য়িন-য়িয়াঙ – এক গূঢ় প্রতীকের কথা

শুধু য়িন-য়িয়াঙ নয়, সামগ্রিকভাবে প্রতীক নিয়ে একটা বই প্রায় লিখে ফেলেছিলাম, কিন্তু তথ্যভাণ্ডারের এতো দুর্লভ অবস্থা, আর নিজের জ্ঞানের পরিধিও এতো কম যে, শেষ করতে পারিনি। তারই একটি অধ্যায় আমরা আজকে দেখার চেষ্টা করবো ইনশাল্লাহ। এই লেখাটি প্রথমত তৈরি করা হয়েছিল একটি শিক্ষার্থী সম্মেলনের জন্য অভিভাষণ হিসেবে, পরে অবশ্য তা আর দেয়া হয়ে উঠেনি। দেখা যাক, কেমন লাগে আপনাদের…

একটা প্রতীক যে কত রকম গূঢ় অর্থ প্রকাশ করতে পারে, তা-ই আমরা দেখার চেষ্টা করবো এখন, আর এজন্য আমরা একটা বিশেষ প্রতীককে নিয়েই আলোচনা করবো।

বিজ্ঞানী [স্যার] আইয্যাক নিউটনের গতির (motion) তৃতীয় সূত্রটি হচ্ছে-

To every Action there is always opposed an equal Reaction: or the mutual actions of two bodies upon each other are always equal, and directed to contrary parts.

সহজে বললে যা বোঝাচ্ছে- “প্রত্যেক ক্রিয়ার সমান এবং বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে” (Every action has a same and opposite reaction)। বিজ্ঞানীদের কথা আমরা সহজে আসলে বুঝতে পারি না, সেক্ষেত্রে আমরা আমাদের মতো করে ব্যাপারটা বুঝে নিতে পারি। আর এজন্য আমরা বাংলা ব্যাকরণের আশ্রয় নিবো। বাংলা ব্যাকরণে দুটো অধ্যায় আছে, যার একটি হলো ‘সমার্থক শব্দ’ আর আরেকটি ‘বিপরীতার্থক শব্দ’ নিয়ে। এবারে নিউটনের তরজমা করা সূত্রটির দিকে লক্ষ করলে দেখা যাবে, সেখানে দুটো শব্দ বাঁকা (italic) করে লেখা, যার একটি ‘সমান’ আর অপরটি ‘বিপরীত’। বাংলা ব্যাকরণের সাথে এ দুটো মিলালে সূত্রটি হয়ে যায় এরকম-

‘প্রত্যেক শব্দের সমার্থক এবং বিপরীতার্থক অর্থ রয়েছে।’

যেমন: ‘ভালো’ শব্দটির সমার্থক শব্দটিও [ধরা যাক] ‘ভালো’ কিন্তু বিপরীতার্থক শব্দটি হলো ‘খারাপ’। অর্থাৎ এরকম জীবনের প্রত্যেকটা বিষয়েই [নিউটনের ভাষ্যমতে] ‘সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া’ বা [আমাদের ভাষ্যমতে] ‘সমার্থক ও বিপরীতার্থক অর্থ’ রয়েছে।

অর্থাৎ একই সময়ে একটি সমান ক্রিয়া হচ্ছে, আরেকটি বিপরীত প্রতিক্রিয়া হচ্ছে। আমরা যদি রকেটের দিকে তাকাই, তাহলে দেখবো- রকেটের নিচের চুল্লি দিয়ে প্রবল বেগে আগুন বা তাপ নিচের দিকে নামছে, কিন্তু একই সময়ে রকেট উপরের দিকে উঠছে। এই নামছে আর উঠছে একই সময়ে ঘটছে।

এবারে খেয়াল করুন, এপর্যন্ত আলোচনায় প্রত্যেকটি ব্যাপারেই ‘দুটো’ বা ‘২টা’ বিষয়ের অস্তিত্বের কথা বলা হচ্ছে। যাকে দর্শনশাস্ত্রের (philosophy) ভাষায় বলা হয় ডুয়েলিয্‌ম (dualism) বা ‘দ্বৈতবাদ’। গ্রিক দার্শনিক প্ল্যাটো’র (Plato) দর্শনকথা (প্ল্যাটোনিক মতবাদ) অনুযায়ী এই দ্বৈতবাদ হলো ‘অস্তিত্ব’ (being) আর ‘অনস্তিত্বে’র (nonbeing) খেলা। লক্ষ করুন, যেখানে আলোর অস্তিত্ব আছে, সেখানে ‘আলোকময়’ আর যেখানে আলো নেই সেখানে ‘অন্ধকারময়’ উপমা দেওয়া হয়। তেমনি সৌন্দর্যের অস্তিত্বে ‘সুন্দর’ আর অনস্তিত্বে ‘অসুন্দর’ বলা হয়। সবই ক্রিয়া আর প্রতিক্রিয়ার খেলা।

দর্শনের এই ‘দ্বৈতবাদ’ আর বিজ্ঞানের ‘নিউটনের তৃতীয় সূত্র’ যেন একই সুতোয় গাঁথা। এই বিষয়টি দর্শনশাস্ত্রে আরো মজবুতরূপে রূপায়িত হয় খ্রিস্টপূর্ব ৪র্থ অব্দে চীনা দার্শনিকদের ‘য়িন এবং য়িয়াঙ’-এ (Yin and Yang)। ‘য়িন-য়িয়াঙ’ মূলত যথাক্রমে ‘অন্ধকার আর আলো’র ব্যাখ্যা দেয়। পাহাড়ের একপাশে যখন আলো পড়ে, তখন অপর পাশ হয় ছায়াময় বা অন্ধকার -এই থেকেই উদ্ভব হয় ‘য়িন-য়িয়াঙ’-এর। বাংলা ভাষার চরণগুলো লক্ষ করা যাক-

আলো বলে অন্ধকারে,
তুমি বড় কালো।
অন্ধকার বলে, ভাই-
তাই তুমি আলো।

অর্থাৎ, আলো আছে বলেই আমরা অন্ধকারকে চিনতে পারি; অন্ধকার না থাকলেও আমরা আলোকে চিনতাম না।

চীনা ঐতিহ্যবাহী 'তাইজিতু' প্রতীক
চীনা ঐতিহ্যবাহী ‘তাইজিতু’ প্রতীক

চীনা দার্শনিকরা যখন তাঁদের এই ‘য়িন-য়িয়াঙ’ দর্শনকে চিত্রে প্রকাশ করার কথা চিন্তা করলেন তখন তাঁরা বেছে নিলেন চীনা ঐতিহ্যবাহী ‘তাইজিতু’ (Taijitu) প্রতীককে। এই প্রতীকে লক্ষ করলে দেখা যাবে যে, এর একপাশ অন্ধকার বা কালো (য়িন), অন্য পাশ আলোকিত বা সাদা (য়িয়াঙ)। কালো অংশে একটি সাদা বিন্দু দ্বারা বোঝানো হয়েছে ‘সাদা ছাড়া কালো অর্থহীন’ আবার সাদা অংশেও কালো বিন্দুটি বোঝাচ্ছে ‘কালো ছাড়া সাদা অর্থহীন’। এবারে বাংলা চরণগুলোর দিকে লক্ষ করলে হুবহু মিল খুঁজে পাওয়া যাবে। বিশেষ লক্ষণীয় যে, ‘য়িন-য়িয়াঙ’য়ের এই ‘জোড়া’ হলো ‘উল্টা পক্ষের জোড়া’, অর্থাৎ সমান আর বিপরীত শব্দ দুটোর আলোচনা একটি আরেকটিকে ছাড়া অর্থহীন, একটি আরেকটির সাথে সম্পর্কযুক্ত বা জড়িত; যেমনটা ‘সমান’ আর ‘বিপরীত’ ‘একই সময়ে’ হচ্ছে। সুতরাং য়িন-য়িয়াঙ, নিউটনের তৃতীয় সূত্রের সাথে মিলে যাচ্ছে, কেননা ‘য়িন-য়িয়াঙে’ য়িয়াঙ ছাড়া য়িন অর্থহীন, আবার য়িন ছাড়া য়িয়াঙ অর্থহীন।

যাদের গণিত সম্পর্কে ধারণা আছে, তারা জানেন ‘বাইনারি সংখ্যা পদ্ধতি’ নামে একটি সংখ্যা পদ্ধতি রয়েছে, যার অংক সংখ্যা মাত্র দুটি, একটি ১[এক] অপরটি ০[শূণ্য]। আবার গণিতের সেটতত্ত্বে দর্শনের ডুয়েলিয্‌ম, ‘সেট ডুয়েলিটি’ (set duality) নাম ধারণ করেছে, যাতে সংযোগ সেটকে (union set) ছেদ সেট (intersection) দ্বারা, আর সর্বজনীন সেটকে (Universal set) ফাই (phi) বা ফাঁকা সেট (empty set) দ্বারা পরিবর্তন করা যায়।

পৌত্তলিক (pagan) ধর্মগুলোর ধর্মীয় সাদৃশ্যে দেখা যায় যে, তাদের ধর্মীয় বিধান ২টি প্রধান অর্ধাংশে (/) বিভক্ত- নারী আর পুরুষ; এই ২-এর সম্মিলনই তাদের ধর্মীয় নীতিকে পূর্ণতা দেয় (/ + / = ১ বা সম্পূর্ণ বা পূর্ণতা)। তাই তাদের ধর্মীয় নীতিতে এই দুয়ের সম্মিলন অপরিহার্য; পৌত্তলিক ধর্মগুলোর মৌলিক নীতি-মতে এই দুই অর্ধাংশে সর্বদা সমতা বজায় থাকতে হয়। এই দুই অর্ধাংশ সমতাপ্রাপ্ত হলে সবকিছুর মধ্যেই একটা ঐকতান থাকে, অর্থাৎ সবকিছু স্বাভাবিক থাকে; যদি এই দুই অর্ধাংশ তাদের সমতা হারায়, তবে প্রকৃতিতে নানা সমস্যা-সংঘর্ষ সৃষ্টি হয়। চীনা দর্শনের ‘য়িন-য়িয়াঙ’ও এই একই মতাদর্শ প্রকাশ করছে, যেখানে বলা হচ্ছে, য়িন এবং য়িয়াঙয়ের মধ্যে সমতাসূচক সামঞ্জস্য না থাকলে প্রকৃতিতে, সমাজে নানা দুযোর্গ, ঘনঘটা সৃষ্টি হয়।

আবার এও তাইজিতু প্রতীকে তাকালে দেখা যাবে যে, তা য়িন (অন্ধকার) এবং য়িয়াঙ (আলো)- এই দুটি অর্ধাংশে বিভক্ত আর এই দুইয়ের সমতাসূচক সমন্বয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ বৃত্ত আঁকা হয়েছে। গ্রিক গণিতবিদ পীথাগোরাসের (Pythagoras) মতে, ‘বৃত্ত হলো ত্রুটিহীন জ্যামিতিক প্রতীক।’ জ্যামিতির স্বতঃসিদ্ধ সূত্রমতে, একটি পরিপূর্ণ বৃত্ত সর্বদা ৩৬০° [ডিগ্রী] কোণবিশিষ্ট হবে। সুতরাং তাইজিতু প্রতীকের পূর্ণাঙ্গ বৃত্তটি য়িন-য়িয়াঙয়ের চিরন্তন বাস্তবতা আর ত্রুটিহীনতা সম্পর্কে প্রতীকি ইঙ্গিত বহন করছে। এছাড়া য়িন এবং য়িয়াঙের উপাদানগুলোর সমতা কোনো নির্দিষ্ট মাত্রায় স্থির নয়, বরং নিয়ত পরিবর্তনশীল। আর তা বোঝাতে য়িন-য়িয়াঙের সংযোগ-রেখাটি বাঁকা, সরলরেখা নয়।

পৌত্তলিক ধর্মগুলোর প্রতিজন দেবতার নামের সাথেই একজন করে দেবীর উল্লেখ পাওয়া যায়; দেবতা আর দেবীর সম্মিলন একটি সমতাসূচক সামঞ্জস্য। হিন্দু ধর্মও পৌত্তলিক ধর্মগুলোর একটি; তাদের দেবতাদের সাথেও একেকজন নারীর নাম উঠে আসে। যখন উভয়ের নামকে একত্রে লেখা হয়, তখন নারীর [বা, দেবীর] নামকে আগে স্থান দেওয়া হয়, যেমন: সীতা-রাম; রাঁধা-কৃষ্ণ।

য়িন (অন্ধকার) য়িয়াঙ (আলো)
পৃথিবীর (মর্ত বা ইহলোক) স্বর্গ (পরলোক)
রাত্রি দিন
শীতলতা উষ্ণতা [বা, তাপ]
চাঁদ (আলো প্রতিফলনকারী, আঁধার তল) সূর্য (আলো প্রদানকারী, আলোকিত তল)
অক্রীয়ত্ব সক্রীয়ত্ব
নারীত্ব পুরুষত্ব

সারণী: য়িন-য়িয়াঙ শক্তিসমূহ

লক্ষ করলে দেখা যাবে, য়িন-য়িয়াঙে প্রথমে ‘য়িন’য়ের অবস্থান, তাই নারীর নামকে নরের নামের আগে লেখার প্রবণতা লক্ষণীয়। (যদিও এর ব্যতিক্রম কোনো মহাভারত অশুদ্ধ নয়)

ভারতের বারানসের সম্পূর্ণআনন্দ সংস্কৃত বিশ্ববিদ্যালয়ে "অর্ধ্বনারীশ্বর" মূর্তি।
ভারতের বারানসের সম্পূর্ণআনন্দ সংস্কৃত বিশ্ববিদ্যালয়ে “অর্ধ্বনারীশ্বর” মূর্তি।

প্রকৃতিগতভাবেই নর আর নারী একে অপরের বিপরীত কিন্তু একে অপরকে ছাড়া অর্থহীন। এরই পরিস্ফুটনে নারী (দেবী) ও পুরুষ (দেবতা) একই দেহে উঠে এসেছে হিন্দু ধর্মের ‘অর্ধ্বনারীশ্বর’ (অর্ধ্ব+নারী+ঈশ্বর) নামক মূর্তিতে। এই অর্ধ্বনারীশ্বর হলো একই দেহে মিলিত শিব ও দুর্গার যুগল মূর্তিবিশেষ; যেখানে ডানদিকে শিব আর বামদিকে দুর্গার মূর্তি একত্রিভূতভাবে উপস্থাপিত। বলা প্রয়োজন, ঐতিহাসিকভাবে নর আর নারীকে দুটি আলাদা দিক দিয়ে প্রতীকায়ন করা হয়- বামদিক নির্দেশ করে নারী বা নারীত্বকে আর ডানদিক নির্দেশ করে পুরুষ বা পুরুষত্বকে। উপরোল্লেখিত সারণীটি থেকেও দেখা যায় যে, ডানদিকে পুরুষের আর বামদিকে নারীর অবস্থান। হিন্দু ধর্মের ‘অর্ধ্বনারীশ্বর’ নামক মূর্তিতে তারই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে, আর তাতে ‘য়িন’ ও ‘য়িয়াঙ’-কে একত্রে রূপায়িত করে আবারো যেন ‘য়িন-য়িয়াঙ’য়েরই জয়ডঙ্কা বাজানো হলো ॥

যারা জন্মগত অন্ধ, তাদের কথা বাদ দিলাম; যারা জন্মের পরে কোনো না কোনো দুর্ঘটনার কারণে অন্ধত্ব বরণ করে নিয়েছেন, তাদেরকে জিজ্ঞেস করলে জানা যাবে, তাদের অন্ধ হয়ে যাবার পর থেকে তারা শরীরের অন্য কোনো না কোনো অঙ্গের অস্বাভাবিক ক্ষমতা উপলব্ধি করতে পারছেন। কেউ হয়তো অন্ধ হয়ে যাবার পর থেকে স্পর্শশক্তির প্রখরতা টের পান, কেউ শ্রবণশক্তির প্রগাঢ়তা উপলব্ধি করেন। একটি অঙ্গ অকেজো হয়ে যাওয়ার ফলেই এটা হচ্ছে- তারা সমান ক্রিয়ায় অঙ্গ হারিয়েছেন, কিন্তু বিপরীত প্রতিক্রিয়ায় বিশেষ ক্ষমতা পেয়েছেন।

‘য়িন-য়িয়াঙ’য়ের বাস্তব প্রতিফলন হয় অনেক রকম। যেমন: য়িন-য়িয়াঙ বলছে, ‘নিরপেক্ষ’ বলে কোনো শব্দ নেই। পত্রিকা খুলে নিরপেক্ষ কোনো সংবাদের দিকে খেয়াল করলে দেখা যাবে, সেখানে এক লাইনে পক্ষের কথা, আরেক লাইনে বিপক্ষের কথা লিখে বলা হয় সংবাদটি নিরপেক্ষ। কিন্তু আদতে তা পক্ষ আর বিপক্ষ- এই দুই ‘য়িন-য়িয়াঙ’য়েই আটকে থাকলো।

এবারে, যদি প্রশ্ন করা হয় “আল্লাহ [একজন] আছেন”- এই কথার বিপরীত প্রতিক্রিয়া কী হবে? তবে আমাদের উত্তরটা হবে হয় “আল্লাহ নেই” নতুবা “জানি না”। যাই হোক, “আল্লাহ আছেন” -এই কথাটি কী বোঝায়? বিজ্ঞানে কোনো বিষয়ে ‘আছে’ (exists) বলাটার মানে হলো তার দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতা, কিংবা তরঙ্গদৈর্ঘ্য আছে। কিন্তু আল্লাহ আছেন, বললেও তার এধরণের কোনো অস্তিত্বই পাওয়া যায় না। তাহলে “আল্লাহ আছেন” কথাটিকে বিজ্ঞান বলবে “আল্লাহ নেই”; কিন্তু প্রকৃত অবস্থাটি হলো, “আল্লাহ আছেন” কিন্তু তিনি “নিরাকার/নিস্তরঙ্গ”। এবারে “আল্লাহ আছেন” ব্যাখ্যাটিকে যদি ১[এক] আর “নিরাকার/নিস্তরঙ্গতা”কে যদি ০[শূণ্য] ধরি, তবে আমাদের ‘য়িন-য়িয়াঙ’ মিলে যায়; কেননা বাইনারী সংখ্যা পদ্ধতির কথা চিন্তা করলে মনে পড়বে যে, ১[এক]-এর বিপরীতে দুই ২[দুই] হয় না, হয় ০[শূণ্য]। অর্থাৎ, “আল্লাহ আছেন; কিন্তু নিরাকার/নিস্তরঙ্গ, তাই তাঁকে উপলব্ধি করা যায়।” এই ব্যাখ্যায় ইসলামের কালিমা ত্বৈয়্যিবার- “লা- ইলা-হা ইল্লাল্লাহ” (অর্থ: নেই কোনো উপাস্য, আল্লাহ ব্যতীত) অংশটি শুধু আল্লাহর বা ঈশ্বরের একত্ববাদের ঘোষণাই দিচ্ছে না, বরং আমাদেরকে ‘য়িন-য়িয়াঙ’ সম্পর্কে প্রতীকিভাবে সচেতন করছে। কারণ আরবিতে “লা-” [বা ‘নেই’] বলে শুরু করেও পরবর্তিতে “ইল্লা” [বা ‘কিন্তু’] বলা হচ্ছে, অর্থাৎ কেউ নেই, কিন্তু [একজন] ‘আছেন’- নিঃসন্দেহে ‘য়িন-য়িয়াঙ’।

মুসলমানদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ আল-ক্বোরআন-এ বারবার ‘জোড়া’ শব্দটা ব্যবহার করা হয়েছে যেন দ্বৈতবাদের প্রকারান্তরে ‘য়িন-য়িয়াঙ’কে বোঝানোর জন্যই। যেমন:

আমি প্রত্যেক বস্তু জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করেছি, যাতে তোমরা [অন্তর থেকে] উপলব্ধি করো। {আয্‌-যারিয়াত (৫১):৪৯}

“সে (মানুষ) কি স্খলিত বীর্য ছিলো না? {৩৭} অতঃপর সে ছিলো রক্তপিণ্ড, অতঃপর আল্লাহ্‌ তাকে সৃষ্টি করেছেন এবং সুবিন্যস্ত করেছেন। {৩৮} অতঃপর তা থেকে সৃষ্টি করেছেন যুগল- নর ও নারী। {৩৯}” {আল্‌-ক্বেয়ামাহ্‌ (৭৫):৩৭, ৩৮, ৩৯}

“আমি (আল্লাহ) তোমাদেরকে জোড়া জোড়া সৃষ্টি করেছি,” {আন্‌-নাবা (৭৮):৮}

এছাড়াও পবিত্র ক্বোরআনের সূরা ‘ফাতির (৩৫):১১’, ‘ইয়াসীন (৩৬):৩৬’, ‘আশ্‌-শূরা (৪২):১১’, ‘আয্‌-যুখরুফ (৪৩):১২’সহ আরো বহু স্থানে ‘জোড়া’, ‘যুগল’ প্রভৃতি শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। শুধু মানুষই নয়, বৃক্ষরাজি এমনকি ফলমূলেও যে ‘জোড়া’ বা ‘যুগল’ আছে, তারও উল্লেখ রয়েছে যথাক্রমে সূরা ‘ত্ব-হা (২০):৫৩’ এবং ‘রদ (১৩):৩’-এর পংক্তি দুটোতে। ক্বোরআনের বিজ্ঞ ব্যাখ্যাকারীগণ (তাফসিরকারক) লিখেছেন যে, ‘এক জোড়া’ শব্দটা আরবি ‘যাওজ’ [বহুবচনে ‘আযওয়াজ’] শব্দের অনুবাদ। এই শব্দের মূল অর্থ: “যেখানে একজন আরেকজনের সংগী, মিলিতভাবে তৈরি করে জোড়া।” এই ‘যাওজ’ শব্দটি সাধারণত ব্যবহৃত হয়ে থাকে বিবাহিত দম্পতির কিংবা এক জোড়া জুতার বেলায়। এক জোড়া জুতা সমজাতীয় হলেও সেখানে ‘ডান’ ও ‘বাম’ নামক দুটো বিপরীত পায়ের জুতা থাকে। ‘বিবাহিত দম্পতি’ বিশেষ অর্থে নারী আর পুরুষের সম্মিলন বোঝায়; অথচ সাধারণ অর্থে সকল কিছুর দ্বিত্ব বোঝায়। এছাড়া ভুলে গেলে চলবে না, যুগল কিংবা জোড়া (couple, pair) তখনই বলা হয়, যখন সেখানে ২[দুই] বর্তমান থাকে; ১[এক]-এও জোড়া হয় না, ৩[তিন]-এও হয় না; আবারও সেই দ্বৈতবাদ।

বিজ্ঞান অতি সম্প্রতি বুঝতে পেরেছে যে, যুক্তি আর ব্যাখ্যার বেড়াজালে গড়া বিজ্ঞানের (matter) বিপরীত বাহুতেই রয়েছে ঋণাত্মক জগত (antimatter)। যেখানে ‘ইলেকট্রন’-এর বিপরীতে ‘এন্টি ইলেকট্রন’ [বা ‘পযিট্রন’ (positron)]; ‘প্রোটন’-এর বিপরীতে ‘এন্টি প্রোটন’ বিদ্যমান। সেখানেও যে যুক্তি অর্থহীন, তা নয়; বরং সেখানে যুক্তির উল্টো পিঠ নিয়ে আলোচনা হয়, আর অবশ্যই যুক্তিতে যুক্তিতে সামঞ্জস্য আবশ্যিক; যা আবারো ‘য়িন-য়িয়াঙ’য়ের কথাই বলছে।

একটি মানব শিশুর জীবনপ্রবাহে বয়স যতই বাড়ছে, ততই তার জীবনকাল [বিপরীত প্রতিক্রিয়ায়] কমে আসছে, কারণ ততই সে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সুতরাং, নিঃসন্দেহে প্রত্যেক ক্রিয়ার মধ্যে একই সময়ে দুটো ঘটনা বর্তমান- সমান ক্রিয়া আর বিপরীত প্রতিক্রিয়া। তাহলে যদি ‘কালো’ থাকে, তবে তার বিপরীত প্রতিক্রিয়া ‘সাদা’ও আছে। ‘রাত’ থাকলে তার বিপরীতে ‘দিন’ও আছে। ‘আলো’ থাকলে ‘অন্ধকার’ থাকবে, ‘জন্ম’ থাকলে ‘মৃত্যু’ থাকবে; তেমনি আরো বহু বহু কিছু। “♫ জন্মিলে মরিতে হবে ♫”- কুমার বিশ্বজিৎ-এর গাওয়া গানের এই চরণটিও কি ‘য়িন-য়িয়াঙ’য়ের কথাই বলছে না?

‘য়িন-য়িয়াঙ’য়ের এই বিশেষ বিশেষত্বকে গুরুত্ব সহকারে নেয়া হয়েছে অনেক ক্ষেত্রে। যেমন: তাইজিতু প্রতীকটি বর্তমানে ‘শাওলিন মার্শাল আর্টে’র লগো হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। চীনা ‘তাই চি চুয়ান’ (T’ai chi chuan) মার্শাল আর্ট মূলত ‘য়িন-য়িয়াঙ’য়ের ভিত্তিতেই চালু হয়েছিল। এছাড়াও কোরীয় ভাষার বর্ণমালার অক্ষরগুলো নকশা করা হয়েছিল মূলত আলো-আঁধারির বা ‘য়িন-য়িয়াঙ’য়ের প্রতিফলনে। দক্ষিণ কোরিয়ার পতাকায়ও এই ‘য়িন-য়িয়াঙ’কে [একটু পাল্টে নিয়ে] স্থান দেয়া হয়েছে; যেখানে য়িন-য়িয়াঙ আরও মজবুত হয়েছে [ত্রিধাবিভক্ত] চারটি কালো দাগের (trigram : ত্রিলেখ) উপস্থিতিতে।

সাহিত্য, দর্শন, গণিত, ধর্ম আর নিউটনের এতো প্রমাণ [বা, প্রামাণিক মিল] যেন আমাদেরকে বারবার ‘য়িন-য়িয়াঙ’ বিষয়ে সচেতন করে তুলছে। আমরা ‘য়িন-য়িয়াঙ’য়ের প্রতিফলনে প্রাথমিকভাবে আমাদের দৃষ্টিকোণকে (view-point) গঠন করতে পারি। আমাদের বাক্যে, কর্মে, চিন্তায়, দৃষ্টিকোণে ‘য়িন-য়িয়াঙ’য়ের প্রতিফলন ঘটিয়ে আমরা জীবনকে স্বাচ্ছন্দ্যময় করে তুলতে পারি। যেমন: আমরা যেখানে সরকারি দলের পক্ষে সাফাই গাই, সেখানে বিরোধী দলেরও সাফাই থাকতে পারে এটা যেন আমরা মেনে নিই। আমরা যখন ‘শিক্ষা’ ‘শিক্ষা’ বলে চিৎকার করি, তখন যেন ‘অশিক্ষা’র স্বরূপ নিয়েও ভাবি। আমরা যখন মুক্তিযুদ্ধের বেলায় ‘রাজাকার’দের ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলে ধিক্কার দিই, তখন যেন তাদের ‘রাজাকার’ বা ‘স্বেচ্ছাসেবক’ শব্দটি নিয়েও মাথা ঘামাই। সন্তানরা বাবা-মাকে দুঃখ দেওয়ার আগে যেন চিন্তা করি নিজে বাবা-মা হলে তার কেমন লাগতো। বাবা-মাও সন্তানকে আদেশ দানের সময় নিজেকে সেখানে বসিয়ে ভাববো আদেশটা আমার জন্য কি যথার্থ হতো? ‘খারাপ দেখার চোখ’ তৈরি করার পাশাপাশি ‘ভালোটা দেখার চোখ’ও যেন তৈরি করি। ‘বিদেশ’ ‘বিদেশ’ বলে লাফাতে গিয়ে ‘দেশ’ নামক শব্দটাও যেন চোখে ধরি। সর্বোপরি ‘য়িন-য়িয়াঙ’কে মান্য করি। আসুন, আমরা ‘দ্বৈতবাদ’ ‘নিউটনের তৃতীয় সূত্র’ ‘য়িন-য়িয়াঙ’কে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে প্রতিফলন ঘটাই, তৈরি করি নতুন জীবন। আর এজন্য বিদেশি ভাষার কঠিন শব্দগুলোর চিন্তা না করলেও চলবে, বাংলাতেই আওড়াই: “আলো বলে অন্ধকারে, তুমি বড় কালো। অন্ধকার বলে, ভাই, তাই তুমি আলো।”

পাঠক, . . . ‘য়িন-য়িয়াঙ’ বিষয়ে দীর্ঘক্ষণ আলোচনা হয়ে গেলো, তারপরও [হয়তো] আমি আপনাদেরকে ‘য়িন-য়িয়াঙ’ সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন করে তুলতে পারিনি। কেননা, আপনারা [হয়তো] আমার বক্তব্য গোগ্রাসে শুধু গিলেই চলেছেন; চিন্তা করছেন না। চিন্তা করলে আমার এই প্রবন্ধের বক্তব্যের মধ্যে [সহজ একটা] খটকা খুঁজে পেতেন (আর ‘য়িন-য়িয়াঙ’-মতে খটকা তো থাকবেই)। খেয়াল করেছেন কিনা জানিনা, আমি আমার প্রবন্ধের মাঝে একস্থানে উল্লেখ করেছি যে, ‘নিরপেক্ষ বলে কোনো শব্দ নেই।’ কিন্তু নিশ্চয়ই খেয়াল করে থাকবেন, ১[এক] (+১) ডিগ্রি তাপমাত্রা আর মাইনাস ১[এক] (-১) ডিগ্রি তাপমাত্রার মাঝখানে একটা তাপমাত্রা আছে, যাকে বলা হয় ০[শূণ্য] ডিগ্রি বা প্লাস-মাইনাস শূণ্য (±০) ডিগ্রি তাপমাত্রা। তাহলে ‘পক্ষ’ আর ‘বিপক্ষ’ মিলিয়ে যে সংবাদটি উপস্থাপন করা হচ্ছে, তাকে আপনারা কী বলবেন? [শূণ্য ডিগ্রির মতো] কিছু একটা তো বলতে হবে, সেই কিছু একটাই হলো- ‘নিরপেক্ষ’ (পক্ষহীন) বা ‘শূণ্যপক্ষ’।

তাহলে ‘শূণ্য পক্ষের’ বিপরীত প্রতিক্রিয়া কী? [আমি আর বলবো না] . . . এবারে আপনারাই খুঁজুন।

প্রবন্ধের শেষাংশে, ছোট্ট একটা ‘য়িন-য়িয়াঙ’। উত্তরটা আপনাদের থেকেই আশা করবো।

“ঈশ্বর সব পারেন।”

কিন্তু ‘য়িন-য়িয়াঙ’ মতে তিনি কিছু একটা পারেন না।

ঈশ্বর তাহলে কী পারেন না?

 

yin-yang-mirrored-text-nishachor
(উত্তরটা এখানেই: লেখা বুঝতে আয়নার সহায়তা নিন)

 

 -মঈনুল ইসলাম

 

পাদটীকা:

ক. অসিরিয়রা (Assyrian) সর্বপ্রথম বৃত্তকে ৩৬০° [ডিগ্রি]-তে বিভক্ত করে।

 


তথ্যসূত্র:

১. “Philosophiae Naturalis Principia Mathematica” by Sir Isaac Newton

২. Microsoft Encarta Encyclopedia 2004 – article: Yin-Yang

৩. প্রবন্ধ সংকলন, বিজ্ঞান চর্চায় ইসলামী দৃষ্টিকোণ (ISBN 984-06-0668-9); জুন ২০০১ সংস্করণ; ইসলামিক ফাউণ্ডেশন, বাংলাদেশ (গবেষণা বিভাগ), ঢাকা। {xerox কপি}

৪. মুনীর হাসান, ‘দুনিয়াকে জানল যাঁরা’ : পিথাগোরাস; ‘বিজ্ঞান প্রজন্ম’ (তারিখ পাওয়া যায়নি); দৈনিক প্রথম আলো।

৫. প্রত্নতত্ত্ব: উদ্ভব ও বিকাশ – পরিপ্রেক্ষিত বাংলাদেশ (ISBN 984-07-3821-6); জুন ১৯৯৮ সংস্করণ; বাংলা একাডেমী, ঢাকা।

৬. Dan Brown, The Da Vinci Code (ISBN 0-385-51322-4); 2003 edition; Doubleday, a division of Random House, Inc.; <http://www.doubleday.com>.

৭. ধর্মগ্রন্থ তাফসীর মা’আরেফুল ক্বোরআন; ব্যাখ্যাকারক: হযরত মাওলানা মুফতী মুহম্মদ শফী (রহ.); বঙ্গানুবাদ পবিত্র কোরআনুল করীম : বাংলা অনুবাদ ও সংক্ষিপ্ত তফসীর; বাংলা সংক্ষেপিত অনুবাদক: মাওলানা মুহিউদ্দিন খান। (খাদেমুল-হারামাইন বাদশাহ ফাহদ কোরআন মুদ্রণ প্রকল্প)

৮. Dr. Maurice Bucaille, The Bible, The Qur’an and Science; বঙ্গানুবাদ: বাইবেল কোরআন ও বিজ্ঞান (আখতার-উল আলম); ফেব্রুয়ারি ১৯৮৮ সংস্করণ; মেসার্স রংপুর পাবলিকেশন্স লিমিটেড, ঢাকা, বাংলাদেশ।

৯. এস. এম. জাকির হুসাইন, অন্ধকারের বস্ত্রহরণ, রোহেল পাবলিকেশন্স।

 

ছবির তথ্যসূত্র:

০. প্রচ্ছদের ছবি: tarianga.net থেকে নিয়ে পরিবর্তন করে নেয়া

১. তাইজিতু প্রতীক: Windings ফন্ট দ্বারা চিত্রীত

২. অর্ধ্বনারীশ্বর: ভারতের বারানসের সম্পূর্ণআনন্দ সংস্কৃত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনে “অর্ধ্বনারীশ্বর” মূর্তিটি। আলোকচিত্র: Bluerasberry। ছবির লিংক^

One thought on “য়িন-য়িয়াঙ – এক গূঢ় প্রতীকের কথা

মন্তব্য করুন