সর্বশেষ সুন্দরবন আর সোয়াচ-অফ-নো-গ্রাউন্ড ভ্রমণে আমাদের জন্য আবহাওয়া এতো সহায়ক ছিলো যে, সবকিছু ছিলো সোনায় সোহাগা আলহ্বামদুলিল্লাহ। শেষ রাতটা ছিলো কুয়াশামুক্ত। মাথাটা শুধু উপরে তুলে তাকালেই হয়েছে—
শত সহস্র, বলা ভালো অজস্র তারার শামিয়ানার নিচে নিজেকে বড্ড অপাঙক্তেয় মনে হতে থাকে।
নৌযানের চলাচলের সুবিধার জন্য যখন ছাদের বাতিগুলো নিভিয়ে দেয়া হলো, তখন আবির ওর ত্রিপলটা নিয়ে এসে বিছিয়ে দিলো ছাদে। আমি রুম থেকে কম্বল নিয়ে আসতেই ৪/৫জন ব্যাডা ছাওয়াল শীতের কাঁপুনি থেকে বাঁচতে আশ্রয় নিলো সেই কম্বলের নিচে।
তারপর?
আমাদের বিছানার উপরে…
কালো আকাশের অতল অসীমতার মাঝে…
মিটমিট মিটমিট করতে শুরু করলো…
ক্ষণিক বাদে জ্বলজ্বল করতে থাকলো…
অগুণতি তারার মেলা…
অগুণতি…
সিগারেটের ধোঁয়ার চাদর মাঝে থেকেও কোথায় বসে যেন চিত্রকর কাবেরী আজাদ খুশিতে চিৎকার করে উঠলেন, আহা, ঐ যে কালপুরুষ দেখা যাচ্ছে… ঐ যে ওরিয়ন বেল্ট, তার উপরে ধনুক হাতে লোকটা…
আমি ত্রয়ী তারার ওরিয়ন/ওরাইওন চিনি, কালপুরুষও জানি— কিন্তু মনে রাখতে পারি না। কাবেরীর কথাটা মনে দাগ কেটে গেছিলো— আর ভুল হবে না।
এত্তো এত্তো তারার ভিড়ে কোনোটা আবার শাঁই করে বিচ্যুত হয় কালো আকাশের বুক থেকে, যেনবা ছিন্ন হতে চায়, মুক্ত হতে চায়। যেনবা মুক্তির আনন্দে খসে পড়বে আমাদের উপর। কিন্তু ‘খসা তারা’রা যে আসলে উল্কা (meteor) তা এই মানুষগুলো জানে, তাই এগুলো নিয়ে আর মিথলজি তৈরি হয় না।
একটা দুটা তারা আকাশের এপাশ থেকে ওপাশে টানা উড়ে যায়— এরা হয় বড়সড় উল্কা— ক্ষয় হয়েও নিঃশেষ না হয়ে দৃষ্টিসীমা পেরোয়, নয়তো এলন মাস্কের ইন্টারনেট স্যাটেলাইটের থোবড়া।

সবাই নীরব থাকলে হয়তো সেখানে শুয়েই রচিত হতো কোনো গান, কবিতা; যেমনটা লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ:
আকাশে যুগল তারা
চলে সাথে সাথে
অনন্তের মন্দিরেতে
আলোক মেলাতে।
কিন্তু এতো মানুষের মাঝে নীরবতা অনেক দাম দিয়ে কিনতে হয়। আমরা তখন এক দেখার বস্তু হয়ে গেছি। আমাদের বালখিল্যের ছবি ভালোবেসে তুলেছিলেন সহযাত্রী আশফাকুজ্জামান প্রবাল। তাঁর মোবাইলের অ্যাস্ট্রোফটোগ্রাফি মোডে উঠে এসেছে সেই অসীম আকাশপানে ছিদ্র করে দেয়া তারার জালিকা।
– মঈনুল ইসলাম

