প্লুটো এবং গ্রহ-বিতর্কের অবসান

মার্কিন মহাকাশ পর্যবেক্ষক ক্লাইড টমবগের (Clyde William Tombaugh) ডায়রী থেকে উদ্ধৃত করেই শুরু করি:

জানুয়ারি ২৩: লওয়েল অবযারভেটরিতে (Lowell Observatory) যোগদান করলাম, যেখানে আমরা [প্রতীকি নাম] x [এক্স]-নামক নবম একটি গ্রহ খুঁজছি। এখানকার দূরবিক্ষণ যন্ত্র (telescope) অবশ্যই বিশাল; খামারের যন্ত্রপাতি আর গাড়ির যন্ত্রাংশে তৈরি আমার নিজের বানানো [দূরবিক্ষণের] প্রতিফলককে হারিয়ে দিবে এটি [নিশ্চিত]। [নক্ষত্রপুঞ্জ] মিথুনের একাংশের এক ঘণ্টার ছবি নিলাম।

জানুয়ারি ২৯: একই অংশের আরো একটি ছবি নিলাম। [আমার] বস্‌ ছবিগুলো দেখলেন, কিন্তু ঐ লেপটানো আলোময় ছবিগুলোতে তিনি আকর্ষণীয় কিছুই দেখলেন না।

ফেব্রুয়ারি ১৮: চারটার সময় গতমাসে নেয়া দুটো ছবি তুলনা করলাম। বেশ অনুজ্জ্বল একটা আলোকে খেয়াল করলাম, সেটা একটা জায়গায় এক ইঞ্চির আট ভাগের মতো সরে গেছে। আমার উত্তেজনা ধরে রাখা দায়, তবে আমাকে নিশ্চিত হতে হবে।

মার্চ ১৩: ওটা একটা গ্রহ!

(যন্ত্র: ১৩-ইঞ্চি দূরবিক্ষণ যন্ত্র, পলক তুলক (Blink comparator) নামক বিশেষ ধরণের দূরবিক্ষণ; পর্যবেক্ষণস্থল: মিথুন নক্ষত্রপুঞ্জ; স্থান: ফ্ল্যাগস্টাফ, এরিযোনা, যুক্তরাষ্ট্র; সময়কাল: ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দ)

প্লুটো (Pluto):

আমাদের সৌরজগতের সবচেয়ে দূরবর্তী ঐ গতিশীল বস্তুপিণ্ডটিকে রোমক মৃত্যু আর প্রেতলোকের দেবতার নামে গ্রহ হিসেবে নামকরণ করা হয় প্লুটো। এর ব্যাস [আনুমানিক] ২,৩০০ কিলোমিটার (১,৪৩০ মাইল); যা কিনা পৃথিবীর উপগ্রহ, চাঁদের তিন ভাগের দুই ভাগ সমান। সূর্য থেকে এর গড় দূরত্ব ৫৮,৭২,০০০ মিলিয়ন কিলোমিটার (৩,৬৮০ মিলিয়ন মাইল)। পৃথিবীর হিসাবে [মোটামুটি] ১৬৪ বছরে সূর্যকে একবার ঘুরে আসে। পৃথিবীর হিসাবে এর ১ দিনের দৈর্ঘ্য [মোটামুটি] ৬ দিন-৯ ঘণ্টা-১৮ মিনিট। পৃথিবীতে আপনার ওজন ৫০ কেজি হলে প্লুটোতে হবে মাত্র আড়াই কেজি। ১৯৭৮ খ্রিস্টাব্দে এর একটি উপগ্রহ আবিষ্কৃত হয়, নাম রাখা হয় ক্যারন (Charon)। (উচ্চারণটা ক্যারন-ই, চ্যারন নয়)

অন্য কথা:

২০০৫ খ্রিস্টাব্দের ৩১ জুলাই দৈনিক প্রথম আলোতে একটা প্রতিবেদন ছাপা হয় এরকম: মার্কিন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা সৌরজগতে দশম গ্রহের সন্ধান পেয়েছেন। প্রায় একই খবর ১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দের ১৬ জুলাই দৈনিক ইত্তেফাকে “সূর্যের দশম গ্রহ” শীর্ষক শিরোনামে ছাপা হয়। সেখানে নাসা’র (NASA) বিজ্ঞানী জন এন্ডারসনের (John Anderson) সূত্রে উল্লেখ করা হয়: কথিত দশম গ্রহটির আকৃতি পৃথিবীর আকৃতি থেকে পাঁচ গুণ বড় আর সূর্যকে প্রদক্ষিণ করতে এর কমপক্ষে ৭ হাজার বছর লাগে। আবার ২০০৬ খ্রিস্টাব্দে দৈনিক যায়যায়দিনে শিরোনাম হয় সৌর পরিবারে যোগ হচ্ছে ৩ সদস্য। বোঝাই যাচ্ছে, সৌর পরিবারে জায়গা করে নেবার জন্য ১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দ থেকেই [কিংবা আরো আগে থেকেই] গ্রহসদৃশ বস্তুপিণ্ডরা উঁকিঝুকি মারছে।

যারাই এসকল মহাকাষীয় বস্তুপিণ্ডকে সৌরজগত সংশ্লিষ্ট করতে চাচ্ছেন, তাঁদের জোরালো দাবিই হচ্ছে প্লুটো যদি গ্রহ হয়, তবে এটা কেন নয়? যৌক্তিক দাবি বটে, কেননা প্লুটো আর-সব গ্রহের তুলনায় একটু বেশিই ছোট। তাই নতুন নতুন গ্রহসদৃশ বস্তুপিণ্ডের আবিষ্কর্তারা জোর দিয়েই তাদের আবিষ্কৃত বস্তুপিণ্ডের সৌর পরিবারে স্থান চাইতে থাকলেন। কিন্তু মহাকাশের এতো এতো বস্তুপিণ্ডকে গ্রহ হিসাবে স্বীকৃতি দিতে থাকলে একসময় গ্রহের তালিকাই আর পড়ার ধৈর্য হবে না। তাই জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা স্বাভাবিকভাবেই এর মিমাংসা করতে বসলেন।

পৃথিবীর তাবত জ্যোতির্বিজ্ঞান সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার মূল হর্তাকর্তা হলো আইএইউ (International Astronomical Union: IAU)। আইএইউ’র জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা মহাকাশের এই উঁকিঝুকি দেয়া বস্তুপিণ্ডের একটা সুরাহা করতে বসলেন গত ২০০৬ খ্রিস্টাব্দে ১৪ আগস্ট চেক প্রজাতন্ত্রের (Czech Republic) রাজধানী প্রাগে (Prague)। এই সম্মেলনে প্রায় ৫০০ জন জ্যোতির্বিজ্ঞানী অংশগ্রহণ করলেন। তাঁরা আলোচনায় বসেই প্রথম যে সমস্যার সম্মুখিন হলেন তা হলো, হয় তাদেরকে এইসব নব্যআবিষ্কৃত বস্তুপিণ্ডকে গ্রহ ষোষণা করতে হবে; নতুবা বিতর্কিত প্লুটোকে বাদ দিতে হবে। কিন্তু যেহেতু গ্রহ ঘোষণা সম্ভব নয়, তাই প্লুটোকে বাদ দেয়াই উচিত। কিন্তু কিসের ভিত্তিতে প্লুটোকে বাদ দিবেন, তার উত্তর খুঁজতে গিয়ে তাঁরা জানতে পারলেন, তাদের হাতে গ্রহের নির্ভুল আর যুক্তিযুক্ত কোনো সংজ্ঞা নেই। সবচেয়ে আশ্চর্যের কথা হলো সেই প্রাচীন গ্রিস থেকে আজ অবধি বিজ্ঞানের কাছে গ্রহের সঠিক কোনো সংজ্ঞাই নেই। তাই শুরুতেই তাঁরা গ্রহের একটি নির্ভরযোগ্য সংজ্ঞা তৈরি করেন।

গ্রহের সংজ্ঞা জানার আগে চলুন আমরা জেনে নিই মহাকাশ আর সৌরজগত সম্পর্কে। মহাকাশ হলো বায়ুমণ্ডলের উর্ধ্বে অনন্ত আকাশ, যার কোনো সীমা আজ পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করতে বা ধারণাও করতে পারেননি: মানুষ আধুনিক প্রযুক্তির বলে দূর থেকে দূরাবধি দেখতে পারছে মাত্র। এই সীমাহীন মহাকাশে সৃষ্টির শুরু থেকেই কিছু নিয়ম বর্তমান। যেমন: এই মহাকাশে তেজষ্ক্রীয় (luminary) বস্তুপিণ্ড রয়েছে, যাদের থেকে [নিউক্লিয় বিক্রিয়ায়] আলো আর তাপ বিচ্চুরিত হচ্ছে, এবং তাদের ক্ষয় আছে। তারকা বা তারা (stars) বা জ্যোতিষ্ক হলো সেরকম বস্তুপিণ্ড। আবার কোনো কোনো জ্যোতিষ্ককে ঘিরে [আপাত] নিষ্ক্রীয় অনেক বস্তুপিণ্ড আবর্তিত হচ্ছে। এই সকল নিষ্ক্রীয় বস্তুপিণ্ডকে আমরা মহাকাশীয় বস্তু বলে জানবো। আমাদের সৌরজগতের সূর্য হলো সেরকম একটি তেজষ্ক্রীয় বস্তু বা জ্যাতিষ্ক বা তারা, যাকে ঘিরে মহাকাশীয় বস্তুসমূহ আবর্তিত হচ্ছে। বিজ্ঞানীরা এই অবস্থাকে একত্রে একটি সৌরজগত আখ্যা দিলেন। অনেক অনেক সৌরজগত মিলে হয় ছায়াপথ (Galaxy)

সৌরজগত (Solar System):

আমাদের সৌরজগতের মোটামুটি কেন্দ্রে অবস্থিত সূর্য, যা নিজে প্রচণ্ড উত্তপ্ত, আর আলো বিকিরণ করে চলেছে। সূর্যকে ঘিরে অনেক মহাকাশীয় বস্তু আবর্তিত হচ্ছে। এই সকল মহাকাশীয় বস্তুপিণ্ড কোনো কোনোটি সুদীর্ঘদিন ধরে একই কক্ষপথে আবর্তিত হচ্ছে, আবার কোনোটি কখনও স্থায়ী কখনও অস্থায়ী কক্ষপথে আবর্তিত হচ্ছে, আবার কোনো কোনোটির কোনো স্থায়ী বা অস্থায়ী কক্ষপথই নেই, এরা বেওয়ারিশ। পৃথিবী থেকে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা দূরবীক্ষণের মাধ্যমে অথবা কখনও মহাকাশযান (spaceship) পাঠিয়ে এপর্যন্ত আমাদের জানিয়েছেন, [মোটামুটিভাবে] সূর্যকে ঘিরে সুদীর্ঘদিন ধরে [স্থায়ী কক্ষপথে] আবর্তিত হতে থাকা মহাকাশীয় বস্তুপিণ্ডের মধ্যে সূর্যের সবচেয়ে নিকটবর্তি হলো বুধ (Mercury)। তার পর একে একে রয়েছে শুক্র (Venus), পৃথিবী (Earth), মঙ্গল (Mars), বৃহস্পতি (Jupiter), শনি (Saturn), ইউরেনাস (Uranus), নেপচুন (Neptune) ও প্লুটো (Pluto)। বিজ্ঞানীরা এই নয়টি মহাকাশীয় বস্তুকে গ্রহ (Planets) আখ্যা দিলেন, কেননা এগুলো আকারে বেশ বড়। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বুধ, শুক্র, পৃথিবী আর মঙ্গল গ্রহকে অভ্যন্তরীণ গ্রহ (Inner Planets), এবং বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস ও নেপচুনকে বহিঃগ্রহ (Outer Planets) বলে থাকেন। অভ্যন্তরীণ গ্রহগুলো আকারে তুলনামূলক ছোট এবং এদের প্রাথমিক গঠন উপাদান হলো লোহা আর পাথর। অন্যদিকে বহিঃগ্রহগুলো তুলনামূলক বেশ বড় এবং হাইড্রোজেন, হিলিয়াম আর বরফপূর্ণ; শুধুমাত্র প্লুটোই এই দুয়ের কোনোটির বৈশিষ্ট্যেই খাপ খায় না।

গ্রহগুলোর নাম মনে রাখার সুবিধার্থে ইংরেজিতে একটা শ্লোক রয়েছে:

My Very Excellent Mom Just Served Us Nice Pickles.

(আমার লক্ষ্মী মা এইমাত্র আমাদেরকে দারুণ [মজার] আচার পরিবেশন করলেন)

প্রতিটা বড় ছাদের হরফ সূর্য থেকে যথাক্রমে নির্দেশ করছে: Mercury-Venus-Earth-Mars-Jupiter-Saturn-Uranus-Neptune-Pluto

এছাড়া মঙ্গল আর বৃহস্পতির মাঝখান দিয়ে প্রচুর ছোট ছোট মহাকাশীয় বস্তু দলবদ্ধ হয়ে আবর্তিত হচ্ছে। তাদের দল বেঁধে এভাবে ঘুরতে দেখলে দূর থেকে মনে হয় একটি ফিতা বা বেল্ট যেন। তাই বিজ্ঞানীরা এই ছোট ছোট নির্জীব মহাকাশীয় বস্তুগুলোর দলকে নাম দিয়েছেন কুইপার বেল্ট (Kuiper Belt)। এরকম আরো একটি কুইপার বেল্ট রয়েছে নেপচুন আর প্লুটোর মাঝখানে; যেন অভ্যন্তরীণ আর বহিঃগ্রহগুলোকে ঈশ্বরই আলাদা করে রেখেছেন এই বেল্টগুলো দিয়ে।

বিজ্ঞানীরা আরো লক্ষ করলেন গ্রহ বলে আখ্যায়িত এই বস্তুসমূহকে ঘিরে আরো কিছু বস্তু আবর্তিত হচ্ছে, তাঁরা সেগুলোকে গ্রহের সাথে সম্পর্কিত [কিন্তু ব্যতিক্রম] করে নাম রাখলেন উপগ্রহ (natural satellite), কেননা তাদের বিশ্বাস সেগুলো গ্রহেরই কোনো না কোনো বিচ্ছিন্ন অংশ। আর বেওয়ারিশ মহাকাশীয় বস্তুপিণ্ডগুলোর নাম দেয়া হলো গ্রহাণু বা মহাকাশীয় বস্তু (asteroids); আর তার একটি উজ্জ্বল উদাহরণ হলো ধুমকেতু (comets)

অতি সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা আরো জানাচ্ছেন যে, মঙ্গল গ্রহ আর বৃহস্পতি গ্রহের মাঝখানে মোটামুটি স্থায়ী কক্ষপথে আবর্তনশীল আরেকটি বস্তুপিণ্ড পাওয়া গেছে, যার নাম দেয়া হয়েছে সেরেস (Ceres)। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা মহাকাশে এরকম আরো কিছু মহাকাশীয় বস্তু আবিষ্কার করতে থাকলেন, যাদের দুটি হলো: ২০০৩ ইউবি ৩১৩ (2003 UB 313)সেড্‌না (Sedna)। সমস্যা দেখা দিলো, যখন এইসব আবিষ্কৃত বস্তুগুলোকে গ্রহ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার কথা উঠলো। তাই গ্রহের সংজ্ঞা নির্ধারণই প্রথম ধাপ হিসেবে বিবেচিত হলো।

গ্রহ কী:

গ্রহকে এককথায় সংজ্ঞায়িত না করে দেখা যাক কী কী বৈশিষ্ট্যের প্রেক্ষিতে একটা মহাকাশীয় বস্তুপিণ্ডকে গ্রহ বলা যাবে: (১) গ্রহ হতে হলে একে জ্যোতিষ্কের চারপাশে স্থায়ী কক্ষপথে আবর্তনশীল হতে হবে; (২) ..এর আকার ও ভর নিজস্ব মহাকর্ষ বল দ্বারা একটি গোলাকার কাঠামো ধরে রাখার জন্য যথেষ্ট হতে হবে; (৩) ..এর কক্ষপথ হতে হবে অন্যান্য যেকোনো গ্রহ, উপগ্রহ কিংবা গ্রহাণুর কক্ষপথ থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র বা আলাদা। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ‘গ্রহ হওয়ার ক্ষেত্রে কোনো বস্তুর গোলাকৃতিই মুখ্য হওয়া উচিত, কারণ এটি ইঙ্গিত করে বস্তুটির পর্যাপ্ত অভিকর্ষ আছে, যা এটিকে গোলাকৃতি দিয়েছে।

আর এই সংজ্ঞার ভিত্তিতেই জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা প্লুটোকে সৌর পরিবার থেকে বাদ দেবার সিদ্ধান্ত নেন ২০০৬ খ্রিস্টাব্দে ২৪ আগষ্ট আইএইউ’র [১৪ আগস্ট শুরু হওয়া] ১৬তম সম্মেলনে।

প্লুটো কেন বাদ পড়লো:

প্লুটোর আকার এতো ছোট যে, অনেক উপগ্রহের আকারই অনায়াসে প্লুটোকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। আবার কুইপার বেল্টেও এমন কিছু মহাকাশীয় বস্তু (Kuiper Belt Objects: KBOs) রয়েছে যাদের আকার প্লুটোর আকারের সাথে পাল্লা দিতে সক্ষম। এছাড়াও প্লুটোর কক্ষপথ অনিয়মিত; এই অনিয়মিত কক্ষপথে এটি মাঝে মাঝেই নেপচুনের কাছাকাছি এসে পড়ে। এমনকি প্রতি ২৩৮ বছরে প্লুটো সূর্যের এতো কাছাকাছি এসে যায় যে, সূর্য থেকে নেপচুনের যে দূরত্ব, তার চেয়েও কম দূরত্ব দিয়ে অতিক্রম করে; তখন নেপচুন অষ্টম নয়, [সাময়িকভাবে] নবম গ্রহ হয়ে যায়। তবে বিজ্ঞানীরা প্লুটোর সবচেয়ে বড় অযোগ্যতা হিসেবে বিবেচনা করেছেন এর ভর; আর আকৃতিতো সব সময়েরই বিতর্কিত।

প্লুটো তাহলে এখন কী:

হ্যা, প্রশ্নটা এখন সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত। কেননা যতদিন প্লুটো গ্রহ ছিল, ততদিন ক্যারন নামে তার একটা উপগ্রহও ছিল। এখন যেহেতু প্লুটো গ্রহ নয়, তাই ক্যারনকেও উপগ্রহ বলা যাবে না। আবার ক্যারনের উপস্থিতির কারণে প্লুটোকে এক ধাক্কায় গ্রহাণুতে নমিয়ে দেয়াও যাচ্ছে না; তাই প্লুটোকে বলা হবে বামন গ্রহ (Minor Planets) সেইসাথে ক্যারন গ্রহাণু হিসেবে স্বীকৃতি পাবে। অন্যান্য বিতর্ক সৃষ্টিকারী সেরেস, ২০০৩ ইউবি ৩১৩ এবং সেড্‌নাও বামন গ্রহ আখ্যা পাবে।

তবে অতি সম্প্রতি জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা প্লুটোসহ নব্য আবিষ্কৃত অন্যান্য বস্তুপিণ্ডগুলোকে আখ্যায়িত করেছেন একটি পরিবার হিসেবে, যার নাম দেয়া হয়েছে: প্লুটোইড। এদেরকে গ্রহাণু আর গ্রহের মাঝামাঝি একটা অবস্থান দেয়া হয়েছে। প্লুটোইডে স্থান পাবার জন্য নির্দিষ্ট ভর আর ঔজ্জ্বল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে প্রাথমিকভাবে প্লুটোইডে প্লুটো ছাড়াও আছে [প্লুটোর কাছাকাছি, আবিষ্কৃত] এরিস (Eris)। এই পরিবারের ভবিষ্যত বংশধর কারা হবে, সেটা সময়ই বলে দেবে।

প্লুটো ও ক্যারণ ও আরো দুটো গ্রহাণু (সংগ্রহ: www.newswise.com)
প্লুটো ও ক্যারণ ও আরো দুটো গ্রহাণু (সংগ্রহ: www.newswise.com)
শেষ কথা:
গ্রহ, গ্রহাণু আর বামন গ্রহ বিতর্কের অবসান করে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা যে উপসংহারে পৌঁছেছেন, তার সারকথা হলো: এখন থেকে সৌরজগতের গ্রহের সংখ্যা ৮টি, সূর্য থেকে দূরত্বের ভিত্তিতে এগুলো যথাক্রমে বুধ, শুক্র, পৃথিবী, মঙ্গল, বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস আর নেপচুন। সুতরাং ‘বাপ-দাদার আমল থেকে শুনে আসছি-জাতীয় কথা আর জ্যোতির্বিজ্ঞানে বলা চলবে না। কেননা জ্যোতির্বিজ্ঞান সংক্রান্ত আমাদের বই, পাঠ্যপুস্তক, ওয়েবসাইট, বিশ্বকোষ, ইতিহাস সবই এবার পরিবর্তন করতে হবে। এমনকি পরিবর্তনশীল জ্যোতির্বিজ্ঞানের সাথে তাল মিলিয়ে [ঢাকার তেজগাঁওয়ের] নভোথিয়েটার-এও আনতে হবে সময়োপযোগী পরিবর্তন। কিন্তু সেখানে এখনও ঝুলছে প্লুটো, কিন্তু যুক্ত হয়নি সেরেস কিংবা সেডনা। বিজ্ঞানের পরিবর্তনশীল জয়যাত্রায় আমরা যেন পিছিয়ে না পড়ি সেই আশাবাদই শুধু ব্যক্ত করতে পারি।
সর্বপ্রথম পরিবর্তনটা হয়ে যাক এখনই, শ্লোকটাকে বদলে ফেলি: My Very Excellent Mom Just Served Us Noodles; যেখানে প্লুটো বাদ। [ইংরেজির মতো শুধু প্রথম অক্ষরগুলো নিয়ে] বাংলা শ্লোক হতে পারে:
বটের শিঁকড়ে পেরেক মেরে বলাই শেখায় ইঁদুর নাচ (অর্থহীনভাবে)
বনের শুকর পড়লো মোহে
বন শয়নে ইষ্ট নহে (অর্থপূর্ণভাবে)
(অর্থ: বন্য শুকর [শহরের] মোহে পড়ে বন ছাড়ার [ভিত্তিহীন] চিন্তা করছে; তাই বনে শয়ন করা নিরাপদ লাগে না আর তার কাছে)
আমার শ্লোক দুটো ভালো লাগলে আত্মস্থ করুন, নতুবা মনের মতো সুন্দর সুন্দর বাংলা শ্লোক লিখে নিচে মন্তব্য করুন বাংলাদেশের অগণিত পড়ুয়াদের সুবিধার জন্য।
four moon of Pluto (latest one is of July 2011)
প্লুটোর উপগ্রহ এখন থেকে চারটি: ক্যারন, নিক্স, হাইড্রা এবং (সাময়িকভাবে) P4 (কৃতজ্ঞতা: M. Showalter/SETI, ESA, and NASA)
প্লুটোর উপগ্রহ বা প্লুটোকে ঘিরে থাকা গ্রহাণুর সংখ্যা কিন্তু একটি নয় বরং চারটি। এতোদিন ছিল তিনটি (ক্যারন, নিক্স ও হাইড্রা), অতি সম্প্রতি (২০১১’র জুলাইতে) আবিষ্কৃত হয়েছে চতুর্থ আরেকটি উপগ্রহ। সাময়িকভাবে যার নাম রাখা হয়েছে P4। (আরো জানুন: এখানে^)

– মঈনুল ইসলাম

অক্টোবর ১৪, ২০০৬ খ্রিস্টাব্দ
পরিমার্জন ও পরিবর্ধন: জানুয়ারি ২২, ২০০৮ খ্রিস্টাব্দ
পরিবর্ধন: আগস্ট ০৭, ২০১১ খ্রিস্টাব্দ
তথ্য সংগ্রহ:
বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকা; বিশ্বকোষ; মহাকাশ বিষয়ক বিভিন্ন গ্রন্থ এবং ডিসকভারি চ্যানেল: ইয়াং ডিসকভারার সিরিয, ইউনিভার্স
nanodesigns

মন্তব্য করুন