়তো বড় হয়ে গেছি তাই, কিংবা হয়তো রকিব হাসানের জন্য মায়া হয়ে গেছে তাই – কিংবা কেন, জানি না। বড় হয়ে জেনেছি, তিন গোয়েন্দা আসলে বিদেশী গল্পের ভাবানুবাদ, যাতে রকিব হাসান, শামসুদ্দিন নওয়াব আসলে তিন গোয়েন্দার যে ইমেজ তৈরি হয়েছে, সেটাকে বসিয়ে আমাদের পঠন-উপযোগী করতেন। যেটাই হোক, ছাই হোক আর ধুলা হোক, তা যে জমাট বেঁধে আমাদের জন্য মহিরূহ তৈরি করেছে – একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়।

তিন গোয়েন্দার সেই ভালোবাসা ভুলিনি আজও। তাইতো উইকিপিডিয়ার তিন গোয়েন্দা নিবন্ধকে অনেকটা গুছিয়েছিলাম আমি। তানভির রহমান আমাকে সহায়তা করেছিলেন এর উল্লেখযোগ্যতা প্রমাণ করে।

সজীবকে আর দেখি না অনেক বছর হয়ে গেছে। দশম শ্রেণী পার করে আসার পর সজীবকে আর দেখি না। কিন্তু আজও আমি সেই বন্ধুটিকে ধন্যবাদ দিতে কুণ্ঠিত হই না। কারণ যে অভিজ্ঞতাগুলো সে আমায় দিয়েছে ঘরের মধ্যে শুইয়ে, আমার বয়সী অনেক কিশোরও এমনকি বয়স্কজনও তা অর্জন করতে পারেননি আজীবনেও। আল্লাহ সজীবকে সুস্থ রাখুন, পৃথিবীর মানুষের জন্য সুপথপ্রদর্শক করুন, এবং তাঁর প্রতি রাজি-খুশি থাকুন।

-মঈনুল ইসলাম

(২৬ জুন ২০০৯-এর ডায়রি অবলম্বনে পুণর্লিখিত…)

___________________________________

বাড়তি পঠন:

মন্তব্য করুন