Bangladesh DX Club-এর ৩দিনব্যাপী ফিল্ড ট্রেনিং-এ অ্যামেচার রেডিও শেখা

আমি গুরু ধরা শিক্ষায় বিশ্বাস করি।

তাই সম্প্রতি বাংলাদেশ ডিএক্স ক্লাব (BDXC)-এর ৩-দিনব্যাপী ৬ষ্ঠ ফিল্ড অপারেশন-এ বিনা দ্বিধায় যোগ দিলাম। এতে আমরা ২৭জন অংশগ্রহণ করি, যার মধ্যে আমিসহ আমরা দুজন ছিলাম, যাদের এর আগে রেডিওতে RX – Receive কিংবা TX – Transmit করার অভিজ্ঞতাই ছিলো না। এই ইভেন্ট আমাদের জন্য যে কী ছিলো— তার গল্পটা না বললেই নয়। এতো কথা পড়ার যদি আপনার আগ্রহ না থাকে, একটা কথা শুধু জেনে রাখুন:

অ্যামেচার রেডিও অপারেটররা দুর্যোগে, কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে দায়িত্ব না পাওয়া পর্যন্ত
নিজে থেকে ঝাঁপিয়ে পড়েন না।

অ্যামেচার রেডিও’র লাইসেন্স পেতে পরীক্ষা-প্রস্তুতি নিয়ে আগেও লিখেছিলাম, সেই নিবন্ধে বাংলাদেশ ডিএক্স ক্লাবের কথাও ছিলো। যাঁরা এখনও পড়েননি, পড়ে দেখতে পারেন, অ্যামেচার রেডিও সম্বন্ধে অনেক ভুল ধারণার অবসান হবে আপনার।

সচেতন থাকুন
এই নিবন্ধে যত জ্ঞান কবচাচ্ছি, সবই এই ফিল্ড ট্রিপ থেকে শেখা। যা ভুল বলছি, তা আমার শেখার ঘাটতি। আর যা ঠিক বলছি, তা আমার শিক্ষকদের অবদান।

ছোট্ট পরিচিতি

বাংলাদেশে অ্যামেচার রেডিও বা হ্যাম রেডিও অপারেশন যাঁরা করেন তাঁরা অনেকেই একত্র হয়ে বিভিন্ন মোটিভ থেকে বিভিন্ন ক্লাব প্রতিষ্ঠা করেছেন। ক্লাবগুলোর মূল উদ্দেশ্য: এই শখের বসে করা কাজটাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। একজন নটর ডেমিয়ান হিসেবে জীবনে অনেক ক্লাব দেখার সৌভাগ্য হওয়ায়, আমার কাছে ক্লাবগুলো বিভক্তি নয়, বরং বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির স্বাধীন চর্চার ক্ষেত্রই বেশি মনে হয়। তাই ক্লাবে-ক্লাবে রেষারেষি, দোষারোপ করার বদলে গঠনমূলক সমালোচনাই আমার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। প্রত্যেকটা ক্লাবের স্বকীয় নীতি, আদর্শ, দায়বদ্ধতা আছে। সেই দায়বদ্ধতা থেকে তাঁরা মাঝে মাঝে নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর মতো এরকম কিছু ইভেন্ট করেন, যেখানে অন্যান্য হ্যামদের মাঝে কিংবা সাধারণ মানুষের মাঝে নিজেদের চিন্তা, গবেষণা, কার্যক্রম তুলে ধরেন— এর বদৌলতে অংশগ্রহণকারীরা যেমন অগ্রজদের থেকে শিখতে পারেন, ক্লাবগুলো তেমনি বিভিন্ন বয়স/শ্রেণী/পেশার মানুষের আগ্রহ/চিন্তা সম্পর্কে জানতে পারেন, কম্যুনিটিও বড় হয়।

BDXC’র আগের ৫টা ফিল্ড অপারেশনের চেয়ে এবারের আয়োজন ব্যতিক্রম ছিলো এর ট্রেনিং সেশনে; আয়োজিত হয়েছিলো কুমিল্লার লালমাইতে রিজিওনাল স্কাউন্ট ট্রেইনিং সেন্টারে। গল্পের শুরু একদিন আগেই… ১৬ জুলাই ২০২৬…

বুলডোজার

ভেনুতে উপস্থিত হবার সাথে সাথে কড়া স্ট্যান্ডআপ মিটিং

বিভিন্ন কারণে পৌঁছতে দেরি হয়ে গেলো আমাদের— রাত ১টা বাজে পৌঁছার সাথে সাথেই BDXC’র বর্তমান সভাপতি আব্দুল্লাহ ফাহাদ ভাই (S21AF) বেশ ঝড়ো স্ট্যান্ড-আপ বক্তৃতা দিলেন। মোটা দাগে তার কিছুটা সারমর্ম এরকম:

  • শুরুতেই নিষিদ্ধ করে দেয়া হলো সব হ্যান্ডি বা হ্যান্ডহেল্ড রেডিও। ফিল্ড অপারেশন চলাকালীন কোনো হ্যান্ডি নিয়ে ঘুরাঘুরি চইলতো ন
  • কুঅভ্যাস, বদঅভ্যাসকে কবর দেয়া হলো
  • ফিল্ড অপারেশন চলাকালীন ৩দিন সোশ্যাল মিডিয়ায় ছবি/ভিডিও, টিকটিকি নাজায়েয 🤪
  • QSO রুমে মোবাইল ফোন হারাম (যাতে টিকটিকিদের স্বর্গরাজ্য না হয়ে উঠে নীরব পরিবেশটা)
  • বৃষ্টিতে ভিজবেন না, আর আল্লাহ’র ওয়াস্তে পানি খাবেন সবাই

সত্যি কথা বলতে কি, বিষয়টা আমার খুব ভালো লাগলো। এই যুগে বিভিন্ন জাত-পাত-মতের মানুষ ডীল করা মহা মসিবতের বিষয়। তাই শুরুতেই রুল সেট করে দেয়াটা খুবই দরকার। আর একজন স্কাউটের থেকে সেনা-কদর পাওয়াই যথোচিত বলেই মনে হয়েছে আমার কাছে।

রাত ২টা বাজে প্রথম সভা। নিয়মকানুন, দলভাগ— সবই হলো এই সভায়। কে যেন যত্ন করে সবার জন্য কফি বানিয়ে দিয়েছেন।

প্রথম সভা হলো রাত ২টায়। সবার সাথে পরিচিতি পর্ব শেষে আমাদেরকে নতুন-পুরোন মিলিয়ে একেকটা ছোট ছোট দলে ভাগ করে দেয়া হলো। টীম-১-এই পড়লাম আমি, আমার সাথে বাংলাদেশের একজন নারী হ্যাম রাকা আপু (S21YLJ), আর আরেকজন হলেন ইফতিয়ার হাসান। রাকা আপুকে আগে থেকে চিনি Peak69-এর মালিক হিসেবে। আমি যে ব্যাগটা বহন করে নিয়ে গেছি, সেটাও ওনার দোকান থেকে কেনা— সেটা বলা হয়নি তখনও। ও, তিনি অনেক আগে থেকেই তাঁর স্বামী S21RC’র বদৌলতে DX করেন, মানে বহির্বিশ্বে রেডিও যোগাযোগ করেন। নারীদের কলসাইনে YL মানে হলো Young Lady। রেডিও যোগাযোগে অপারেটরের কণ্ঠ শুনে নারী নাকি পুরুষ বোঝা যেতো না বলেই নামের আগে YL ব্যবহারের এই প্রবর্তন হয়েছিলো, যা ১৯২০-এর দিকে আনুষ্ঠানিক মর্যাদা পেতে শুরু করে।

প্রসঙ্গত জানিয়ে রাখি, বাংলাদেশের প্রথম নারী হ্যাম হলেন মমতাজ শহীদ (S21J), তিনি ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম হ্যাম অপারেটর সাঈফ শহীদ (S21A)-এর স্ত্রী। এছাড়া ১৯৯৩ সালে Amateur Radio Relay League (ARRL)-এর বাংলাদেশে একটা DXpedition-এর সময় প্রথম বিদেশী নারী হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের Gaynell Larsen-কে (যাঁর কলসাইন KD4GMV ছিলো পরে KK4WWW) বাংলাদেশে অবস্থানকালীন একটা অস্থায়ী কলসাইন দেয়া হয়েছিলো, সেটি ছিলো S21ZH। ঐসময় ৮জনের দলের জন্য বাংলাদেশ সরকার ৫টা সাময়িক কলসাইন বরাদ্দ করেছিলো: S21ZH-S21ZM।

প্রথম রাতেই আমাদের QSO রুমের সাথে পরিচয় হয়ে গেলো— যেখানে রেডিওগুলো রাখা আছে, এই রুম থেকে দেশ-বিদেশে যোগাযোগ করা হবে। তারপর আমরা ঘুমিয়ে পড়লাম, কাঁটায় কাঁটায় সকাল ১০টায় সেশন শুরু হবার কথা।

টীম-১

আমি দলগত কাজে বিশ্বাস করি। আমার কাছে আমার টীম হলো সবকিছু। কিছু হলে আমার টীমের মাধ্যমেই হবে। তাই পরদিন সকালে আমাদের দলের তিনজনের ফোন নম্বর একত্র করে হোয়াটসঅ্যাপে একটা গ্রুপ তৈরি করে নিলাম আমরা, যাতে ইভেন্ট চলাকালীন ৩দিন নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করা যায়।

রাকা আপু’র নিজের ঘরই যেহেতু রেডিও’র একটা ব্রিগেড— সেখানে তাঁকে টীমের মধ্যে পেয়ে আমি খুবই খুশি; অনেক কিছু শেখা যাবে।

এদিকে আমার দলের পরিণত যুবক একজন SWL: ইফতিয়ার হাসান। একজন SWL বা ShortWave Listener হলেন এমন একজন, যিনি রেডিওতে বার্তা গ্রহণ করতে পারেন, কিন্তু পাঠানোর জন্য লাইসেন্স নেই— অর্থাৎ RX করেন, TX করতে পারেন না। ইফতিয়ার কুমিল্লারই সন্তান, তার পড়ালেখা ইলেকট্রোনিক্সে, পড়েন কুমিল্লা সেনানিবাসে BAIUST-তে। তিনি রেডিওর প্রতি ভালোবাসা থেকে BDXC’র সহায়তায় কুমিল্লাতে একটি ক্লাব প্রতিষ্ঠা করেছেন, যার নাম: অ্যামেচার রেডিও ক্লাব কুমিল্লা, বাংলাদেশ।

শুরুতেই গুরু

সকালের সেশন শুরু হলো অগ্রজ ট্রেকার বড় ভাই, ফজলে রাব্বি ভাইয়ের (S21RC) সেশন দিয়ে। অ্যান্টেনা আর প্রোপাগ্যাশন নিয়ে। কী দারুণ দক্ষতায় তিনি পরিচয় করিয়ে দিলেন অ্যান্টেনার বিপুলা জগতের সাথে। না, বিপুল জগতের সবকিছুর সাথে একসাথে পরিচয় করিয়ে দিলে তো মাথা নষ্ট হয়ে যাবে, তিনি প্রাথমিকভাবে তিনটা অ্যান্টেনা সম্পর্কে ধারণা দিলেন:

  1. ডাইপোল অ্যান্টেনা (Dipole Antenna)
  2. এন্ড-ফেড হাফ ওয়েভ অ্যান্টেনা (End-Fed Half Wave Antenna)
  3. হেক্স বীম অ্যান্টেনা (Hex-Beam Antenna)

অ্যান্টেনার আলোচনা করতে গিয়ে রাব্বি ভাই আক্ষেপ করে যে কথাটা বললেন:

আজকাল যখন ছেলেদেরকে দেখি, রেডিও’র জন্য কোন অ্যান্টেনা কিনবো, কোন অ্যান্টেনা কোথায় পাওয়া যাবে, একেকজন কত কত দাম দিয়ে অ্যান্টেনা কিনে, তখন আক্ষেপ হয়।

তাঁর আক্ষেপের কারণটা জানতে হলে S21RC সম্পর্কে আপনাদের জানতে হবে। বাংলাদেশে খেটে খেটে যাঁরা অ্যামেচার রেডিও চর্চাকে এককভাবে জিইয়ে রেখেছেন, তিনি তাঁদের মধ্যে একজন— যাঁর সাহচর্য আমরা পাচ্ছি। তিনিও গর্ব করে তাঁর গুরুর কথা স্বীকার করেন। প্রচুর অ্যান্টেনা বানানোর অভিজ্ঞতা থেকে তিনি একটা কথা বোল্ড করে বললেন:

অ্যান্টেনাটা একটা টিনের পাত কিংবা লোহার টুকরা ছাড়া কিছুই না।

আমার অভিজ্ঞতা থেকে জানি [আলহ্বামদুলিল্লাহ], কোনো বিষয়কে গোড়া থেকে দেখা কতটা জরুরি। তাঁর এই দেখার চোখটা কত যে প্রয়োজনীয়, তা হয়তো সবাই বুঝবে না। কিন্তু এভাবে দেখতে শিখলে, সবাই কিন্তু ম্যাকগাইভার হতে পারবে। যার কিছুই নেই, সে-ও হাতের কাছে থাকা বস্তুগুলোকে প্রয়োজনীয় রসদ হিসেবে দেখবে। একটা মামুলি তারকে সঠিক মাপে টাঙিয়ে যে অ্যান্টেনা বানিয়ে ফেলা যায়— তা আমরা হাতে-কলমে করে দেখেছি।

সামান্য একটা তারও অ্যান্টেনা হতে পারে— ছবিটা অন্য আরেকটা ছবির রেফারেন্সে AI দিয়ে তৈরি করেছি

অ্যান্টেনার আলোচনা করে তিনি বিভিন্ন ধরণের স্যাটেলাইটের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন:

  • LEO: Low-Earth Orbit— পৃথিবী ঘূর্ণনের সাথে (আহ্নিক গতি) এগুলোও ঘুরতে থাকে
  • GEO: Geostationary Earth Orbit— পৃথিবী ঘুরলেও এগুলো একটা অবস্থানে স্থির থাকে
  • MEO: Medium Earth Orbit— LEO আর GEO’র মাঝামাঝি এদের অবস্থান— এরাও পৃথিবী ঘূর্ণনের সাথে ঘুরতে থাকে

LEO-এর সাথে যোগাযোগ করতে কিভাবে হাতে ধরা অ্যান্টেনাটাকে আকাশের দিকে তাক করে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে যোগাযোগ করতে হয় যখন দেখিয়ে দিচ্ছিলেন, আর বলছিলেন, “LEO দিয়ে যোগাযোগ করাটা একটা আর্ট” তখন আসলেই বোঝা যাচ্ছিলো: সত্যিই এটা একটা আর্ট। ঘণ্টায় ৭০০-৮০০ কিলোমিটার গতিতে মাথার উপর দিয়ে একটা স্যাটেলাইট যখন উড়ে যায়, তখন মাত্র ৩ মিনিট সময় পাওয়া যায় সেটার দিকে অ্যান্টেনা মুখ করে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে যোগাযোগ করতে— আর্টই বটে।

LEO’র গল্প শেষ করে GEO’র গল্পে বিশেষ করে Es’hail 2 (Qatar OSCAR-100) নামক Geostationary স্যাটেলাইটের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। অ্যামেচার রেডিও অপারেটরদের জন্য এটা যে কী অপূর্ব একটা সংযোজন তা বোঝা যায় এর নামেই: Orbiting Satellite Carrying Amateur Radio। আমাদের সময় কম ছিলো, জুম’আর নামাযে যেতে হবে, তার মাঝেই তিনি ছবি এঁকে যথাসম্ভব অনেক কিছুই বুঝিয়ে দিলেন। নামাযের পরে এর উপরই প্র্যাক্টিক্যাল আছে।

এই আলোচনায় Maidenhead Locator System-এ Grid Square বা Grid Locator নামের আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জানলাম, যা অ্যামেচার রেডিও অপারেটরদের যোগাযোগের সময়, বিশেষ করে DX (দূরবর্তী যোগাযোগ)-এর সময় নিজের অবস্থান জানাতে কার্যকর।

Grid Locator (গ্রিড লোকেটর) আর কিছু না, পৃথিবীর স্থানাংকে (অক্ষাংশ আর দ্রাঘিমাংশের) একটা বড়সড় নম্বর রেডিও মারফত পাঠানো কষ্টকর, তাই এটাই ছোট্ট একটা নাম, যা আপনি সহজে অপর প্রান্তের মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারবেন। একটু গুগল করে জেনে নিলাম, আমার রেডিও স্টেশনের গ্রিড লোকেটর হলো: NL53eu— এখানে NL53 হলো বাংলাদেশের Field+Square, আর eu হলো সেই স্কোয়্যারে আমার অবস্থান (সাব-স্কোয়্যার)।

ও, যাঁরা জানেন না, অ্যামেচার রেডিওতে একজন লাইসেন্সধারী ব্যক্তি যেখানে রেডিও নিয়ে আছেন, সেটাই একটা Radio Station। সে হিসেবে লাইসেন্সধারী ব্যক্তিই আসলে একটা স্টেশন। আর স্টেশনগুলোর পরিচয় হলো কলসাইনে, যেমন আমারটা S21NYN।

আমার বুঝ— পাগলের বুঝ

রেডিও যোগাযোগ বিষয়ে যে সহজ বিষয়টা আমি খাঁটি বাংলায় বুঝেছি, সেটা এরকম:

রেডিওটা আমি একটা ব্যাটারি কিংবা পাওয়ার কেবল দিয়ে পাওয়ার দিচ্ছি। এই পাওয়ারটা আমার রেডিও থেকে একটা তারের ডগায় গিয়ে পৌঁছাচ্ছে— এই তারটা হলো একটা অ্যান্টেনা। আমি কত পাওয়ার দিয়ে ঠেলা দিচ্ছি, তার উপর নির্ভর করে আমি কত দূরে সিগন্যাল পাঠাতে পারবো। যদিও বিষয়টা মোটা দাগে সেরকম না, তবু মাথায় ঢুকানোর জন্য এভাবে বুঝলে ক্ষতি নেই।

এবার এই পাগলের বুঝকে রেডিও’র ভাষায় বদলে নেয়া যাক:

পাওয়ার দিয়ে ঠেলা দেয়ার মাঝখানে রেডিও একটা তেলেসমাতি করে: সে Current-কে রেডিও ফ্রিকোয়েন্সিতে (RF AC) বদলে নেয়। আর ঐ যে তারটা মানে অ্যান্টেনা— এটা একটা গিটারের তারের মতো, ঐটা কী করে বৈদ্যুতিক সিগন্যালকে বাতাসে Electro-magnetic wave বা তড়িৎ-চৌম্বকীয় তরঙ্গে (যা আলোরই একটি অদৃশ্য রূপ) রূপান্তর করে ছেড়ে দেয়— মানে ঐ ইথারে যোগাযোগ করা, এই হলো ইথারে কথা ছেড়ে দেয়া আরকি। এখন ঐ যে, “কত পাওয়ার দিয়ে কত জোরে ঠেলা দিলাম” বলেছিলাম, বিষয়টা সেরকম না আসলে, আপনি সঠিক প্রোপাগাশন কাজে লাগাতে পারলে HF Band-এ (৩ থেকে ৩০ মেগাহার্টজ) কম পাওয়ারে ঠেলা দিয়েও Ionosphere-এর প্রতিফলন কাজে লাগিয়ে সিগন্যাল বহুদূরে পাঠিয়ে দিতে পারবেন, আবার VHF, UHF Band-এ (মানে ৩০ মেগাহার্টজের উপরে) সিগন্যাল চলে সোজা পথে; তাই বেশি পাওয়ার দিলেও এগুলো বেশি দূরে যায় না— সামনে বাধা পড়লে আটকে যাবে।

এজন্য রেডিও যোগাযোগ একটি বহুল প্রচলিত কথা আছে—পাওয়ারের চেয়ে অ্যান্টেনা আর প্রোপাগেশন (Propagation) বেশি শক্তিশালী

তাহলে, ম্যাংগো পিপলের ভাষায়: রেডিও মূলত বিদ্যুৎ শক্তিকে আলোর মতো অদৃশ্য তরঙ্গে বদলে নেয়, আর অ্যান্টেনা সেই তরঙ্গকে মহাকাশে বা বাতাসে ছড়িয়ে দেওয়ার স্পিকার হিসেবে কাজ করে।

Propagation বা সঞ্চলন হলো বেড়ানো। আপনার রেডিও থেকে বেরিয়ে সিগন্যাল কিভাবে পরিবেশ আর বায়ুমণ্ডলের সাথে মিথস্ক্রীয়া করে দূরে বেড়াতে গেলো তারই গালভারি নাম হলো প্রোপাগ্যাশন।

  • ঘর থেকে বেরিয়ে সোজা স্কুলে গেলেন। দৃষ্টিসীমার মধ্যে মানে Line of Sight— VHF (ওয়াকিটকি), UHF (4G, WiFi), কিংবা
  • ঘর থেকে বেরিয়ে প্লেনে চড়ে আকাশে ধাক্কা দিয়ে গিয়ে আমেরিকা পড়লেন। Sky wave— যেমন HF বা শর্টওয়েভ ব্যান্ডে, কিংবা
  • বুকে ভর দিয়ে ঘষটে ঘষটে মাটিতে কিংবা পানিতে চলতে চলতে গেলেন। Ground wave— যেমন Medium Wave (AM radio)।

ধর তক্তা মার পেরেক

এই ফিল্ড ট্রেনিং-এর মজার বিষয় হলো, সবাই সবকিছু করছেন। মানে আমি কিংবা আরো কয়েকজন আমাদের অ্যান্টেনার দৌঁড় বড়জোর বিটিভি কিংবা দূরদর্শন দেখার জন্য বাঁশের আগায় লাগানো ইয়াগি অ্যান্টেনা ঘুরানো পর্যন্ত। অথচ, আমরা সবাই মিলে একটা নয়, দুই দুইটা অ্যান্টেনা সেটআপ করতে লেগে গেলাম। মানে পুরাই “ধর তক্তা মার পেরেক” অবস্থা— কাজ করেই কাজ শেখা যায়।

অ্যান্টেনা সেটআপ করতে করতে ফিযিক্যাল অ্যান্টেনার খুঁটিনাটি বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন আরেক প্রাজ্ঞ অগ্রজ মারুফ ইসলাম ভাই (S21FIA)। বৃষ্টিও আমাদের সাথে সাথেই আছে— এই গুড়ি গুড়ি পড়ে তো এই আবার একটু বর্ষণ। তার মাঝে চললো আমাদের অ্যান্টেনা সেটআপ।

রাব্বি ভাইয়ের তৈরি করা একটা প্যারাবলিক রিফ্লেক্টর অ্যান্টেনা দিয়েই শুরু করলাম আমরা। প্রতিফলক (Reflector) হিসেবে কিভাবে বাজারে পাওয়া একটা ডিশকে ব্যবহার করে তাঁদের কয়েক জনকে জবাবদিহী করা লেগেছিলো কোনো এককালে— তা শুনে আমাদের দেশে অ্যামেচার রেডিও সম্পর্কে সাধারণ মানুষের অজ্ঞতারই পরিচয় পাওয়া যায়। একজন উইকিমিডিয়ান হিসেবে এই স্ট্রাগল আমরাও বুঝি অবশ্য। যাহোক, এই অ্যান্টেনার ডগায় যে ADALM-PLUTO বসানো, সেটাও খুলে দেখালেন মারুফ ভাই।

এসব ফিল্ড অপারেশনে ব্যক্তির নাম থেকে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে তাঁদের কলসাইন। যে রাব্বি ভাইকে সব সময় রাব্বি ভাই বলেই ডাকতাম, তাঁকে দেখা গেলো এক পর্যায়ে আরসি (RC) ভাই ডাকছি— হাস্যকর বিষয়। কিন্তু এটাই সায়েন্স। মারুফ ভাইয়ের নাম এখন লেখার সময় উনার QRZ প্রোফাইল থেকে খুঁজে বের করেছি— কারণ ওখানে তিনি আমাদের সর্বজন শ্রদ্ধেয় ফিয়া (FIA) ভাই ছিলেন। ❤️

এটা রেডিমেড অ্যান্টেনা, দ্রুতই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে গেলো। তারপর এলো বিশেষ এক এন্টেনা: Hex beam।

হেক্স বীম— যাদুকরী এক অ্যান্টেনা

অ্যান্টেনার জগতে Hex Beam Antenna যে কী জিনিস, তার প্রাথমিক পরিচয় আমরা রাব্বি ভাইয়ের থিওরেটিক্যাল সেশনে পেয়েছি। এবার সেই অ্যান্টেনাই যখন হাতে-কলমে দেখার সুযোগ পেলাম— তাকে সৌভাগ্যই বলা চলে। কী আছে এই অ্যান্টেনায়?

বীম অ্যান্টেনা (মানে আগেকার যুগে টিভি দেখতে যেরকম অ্যান্টেনা কিনতাম আমরা, সেগুলো আরকি — Yagi-Uda) যেখানে টর্চলাইটের মতো একদিকে তাক করে সিগন্যাল নেয় অথবা পাঠায়, কিন্তু দূরের যোগাযোগের জন্য স্টীল বা অ্যালুমিনিয়ামের বড় আকারের অ্যান্টেনা নাড়াচাড়া করা কষ্টকর। আবার এন্ড ফেড হাফ ওয়েভ অ্যান্টেনা (EFHW), তার (Wire) দিয়েই বানিয়ে ফেলা যায়— Omni/Bi-directional হবার কারণে দূরের (DX) কোনো দূর্বল স্টেশনে তাক করা যায় না, আবার চারপাশের সবদিক থেকে আসা গোলমেলে শব্দ (noise) গ্রহণ করে। তবে সহজ আর সস্তা।

Band বা ব্যান্ড হলো রেডিও ফ্রিকোয়ন্সির (RF) একেকটা গ্রুপ— মানে এতো থেকে এতো ফ্রিকোয়েন্সি হলো যদু, আর এতো থেকে এতো হলো মধু। যেমন: কেউ যদি বলে ২০ মিটারে যোগাযোগ করছি, তার মানে উনি বোঝাচ্ছেন 14.0 থেকে 14.35 MHz (মেগাহার্টসে)-এ যোগাযোগ করতে চাইছেন।

তবে উল্টানো ছাতার মতো দেখতে এই হেক্স বীম অ্যান্টেনা বীম অ্যান্টেনার মতো বড় না, আর EFHW-এর মতো ছড়ানো না, যা ২০ মিটার থেকে ৬ মিটার অনেকগুলো ব্যান্ডে কাজ করে— ষড়ভূজাকার হওয়ার অল্প জায়গায় এঁটে যায়। থিওরিকে মাথায় নিয়ে ইথার ঘেঁটে আমাদের অ্যান্টেনাটা বানিয়েছেন FIA ভাই। অনেক অংশ এখনও এক্সপেরিমেন্টাল। কিছু গ্লাস ফাইবারের পোল জুড়ে আর সুতা টেনে অ্যান্টেনাটা দাঁড় করিয়ে দেয়া যায়। তারপর একটা বাঁশের বা পাইপের ডগায় বসিয়ে দিয়ে খাড়া করে দিলেই হলো। FIA ভাইয়ের হেক্স বীমে ২০, ১৭, ১৫, ১২, আর ১০ মিটার ব্যান্ডে যোগাযোগ করা যায়। ছবি দেখিয়ে এটা বোঝানো কঠিন, তবে সামনা-সামনি এটা অভিজ্ঞতা নেবার মতোই একটা জিনিস বটে।

স্যাটেলাইট ধরা

উর্ধ্বাকাশে উড়তে থাকা স্যাটেলাইট কি আর হাত দিয়ে ধরা যায়? তাই তাদের ধরা মানে হলো তাদের দিক খুঁজে বের করে অ্যান্টেনা সেদিকে তাক করা। বিভিন্ন ধরণের মোবাইল অ্যাপ আছে এজন্য। তারই একটা নামিয়ে আমরা QO-100 স্যাটেলাইটটাকে খুঁজে বের করলাম। তারপর ডিশ অ্যান্টেনাটাকে সেদিকে মুখ করে দিতে না দিতেই শুরু হলো বৃষ্টি— ঝুমমম বৃষ্টি। এদিকে সন্ধ্যা হয়ে গেছে। FIA ভাই একটা রেইনকোট পরে ডিশ ধরে দাঁড়িয়ে আছেন ছাদে। আর বৃষ্টি থেকে মাথা বাঁচিয়ে একটা ল্যাপটপে Azimuth আর Elevation-এর হিসাব মিলাচ্ছেন RC ভাই। AF ভাইয়ের গায়ে জ্বর, তবু এসে দাঁড়িয়েছেন প্রোপাগাশনে সামিল হতে। রাব্বি ভাই একটা নাম্বার বলছেন আর FIA ভাই অ্যান্টেনাটা সামান্য ডানে অথবা বামে সরিয়ে হিসাব ঠিক করে নিচ্ছেন। ছোটবেলার বাঁশের আগায় লাগানো ইয়াগি অ্যান্টেনা তাক করার স্মৃতি ভাস্বর হলো আমার।

অবশেষে কাতার ওসকারে তাক হলো অ্যান্টেনা।

এন্ড-ফেড হাফ-ওয়েভ অ্যান্টেনা

বৃষ্টিস্নাত জুলাই মাসে, অপারেশনের দ্বিতীয় দিনে রৌদ্রোজ্জ্বল একটা সকাল পাওয়ায় আমরা সবাই লেগে পড়লাম আরেকটা অ্যান্টেনা সেটআপ করতে। আজকে আমরা দুই বিল্ডিং-এর মধ্যে এমাথা-ওমাথা তার টানিয়ে একটা এন্ড-ফেড হাফ-ওয়েভ অ্যান্টেনা বানানো/টাঙানো শিখবো। গতকালকের থিওরির পরে আজকে আমাদেরকে দায়িত্ব দেয়া হলো হিসাব-নিকাশ করতে। সব টীম দেখা গেলো ঠাশ ঠাশ করে হিসাব করে দিয়ে দিলেন।

দৈর্ঘ্য (মিটারে)=300ফ্রিকোয়েন্সি (MHz)\text{দৈর্ঘ্য (মিটারে)} = \frac{300}{\text{ফ্রিকোয়েন্সি (MHz)}}
গতকালকে যে থিওরি শেখানো হয়েছে এখন তারই হাতে-কলমে কাজ দেয়া হলো। আমাদের টীম ১-কে একসাথে দেখা যাচ্ছে।

তারপর দুটো টীমকে একটা দলে দিয়ে দুটো আলাদা আলাদা অ্যান্টেনা লাগাতে বলা হলো। কোন দলেরটা সঠিক হয়— দেখা হবে। আমাদের দলের ইফতিয়ার একাই একশো— সমস্যা হলো ওর জ্ঞানের কারণে অনেক জিনিস আমরা বুঝতে পারছি না। তাই ঠিক করলাম ওর থেকেই প্রশ্ন করে উত্তরটা জেনে নিবো। কিন্তু দেখা গেলো সেও ইলেকট্রোনিক্সের হিব্রু ভাষায় উত্তর দিচ্ছে— বুঝতে হলে আরো জ্ঞান অর্জনের দরকার আমার কিংবা রাকা আপুর।

আমরা ফ্রিকোয়েন্সির হিসাব করে তার কেটে নিলাম। তারপর একজন পাশের বিল্ডিংয়ের উপরে উঠে প্যারাকর্ড ছেড়ে দিলো নিচে, আর আরেকজন তাতে তার বেঁধে উপরে টানতে বললো। একই প্রক্রিয়ায় দুটো বিল্ডিং-এর মাথায় তার আটকে ফেলার পরে সেখান থেকে একটা 9:1 Unun – Impedance Transformer) সংযোগ করা হলো। ইফতিয়ার ঠোটস্থ বলে গেলো, এটার ভিতরে একটা কয়েল আছে, যা অ্যান্টেনার তারের শক্তিকে রেডিও’র উপযোগী করে।

নিচে আমাদের FIA ভাই একটা ছোট্ট চারকোণা মনিটর (NanoVNA SWR) যন্ত্র নিয়ে বসা। ওখানে তার সংযোগ করে আমাদের দেখালেন কিভাবে 1:1-এ Standing Wave Ratio নামিয়ে আনতে হয়। বিশ্বাস করেন, জীবনে প্রথমবার এই NanoVNA জিনিসখান দেখছি। FIA ভাই যথেষ্ট আন্তরিকতার সাথেই বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন— কিন্তু পরিচয় না থাকায় এই জিনিস থেকে সত্যিকার অর্থে কিভাবে SWR-কে 1:1 নামিয়ে আনছি সেটা বুঝিনি। ফিরে এসে 🎥 এই ভিডিও দেখে কিছুটা বুঝতে পেরেছি মনে হচ্ছে।

এন্ড-ফেড হাফ-ওয়েভ অ্যান্টেনা তৈরিতে যা যা করলাম আমরা

লালমাই পাহাড়ে পলাতক আমরা

বন্ধু নাকিব (S21NKB) দেখলো দ্বিতীয় দিন আসরের নামাজের দিকে একটু গ্যাপ তৈরি হয়েছে। বললো, চল বাইরে থেকে ঘুরে আসি। একজনকে জানিয়ে আমি আর নাকিব বেরিয়ে পড়লাম পাড়া বেড়াতে। নাকিব গুগল ম্যাপে কোথায় জানি একটা পাহাড় দেখতে পেয়েছে— সেখানে যাবে। হাঁটতে থাকলাম দুজনে। পুরো এলাকাই পাহাড়ি— কারণ এটা লালমাই পাহাড় এলাকা। মানুষজন পাহাড় কেটে বসতি স্থাপন করেছেন।

ফ্ল্যাশব্যাক ২০০২ খ্রিষ্টাব্দ— নটর ডেম কলেজের অ্যাডভেঞ্চার ক্লাব থেকে আমরা এই লালমাই পাহাড়ে শিক্ষা-সফরে এসেছিলাম আমাদের জিওগ্রাফি শিক্ষকের সাথে। আজকে ২৪ বছর পরে একই পাহাড়ে হাঁটছি। রাস্তা বিশাল বড়, পুরোপুরি পাকা করা। হাঁটতে হাঁটতে আমরা গিয়ে পৌঁছলাম একটা বিশাল পার্কে: লালমাই লেকল্যান্ড পার্ক। পাশেই কিছু ছেলে ফুটবল খেলছে। বিশ্বকাপ ফুটবলের সময় তো— সবাই এখন ফুটবলার। সেখানে গিয়ে স্থানীয় একজনের থেকে জানতে পারলাম, পাশেই পুরোন গ্যাসকূপ আছে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে, তবু আমরা দুজনে সেদিকে হাঁটতে শুরু করলাম। বৃক্ষ আচ্ছাদিত ইট সো’লিং সরু রাস্তা দিয়ে গিয়ে হাজির হলাম তালা দেয়া একটা গেটের সামনে— এটাই সেই পরিত্যক্ত গ্যাস কূপ।

চারদিকে মাগরিবের আযান হচ্ছে— আমরা ফিরতি পথ ধরলাম।

বিদ্যুৎ নেই তাতে কী? আমরা অন্ধকারেও দেখি। অনেক রাত পর্যন্ত ডেল্টা লুপ অ্যান্টেনা সেটআপ চললো। (ছবি: লেখক)

ত্রিকোণাকৃতি ডেল্টা লুপ অ্যান্টেনা

মাগরিবের নামাজের পরে সবাইকে দেখি কী-সব তার নিয়ে মাপঝোক শুরু করেছেন। জানলাম এর মধ্যে RC ভাই আরেকটা অ্যান্টেনা শিখিয়ে দিয়েছেন সবাইকে— বোর্ডে আঁকা দেখে সেটা বুঝে নেবার চেষ্টা করলাম। কচু বুঝলাম। কিন্তু সবাইকে ডেল্টার (𝚫) হিসাব কষতে দেখে আর সেখানে হিসাবের খুটিনাটি নিয়ে মত-দ্বিমত করতে দেখে কিছু বুঝলাম আরকি।

সবাই নেমে পড়লাম এই কাজে। তার মাপা, তার কাটা, তার ঝুলানো, একজনকে ছাদে পাঠিয়ে ব্যালুন বসানো, একজন QSO রুম থেকে SWR reading QSO করছেন একটা হ্যান্ডিতে। সে অনুসারে তার কেটে অ্যান্টেনা ছোট করা হচ্ছে— বোঝা গেলো মাপঝোক ঠিকমতো হয়নি।

এসব করতে করতে অনেক রাত হয়ে গেলো। ডেল্টা লুপ অ্যান্টেনার বাকি কাজ আগামী দিনের জন্য রেখে দেয়া হলো।

থিওরি ক্যালোরি

মাঝে মাঝে ছিলো থিওরি ক্লাস— কিভাবে আয়োনোস্ফিয়ার আমাদের বড় বন্ধু, কিভাবে বিশাল সমুদ্রের লোনাপানি আমাদের পরম আত্মীয়, স্কিপযোন কী, শর্ট পাথ, লং পাথ— রেডিও ফ্রিকোয়ন্সির জগতে কানাডা আমাদের কাছ না আমেরিকা কাছে— কত্ত কত্ত মজাদার থিওরি— ক্যালোরির মতো সবার মগজে ঢুকিয়ে দিচ্ছিলেন FIA ভাই। তাঁর সাথে কিছু বাস্তব অভিজ্ঞতা যোগ করছিলেন আব্দুল্লাহ ফাহাদ (AF) ভাই। অনেক আলোচনাই হলো।

একটা কথা বোল্ড করে বললেন AF ভাই:

১৬০ মিটার ব্যান্ডে ভুলেও ট্রান্সমিট করতে যাবেন না। নাহলে আপনার ভুলে আপনার আশেপাশের (আপনার কিংবা প্রতিবেশীর), শিল্ডেড না, এমন অনেক বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

আর FIA ভাই যে কথাটা বোল্ড করে জানিয়ে দিলেন:

অ্যামেচার রেডিও অপারেটররা দুর্যোগে, কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে দায়িত্ব না পাওয়া পর্যন্ত
নিজে থেকে ঝাঁপিয়ে পড়েন না।

তখন আমাদের Red Crescent সাব্বির হোসেন (S21ACP) জানালেন কিভাবে তাঁরা ফেনীর বন্যায় জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে বাস্তব পরিস্থিতিতে কাজ করেছেন। রেড ক্রিসেন্ট হিসেবে নয়, বরং অ্যামেচার রেডিও অপারেটর হিসেবে তিনি এবং তাঁর দল তিনটা আলাদা দলে ভাগ হয়ে একদল জেল প্রশাসকের কার্যালয়ে, একদল ফেনীর সবচেয়ে উঁচু টাওয়ারে রিলে স্টেশন স্থাপন করে, আর আরেকদল ফিল্ডে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করেছেন। তাঁদের এই অবদান সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। এবং তিনি স্ট্যাটিস্টিক্স দিচ্ছিলেন— কতজন দুর্গত মানুষকে সহায়তা দিতে পেরেছেন তাঁরা— যা সত্যিই আশাপ্রদ।

প্রথম সফল QSO

যাওয়ার পর থেকে অনেকবার BDXC আমাকে QSO করার সুযোগ দিয়েছেন— কিন্তু আমি প্রতিবারই কিছু না কিছু ভুলভাল করছি। হয়, ভুল Q-Code ব্যবহার করছি, নয়তো established radio contact-এ looking for station, কিংবা QSL বলতে গিয়ে CQ বলে ফেলছি। মাথা পুরাই হেট।

আমাদেরকে যাবার সাথে সাথেই একটা নোটবুক, কলম, আর একটা QSO Logbook ধরিয়ে দেয়া হয়েছিলো। তার পিছনে QSO করার কিছু নিয়মকানুন লেখা ছিলো। সেগুলোর পাশাপাশি আরো কিছু থিওরি বলে দিলেন FIA ভাই। তারপর আমাদেরকে পাঠিয়ে দিলেন QSO করতে। QSO’র থিওরি কবচিয়ে FIA ভাই এবার আমাদের দুজন দুজন করে QSO রুমে পাঠিয়ে দিলেন। কারণ রেডিও নষ্ট করার মতো অবস্থায় এখন আর আমরা নেই— এটা তাঁর বিশ্বাস হয়ে গেছে।

QSO করা মানে আরেকটা রেডিও স্টেশনের সাথে সফল যোগাযোগ করা। এরকম যোগাযোগ সফল হবার জন্য দুপক্ষের মধ্যে কলসাইন বিনিময় হয়, একপক্ষ অপরপক্ষের সিগন্যাল কতটা শক্তিশালী শুনতে পারছেন তা RST-তে জানান দেন, এবং সম্ভব হলে অবস্থানের Grid Locator জানান দেন।

গাজিপুরের ছেলে আশেক এলাহী (S21ASQ) আর আমি QSO রুমে ঢুকলাম। একটা রেডিও নিয়ে পাওয়ার-টাওয়ার দিয়ে বসে পড়লাম আমরা। তারপর ফ্রিকোয়েন্সি ঘোরাতে ঘোরাতে এক পর্যায়ে আমরা QSO করলাম সাইথ কোরিয়ার একজন Ham-এর সাথে: HL4CAF। জীবনে প্রথম QSO— খুশিরই ব্যাপার বটে। BDXC সেই খুশির ভাগিদার না করলে আরো কতো দেরি হতো কে জানে।

দেখে মনে হতে পারে অভিনয় করছি— আসলে সত্যিকার অর্থেই QSO করছি। ছবি তুলেছেন ছোটভাই ইফতিয়ার হাসান

পরীক্ষা

যে একটা জিনিসের জন্য আমি ছোটবেলায় ফেরত যেতে চাই না, তার নাম পরীক্ষা। পড়ালেখার জীবনে ফার্স্টক্লাস স্টুডেন্ট ছিলাম আলহ্বামদুলিল্লাহ, পরীক্ষাকে আমি ভয় পাই বিষয়টা তেমন না, তবে খুব যে ভালোবাসি এমনও না। পরীক্ষা আমার বিরক্তি লাগে— স্ট্রেস দেয়। কিন্তু এখানে আসার পর থেকেই জানিয়ে দেয়া হয়েছে, তিনদিনে কী শিখলাম, তার উপরে শেষ দিন পরীক্ষা হবে।

সুন্দর প্রশ্নপত্র তৈরি করা হয়েছে। তাতে আমাদেরকে দেয়া কলম দিয়ে উত্তর লিখতে হবে। আমি ইলেকট্রোনিক্সে বকলম। পরীক্ষায়ও তার প্রমাণ মিললো। ফাহাদ ভাই জনে জনে ডেকে ব্যক্তিগত মন্তব্য করে করে খাতা দিলেন। ৫০ মার্কের পরীক্ষায় ৩৫ পেয়ে ৭০% মার্ক নিয়ে পাশ করলাম বটে, তবে সেটা BDXC’র কাঙ্ক্ষিত মানের চেয়ে নিচে 😔। রেযাল্ট শুনে রাব্বি ভাই অবশ্য বললেন, ৩৫ ভালো নাম্বার 😟।

বোর্ডের পরীক্ষার মতো পরীক্ষা হচ্ছে— ৫০ মার্কের ৪০ মিনিটের পরীক্ষা— মোট প্রশ্ন ৩৮টা

কী পেলাম?

সুন্দর কাগজে, দৃষ্টিনন্দন নকশায় অংশ্রগ্রহণের সনদ

কোনো ইভেন্টে অ্যাটেন্ড করা মানে যদি একটা পার্টিসিপেশন সার্টিফিকেট পাওয়া— তবে সেটা এখানে সবাই পেয়েছে। কিন্তু এই সনদ কী প্রত্যয়ন করে তা আমি জানি না। আমি যদি ৩দিন সবার সাথে থাকি, কিন্তু সুম্মুন-বুকমুন-‘উমইউন মানে বধির, বোবা, আর অন্ধ হয়ে থাকি— তাহলে এই সনদ আমার জন্য কী বোঝাবে? তবে শর্ত দিয়েছিলেন, ক্লাবের সভাপতি AF ভাই: ৩দিনের কাজে অসন্তুষ্টি থাকলে তিনি সনদে স্বাক্ষর করবেন না— সে হিসেবে ধরা যায়, আমাদের প্রতি তাঁর ক্লাবের অসন্তুষ্টি অন্তত নেই, ইনশাআল্লাহ।

সবকিছু ছাপিয়ে আমার কাছে এই ইভেন্টে সবচেয়ে বড় পাওয়া সরাসরি DX করা (দূরবর্তী যোগাযোগ)। দ্বিতীয় বিষয় হলো, একটা রেডিও-তে বসে PTT বাটন চেপে কথা শুধু বলাই না, RC ভাই, FIA ভাই— উনাদের পাশে বসে যোগাযোগের খুঁটিনাটি দেখা; নিজের হাতে বিভিন্ন ইলেকট্রোনিক যন্ত্রপাতি হাতানোর সুযোগ; FIA ভাইয়ের Morse Communication-এর আগ্রহের দুনিয়া; অবসরে অগ্রজ হ্যামদের সাথে আড্ডা— এই মোক্ষম সুযোগ আপনি কোথায় পাবেন? আমার কাছে এই সম্পৃক্ততা ঐ কাগজের সনদের চেয়ে অনেক অনেক উর্ধ্বে। (ও, পার্টিসিপেশন সার্টিফিকেটের মান খুব ভালো হয়েছে— আমার ব্যক্তিগতভাবে খুব পছন্দ হয়েছে)

এই মুহূর্তগুলো আপনি কখন পাবেন আর? S21RC কাছে বসিয়ে আমাদেরকে DXing করে দেখাচ্ছেন।

কিছু শিক্ষা আপনি ইশারা-ইঙ্গিতে, চোখ রাঙানিতে, ভ্রু কোঁচকানোতে, চোখ সরিয়ে নেয়াতে, দৃষ্টি সরানোতে কিংবা দৃষ্টি না মেলানোতে, মুচকি হাসিতে, হাতের ইশারায় পাবেন— যা একজন মানুষের শিক্ষার জন্য লাইভ ফিডব্যাক। এই শিক্ষা আপনি গুরু ধরা শিক্ষা ছাড়া, শারীরিক উপস্থিতি বিনা আজীবনেও পাবেন না। এমন বহু বহু সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম মুহূর্ত দিয়েই একজন শিক্ষার্থীর জীবন পরিপূর্ণ হয়। এমন অভিজ্ঞতার সুযোগ কখনোই পাওয়া যাবে না, যদি এমন আয়োজন না হয়।

লাইসেন্স না থেকেও রেডিও’র প্রতি যে কী দূর্বার আকর্ষণ থাকতে পারে— এই ফিল্ড ট্যুরে অংশগ্রহণকারী SWL-দেরকে না দেখলে আমার জানা হতো না। এঁদেরকে দেখে আমার নিজের লাইসেন্সটা পানিতে ফেলে দিতে ইচ্ছে হয়েছে। এদেরইতো সবার আগে লাইসেন্স পাওয়া উচিত ছিলো। তাদের যুবক বয়স, কর্মস্পৃহা, আগ্রহ— এগুলো আপনি চাইলেই যেখানে-সেখানে পাবেন না।

এছাড়া আমি অপূর্ব সাপোর্টিভ একটা টীম পেয়েছিলাম। পুরো ট্রিপে টীম ধরে কোনো জাজমেন্ট ছিলো না— নাহলে আমাদের টীম ভালো কন্টেন্ডর ছিলো ইনশাআল্লাহ। হ্যাটস অফ টু দা গ্রেট টীম মেম্বারস— S21YLJ রাকা আপু আর SWL ইফতিয়ার হাসান-এর প্রতি।

পরিশেষ

আবার কি এরকম আয়োজনে সামিল হবো? জানি না। বয়স হচ্ছে। সবকিছু আর আগের মতো পারি না। এবার আসার পর থেকে বিভিন্ন ধরণের শারীরিক অসুস্থতায় একেবারে কাবু হয়ে আছি। ট্রেনিং-এর দোষ না— আমার শরীর আমাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে আরকি। তবে ডে-লং ট্রেনিং হলে হয়তো সামিল হতে পারি— আল্লাহ ভালো জানেন।

এই পুরো আয়োজনে সবার সান্নিধ্য খুব উপভোগ করেছি। বিশেষ করে S21ACP’র রেড ক্রিসেন্টের গল্পগুলো, S21RAK’র দায়িত্বশীলতার সাথে সর্বত্র অবস্থানের জন্য, S21CAN’র হাস্যরসাত্মক পাঞ্চ নিয়ে উপস্থিতি, S21ABK’র এতো বড় একটা দলকে দেখভাল করা, আর SWL-দের কর্মস্পৃহা। এই আয়োজনের পিছনে যাঁদের সক্রীয় অবদান আড়ালে ছিলো, তাঁদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা। আর এই পুরো আয়োজনে কী কী ত্রুটি ছিলো, সেগুলো আমি কর্তৃপক্ষকে জানাবো। তাঁরা নিজেদের ভুল শুধরে নতুন করে শুরু করার ব্যাপারে যথেষ্ট সচেতন।

আমি অনেকের কাছে চেয়েও উপযুক্ত টাইমস্ট্যাম্পসহ ছবি পাইনি। সবাই গণহারে ছবি হোয়াট্সঅ্যাপ করেছেন। তাই এবারে ছবির কৃতজ্ঞতা দেয়া সম্ভব হয়নি।

এমন আয়োজনের অনেক অনেক শুভ কামনা জানাচ্ছি আমি।

– মঈনুল ইসলাম
mayeenulislam.github.io

সহায়তাচিত্রণ
লেখার প্রাথমিক তথ্য-উৎস এই প্রশিক্ষণ কর্মশালায় লেখকের নিজের অভিজ্ঞতা। এছাড়া বাড়তি বিভিন্ন তথ্য সহায়তায় পাশে পেয়েছি ফজলে রাব্বি (S21RC), নজরুল ইসলাম (S21NZ) প্রমুখকে। এছাড়া বাকিটা নিজের নোট আর অনলাইনে ঘাঁটাঘাঁটির ফসল।

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না

আপনি এই HTML ট্যাগ এবং মার্কআপগুলো ব্যবহার করতে পারেন: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>

*