মহাকাশে অতীত দেখার কলকাঠি

মহাকাশবিজ্ঞান বিষয়ে বিশদ জ্ঞান যাদের নেই, তাদের অবগতির জন্য অতীত দেখার ব্যাপারটা আমরা আজকে বুঝে নেবার চেষ্টা করবো: আমরা কোনো বস্তু দেখি, ঐ বস্তু থেকে আলো প্রতিফলিত হয়ে আমাদের চোখে এসে পড়লে। এজন্য আমার শার্টের ভিতরে আমার বুকটা আপনি দেখতে পাচ্ছেন না, কারণ আলো এসে যদি পড়েও, তবে প্রতিফলিত হয়ে আপনার চোখে পৌঁছানোর আগে আমার শার্ট সেই আলোকে আটকে দিচ্ছে। আপনার চোখে সেই আলো যেতে পারছে না, তাই আপনি ঐ জায়গাটা দেখতে পাচ্ছেন না। এবারে জানা দরকার, আলো, প্রতি সেকেন্ডে, আবার বলছি, সেকেন্ডে ১,৮৬,০০০ মাইল গতিতে যেতে পারে; তার মানে হলো, এইমাত্র যে আলো আপনি জ্বেলেছেন, তা এই চোখের পলকে এক লক্ষ ছিয়াশি হাজার মাইল দূরে চলে গেছে। আলোর যে কণাটা সবার আগে আছে, ধরা যাক, আপনি সেই কণার উপরে উঠে বসেছেন। আমি আলো জ্বালালাম। …বলুন তো, প্লুটোতে যেতে তবে আপনার কতক্ষণ লাগবে? …৫ ঘন্টা ২৫ মিনিট।

বুঝতে পারছেন আশা করি, পাঁ–চ…ঘ–ন্‌-টা…পঁ-চি-শ…মিনিট লাগবে আলোর গতিতে চললে, শ্রেফ প্লুটোতে যেতেই। অর্থাৎ, পৃথিবী থেকে রওয়ানা দিয়ে শ্রেফ আমাদের সৌর জগতের মোটামুটি শেষ মাথায় যেতেই লাগছে এই সময়। এবার যদি বলি, আমাদের গ্যালাক্সিতে আমাদের সূর্যের (নক্ষত্র) মতোই আছে লক্ষ-কোটি সূর্য। …একটু সময় নিয়ে হজম করুন …কথাটা একটু চোখ বন্ধ করে ভাবুন …কল্পনার বিস্তার করুন— লক্ষ-কোটি সূর্য নিয়ে একটা বিশা–ল এলাকা…। এভাবে লক্ষ-কোটি সূর্যের একত্র বসবাসস্থলকে বলা হয় একটা গ্যালাক্সি বা ছায়াপথ। …আশা করি, বুঝতে পারছেন আমাদের সৌরজগত (মানে সূর্য আর তার বংশধরদের জগৎ) যে গ্যালাক্সিতে আছে, সেখানে আমাদের মতো হুবহু না হলেও আছে আরো আরো সূর্য আর তাদের জগৎ, মানে আরো আরো সৌরজগত। তাহলে বলা যাচ্ছে লক্ষ-কোটি সৌরজগত মিলে একটা গ্যালাক্সি।

আপনি কোনো বিরতি না দিয়ে সময়ের সাথে সাথে প্লুটোকেও ছেড়ে, সামনে, আরো দূরে চলে গেলেন, চলে যাচ্ছেন…। তাহলে আমাদের আশেপাশের এলাকাতে আছে এরকম আরেকটা সূর্য পর্যন্ত যেতে বেশি সময় তো লাগার কথা না, যেহেতু এরকম ১০০ বিলিয়ন, মানে ১,০০,০০,০০,০০০টির মতো সূর্য (নক্ষত্র) আছে আমাদের গ্যালাক্সিতে। কিন্তু আমাদের সবচেয়ে কাছের নক্ষত্রটায় (আরেকটা সূর্য) (আলফা সেনচোরি : Alpha Centauri) আলোর গতিতেই আপনার যেতে সময় লেগে যাবে ৪.২ বছর (মোটামুটি, সোয়া চার বছর)! ভুলে যাবেন না আপনি আলোর গতিতে চলছেন কিন্তু!!

আমাদের গ্যালাক্সির নাম হলো মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি (বাংলায় আকাশগঙ্গা ছায়াপথ)। আমাদের সূর্য আর তার জগতটা (সৌরজগৎটা) রয়েছে এই গ্যালাক্সির একটা কোণায়। এবার আপনার লক্ষ্য হলো এই এত্তো বড় গ্যালাক্সির কেন্দ্রের দিকে যাওয়া, মাঝখানে যাওয়া, পৃথিবী থেকে আপনি আলোর গতিতে সবচেয়ে নিকটবর্তি সূর্যে (তারা, নক্ষত্র) পৌঁছেছেন, আর সামনে চলেছেন আলোর গতিতে, সেকেন্ডে ১,৮৬,০০০ মাইল বেগে এই গ্যালাক্সির কেন্দ্রে যেতে আপনার লেগে যাবে… শান্ত হয়ে শুনুন, আপনার লেগে যাবে ২৮,০০০ বছর। …একজন মানুষের স্বাভাবিক জীবনই ৬০-৭০ বছরের, ধরলাম ১০০ বছরই; আপনি তো মরে যাবেন যাবেনই, আপনার চৌদ্দ গুষ্টিও যাবেন, এমনকি আপনার ২৮০তম প্রজন্ম তখন পৃথিবীতে থাকবে। আচ্ছা, বাল্যবিবাহ ইত্যাদি বিবেচনায় ধরে নিলাম মোটামুটি ১০০ প্রজন্মই।

এবারে একটু উল্টো করে ভাবুন তো! যে জায়গাতে একটা আলোর কণা পৃথিবী থেকে যেতে লাগছে ২৮,০০০ বছর, খুব স্বাভাবিকভাবে ওখানে যদি কোনো সূর্য জ্বলে, তবে তা থেকে আরেকটা আলোর কণা পৃথিবীতে আসতে লাগবে এরকম ২৮,০০০ বছর। আর, কোনো আলোর কণা আমাদের চোখে প্রবেশ না করলে ঐ জিনিসটাকে আমরা দেখি না। তাহলে, আমাদের গ্যালাক্সির কেন্দ্রে এই মুহূর্তে যদি কোনো সূর্যের (তারা, নক্ষত্র) জন্ম হয়, তাহলে আমরা সেটার অস্তিত্ব সম্পর্কে জানতেই পারবো না, তেমনি জানতে পারবে না আমাদের সন্তান, নাতি-নাতনি কিংবা তাদের সন্তানও। বরং আমাদের ১০০ প্রজন্ম পরের মানুষেরা জানতে পারবে আমাদের গ্যালাক্সির কেন্দ্রে একটা তারা জন্মেছে।

আমাদের মিল্কি ওয়ে গ্যালাক্সি বা ছায়াপথ
আমাদের গ্যালাক্সির একটা কল্পিত চিত্র, কারণ এই বিশাল জিনিসটার ছবি তুলতে যত দূরে আমাদের যাবার দরকার, আমরা এখনও তত দূরে যেতে পারিনি। ছবিতে আমাদের সৌরজগতের অবস্থান দেখা যাচ্ছে। (সংগ্রহ: colonial.net)

সবচেয়ে মজার কথা, তারা কিন্তু এই ২৮,০০০ বছরে তারাটা কী হয়েছে, তা দেখতে পাবে না, তারা ঐ ২৮,০০০ বছর পরে দেখবে, এইতো এইমাত্র আমাদের গ্যালাক্সির কেন্দ্রে একটা তারার জন্ম হলো। যেনবা আমাদের প্রবাদের “গন্ডারের চামড়া”, মারের তিনদিন পরে টের পায়। তবে মানুষ তো আর গন্ডার না, মানুষ অনেক বুদ্ধিমান। তারা জানে যে, তারা যে নক্ষত্রটা দেখছে, তা আসলে আলোর গতিতে ২৮,০০০ বছর দূরের একটা নক্ষত্র, তাই আসলে যে তারা দেখতে পাচ্ছে, তা আজকের দিনের এই মুহূর্ত থেকে ২৮,০০০ বছরের অতীত (সোজা বাংলায় -২৮,০০০ বছর, একটা নেগেটিভ ফিগার)।

এ তো গেল আমাদের গ্যালাক্সি, এখনও আমরা যার কেন্দ্র পর্যন্ত গিয়েছি মাত্র। আমরা আলোর গতিতে আরো সামনে চলতে থাকলাম, আর এভাবে একসময় (?) আমরা আমাদের গ্যালাক্সি পার করে চলে গেলাম আরো সামনে। এবারে অনেকটুকু জায়গা ফাঁকা। তারপর আবার শুরু হলো আরেকটা বড় গ্যালাক্সি, এর নাম অ্যান্ড্রোমিডা গ্যালাক্সি (আমাদের সবচেয়ে কাছের বড় গ্যালাক্সি এটি)। ব্যাপারটা অনেকটা এক গ্রাম ছাড়িয়ে আরেক নতুন গ্রামে চলে যাবার মতো। …এবারে জানতে ইচ্ছে করছে না, কত বছর পার হয়ে গেল? …আপনি ২.৫৪ মিলিয়ন (২৫,৪০,০০০) বছর পার করে ফেলেছেন ইতোমধ্যেই, অথচ মাত্র, হ্যা শুধুমাত্র এই কাছের গ্যালাক্সিটায় গিয়ে পৌঁছেছেন। এরকম হাজারে হাজারে, লাখে লাখে, কোটি কোটি জানা গ্যালাক্সি রয়েছে এই মহাকাশে (আসলে অন্ধকার মহাকাশে জানা গ্যালাক্সির সংখ্যা হলো ৫০ বিলিয়ন)।

আলো প্রতি সেকেন্ডে যে পথ পাড়ি দেয়, তার হিসাব করে এগোচ্ছিলাম আমরা, কিন্তু তাতে দেখা যাচ্ছে, হিসাবটা ক্রমশ জটিল হয়ে যাচ্ছে, কী সব মিলিয়ন মিলিয়নের হিসাব এসে পড়ছে এখনই, অথচ আরোওতো সামনে দেখতে হবে। তাই এবারে ঠিক করা হলো, আলো এই তুমুল গতিতে এক বছর ধরে যতটুকু যেতে পারে, সেটুকু নিয়ে হিসাব করা যাক। তাই বিজ্ঞানীরা এই দূরত্বকে একটু সহজ করে বলার জন্য বললেন আলো এক বছরে যতটুকু যায়, তা হলো ১ আলোকবর্ষ। সুতরাং আমাদের নিকটবর্তি বড় গ্যালাক্সি অ্যান্ড্রোমিডার দূরত্ব হলো ২৫,৪০,০০০ আলোকবর্ষ।

গ্যালাক্সির মানচিত্র
Margaret Geller-এর তৈরি করা আমাদের নিকটবর্তি জানা গ্যালাক্সিগুলোর একটি মানচিত্র, যাকে তিনি আদর করে ডাকেন “stickman”। (সংগ্রহ^)

লক্ষ করেছেন কিনা জানিনা, আমরা বলেছিলাম ৫০ বিলিয়ন জানা গ্যালাক্সি আছে এই মহাকাশে। এর মানে হলো যাদের আলো আমাদের কাছে এসে পৌঁছেছে বলে আমরা তাদেরকে দেখতে পাচ্ছি; বলতে পারছি যে, তারা আছে, শুধুমাত্র তাদের কথাই বলতে পারছি আমরা, শুধু তাদের সংখ্যাই ৫০ বিলিয়ন। কিন্তু যারা আরো বেশি দূরে, যাদের আলো হয়তো আমাদের দুতিন প্রজন্ম পরের কোনো প্রজন্মের চোখে এসে ধরা দিবে, তারা হয়তো আবিষ্কার করবে আরো একটা গ্যালাক্সি, কিংবা অনেকগুলো গ্যালাক্সির সমন্বয়ে একটা ক্লাস্টার। তখন আমরা বলতে পারবো সংখ্যাটা ৫০ বিলিয়ন ছাড়াচ্ছে।

এখন পর্যন্ত (২০১২) আবিষ্কৃত সবচেয়ে দূরবর্তী তারাটি হলো V12 বা Variable 12; এটি NGC 4203 গ্যালাক্সিতে রয়েছে। এই তারা যত আলোকবর্ষ দূরে, সেখানে যা ঘটছে বলে আমরা দেখছি, তা আসলে ঠিক তত বছর (কিংবা তত ট্রিলিয়ন বছর) অতীতের দৃশ্য।

তাহলে কি “মহাকাশবিজ্ঞান”-এর বই আর “ইতিহাস”-এর বইয়ের মধ্যে কোনোই পার্থক্য নেই? দুটোইতো দেখি অতীতের কান্ডারী!!!

-মঈনুল ইসলাম

____________________________________________

১. জানা গ্যালাক্সির সংখ্যাটা কিছুটা আপেক্ষিক। কারণ মহাবিষ্ফোরণের (Big Bang) পর থেকে মহাকাশের সব বস্তু একটা আরেকটা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। এই accelerated expansion-এর ফলে প্রথমে আমরা দূরবর্তী গ্যালাক্সিগুলো দেখতে পেলেও ধীরে ধীরে দূরের গ্যালাক্সিগুলো আমাদের দৃশ্যপট থেকে দূরে সরে যাবে। আর ধীরে ধীরে একসময় আমাদের দৃশ্যমান গ্যালাক্সিগুলো শূণ্যে মিলিয়ে যেতে থাকবে, কারণ তারা প্রতিনিয়ত আরো একটু দূরে, আরো বেশ খানিকটা দূরে সরে যাচ্ছে – তাই তাদের থেকে বের হওয়া আলোও বেশি সময় নিচ্ছে আমাদের কাছে আসতে – দেখবো কী করে আমরা তাদের?

তথ্যসূত্র:

Discovery Channel Young Discoverer Series: Universe. Discovery Communications Inc. ISBN: 81-7991-180-2. Printed in Malaysia. (এই অপূর্ব বইটা আমাকে পড়তে দিয়েছে আমার বন্ধু মোহাম্মদ শামসুল আরেফিন, তার পূর্ণ কৃতজ্ঞতা স্মরণ করছি এবং তার ভালো’র জন্য ঈশ্বরের কাছে প্রার্থণা করছি)

One thought on “মহাকাশে অতীত দেখার কলকাঠি

মন্তব্য করুন