কেন খুতবা বাংলায়, কেন নয়

যে কথা বুঝি না, সে কথা শোনার মানে কী থাকতে পারে? ভাষা বুঝিনা বলেই তো ’৫২-তে রক্ত দিয়ে আজ বাংলাকে মাতৃভাষা করেছি আমরা। তাই যে কথাই বলো না কেন, বলতে হবে বাংলায়- যে ভাষায় আমি সব বুঝি, বুঝি তুমি আমাকে গালি দিলে, নাকি বাহবা দিলে। ডাক্তার যাকির নায়েককে একজন প্রশ্ন করলেন: খুতবা কেন স্ব স্ব ভাষায় দেয়া হয় না। উত্তরে তিনি দৃঢ়কণ্ঠে জানিয়ে দিলেন যে, খুতবা অবশ্যই স্ব স্ব ভাষায় হওয়া উচিত। তবে খুতবার অন্তর্গত ক্বোরআনের আয়াত এবং হাদিসের উদ্ধৃতি হুবহু আরবিতে বলতে হবে। ব্যস, তাতেই হয়ে যাবে। …একদিকে সমস্যাটা ঘোরতর, অথচ ওদিকে সমাধান কত সহজ! কিন্তু, এটাই কি তবে সমাধান? জানতে হলে পড়তে হবে শেষাবধি।

কথাটা ভুলেই গিয়েছিলাম, যদিনা সহকর্মী হাসান ভাই প্রশ্নটা আবারও তুলতেন। তিনি জোর দাবি জানালেন যেন খুতবা অবশ্য অবশ্যই বাংলায় হয় (কেননা তিনি বাঙালি)।

কী এই খুতবা?

খুতবা শব্দটা আরবি (ﺨﻂﺑﻪ), যার অর্থ ‘ভাষণ’। অর্থগত দিক দিয়ে খুতবা হলো জুমার নামাযের আগে এবং ঈদের নামাযের পরে ইমামের দেয়া ভাষণ, যাতে ধর্মের বিধিনিষেধ আলোচনা ও মুসলমান খলিফার প্রতি আনুগত্য করার কথা বলা হয়। আমরা যারা মুসলমান এবং ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে খানিকটা জানার আগ্রহ আছে, তারা জানি যে, জুমার খুতবা আসলে মুসলমানদের জন্য একপ্রকার সাপ্তাহিক আপডেট (সাম্প্রতিক তথ্য)। এই খুতবায় মুসলমানদেরকে বিগত সাতদিনে ঘটে যাওয়া ঘটনার ব্যাপারে জানিয়ে দেয়া হয়, সেগুলোর কোনটা কতটা ইসলাম কর্তৃক স্বীকৃত, কতটা পরিত্যাজ্য, কেন পরিত্যাজ্য ইত্যাদি। কেন পরিত্যাজ্য, তা জানাতে গিয়ে ক্বোরআন এবং হাদিসের উদ্ধৃতি দেয়া হয় এবং সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে কোনো ইযমা থেকে থাকলে, তাও উল্লেখ করা হয়। যেন ইসলামের প্রকৃত তথ্য সম্পর্কে মুসলমানদের সজ্ঞানতা তৈরি হয় এবং সাম্প্রতিক ঘটনাবলীর প্রতি ইসলামসম্মত আচরণ গড়ে ওঠে। -এটাই জুমা’র খুতবার মূল উদ্দেশ্য। (দুই ঈদে মূলত ঈদ সংশ্লিষ্ট বিষয়াবলীর উল্লেখ বেশি থাকে।)

খুতবা কেমন আরব দেশে?

আমি সংযুক্ত আরব আমিরাতে জুমা’র খুতবা দিতে দেখেছি। সেখানে আমরা জুম’আর দিনে আযানের পরপর মসজিদে চলে গেলাম। গিয়ে সবাই বসে আছি। কোথাও কোনো ইমাম নেই। সবাই চুপচাপ বসে আছেন। কেউ কেউ তাক থেকে ক্বোরআন শরীফ বের করে পড়ছেন, কেউবা হাতে প্লাস্টিকের গুটিকা নেড়ে তাসবিহ পড়ছেন; আর সবাই-ই চার রাকা’আত ক্বাবলাল জুম’আ পড়ে নিচ্ছেন। অনেকক্ষণ বসে থাকার পর ইমাম সাহেব এলেন, এবং প্রায় আট-নয়টা সিঁড়ি পেরিয়ে বেস্টনি দেয়া স্টেজে উঠলেন, আসলে এই স্টেজটা হলো মিম্বর (আরব দেশের মিম্বরগুলো আমাদের দেশের মতো তিন সিঁড়ির মিম্বর নয়)। এবারে আর কাউকেই ক্বাবলাল জুম’আ পড়ার অনুমতি দেয়া হলো না। মোয়াজ্জিন সাহেব আবার আযান দিলেন (সা-নী আযান: ﺛﺎﻨﻰ ﺍﺬﺍﻦ)। আযান শেষ হলে ইমাম সাহেব দাঁড়িয়ে গেলেন এবং আরবি ভাষায় বলা শুরু করলেন। তিনি কী বললেন, আমি বুঝলাম না, কারণ আমি আরবি পড়তে পারি, বুঝতে পারি না- আরবি ভাষা, ‘ভাষা’-অর্থে জানি না। শুধু এতোটুকু বুঝলাম বাংলাদেশে একজন ইমাম সাহেব যতক্ষণ সময় নিয়ে প্রথম খুতবাটুকু বলেন, তিনি এর চেয়ে বেশি সময় নিয়ে কথাগুলো বলছেন। দ্বিতীয় খুতবাও খানিকটা দীর্ঘ হলো- খুব একটা দীর্ঘ না। দুই খুতবার মাঝখানে তিনি যথারীতি বসেও ছিলেন।[১]

খুতবা এবং আমরা

ইসলামের প্রথম যুগে সানী আযানই ছিলো মূল আযান, এখনকার মতো দুবার আযান দেয়া হতো না। পরবর্তিতে মানুষকে আগে থেকে প্রস্তুতি নেয়ার জন্য (যেহেতু জুম’আর নামায, সারা সপ্তাহে একবার, এবং খুব তাৎপর্যপূর্ণ) আরো একটু আগ বাড়িয়ে আরেকবার আযান দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়। যাহোক, প্রথম আযান শুনে আমরা মসজিদের দিকে রওয়ানা হয়ে যাবো- এটাই উদ্দেশ্য। তারপর চুপচাপ বসে থাকবো নেতার আগমনের অপেক্ষায়। ‘ইমাম’ শব্দের অর্থ কিন্তু নেতা। তারপর যখন নেতা আসবেন, এবারে ইসলামের সেই প্রাথমিক যুগের প্রবর্তিত মূল আযানটি দেয়া হবে এবং নেতা উঁচু একটি স্থানে দাঁড়িয়ে যাবেন। তারপর পুরো সপ্তাহের আপডেট দিবেন ইসলামের বিধিবিধান অনুসারে। তিনি যখন কথাগুলো বলবেন, তখন আমরা সবাই তাঁর কথাগুলো শুনবো খুব মন দিয়ে। তাঁর বলা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁর কথাগুলোই আমাদের খাদ্য। তারপর তিনি বলা শেষ করে নেমে এসে আমাদের সবার সামনে নেতা হিসেবে দাঁড়িয়ে যাবেন আমাদেরকে আল্লাহ’র দরবারে পথ দেখানোর জন্য। তিনি নামায শুরু করবেন এবং আমরা তাঁকে অনুসরণ করবো। -এটিই জুম’আর দিনের মূল কথা।

আমাদের দেশে দেখা যায়, সতর্কতামূলক আযানের পরপর আমরা মসজিদে চলে যাই ঠিকই, তারপর ইমাম সাহেব দাঁড়িয়ে নয়, বরং বসে বসে বেশ কিছুক্ষণ কীসব বক্তৃতা দেন, সেগুলো শোনা হয়ে গেলে তারপর আমাদেরকে চার রাকা’আত নামায পড়ার অনুমতি দেয়া হয়, তারপর আযান হয়, এবারে ইমাম সাহেব দাঁড়িয়ে আরবিতে কী যেন বলেন, সব মুখস্থ কথা কিংবা বই দেখে বলা বুলি।…

ব্যাপারটা আসলে ঠিক এরকম হওয়ার কথা ছিল না। কিন্তু তারপরও কেন হয়?

তার প্রথম কারণ: সতর্কতামূলক আযান হওয়াসত্ত্বেয় আমরা আলস্য করেই হোক কিংবা অনীহা করেই হোক মসজিদে যাই না, কেননা মূল নামাযের তখনও অনেক বাকি থাকে; ফলে আগে থেকেই ক্বাবলাল জুম’আ পড়ে নিতে পারি না, অথচ তা পড়া সুন্নতে মোয়াক্কাদাহ (আবশ্যক সুন্নত)। এখন একজন ইমাম কী করে পারেন এতোগুলো মানুষকে একটা সুন্নতে মোয়াক্কাদা’র পূণ্য থেকে বঞ্চিত করতে? তাই তিনি সানী আযানের আগে একটু সুযোগ করে দেন আরকি।

দ্বিতীয় কারণ: ইমাম সাহেব যে কথাগুলো আরবিতে বলেন, সেগুলো বাঙালি বুঝবে না, তাই তাঁর সারকথাগুলো গুছিয়ে বাংলায় বলাটা খুব দরকার। তাই সতর্কতামূলক আযানের পরে তিনি একটু দীর্ঘ সময় নিয়ে কথাগুলো বাংলায় ভেঙে ভেঙে বলেন, যেন কথাগুলো সবার মাথায় ঢোকে। সেখানে তিনি ক্বোরআনের উদ্ধৃতি দেন, হাদিসের উদ্ধৃতি দেন এবং নীতিকথাও বলেন।

কিন্তু হাসান ভাইয়ের বক্তব্য হলো, যে কথাগুলো একবার বাংলায় বলা হয়ে গেলোই, সে কথাগুলো আবার কেন দাঁড়িয়ে আরবিতে বলতে হবে? ঐ সময়টাতে আমরাতো কিছুই বুঝি না, তাহলে কেন বলা হয়? বলা হয়, তার কারণও কয়েকটা:

প্রথমত, সবকিছুকে বাংলা করতে চাওয়াটা অন্যায় এবং অনুচিত। কেননা ক্বোরআনের বক্তব্য এবং হাদিসের বক্তব্য শুধুমাত্র অনুবাদের কারণে ভুল অর্থ হয়ে যেতে পারে, তাই সেগুলোকে মূল আরবিতে বলতে হবে (প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, বাইবেলের ওল্ড টেস্টামেন্ট এবং নিউ টেস্টামেন্টে মানুষের যথেচ্ছ অনুবাদ প্রবণতাই অর্থগত মূল থেকে মানুষকে সরিয়ে দিয়েছে বহুদূর)। তাছাড়া আরবি ভাষা হলো পৃথিবীর একমাত্র ভাষা, যা তার মূল থেকে খুব কম বিকৃত হয়েছে, আর তাই এই ভাষা সম্মানিতও। যদি আরবি’র চর্চাই না থাকে, তাহলে এই কথাগুলো কখনও মনে প্রশ্ন জাগাবে না, আর প্রশ্ন না জাগলে এধরণের কথাগুলো আড়ালেই থাকবে। তাছাড়া আরবিতে খুৎবা দেয়া সুন্নত। মুসলমানদের কাছে, একটা সুন্নত পালন করার অর্থ হলো একশ শহীদের সওয়াব পেয়ে যাওয়া[২] (এই শহীদ আল্লাহর পথে জেহাদ করতে গিয়ে শহীদ-অর্থে)।

দ্বিতীয়ত, যাকির নায়েক যে সমাধান দিয়ে দিয়েছিলেন, সেটা আসলে একটা জগাখিচুড়ি সমাধান-প্রচেষ্টা: কিছু বলো বাংলায়, কিছু বলো আরবিতে… আদতে যেই লাউ-সেই কদু। তাই মূল সুন্নতের অনুসরণে এবং অনুকরণে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে অনেকটা প্রতীকিভাবেই খুৎবা আরবিতে দেয়া হয়।

খুৎবার প্রথম অংশে থাকে সাপ্তাহিক আপডেট এবং করণীয় সম্বন্ধে। দ্বিতীয় অংশে থাকে দোয়া। আর উভয় অংশ জুড়েই থাকে আল্লাহ’র প্রশংসা আর বাণীবাহক মুহাম্মদের [আল্লাহ তাঁর প্রতি শান্তি বর্ষণ করুন] প্রতি দুরূদ। দ্বিতীয় অংশে নিজের এবং পরিজন, বন্ধুবান্ধবদের জন্য দোয়া ছাড়াও সুন্নিগণ চার খলিফা (আবুবকর, ওমর, ওসমান, আলী [আল্লাহ তাঁদের প্রতি সন্তুষ্ট থাকুন]), মুহাম্মদের বংশধর (ফাতেমা, হাসান, হোসাইন [রা.]), মুহাম্মদের সহচরগণ (সাহাবিগণ [রা.]), সাহাবাদের বংশধরগণ (তাবে’য়ী ও তাবে’-তাবে’য়ীনগণ [আল্লাহ তাঁদের প্রতি দয়াপরবশ হোন]), ইসলামের দাওয়াত নিয়ে ঘুরে বেড়ানো ওলি-আওলিয়াদের [আল্লাহ তাঁদের প্রতি দয়া পরবশ হোন] জন্য দোয়া করেন। তাই, প্রথমাংশে সামান্য ব্যতিক্রম থাকলেও প্রায় সকল স্থানেই দ্বিতীয় খুৎবায় অনেক মিল। যেহেতু দ্বিতীয় খুৎবায় দোয়া পাঠ করা হতে থাকে, তাই এসময় উপস্থিত শ্রোতারা মনে মনে “আমীন” (তাই হোক) বলাটা উত্তম।

কিন্তু…

কথা হলো, সাধু কথায় তো অনেক কিছু বোঝা গেলো, কিন্তু ওমুক মসজিদের ইমাম সাহেবতো দেখি বই দেখে সব অনর্গল পড়ে যান তোতাপাখির মতো। তাহলে আপডেটটা দিলেন কই? সবইতো ঐ বই-লেখকের বক্তব্য বলে দিলেন।

আপনার প্রশ্নের উত্তরটা আমি দিতে চাই আমার মসজিদের ইমাম সাহেবকে দিয়ে। আমার মসজিদের ইমাম সাহেব (খতিব মাওলানা শুয়ায়েব খান) খুব গুছিয়ে বাংলায় বক্তৃতা দেন, বক্তব্যের ভিতরে ক্বোরআন ও হাদিসের যতগুলো উদ্ধৃতি থাকে সবই তিনি হয় লিখে নিয়ে আসেন, নতুবা মুখস্থ করে আসেন। যদি সেটা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ হয়, তবে সেবিষয়ে; যদি সেটা শিক্ষানীতি ২০১০ বিষয়ে হয়, তবে সেবিষয়ে; যদি সেটা এ’তেকাফ নিয়ে হয়, তবে সেবিষয়ে; যদি সেটা ‘আশুরা নিয়ে হয়, তবে সেবিষয়ে ক্বোরআন ও হাদিসের দৃষ্টিতে ইসলামের দৃষ্টিকোণটা তুলে ধরার জন্য তিনি প্রযোজ্য আয়াতগুলো ও হাদিসগুলো সাথে করে নিয়ে আসেন। বাংলা বক্তৃতার ভিতরে ভিতরে যেখানে সেগুলো উল্লেখ করার দরকার, সেখানে সেগুলো বলেন। তারপর যখন প্রথম খুতবা হয়, তখন তিনি কিছু সর্বজনীন কথা বলার পর হাতে ধরা কাগজটা বের করে, কিংবা [মুখস্থ থাকলে] স্মরণ করে, “ইয়া আইয়্যুহাল ইখওয়া…” (হে ভাইগণ) বলে ক্বোরআন ও হাদিসের ঐ আয়াতগুলো পুণরাবৃত্তি করেন। বলা শেষে একটা সমাপনী বক্তব্য রাখেন, তারপর খুতবা’র মধ্যস্থলের বিরতিতে যান।

আপনি অনেক মসজিদের [দ্বিতীয়] খুতবাতেই শুনবেন ফিলিস্তিন, আফগানিস্তান, ইরাক, ইরানের জন্য দোয়া করা হচ্ছে। আপনি যদি ইমাম সাহেবের হাত থেকে বইটা নিয়ে পড়েন, তাহলে সেখানে দেখবেন কথাগুলো লেখা নেই। আসলে ইসলাম এসকল দেশে বিপর্যস্থ মনে করে মুসলমান নেতাগণ (ইমামগণ) ঐসকল দেশের জন্য দ্বিতীয় খুতবায় দোয়া করেন, আল্লাহ যেন সেখানে শান্তি বিরাজ করেন, ইসলামকে পুণর্বহাল করেন ইত্যাদি।

তারপরও বাংলা কথার পরিমাণ হয়তো বেশি দেখবেন, আর আরবি কথাগুলো থাকবে গৎবাঁধা, তার কারণ বাংলাদেশের ইমাম সাহেবদের মাতৃভাষা আরবি নয়। তাই বাংলায় কথাগুলো যতটা বিস্তারিত বলেন, আরবিতে গিয়ে তা সংক্ষিপ্তাকারে বলেন, ক্বোরআন আর হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়েই কথাগুলোকে গুছিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেন, কারণ তাঁরা জানেন, এই আরবি খুতবাটুকু তিনি শুধুই সুন্নত পালনার্থে দিচ্ছেন, এই কথাগুলো আগেই বলা হয়ে গেছে। আর সংক্ষিপ্ত করার আরেকটা কারণ হলো, মুহাম্মদ [স.] বলেছেন:

তোমরা নামাযকে দীর্ঘ করো, আর খুতবাকে সংক্ষিপ্ত করো।[৩]

আর কেউ কেউ যে নিজেদের অজ্ঞতার কারণে যেভাবে খুতবা দেয়ার দরকার ছিল সেভাবে না দিয়ে গৎবাঁধাভাবে পড়ে যাচ্ছেন না, সেটাও আমি বলবো না। তবে তাতেও দোষের তেমন কিছু নেই, কেননা তাঁরা ঐসময় যে কথাগুলো বলছেন কিংবা বই দেখে পড়ছেন, সেগুলো সর্বজনীন কথা। উদাহরণস্বরূপ ধরা যাক, ইমাম সাহেব সাম্প্রতিক সময়ের আপডেট নিয়ে কথা বলছেন, “আপনি ইভ-টিযিং না করাসত্ত্বেয় আপনাকে যদি কেউ এখন ইভ-টিযার বলে গালি দেয়, আপনি দয়া করে উত্তেজিত হবেন না, আপনি ধৈর্য্য ধারণ করুন এবং মনে মনে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থণা করুন”। কিন্তু ইমাম সাহেব কথাগুলো এভাবে না বলে বই দেখে [খুতবা] পড়ছেন: “মুসলমানরা সব সময় ধৈর্য্য ধারণ করবে এবং আল্লাহর কাছে সাহায্যপ্রার্থী হবে”। তাহলে কি তিনি কিছু ভুল বললেন? না, তিনি শুধু ব্যাপারটাকে ভেঙে না বলে একটু দায়সারাভাবে বলে গেলেন। তবুতো বললেন।

সারকথা

জুম’আর দিনে আরবিতে খুৎবা দিব আমরা মুহাম্মদের [স.] সুন্নতকে অনেকটা সেভাবে পালনের মাধ্যমে ইসলামের প্রথম সময়কে স্মরণ করার জন্য। সেই খুতবা যেন আমজনতা বুঝতে পারে, তাই নামাজের আগে কিংবা পরে সেগুলোকে বাংলা করে বুঝিয়ে দিব। যেহেতু মুহাম্মদ [স.] খুতবা চলাকালীন সময় কোনো সহচরকে তাঁর সামনে পড়ে থাকা বালি হাত দিয়ে সরাতেও নিষেধ করেছেন, কারণ সে অন্যমনষ্ক হয়ে যাবে[৪]; তাই খুৎবা চলাকালীন সময় আমরা চুপ করে মনোযোগসহকারে সেই কথাগুলো শুনবো। বাংলা কথাগুলো যেহেতু সেই আরবি কথাগুলোরই বিবর্ধন, তাই এই কথাগুলোর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। আর আরবি কথাগুলো বুঝি আর না বুঝি, মুহাম্মদের [স.] যুগকে স্মরণ করে একটা সুন্নত পালনার্থে হলেও চুপ করে ধৈর্য্যসহকারে শোনা আর মনে মনে খুশি হয়ে যাওয়া যে, একটা সুন্নত পালন করলাম এবং একশ’ শহীদের সওয়াব নিজের করে নিলাম।
-মঈনুল ইসলাম
___________________________

কৃতজ্ঞতা

প্রচ্ছদের ছবি: Muhammad Mahdi Karim, মূল ছবি: উইকিমিডিয়া কমন্স^

তথ্যসূত্র

১. “তরল স্বর্ণের দেশে” (পাণ্ডুলিপি: ভ্রমণ কাহিনী), মঈনুল ইসলাম।
২. من تمسك بسنتي عند فساد أمتي فله أجر مائة شهيد
“He who clings fast to my Sunnah (way of life) when my Ummah is corrupt, will receive the Reward of a hundred martyrs.”
বঙ্গানুবাদ: যখন আমার অনুসারীরা দূর্বল হয়ে পড়বে, তখন আমার একটা সুন্নত যে আমল করবে, সে একশ শহীদের সমান পূণ্য পাবে।
(“কিতাব আল যুহদ” –ইমাম বায়হ্বাকী; দেখুন “আল তারগীব” খণ্ড ১ পৃ. ৮০) সনদ বা পরম্পরা বিষয়ে মতদ্বৈততা থাকলেও আবু হুরায়রা [রা.] ও আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস [রা.] হতে হাদিসটির বর্ণনা এসেছে বলে জানা যায়। হাদিসটি হাসান (ﺍﻠﺤﺴﻦ: ভালো) হাদিস হিসেবে গণ্য এবং পালনে কোনো বাধা নেই এবং ইসলামী শরীয়তে হাসান হাদিস অন্তর্ভুক্ত।
৩. মুসলিম শরীফ, জুমু’আ, tr. ৪৭, Encyclopaedia of Islam-এ “Ḵh̲uṭba” অংশে উল্লেখিত।
৪. রামপুরার কুঞ্জবন মসজিদের ইমাম, জনাব মাওলানা আবুল বাশার সাহেবের বক্তব্য থেকে শোনা। (সত্যতার কোনো দলিল পেশ করতে পারছি না)

মন্তব্য করুন