রোল নাম্বার কেন গণনাবাচক, কেন নয়?

তেজগাঁও কলেজে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে, অনার্স পড়াটা আমার জীবনের একটা চরম নেতিবাচক, কিন্তু জীবনের উল্টো পিঠটা দেখার আর শেখার একটা অধ্যায় বলা যায়। অনেক অনেক কাহিনী থেকে শুরু করে কাহানি পর্যন্ত আছে, সেগুলো অন্য সময় হবে বলে আপাতত একটার উপর আলোকপাত করি।

অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে আমাদের ভাইভা বা মৌখিক পরীক্ষা হবে। যেহেতু প্রাইভেট কলেজ, ওদিকে এক্সটার্নাল টিচার বা বাইরের শিক্ষকগণ আসবেন, তাই আমাদের জন্য ডিপার্টমেন্ট থেকে একটা ভাইভা-পূর্বপ্রস্তুতিসূচক ক্লাসের ব্যবস্থা করা হলো। সৌভাগ্য অথবা দুর্ভাগ্যবশত আমি সেদিন দেরিতে গিয়ে হাজির হওয়ায় লেকচারের কিছু্ই শুনিনি। যাহোক, বন্ধু হানিফের থেকে ব্রিফ নিলাম কী কী বলা হয়েছে। কিন্তু হানিফ যে বিষয়টা আমাকে বলতে ভুলে গিয়েছিল, সেই বিষয়েই আমি ভাইভা বোর্ডে গিয়ে খেলাম ধরা। (নাকি ওটাই আমার চরম জয়?)

ভাইভা বোর্ডে আমাকে শুরুতেই জিজ্ঞাসা করা হলো, “রোল নাম্বার?” আমি বলে গেলাম, “ফোর-সিক্স-নাইন-ফাইভ-থ্রি-ওয়ান”। সাথে সাথে ইন্টারভিউ বোর্ডের চারজন শিক্ষকই ভূত দেখার মতো করে আমার দিকে দৃষ্টির তীক্ষ্ণ তীর ছুঁড়ে দিলেন। ডিপার্টমেন্টের একজন শিক্ষক বললেন, “রোল নাম্বার কি এভাবে বলতে হয়?” বাইরের একজন শিক্ষকও একই কথার পুণরাবৃত্তি করে বললেন, “রোল নাম্বার বলতে হয় চার লাখ ঊণসত্তুর হাজার… এভাবে”। ডিপার্টমেন্টের প্রধান স্যার আমাকে বেশ স্নেহ করেন, তিনিও দেখি অসন্তুষ্ট হলেন, “মঈন, তুমি আমাদের একজন ফার্স্ট ক্লাস স্টুডেন্ট হয়েও যদি রোল নাম্বারটা না বলতে পারো…” তাঁর কন্ঠে স্পষ্ট আফসোসের সুর। কিন্তু আমি ভুলেও বুঝতে পারলাম না, আমার দোষ কোথায়? রোল নাম্বার কি কোনো কাউন্টিং নাম্বার? কেন রোল নাম্বারটা আমাকে লাখের হিসাবে বলতে হবে?

আমি এতো বড় শক পাওয়াসত্ত্বেয় নিজের অবস্থান বদলাইনি। আমি, ভাইভা বোর্ডে রোল নাম্বারটা আর পুণরাবৃত্তি করিনি। এবং এখন আমি যুদ্ধ করতে প্রস্তুত, আমি চিৎকার করে বলবো, ঐ রোল নাম্বারটি কখনোই লাখে বলা যাবে না।

দৃশ্যপট: সপ্তম শ্রেণী

স্যার, ক্লাসে রোল কল করছেন, “রোল নাম্বার ফিফটি ওয়ান, ফিফটি টু, …” ধরা যাক, ঐ ক্লাসে ১৫০ জন ছাত্র আছে, শিক্ষক ডেকেই চলেছেন, “হান্ড্রেড ওয়ান, হান্ড্রেড টু, …” এবারে ধরা যাক ঐ ক্লাসে ৫ লাখ ছাত্র আছে, শিক্ষক ডেকেই চলেছেন, “ওয়ান ল্যাক ওয়ান, …ওয়ান ল্যাক ফাইভ হান্ড্রেড এ্যান্ড ফিফটি নাইন, …” -এই দৃশ্যপটে দেখা যাচ্ছে যে, রোল নাম্বার একটা গণনাবাচক সংখ্যা, যাকে উচ্চারণ করতে গেলে “এক লাখ পচাত্তর হাজার…”-এভাবে উচ্চারণ করতে হবে।

দৃশ্যপট: নটর ডেম কলেজ

নটর ডেম কলেজে আমি যখন ভর্তি হলাম, তখন আমার রোল নাম্বার ছিল ৬০৩৩০৪৭। স্কুল পাশ করে এলাম, এক এসএসসি পরীক্ষা ছাড়া এমন ভজকটমার্কা রোল নাম্বার তো দেখিনি! কী মানে এই রোল নাম্বারের? একদিন এক শিক্ষক আমাদেরকে বুঝিয়ে দিলেন:

নটর ডেম কলেজে রোল নম্বরের বৃত্তান্ত (অংলকরণ: নিশাচর)
নটর ডেম কলেজে রোল নম্বরের বৃত্তান্ত (অংলকরণ: নিশাচর)

সেই হিসাবে আমার রোল নাম্বারের প্রথম “৬” দ্বারা “ব্যবসায় শিক্ষা শাখা” বোঝানো হচ্ছে। “বিজ্ঞান শাখা”র কোড ছিল “১”। “০৩” দিয়ে বোঝানো হচ্ছে, আমি ২০০৩ খ্রিস্টাব্দে পাস করবো। “৩” দিয়ে বোঝানো হচ্ছে, আমার শ্রেণীর শাখা হলো তিন, বা ইংরেজিতে “C” (সি)। এর পরের তিন ডিজিট কোডটা হলো সর্বোচ্চ ৯৯৯ জন ছাত্রকে সূচিত করার জন্য। আমি সেখানে ছিলাম ৪৭ নম্বর, তাই “০৪৭”। …তাহলে দেখা যাচ্ছে একটা রোল নাম্বার শ্রেফ একটা সিরিয়াল নাম্বার নাও হতে পারে।

এবং ঘটনাটা সেইখানেই। আপনি যখনই বলবেন এক হাজার (১,০০০), তখনই বুঝতে হবে, তার এককের ঘর আছে (১), দশকের ঘর আছে (১০), শতকের ঘর আছে (১০০) বলেই সেটাকে আপনি ‘সহস্র’ (১০০০) বলতে পারছেন।

এবারে আসি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কথায়। আমি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ঢাকা কলেজের এক ছাত্রের কাছ থেকেও জেনেছি যে, ওখানেও ভাইভা বোর্ডে এভাবে লাখের হিসাবে রোল নাম্বার বলতে হয়। জানি না, সারা বাংলাদেশের কি এই হাল নাকি। তবে এখন আমি চ্যালেঞ্জ করছি, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যে রোল নাম্বার দেয়া হয়, তা কখনোই কাউন্টিং নাম্বার বা গণনাবাচক সংখ্যা নয়। তাই সেটাকে লাখে, হাজারে বলা যাবে না।

আমার রোল নাম্বারটি ছিলো ৪৬৯৫৩১। এই রোল নাম্বারটিকে যদি লাখের হিসাবে বলতে হয়, তাহলে ঐ শিক্ষকদেরকে অনুরোধ করবো, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের রোল নাম্বার ১-ওয়ালা ছাত্র/ছাত্রীটিকে বের করে দেখাতে। এককের ঘরের ছাত্রটি কোথায়? দশক, শতকের ঘরের ছাত্রটিইবা কোথায়? আমি জানি, তাঁরা ব্যর্থ হবেন। কারণ আমি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪লক্ষ ৬৯হাজার ৫শত ৩১তম ছাত্র নই। এটা শ্রেফ একটা কোড, এর মধ্যে রোল নাম্বারও আছে (যেটা প্রকৃত অর্থেই গণনাবাচক সংখ্যা)। কিন্তু সম্মিলিতভাবে পুরো রোল নাম্বারটি কখনোই গণনাবাচক সংখ্যা নয়। ঠিক যে কারণে একটা ফোন নাম্বার লাখে, কোটিতে পড়তে হয় না, ঠিক একই কারণে এজাতীয় রোল নাম্বারকে লাখে, কোটিতে না পড়ে ডিজিট-ডিজিট আলাদা করে পড়তে হয়, বলতে হয়।

সপ্তম শ্রেণীতে যখন রোল নাম্বার ৪৭ ডাকা হচ্ছে, তখন ক্লাসে রোল নাম্বার ১-ধারী একজন ছাত্র থাকে। আর এভাবেই ১ থেকে গণনা শুরু হয়ে ধীরে ধীরে ৪৭ ছুঁয়ে সামনে এগিয়ে যেতে থাকে। কিন্তু জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের এই রোল নাম্বারটি নটর ডেম কলেজের মতোই অনেকগুলো কোডের সমষ্টিমাত্র।

তাই সম্মানিত শিক্ষকদের প্রতি আকুল আবেদন, শ্রেফ নিজেদের গোঁড়া, ভ্রান্ত মতবাদের উপর না দাঁড়িয়ে থেকে দয়া করে সত্যটা মানুন এবং ছাত্রদেরকে সঠিক শিক্ষাটি দিন। সত্যি বলতে কি, কিছুই হতো না, যদি আমি সেদিন আমার রোল নাম্বারকে লাখে বলে আসতাম। কিন্তু এটাতো হতো যে, আমি একটা অন্যায়কে সাপোর্ট করতাম? তাই অন্যায়, সে যত ক্ষুদ্রই হোক, তাকে জোর গলায় প্রতিহত করতে হবে, ছাত্র-শিক্ষক, সকল স্তরেই।

-মঈনুল ইসলাম

মন্তব্য করুন