সার্ভাইভাল অভিজ্ঞতা: তরু-কুটিরে আমরা ক’জন সৌখিন সার্ভাইভার

বর্ষাবনে বৃষ্টিতে ভিজে কোনোরকমে একটা মাথা গোঁজার স্থান করেছেন বিয়ার গ্রিল্‌স^। এবার আগুন ধরাতে হবে। গাছের ভিতরের ছাল, আর হালকা-ভেজা কাঠ দিয়েই কিভাবে যেন আগুন ধরিয়েও ফেললেন তিনি। ব্যস, এইমাত্র ধরা খরগোশটাকে পুড়িয়ে খাবার পালা – ম্যান ভার্সেস ওয়াইল্ড টিভি অনুষ্ঠানটির এই দৃশ্যটি বাস্তব(?)। কিন্তু দ্ব্যর্থহীন বাস্তব হচ্ছে আমাদের নিজস্ব তরু-কুটিরে বসে তাজা মাছ পুড়িয়ে খাওয়া। …এমনই সহজ? দেখা যাক?

১৬ আগস্ট ২০১২ যখন নতুন ট্রেন কালনীতে করে গ্রামের বাড়ি যাচ্ছিলাম ঈদ-উল-ফিতর পালন করতে, তখন খুবই বুঝতে পারছিলাম যে, এবারের ঈদটি হবে মনে রাখবার মতো। কিন্তু ভাবিনি, তা সত্যিই হবে। এবারের ঈদের বিশেষত্ব ছিল অনেক: চাচা লন্ডন থেকে এসেছেন, ফুফু দশ বছর পর আমেরিকা থেকে এসেছেন, আমার প্রবাসী বাবাও সাথে আছেন – সুতরাং এবারের ঈদে আনন্দের সীমা থাকবে না।

আমার গ্রামের বাড়ি সিলেটের মৌলভীবাজারের বড়লেখায় (বিস্তারিত পাবেন এখানে)। বাড়িতে যাবার পরপরই আমার সঙ্গী হলো বাড়িতে থাকা চাচাতো ভাই [এইচএসসি পড়ুয়া] আমজদ, [স্কুল পড়ুয়া] আশফাক, আর বেড়াতে আসা ফুফাতো ভাই [স্কুল পড়ুয়া] রাফি। বাকিরা কেউ বয়সে বেশ ছোট, আর অন্যান্য কাযিনরা তখনও এসে পৌঁছায়নি। বাড়িতে ঘুরছি-ফিরছি, নীরবতা খুঁজে বেড়াচ্ছি, কারণ প্রকৃতির মাঝে নীরবতাটা আমি বেশি পছন্দ করি; এমন সময় আমজদ এগিয়ে এলো পুকুর পাড়ে। আমাদের পুকুরের পশ্চিম পাড়ের একটা জায়গা দেখিয়ে জানালো, বিদেশ ফেরত চাচা এই জায়গাটা পরিষ্কার করে রেখেছিলেন মাঁচা বানানোর জন্য।

ব্যস, আর যায় কই? রোজা রেখেই সেদিন দুজনে কাজে লেগে গেলাম, ঠিক করলাম আমরাই একটা মাঁচা বানিয়ে ফেলবো জায়গাটায়। আমার মনে যেখানে বিয়ার গ্রিল্‌স-এর সার্ভাইভাল টেকনিক কাজ করছে, সেখানে আমজদের মনে যে খেলাঘর বানানোর নেশা চেপেছে সে আর কিছু না, বয়সের দোষ! 🙂

খেলাঘরচ্ছলে তরু-কুটির

বাড়ির এক জায়গায় কয়েকটা বাঁশ কেটে রাখা হয়েছে, ব্যস দা নিয়ে দুজনে লেগে গেলাম ওখান থেকে প্রয়োজনীয় বাঁশ কেটে নেবার জন্য। আমাদের নির্ধারিত জায়গাটার চারপাশে চারটা সুপারি গাছ। উপকরণ যা যা লাগবে বলে স্থির করা গেল:

  • বাঁশ (মাঁচার জন্য)
  • সুতলি আর স্টিলের তার (বাঁধার জন্য)
  • দা (বাঁশ ও অন্যান্য বস্তু কাটার জন্য)

বাঁশ কাটতে গিয়ে বুঝলাম অনভ্যস্ততায় বিষয়টা খুব একটা সহজ কিংবা সুখকর না। আমি দা খারাপ চালাই না, কিন্তু দীর্ঘদিনের অনভ্যাসে নিশানা আর হাতে জং ধরেছে বেশ, এদিকে বাঁশগুলোও বুড়ো, তাই বেশ শক্ত। তার উপর রোজা রেখে কাজটা সহজেই হাঁপিয়ে উঠার মতো। বাঁশগুলোকে প্রথমে প্রয়োজনীয় আকারে কেঁটে নিতে হবে, তারপর দুটো আস্ত বাঁশ রেখে বাকিগুলোকে মাঝখান দিয়ে চিরে আধফালি করতে হবে। আরেকটা ছোট কাজ হলো আধফালি করা বাঁশগুলো আবার চেঁছে পরিষ্কার করতে হবে, কারণ ওগুলো দিয়ে বসার স্থান বানানো হবে, সেখানে ধারালো কিছু থাকলে কাপড় ছিঁড়তে পারে। একেকটা বাঁশ আধফালি করতে বেশ পরিশ্রম হচ্ছে, যেখানে আমিই হাঁপাচ্ছি, সেখানে বয়সে ছোট আমজদ যে ক্লান্ত হবে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না, এখানে বিয়ার গ্রিল্‌স একা নন, দুজন বিয়ার গ্রিল্‌স একত্রে কাজ করছে।

এই কাজে আমাদের একটা অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য হলো: আমরা যথাসম্ভব অকেজো আর ফেলনা জিনিস ব্যবহার করবো। তাই বাঁশের মধ্যে এমন বাঁশ বেছে নিয়েছি, যেটা দিয়ে বেড়া দেয়ার মতো কোনো কাজও করা যাবে না— আঁকাবাঁকা বাঁশ। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে, ইফতারের সময় সমাগত বলে বাঁশ কাঁটা-চেরা ওখানে রেখে সেদিনের মতো কাজে ইস্তফা দিয়ে পরদিন আবার শুরু করলাম দুজনে। আমজদ ছোট হলে কী হবে, ওর পরিশ্রম করার ধাঁত অন্যরকম।

tree-house plan
আমাদের তরু-কুটিরের পরিকল্পনাটা ছিল এমন (নকশা: লেখক)

কাঁটা বাঁশগুলো নিয়ে আমরা যথাস্থানে গিয়ে হাকালুকি হাওরকে সামনে রেখে ডানে আর বামে দুটো বাঁশ বাঁধলাম সুতলি দিয়ে। তার উপর ফালি করা বাঁশগুলো বসালাম পেছন দিকে। বেশি বাঁশ হলে মাচাটা সম্পূর্ণ করা যেত, কিন্তু ফেলনা জিনিস অগণিত থাকে না। তাই দুজনে ঠিক করলাম পেছন দিকে হেলান দিয়ে বসার মতো একটা স্থান বানিয়ে সামনের দিকে দুটো বাঁশ দিব পা উচিয়ে রাখার জন্য। দলে যোগ দিয়েছে আশফাক আর রাফিও।

মাচাটা এভাবে বানিয়ে বুঝতে পারলাম, সামান্য সুতলির উপর এতো ওজন ঠিক জুৎসই হবে না। তাই ঠিক করা হলো তার দিয়ে বাঁধা হবে আড়াআড়ি বাঁশগুলো, আর বাড়তি চাপ রাখার জন্য সেগুলোকে বাঁশ দিয়েও নিচ থেকে ঠেক দেয়া হবে। এজন্য বাড়তি বাঁশ নষ্ট না করে কর্তিত ছোট বাঁশগুলো দিয়েই কাজটা সারার জন্য, যেখানে দরকার প্রয়োজনে ইট দিয়ে উচ্চতাজনিত ঘাঁটতি পুষিয়ে নেয়া হলো। কিন্তু বসার জায়গাটা হয়ে পড়লো বেশি ছোট, তাই শেষ পর্যন্ত বাঁশঝাড় থেকে একটা কচি বাঁশ কেটে আনা ছাড়া গত্যান্তর ছিল না। তবে সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহারের কথাটা মাথায় ছিল সব সময়ই।

ব্যস, বসার মাঁচাটা হয়ে যাওয়ায় খুব তৃপ্তি ভরে তাকালাম ওটার দিকে। কিন্তু বসতে গেলে একটু আয়েশও দরকার, তাই হেলান দেবার জন্য পিঠের জায়গায় যোগ করা হলো আরেক ফালি বাঁশ। এবার বেশ পূর্ণাঙ্গ লাগছে। একটু বসে উদ্বোধন করার লোভ সামলাতে পারলো না আশফাক। সে-ই উদ্বোধন করলো আমাদের তরু-কুটির।

কিন্তু আমার মাথায় কাজ করছিল সার্ভাইভাল প্রস্তুতি, তাই ঠিক করলাম এই মাঁচার উপর একটা ছাউনি দিতে হবে প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে, তাই আজকের মতোও কাজে নিবৃত্তি দিলাম। কিন্তু রাতে যখন জানতে পারলাম, কালকে ঈদ হচ্ছে না, তখন আমরা নতুন পরিকল্পনা করলাম। চুপিচুপি রাতেই, একটা এলইডি টেবিল-ল্যাম্প নিয়ে চলে এলাম তরু-কুটিরে। দিনের বেলা কেটে রাখা কঞ্চিগুলো কুড়িয়ে এনে ছাউনির কাজে হাত দিলাম। শুধু আমজদ আর রাফিকে নিয়ে কাজটা শুরু করলেও কিভাবে যেন আশফাকও বাতাসে গন্ধ শুঁকে চলে এলো অকুস্থলে।

চারজনে মিলে টর্চ আর এলইডি ল্যাম্পের আলোয় বুনতে থাকলাম আমাদের মাঁচার উপরের চালা। দুরন্ত আশফাক তার কুশলী বুদ্ধি দিয়ে উপরের বাঁশগুলো এমনভাবে বুনলো, যাতে আড়াআড়ি বাশগুলোতে কাপড়ের সুতার মতো করে বুনন তৈরি হয়। চালের কাঠামো দাঁড়িয়ে গেলে আমরা শেষ তারাবি’র নামায পড়ার জন্য কাজ বন্ধ রাখলাম।

পরদিন সকালে শেষ রোযা রেখে আবার কাজে ফিরলাম। চালে সাধারণ লতাপাতার বদলে বিশাল বিশাল কচু পাতা দেবার প্রস্তাব করলো আমজদ। প্রস্তাব অনুযায়ী কচু পাতা কেটে এনে সেগুলো দিয়ে নিচের আস্তরণ দিয়ে আশফাকের কেটে আনা কলা পাতা দিয়ে উপরের আস্তরণ দেয়া হলো। আর সবচেয়ে উপরের আস্তরণ দেয়া হলো সুপারি পাতা দিয়ে।

ঘরটা সম্পূর্ণ হয়ে গেলে প্রয়োজনীয় অন্যান্য নিরাপত্তার দিকগুলো পরীক্ষা করে দেখা হলো, যাতে কেউ বসলে দুর্ঘটনা না ঘটে। ব্যস, সম্পূর্ণ বিয়ার গ্রিল্‌স কায়দায় না হলেও আমাদের তরু-কুটির সম্পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় সবাই-ই বেশ তৃপ্ত হলাম। ঈদে, সব কাযিনরা একত্র হলে খুব মজা করা যাবে এখানে…।

কিন্তু দেখা গেল, বিকেলে এই জায়গাটা আমারই বড্ড দরকার হয়ে পড়লো। শান্ত-নীরব প্রকৃতির মাঝে একটু সময় কাটিয়ে দেয়ার জন্য এর চেয়ে ভালো জায়গা আর কোথায় হতে পারে? গিয়ে বসলাম আরাম করে হেলান দিয়ে। বসার জায়গায় কোনো গদি নেই, কিন্তু অনেকগুলো এবড়ো-খেবড়ো বাঁশ হওয়াসত্ত্বেয় সবগুলো মিলে বসার জায়গাটা আরামপ্রদই হয়েছে। হেলান দিয়ে বসে যখন সামনের হাকালুকি হাওড়ের দিকে দৃষ্টি দিলাম, তখন অস্তমিত সূর্য আর মিষ্টি বাতাস এসে আমায় স্বাগত জানালো। শান্তিতে চোখটা বুজে আসতে চাইলেও দৃষ্টি মেলে রাখলাম এই আকাঙ্ক্ষিত দৃশ্যটা অক্ষিপটে ধরে রাখতে।

আমার শান্তিময় এই ধ্যানী আবহ বেশিক্ষণ থাকলো না, কারণ দুরন্ত বাহিনীর সবাই-ই একে একে হাজির হতে থাকলো: ধ্যানী-তান্ত্রিক আবহ কোলাহলে পর্যবসিত হলো। অগত্যা আমিই ঐ স্থান পরিত্যাগ করলাম।

ঈদে, সবাই এলো, সবাই-ই। বাড়িতে আনন্দের শেষ নেই। সময় যে কোনদিকে পার হচ্ছে, তার হিসাব নেই। সারাদিনই আনন্দ: ফুটবল, ক্রিকেট, ক্যারাম, লুডু, হ্যান্ডবল, রস-কষ-সিঙ্গাড়া-বুলবুল, চোর-ডাকাত-পুলিশ ইত্যাদি যাবতীয় ইনডোর-আউটডোর খেলা চলছে একটার পর একটা। বৃষ্টিও আমাদের গুড়ে বালি দিতে পারেনি, কাদা মাড়িয়ে কাদা-ফুটবল, কিংবা কাদা-হ্যান্ডবল, আর বৃষ্টি ছাপিয়ে পুকুরে সাঁতার।

কিন্তু এর ফাঁকেই আমি নিয়মিত, সুযোগ করে যেতে লাগলাম আমার এই প্রিয় জায়গাটায়। নিভৃতে বসে প্রকৃতি দর্শনের সুযোগ কি আর ছাড়া যায়? এবার আমার দলে যোগ দিয়েছে ফুফাতো ভাই শাকির। দুজনে মিলে বৃষ্টি সমাগত মুহূর্তে যখন আমাদের তরু-কুটিরে হাজির হলাম, আশফাকও বাতাসে গন্ধ শুঁকে শুঁকে হাজির হয়ে গেল। তিনজন যখন বসে আসি, বাতাস তখন যেন আমাদেরকে উড়িয়ে নিয়ে যাবে। আকাশে মেঘ জমেছে গাঢ় কালো হয়ে। কিছুক্ষণের মধ্যেই নামবে বৃষ্টি। আর সেই অধরা মুহূর্তে সাক্ষী হয়ে থাকতে চাই আমরা তিনজনই।

আমাদেরকে নিরাস করলো না বৃষ্টি। প্রচন্ড বাতাসের সাথে ঝরঝর করে বৃষ্টি ঝরলো। না, বৃষ্টির আওয়াজটা এখানে ঝমঝম না, কারণ এটা হুমায়ূন আহমেদের বৃষ্টিবিলাসের টিনের ছাউনি না, বরং সুপারি পাতা আর কলাপাতার উপর পড়া অঝোর ধারার বৃষ্টি। বৃষ্টি ছিটকে এসে গায়ে পড়লেও ভিতরে বৃষ্টি আসছে না দেখে বেশ লাগলো আমাদের- আমাদের দেয়া চালটা কাজে এসেছে। ঠান্ডা বাতাসে শীত লাগতে লাগলো আমাদের, তিনজনে জড়াজড়ি করে জবুথুবু হয়ে বসে থাকা ছাড়া উপায় ছিল না।

ঈদের পরদিন: ২০ আগস্ট ২০১২, সোমবার

বাড়ি ভর্তি সব কাযিন। সন্ধ্যার পরে অন্ধকারে আমরা ক’জন চুপিচুপি গিয়ে বসে থাকলাম তরু-কুটিরে। এই ‘চুপিচুপি’র কারণ হলো, এতটুকু এতটুকু বল্টুগুলোও আমাদেরকে অনুসরণ করে চলে আসে ঐ চিপায়; পরে অঘটন ঘটলে দোষ পড়বে আমাদের ঘাঢ়ে। কিন্তু যেভাবেই আসি না কেন, আশফাককে ফাঁকি দেয়া এবাড়ির কারো কম্ম নয়, বাতাসে উড়ে বেড়ানো গন্ধ সে কিভাবে যেন টের পেয়ে যায়।

তরু-কুটিরে বসে বসে আমার আইফোনে সার্ভাইভাল গাইডটা কাযিনদের দেখাচ্ছিলাম। কিভাবে জঙ্গলে ঘর বানাতে হয়, কিভাবে আগুন জ্বালাতে হয়; বলছিলাম কিভাবে বিয়ার গ্রিল্‌স পোকা খায়, কিভাবে কাচা মাছ খেয়ে ফেলে… সবাই এসবে ঘেন্না প্রকাশ করতো, কিন্তু আমার বলার মধ্যেই সুস্বাদু একটা ব্যাপার ছিল বলে তাদেরও বোধহয় মনে হলো, একবার খেয়ে দেখা যায়…

…হ্যা, পোকা না হোক, মাছ তো খেয়ে দেখাই যায়…

রাত ১টা

বাড়ির সব বল্টু-বাল্টুকে ঘুম পাড়িয়ে সজাগ আমরা ক’জন: আমি, [ভার্সিটি পড়ুয়া] ফুফাতো ভাই শাকির, [অনার্স পড়ুয়া] নাসিম, [আমেরিকাবাসী] আবির, রাফি; চাচাতো ভাই [হাফিজে ক্বোরআন] আকবর আর আশফাক। আমাদের রাত্রে বহিঃযাপনে পূর্ণ সমর্থন আমাদের যুক্তরাজ্য-প্রবাসী চাচার। তাই বাকি বড়রা আর কেউ আপত্তি করলেন না। একটা দরজা বাইরে থেকে তালা দিয়ে আমরা বেরিয়ে পড়লাম। আমাদের বেসক্যাম্প হলো আমাদের তরু-কুটির। আর সঙ্গে সরঞ্জামাদি:

  • দুটো ভালো মানের টর্চলাইট, আরো কিছু নিম্নমানের মোবাইল টর্চ
  • মাছ ধরার জন্য দুটো কুচা
  • কাঠের বাটের একটা ধারালো ছুরি
  • আগুন ধরানোর জন্য একটা গ্যাস লাইটার, আর
  • উদ্যমী কিছু সাহসী, কুশলী মন

আমাদের মধ্যে আমেরিকা-ফেরত আবির থাকায় আমাদেরকে একটু কুশলী হতে হলো: ও-বেচারাকে মশা কামড়ালে যা-তা অবস্থা হয়ে যায় বলে ওকে আমার ওডোমস ক্রিম দিলাম, যাতে গায়ে মেখে বসে থাকতে পারে। ওকে কোনো পরিশ্রম করতে নিচ্ছি না আমরা, ও’ আমাদের সাথে শুধু আনন্দই করবে।

আমরা দুই দলে ভাগ হলাম: এক দলে আমি, নাসিম আর রাফি- আমাদের দলপতি স্কুল পড়ুয়া রাফি; অন্য দলে শাকির আর আশফাক- দলপতি স্কুল পড়ুয়া আশফাক। আবির আর আকবরকে রেখে গেলাম আমাদের বেস ক্যাম্প তরু-কুটিরে। আমাদের লক্ষ্য হলো, সামনেরই হাঁটুর-নিচ-সমান জলমগ্ন জমিগুলোতে অন্ধকারে অভিযান চালিয়ে মাছ ধরা। বাড়িতে এসে এরই মাঝে এক রাতে আমি আর রাফি এই অভিযান করেও ছিলাম বলে কাজটা আমাদের দুজনের জন্য একটু সহজই হলো।

মাছ ধরতে রওয়ানা দিয়ে মনে পড়লো, মাছগুলো রাখার জন্য আমরা কোনো ব্যাগ আনিনি। তাই আমি, শাকিরের মিনিয়েচার মোবাইল ফোনের (bPhone) টর্চ নিয়ে আবার ব্যাসক্যাম্পে ফিরলাম। একটা ব্যাগ লাগবে। নাহ্‌! প্লাস্টিকের ব্যাগ আনা চলবে না, একজন প্রকৃত সার্ভাইভার প্লাস্টিকের ব্যাগ পায় না। তাই একটা ব্যাগ বানাতে হবে প্রাকৃতিক উপাদান দিয়েই।

সুপারি গাছের খোল আমরা এনে রেখেছিলাম কুটির তৈরির সময়। ওখান থেকে একটা তুলে নিলাম। দেখি এখানে ওখানে আবাস গেড়েছে “হেনোস্‌ ’খাওরা” (দেখতে পিচ্ছিল, সাদা, আপাতদৃষ্টিতে কোনো নাক-চোখ-মুখ দেখা যায় না এমন প্রাণী; স্যাঁতস্যাতে জায়গায় এদের আবাস; নাকের সর্দির (হেনোস্‌) সাথে মিল দেখে সিলেটিরা সিলেটি ভাষায় একে এই নামে ডাকেন)। একটা কাঠি দিয়ে হেনোস ’খাওরা ফেলে দিয়ে খোলটা মাঝ বরাবর ভাঁজ করে নিলাম, এতে খোলটার একপাশ, ঘুরে আরেক পাশে এসে ঠেকলো। এবারে, কুটির বানাবার জন্য এনে রাখা কচি বাঁশ থেকে পাতলা করে ছাল ছাড়িয়ে নিলাম ছুরি দিয়ে। বাঁশ থেকে এভাবেই ছাল ছাড়িয়ে বাঁশের বেত বানানো হয়। তবে বেত যতটা পাতলা করে বানানো হয়, এখানে ততটা পাতলা করলাম না, একটু শক্ত আর মোটা করে ছিললাম, যাতে তা একাধারে সুঁই এবং সুতার কাজ করে। এবারে খোলের পাশ দুটো একত্র করে এক জায়গায় ছুরি দিয়ে খোঁচা দিয়ে ছিদ্র করলাম। তার ভিতর দিয়ে ঢুকিয়ে দিলাম এই বাঁশের তৈরি সুঁই-সুতা। একটু উপরে আরেকটা ছিদ্র করে অনুরূপভাবে ঘুরিয়ে আনলাম সুঁই-সুতা। এভাবে একটা বেত দিয়ে এক পাশ, আরেকটা বেত দিয়ে আরেক পাশ সেলাই করে নিতেই চমৎকার প্রাকৃতিক খলই (মাছ রাখার ঝুড়ি) হয়ে গেল খোলটি। নিজের কম্ম দেখে নিজেরই হিংসা লাগলো।

খুশি মনে খোলটা নিয়ে গেলাম আমাদের দলের কাছে। ইতোমধ্যেই রাফি দুটো মাছ কুচা দিয়ে ধরাশায়ী করে ফেলেছে। নাসিমের হাত থেকে সেগুলোকে পুরলাম আমার ইমপ্রোভাইস্‌ড খলই-এ। কাদাপানির মধ্যে একটা টর্চ একহাতে নিয়ে আরেক হাতে কুচা ধরে সামনে হাঁটছে রাফি, পিছনে আমি আর নাসিম। মাছ ধরতে গেলে পানিতে পা ফেলার বিশেষ কসরত আছে- শব্দ না করে পা ফেলতে হলে পায়ের পাতা কাত করে আড়াআড়ি করে নিতে হয়, তারপর আস্তে করে পা ঢুকিয়ে দিতে হয় পানির ভিতরে, প্রায় নিঃশব্দে পানিতে চলে যাওয়া পায়ে ভর করে পেছনের পা এগুতে হয়। একটা মাছ দেখতে পেয়ে সাঁই করে কুচা ফেললো রাফি, কুচার লোহার শান দেয়া শলাকাগুলোতে মাছটা আটকালো কিনা দেখতে ঐখানকার ঘোলা পানিতে হাত দিতে হয়। তারপর কুচার নিচের ময়লা ধীরে ধীরে পরিষ্কার করে মাছের অস্তিত্ব আন্দাজ করতে হয়। মাছ ধরা পড়লে, সেটাকে শক্ত করে ধরে রেখে কুচাটা পানির উপর তুলে আনা হয়, তারপর শলাকা থেকে মাছ ছাড়িয়ে খলইয়ে।

বয়সে কালকের পিচ্চি হলেও রাফির মাছ ধরার বিস্তর অভিজ্ঞতা আছে। গতদিন আমি ওর সাথে ছিলাম বলে ওকে আমার চেনা হয়ে গেছে। এগিয়ে গিয়ে পানির নিচে উজ্জল টর্চের সরাসরি আলোয় মাছটা দেখে প্রথমে, দেখেই কুচা চালায় না, ওটাকে ওখানে রেখে আশে পাশে টর্চের আলো ফেলে দেখে আশেপাশে এরচেয়ে ভালো কোনোটা দেখা যাচ্ছে কিনা, না থাকলে কুচা পড়ে ঐ ভাগ্যাহতের উপর। কুচা ফেললেই সবসময় মাছ ধরা পড়ে না, ধরা পড়েছে কিনা, সেটা খুব দ্রুত আঁচ করে ফেলে আশেপাশে মাছের নড়াচড়া হলো কিনা দেখে। যদি দেখে কুচার নিচ থেকে মাছটা লাফ দিয়ে কাছেই কোথাও নড়ছে, তাহলে কোপটা দিয়েই আবার চোখের পলকে কুচাটা তুলে নড়তে-থাকা-পানিতে ইশারায় কোপ মারে। কখনও সফল হয়, কখনও হয় না।

মাছ যেখানে, সেখানে সাপ থাকবেই। মাছ ধরতে গিয়ে গতদিনও আমাদের পাশে ছিল সাপ। সাপ দেখে রাফি জাতও চিনে, কোনটা ধুড়া, আর কোনটা বুড়া বেশ চেনে সে। ধুড়া সাপ নির্বিষ, কিন্তু বুড়ার বিষ মারাত্মক। গতদিন আমরা দেখেছিলাম একটা ধুড়া সাপ। আজও দেখলাম একটা। আমার কাছে সেটা গা সওয়া হয়ে এলেও নাসিমের কাছে ব্যাপারটা নতুন। রাফি সাপ দেখলে মোটেও বিচলিত হয় না। সাপকে তার জায়গায় রেখে সে তার গন্তব্যে চলতে থাকে। আমার অস্বস্থি লাগে, যদি সাপটা পিছু নেয়? রাফি দ্বিতীয়বার টর্চও মারে না ওর গায়ে। চুপচাপ পাশ কাটিয়ে চলে যায়। কিন্তু একটু সামনে ডানদিকে যখন একটা বুড়া সাপ দেখলাম, তখন ভয় খানিকটা পেলাম আমি ঠিকই। কিন্তু রাফির সাথের গতরাতের অভিজ্ঞতা আমায় সাহস যোগালো। রাফি, একজন পাক্কা শিকারীর মতোই অনেক কুসংস্কারে বিশ্বাস করে। সে বিশ্বাস করে, সাপ দেখলে তাদের নাম জপ করতে নেই। কথায় কথায় ‘সাপ’ ‘সাপ’ উচ্চারণ করলে নাকি সাপের দল ঘিরে ফেলে। কুসংস্কার হলে হতেও পারে, কিন্তু আমি কুসংস্কারকে ধুর্‌ বলে উড়িয়ে দেই না; পাক্কা শিকারি জিম করবেটও বনের ভিতরে বনদেবীকে বিশ্বাস করতেন।

একপাশে নির্বিষ ধুড়া আরেকপাশে বিষাক্ত বুড়া রেখে অস্বস্থি হলেও চুপিচুপি অভিজ্ঞ রাফিকে অনুসরণ করলাম আমি আর নাসিম। আশফাক আর শাকিরও কাছাকাছি বলে আমরা এবারে একটু দূরে, নির্জনে মাছ ধরার জন্য গেলাম। সেখানে কাদার পরিমাণ একটু বেশিই। প্রায় হাঁটু অবধি ডুবে যাচ্ছে পা। তবে সেখানে কচুরিপানার নিচে মাছের দেখা পাওয়া গেল। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা টের পেলাম, স্যাঁতস্যাতে পানির আতঙ্ক ‘জোঁকের’ আনাগোনা। রাফির মতো তুখোড় পাবলিকের পায়ে দুইটা জোঁক ধরেছে। নাসিমের পায়ে আরো দুইটা। আমার পায়ে একটা মাত্র উঠছে। নাহ্‌! এখানে বেশিক্ষণ থাকা নিরাপদ না। ভালো করে জোঁক আর কোথাও আছে কিনা দেখে সরতে লাগলাম এখান থেকে। তবে মাছ মারতে মারতেই চললাম আমরা।

আশফাকদের দলের মধ্যে আশফাক খুব বেশি ডেয়ারিং। কিন্তু সঙ্গী শাকির আবার বেশ শহুরে। তাই শাকির ফিরে গেল বেসক্যাম্পে, আশফাকের সঙ্গী হলো নাসিম। প্রায় ঘন্টাখানেক মাছ শিকার করলাম আমরা দুই দলে ভাগ হয়ে। এসে শুনি, নাসিমের হাতে কাঁটা ফুটিয়ে দিয়েছে শিং মাছ। শিং মাছ কাঁটা ফোটালে সেখানে প্রচন্ড ব্যাথা হতে থাকে, অনেক সময় এই ব্যাথায় জ্বরও এসে যায়, সহ্য-ক্ষমতা খুব কম হলে ব্যাপারটা আরো মারাত্মক পর্যায়েও চলে যেতে পারে। দক্ষ স্কাউট নাসিমকে নিয়ে অবশ্য অত দুষ্চিন্তার কারণ নেই, তবুও আমাদের একজন সক্রীয় কর্মী আহত বলে একটু মনখারাপ হলো আমাদের। …ক্যাম্পে ফিরে যাওয়া ঠিক করলাম, কারণ মাছগুলো পুড়িয়ে খাওয়া আমাদের উদ্দেশ্য, রাত বেশি হয়ে গেলে সময় পাওয়া যাবে না।

ক্যাম্পে ফিরে গিয়ে আমাদের দু’দলের মাছগুলো একত্র করলাম: কই, শিং, ‘কইয়া মাছ আর চেং মাছ। আমি পরিকল্পনা করলাম কিভাবে মাছগুলো পোড়ানো হবে। সার্ভাইভাল গাইড থেকে শিখেছি আগুন জ্বলার জন্য মনে রাখতে হবে আগুনের বিখ্যাত ত্রিভুজ প্রতীককে: বাতাস, তাপ আর জ্বালানী। এই উপাদানগুলো কাজে লাগিয়ে আমাদের দরকার তিনটি জিনিস: টিন্ডার (স্ফুলিঙ্গ পেলেই জ্বলে ওঠার মতো অতি-দাহ্য বস্তু), প্রাথমিক জ্বালানী (ছোট্ট ছোট্ট শুকনো ডাল, যাতে খুব দ্রুতই আগুন ধরবে এবং তা আগুন ধারণ করবে) এবং জ্বালানী (আমাদের ক্ষেত্রে শুকনো কাঠ)। আমি, একটা টর্চসহ আকবরকে সাথে নিয়ে গেলাম শুকনো জ্বালানী কাঠের সন্ধানে। কিন্তু রেইনফরেস্টের বৃষ্টির মধ্যেও বিয়ার গ্রিল্‌স যেভাবে খুব সহজে শুকনো কাঠের সন্ধান পেয়ে যায়, আমরা এই বাসা-বাড়িতেও সহজে শুকনো কাঠ সেভাবে পেলাম না। তার পরও দুজনে যতটুকু পারলাম জ্বালানী আর প্রাথমিক জ্বালানী সংগ্রহ করলাম। প্রাথমিক জ্বালানী এবং টিন্ডার হিসেবে আনলাম পশুকে খাওয়ানোর খড় (এগুলো ঘরের ভিতর থাকায় শুকনোই পাওয়া গেল)।

আকবরকে জ্বালানী কাঠ দিয়ে ক্যাম্পে পাঠিয়ে আমি গেলাম গত কয়েকদিন আগে বাঁশঝাড় থেকে কেটে নামানো বাঁশের পাতাগুলো যেখানে ছেটে রেখে এসেছিলাম, সেখানে। সেখান থেকে পাতলা, সরু সরু কচি, বৃষ্টিভেজা ডাল থেকে বড়-ছোট মিলিয়ে কয়েকটা কেটে আনলাম। বাঁশটা এখনও কাজে লাগাতে পারছি বলে বেশ তৃপ্তি পেলাম। এগুলোতে মাছ আটকে তা পোড়ানো হবে। কচি, বৃষ্টিভেজা ডাল বলে ডাল, আগুনে পুড়ে যাবে না, কিন্তু মাছ ঠিকই সিদ্ধ হয়ে যাবে।

নাসিম আর আকবরকে আগুন ধরাতে দিয়ে আমি, শাকির আর রাফি চললাম পুকুরঘাটে, মাছগুলোকে যত্নসহকারে পরিষ্কার করে আনতে। এই বিষয়টা আমার মাথায়ই ছিল না, আমি ভেবেছিলাম, মাছ ধরবো, কাঠিতে লাগিয়ে পুড়িয়ে খেয়ে ফেলবো। রাফিই এই বিষয়টার উদ্যোগ নেয়। যাহোক, পুকুরঘাটে এসে রাফি হাত লাগালো মাছ পরিষ্করণে। পিচ্চিটা দক্ষতার সাথে জ্যান্ত মাছগুলোর লেজে ধরে ছুরি ঘষে আঁশ ছাড়াতে লাগলো। কিন্তু পিচ্ছিল মাছগুলো পিছলে সরে যাচ্ছে হাত থেকে। রাফির এখন দরকার ছাঁই, মহিলারা ছাঁই দিয়ে মাছের পিচ্ছিল পদার্থকে শুকিয়ে মাছ কাটেন। এখন ছাঁই পাওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব না, তাই হাতে মাটি লাগিয়ে কাজটা সারতে হচ্ছে আমাদের। রাফি কাজটা করে দিতে পারে, কিন্তু আমারতো অভিজ্ঞতার দরকার। ওর থেকে কাজটা আমি নিলাম। দেখে দেখে অভিজ্ঞতা আর হাতে-কলমে অভিজ্ঞতার বিস্তর ফারাক। সারাটা জীবনই এই অভিজ্ঞতার পিছনে ছুটেছি।

মাছের আঁশ ছাড়ানো সহজই হলো ছোট-মাছ বলে। কিন্তু শিং মাছের বিষয়টা বিপদে ফেললো। এগুলো এত বেশি পিচ্ছিল যে, ধরতে গিয়ে আমাদের হাতে না আবার কাঁটা ফুটে যায়। রাফি দেখিয়ে দিল, কিভাবে হাতের তর্জনি আর মধ্যমাকে শিংয়ের মাথার দুপাশে নিয়ে গিয়ে চেপে বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে থুতনিতে ধরে কাঁটার আঘাতমুক্ত থেকে শিং মাছ ধরতে হয়। এগুলোর তিড়িংবিড়িং দেখে আমি আর সাহস করলাম না। কাঁটার আঘাত থেকে বাঁচতে ছুরি, সরাসরি বসিয়ে দিলাম জোরসে ওদের গলায়। মাথা কেটে গেলেও ধড়টা লাফাচ্ছে। শিং মাছের পেট কেটে এদের বিষাক্ত রগটা ফেলে দিতে হয়। এসবে অভিজ্ঞতা লাগে। আমাদের সেই অভিজ্ঞতা নেই, রাফিও হাত ঝাড়লো। তবু আমরা আন্দাজে ভেতর থেকে কিছু রগ টেনে টেনে বের করলাম। সবগুলো মাছের ক্ষেত্রেই আঁশ ছাড়িয়ে, পেট কেটে নাড়ি-ভুড়ি বের করা হয়েছে। পেটে ডিম থাকলে তা আবার যথাস্থানে পুরে আটকে দেয়া হয়েছে। সবগুলো কাটা মাছ এবারে ধুয়ে পরিষ্কার করে আনলাম দুজনে। পুরো প্রক্রিয়া জুড়েই টর্চের আলো দেখিয়েছে শাকির।

মাছ কাটতে কাটতে রাফি জানাচ্ছিল তার বিশ্বাস করা নানা কুসংস্কারের কথা। শুনে শাকির হাসতে হাসতে গড়াগড়ি। কিন্তু আমাদেরকে বেশ চেপে হাসতে হচ্ছে, কারণ বাড়ির মানুষজন সব ঘুমিয়ে আছে, রাত বাজে আড়াইটারও বেশি। রাফির বিশ্বাসের মধ্যে আছে, কুচাকে মাটিতে রেখে এর উপর দিয়ে পার হওয়া ঠিক না, এতে ঐ কুচায় আর মাছ ধরা যায় না। যদি ভুলবশত তা করেও ফেলে কেউ, সে যেন কাজটা আবার উল্টে নেয়, মানে যেদিক থেকে পার হয়েছে, আবার যেন সেদিকে ফিরে আসে কুচার উপর দিয়ে, তাহলে নাকি আর কোনো সমস্যা হয় না। …তারপর বলছিল, শিং মাছের কামড় থেকে বাঁচার জন্য কিভাবে সে জড়িবুটি বানিয়ে নিয়েছিল। একবার শিংমাছের গুতা খেয়ে বেশ কষ্ট করার পর কোত্থেকে জানি এই জড়িবুটি বানিয়ে এনেছিল সে, সেটা তার বাড়িতে রেখে এসেছে বলে বেশ আফসোস তার। আমি আর শাকির হেসে বাঁচিনে। কিন্তু রাফি সেসবে পাত্তাই দেয় না।

ধুয়ে পরিষ্কার করা মাছগুলো উপরে আনতেই রাফি দেখিয়ে দিল মাছগুলোর ত্বকে কিভাবে ছুরি দিয়ে চিড় তৈরি করতে হয়, যাতে আগুনের তাপ ভিতর পর্যন্ত যায়। রাফির এই বার্বিকিউ মার্কা অভিজ্ঞ বক্তব্য শুনে তাকে বাহবা না দিয়ে উপায় ছিল না, কারণ এই জরুরি বিষয়টা মাথায় ছিল না আমারও।

ওদিকে আগুন ধরিয়েছিল আকবর আর নাসিম, সেই আগুন নিভেও গেছে। কাছে গিয়ে শুনি, যে গ্যাস লাইটার তারা এনেছিল, তার পাথর পড়ে গেছে: ওটা এখন অকেজো। আমি যদিও নাসিমকে বলেছিলাম যন্ত্রের সহায়তা না নিয়ে প্রাকৃতিক উপাদান থেকে আগুন ধরাতে; কিন্তু সে যে অনেক অনেক কষ্টের কাজ। অত সময়ও আমাদের হাতে নেই, তাছাড়া আমাদের এই এক্স-স্কাউট এখন আহত। এখন কী করা যায়?

ঠিক করা হলো, বাড়ির দরজার তালা খুলে একজনকে চোরের মত ঢুকে যেতে হবে ভেতরবাটিতে। রান্নাঘর থেকে নিয়ে আসতে হবে ম্যাচ। সেমতে, রাফিকে দেয়া হলো দায়িত্ব। সে কাজটা অভিজ্ঞদের মতোই করলো চুপিচুপি। ওকে পাঠিয়ে দিয়ে আমি বাঁশ দিয়ে শিক লাগানোর মতো প্লাটফর্ম বানাতে লাগলাম। ম্যাচবাক্স এলে খড়ের মধ্যে আগুন ধরিয়ে প্রাথমিক জ্বালানী কাঠগুলোতে আগুন ধরানোর চেষ্টা করা হলো। এবং তখন বুঝলাম এটা “ম্যান ভার্সেস ওয়াইল্ড” নয়, এটা রূঢ় বাস্তবতা।

বাস্তবে আগুন ধরানো যথেষ্ট ঝক্কির কাজ। খড় খুব দ্রুত পুড়ে যাচ্ছে, কিন্তু প্রায় শুকনো ছোট ছোট ডালগুলোতে আগুন ধরতে না ধরতেই তা নিভে যাচ্ছে। আগুনের ক্ষেত্রে যে জিনিসটা খুব বেশি দরকার, সেটা হলো কয়লা। যদি একবার কয়লা বানিয়ে ফেলা যায়, তাহলে আর আগুন নিয়ে চিন্তা নেই, অনেকক্ষণ ধরেই তা থেকে আগুন উসকে দেয়া যায়। কিন্তু কয়লা বানাতে দরকার বড় বড় কাঠ জ্বালানো, …আর এখানে ছোটটাতেই আগুন ধরছে না!

যে আশফাক, মাছ ধরায় দুর্দান্ত, সে দেখা গেল এবার একটু ঝিমিয়ে বসে আছে বেসক্যাম্পে। নাসিমকেও আমরা বিশ্রাম দিলাম, ওর হাতের ব্যথা বাড়ছে। তরু-কুটিরের মাচা থেকে বসে আবির তাকিয়ে আছে আমাদের কৃতকম্মে। আমি আর আকবর যখন আগুন নিয়ে ব্যস্ত, তখন শাকির, রাফিকে সাথে নিয়ে মাছগুলোতে লবণ মেখে কচি বাঁশের মধ্যে গাঁথতে থাকলো। একপর্যায়ে আগুন ধরলো অবশ্য, কিন্তু পরক্ষণেই আবার মিইয়ে আসে। বড় কাঠগুলো কিছুটা ভেজা, সেগুলো শুকানোর মতো সময়ও আগুন থাকছে না। বড় কাঠে আগুন না ধরলে বিপদ আছে।

আগুনে পুড়ছে কাঠিতে লাগানো মাছ (ছবি: নাসিম আহমেদ)
আগুনে পুড়ছে কাঠিতে লাগানো মাছ (ছবি: নাসিম আহমেদ)

আগুন ঘিরে বসলাম আমরা ক’জন। নাসিম ওর আঙ্গুলটা এগিয়ে দিল আগুনের দিকে, স্যাঁক দিলে ব্যথা কমবে। আগুনের পিছনে আমি, শাকির আর আকবর এক-পায়ে-খাড়া, মানে আগুন দমতে থাকলেই ফু দিয়ে তা চাঙা করে দেয়া, কাঠগুলো নেড়ে আগুনকে উসকে দেয়া…। কিন্তু একটুক্ষণ জ্বলেই আবার নিভে যায় আগুন, তখন সেই আগুনকে উসকে দিতে ব্যবহার করতে হয় খড়। খড় ব্যবহার করাটা মোটেও ঠিক হচ্ছে না, কারণ এতে কয়লা হচ্ছে না, শুধু শুধু অপ্রয়োজনীয় ছাই জমা হচ্ছে। আকবর কোত্থেকে একটু শুকনো সুপারি পাতা নিয়ে এলো। এগুলো আবার কিছুটা কাজে দিল।

শাকির, আবির (ধোয়ার পিছনে), আশফাক, এবং লেখকের চেহারা দেখা যাচ্ছে; আশফাকতো মনে হচ্ছে ধুয়াই খেয়ে ফেলবে (ছবি: নাসিম আহমেদ)
শাকির, আবির (ধোয়ার পিছনে), আশফাক, এবং লেখকের চেহারা দেখা যাচ্ছে; আশফাকতো মনে হচ্ছে ধুয়াই খেয়ে ফেলবে (ছবি: নাসিম আহমেদ)

আগুন ছড়িয়ে দেয়া দরকার, কারণ ডালে মাছগুলো একটা লম্বাটে জায়গায়, অথচ আগুন জ্বলছে এক জায়গায়। তাই এবার কাঠিটা হাতে নিয়ে মাছকে আগুনের কাছে ধরাটাই শ্রেয় মনে করলাম। অনেকক্ষণ ধরে আগুনের সাথে ঝুঝতে ঝুঝতে মাছগুলোকে পোড়াতে পোড়াতে যখন আমার কাছে মনে হলো ভালোই পুড়ে গেছে ওগুলো, শাকির তখনও চাইলো মাছগুলো আরেকটু পুড়ুক, নাহলে কাচা থেকে যাবে। তাই আরো কিছুটা সময় মাছগুলোকে পোড়ানো হলো। মাছ পোড়াতে পোড়াতে ফযর সমাগত। আমরা মাছ খেয়ে নেয়ার তাড়া অনুভব করলাম।

রাফি, আকবর, লেখক, নাসিম পোড়া মাছের অপেক্ষায় (ছবি: শাকির আহমেদ)
রাফি, আকবর, লেখক, নাসিম পোড়া মাছের অপেক্ষায় (ছবি: শাকির আহমেদ)

অন্ধকারে এই ক্যাম্প-ফায়ারের আলোতে চেহারা যা দেখা যাচ্ছে তাতে দেখি শাকির মিটিমিটি হাসছে। কী হয়েছে জানতে চাইলে উচ্চস্বরে হাসতে হাসতে বললো, ঐ দূরের মসজিদের ইমাম সাহেব উঠে দেখবেন বন্দরবাড়িতে  কতগুলো ভুত রাত-বিরাতে আগুন জ্বালিয়েছে। এদের একটা বলছে, রগ কেটে ফেল; আরেকটা বলছে, রগসহই খেয়ে ফেলবো। একটা বলছে, পুড়িয়ে খা; তো আরেকটা বলছে কাচাই খেয়ে ফেলি…। ওর কথাটা শুনে যখন বিষয়টা চিন্তা করলাম, তখন হাসিতে সবাইই ফেটে পড়লাম। আসলেই তো, আমাদেরকে ভুত ঠাওরালে আমাদের কথোপকথনগুলো ঠিক মানুষ খেয়ে ফেলার মতোই মনে হবে… শুধু হুহুঠাঠাঠা করে হাসির বাকি।

মাছ পোড়ানো শেষ, আমাদের জিবে জল এসে যাচ্ছে। জীবনে প্রথমবারের মতো পোড়া মাছ খাওয়ার অভিজ্ঞতা নিতে যাচ্ছি। আমরা সবাই-ই যখন মাছের স্বাদ নিতে প্রস্তুত, আশফাক তখন খাবে না বলে দূরে বসে থাকলো। সবাই বিসমিল্লাহ বলে মাছের গায়ে হাত দিলাম। পোড়া মাছ কিছুটা স্পঞ্জের মতো হয়েছে, তবে উঠে এলো কাটা ছেড়ে। কাঠি থেকেই সরাসরি হাতে নিয়ে মুখে পুরতে থাকলাম আমরা। স্বাদে আর মাছের পোড়া-গন্ধে আমার জিবে আরো খানিকটা জল বেরিয়ে এলো। এদিকে আকবর, শাকির আর আবিরের কাছে মাছের স্বাদ খুব একটা ভালো লাগছে না। রাফি আর নাসিমের অবশ্য আমার মতো অভিমত, অপূর্ব লাগছে। তবে যে পাশে আগুন কম লেগেছে, সেখানকার মাছগুলো আরো খানিকটা সময় পুড়লে ভালো হতো। যদিও সেগুলো খাওয়া যাচ্ছে। তবে যে মাছগুলো বেশি পুড়েছে, সেগুলো খেতে অমৃত লাগছে। ভাগ্য ভালো শাকির আরো কিছুক্ষণ না পোড়ালে হয়তো প্রায় অখাদ্য খেতে হতো আমাদের।

আমাদের বল্টু-বাহিনীর একাংশ (ছবি: লেখক)
আমাদের বল্টু-বাহিনীর একাংশ- বাম থেকে: রাফি, আকবর, হুসাইন, নাসিম, সামি, শাকির, আজওয়াদ, আশফাক। (ছবি: লেখক)

যাদের ভালো লাগলো না, তারা থু থু করে ফেলে হাসতে লাগলো সারা রাতের এই ছেলেমানুষিতে। আর আমি তখন নিজেকে একজন বিয়ার গ্রিল্‌স হিসেবে আবিষ্কার করে আরো খানিকটা উজ্জীবিত। খাওয়া-দাওয়া শেষে টিউবওয়েল থেকে এনে রাখা পানি দিয়ে তা হজমের ব্যবস্থা করা হলো। ক্যাম্পের আগুন নিভিয়ে বাড়ির পথ ধরলাম আমরা।

শিখলাম, ভূমির সাথে সংস্পর্শহীন কোনো সার্ভাইভাল আবাস তৈরি করতে অবশ্যই বাঁধার জন্য মোটা রশি কিংবা এমন কিছু ব্যবহার করতে হবে; পাতলা রশি, এমনকি তারও দীর্ঘমেয়দি ওজন ধারণে অক্ষম- বরং দুর্ঘটনা ঘটিয়ে দিতে পারে। শুকনো মৌসুম ছাড়া বর্ষায় আগুন ধরানো চাট্টিখানি কথা নয়। প্রকৃত সার্ভাইভাল পরিস্থিতিতে বর্ষায় কাউকে টিকে থাকতে হলে দরকার প্রচুর প্রচুর প্রশিক্ষণ, বারবার অনুশীলন। আর অতি-অবশ্যই, যেখানে আগুন ধরানো হবে, সে স্থান ত্যাগের সময় মনে করে সেই আগুন নিভিয়ে আসতে হবে। শুকনো মৌসুম হলে ক্যাম্প ফায়ার থেকে জঙ্গলে দাবানলও ছড়িয়ে পড়তে পারে।

সবশেষে একটা দুঃসংবাদ আর একটা সুসংবাদ: পোড়ানো মাছ খেয়ে বাড়িতে ফিরেই পেট পরিষ্কার হয়ে গেছে আমাদের মার্কিন বল্টু আবিরের। তবে আগুনে স্যাঁক দেয়ায় হাতের ব্যথা অনেক কমেছে নাসিমের। আর শেষ ভয়ঙ্কর কথাটা হলো: আমি এই অভিজ্ঞতা ঝালিয়ে নিতে জঙ্গলে-মঙ্গলে চলে যাব যেকোনো সময় ইনশাল্লাহ।

-মঈনুল ইসলাম
wz.islam@gmail.com

৩ thoughts on “সার্ভাইভাল অভিজ্ঞতা: তরু-কুটিরে আমরা ক’জন সৌখিন সার্ভাইভার

মন্তব্য করুন