জলপ্রপাতের খোঁজে – ছোট বোয়ালিয়া আর মালিখোলা ৩

~ জলপ্রপাত আবিষ্কার ~

খইয়াছড়া ঝরণার যৌবনে যুদ্ধে ব্রতী হবো বলে এসে হালকা চালের রজ্জু তীরোপার করে আমরা যখন বিশ্রাম নিচ্ছি, তুহিন ভাইয়ের জ্যাঠার মৃত্যু খবরে তিনি ঢাকার পথ ধরলেন। বাকি তিনজন, দুপুরের খাবার খেয়ে বাক্স-পেটরা সব ঐ খাবার হোটেলে রেখেই বেরিয়ে পড়লাম – নিকটস্থ একটা ঝরণা আবিষ্কারের জন্যে।
ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়কটা পেরিয়ে রাস্তার পূর্ব পাশের ফটিকছড়ির রাস্তা ধরে যেতে হবে। একটা সিএনজি নিয়ে নিলাম আমরা হোটেল মালিকের কথামতো… সিএনজি যাবে ব্র্যাক সেন্টার পর্যন্ত। বাকি পথটা হেঁটে যেতে হবে। মাঝখানে একবার সিএনজি নষ্ট হয়ে গেল, তখন নেমে আবুবকর আবারও ঝরণার বিষয়টা নিশ্চিত হয়ে নিলেন। ব্র্যাক পোল্ট্রির কাছে গিয়ে সিএনজি থেকে নামলাম আমরা (ভাড়া ৳৫০)।

ঝরণার উদ্দেশ্যে আমাদের যাত্রা শুরু - গ্রামীণ রাস্তা ধরে (ছবি: নিশাচর)
ঝরণার উদ্দেশ্যে আমাদের যাত্রা শুরু – গ্রামীণ রাস্তা ধরে (ছবি: নিশাচর)

এবারে বামদিকের পথটা ধরে যেতে হবে পায়েদল – গন্তব্য ত্রিপুরা পাড়া। কোনো গাইড নেয়া হলো না, একে-ওকে জিজ্ঞেস করে পথ চলতে হচ্ছে আমাদের। বৃষ্টির দিনে গ্রামের রাস্তা কেমন হয়? তা আর বলা লাগে না – কর্দমময়। তাও যেনতেন কর্দম না, একেবারে এঁটেল মাটির কর্দম। পা দিয়েই বিপদ, পিছলে যেতে চায় পা। এই পথের বর্ণনা দেয়া উচিত ছিল, কিন্তু এপথে ছবি তুলেছি খুব কম, কারণ আমরা যদি ঝরণা পাইই, তাহলে তার জিপিএস ট্র্যাক নিতে হবে, তাই ব্যাটারি বাঁচানো দরকার। এজন্য এপথে ছুবি তুলেছি খুব কম।

পথে পথে নদী পার হওয়া লেগেছে, হাঁটু কিংবা উরু পানি দিয়ে - তথৈবচ (ছবি: নিশাচর)
পথে পথে নদী পার হওয়া লেগেছে, হাঁটু কিংবা উরু পানি দিয়ে – তথৈবচ (ছবি: নিশাচর)

তবে কিছু কিছু বর্ণনা না দিলেই নয়: একটা জায়গায় গেলাম, যেখানে পথটা একটা খাড়া পাহাড়ের মতো করে উঠে গেছে। সাধারণত ঢালু জায়গায় কাদা হয় না, কারণ পানি জমতে পারেনা ওখানে, কিন্তু দেখা গেল এখানে বিষয়টা বিচিত্র – কাদা শুধু কাদাই নয়, একেবারে মোক্ষম কাদা। ঢালু জায়গায় যদি কেউ এক গ্যালন পিচ্ছিল পদার্থ ছেড়ে দেয়, তো যে অবস্থা হবে, আমাদেরও একই অবস্থা। না পারছি, রাস্তা ছেড়ে বাইপাস ধরতে, আর না পারছি রাস্তা ধরে হাঁটতে। একটু বেসামাল হলেই কাদায় গোসল তো হবেই, সাথে নেমে যেতে হবে বেশ কয়েক ফুট স্লাইড করে। বহু কষ্টে, অনেক সময় নিয়ে পার হলাম আমরা এই জায়গাটা।

আমার ভুল না হলে, আমাদের পথ চলায়, আমরা তিন কি চার জায়গায় নদী পার হয়েছি। হাঁটতে হাঁটতে নদী পার হবার বিষয়টা আমাদের আয়ত্বেই ছিল অফ-ট্র্যাক বান্দরবানের পরে। এবারে এক ডিগ্রি বাড়া – কোথাও কোমর পানিতে ক্যামেরার ব্যাগটা বাঁচিয়ে পার হতে হচ্ছে। একটু পা পিছলে পড়ে গেলে নিজের গোসল হবে, তা বড় কথা নয়, এত দামী ক্যামেরাটা আক্ষরিক অর্থেই জলে যাবে

রাস্তায় এতো এতো কাদা যে, পথটাকে আদতে কেউ যদি শুকরের খোয়াড় বলে, খুব একটা ভুল হবে না। …যাহোক, যতই সামনে এগোচ্ছি, ততই আমরা পাহাড়ের কাছাকাছি হচ্ছি। এতে মনের মধ্যে মৃদু আশা জাগছে: ঝরণা বোধহয় পেতে চলেছি। একটা পাহাড়ে চড়ে (এগুলোকে পাহাড় বলা হবে, নাকি উঁচু টিলা বলা যাবে, তা হয়তো আলোচনাসাপেক্ষ) সামনে এগোনোর সময় কিসের যেন আওয়াজ শুনতে পেলাম। আমরা বুঝলাম, এগুলো কলাগাছের পাতায় পাতায় ঘর্ষণের আওয়াজ। এদিকে কলা গাছের চাষ একটু বেশিই দেখছি।

এমন সময় আমরা আবিষ্কার করলাম, আমরা পথ হারিয়েছি। ঘুরেফিরে একই জায়গায় ফিরে এসেছি আবার। কী করা যায়, কী করা যায়… এমন সময় আমরা একজন লোককে পেলাম। আবুবকর তাঁর কাছে বিস্তারিত বললেন। শুনে তিনিই বললেন, চলেন আমার সাথে। পেয়ে গেলাম আমাদের গাইড, নাম আক্কাস আলী (ছদ্মনাম)। পরনে একটা ময়লা সাদা শার্ট আর ময়লা লুঙ্গি। মুখে হালকা দাড়ি, দাড়ির গড়নটাই ফ্রেঞ্চকাট টাইপের, মাথায় পাতলা চুল, রোদে পোড়া তামাটে ত্বক – দেখেই বোঝা যায় ইনি কামলা-গোছের একজন। ঢাকা থেকে তিনজন লোক এসেছে ঝরণা দেখতে – আন্তরিকতায় নাকি টাকার গন্ধেই কিনা জানি না, আক্কাস আমাদেরকে নিয়ে চললেন ঝরণার দিকে।

দেখা গেলো, যেখানটায় আমরা পথ হারিয়েছিলাম বলে মনে করেছিলাম, আসলে সেদিক দিয়েই যেতে হতো। যাহোক, আমাদের পথটা গিয়ে নামলো একটা ঝিরিতে। ঝিরিতে নেমেই নিজেদের ভুলটা বুঝতে পারলাম, একটু আগে যাকে কলাপাতার ঘর্ষণের আওয়াজ ঠাওরেছিলাম, তা আসলে আমাদের কাঙ্ক্ষিত ঝরণারই শব্দ। ঝিরিতে জলস্রোতের বিপরীতে হাঁটতে হচ্ছে আমাদেরকে, তাছাড়া এখানে ঝিরির পানির গভীরতা খইয়াছড়া থেকে একটু বেশি। ঝিরিতে পানির তোড় দেখেই আন্দাজ করে ফেলা যায়, কী অপেক্ষা করছে সামনে।

ঝরণাটাকে দেখা যাচ্ছে একটা খুমের ফাঁক দিয়ে - আরো উতলা করে দিল (ছবি: নিশাচর)
ঝরণাটাকে দেখা যাচ্ছে একটা খুমের ফাঁক দিয়ে – আরো উতলা করে দিল (ছবি: নিশাচর)

অবশেষে পাথর ডিঙিয়ে ডিঙিয়ে আমরা যেখানটাতে হাজির হলাম, সেখান থেকেই ঝরণাটাকে দেখতে পেলাম – কী সে পানির তোড়… অস্থির অবস্থা! ঝরণার জলপতনের ঐ শাঁ শাঁ আওয়াজটাই মন ভরিয়ে দেবার জন্য যথেষ্ট। তীব্র গতিতে পানি আছড়ে পড়ছে উপর থেকে, আছড়ে পড়ছে পাথরের উপর। পাথরের গায়ে আছড়ে পড়ার পর চারদিকে সাদা হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে পানি। কিন্তু কোথা থেকে পড়ছে, আর কতটুকু বড়ইবা ঝরণাটা তা দেখা যাচ্ছে না এখান থেকে… আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, সেখান থেকে ঝরণাটা দেখা যাচ্ছে সত্যি, তবে দুপাশে দুটো পাহাড়, আর তাদের মাঝখানে সরু একটা খাঁজমতো (খুমের মতো), ঐ ফাঁক দিয়ে দেখছি আমরা ঝরণাটাকে।

ঝরণা আর আমাদের মাঝখানে পানি – ঝরণা থেকে নেমে পানি এদিক দিয়েই এসে বেরোচ্ছে সব। ঝিরি ধরে যেমনটা এগিয়েছিলাম, সেরকমই এগোতে যাচ্ছিলাম, বাধা দিলেন আক্কাস, জানালেন, ঐ অংশটুকুতে পানির গভীরতা বেশি। সাঁতরে হয়তো যাওয়া যেত, কিন্তু পানির তোড়ে যদি সামনে এগোন না যায়? তাই বিকল্প খুঁজলেন আবুবকর। ডানদিকের পাহাড়টায় চোখ বোলালেন, গাইডও যা বোঝার বুঝে নিলেন। ডানদিকে পাহাড় বেয়ে উঠতে শুরু করলাম আমরা।
পিচ্ছিল হওয়াসত্ত্বেয় সহজেই উঠা গেলো। উপরে উঠে এবারে ঝরণাটার দেখা পাওয়া গেল। আরো কাছে থেকে ঝরণাটা দেখে আমি আর আমার আবেগ আটকে রাখতে পারলাম না। অপূর্ব একটা ঝরণা! কিন্তু যে জায়গাটায় দাঁড়িয়ে আছি আমরা, এখান থেকেও পুরো ঝরণাটা দেখা যাচ্ছে না, গাছপালা, লতাপাতা চারদিক থেকে এসে বেঁধে ধরেছে চোখটাকে যেন। মন ভরছে না কিছুতেই।

গাছ লতাপাতার ফাঁক-ফোকর দিয়ে ছোট বোয়ালিয়াকে দেখে মন ভরছিল না মোটেই (ছবি: নিশাচর)
গাছ লতাপাতার ফাঁক-ফোকর দিয়ে ছোট বোয়ালিয়াকে দেখে মন ভরছিল না মোটেই (ছবি: নিশাচর)

আবুবকর জানতে চাইলেন, ঝরণার সামনে যাওয়া যাবে কিনা। গাইড আক্কাস তখন, আমরা যে পাহাড়ে, তার থেকে নিচের দিকে সন্তর্পনে নেমে যেতে লাগলেন। তিনি নামছেন, আমরা নিচে যেখানটাতে দাঁড়িয়ে পানির কারণে এগোতে পারিনি, সেটা পার হয়েই একটা পাথুরে ঢালু জায়গায়। ঝরণা থেকে পানি পড়ছে পাথরের উপর, তারপর এই ঢাল হয়ে পানি নামছে সেই গভীর খাঁজে, তারপর যাচ্ছে ঝিরিতে। আমার ভয় হলো, জায়গাটা দিয়ে যেভাবে পানি নামছে সব সময়, নিশ্চয়ই প্রচন্ড পিছলা হবে।

আবুবকর জানতে চাইলেন আমার দিকে চেয়ে, নামবেন কিনা? আমিতো এক পায়ে খাড়া – এতো কাছে এসে ঝরণার একটা জুৎসই ছবি না নিয়ে গেলে কি আর হয়? কিন্তু এই বিপদসংকুল পথে যেতে চাইলেন না কামাল ভাই। আবুবকর অনুসরণ করলেন গাইডের দেখানো পথ। আমি ঠিক করলাম, যথাসম্ভব ভিডিও করবো কিংবা ছবি তুলতে থাকবো, যতই বিপদসংকুল পথ হোক না কেন। বিয়ার গ্রিল্‌স যদি ক্যামেরার সামনের নায়ক হন, তবে সেই ক্যামেরার পেছনের নায়ক হলেন সাইমন রে। মনে মনে নিজেকে ম্যান ভার্সেস ওয়াইল্ড-এর এই ডিরেক্টর অফ ফটোগ্রাফি’র জায়গায় কল্পনা করে নিলাম – যত যা-ই হোক, ক্যামেরা চলবেই।

এবারে ছোট বোয়ালিয়া ঝরণার কাছে যাওয়ার প্রয়াস - গাইডের দেখানো পথে পা ফেলে নামছেন আবুবকর (ছবি: নিশাচর)
এবারে ছোট বোয়ালিয়া ঝরণার কাছে যাওয়ার প্রয়াস – গাইডের দেখানো পথে পা ফেলে নামছেন আবুবকর (ছবি: নিশাচর)

কিন্তু ঢালু জায়গাটা দিয়ে নামতে গিয়ে বুঝলাম, একেতো বর্ষার জলসিক্ত পাথুরে ঢালু পথ, তার উপর ঝরণা থেকে উড়ে আসা বাষ্পে সিক্ত গাছ-আগাছা-শ্যাওলা – রীতিমতো পিচ্ছিল করে রেখেছে পথটাকে। তাই বান্দরবানে ট্রেক করার জন্য কিনে নেয়া বিশেষ উপকারী রাবারের জুতাজোড়া উপরেই খুলে রাখার সিদ্ধান্ত নিলাম। খালি পায়ের চেয়ে মোক্ষম গ্রিপ আর কী হতে পারে? আবুবকরকে বললাম, ‘ইশ্! আমাদের গিয়ারগুলো সাথে নিয়ে এলেই হতো।’ আবুবকরও একই কথাই ভাবছেন, বললেন, ‘এজন্যই বলে, গিয়ার কখনও কাছ-ছাড়া করতে নাই।’ আক্ষেপটা ঝরণার সাথে বইয়ে দেয়া গেল না, মাথায় নিয়েই নামতে থাকলাম কষ্ট করে, কসরত করে, ঝুঁকি নিয়ে। আমরা ঠিক যেখানটায় নামতে যাচ্ছি, তার পাশেই ঝরণার একপাশের পানি একটা পাথরে আছড়ে পড়ছে। পানির ছিটা এসে গায়ে পড়বে, ক্যামেরা সেই ছিটা থেকে বাঁচিয়ে তবে ছবি তুলতে হবে।

কিন্তু ছবি তুলে তুলে নামতে গিয়ে আবিষ্কার করলাম ম্যান ভার্সেস ওয়াইল্ড শুরু হবার সময় লেখা থাকে: বিয়ার গ্রিল্‌স প্রয়োজনে সাপোর্ট গ্রহণ করেন। সে তুলনায় সাইমন রে তো কথাই নেই – সেরকম সাপোর্ট ছাড়াই সাইমন রে হতে গিয়ে হাত-পা ভাঙার মানে হয় না। তবু যথাসাধ্য ভিডিও করে করে নামছিলাম নিচে। ভিডিওতে আবুবকরকে দেখা যাবে কিভাবে ধীরে ধীরে পা বুঝে বুঝে ফেলে নামছেন। গাইড খুব সাবধান করে দিচ্ছিল – আমরা যেন হাত-পা ভেঙে তাঁকে বিপদগ্রস্থ না করি।

এই জায়গাটাতে নামতে হলো- উপর থেকে দেখে পিচ্ছিল মনে হলেও মোটেও তা নয় (ছবি: নিশাচর)
এই জায়গাটাতে নামতে হলো- উপর থেকে দেখে পিচ্ছিল মনে হলেও মোটেও তা নয় (ছবি: নিশাচর)

না, আমরা বিপদগ্রস্থ হলাম না, পা টিপে টিপে, ভেজা পাতা, গাছে, আগাছায়, ঢালু পাহাড়ের গায়ে পা ঠেকিয়ে একসময় নেমে এলাম ঢালু জায়গাটায় – আর আবিষ্কার করলাম অনবরত পানি চললেও, সম্ভবত ঢালু হবার কারণে জায়গাটা মোটেই পিচ্ছিল না; তাই পাথরের উপরে দাঁড়াতে পেরে স্বস্থি পেলাম – পা জোড়া ঝরণার প্রচণ্ড ঠান্ডা পানিতে ভিজিয়ে বড্ড অপূর্ব লাগলো। ক্যামেরা কিছুক্ষণের জন্য বন্ধ রাখলাম – ভিজে যাবে নাহলে। এবারে ঝরণাটা সম্পূর্ণ দেখা যাচ্ছে, তবে একপাশ থেকে – সম্পূর্ণ ঝরণাটা একেবারে সামনাসামনি দেখতে হলে বড় একটা পাথর ঘুরে ডানদিকে যেতে হবে।

যাবো কি যাবো না – আবুবকর আমার দিকে তাকালেন, আমি কি আর ‘না’ করার বান্দা? গাইড এগিয়ে গেলেন, আমরা ধীর পায়ে তাঁকে অনুসরণ করলাম। ক্যামেরা আমার শরীরের আড়ালে রাখলাম যাতে পানির ছিটা না লাগে। পিচ্ছিল পাথরের কোথাও কোথাও পা ফেলে আরেক পা তোলার আগে ভালোমতো যাচাই করে নিতে হচ্ছে শরীর টিকবে কিনা। এভাবে বেশ ধীরে আমরা সামনে এগিয়ে এক্কেবারে সামনাসামনি দাঁড়ালাম আমাদের আবিষ্কৃত ঝরণাটির – গাইডের থেকে জেনে নিলাম এর নাম ‘ছোট বোয়ালিয়া ঝরণা’। অপূর্ব এক ঝরণা – তীব্র তার স্রোত। এরকম ঝরণাকেই বোধহয় ‘ঝরণা’ তকমার বদলে ‘জলপ্রপাত’ তকমাটি দিয়ে দেয়া যায়।

ছোট বোয়ালিয়া ঝরণা, ছোট বোয়ালিয়া জলপ্রপাত (Choto Boalia Falls), চট্টগ্রামের মীরসরাইতে অবস্থিত একটি সাধারণ উচ্চতার ঝরণা, যা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মোটামুটি উচ্চতার ঝরণা এটি। গাইডের উচ্চতাকে মাপকাঠি ধরে, আমাদের হিসাবমতে এটি ভূমিসমতল থেকে ২২ ফুট উঁচু ঝরণা। ভৌগোলিক স্থানাঙ্ক: 22°47’26.86″N, 91°36’0.23″E। –panoramio-logo

ঝরণার আরো একটু কাছাকাছি যেতে ইচ্ছে করছে, কিন্তু জায়গাটায় একটু ঢালু পাথর, আর পাথরগুলো এতোটাই পিচ্ছিল যে, এগোন খুব কষ্ট। শুধু ঝরণা দেখলেই তো হবে না, ছবিও তুলতে হবে। আবুবকর এগোতে গিয়ে বেশিদূর এগোতে পারলেন না, কারণ পা, পাথরে পিছলে যাচ্ছে। আমি অবশ্য গাইডের সহায়তায় কিছুদূর অবধি যেতে পারলাম, কারণ আমার পায়ে অ্যাংকলেট পরা ছিল, চর্মাবৃত পা-খানা যখন পিছলে যেতে চায়, তখন অ্যাংকলেটের কারণে তা একটু কর্ষণ পায়, আমাকে দাঁড়াতে সহায়তা করে।

ঝরণাটার মূল ধারাটা বড়, অশ্বক্ষুরাকৃতি (মানে ঘোড়ার ক্ষুরের মতো সামনের দিকে অর্ধবৃত্তাকার), উপর থেকে জলধারা একাঙ্গি পড়লেও মাঝপথে বড় একটা পাথরের উঁচিয়ে থাকা বুকের কারণে ঝরণাটা দুভাগ হয়ে নিচে পড়ছে। ঠিক নিচেই বড় বড় পাথর, সেগুলোতে সরাসরি আছড়ে পড়ছে জল। ঝরণার দিকে মুখ করে দাঁড়ালে ডানদিকে একটা ছোট্ট জলধারা নেমে আসছে, যা, উপর থেকেই আলাদা হয়ে ওদিকে সরে যাচ্ছে, তবে নিচে নেমে ঝরণার সব জলই একটা পথ দিয়ে যাচ্ছে, যেদিক দিয়ে আমরা এসেছিলাম।

ছোট বোয়ালিয়া থেকে ফেরার পালা - ঐ যে ফোকরটা দেখা যাচ্ছে, আমরা ওখান থেকে প্রথম ঝরণাটাকে দেখেছিলাম (ছবি: নিশাচর)
ছোট বোয়ালিয়া থেকে ফেরার পালা – ঐ যে ফোকরটা দেখা যাচ্ছে, আমরা ওখান থেকে প্রথম ঝরণাটাকে দেখেছিলাম (ছবি: নিশাচর)

ঝরণাটা যেখানে দাঁড়িয়ে উপভোগ করতে হয়, এই জায়গাটার সাথে মাধবকুণ্ডের অনেক মিল আছে। একটা পাহাড়ের গুহামতো, কিন্তু গুহাও না, বরং একটা খাঁজ। পাহাড়টা এখানে তিনদিক থেকে অর্ধবৃত্তাকারভাবে ঘিরে রেখেছে, একটা স্টেডিয়াম যেন, যেনবা তিনদিক থেকে ওরা দেখছে বসে ঝরণাটাকে। পাথুরে পাহাড়ের গায়ে অনেক ছোট ছোট গাছপালা আর ফার্ন গজিয়েছে।

আবুবকর, আমাদের গাইডের থেকে আরো কিছু তথ্য নিয়ে নিচ্ছেন। পাহাড়ের উপরে কী আছে জেনে নিচ্ছেন। ঝরণার উপরটা দেখার লোভ সামলানো যাচ্ছে না, কিন্তু যন্ত্রপাতি সব রেখে আসায়, সেটা খুব ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যাবে। যাহোক, এবারের মতো ফেরা যাক। ক্যামেরাটাকে আগের মতোই আড়াল করে ফিরে এসে আবার ঐ পাহাড়টাতেই উঠলাম, যে পথ দিয়ে নেমেছিলাম।কামাল ভাইকে সঙ্গে করে এবারে আবার আগের জায়গায়, যেখান থেকে প্রথম দর্শন পেয়েছিলাম ঝরণার। তারপর…

বলা নেই কওয়া নেই, আবুবকর দেখি ডানদিকের পাহাড়টা ধরে উঠে যাচ্ছেন গাইডকে অনুসরণ করে – গোপনে গোপনে যে এই বুদ্ধি করে ফেলেছেন, জানতেই পারিনি আমি। ভালোই করেছেন, ফিরে যাবার বদলে দেখে যাওয়া যাক, কী আছে উপরে…

পাহাড়ের এই অংশটা খুব যে খাড়া তা বলা যাবে না, তবে খাড়া। তারচেয়েও বড় কথা, এদিকে স্থানীয়রাও মনে হয় খুব একটা উঠে না, তাই পা ফেলার ধাপগুলো এখনও সচল নয়। তার উপর বৃষ্টি, ঝরণার বাষ্প, গাছ থেকে ঝরা পাতা, পঁচা পাতার আস্তরণ – সবে মিলে বেশ ভালো পিচ্ছিল একটা খাড়া ট্রেইল বলা চলে – তার উপর আমাদের খালি পা (অবশ্য উইকিপিডিয়ান তানভির রহমানের মতে, খালি পা, জুতার থেকেও ভালো গ্রিপ করে)। আমি চেষ্টা করলাম ক্যামেরা অন করে রাখবো। আমার ঠিক পিছনেই কামাল ভাই। কিন্তু কিছুদূর উঠতেই ট্রেইলটা প্রচন্ড খাড়া হয়ে গেল, যেই না পা দিয়ে ভর দিয়ে নিজেকে উপরে তুলতে গেছি, ওমনি পা এমন বিশ্রীভাবে পিছলালো – কিছুটা থতমত খেয়ে গেলাম। আরেকটু হলে কামাল ভাইকে নিয়ে পিছনে ফুট দশেক নিচের পাথরে পড়তাম। ভাগ্য ভালো কামাল ভাই সামলে নিলেন। সাথে সাথে সাইমন রে হওয়ার ভূত মাথা থেকে তাড়িয়ে বাস্তববাদী হলাম – সাইমন রে’র মতো আমার পিছনে একজন রোপ সেফ্‌টি এক্সপার্ট নেই, আমি হার্নেস আর একগাদা ক্যারাবিনার দিয়ে কোনো রশির সাথে আটকানো নই – সুতরাং শাট ইট অফ

ক্যামেরা তাই বলে ব্যাগে পুরলাম না। হাতে নিয়েই উঠবার জন্য যখন এগোচ্ছি, কামাল ভাই এই খাড়া জায়গায় আমার এই অবস্থা দেখে কিনা জানি না, বললেন, এবারও তিনি যাচ্ছেন না উপরে। গাইডের দেখানো পথে আবুবকর এগিয়ে চললেন, থুক্কু উঠে চললেন। আমিও অনুসরণ করছি তাঁদের। কোথাও শিঁকড় ধরে, কোথাও মাটিতে হাত রেখে নিজের শরীর লিফ্‌ট করে করে উঠতে হচ্ছে। ছোট্ট, মাটির সাথে কথা বলতে থাকা গাছগুলোও যেভাবে সাপোর্ট দিচ্ছিলো, তা বলে বোঝাবার নয়। আবুবকরেরও কষ্ট হচ্ছে, কারণ পথটা বন্ধুর। নিজের ভরকে নিরাপদ না করে পেছনের পা সরালেই সোজা খাদে – যদি মরে নাও যাই, পঙ্গুত্ব নিশ্চিত।

একসময় আবিষ্কার করলাম একটু আগে নিচে থেকে দেখা ঝরণাটার ঠিক চূঁড়ার ডানদিকের পাশটাতে উঠে এসেছি আমি – আমার সামনে দিয়েই শাঁ শাঁ আওয়াজ তুলে নিচের দিকে পড়ছে জল – একটু ভয় মেশানো থ্রিল এলো নিজের মধ্যে – একটু পা হড়কালেই ভবলীলা সাঙ্গ – আর বৃষ্টি আর ঝরণার বাষ্পে যেরকম পিচ্ছিল হয়ে আছে জায়গাটা – পা না পিছলানোটাই বরং আশ্চর্যের বিষয়।

একটা পাহাড়ের ঝরে পড়া মাটির দেয়ালে হাত রেখে ঝরণার ঠিক পাশে এসে পড়ার পর তাকিয়ে দেখি ঝরণার ধারাটা সামনের যেদিকটা থেকে আসছে, সেদিকে পথ নেই, আছে আমাদের দিকে ধেয়ে আসা জল।

গাইড দাঁড়িয়ে, আবুবকর দাঁড়িয়ে – এই জলে পা দেয়া মানেই হলো নিশ্চিত স্রোতস্বিনী ঝিরির টানে সোজা নিচে গিয়ে বড় পাথরটাতে আত্মাহুতি দেয়া। পানি খুব বেশি না, কিন্তু বুঝতেই পারছেন, ঠিক পিছনেই ঝরণাটা নিচে পড়ছে – টেনে নিয়ে গেলে আযরাইলের সাথে দেখা। আমি আবুবকরকে বললাম, না, দরকার নেই, রিস্ক হয়ে যায়, এবার নামা যাক। তখন আমাদের গাইডকেই দেখা গেলো বেশ অগ্রণী – এতক্ষণ এই বেচারা আমাদেরকে ঝরণা অবধি নিয়ে এসেছে, কিন্তু বারবার আমাদেরকে সাবধান করছিল – দেইখেন, আমারে বিপদে ফালায়েন না। এখন আমাদের সক্ষমতার আন্দাজ পেয়ে বুঝে গেছে এরা কী জিনিস – তাই এখন সে নিজেই অত্যুৎসাহী। সে একটা ঝুলে থাকা গাছের গায়ে ধরে ঝিরির পাশে পা রেখে একটু এগিয়ে সোজা এগিয়ে আসা ধাবমান জলেই পা দিলো। এবং দেখা গেল, স্রোতস্বিনী জলও তাকে টেনে এনে ফেলছে না – তারমানে পা ফেলার জায়গাটা পিচ্ছিল নয়, পোক্ত জায়গাই পেয়েছেন আমাদের গাইড। আবুবকর সাহস দেখালেন – বললেন, চলেন।

তাঁদের অনুসরণ করে এগিয়ে গেলাম আমিও – ঝিরিতে পা দিলাম, স্রোতসত্ত্বেয় যখন পা গিয়ে নিচে ঠেকলো, তখন দেখা গেলো— ঠিক নিচে এরকমই একটা জায়গা ছিল, জল চলমান থাকায় পিচ্ছিল মনে হলেও পিচ্ছিল ছিল না – এখানটাও পিচ্ছিল না, বরং পাথুরে পরতে পা বেশ ভালোই বসলো গ্রিপ করে। সাহস পেলাম। ঠেলে আসা জলকে ঠেলে আমরা এবার উল্টোরথে হাঁটছি। পানি খুব বেশি না, তবে স্রোত আছে। সামনে বিশাল একটা পাথর, তার ফাঁক গলে গাইড এগিয়ে গেলেন – আমরাও তাঁকে অনুসরণ করলাম।

পাথর পার হতেই একটু গভীর জলে পড়ে গেলাম। ক্যামেরা বাঁচিয়ে চললাম। প্রায় উরু পানি এখানটায়। সাবধানে পা ফেলতে হচ্ছে দুটো কারণে – এক, পানির নিচে কি আছে জানি না, চোখা পাথরে পা কাটলে শুভকর হবে না, আর দুই, পা পিছলে পড়ে গেলে পাথরে হাত-মাথা পড়লে, তাও শুভকর হবে না। এখানে পানিটা বোধহয় চলমান থাকলেও সারফেস লেভেলের পানিটাই শুধু চলমান, মানে নিচের দিকের পানিটা চলছে না – আবদ্ধ, তাই নিচে প্রচুর শ্যাওলা। সামনে আবুবকর একটা পাথরের উপরে উঠে গেছেন, কিন্তু হোমোস্যাপিয়েন্সের মতো দুই পায়ে হাঁটার বদলে কেমন অ্যানথ্রোপয়েডের মতো হামাগুড়ি দিয়ে হাঁটছেন – পাথরের উপর সবুজ প্রলেপ দেখে বুঝতে বাকি রইলো না, ওখানেও শ্যাওলা। সাবধানে এই উরু পানি আর শ্যাওলা-পাথর পার হয়ে সামনের দিকে যখন তাকালাম… মনটা ভরে গেল…

মালিখোলা জলপ্রপাত - ধেয়ে আসছে ঢাল বেয়ে মালিখোলার স্রোত (ছবি: নিশাচর)
মালিখোলা জলপ্রপাত – ধেয়ে আসছে ঢাল বেয়ে মালিখোলার স্রোত (ছবি: নিশাচর)

সামনে বেশ খানিকটা পাথুরে ঢাল বেয়ে এক পাহাড়ি নদী আরো উপর থেকে বিস্তৃত এক ঝরণার রূপ নিয়ে ধেয়ে আসছে নিচে, কিংবা বলা যায় গড়িয়ে গড়িয়ে আসছে – একে কি ঢালু পাহাড়ি নদী বলা যায়, ঢালু ঝিরি বলা যায়, নাকি ঝরণাই বলা যায়? ঠিক বুঝলাম না। তবে ঝরণা যেরকম মন ভরে দেখা যায়, একেও তেমনি মন ভরে উপভোগ করা যায়। তাকিয়ে থাকলাম কিছুক্ষণ অবাক হয়ে… বিস্ময়ে মুখ থেকে বেরিয়ে এলো আল্লাহু আকবার!

মালিখোলা ঝরণা, মালিখোলা জলপ্রপাত (Malikhola Falls), চট্টগ্রামের মীরসরাইতে অবস্থিত একটি ঢাল ঝরণা, যা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মোটামুটি উচ্চতার ঝরণা (ছবিতে লগ হওয়া জিপিএস ভুল অল্টিচিউড দেখাচ্ছে, তাই উচ্চতাটা দিতে পারছি না)। ভৌগোলিক স্থানাঙ্ক: 22°47’27.89″N, 91°36’0.22″E। –panoramio-logo

মালিখোলায় বিশাল পাথরের সামনে আমরা ত্রয়ী (ছবি: স্বয়ংক্রীয়)
মালিখোলায় বিশাল পাথরের সামনে আমরা ত্রয়ী (ছবি: স্বয়ংক্রীয়)

জায়গাটা ঢালু, তবে পাথরের উপর প্রচুর শ্যাওলা ধরা, হাঁটতে হচ্ছে খুব সাবধানে। ঝরণাটার দিকে মুখ করে দাঁড়ালে আমাদের বামদিকে বিশাল এক পাথুর পাহাড় এক্কেবারে খাড়া উঠে গেছে, তার গায়ে গজানো অনেক গাছ, চারা ঝুলে আছে বাইরের দিকে। ঝরণার একেবারে চূড়ায় উৎলে উঠছে সাদা জল, তারপর ধেয়ে আসছে নিচের দিকে। উঁচু পাহাড়টার গা ঘেষে ঝরণার ধারাটা গিয়ে আমাদের ঠিক পিছনে বড় বড় অনেকগুলো পাথরের পিছনে ঢুকেছে, তারপর সেখান থেকে বেরিয়ে গিয়ে ছোট বোয়ালিয়ায় ‘ঝরণা’ হয়ে পড়ছে।

বড় বড় পাথরগুলোর দিকে তাকিয়ে আমি তো থ, এত্তো বিশাল বিশাল পাথর! অফ-ট্র্যাক বান্দরবানে এরকম বড় একটা পাথরের পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলেছিলাম আমি আর আবুবকর, ওটার মতোই কিংবা ওটার চেয়েও বড় এখানকার একটা। পাথরগুলোর আকার-আকৃতি দেখে মনে হলো, এগুলো ঐ খাড়া পাহাড়টার চূড়া থেকে ভেঙে গড়িয়ে পড়া উচ্ছিষ্ট।

উন্মুক্ত আকাশের নিচে উন্মুক্ত ঝরণা কিংবা নদীর পাশে দাঁড়িয়ে আমি আর আবুবকর পরস্পর মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলাম – যে খইয়াছড়ার বানে হাবুডুবু খাবার চ্যালেঞ্জ নিয়ে এসে ব্যর্থ হয়েছিলাম, ছোট বোয়ালিয়া আর মালিখোলা সেই চ্যালেঞ্জ পূর্ণ করে দিয়েছে – তৃপ্তির হাসি বিনিময় হয়ে গেলো দুজনায়। বেশ কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে ফিরতি পথ ধরলাম আমরা। যাবার আগে বড় পাথরটার কাছে তিনজনে একটা ছবি তুলে নিলাম – ক্যামেরাকে প্রস্তুত রেখে পিচ্ছিল পাথর বেয়ে ওদ্দুর ১০ সেকেন্ডে যাওয়াও চাট্টিখানি কথা নয়- দ্বিতীয়বারের চেষ্টায় সফল হলাম।

ফিরতি পথে আবার আমরা ঝরণার মাথায় এলাম, তারপর ডানদিকে যে পথে উঠেছি, সেপথেই নেমে যেতে হবে। পাহাড়ে সবসময়ই দেখেছি, উঠার চেয়ে নামাটা বেশি ঝক্কির – আর এখানে পিচ্ছিল পথে তা তো বটেই। অবশেষে নেমে এসে কামাল ভাইকে শোনালাম আমাদের আবিষ্কারের কথা। তারপর আবার ঝিরি ধরে লোকালয়ে ফিরে আসা। গাইড আক্কাসকে এই পথপ্রদর্শনের জন্য দেয়া হলো ৳১০০ [টাকা]। আর বাড়তি হিসেবে সবাই এককাপ করে চা খেলাম (সাকুল্যে ৳৫০) ব্র্যাক সেন্টারের পাশেই।

gpx_icon ছোট বোয়ালিয়া আর মালিখোলা জলপ্রপাতের ছন্নছাড়া জিপিএস লগ পাওয়া যাবে এই .gpx ফাইলে। খইয়াছড়ারও কিছু পিন আছে এতে।

পথপরিক্রমা:

ঢাকা-চট্টগ্রাম র‍্যুটের বাসযোগে নামতে হবে মিরসরাই বাজারে। তারপর বাজারের পূর্বদিকের ফটিকছড়ির পথ ধরে সিএনজিতে যেতে হবে ব্র্যাক সেন্টার পর্যন্ত। সেখান থেকে বামদিকে পদব্রজে ত্রিপুরা পাড়া। ওখানকার কাউকে গাইড হিসেবে নিয়ে যাওয়া যাবে ঝরণায়।

ট্রেনযোগেও যাওয়া যায় – চট্টগ্রামের যেকোনো ট্রেনেই ফেনী কিংবা সীতাকুণ্ড নেমে সিএনজিতে মীরসরাই আসা যায়। তবে দুটো স্টেশন থেকেই গন্তব্য বেশ খানিকটা দূর। কাছাকাছি স্টেশনের মধ্যে আছে পরিত্যক্ত ‘মাস্তান নগর স্টেশন’ এবং মফস্বলের এন্টিক স্টেশন ‘চিনকি আস্তানা স্টেশন’ – কোনো ট্রেনই এখানে নিয়মতান্ত্রিকভাবে থামে না।

ঘটনার শুরু যেখান থেকে, শেষটা যদি সেখান থেকে হয়, কেমন হয়? —কাহিনীটা আরো বেশি চমকপ্রদ হয়। দেখা যাক ভাগ্য কোথায় নিয়ে দাঁড়া করে… ফিরতি পথটা বেশ কষ্টকর হয়ে উঠলো। আমরা মিরসরাই থেকে নিজেদের বাক্সপেটরা সংগ্রহ করে, নাস্তা করে (৳৭০) সেখান থেকে ফেনী পর্যন্ত সরাসরি বাসের সন্ধান করতে থাকলাম। কিন্তু হরতাল ছাড়তেই সব বাস ভরপুর হয়ে আসতে লাগলো। অগত্যা আমরা বাদ মাগরিব একটা সিএনজিতে শেয়ারে বারৈরহাট পর্যন্ত চললাম (জনপ্রতি ৳২৫)। রাস্তায় প্রচন্ড ট্রাফিক, অটো’র ড্রাইভার বুদ্ধি করে ফাঁকফোকর দিয়ে না নিলে ওখানেই ফযর হয়ে যেত মনে হয়। সেখানে নেমে আবারও কোনো পথ না পেয়ে আমরা আরেকটা অটোয় উঠলাম, সেটা দিয়ে (জনপ্রতি ৳১০) আমরা পৌঁছলাম… কোথায় জানি না। আবুবকরই পথ দেখাচ্ছেন, তাই আমি শ্রেফ তাকে অনুসরণ করছি। এখানে নেমেই বাসের সন্ধান করতে গিয়ে শুনি এখুনি ট্রেন আছে এখানকার স্টেশন থেকে, দ্রুত করলে পাওয়া যেতে পারে। রিকশা ডেকেও পরে বাদ দেয়া হলো, এইতো কাছেই নাকি স্টেশন। দে ছুট, রাকস্যাক পিঠে নিয়ে তিনজনেই ছুট লাগালাম। স্টেশনে পৌঁছে গেলাম। আবুবকর খবর নিয়ে এলেন, ট্রেন এখনই নয়, একটু দেরি হবে।

স্টেশনেই অপেক্ষা করতে থাকলাম আমরা। তখন হঠাৎ রাতের আধারে আমি আবিষ্কার করলাম, আমরা ঘুরেফিরে সেই চিনকি আস্তানা স্টেশনেই এসে পড়েছি, যেখানে নেমে সকালে খইয়াছড়া গিয়েছিলাম আমরা। কিন্তু এখন ঘুরপথে আসার কারণেই হোক কিংবা রাতের আঁধারে আসার কারণেই হোক, অনে-ক দূর মনে হলো স্টেশনটাকে। আশ্চর্য হলাম, কিভাবে নিয়তি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে আগের জায়গায়ই নিয়ে এসেছে! তবে এখানে এসে একটা লাভ হলো, পরিচয় হলো এখানকার স্টেশন মাস্টারের সাথে।

ব্রিটিশ আমলের রেলওয়ে সিগন্যাল ল্যানটার্ন হাতে আবুবকর (ছবি: নিশাচর)
ব্রিটিশ আমলের রেলওয়ে সিগন্যাল ল্যানটার্ন হাতে আবুবকর (ছবি: নিশাচর)

সুন্দর ফর্সা, ধুপদুরুস্ত মানুষ – সাধারণত গরীব ঘরের লোকদের স্টেশন মাস্টার, বিশেষ করে মফস্বলের স্টেশন মাস্টার হতে দেখা যায়, ইনি সে হিসেবে বেশ সুবেশী, সুদর্শন আর ফিটফাটও। আমাদের উদ্দেশ্য আর মালিখোলায় তীব্র স্রোতের ঝরণা আবিষ্কারের ভিডিও দেখে রীতিমতো আমাদের প্রেমে কিংবা আমাদের মতো দামাল যৌবনের রোমন্থনে পড়ে গেলেন। আক্ষেপ করলেন এই চাকরির কারণে কোথাও বেড়াতে যাওয়া হয় না তাঁর কিংবা তাঁর পরিবারের।

তাঁর থেকে অনেক কিছু দেখলাম, কিভাবে সামনের বোর্ডটা থেকে তিনি এখানকার স্টেশনের চারটে লাইন নিয়ন্ত্রণ করেন, কিভাবে সামনের রাস্তার গেটঘরটা তিনি এখান থেকে নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত গেট বন্ধ কিংবা খুলতে পারে না, কিভাবে এক লাইন খালি না থাকলে দ্বিতীয় ট্রেনকে বিকল্প লাইনে ডাইভার্ট করে দেন। স্টেশনের রেললাইনগুলোকে সাধারণত স্টেশনের দিক থেকে গণনা করা হয় ১, ২, ৩, ৪ ইত্যাদি, তাও জানালেন। তবে তিনি আমাদের কামাল ভাইয়ের কাছে হেরে গেলেন, যখন কামাল ভাই প্রশ্ন করলেন ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত কয়টা স্টেশন আছে – তিনি নিশ্চিত হয়ে একটা সংখ্যা বললেন, যা কামাল ভাই জোর দিয়ে মিথ্যা প্রতিপন্ন করলেন, কারণ তিনি বেশিদিন হয়নি, ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম রেলপথে হেঁটে পাড়ি দিয়েছেন। সব স্টেশনের ছবিও তাঁর কাছে আছে।

এটি তুলনামূলক আধুনিক সংযোজন, এখান থেকে স্টেশনের রেল সিগন্যাল নিয়ন্ত্রণ করা হয় (বাম দিকের সবুজ টেলিফোনটা চালাতে হয় একটা হ্যান্ডল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চাবি দিয়ে) (ছবি: নিশাচর)
এটি তুলনামূলক আধুনিক সংযোজন, এখান থেকে স্টেশনের রেল সিগন্যাল নিয়ন্ত্রণ করা হয় (বাম দিকের সবুজ টেলিফোনটা চালাতে হয় একটা হ্যান্ডল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চাবি দিয়ে) (ছবি: নিশাচর)

আমাদেরকে পরামর্শ দিলেন, একটা লক্করঝক্কর মেইল ট্রেন আসবে, ওটাতে চড়ে ফেনী চলে যেতে। তারপর সেখান থেকে চট্টগ্রাম মেইলে উঠে ঢাকা যাওয়া যাবে। চট্টগ্রাম মেইল মফস্বলের এই ছোট্ট স্টেশনে ধরে না, তাই এই পরামর্শ। ট্রেন আসা অবধি আমরা স্টেশনেই থাকলাম। নাটক, সিনেমায় মফস্বলের স্টেশনের যে চিত্র, তার খাঁটি একটা প্রতিরূপ হলো এই চিনকি আস্তানা স্টেশন। ট্রেন আসার আগে আমরা রাতের খাওয়া সেরে নিলাম (সাকুল্যে ৳২০০)।

লক্করঝক্কর স্থানীয় ট্রেনটা যখন এলো, আমরা ভিতরে ঢুকলাম ধাক্কাধাক্কি করে, তারপর বসার জায়গা নেই। ভারি ব্যাগ কাঁধে দাঁড়িয়ে আছি তিনজনেই, বিশেষ করে আবুবকরের ঘাঢ়ে বিশাল বোঝা। ট্রেন (জনপ্রতি ৳১০) ছাড়তেই একটু পরেই অন্ধকার হয়ে গেল ভিতরটা, ঘুটঘুটে অন্ধকার। আশেপাশে কোনো লোকবসতিও নেই, আলো আসবার উৎসও নেই। ভিতরে কোনো আলো নেই – লক্করঝক্কর ট্রেন বলে বোঝাতে হবে না? বসার সুযোগ যা হলো আবুবকর আর কামাল ভাইকে বসতে দিলাম। দাঁড়িয়ে ট্রেন ভ্রমণ তো প্রতিদিনই করছি, এ আর এমন কী?

ফেনী স্টেশন আধুনিক স্থাপনায় সুন্দর করে বানানো। সেখানে নেমে আবুবকর স্ট্যান্ডিং টিকেট কেটে ফেললেন (সাকুল্যে ৳২৫০)। চট্টগ্রাম মেইল এলে আমরা যখন চড়ে বসলাম, গিয়ে উঠলাম কেবিন বগিতে। শেষ পর্যন্ত টয়লেটের সামনে এক মানবেতর রাত কাটিয়ে আমরা ভোরে এসে পৌঁছলাম ঢাকায়। ছুট দিলাম অফিসে।

কিন্তু ঝরণার পানি দিয়ে যে ক্লান্তিটুকু ধুয়ে এসেছি, তাতে এই ইট-পাথরের জঞ্জালে, চলে যাবে আরো বেশ কিছু দিন। তবে একটা কথা মনে হলে খুব কষ্ট পাই – এই ব্লগ পড়ে ছোট বোয়ালিয়া আর মালিখোলা যারা যাবেন, তারা কি সেখানে গিয়ে নষ্ট করে দিবেন প্রকৃতি, নষ্ট করবেন মানুষ, নিজেদের উচ্ছিষ্ট দিয়ে ধুয়ে দিয়ে আসবেন প্রকৃতির রং?

যাবার আগে অন্তত পড়ে যান কেন, কখন, কিভাবে পাহাড়ে-জঙ্গলে যাবেন, যাবেন প্রকৃতির কোলে; কী দেখতে যাবেন, কিভাবে দেখতে যাবেন, আর কিভাবে ফিরে আসবেন। সবইতো জানেন, জানি। জানা বিষয়টাই নতুন করে জানার চেষ্টা করলে কেমন হয়? …আমরা হাম হাম ঝরণার মতো আরেকটা ছোট বোয়ালিয়া আর মালিখোলা দেখতে চাই না।

বাংলাদেশের পর্যটকদের সম্বন্ধে এই আক্ষেপটা যাতে আমাদের আর না করতে হয়।

(সমাপ্ত)

-মঈনুল ইসলাম

One thought on “জলপ্রপাতের খোঁজে – ছোট বোয়ালিয়া আর মালিখোলা ৩

  1. আল্লাহ আপনার কল্যাণ করুন। আমি জীবনে কয়েকবার পাহাড়ে গেছি। তবে এমন করে দেখা হয়নি, এমন এডভ্যাঞ্চার হয়নি, আল্লাহ চাইলে আমাকে আপনাদের সঙ্গী করে নিতে পারেন, আল্লাহ ভাল জানেন হয়তো খারাপ সঙ্গী পাবেন না।

মন্তব্য করুন