ট্যুর টু শরিয়তপুর: পর্ব ১

~ দাড়িতে হাওয়া লাগানো অভিযাত্রা ~

বন্ধু  নাকিবের ফুফাতো ভাই রবিন একটা মোটরসাইকেল কিনেছে ভাইয়ের টাকায়, সেটা তার বাবা-মাকে দেখাতে নিয়ে যাবে শরিয়তপুরের কার্ত্তিকপুরে, তাই নাকিবকে ধরেছে তাকে নিয়ে যেতে হবে। নাকিব কি আর আনন্দ করার সুযোগ ছাড়ে? সাথে সাথে খবর দিলো মামাতো ভাই শাকিল ভাইকে আর আমাকে। ফ্রি ছিলাম, তাই চল মামু ঘুইরা আসি…

  • রবিনের মোটরসাইকেল: Hero Honda CBZ X-Treme 150
  • শাকিল ভাইয়ের মোটরসাইকেল:Victor GLX 125

রবিনের মোটরসাইকেলটা চালাচ্ছে নাকিব, আর শাকিল ভাইয়েরটা উনি নিজে। ‘শাকিল ভাই’ বলছি বলে মনে করার দরকার নাই যে, খুব সিনিয়র কোনো ভাইয়ের সাথে চলছি; উনি আমাদেরই মতো, শ্রেফ আমার ইচ্ছা হয় বলে আমি উনাকে ‘ভাই’ বলে সম্বোধন করি।

২১ মার্চ বিকাল ৪:২০ রওয়ানা করলাম আমরা। নাকিবের পিছনে রবিন, আর আমি শাকিল ভাইয়ের পিছনে। মোটরসাইকেলে চড়েছিই জীবনে খুব অল্প, তার উপর দীর্ঘযাত্রা- কোনোটারই প্রস্তুতি নেই: নেই রোদচশমা, নেই হেলমেট। তবু শাকিল ভাই ওনার হেলমেটটা আমাকে পরতে দিলেন, ওনার লাগবে না, চশমা আছে চোখে।

উনি একটা কোলবালিশমার্কা ব্যাগ নিয়েছেন, সেটার কারণে আমার বসতে সমস্যা হচ্ছে। আমি ওটা নিয়ে নিলাম আমার পিছনে আর আমার ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে রাখলাম দুজনের মাঝখানে বসিয়ে। ব্যস, আরামসে বসে বসে যাচ্ছি আমরা। বুড়িগঙ্গা পার হতেই রাস্তা ভালো না, সামনের ট্রাক থেকে ছিটকে ছিটকে এসে ছোট ছোট নুড়ি পাথর লাগছে মাথায়। তাই হেলমেট পরে নিলেন শাকিল ভাই।

মুন্সিগঞ্জে ঢুকতেই নাকিবের মোটরসাইকেলকে হাত ইশারায় সাইড করতে বললেন টহল পুলিশ। অথচ শাকিল ভাই সাইড করতে গেলে তারা প্রবল আপত্তিসহকারে “আপনি চলে যান, আপনাকে সিগন্যাল দেয়া হয় নাই” বলতে ব্যস্ত হয়ে উঠলো। উল্লেখ্য, শাকিল ভাই দীর্ঘদিন যাবৎ ঢাকায় মোটরসাইকেল চালান, সে হিসেবে নাকিব কিছুটা অনভ্যস্ত। আমরা আশ্চর্য হলাম পুলিশরা কী করে বুঝে কে পুরোন আর কে নতুন? …যাই হোক, সমস্যা হলো আমাদের নাকিব সাহেবের ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই। পুলিশ এখন কেস দিতে উদ্যত। অথচ নাকিব আর রবিনের প্রবল আপত্তি: আমাদের গাড়ি একটা কেস খেয়েছে (মানে কিছুদিন আগে রবিনের মোটরসাইকেল ৫০০টাকার একটা কেস খেয়েছে; নিয়ম হলো একটা কেস চলাকালীন দ্বিতীয় কেস দিতে পারেনা পুলিশ)। কিন্তু পুলিশ বললো: ড্রাইভিং লাইসেন্স আর মোটরসাইকেল আলাদা ব্যাপার। পরে শাকিল ভাই গিয়ে কীসব ছাত্র-টাত্র বলেটলে দেখি হাসিমুখে ছাড়িয়ে নিয়ে এলেন। গর্বে শাকিল ভাইয়ের বুকটা ফুলে গেলো কয়েক হাত। আর যাই হোক, অভিজ্ঞতার দাম না দিয়ে পারলাম না। মনে মনে ধন্যবাদ দিলাম তাঁকে। …আমি দাড়ি রেখেছি মাস দুয়েক হয়েছে। ভয়ে ভয়ে আছি, জেএমবি সন্দেহে না আবার পুলিশ হ্যারাস করে। কিন্তু কিছুই হলো না আল্লাহ’র দয়ায়।

রাস্তা ভালো হওয়ায় এবারে গতি বাড়লো আমাদের। প্রচন্ড বাতাস এসে আমার চোখে লাগছে, চোখ জ্বলছে, পানি পড়ছে চোখ দিয়ে; কানেও প্রচন্ড বেগে বাতাস লাগছে, মনে হচ্ছে পর্দাই ছিড়ে ফেলবে বাতাস। শাকিল ভাই মোটরসাইকেল চালিয়ে মজা পাচ্ছেন, আর আমি দৃশ্য দেখছি। তবে এই আকষ্মিক মোটরসাইকেল ট্যুরটা তখনও ঠিক উপভোগ যে করছি, তা ঠিক না।

র‌্যাব-১১’র সদরদপ্তর পার হয়ে লৌহজং পার হয়ে মাওয়া ফেরিঘাটে পৌঁছালে দেখি ফেরি চলে গেছে। অপেক্ষা…অপেক্ষা…। আসর-মাগরিব মাওয়াতে সারলাম। রাত ৮টায় এলো ফেরি। মোটরসাইকেল তুলে দিলাম আমরা এক ফোঁকরে। কিন্তু টিকিট করবার আগেই দিলো ফেরি ছেড়ে। তাই ফেরির দায়িত্বে থাকা কট্টর বৃদ্ধকে শাকিল ভাই বেশ মিষ্টি স্বরে গায়ে-পিঠে হাত বুলিয়ে, জড়িয়ে ধরে আদর-সোহাগ করে ৫০টাকা ধরিয়ে দিলেন ফেরির ভাড়া বাবদ। …ঘটনা হলো: যে ঘাটে নামবো বলে চিন্তা করছিলাম আমরা, সেই ঘাটে ফেরি ভিড়বে না। অগত্যা আরো দূরে নামতে হবে আমাদের; কী আর করা? ফেরি যাত্রাও প্রায় দেড় ঘন্টার। ফেরির নাম: যশোর G.T.29052।

সপ্তর্ষি দিয়ে দিক নির্ণয় (ছবি: লেখক)
সপ্তর্ষি দেখে দিক চেনা সহজ এখন! সব ঋতুতেই কি এটা সত্য? (ছবি: লেখক)

ঘটনা হলো মাঝ নদীতে ফেরি চলে গেলে পরিষ্কার ধুলোবালিহীন আকাশটা নজরে এলো। কালো আকাশটাতে তারা দেখার লোভ সামলাতে পারলাম না। আর তখনই শাকিল ভাইকেও পাশে পেলাম। তিনিও আমারই মতো পোকা। দুজনে অনেক কষ্টে তারা দেখে দিক নির্ণয়ের চেষ্টা করলাম। আমি খুঁজছি ‘প্রশ্নবোধক চিহ্ন’ আর তিনি খুঁজছেন ‘উল্টো ফাইভ’। শেষে দেখা গেলো দুজনেই একই জিনিসই খুঁজছি। অবশ্য তিনিই চিনিয়ে দিলেন যে, উল্টো ফাইভের উপরের মাথাটা থাকে পশ্চিম দিকে। ব্যস, সে অনুযায়ী ব্যাপারটা শিওর হয়ে নিলাম নাকিবের আনা দিকদর্শন যন্ত্রটার সাথে মিলিয়ে নিয়ে। …প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, এই প্রশ্নবোধক বা উল্টো ফাইভ হলো Ursa Major-এর Big Dipper-এর সাতটি উজ্জ্বল তারা, বাংলায় যাদেরকে একত্রে বলা হয় ‘সপ্তর্ষি’।

দেড় ঘন্টা পর আমরা নামলাম কাঁঠালবাড়ি ফেরিঘাটে। সেখান থেকে শুরু হলো রাতের যাত্রা। এবারে জানা গেলো, রবিনের মোটরসাইকেল সেদিন পড়ে গিয়ে সামনের লাইটটা আকাশমুখি হয়ে গেছে ঈশ্বরকে পথ দেখানোর জন্য। তাই এবারে শাকিল ভাই ওনার মোটরসাইকেল নিয়ে থাকলেন সামনে, নাকিব ওনাকে অনুসরণ করলো। তবুও সাবধানতাবশত রবিন ব্যাগ থেকে বের করে নিলো বৈদ্যুতিক চার্জসমৃদ্ধ শক্তিশালী কালো লম্বাটে টর্চলাইটটা। মাঝে মাঝে সেটা দিয়ে পথ শিওর হয়ে নিচ্ছে সে, ওটারও আলো মাশাল্লাহ…!

কাঁঠালবাড়ি থেকে কাজিবাড়ি, জাজিরা হয়ে চলছি। ধুধু ঠান্ডা বাতাস এসে গায়ে লাগছে। দিনের বেলা রোদের কারণে বুঝিনি, এখন সেটা রীতিমতো শীত লাগিয়ে দিচ্ছে। হাঁচিও দিয়ে দিলাম দুটা। শাকিল ভাই আমাকে নিয়ে হাসলেন, এতো অল্পতেই হাঁচি চলে এলো বলে। …রাস্তায় লোকজন প্রায় নেই বললেই চলে। মাঝে মাঝে বাজারে এলে লোকজনকে জিজ্ঞেস করে পথ চিনে নিচ্ছি আমরা। আশপাশ দেখতে পারছিনা পথ ঘুটঘুটে অন্ধকার বলে; হেডলাইটে সামনেটা যতদূর আলোকিত হয়েছে ব্যস, অতোটুকুই। আর নাকিবের হেডলাইটটা আকাশের দিকে মুখ করা, তাতে আমাদের দুজনের ছায়া গিয়ে পড়েছে সামনের ছাউনির মতো থাকা দুপাশের গাছগুলোতে।

একটু পরে দেখি হঠাৎ শাকিল ভাইও সামনে ঝুঁকে একটা হাঁচি দিয়ে দিলেন। আমি তো হেসে বাঁচিনে, একটু আগে আমাকে নিয়ে হেসেছিলেন, বেচারা। কিন্তু পরক্ষণেই তিনি বলে উঠলেন, “ভাই, এটা কী!!”

আমি তো আশ্চর্য, “কী!”

শাকিল ভাই তারও চেয়ে আশ্চর্য, “তুমি দেখো নাই!!”

শাকিল ভাই আমাকে আশ্চর্য করে দিয়ে জানালেন এই মাত্র বিশাল একটা পাখি দুদিকে ডানা ছড়িয়ে ঠিক আমাদের মাথার উপর দিয়ে উড়ে চলে গেছে রাস্তার একপাশ থেকে আরেক পাশে কোনোকুনিভাবে। আসলে শাকিল ভাই মাথা নুইয়েছিলেন সামনের দিকে মাথার উপর দিয়ে উড়ে যাওয়া ঐ পাখিটা থেকে মাথা বাঁচানোর জন্য, আমি ভেবেছি হাঁচি দিচ্ছেন। পাখিটার পালকে নীল আর ধুসর রং দেখেছেন তিনি, আর যে বর্ণনা দিলেন, তাতে সেটা বিশাআল পাখি। অথচ আমি কিছুই দেখলাম না। নাকিব আর রবিনও তাঁর কথাকে সমর্থন করলো, ওরাও দেখেছে, কারণ মোটরসাইকেলের আলোটা আকাশমুখি ছিলো। আমি এদিকে মাথা কুটে মরছি: ইশ্‌‌! কেন দেখলাম না আমি? (রহস্য ১)

আমরা নড়িয়া পার হয়ে ভেদরগঞ্জ, পন্ডিতসার ছুঁয়ে অবশেষে পৌঁছলাম কার্ত্তিকপুরে, রাত তখন ১১:১৫। ফুফা-ফুফু হাসিমুখে বেরিয়ে এসে দেখলেন নতুন কেনা মোটরসাইকেল, বরণ করে নিলেন আমাদেরকে।

কিন্তু কাহিনীর পর কাহিনী: কাহিনী আরোও অপেক্ষা করছিল আমাদের জন্য। সাক্ষাৎ ভূত-উপদ্রুত বাড়িতে এসে উঠেছি আমরা চারজন। পিকচার আভি বাকি হ্যায় মেরে দোস্ত‍!

(চলবে…)

-মঈনুল ইসলাম

One thought on “ট্যুর টু শরিয়তপুর: পর্ব ১

মন্তব্য করুন