ট্যুর টু শরিয়তপুর: পর্ব ৪

~ মাদারিপুর, থোবাল ফেরি, অন্ধকার রাত, রক্তপাত ~

ফেরি মিস।

ফেরি মিস করার দুঃসহ যন্ত্রণা আর ভালো লাগে না। অপেক্ষার প্রহর, আর যাই হোক, সুখের না। তার উপর আমরা ক্লান্ত। শিবচরে বসে কলা-রুটি দিয়ে হালকা নাস্তা সারলাম। টিউবওয়েলের ঠান্ডা পানি দিয়ে যখন উদরপূর্তি করলাম, তখন আবার যেন জানে পানি ফিরে পেলাম। এবং তার সাথে সাথে একটা সুসংবাদও পেলাম দোকানি ছেলেটার থেকে। সে পরামর্শ দিলো: আপনারা কেওড়াকান্দি চলে যান, ওইখানে আধাঘন্টা পর পর ফেরি পাইবেন। মোটর সাইকেলে আধা ঘন্টা লাগবো।

ব্যাপারটা মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে আমরা উঠে পড়লাম। আবারো মোটর সাইকেল ট্যুর। একটু পিছিয়ে এসে আরেকটা রাস্তা ধরতে হলো আমাদের, লোকজন দেখিয়ে দিলো। ভাগ্য ভালো, বাংলাদেশের মানুষ মিথ্যা কথা বলে মানুষকে বিভ্রান্ত করে না।

আমরা যে রাস্তাটা ধরেছি, আন্দাজ করলাম, রাস্তাটা নদীর পাশ ধরেই চলেছে, যদিও আমাদের ডানদিকে নদীটা থাকাসত্ত্বেয় আমরা সেটাকে দেখতে পাচ্ছি না। রাস্তা ধরে যেতে যেতে গ্রামের সৌন্দর্য্য উপভোগ করছি। মাঝে মাঝে বাজার, দোকানঘর দেখলে সাইনবোর্ড পড়ার চেষ্টা করছি। এমন সময় হঠাৎ করে আবিষ্কার করলাম আমরা মাদারিপুর চলে এসেছি।

এটা সত্যিই আমাদের সবার জন্য বিষ্ময় ছিল, কারণ নিজের দেশে চলতে চলতে হঠাৎ করে সচেতনভাবে জেনে-শুনে এক জেলা থেকে আরেক জেলায় ঢুকে যাবার ঘটনা আমার জন্য অন্তত প্রথম, বাকিদেরও হয়তো তাই। আশ্চর্য হয়ে আবিষ্কার করলাম কেওড়াকান্দি মাদারিপুরে, শিবচর থানায় পড়েছে।

এদিকে প্রতি মুহূর্তে আমাদেরকে তেলের হিসাব করতে হচ্ছে। কারণ এই পথটুকু অতিরিক্ত চালাতে হচ্ছে আমাদেরকে। নাকিব জানালো, তার তেল প্রায় শেষ পর্যায়ে, রিযার্ভে আছে ১ লিটার। তাই তেলের দোকান দেখে আমরা মোটর সাইকেল থামালাম সবাই। কিন্তু তেলের দাম শুনে তো আক্কেল গুড়ুম। শরিয়তপুরের ঐ তেলের দোকানের চেয়েও বেশি। নাকিব এই দামে তেল নিতে রাজি নয়। তাই সামনের প্রয়োজনে রিযার্ভ থেকে চলার ঝুঁকি নিল সে। ঠিক করলো, মাওয়া গিয়ে তেল নিয়ে নেবে।

আবার চলা শুরু করলাম। একটা পাকা রাস্তা ধরে মোটর সাইকেল চলছে। বাম দিকে গাছ-গাছালি আর ঘর-বাড়ি, ডানদিকটা তুলনামূলক ফাঁকা। বামে বড় বড় স্কুল-কলেজ, স্কুল-কলেজের আবার ড্রেসকোড আছে, তারমানে এলাকাটা মোটামুটি মফস্বল ঘরানার। সুন্দর ছায়া সুনিবিড় পথ। এমন সময় নাকিব ঘোষণা করলো, তার রিযার্ভ থেকে চলছে মোটর সাইকেল।

ডানদিকে পড়লো একটা খাল: বিশাল খাল। সেখানে জেলে-নৌকা নিয়ে জেলেরা মাছ ধরছেন। দৃশ্যটা আমার খুব পছন্দ হয়েছে। কেননা পুরো খালটার যদি প্যানোরামিক একটা ছবি নেয়া যেত, তাহলে সেটা দেখতে ঠিক ছোটবেলার পাঠ্যবইয়ের আঁকা দৃশ্যগুলোর অনুরূপ একটা ছবি হতো। কিন্তু সেটা চলন্ত মোটর সাইকেল থেকে নেয়া সম্ভব না।

আমরা এই পথ ধরে গিয়ে উঠলাম একটা নতুন কার্পেটিং করা হাইওয়েতে। নাকিব তো দারুণ খুশি। সে এই খুশিতে ভুলেই গেলো তাকে তেল নিতে হবে। কিন্তু আমি আর শাকিল ভাই পাশের একটা পেট্রল পাম্প দেখে থেমে গেলাম। ওদেরকে হর্ণ বাজিয়েও আর ফেরানো গেলো না। আমরা তেল নিয়ে সামনে এগোলাম। বেশি দূর যেতে হলো না, রাস্তার দুই পাশে আর্মি প্রটোকলের মতো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম বিশাল বিশাল ৫ থেকে ১০ টনের ট্রাক আর ট্রাক। বিশাল হাইওয়ের দুদিকে ট্রাকের সারি রেখে মাঝখানের সরু পথ ধরে আমরা সামনে এগিয়ে গিয়ে দেখতে পেলাম ফেরি এইমাত্র এসে ঘাটে ভিড়েছে। স্বস্তি পেলাম।

জায়গাটার নাম কেওড়াকান্দি (চর জানাজাত)। আমরা চিন্তা করলাম, এখন আসরের নামায পড়তে গেলে ফেরি মিস হবে। তারচেয়ে ওযু করে ফেরিতে উঠে পড়ি, সেখানেই পড়ে নিবো নামায। নদীর পানিতে ওযু করলাম আমরা। শাকিল ভাই গিয়ে টিকেট করে নিয়ে এলেন ফেরির। কত নিয়েছিল, ভুলে গেছি। তারপর মোটর সাইকেলগুলো ফেরির একদিকে তুলে অপেক্ষা করতে থাকলাম।

অবশেষে ফেরি ভর্তি হলে চালু হলো সেটা। ফেরির নাম: D.F. থোবাল D8489। ফেরি চালু হলে আমরা মোটর সাইকেলগুলোর কাছাকাছিই থাকলাম, যাতে কেউ তেল চুরি করে না নিতে পারে, আর ঝাঁকুনির ঠ্যালায় যেন সেগুলো পড়ে না যায়। এসময় পুরো ট্যুরে নিজেদের মধ্যকার হিসাব-নিকাশ মিটিয়ে নিলাম আমরা।

আসরের নামায পড়তে গিয়ে আবিষ্কার করলাম, ফেরিটা স্বয়ংসম্পূর্ণ না। ফেরির বডিতে কোনো ইঞ্জিন নেই। তাই বিশাল মোটা শিকল দিয়ে ফেরিকে বেঁধে নেয়া হয়েছে অন্য আরেকটা ইঞ্জিন বোটের সাথে আড়াআড়ি করে। সেই শক্তিশালী ইঞ্জিন-বোটটা ফেরিটাকে টেনে নিয়ে চলেছে। নামায পড়ার জন্য ইঞ্জিন বোটেই একটা আলাদা করে রাখা স্থান পেয়ে গেলাম, আসরের নামায পড়ে নিলাম।

রবিন রয়ে গেছে মোটর সাইকেলের কাছে। তাই আমরা নিশ্চিন্ত হয়ে ঠিক করলাম, বেশি সময় নেই, বরং মাগরিবটা পড়েই যাই। তাই খাড়া সিঁড়ি বেয়ে গিয়ে উঠলাম ইঞ্জিন বোটের দোতলা সমান উঁচুতে, ফেরিচালকদের কামরার পাশের বেলকনিতে। জানালা দিয়ে দেখতে পেলাম ফেরিচালকেরা, সারেঙ-ই বলা হয় বোধহয় এঁদেরকে, দুজন, খুব মনোযোগের সাথে সামনে তাকিয়ে পথ পর্যবেক্ষণ করছেন। এখনও দিনের আলো আছে। তবুও ডুবোচর দেখার কোনো উপায় নেই। নদীর পানি টলটলে পরিষ্কার না। তাই পূর্ব-অভিজ্ঞতা আর কিছু নির্দেশক পতাকা দেখে চালাতে হয় তাদের।

পথে অপূর্ব সব দৃশ্য দেখলাম আমরা তিনজন: ফেরির বিপুল ওজন বহনক্ষম ইঞ্জিনের ভাল্বগুলোর কী ছান্দসিক অবিশ্রান্ত উঠানামা; নদীর জলরাশিকে কেটে যাওয়া সাদা ফেনিল শুভ্র ট্রেইল; ড্রেজিং করে ভরাট করা ঐ যে অনতিদূরের বালুচরে সাদা, ধবধবে সাদা বালুর সাদা ঝড়, পড়ন্ত বিকেলের অস্তমিত সূর্য… শাকিল ভাই তাঁর মোবাইলে অনবরত ছবি তুলতে থাকলেন একের পর এক।

তারপর মাগরিবের সময় হয়ে এলে দেখি ফেরির কর্মীবাহিনী জামাতে নামায পড়ার আয়োজন করছেন। আমরাও গিয়ে শামিল হলাম দলে। নামায শেষ করে ফিরে এলাম মোটর সাইকেলের কাছে। রবিন তখনও বসে আছে। খোলা নদীর মাঝখানে অন্ধকার ধীরে ধীরে ঘনীভূত হয়। অন্ধকার যখন আমাদের মনকে ছুঁতে পারলো, তখনই শাকিল ভাই ঘোষণা করলেন এক চরম বিভীষিকার কথা।

ঢাকা-মাওয়া র‌্যূটে মোটর সাইকেল ডাকাতদের বেশ উৎপাত। খবরটা আমি, জীবনে এই প্রথম শুনলাম। রাতের বেলা তারা নাকি বিভিন্ন কৌশলে মোটর সাইকেল ছিনিয়ে নেয়। সম্ভাব্য একটি পদ্ধতি: দলবদ্ধভাবে মোটর সাইকেলের পথ রুদ্ধ করে মোটর সাইকেল ছিনিয়ে নেয়া। আরেকটি পদ্ধতি হলো: অন্ধকার রাস্তার দু’পাশে দুজন বসে থাকবে রাস্তার মধ্যে একখানা রশি ফেলে রেখে। মোটর সাইকেলকে যখনই কাছে আসতে দেখবে, তখনই তারা হঠাৎ রশিটা উপরে তুলে ধরবে। এতে রশিটা আঘাত করবে মোটর সাইকেল আরোহী/আরোহীদের বুকে। গতির কারণে তারা পিছন দিয়ে পড়ে যাবে, তখন অনায়াসে মোটর সাইকেল নিয়ে তারা চম্পট দিবে।

আমি বেশ ভয় পেলাম মনে মনে। কারণ, ডাকাত-ফাকাত মোকাবিলা করা কঠিন নয়, সেই সাহস আছে আলহ্বামদুলিল্লাহ; অবশ্য যদি মোকাবিলা করার মতো ডাকাত হয়। কিন্তু সমস্যা হলো, এরা যেভাবে আক্রমণ করছে, তার কোনোটাতেই কিছু বুঝে ওঠার আগেই আক্রমণের শিকার হতে হবে। কোনো প্রস্তুতিই খাটবে না।

তাই অগত্যা, আমাদেরকে প্ল্যান করতেই হলো। ঠিক করলাম:

  1. মাওয়া নেমে আমরা এক সেকেন্ডও বিরতি দেবো না। তাতে মাওয়াতে থাকা কোনো ইনফর্মার আমাদের খবর সাগরেদদেরকে দিতে পারবে না।
  2. মাওয়া থেকে আমরা দুই মোটর সাইকেল পাশাপাশি, একসাথে থাকবো, যাতে দুটো মোটর সাইকেলের চারজন আরোহীকে আক্রমণ করার আগে তারা যেন ভয় পায়।
  3. আমরা যত দ্রুত সম্ভব এই এলাকা থেকে পালাবো।

মাওয়াতে যখন ফেরি থামলো, তখন বাজে সন্ধ্যা সাতটা। ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে গেছে ইতোমধ্যে। ফেরি, পাড়ের কাছাকাছি আসতেই রবিন আর আমি পাশ গলে লাফিয়ে নেমে গেলাম বাইরে। যেন এক ফোঁটাও সময় নষ্ট না হয়। কিন্তু বাঁধলো ভজকট। ফেরি থেকে নামার প্যাসেজ-ওয়ে’র একটা রশি আটকে গেলো ভিতরে কোথায় যেন। একজন লোক উপরে উঠে সেটা খুলতে লাগলো। ভিতরের সব গাড়ি আটকা পড়লো। এমনকি সামান্যতম ফাঁকও নেই যে, ঐ ফাঁক গলে মোটর সাইকেল নামতে পারবে। শাকিল ভাই ওদিকে উত্তেজিত হয়ে আছেন, ইতোমধ্যেই স্টার্ট দিয়ে দিয়েছেন মোটর সাইকেল, একটু পর পর এক্সেল করে করে বুম বুম করছেন, তাঁর অনেক তাড়া।

প্যাসেজ-ওয়ে খুলতে খুলতে বেজে গেলো সোয়া ৭টা। প্যাসেজ-ওয়ে খুললে প্রথমেই নামলো আমাদের দুই মোটর সাইকেল। বাইরে বেরোতেই আমরা দুইজন মিসাইলের মতো গিয়ে যার যার মোটর সাইকেল চালকের পিছনে উঠে বসলাম। দুটো মোটর সাইকেলই ঢাল বেয়ে উপরে রাস্তায় উঠে এলো। …কিন্তু বিধি বাম। নাকিবের তেল নিতে হবে। প্ল্যান-প্রোগ্রামের প্রথমটাই খাঁদে।

নাকিব এদিক-ওদিক খুঁজতে খুঁজতে এবড়ো খেবড়ো মোটর সাইকেল চালাচ্ছে। শাকিল ভাই এদিকে বেশ উত্তেজিত। নাকিবের দায়িত্বহীনতায় তিনি খুবই রাগত। কেন নাকিব মাদারিপুরের হাইওয়ে থেকে তেল নিলো না? কেন সে এখন এই বিপদের সময় এসব করছে? …কিন্তু এখন আর সেসব ভেবে হবে না কিছু।

অবশেষে নাকিব একটা পেট্রল পাম্পে ঢুকে তেল নিলো। তারপর অন্ধকারের মধ্যে চলা শুরু হলো আমাদের, ঢাকা অভিমুখে। সেদিনের মতোই সামনে থাকতে হলো আমাদেরকে, নাকিব আর রবিনকে থাকতে হলো পিছনে। অন্ধকারের মধ্যে শাকিল ভাই একা যদি কিছু মিস করেন, তাই তাঁকে সহায়তা করার জন্য আমিও চোখ খাড়া করলাম। কোথাও যদি বিন্দুমাত্র সন্দেহ উদ্রেককারী কিছু দেখি, তাহলে তাঁকে সজাগ করে দেবো।

শাকিল ভাই যতটা আরামপ্রদভাবে চালান, হাত ছেড়ে দিয়ে বসে থাকলেই হয়। কিন্তু আজকে অন্য ব্যাপার। আজকে আরামপ্রদের চিন্তা করলে হবে না। যতদ্রুত সম্ভব এই এলাকা থেকে বেরিয়ে যেতে হবে। তাই আমি ডান হাত দিয়ে পিছনটা ধরে বসলাম। একটু পর পর পিছনে তাকিয়ে নিশ্চিত হলাম, নাকিবরা ঠিক আমাদের পিছন-পিছন আছে কিনা। সেই খবর আবার গলা উচিয়ে শাকিল ভাইকে জানালাম। দুতিনবার জানানোর পরে তিনি ব্যাপারটাতে বেশ নিশ্চিন্তবোধ করলেন। এই দায়িত্ব মনে মনে আমার উপর ছেড়ে দিয়ে রাস্তায় মনোযোগ বাড়ালেন।

অনেকদূর যাবার পর হঠাৎ একটা এলিয়েন মোটর সাইকেল আমাদের পাশ কাটালো। বলাই বাহুল্য আমি এটাকে নাকিবদের মোটর সাইকেল ভেবে ভুল করেছিলাম। মোটর সাইকেলটা আমাদের সামনে সামনে চলতে লাগলো। ওটাতে দুজন আরোহী, দুজনই যুবক। আমি সন্দেহের চোখে তাকিয়ে থাকলাম।

কিছুক্ষণের মধ্যেই সেটা আমাদের দুই মোটর সাইকেলের মাঝখানে চলে এলো। তারপর সেটা নাকিবদেরও পিছনে চলে গেলো। কিছুক্ষণ পরে আবার মাঝখানে, আবার আমাদের সামনে, তারপর আবার মাঝখানে, তারপর নাকিবদের পিছনে… আর কোনো সন্দেহই থাকলো না, এরা আমাদেরকে পর্যবেক্ষণ করছে। কিন্তু সত্যি কথা বলতে কি কিচ্ছুই করার নেই। অনেকক্ষণ ধরে যখন মোটর সাইকেলটাকে আর দেখলাম না, তখন বেশ আশ্বস্থ হলাম। ওটা চলে গেছে।

এখন সামনে নতুন মিশন। সামনে পুলিশ চেকপোস্ট আছে। শাকিল ভাই এই র‌্যুটে আগেও মোটর সাইকেল চালিয়েছেন, তিনি জানেন চেকপোস্টটা কোথায়। তাই নাকিবকে বলে দিয়েছেন, ওই জায়গায় গেলে তিনি ডানদিক ধরে চালিয়ে বেরিয়ে যাবেন, সেও যেন তেমনটা করে। আমরা যখন চেকপোস্ট পার হচ্ছি, তখন দেখি পুলিশ অন্য আরেকটা গাড়ি নিয়ে ব্যস্ত। তাই নিশ্চিন্তেই পার হয়ে এলাম; কিন্তু নাকিবরা পড়ে গেলো অনেক পিছনে একটা সিএনজি অটোরিকশার আড়ালে।

শাকিল ভাই আবারো দোষারোপ করলেন নাকিবকে যে, এবার যদি নাকিব ধরা খায়, তাঁর কোনো দায়-দায়িত্ব নেই। তিনি পথ বাতলে দেয়াসত্ত্বেয় সে কেন খামখেয়ালি করছে? …যাহোক, প্রতিক্ষার অবসান ঘটিয়ে একসময় নাকিব পেরিয়ে এলো চেকপোস্ট, কোনো বাঁধা ছাড়াই।

তখনই আমাদের পাশে পড়লো একটা মাইলপোস্ট: ঢাকা ৫ কি: মি:। শাকিল ভাই বেজায় খুশি হয়ে গেলেন, আমরা তো চলে আসছি! আমাদের গাড়ির গতি এতক্ষণ স্থির ছিল ৭০ কিলোমিটারে। এবার বোধহয় কিছুটা স্বস্থি এসে ভর করেছে আমাদেরকে।

কিন্তু, সেই স্বস্থি আর বেশিক্ষণ ভরে থাকলো না আমাদের মাঝে…হঠাৎ…….

হঠাৎই, আমি দেখলাম যেন… কোত্থেকে একজন মানুষ… যেনবা উড়ে এসেছে কোথাও থেকে… এসে মাথাটা পেতে দিলো আমাদের চাকার তলায়…..তা..র..প..র……………………..

অন্ধকার……..

ঘন কালো অন্ধকার……..

কিচ্ছু মনে নেই আর…

আমি রাস্তায় গড়াচ্ছি…..

শেষ আরেকটা গড়ান দিতেই মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো “ইন্নালিল্লা-হি ওয়া ইন্না ইলাইহি রা-জিউন”। আমি রাস্তায় গড়ান থামিয়ে ফট্ করে উঠে দাঁড়ালাম। বুঝে নিলাম, এক্সিডেন্ট হয়েছে।

কিন্তু বেঁচে যে আছি, সেটা মনে হচ্ছে না; মনে হচ্ছে না মরে গেছি। একটা ঘোরের মধ্যে আছি। কিন্তু সেই ঘোরের মধ্যেই মনে পড়লো শাকিল ভাইয়ের কথা। পেছন ফিরে তাকালাম। শাকিল ভাই রাস্তায় শুয়ে আছেন। তাঁর মাথায় হেলমেট নেই। মুখ দিয়ে গলগল করে রক্ত পড়ছে। প্রথমেই যে কাজটার কথা মাথায় এলো: শাকিল ভাইকে রাস্তার পাশে সরিয়ে নিতে হবে। কিন্তু একজন মানুষকে আলগোছে তুলে সরানোর মতো ফিটনেস আমার নেই। তাই একটা হাত ধরে টানলাম রাস্তার পাশের দিকে।

এমন সময় দূরে নাকিবদের মোটর সাইকেল এসে থামলো। নাকিব আর রবিন চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে দৌঁড়ে আসতে থাকলো। দূর থেকে নাকিব হাত নেড়ে আমাকে টানতে নিষেধ করছিল। একটা টান দেয়ার পর আমারও আর টানতে ইচ্ছে হচ্ছে না, কারণ তাঁকে আলগোছে আনতে পারছি না, ছ্যাঁচড়ে আসছেন। নাকিবরা আসছে দেখে আমি হাতটা ছেড়ে দিয়ে শাকিল ভাইয়ের শরীরের দুপাশে দুই পা ছড়িয়ে দিয়ে দূরের ঐ সিএনজিটাকে হাত ইশারায় সরে যেতে বলছি, আর বলছি, এক্সিডেন্ট, ভাই সরে যান, সরে যান

সিএনজিটা কাছে আসতেই নাকিব বুদ্ধি করে সেটাকে থামালো: ভাই এক্সিডেন্ট হয়েছে, থামান, থামান। সিএনজি থামলো।

এরপরের ঘটনাগুলো সংক্ষেপে বলি: রবিন উঠে বসলে তার কোলে শাকিল ভাইয়ের মাথাটা রাখা হলো। কিন্তু পা বেরিয়ে থাকলো বাইরে। সিএনজি ছেড়ে দিলো। আমি সাথে সাথে দৌঁড় দিলাম, পা বেরিয়ে আছে বলে চিৎকার করতে থাকলাম। কিন্তু ড্রাইভার তাতে কর্ণপাতও করলো না। বরং সিএনজি থামিয়ে আমাকে উঠে পড়তে বললো। আমি কোনোকিছু চিন্তা না করেই উঠে পড়লাম। শাকিল ভাইয়ের পা যথাসম্ভব ভিতরে রাখার চেষ্টা করলাম।

আধা কিলোমিটারের মধ্যেই পেয়ে গেলাম হসপিটাল। “হাসনাবাদ হাসপাতাল”। ওদিকে যে নাকিবকে একা রেখে চলে এসেছি, সেটা মাথায়ই খেলছে না। সিএনজি থেকে নামিয়ে শাকিল ভাইকে দুজনে দুপাশ থেকে কাঁধে ধরে নিয়ে হাসপাতালের ভিতরে গেলাম। তাঁকে ইমার্জেন্সিতে ভর্তি করতেই রবিনকে ফোন করিয়ে নিয়ে গেলো নাকিব। আমি পেছনে তাকিয়ে রবিনকে আর দেখলাম না। তখন হঠাৎ আমার ডান হাতে ব্যাথা অনুভব করতে থাকলে ডাক্তারকে বলে পাশের খালি বেডে শুয়ে বিশ্রাম নিতে চাইলাম। ডাক্তার নিশ্চিত করলেন শাকিল ভাই আশংকামুক্ত।

…কিন্তু ঘটনা গেলো উল্টে।

ডাক্তার আমার গায়ের ছড়ে যাওয়া অংশগুলোর রক্ত পরিষ্কার করতে গিয়ে আবিষ্কার করলেন, আমার ডান হাতের কনুইয়ের বলটা ভেঙে গেছে, রগ ছিঁড়ে গেছে। দ্রুত প্রাথমিক অপারেশন সারলেন তিনি। রগটা আপাতত বাইপাস করে দিলেন। ওদিকে শাকিল ভাইয়ের চলছে সেলাই করা।

আমরা দুজন পড়ে থাকলাম হাসপাতালের বিছানায়। সব ঝড়-ঝাপটা গিয়ে পড়লো নাকিব আর রবিনের উপর। মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো যখন ওরা শুনলো দুজনই আহত, তার উপর সুস্থ দেখা আমি উল্টো মারাত্মকভাবে আহত।

আমার হাতে অপারেশন করা হলো। আমি ট্রমা সেন্টারে, আর শাকিল ভাই হলি ফ্যামিলিতে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তাঁর শরীর আর মুখে ৭৮টা সেলাই পড়লো। মুখের তিনটা দাঁত ভেঙে পড়েছে।

ভ্রমণ কাহিনীতে দুর্ঘটনার কাহিনী বাড়িয়ে আর বিরক্ত করবো না। শুধু এতটুকু জেনে রাখুন: আমরা দুজনেই আল্লাহ’র অশেষ দয়ায় সুস্থ হয়ে উঠছি। নাকিব আর রবিন মানসিক শক্ কাটিয়ে উঠেছে। যদিও আমাদের চারজনের কাছেই সেই রাতের কথা আজও দুঃস্বপ্নের মতো স্মৃতির বায়োস্কোপে ভাসে।

কিন্তু অনেকগুলো প্রশ্ন উত্তরবিহীনই থেকে গেলো। কোত্থেকে ঐ লোক এসে মোটর সাইকেলের নিচে পড়লো? মোটর সাইকেলগুলো কি পাওয়া গেলো শেষে? নাকি এটা ছিনতাইকারীর কোনো কৌশল? (রহস্য ৩)

সবগুলো রহস্যের উত্তর পাওয়া যাবে আগামী পর্বে। শুধু একটা রহস্যের উত্তর দিয়ে দিই: এই পুরো ট্যুরের এতো সুন্দর সুন্দর ছবি শাকিল ভাইয়ের মোবাইল ফোনে তোলা হলেও এক্সিডেন্টের পর সেই মোবাইল ফোনটা আর পাওয়া যায়নি। আমাদের ট্যুরের সব ছবিসহ হারিয়ে গেছে সেটি।

(চলবে…)

-মঈনুল ইসলাম

পরের পর্ব »

মন্তব্য করুন