ইংরেজিভীতি থেকে ইংরেজিপ্রীতি : উপক্রমণিকা

আমরা যখন পাহাড়ে যাই, তখন সেখানে পশ্চাৎদেশীয় কৃতকর্ম সারার কোনো সুন্দর পদ্ধতি নেই, আসলে পাহাড়িরা বেশিরভাগই পাহাড়ের পাদদেশে, কিংবা জলধারার কাছে কোনো পাথরের আড়ালে, উন্মুক্ত স্থানেই কাজটা অনায়াসে সেরে ফেলে। আমার এক বন্ধু সকালের আলো ফুটবার পরে কৃতকর্মটি পাথরের আড়ালে শুরু করেছে, মাঝপথে যেতেই হঠাৎ পাশের পাহাড় থেকে দুজন নামছে দেখে, সে তল্পিতল্পা গুটিয়ে দাঁড়িয়ে গেল – ভাবটা এমন: আমি কিছুই করছি না 😄। …আর সেই উচ্ছিষ্ট যে আবার ঘুরেফিরে তাদের পেটেই যায় – সেটা নাহয় এখানে না-ইবা বললাম… (বিস্তারিত: অফ-ট্র্যাক বান্দরবান – এনেঙ পাড়া)

যারা এই এতটুকু পড়ে খুব বিরক্ত হয়ে গেছে যে, ইংরেজি শিখার সাথে এর কী সম্পর্ক, তাঁদেরকে বলবো, দয়া করে লেখাটা পড়া বাদ দিয়ে উঠে পড়ুন, কারণ আপনি সারা জীবন ইংরেজি শিখতে পারেননি, আজও পারবেন না, কারণ আপনি আমার সেইসব বন্ধুদের মতো, যারা ইংরেজি ক্লাসে যেতো ইংরেজি শিখার জন্য।

এটা আবার কেমন কথা? ইংরেজি ক্লাসেই তো ইংরেজি শিখার জন্যে যাবো… আজব!!! o.O

তথ্য আর জ্ঞান উৎস: www.gapingvoidart.com
তথ্য আর জ্ঞান
উৎস: www.gapingvoidart.com

আসলে আপনিই আজব। পাশের ছবিটা দেখুন: তথ্যগুলো ছড়িয়ে থাকে এখানে-ওখানে, সবখানে, জীবনের বিভিন্ন ধাপে, বিভিন্ন ক্ষেত্রে, বিভিন্ন পাত্রে…। ইংরেজির তথ্য থাকতে পারে সমাজ বিজ্ঞান ক্লাসে, বিজ্ঞানের তথ্য থাকতে পারে ৩ বছর বয়সী একটা বাচ্চার কাছে, কমোড ব্যবহার করার শিক্ষা থাকতে পারে একজন পাহাড়ির কাছে… তাহলে আপনি তথ্য নেয়ার ক্ষেত্রে কেন এতো বাছবিছার করেন? যেখানে যা পান নিতে থাকুন – একদিন আপনি আশ্চর্য হয়ে আবিষ্কার করবেন, আরে, আমি ৫ বছর বয়সে যে খেলনাটা দিয়ে খেলেছিলাম, সেটাই আজকে আমাকে আর্কিটেক্ট হিসেবে বিল্ডিং নকশা করতে সহায়তা করছে!

তাই জীবনে চলার পথে, নিতে থাকুন… ভুলে যান, কী উদ্দেশ্যে কী নিতে বসেছেন… শুনে যান, দেখে যান, গিলে যান… একদিন ঠিকই সব খাপে খাপে মিলে যাবে, সেদিন আপনার জ্ঞান তৈরি হবে।

 

মনে রাখতে হবে, ইংরেজি একটা ভাষামাত্র, ঠিক যেমন ভাষা বাংলা, উর্দু, আরবি, হিন্দী, ফারসি, ফরাসি ইত্যাদি। আর, স-ব ভাষার ক্ষেত্রেই নিয়মটা একই। ভাষার দরকারই হলো মানুষে-মানুষে যোগাযোগ রক্ষার্থে। সাহিত্যচর্চা করার জন্য ভাষা শিক্ষার দরকার হয়, আমরা সেই উচ্চমার্গীয় চিন্তা-ভাবনার জন্য ভাষা শিক্ষার কথা বলছি না, আমরা বলছি ঠেকার কাজ চালিয়ে নেয়ার মতো ভাষাশিক্ষার কথা। বাস্তব উদাহরণ দেই:

আমার বড় খালু সৌদি আরব গিয়েছেন। দুয়েকটা আরবি তিনি জানেন। একদিন তিনি থাকার জায়গা থেকে কর্মক্ষেত্রে যাচ্ছেন, কর্মক্ষেত্রের কাছে গিয়ে ট্যক্সি ড্রাইভারকে আরবিতে বললেন, ইমশি (إمشي)। ড্রাইভার চালিয়েই চলেছে। হাইওয়েতে গাড়ির গতি থাকে বেশ, তাই তিনি আবারও বললেন, ইমশি। কিন্তু ড্রাইভার এখনও থামছে না। তিনি তো মহাচিন্তায় পড়ে গেলেন। তিনি তো জানামতে ঠিক আরবি শব্দটাই ব্যবহার করছেন। তিনি আরো একবার চেষ্টা করলেন। না, ড্রাইভারের থামার কোনো লক্ষণই নেই। অবশেষে তিনি না পারতে উল্টো কথাটা বললেন, ও’গ্গফ (توقف)। এবারে ড্রাইভার ঠিকই গাড়ি সাইড করে দাঁড় করালো। তিনি এরই মধ্যে প্রায় ১ কিলোমিটারের বেশি জায়গা পার করে চলে এসেছেন। নিশ্চয়ই বুঝে গেছেন, তিনি থামো আর চলো শব্দদুটোর আরবি বলতে গিয়ে উল্টা বলছিলেন, যখন উনি থামো বলছিলেন, আসলে তিনি বলছিলেন ‘চলো’, তাই ড্রাইভারও চালিয়েই গেছে।

এটা ছিল যোগাযোগ রক্ষায় ভাষার ব্যর্থতা। তিনি ভাষা ব্যবহার করে সঠিক যোগাযোগ রক্ষা করতে পারেননি। আবার, আমার এক আত্মীয় একবার গল্পচ্ছলে বলেছিলেন:

ওমুক ব্যক্তি এক মার্কিনীর সাথে কথা বলছে ইংরেজিতে। এখন কথায় কথায় ঝুড়ির প্রসঙ্গ এসেছে, তো সে বলছে, “O, we carry mango with a… a… a…” আমতা আমতা করছে। কোনোভাবেই তার মাথায় ‘ঝুড়ি’-কে ইংরেজিতে যে basket বলে, সেটা আসছে না। কিন্তু কিছু একটা বলে তো বোঝাতে হবে। তখন সে মুখের ভাষার সাথে ইশারা ব্যবহার করলো, বললো: “…with a thing made of bamboo, something like this shape…” বলে সে হাত ইশারায় ঝুড়ির চেহারাটা বুঝিয়ে দিলো। তখন অন্য লোকটি বললো, “O, you are meaning basket, right?” – লোকটা বুঝে ফেললো।

এটাই ছিল সফল যোগাযোগ, লোকটি ইংরেজি না পারলেও যোগাযোগ ঠিকই সফল হয়েছে। আসলেও, ইংরেজি কিংবা অন্যান্য ভাষাগুলো আমাদের শ্রেফ দরকার যোগাযোগের জন্য। অতটুকু হলেই আমাদের বেশিরভাগ মানুষের হয়ে যাবে

তো কিভাবে এই ইংরেজি ভাষাটা শিখবো?

ভাষাশিক্ষার মন্ত্র

ভাষাশিক্ষা, তা সে যেকোনো ভাষাই হোক না কেন, চাই বাংলা, ইংরেজি, ফারসি, জাপানী… ব্যাংকার লুবাবুল ইসলাম বলছেন, এক যাদুমন্ত্রের কথা:

চিন্তা করে দেখুন তো, আমরা বাংলা কিভাবে শিখি? জন্মের পরেই আমরা সবার আগে, ভাষাকে দেখতে শিখি। বাবা মা আমাদেরকে ঠোঁট নেড়ে ডাকেন, আমরা তাঁদের ঠোঁট নাড়া দেখি। তারপর, আমরা শুনতে শিখি। আমরা শুনতে পাই, বাবা-মা আমাদেরকে ডাকছেন, “বাবা আয়…”, “মা কোলে আয়…”। এরপর আমরা ভাষাটা উচ্চারণ করা শিখি। আমরা বলি, “বা” “বা” হয়ে যায় “বাবা”, তারপর এই শব্দগুলোর সাথে আরো শব্দ জোড়া লাগানো শিখে ফেলি, হয়ে যায়: “মাঃ ভাঃ” (মা, ভাত খাবো)। এসব করতে করতেই আমরা কিন্তু কঠিন করে বাক্য বলতে শুরু করে দেই: “মা, পাশের বাসার অপু আমার খেলনা নিয়ে গেছে।” শ্রেফ, দেখা, শোনা আর উচ্চারণ করে করেই আমরা সেটা করে ফেলতে পারি। এরপর আমরা ভাষাকে লিখতে শিখি। আমরা আশ্চর্য হয়ে দেখি, “ঈ” লিখতে কী প্যাঁচগোছ দিতে হয়, জানটা বেরিয়ে যায়। তারপর আমরা ভাষার ব্যাকরণ শিখি

লুবাব সাহেবের কথাটা সাজালে ধাপগুলো এমন:

  1. ভাষা দেখা
  2. ভাষা শোনা
  3. ভাষা বলা
  4. ভাষা লেখা
  5. ভাষার ব্যাকরণ জানা

লুবাব সাহেবের কথাগুলো এবারে একেবারে মাথায় ঢুকিয়ে দিই: আপনারা এখানে যারা আছেন, আমি তাদের একজনকে বললাম:

এই, তুমি বসেন তো…

আর, আরেকজনকে বললাম,

এই, আপনি দাঁড়াও তো…

আপনারা সবাই তো হেসে কুটিকুটি… 😆 এই লোকটা কী সব ভুলভাল কথা বলছে… “তুমি” বললে তো হবে “বসো”, “আপনি” বললে তো হবে “বসেন”…।

আপনাকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে বললাম, “আচ্ছা, আমার ভুল যে ধরতে এসেছেন, বলেন তো, এটা বাংলা ব্যাকরণের কোন কারণে ভুল?” এবারে দেখা যাবে আপনি চুপষে গেছেন (অধিকাংশের ক্ষেত্রেই এটা ঘটবে)। আপনি হলফ করে বলে দিতে পারছেন, আমার কথাগুলো ভুল, অথচ আপনি জানেন না, গ্রামারের কোন ধারার কারণে, কেন এটা ভুল।

…কেন এটা হচ্ছে?

এটা হচ্ছে, কারণ আপনি ভাষা, গ্রামার দিয়ে শিখেননি, ব্যাকরণ ঘেঁটে শিখেননি – জীবনে উঠতে-বসতে, চলতে-ফিরতে, এতোবার “তুমি”র সাথে “বসো” আর “আপনি”র সাথে “বসেন” ব্যবহার করেছেন যে, এর বাইরে আর কিছুর কথা চিন্তাই করতে পারেন না। কোনো ব্যাকরণ জানার দরকার নেই আপনার। …ভাষাশিক্ষায় ব্যাকরণের দরকার সবা–র পরে।

অথচ আপনি ইংরেজি শিখতে গিয়ে সবার আগে বেশি বেশি করে গ্রামার মুখস্থ করছেন, গ্রামার দিয়ে বাক্যরচনা করা শিখছেন… ইংরেজি যদি বাংলারই মতো একটা ভাষা হয়ে থাকে, তবে বাংলা যেভাবে শিখেছেন, ইংরেজিও সেভাবেই আপনার শিখার কথা; অথচ আপনি ঠিক উল্টো পথে হাঁটছেন। …ইংরেজি কি শেখা হবে আপনার? নাকি কষ্টই শুধু বাড়বে?

 

ইংরেজি আর বাংলা দুটোই সমান - ভাষা - নিশাচর
ইংরেজি আর বাংলা দুটোই সমান – ভাষা

ডান হাতটা চোখের সামনে ধরুন। এটা হচ্ছে বাংলা ভাষার স্থান। আর বাম হাতটা মাথার উপরে ধরুন – আপনার কাছে ইংরেজির স্থান বাংলার তুলনায় এরকমই উপরে। কারণ আপনি মনে করেন, ইংরেজি একটা কঠিন ভাষা, ইংরেজির একটা আলাদা গুরুত্ব আছে। আমি বলছি বাম হাতটা নামিয়ে নিয়ে এসে ঠিক ডান হাতটার সমান উচ্চতায় ধরুন – এবারে বাংলা আর ইংরেজি সমান। হ্যাঁ ঠিক দেখছেন, দুটোই ভাষা। একটা বাংলা, আরেকটা ইংরেজি। যদি বাংলা আপনার জন্য সহজ হয়, তবে ইংরেজিও তা। দুটোই ভাষা – দুটো আসলে একই জিনিস। নিজের মনকে আগে এই পার্থক্যহীনতাটা বোঝান। ইংরেজি কোনো আহামরি কিছু না – শ্রেফ বাংলার মতোই পৃথিবীর আরেকটা ভাষা মাত্র।

 

আসুন তবে, আমরা নতুন করে ইংরেজি (পড়ুন ‘ভাষা’) শিখার চেষ্টা করি… আগামী পর্বগুলোতে আমরা দেখবো কিভাবে ইংরেজি (পড়ুন ‘ভাষা’) শিখবো না… কিভাবে শিখবো… যারা পারেন, তারা কিভাবে পারেন, আর যারা শিখছেন, তারা কিভাবেইবা শিখতে পারছেন…

(চলবে…)

– মঈনুল ইসলাম

পরের পর্ব »

One thought on “ইংরেজিভীতি থেকে ইংরেজিপ্রীতি : উপক্রমণিকা

মন্তব্য করুন