জলপ্রপাতের খোঁজে – ছোট বোয়ালিয়া আর মালিখোলা

~ খইয়াছড়া ঝরণা ~

“রশিটা টেনে ধরেন, আপনার টানেই ও’ আসবে…” কথাটা ছুঁড়ে দিলেন কামাল ভাই, তুহিন ভাইয়ের উদ্দেশ্যে রশিতে ঝুলে আছি আমি, নিচে খইয়াছড়া ঝরণার পানি বয়ে যাচ্ছে বিয়ার গ্রিল্‌সের মতো করে রশির উপর শরীর রেখে এক পা ঝুলিয়ে সামনে এগোনোর চেষ্টা করছিকিন্তু রশিটা দুলছে… একটু বেশিই দুলছে…

২০১৩ জুলাই ১ | সকাল ১১:০০

আবুবকরের মাথা খারাপ। হঠাৎ ফোন আমাকে, ‘আপনে কই?’ …‘আমি আসতেছি, কথা আছে।’ পনেরো মিনিটের মধ্যে আমার নতুন অফিস খুঁজে খুঁজে বের করে আবুবকর হাজির। মাথামুথা মনে হয় আসলেই খারাপ! এসে সাথে সাথেই ফেসবুক খুলে একটা ভিডিও দেখালেন। …সরাসরি আমাকে প্রশ্ন: ‘কালকে যাবেন কিনা?’

এ ব্যাটা বলে কি? আজকে সোমবার। হপ্তার মাঝখানে ছুটি নিবো কিভাবে!

সরাসরি কথা: ‘আপনে গেলে যান, টীম রেডি। কালকে যাচ্ছি আমরা।’

ব্যস দিলো তো মাথাটা আমার খারাপ করে। আর তো ভাল্লাগে না। মাথা পুরাই নষ্ট। যে ভিডিওটা দেখলাম, সেখানে একটা খরস্রোতা জলধারা, একদঙ্গল মানুষ, তারা এই জলধারার তীব্রতায় উচ্ছসিত। শুনলাম ৫০ জনের একটা দল নিয়ে ভ্রমণ বাংলাদেশ গিয়েছিল সেখানে; ঝিরিতে তীব্র স্রোতে পর্যুদস্ত হয়ে মূল ঝরণায় যেতেই পারেনি দলটা – ব্যর্থ অভিযান হয়েছে একটা। কিন্তু ব্যর্থ অভিযানটাই মাথা খারাপ করে দিয়েছে আবুবকরের – সামান্য কিছু জল লাথি মেরেছে আবুবকরকে! কিন্তু তার চেয়েও বেশি মাথা খারাপ হয়ে গেছে এখন আমার। এই ঝরণাতেই একটা দল যাচ্ছে কালকেই, সাথে থাকছে সরঞ্জামাদি – তীব্র স্রোতকে হার মানানোর সব প্রস্তুতি।

লক্ষ্য মিরসরাই, চট্টগ্রাম। মাত্র একদিনের ট্যুর, একদিন ছুটি নিলেই হবে – আর তো কিচ্ছুই ভাল্লাগে না। ওদিকে আবুবকরের দরকার ঝুম বৃষ্টি। ইন্টারনেটের হেন ওয়েদার সাইট নেই যে ঘাঁটা হলো না। মিরসরাই, কিংবা চট্টগ্রামে কালকে কি বৃষ্টি হবে? দেখা যাচ্ছে দুটো ওয়েবসাইট বিস্তারিত জানাচ্ছে, কালকে নয়, মোটামুটি থান্ডারস্টর্ম মানে বজ্রপাতসহ বৃষ্টি হবে; তবে সেটা পরশুদিন। আবুবকরের তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত, তাহলে কালকে না, পরশু দিন টীম যাবে। আপনি গেলে কালকে ভোরের মধ্যে আমাকে জানান।

২০১৩ জুলাই ৩ | রাত ১২:৩০

টীম বড় করা যাবে না, তাই বাছাই করা লোক নিয়ে আববকর টীম নিশ্চিত করেছেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে দুজন যাবে না জানিয়ে দিলে রইলাম বাকি চার। …হ্যা, যাচ্ছি আমিও – একদিনের ছুটি ম্যানেজ হয়েছে আমার। তবে যাওয়ার বাহনটা পিক্যুলিয়ার — চট্টগ্রাম মেইলে করে যাবো আমরা। ঢাকা-চট্টগ্রাম র‍্যুটে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ র‍্যুটের সবচেয়ে বিলাসবহুল ট্রেন হলো সুবর্ণ; রয়েছে তূর্ণা এক্সপ্রেস, মহানগর প্রভাতি আর গোধুলী। কিন্তু এতকিছু থাকতে আমাদের দরকার এই লক্করঝক্কর মেইল ট্রেনটাই। মেইলে যাবার পদ্ধতি হলো টিকেট কাটবেন, কিন্তু আগে গিয়ে নিজের সীট বুক করতে হবে। আবুবকর, ট্রেন ছাড়ার ১ ঘন্টা আগে কমলাপুর স্টেশনে উপস্থিত (টিকেট জনপ্রতি ৳১১০)। আনসারদের সাথে বিশেষ খাতির করে কয়েকটা সীট নিয়ে বসলেন। আমি উঠবো এয়ারপোর্ট থেকে, বাকি দুজন উঠবেন নরসিংদী থেকে। ট্রেন যখন এয়ারপোর্টে এলো, পুরোটা লোকে লোকারণ্য, তার মাঝখানে যে ‘দুটো’ সীট আছে, এটা আল্লাহর অশেষ রহমত। আবুবকরের বিশাল একটা র‍্যাকস্যাক – এতো কিছু কী? ‘সব সরঞ্জামাদি -আরে এজন্যইতো যাওয়া…’। ট্রেনের ভিতরে কোনো বাতি নেই, প্লাটফর্মের বাতি দিয়ে অর্ধালোকিত ভিতরটা। আমার এসব গন্ধময়, নোংরায়, কিংবা ছারপোকায় কোনো ফোবিয়া নেই। বসে পড়লাম সীটে।

নরসিংদী থেকে উঠলেন আরো দুজন, হাতে দেখি কলা, পাউরুটি, আর লটকন। বাহ, বেশ তো! এবার দলটাকে পরিচয় করিয়ে দেয়া যাক:

ক. আবুবকর সিদ্দীক – হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউট (HMI) থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে আসা ভ্রমণ বাংলাদেশের একজন তুক্‌খোড় ট্রেকার – ট্রেকিং জগতে আমার শিক্ষক। বর্তমানে Eco Travelers নামক সংগঠনের মাধ্যমে বিভিন্ন ভ্রমণ আয়োজন করে থাকেন।

খ. আমি নয়ন – পেশায় ফ্রন্ট এন্ড আর ওয়ার্ডপ্রেস ডেভলপার। শখের বশে লেখালেখি করতে ভালোবাসি। অ্যাডভেঞ্চার আর রোমাঞ্চপ্রিয় একজন মানুষ। শখের বশে সাক্ষী ছবি তুলি। (‘সাক্ষী ছবি’ ক্যাটাগরিটা বন্ধু, ট্রেকার সাজ্জাদের দেয়া)

গ. কামাল হোসেন – নরসিংদীর একজন ব্যবসায়ী। শখের বশে ব্লগ লেখেন, ছবিও তোলেন। বেশিদিন হয়নি, তিনি একা একা ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম স্টেশন পর্যন্ত রেললাইন ধরে হেঁটে হেঁটে গেছেন। এপথে কয়টা স্টেশন আছে তার পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব তার মাথায় আছে, আছে প্রত্যেকটা স্টেশনের ছবিও।

ঘ. তুহিন – নরসিংদীর আরেক ব্যবসায়ী। ফুটবল খেলতে খুব ভালোবাসেন, তাই বেশ সুঠাম দেহের অধিকারী।

দুজনেই ভ্রমণ বাংলাদেশের সাথে একাধিক ট্যুর দিয়েছেন আর দুজনেই খুব ভালো বন্ধু, যেখানেই যান দুজন একসঙ্গে যান। দুজনেই বিবাহিত। আর, আমি তখন অর্ধ-বিবাহিত – বিয়ে করেছি, তবে সংসার শুরু হয়নি। বউয়ের নানা বাঁধা এড়িয়ে শেষে গররাজি করে বেরিয়েছি— ফোনে যতটা বোঝানো যায় আরকি। আর আবুবকর এখনও পাংখা।

অন্ধকারের মধ্যে আমরা চারজন। তুহিন ভাই দেখি এসেই লম্বা হয়ে শুয়ে পড়লেন— ঘুম দরকার। অন্ধকারে বসে বসে কামাল ভাইয়ের রেললাইন ধরে হাঁটার কাহিনী শুনছি। কিভাবে মাস্তান নগর স্টেশনে তাঁকে কিছু ষন্ডাশ্রেণীর লোক আটকে ফেলেছিল, শেষে বেশ সমাদর করে তারাই আবার তাঁকে যথাস্থানে পৌঁছে দিয়েছিল, তা বেশ রসিয়ে রসিয়ে বললেন কামাল ভাই। নাহ, লোকটার মজা করার বাতিক আছে! ভালোই লাগছে।

খইয়াছড়া ঝরণা, মিরসরাই, চট্টগ্রাম

ইতোমধ্যেই অ্যাডভেঞ্চার-ভ্রমণপিপাসুদের কাছে পরিচিতি পেয়ে গেছে খইয়াছড়া ঝরণা। BanglaTrek-এ সোহরাব চৌধুরি’র দেয়া সুন্দর একটা বিবরণী^ আছে। সেখান থেকে উদ্ধৃত করছি:

খইয়াছড়া, খৈয়াছড়া ঝরণা (Khoiya Chora, Khoiyachhora Waterfall): ভৌগোলিক স্থানাংক হলো: 22°46’12.51″ উত্তর অক্ষাংশ এবং 91°36’45.20″ পূর্ব দ্রাঘিমাংশ। চট্টগ্রামের মিরসরাইতে অবস্থিত একাধিক ঝরণার একটি। বর্ণনা অনুযায়ী এটি একটি তিনধাপ ঝরণা। সারাবছরই খুব অল্প ধারায় পানি থাকে, তবে বর্ষাকালে বেশ খরস্রোতা হয়।

তবে ওখানে যে বিবরণটা আছে, তা হলো সড়কপথে খইয়াছড়া যাবার বৃত্তান্ত – আর আমরা চলেছি রেলপথে। তাই আসার আগে আমি বাংলাট্রেক থেকে সাদমান সাকিবের দেয়া জিপিএস লগ^ (বিকল্প ডাউনলোড লিংক^) নামিয়ে গুগল আর্থে বসিয়ে সঠিক অবস্থানটা বসিয়েছি মানচিত্রে। তারপর মিরসরাইয়ের আশেপাশের স্টেশনগুলোর একটা বৃত্তান্ত সংগ্রহ করে কাগজে লিখে এনেছি: আমাদের অকুস্থলের সবচেয়ে কাছের স্টেশনটা হলো মাস্তান নগর রেল স্টেশন। ঢাকা থেকে যেতে বড় বড় স্টেশনগুলোর মধ্যে আগে পড়ে ফেনী রেল স্টেশন, আর ওদিকে সীতাকুণ্ড রেল স্টেশন। মাঝখানে সব ছোট ছোট স্টেশন, তাই ট্রেন থামার কথা না। কিন্তু যেহেতু এটা মেইল ট্রেন, তাহলে একটা কিঞ্চিৎ আশা তো করাই যায়। আবুবকর আর কামাল ভাই দুজনেই নিশ্চিত করলেন মাস্তান নগর বহুদিন থেকে পরিত্যক্ত; সুতরাং আমাদের লক্ষ্য হলো এর আগের চিনকি আস্তানা রেল স্টেশন নামা।

ঢাকা থেকে খইয়াছড়া ঝরণায় যেতে ট্রেন স্টেশনগুলো (অলংকরণ: নিশাচর)
ঢাকা থেকে খইয়াছড়া ঝরণায় যেতে ট্রেন স্টেশনগুলো (অলংকরণ: নিশাচর)

সমস্যা হলো সকালে গিয়ে আমরা যখন নামবো, তখন থাকবে হরতাল। তাছাড়া শুনেছি, জামাত-শিবিরের ডাকা হরতাল নাকি সীতাকুণ্ডে খুব মারাত্মক হয়। তাই আমরা ভয়ে ভয়ে আছি, কোনো উপায় না দেখলে শেষ পর্যন্ত যদি গিয়ে সীতাকুণ্ডে নামতে হয়, তাহলে মহাঝামেলা হয়ে যাবে।

ইতোমধ্যে হালকা নাস্তা-পানি হয়েছে, আবু বকর কলা-পাউরুটির খানিকটা ওখানকার আনসারদেরও দিলেন এবং বিনিময়ে তাদের সাথে সখ্যতা কিনে নিলেন। ট্রেন পৌঁছলো আখাউড়া। পনেরো মিনিটের বিরতি। কোনো একজন যাত্রী উঠে এসে আমাদের সীটে তুহিন ভাইকে শুয়ে থাকতে দেখে বসার আবদার করলে আবুবকর সাফ না করে দিলেন। এরকম নির্দয় আচরণ দেখে আমার আবুবকরকে মোটেই ভালো মানুষ মনে হলো না। কিন্তু ঐ লোক নাছোড়বান্দা – আপনারা কি ট্রেনের দখল নিয়ে ফেলেছেন নাকি? তখন আবুবকরের পক্ষ নিলেন একজন আনসার (কলা-পাউরুটির ঘুষটা ভালোই খেয়েছে ব্যাটা): না, এখানে আমাদের অস্ত্র রাখা। বেচারা শেষ পর্যন্ত গজগজ করে চলে গেলো। আমার খুব কষ্টই হলো- এটা খুব অন্যায় হয়েছে, আমাদের সামান্য আরামের জন্য আরেকজন মানুষকে অতোটা দূর পথ দাঁড়িয়ে যেতে বাধ্য করছি। যদিও স্বীকার করছি আবুবকর এটা না করলে এতক্ষণ আমাদেরকেই হয়তো সীট ছেড়ে উঠে দাঁড়াতে হতো – মেইল ট্রেনে যে অবস্থা হয় আরকি। কিন্তু তবু মন থেকে গ্রহণ করতে পারলাম না এই জোর-যার-মুল্লুক-তার কাণ্ডটা।

জায়গায় বসে, খাড়া একটা সীটে হেলান দিয়ে কীইবা ঘুমানো যায়; তাই কখনও ওভাবেই, কখনও এক সীটে মাথা, আরেক সীটে পা রেখে মাঝখানে ঝুলন্ত অবস্থায় কোনো রকমে একটু পিঠ সোজা করে নেয়া – ঘুম কি আর আসে! তন্দ্রার মতো একটু এসে দেখা দিয়ে যায়, আর তা যেন আরো খানিকটা কাহিল করে যায় আমাদেরকে। আমাদের তিনজনের ঘুম একাই পুষিয়ে নিচ্ছেন তুহিন ভাই – সটান হয়ে দে ঘুম!

একসময় ভোরের মৃদু আলোর রেখা দেখলাম, ফযরের নামায পড়া দরকার। সঙ্গে থাকা ওয়ালটনের স্মার্টফোনে কম্পাস দেখে দিক জানালেন আবুবকর; কিন্তু নামায পড়তে পারলেন না তিনি – মেইল ট্রেনে ওযু করার জন্য টয়লেট কিংবা কোনো ব্যবস্থা নেই। কিন্তু আমার হিসাব ভিন্ন – নামায পড়তে হবে, ব্যস। নিজের পানির বোতলটা তুলে নিলাম – খাওয়া যাবে পরে, আগে ওযু সেরে নিই। চলে গেলাম দরজায়, তারপর সেখানে উবু হয়ে বসে সেরে নিলাম ওযু। তারপর সিটে বসে সেরে নিলাম ফযরের নামায। …এদিকে প্রচন্ড পেশাবের বেগ পেয়েছে। সেই রাত থেকে একবারও পেশাব করা হয়নি। প্রকাশ করতেই বুঝলাম বাকিদেরও একই অবস্থা।

একসময় ভোর হলো, ট্রেন ফেনী পেরিয়ে গেলো। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন; কিন্তু আবুবকরের একটু শুয়ে চোখকে শান্তি দেবার চেষ্টা – আমি নিশ্চিত বাইরের গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি দেখলে আবুবকর লাফিয়ে উঠবেন – এই বৃষ্টির জন্যেইতো এখানে আসা। প্রচণ্ড বৃষ্টি চাই, ঝরণায় প্রবল ঢল চাই, প্রতিকূল পরিবেশ চাই – তবেই না চ্যালেঞ্জ নিয়ে মজা আছে। এসময় একজন ধুপদুরস্ত ব্যক্তি এসে আমাদের এদিকটায় বসলেন। কিভাবে জানি না, আবুবকরের সাথে এপ্রসঙ্গ-ওপ্রসঙ্গ চলতে চলতে গন্তব্যের বিষয়ে আলাপ হলো। তিনি পরামর্শ দিলেন, আপনারা হরতালের দিনে সীতাকুণ্ড নামলে কষ্ট হয়ে যাবে। তারপর তাঁরই পরামর্শে আবুবকর এগিয়ে গেলেন ড্রাইভারের দিকে, মানে সামনের বগিটাতেই তো আমরা, তার সামনেই ইঞ্জিন। ড্রাইভারকে ৳২০০ [টাকা] দিয়ে চিনকি আস্তানায় ট্রেন থামানোর জন্য রাজি করিয়ে এলেন।

চিনকি আস্তানা আসার আগেই আমরা নিজেদের র‍্যাকস্যাক পিঠে নিয়ে প্রস্তুত, ট্রেনের গতি ধীর হবে, আমরা দুদিকের দরজা দিয়ে সুড়ুৎ হয়ে যাবো। ঢাকা শহরে চলন্ত বাস থেকে নামার যাদের অভ্যাস, তাদের নিশ্চয়ই আর নতুন করে শেখানো লাগবে না, তাছাড়া চারজনই পুরোন ট্রেকার। ট্রেনের গতি ধীর হতেই আমরা প্রপাতধরণিতল। কিন্তু নেমে যাবার পর দেখি ট্রেন পুরোপুরিই হল্ট করেছে। নাহ্‌ ঘুষখোররা দেখি ঘুষের টাকায় পাওয়া দায়িত্বে বড্ড বেশি সৎ। হায়রে সততা!

চিনকি আস্তানা স্টেশন – নাটক সিনেমায় মফস্বলের স্টেশন বললে চোখের সামনে যা ভেসে উঠে, তার সাথে একশোতে একশো ভাগ মিলে যায়। ঠিক হলো, এখানেই নাস্তা সেরে নেবো আমরা, কিন্তু নাস্তা তো পরে, সবারই প্রস্রাবের বেগ বাড়তে বাড়তে এখন তা বড়রকম, মানে পশ্চাৎদেশীয় হাঁকডাকে রূপ নিয়েছে। আবুবকর দেখা গেল কাকে বলে স্টেশনেই একটা ওয়েটিং রুমের টয়লেট খোলার ব্যবস্থা করে ফেললেন। টয়লেটের সামনে দাঁড়িয়ে এবার যেন অবস্থা আরো খারাপ হয়ে গেল একেকজনের। কিন্তু বিধি বাম- চাবি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে আবার ঘুরিয়েও নিষ্ফল, এতোটুকুন পিচ্চি একটা তালা, খুলবারই না। স্টেশনেরই একজন কর্মকর্তাও বহু চেষ্টা-তদবির করেও ব্যর্থ হলেন। এদিকে সবারই অবস্থা সঙ্গীন। প্রাকৃতিক এই বেগ যে কী মারাত্মক- ভুক্তভোগীমাত্রই জানেন।

নাহ, বেরিয়ে পড়তে হবে। এখানে হবে না। চাবি ফেরত দিয়ে দল, স্টেশন থেকে বেরিয়ে পড়লো। কিন্তু আবুবকর কোথায়? অপেক্ষা… এক মিনিট পরে আমরা ফেরত যাবার জন্য রওনা করেছি, ফিরলেন আবুবকর। ‘আয়হায়, আমার খোঁজে টীম ফেরত যাচ্ছে!! শেম অন মী। এটা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না।’ আবুবকর নিজেকে ভর্ৎসনা দিলেন – এটাই বোধহয় ট্রেকিং টীমের নেতাসুলভ আচরণ- আমি নিজে পাংকচুয়াল অ্যান্ড অ্যাকটিভ তো টীম উড়াল পাখি।

ছোট্ট স্টেশন-সড়কটা দিয়ে বেরোলেই সরাসরি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক। ডানদিকে একটা হোটেল দেখে ঠিক করা হলো এখানেই সকালের নাস্তাটা সেরে নেয়া হবে। হোটেলে ঢুকে টয়লেটের খবর নিয়ে জানা গেল, ব্যবস্থা আছে। ভিতরে গিয়ে দেখা গেল এ তো লঙ্কাকান্ড – অনেকগুলো টয়লেট আছে। এক্কেবারে পোয়াবারো। কিন্তু দলের মালপত্রও পাহারায় থাকা দরকার। আমি থেকে বাকিদেরকে পাঠালাম। একজন ফিরলে আমি গেলাম। টয়লেট এখানে সাধারণ লোকজন ব্যবহার করলেও পাকা করা আর বেশ পরিচ্ছন্ন। ট্রেকে এসে এসব পাওয়া তো হাতে আকাশের চাঁদ পাওয়ার সামিল। প্রাকৃতিক বর্জ্য নিঃসরণপূর্বক মানসিক প্রচন্ড তৃপ্তির কারণেই সবার মুখে হাসি দেখা গেল। নান, ভাজি আর ডাল দিয়ে জম্পেশ একটা নাস্তা হলো (সাকুল্যে ৳১০০)।

এবারে রাস্তায় নেমে বাসের অপেক্ষা… কিন্তু হরতালে বাস পেতে কষ্ট হবে। দুটো সিএনজি অটোরিকশা দাঁড়িয়ে আছে। ভাড়া করা হলো ‘বড় তাকিয়া’ নামক স্থান পর্যন্ত (৳২৫০)। রাস্তা ফাঁকা – হরতালের কারণেই। তবে কোথাও কোনো সমস্যা দেখা যাচ্ছে না। নিরাপদেই পৌঁছলাম আমরা বড় তাকিয়ায়। বড় তাকিয়া বামদিকে (পূর্ব দিকে) একটা রাস্তা ধরে নেমে যেতে হয় ‘কাঁঠাল বাগান’ নামক স্থানে। বড় তাকিয়ার এই রাস্তাটা আলাদা করে চেনা একটু কষ্টকর, তবে মনে রাখার সুবিধার্থে বলছি: বড় তাকিয়ায়, চট্টগ্রামের দিকে যেতে মহাসড়কের ডান দিকে একটা বাইপাস সড়ক আছে (মানচিত্রে দ্রষ্টব্য) সেখান থেকে, এই বাইপাসের মাঝামাঝিতে বাঁ দিকের সড়কপথটা। মেঠো পথ, তবে সিএনজি যাবে। আবুবকরই পথ দেখালেন, কারণ তিনি কিছুদিন আগে ৫০ জনের দল নিয়ে এসেছিলেন।

কাঁঠাল বাগান নেমে ট্রেক শুরু। আরো একটু পূর্বদিকে যেতে হবে হাঁটা পথে। এদিকে গুড়িগুড়ি বৃষ্টি যাও একটু হচ্ছিলো, তা সরে গিয়ে মিষ্টি রোদ উঠেছে। পথ ধরে চলতে চলতে একসময় কলকল আওয়াজ পাওয়া গেল – আর আবুবকরের মন এতোটাই খারাপ হয়ে গেল যে, একবার কিছুক্ষণের জন্য থ’ হয়েই দাঁড়িয়ে গেলেন। ঝিরি ধরে কলকল করে পানি যাচ্ছে – এতে মন খারাপের কারণ কী বোঝা গেল, যখন জানলাম, ও-ই তলায় কলকল করে যে পানি যাচ্ছে, এর আগের বার রাস্তা ছুঁইছুঁই করছিল সেই পানি। সুতরাং আমাদের সব পরিকল্পনা যে ভন্ডুল, তা আর বলাই বাহুল্য। যুদ্ধই যদি না হলো, তবে হাতিয়ার মজবুত করে লাভটা কী? তবু চললাম আমরা, ঝরণাটাতো আর দেখা হয়নি আগে।

গতবার দলকে নিয়ে গিয়েছিলেন স্থানীয় এক ব্যক্তি, তাঁর ঘরে গিয়ে তাঁকে পাওয়া গেল না, তবে তাঁর বাবা আবু তালহাকে (ছদ্মনাম) পাওয়া গেল, বয়স চল্লিশ-পয়তাল্লিশ হবে। তাঁকে গাইড ঠিক করেই দল চললো। আমাদের ব্যাগ ও’বাড়িতে রেখেই নিজেদের দরকারি জিনিসপত্র ভাগাভাগি করে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম আমরা। একটা হাত-দা হাতে লুঙ্গি আর সবুজ পাঞ্জাবি পরা শ্মশ্রুমণ্ডিত তালহা সাহেব পথ দেখিয়ে চললেন ধানের আ’ল ধরে ধরে। মহাসড়ক থেকে উত্তর-পূর্ব দিকে দেখা যাচ্ছে উঁচু পাহাড় – বোঝাই যাচ্ছে, ওখানে অপেক্ষা করে আছে পাহাড়ি ঢল নামা ঝরণা।

খইয়াছড়া ঝরণার পথে প্রাকৃতিক রকস্টার - একাধারে রকস্টার এবং রক স্টারও। (ছবি: নিশাচর)
খইয়াছড়া ঝরণার পথে প্রাকৃতিক রকস্টার – একাধারে রকস্টার এবং রক স্টারও। (ছবি: নিশাচর)

একসময় নেমে যেতে হলো ঝিরিতে (সিলেটি ভাষায় এগুলোকে বলে: ‘ছড়া’)। একটা নালা দিয়ে যেভাবে পানি যায়, বিষয়টা সেরকমই, তবে শহুরে নালার সাথে এর বিস্তর ফারাক- এই পানি পরিষ্কার, শীতল, আর সবুজ বনানীতে ঘেরা। বৃষ্টির দিনে আগে ট্রেক করা হয়নি আমার- গ্রামের পথে হেঁটেছি বহুবার। তাই মনে করিয়ে দিচ্ছি: বৃষ্টির দিনে ট্রেক মানেই হলে প্যাঁচপ্যাচে কাদা আর জঙ্গলের বাসিন্দা সদ্য জন্মোজাত জোঁকের পিচ্চি বাবু।

পথে যেতে যেতে একটা পাথর দেখা গেল বাম দিকে, পাথরটার উপরই গজিয়ে গেছে গাছপালা- মনে হচ্ছে ঝাঁকড়া চুলের একজন রকস্টার যেন (আরে! Rockstar শব্দটার মধ্যেই একটা rock আছে দেখছি!)। বান্দরবানের মতোই বড় বড় পাথর পড়লো মাঝে মাঝে, পাশ কাটিয়ে কিংবা উৎরিয়ে এগিয়ে পথ চলা। তবে পা খুব সাবধানে ফেলতে হয়, কারণ শীতের ট্রেকের মতো বর্ষায় ট্রেক করলে হবে না, এখন চলার পথটা পিচ্ছিল।

প্রায় ভূমি সমান্তরালে জাল বুনেছে মাকড়সা (ছবি: নিশাচর)
প্রায় ভূমি সমান্তরালে জাল বুনেছে মাকড়সা (ছবি: নিশাচর)

এক জায়গায় দেখলাম ঝিরির উপরই বিরাট জায়গা জুড়ে মাকড়শা একটা বড়সড় বিস্তৃত জাল বানিয়েছে। মাকড়সার জাল বোনার একটা অ্যানিমেশন দেখেছিলাম এনকার্টা এনসাইক্লোপিডিয়ায়: বাতাস যেদিক থেকে আসছে, সেদিকে বসে জালের সুতা বের করতে থাকে, বাতাস সেটাকে উড়িয়ে উড়িয়ে অন্যপাশের ডালে আটকে দেয়, ব্যস, তারপরতো কাজ সোজা: রশি ধরে ধরে মাঝ বরাবর গিয়ে কাটাচামচের মতো করে দুনলা সুতা মূল সুতায় আটকে একগাছি সুতা নিয়ে নিচের দিকে ঝুলে পড়ে জালের মূল আকৃতি দেয়া। এজন্যই বেশিরভাগ মাকড়শার জাল দেখেছি ভূমির সাথে লম্বালম্বি- কিন্তু এই জালটা একটু ব্যতিক্রম- ভূমির প্রায় সমান্তরাল।

এই ঝিরি ধরেই যেতে হয় খইয়াছড়া ঝরণায়। ছবিতে তুহিন ভাইকে দেখা যাচ্ছে। (ছবি: নিশাচর)
এই ঝিরি ধরেই যেতে হয় খইয়াছড়া ঝরণায়। ছবিতে তুহিন ভাইকে দেখা যাচ্ছে। (ছবি: নিশাচর)

কিছুদূর যাবার পর এবার হঠাৎই পথটা, ঝিরি থেকে, ডানদিকের পাহাড়ে উঠে গেলো। পাহাড় বাওয়া তো কোনো বিষয়ই না, কিন্তু বর্ষা মানে হলো পিচ্ছিল ঢালু পথ। পা আটকে উপরে ওঠা একটু কষ্টই। আমার মতো পাটকাঠিরই যদি পতনোন্মুখ অবস্থা হয়, তাহলে কামাল ভাই আর তুহিন ভাইয়ের যে কী অবস্থা হবে বোঝাই যাচ্ছে।

উপরে এক্কেবারে প্যাঁচপ্যাচে কাদার মধ্যে দিয়ে পথচলা, কিন্তু ট্রেকারদের জন্য এগুলোই হলো ‘পথ’। এটাকে পাহাড় না বলে টিলা বলা ভালো। মাঝে মাঝেই বামদিকে গাছের ফাঁক দিয়ে ঝিরির পানি দেখা যাচ্ছে- পাথুরে পিচ্ছিল উঁচু-নিচু পথ, তাই বাইপাস হয়ে এই টিলা ধরে যাচ্ছি আমরা। কোথাও আবার ঝিরিতে ঢালু পাথরে পানির স্রোত তীব্র, আর পিচ্ছিল তো সর্বত্রই। কামাল ভাই আর আমি, দুজনেই ছবি তুলে তুলে এগোচ্ছি।

প্যাঁচপ্যাঁচে কাদা আর গাছপালা-আচ্ছাদিত সরু পথ - এগোচ্ছি আমরা খইয়াছড়া ঝরণার দিকে। (ছবি: নিশাচর)
প্যাঁচপ্যাঁচে কাদা আর গাছপালা-আচ্ছাদিত সরু পথ – এগোচ্ছি আমরা খইয়াছড়া ঝরণার দিকে। (ছবি: নিশাচর)

বর্ষার ট্রেকে গাছপালার রং যেমন অপূর্ব হয়, তেমনি পাওয়া যায় বর্ষাকালীন ফুলের দেখা। অপূর্ব লাগছে প্রকৃতিটা। এসময় বামদিকে উপরের দিকে একটু উঁচুতে উঠেই বাইপাস করতে হলো ঝিরিকে। উপরের দিকে উঠার ব্যাপারটা একটু কষ্টসাধ্য, কারণ পিচ্ছিল এঁটেল মাটির পথ। সামনে এগিয়ে গিয়ে দেখি একটা মৃদু ঝরণার উপরে অবস্থান করছি আমরা। শেষ মাথায় গিয়ে ধপ্ করে পড়ে যাচ্ছে পানি, আর ওখানটায় পানির ফোঁটাগুলো দেখতে অপূর্ব লাগছে, মনে হচ্ছে রাজার মাথায় স্ফটিক স্বচ্ছ হিরার মুকুট পরিয়ে দেয়া হয়েছে যেন।

পাথরের ধাপে ধাপে পানির ক্রমাগত আঘাতে কিভাবে থিতিয়ে বিশুদ্ধ হচ্ছে পানি, তাও দেখবার মতো দৃশ্য বটে – যেনবা প্রত্যেকটা পার্টিকেলে ভাগ হয়ে পানি তার শুদ্ধতা কিনে নিচ্ছে প্রকৃতি থেকে – কিংবা হয়তো এর উল্টোটা – ঈশ্বরই ভালো জানেন। সবুজ পাতার উপরে চোখে পড়লো লালচে গোলাপি রঙের ফড়িং – এগুলোকে আমি ডাকি হ্যালিকপ্টার – অপূর্ব দৃশ্য!

এরই মধ্যে গাইড আবু তালহা আর তুহিন ভাইকে জোঁকে কামড়েছে। বাকিরা এখনও আক্রান্ত হইনি, কিন্তু জোঁক দেখলেই মনে হয়, এই বুঝি শরীরের কোনো এক জায়গায় আছে একটা। তুহিন ভাইয়ের শরীরে যে জোঁকের বাবুটাকে পাওয়া গেল, ওটাকে পাওয়া গেল পিঠে। তাই অযথাই নিজের শরীরে শিরশির করতে থাকলো…

খুব বেশি দূরে না… আরেকটু সামনে যেতেই চোখে পড়লো বিশাল ঝরণাটা – খইয়াছড়া ঝরণা। বর্ষাকাল বলেই হয়তো, স্বাভাবিক বৃষ্টিতে মোটামুটি জল আছে, মন্দ না। মন হয়তো খারাপ হবার কথা, কারণ ঝরণাটার ভয়ঙ্কর রূপ দেখবার জন্য এসেছিলাম, শান্ত রূপ না। তবু ঝরণা বলে কথা – মনটাই ভরিয়ে দিলো। বাংলাট্রেক-এর নিবন্ধ অনুযায়ী, এটি হলো এই ঝরণার প্রথম ধাপ (নিচের ধাপ), উপরে নাকি আরো দুটো ঝরণা আছে।

ঝরণা জিনিসটা আসলে কী? না বোঝার কথা না, কিন্তু সব কনসেপ্ট সবার থাকে না। তাই ভেঙ্গে বললাম:

ঝরণা: স্থলে যেমন বৃষ্টি হয়, পাহাড়েও সেরকম বৃষ্টি হয়, বরং পাহাড়ে গাছগাছালি বেশি থাকে বলে বৃষ্টির পরিমাণটাও একটু বেশি থাকে। যাহোক, বৃষ্টি হলে পানি, মাধ্যাকর্ষণের কারণে উঁচু স্থান থেকে ঢালু জায়গার দিকে বইতে থাকে। বৃষ্টির ফোঁটায় আর ক’ফোঁটা পানি থাকে? টেপের পানির মতো একফোঁটা পানি এদিক থেকে যাচ্ছে, আরেক ফোঁটা পানি ওদিক থেকে আসছে, আরো কয়েক ফোঁটা পানি ঐ যে ওদিকের উঁচু জায়গা থেকে আসছে – সবারই লক্ষ্য হলে নিজের অবস্থান থেকে একটু ঢালুর দিকে এগিয়ে চলা। বিন্দু বিন্দু জল যে সাগর গড়ে বিষয়টা কবিতার মতো করেই আমরা সবাই-ই জানি। ফোঁটা ফোঁটা জল ঝরতে থাকলে এক বালতি পানি হতে বেশিক্ষণ লাগে না। এবারে চিন্তা করুন, এভাবে শত সহস্র ফোঁটা জল যখন তাদের অবস্থান থেকে ঢালু জায়গার দিকে চলতে থাকে, তখন পথিকই পথের জন্ম দেয় বলে যে কথাটা আছে, তা-ই তাদের জন্য সত্য হয়ে দাঁড়ায়। সব জলকণা একত্র হয়ে বালতি বালতি জলে রূপ নেয়। আর বালতি বালতি জল আরো ঢালুতে জড়ো হয়ে হয় গামলা গামলা জল, গামলা গামলা জল আরো ঢালুতে জড়ো হয়ে হয় ট্যাংকি ট্যাংকি জল – সবেতে মিলে এবারে মিছিল করে যেদিকে যাবে, সেদিকে যে সব ধুয়ে মুছে সাফ করে যাবে, তা আর বলাই বাহুল্য। ব্যাপারটা হয়ও তাই। তাদের চলার পথটা হয়ে দাঁড়ায় আমাদের কাছে, খাল, ঝিরি কিংবা খাড়ি। এরই বড়সড় রূপটাকে আমরা ‘নদী’ বলি। এখন এই ঝিরি, খাল কিংবা খাড়ির জল-মিছিলটাতো চলছে আরো ঢালু জায়গার দিকে… চলছে, চলছে, তো চলছেই… যতক্ষণনা সমুদ্রসমতলে পৌঁছায়। কিন্তু চলার পথ তো আর সব জায়গায় মসৃণ না, দশতলা বিল্ডিং-এর উপর দিয়ে চলতে চলতে হঠাৎ যদি পায়ের তলা থেকে মাটি উধাও হয়ে যায়, ব্যাপারটা যা হবে, ওদের জন্যও ব্যাপারটা তাই হয়, ধপাস করে হুমড়ি খেয়ে জলের মিছিলটা পড়ে নিচে। তাদেরকে অনুসরণ করে পিছনের জলধারাও। নিচে পড়ে আরো ঢালের দিকে আবারও চলতে থাকে অবিরাম পথচলা। আর, আমরা ঐ ঢালের নিচটায় দাঁড়িয়ে তখন অবাক দৃষ্টিতে তাদের দিকে চেয়ে দেখে বলি: আহ্‌! কী অপূর্ব ঝরণা। অথচ বেচারা জলকণাগুলোর আছাড় খেতে খেতে কী যে দশা হচ্ছে, তার খবর নেই। 🙂

খইয়াছড়া/ খৈয়াছড়া ঝরণা, মিরসরাই, চট্টগ্রাম - জুলাই ২০১৩। (ছবি: নিশাচর)
খইয়াছড়া/ খৈয়াছড়া ঝরণা, মিরসরাই, চট্টগ্রাম – জুলাই ২০১৩। (ছবি: নিশাচর)

অনেকেই ঝরণার সামনে গিয়ে ঈশ্বরের গুণকীর্তন করতে করতে একসা করে ফেলে- এতো পানি যে কোথা থেকে আসে, আল্লা’র এক মহিমা বটে। মানবকীর্তির উর্ধ্বে কিছু দেখলেই ঈশ্বরের মহিমা কীর্তনের রীতিটা আমাদের পূর্বপুরুষদের ঐ সর্বেশ্বরবাদ পৌত্তলিক ধর্মগুলো থেকে ধার করা এক ব্যাধি বটে। অনেকেই আবার রূপকথা বানায়: এগুলো আসলে পাহাড়ের কান্না। আমার প্রশ্ন হলো পাহাড়ের কি বর্ষা এলেই জগতের সব দুঃখ-কষ্ট এসে ঘিরে ধরে নাকি? (আমার বাড়ির কাছে সিলেটের মাধবকুণ্ড ঝরণা – এসব ছাইপাশ শুনতে শুনতে আমি যারপরনাই বিরক্ত)। এজন্যই ঝরণার ধারণাটা বুঝিয়ে বলা আরকি।

খইয়াছড়া ঝরণার পাদদেশে আমাদের রজ্জু তীরোপারের প্রস্তুতি - কামাল ভাই আর গাইড বসে আলোচনা করছেন, তুহিন ভাই আর আবুবকর মিলে জিনিসপত্র বের করছেন। (ছবি: নিশাচর)
খইয়াছড়া ঝরণার পাদদেশে আমাদের রজ্জু তীরোপারের প্রস্তুতি – কামাল ভাই আর গাইড বসে আলোচনা করছেন, তুহিন ভাই আর আবুবকর মিলে জিনিসপত্র বের করছেন। (ছবি: নিশাচর)

আমরা মুহূর্ত দেরি না করে আমাদের কর্মে ব্রতী হলাম। সরঞ্জামাদি নিয়ে যেহেতু এসেছি, তাহলে তা কাজে লাগাবোই। জল কম, তাতে কী? উদ্যম তো আর কম না। ঠিক করা হলো, ঝরণার এপাশ-ওপাশ জুড়ে গাছ থেকে গাছে রশি বাঁধা হবে। সেই রশি ধরে ঝুলে ঝুলে আমরা এপাড়-ওপাড় যাবো। আবুবকর জানালেন, এর একটা ইংরেজি গালভরা নাম আছে: Tyrolean Traverse (উচ্চারণ: টাইরোলীন ট্র্যাভার্স)- বাংলায় এর কোনো অর্থ নেই- আমরা বানিয়ে নিতে পারি: রজ্জু পারাপার, কিংবা আরেকটু সাহিত্যিকভাবে: রজ্জু তীরোপার

আমার জন্য এই পুরো ব্যাপারটাই হাতেকলমে এক্কেবারে নতুন। টিভিতে অনির্বাণ অনুষ্ঠানে সেনাবাহিনীকে, কিংবা বিদেশী যুদ্ধের মুভিগুলোতে দেখেছি হয়তো। তাই পদ্ধতিটা বুঝে নিতে চাইলাম। আবুবকর, রশিটশির বিষয়গুলো শিখে এসেছেন হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইন্সটিটিউট (HMI) থেকে। কিন্তু অনভ্যাসের কারণে ভুলে গেছেন কিভাবে জানি কী করতে হয়। তিনি, কিভাবে রশিগুলোকে পদ্ধতিগতভাবে বাঁধলে ক্যারাবিনার আর পুলি লাগিয়ে সহজে পার হওয়া যাবে- তার হিসাব মিলাতে একটু দেরি করে ফেলছেন।

নেতার এই সিদ্ধান্তহীনতা দলের জন্য কিছুটা ‘কাল’ হলো, এবং আমাদের জন্য এক চরম অশুভ পরিণাম অপেক্ষা করছিল।

(চলবে…)

-মঈনুল ইসলাম

পরের পর্ব »

৭ thoughts on “জলপ্রপাতের খোঁজে – ছোট বোয়ালিয়া আর মালিখোলা

  1. খুব ভালো হয়েছে। আপনার লেখার হাত চমৎকার নয়ন ভাই। আপনার সাথে আমার একবার ফোনে কথা হয়েছিল। মনে আছে কিনা জানি না। আপনি আবু বক্কর ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ করতে বলেছিলেন। আমি কিন্তু এখন তার সংস্পর্শে আছি।

মন্তব্য করুন