বান্দরবান ভ্রমণ ২০১১ : পর্ব ১

কতজন যে যাবে তার ইয়ত্তা নেই। যাকেই বলি, সে-ই যেন যাবে। শেষ পর্যন্ত মনে হচ্ছিলো পুরো একটা গ্রামই কি যাচ্ছি নাকি? কিন্তু সব ট্যুরেই যা হয় আরকি, শেষ খেলায় থাকে হাতে গোণা ক’জন। প্ল্যানটা হলো বান্দবানের নীলগিরি আর বগা লেক (বগাকাইন হ্রদ) ভ্রমণ। বন্ধু সাকিব আর সাজ্জাদের কাছে বগা লেক-কীর্তণ শুনতে শুনতে যাওয়ার লোভ সামলাতে পারলাম না। সাকিব বলে দিলো আদ্যোপান্ত। সে হিসেবেই গুগল ম্যাপ্‌স ঘেঁটে প্ল্যানটা সাজালাম আমি। অফিস থেকে ছুটি নিলাম। ২ জুলাই রাতে ট্রেনে ওঠার পরিকল্পনা করলাম। এতে ৩ তারিখ ভোরে চট্টগ্রাম, তারপর সেখান থেকে বান্দরবান। বান্দরবান শহরে একরাত থাকা। বন্ধু নাকিব আর [তার মামাতো ভাই] শাকিল যাবে পরদিন সরাসরি বান্দরবান, তাদেরকে নিয়ে রওয়ানা করবো বগা লেকের উদ্দেশ্যে। সেখানে একরাত থেকে পরদিন ফিরবো আবার, সরাসরি উঠবো নীলগিরিতে। সেখানে একরাত থেকে পরদিন ভোরে রওয়ানা হবো আবার চট্টগ্রামে, ফের ট্রেনযোগে ঢাকা ফেরত। প্ল্যানটা বেশ গোছানো এবং সব ঠিকঠাকমতো হলে আমরা ৬ তারিখ ঢাকা ফেরত আসতে পারবো।

প্ল্যান করার জন্য ওয়েবসাইট ঘেঁটে বান্দরবানের এক সপ্তাহের অগ্রিম ওয়েদার আপডেট নিয়ে নিলাম। আবহাওয়ার অগ্রিম খবর অনুযায়ী প্রতিদিনই বৃষ্টি ও বৃষ্টিঝড় থাকার সম্ভাবনা গড়ে ৩০%। তাপমাত্রার গড় ৩৪ ডিগ্রি (যদিও অনুভূত তাপমাত্রা হবে গড়ে ৪০ ডিগ্রি)।বৃষ্টিময় এই সময় তাই সবাই-ই ট্যুরের ব্যাপারে একটু সন্দিহানও ছিলাম। এছাড়া যেখান থেকে পারলাম বান্দরবানের খুঁটিনাটি মানচিত্র তৈরি করে নিলাম। সাকিব জানিয়ে দিলো: বগা লেক ট্যুরে বড় বোতলে ২ লিটার পানি, লাঠির মাথায় একটা কাপড়ে প্যাঁচিয়ে লবণ (জোঁক ছাড়ানোর জন্য), মশা ও ক্ষতিকর পোকা তাড়াতে ওডোমোস ক্রিম, আর মুখে রস জোগাতে ক্যাডবেরি চকলেট নিয়ে নিতে। সবই ঠিকমতো ছিল, কিন্তু…

কিন্তু প্ল্যান ঠিকমতো চললো না: শুরুতেই বাগড়া দিলো ট্রেন। ট্রেনের টিকেট মিললো না ২ তারিখের তূর্ণা এক্সপ্রেসের। এক সপ্তাহের টিকেট নাকি নেই। এবারে প্ল্যান বি: বাসের টিকেট করলাম ২টা: ইউনিক বাস, সরাসরি যাবে চট্টগ্রামে (জনপ্রতি ৳৩৫০)। আমরা সরাসরি বান্দরবান গেলেও পারতাম, কিন্তু চট্টগ্রাম থেকে আমাদের সাথে যোগ দিবে আরো ক’জন, তাই চট্টগ্রামে যাওয়াই ঠিক করলাম। শেষ পর্যন্ত ঢাকা থেকে ২ তারিখ রাত ১১টার বাসে রওয়ানা করলাম আমি আর আমার বন্ধু ইফতি (হলি)। বাসের অবস্থা ঠিক ভালো না। হাতল ভাঙা, জানালাটা একটা পরপর হড়কে খুলে গিয়ে বৃষ্টিস্নাত ঠান্ডা বাতাসে কাবু করে ফেলছে। এভাবেই ভোর সাড়ে ৬টার দিকে পৌঁছলাম চট্টগ্রামে। সেখানে আমাদের সাথে যোগ দিতে সিলেট থেকে বাসযোগে আসছে আমার ফুফাতো ভাই আর তার দুই বন্ধু; চট্টগ্রামে ব্যাংকে চাকরি করে আমার বন্ধু নিঝু, সেও যোগ দিবে; আরো যোগ দিবে ইফতি’র এক সিভিল ইঞ্জিনিয়ার কাযিন। শেষ পর্যন্ত নিঝু ব্যাংক থেকে ছুটি পায়নি, আর ওদিকে আমার ফুফাতো ভাই শাকির নিয়ে এসেছে তিন বন্ধুকে। আমরা সবাই চট্টগ্রাম বহদ্দারহাট বাসস্ট্যান্ডে মিলিত হলাম আলাদা আলাদাভাবে।

আমাদের সাতজনের টীম (আমি, [বন্ধু] ইফতি, [ইফতির কাযিন] প্রিয়ম, [আমার কাযিন] শাকির, [শাকিরের বন্ধু] আব্দুল্লাহ, ফয়সল এবং ফরহাদ) বাসের টিকেট করলাম পূরবীর (জনপ্রতি ৳৮০)। বান্দরবান পৌঁছালাম দুপুর ১২টার দিকে। রোদ যদি সরাসরি গায়ে এসে লাগে তো মনে হয় পুড়িয়ে দিয়ে যাবে, বৃষ্টির ছিটেফোঁটাও দেখলাম না কোথাও।

বান্দরবানে এর আগেও একবার ট্যুর দিয়েছিলাম ২০০৮-এ (২০০৮ ট্যুর বৃত্তান্ত)। সেবার যে হোটেলে থেকেছিলাম সঙ্গীদের সবাইকে সেই হোটেলে নিয়ে গেলাম: হোটেল গ্রীণ হিল। বাস থেকে নামতেই দেখি মাহিন্দ্র বেবি টেক্সি দাঁড়িয়ে আছে, প্রেসক্লাব পর্যন্ত জনপ্রতি ৳৫ করে নিলো। ট্যুরে আমি প্রথম যে নিয়ম মেনে চলি, সেটা হলো”খরচ কমাও”। গ্রীণ হিলে খরচ কম হলেও হোটেলের ভিতরের চেহারা যখন সবাই দেখলো, তখন কারোরই পছন্দ হলো না: খরচ বাঁচানোর পরিকল্পনায় প্রথম ধাক্কা খেলাম আমার টীমমেটদের পক্ষ থেকে। অগত্যা আরেকটু ভালো হোটেলের সন্ধানে বেরোতে হলো।

পূরবী বাসে আসতে ইফতি’র পাশে বসেছিলো এক যুবক। সে পরিচয় দিয়েছে সে হোটেল ফোর স্টার-এর মালিক। তার হোটেলে থাকার আমন্ত্রণ জানিয়েছে ইফতিকে, ফোন নম্বরও দিয়েছে। ভালো হোটেল খুঁজতে গিয়ে ফোর স্টার পেয়ে গেলাম। সেখানে রুমভাড়া বেশি, তবে চেহারা দেখে টীমমেটদের পছন্দ হয়ে গেল। যখন ইফতি মালিকের রেফারেন্স দিলো, তখন ম্যানেজার হোটেল ভাড়া আরো কমিয়ে অফার করলেন। ব্যস, আমাদের দুটো ডাবল রুম বুক করা হলো একরাতের জন্য অগ্রিম ভাড়া (রুমপ্রতি ৳৭০০) দিয়ে। রুম বুক করার পর শাকির আর তার তিন বন্ধু মিলে নিলো একটা, আমি-ইফতি-প্রিয়ম নিলাম আরেকটা। শুরুতেই গোসল করতে গেলাম, কিন্তু গোসলের পানি দেখে তো মেজাজ খারাপ: একেবারে কাদাগোলা পানি। তারপরও সেই পানি দিয়েই গোসল সেরে জুমার নামাযে রওয়ানা করলাম। শুরুতেই দলে বিভাজন পড়ে গেলো: শাকিরের তিন বন্ধু নামাযে যাবে না। অগত্যা আমরা চারজনই গেলাম। জুমার নামায পড়তে গিয়ে বান্দরবান কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ দেখেতো চক্ষু চড়কগাছ। এতো বড় মসজিদ, তারউপর ঠান্ডা একটা মসজিদ। মসজিদের ইন্টেরিয়রে একটা বিষয় নজর কাড়লো: কয়েক সারি পরপরই রটের তৈরিজুতা রাখার র‌্যাক, চার তাকের র‌্যাকটির পঞ্চম তাকটিতে রাখা প্লাস্টিকের টুপি, তার উপরে একটা স্ট্যান্ডে একটা করে টাওয়্যাল ঝোলানো, যাতে ওযু করে মুখ মোছা যায়। পরিকল্পনাটা ভালোই লাগলো।

মসজিদের বয়ান থেকে পাহাড়ি-বাঙালি রেষারেষির বিষয়টি স্পষ্ট হয়েই ফুটে উঠলো (পাহাড়ি-বাঙ্গালি সম্পর্ক বিষয়ে আমার মত)। ইমাম সাহেব জানালেন, পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য নাকি জাতিসংঘের শান্তি বাহিনীকে বাংলাদেশে আনার পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ সরকার, অথচ বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী বিদেশে শান্তি প্রতিষ্ঠায় পুরষ্কারপ্রাপ্ত। কথাটার সত্যতা যাচাই করার উপায় ছিল না, তবে শুনে রাখলাম। বয়ানের মূল বিষয়বস্তু ছিল নিয়্যত: সমাজ নেতারা জনসেবা করছেন, কিন্তু তাদের নিয়ত আল্লাহমুখী না, যদি তা হতো, তাহলে তাঁরাও নামায-রোযার মতো ইসলামিক কাজের মর্যাদা পেতেন তাঁদের জনসেবার কাজে। এই বয়ানের কারণ হলো আসন্ন পৌরসভা নির্বাচন: সারাদেশের মতো বান্দরবানেও লেগেছে নির্বাচনের হাওয়া।

নামায শেষে সবাই-ই প্রচণ্ড ক্ষিধা অনুভব করলাম, কিন্তু হোটেলে গিয়ে আবিষ্কার করলাম শাকিরের তিন বন্ধু আমাদেরকে রেখেই খেয়ে নিয়েছে। ফোর স্টারের দোতলায় একটা হোটেলে ২০০৮-এ খেয়েছিলাম, তাই সেখানেই চেষ্টা করলাম, কিন্তু প্রচণ্ড ক্ষুধা থাকাসত্ত্বেয় খাবার মজা লাগলো না, আশা করি বুঝতেই পারছেন খাবার কতটা জঘন্য ছিল। খাবার বিল গেলো চারজনে জনপ্রতি ৳৭০।

যাবতীয় ব্যয় বহন করছে ইফতি, রাতে আমরা সেগুলো হিসাব-নিকাশ করে যার-যার ব্যয়র্থ ইফতিকে ফিরিয়ে দিব। একহাতে খরচ হলে হিসাব পাওয়া সহজ হয় -এটাও ট্যুরের আরেকটা নিয়ম:”একহাতে খরচ করো”।

আমাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী আজকের দিনটা আমরা বান্দরবান সদরে আছি, সুতরাং আমি যেহেতু আগে একবার এসেছি, নতুন সবাইকে বান্দরবান সদরের স্পটগুলোতে ঘুরিয়ে নেয়ার দায়িত্ব আমার। পরিকল্পনামতো ঠিক করলাম সময় নষ্ট করা যাবে না, দশ মিনিটের বিশ্রাম শেষে তাই সবাইকে নিয়ে জোর করে বেরিয়ে পড়লাম (যদিও শাকিরের বন্ধুরা একটু বিশ্রাম করতে চাইছিল) বালাঘাটা বৌদ্ধ মন্দিরের উদ্দেশ্যে।

বালাঘাটা বৌদ্ধ ধাতু জাদি

বান্দরবান সদর মোড় থেকে মাহিন্দ্র বেবিটেক্সি ঠিক করলাম। একেবারে বৌদ্ধ মন্দিরের গোড়ায় নিয়ে যাবে, খরচ পড়বে ৳১৪০, সাতজন একসাথে, তাই কনসেশন করে এলো ৳১২০-এ। বৌদ্ধ মন্দির আগেই ২০০৮-এ দেখেছিলাম, তবে ভিতরে যেতে পারিনি, এবার গিয়ে যখন ভিতরে ঢুকতে গেলাম, তখন দেখা গেলো জনপ্রতি টিকেট করতে হবে ৳১০ দিয়ে। আমি আপত্তি করছিলাম, “আগে তো ছিল না”, তখন এক বৌদ্ধ ছাত্র আমাকে বললো, “আপনিওতো আগে এরকম [এখনকার মতো] ছিলেন না।” কী আর করা, টিকেট করে মন্দিরের উপরে উঠলাম। মন্দিরের বর্ণনা আগেও দিয়েছি, তাই আবার দিচ্ছি না। নতুন যা দেখলাম তা-ই বলি: বিভিন্ন দেশ থেকে কিছু বৌদ্ধ মূর্তি এই জাদিতে পাঠানো হয়েছে, সেগুলো শোভা পাচ্ছে মন্দিরের প্রতিটা খাঁজে। প্রতিটা বৌদ্ধমূর্তি পদ্মের আসনে দণ্ডায়মান এবং সেগুলোর সামনে প্লেকার্ডে দেশের নাম লেখা আছে, কত শতাব্দে সেগুলো দেয়া হয়েছে, তার সালোল্লেখ আছে। যেমন: জাপান (৮ শতাব্দি), আরাকান (৪-৯ শতাব্দি), মিয়ানমার (১৭ শতাব্দি), আফগানিস্তান (২-৪ শতাব্দি), কোরিয়া (৮ শতাব্দি), চীন (৭-৯ শতাব্দি), ভিয়েতনাম (৫-৬ শতাব্দি), থাইল্যান্ড (১৩-১৫ শতাব্দি), ইন্দোনেশিয়া (৮ শতাব্দি), লাওস (১৭ শতাব্দি), কম্বোডিয়া (১২ শতাব্দি), শ্রীলঙ্কা (৫ শতাব্দি), বাংলাদেশ (৭-৯ শতাব্দি)। তবে সালের এই এতো প্রাচীনত্ব দেখে অনুমিত হয়, এগুলো এতো আগের মূর্তি নয়, বরং এগুলো ঐ সময়কার মূর্তির সাংস্কৃতিক আদল-মাত্র। প্রতিটা মূর্তিই আলাদা আলাদা মুদ্রায় বিধৃত: কোনোটা অভয় মুদ্রায়, কোনোটা তর্পণ (তৃপ্তিসাধন) মুদ্রায় ইত্যাদি। প্রতিটা মূর্তির পায়ের কাছে একটা করে আধা লিটার পানির বোতল, হয়তো মূর্তির প্রতি অর্ঘ্য।

বুদ্ধ ধাতু জাদির সদর দরজার বাম পাশে বুদ্ধ এরকমই মনোহর [ছবি: লেখক]
বুদ্ধ ধাতু জাদির সদর দরজার বাম পাশে বুদ্ধ এরকমই মনোহর [ছবি: লেখক]

মন্দিরের গায়ে যখন এই দণ্ডায়মান মূর্তিগুলো সাঁটা, তখন বেদির সামনে বসানো কয়েকটি ছাতা-আচ্ছাদিত বসা-মূর্তি -এগুলোও বুদ্ধেরই মূর্তি, সম্ভবত শ্বেত পাথরের। প্রতিটা মূর্তির নাম লেখা রয়েছে ছাতার দণ্ডে: বুধ ১, বুধ ২, বৃহস্পতি, বৃহস্পতি ২, শুক্র-১, শুক্র-২, শনি, রবি (সূর্য), সোম-১ (চাঁদ), সোম-২, মঙ্গল, এবং রাহু। প্রতিটা মূর্তির আসনের সামনে মেঝেতে একটা উপ-বেদীতে কিছু প্রাণীর মূর্তি। যেমন: বৃহস্পতি ১ ও ২, শুক্র ১ ও ২-এর সামনে একটা খরগোশ কিংবা ইঁদুর (ঠিক ঠাহর করতে পারিনি), শনির সামনে নাগিন, রাহুর সামনে কালো হাতি, রবির সামনে গণেশাকৃতি মূর্তি, সোম ১ ও ২-এর সামনে ডোরা কাটা রয়েল বেঙ্গল টাইগার, মঙ্গলের সামনে সিংহসদৃশ মিথিকাল চরিত্র, বুধ ১ ও ২-এর সামনে শ্বেত হাতি। সম্ভবত এগুলো বুদ্ধের আলাদা আলাদা বাহন বোঝাচ্ছে।

মন্দিরের পিছনের দিকে একটা ঘণ্টা শোভা পাচ্ছে, যা অলঙ্কৃত এক সোনালি ড্রাগন-স্তম্ভের মধ্যে ঝোলানো। ঘণ্টার গায়ে খোদাই করা লেখা থেকে জানা যায় ঘণ্টাটি দান করেছিলেন, Takhon Timber Merchant, Yangon। আরেক পাশে বর্মী ভাষায় একই কথা লেখা ঠিকানাসহ।

দুপুরের প্রচণ্ড খাড়া রোদে মন্দিরের মেঝে উত্তপ্ত বালুর চেয়েও ভয়ঙ্কর হয়ে আছে, তার উপর জুতা নিয়ে প্রবেশ নিষেধ। সবারই ত্রাহী অবস্থা। আমার হাঁটা-চলা একটু বেশি, পায়ের তলা শক্ত, আমারও কষ্ট হচ্ছিলো ঐ প্রচণ্ড রৌদ্রতপ্ত মেঝেতে হাঁটতে। যাহোক সবাই-ই মনমতো ছবি তুললো। সবাইকে একটু সুযোগ দিলাম, যাতে বিশ্রাম নিতে পারে, আর রোদও একটু কমে আসে। কারণ এর পরের যাত্রা হবে মেঘলা পার্কের উদ্দেশ্যে।

পুরোদমে ট্যুরিস্ট-মার্কা একটা পরিকল্পনা তখনও পর্যন্ত চলছিল, কারণ ঐদিনই আমরা নাকিব আর শাকিলকে রেখে বগা লেকের উদ্দেশ্যে রওয়ানা করতে পারছিলাম না। মন্দির চূড়া থেকে নেমে এসে ২০০৮-এর মতো পাশের আরেকটা চূঁড়ায় ওঠার পরিকল্পনা নিলাম। কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখি সেই পথটা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। সবাই-ই আমার কাজেকর্মে একটু বিরক্ত হলো, কারণ আমি তাদেরকে অতিরিক্ত কষ্ট করাচ্ছি- পাহাড়ে চড়াচ্ছি, আবার নামাচ্ছি। মনে মনে একটু সন্দিহান হলাম আমার টিমমেটদের ব্যাপারে, এদেরকে নিয়ে বগা লেকে ট্যুর দেয়া কি বুদ্ধিমানের কাজ হবে? এরা কি পারবে ওতোগুলো চড়াই উৎরাই পার হতে? পারবে পিচ্ছিল রাস্তায় জোঁকের কষ্ট সহ্য করতে? পারবে মশা-মাছির কামড় সহ্য করতে? আমার মনে হলো না।

মেঘলা পর্যটন স্পট

যাহোক, যে মাহিন্দ্রতে করে মন্দিরে গিয়েছিলাম, সেটা আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল, সে নাকি আমাদেরকে বহন করলে যে ভালো এ্যামাউন্ট পাবে, তা সাধারণভাবে পাবে না। তার সাথে মেঘলা পর্যন্ত কত নিবে তা ঠিক করা হলো: সাকুল্যে ৳২২০ টাকা। সেখানে গিয়ে দেখি সেখানকার টিকেটের দামও বেড়ে গেছে (জনপ্রতি ৳২০)। ভিতরে সেই আগেরই দৃশ্য। ছবি তুললাম, লেকের পানিতে ওযু করে আসরের নামায সারলাম। এমন সময় ফরহাদ জানালো ওর মোবাইল ফোন হারিয়ে গেছে। মহা গ্যাঞ্জাম! অবশেষে সেটা পাওয়া গেলো সেই মাহিন্দ্র’র ড্রাইভারের কাছে। ব্যস, ওরা তিনজন পিছনে হটলো। আমি, শাকির, ইফতি আর প্রিয়ম হাঁটলাম, ছবি তুললাম।

মেঘলা'র ভিতরের এই রাস্তাটা আমায় পাগল করে ছেড়েছে। [ছবি: লেখক]
মেঘলা’র ভিতরের এই রাস্তাটা আমায় পাগল করে ছেড়েছে। [ছবি: লেখক]
মেঘলা থেকে বেরিয়ে এলাম সন্ধ্যার আগ মুহূর্তে। আমাদের আগের মাহিন্দ্র চলে গেছে। অন্য আরেকটা মাহিন্দ্র বাইরে দাঁড়িয়ে আছে, আমি তাতে চড়তে অস্বীকৃতি জানালাম, কারণ খরচ বেশি হয়ে যাচ্ছে। অপেক্ষা করতে করতে হঠাৎ এগিয়ে এলো একটা জিপ-পিকাপ। সেটার পিছনের হুড খোলা। জনপ্রতি ৳১০ করে নিবে সদরে পৌঁছে দিতে। লাফ দিয়ে উঠে পড়লো সবাই। তারপর উপরের রডের বাইরে মাথা বের করে দিয়ে উঠে দাঁড়ালাম সবাই। আর গাড়ির ড্রাইভারও শুরু করলো রোলার কোস্টার চালানো। বান্দরবানের রাস্তা এমনিতেই চরম আঁকাবাঁকা, তার উপর চড়াই-উৎরাই, কিন্তু কোনো বাঁক পেরোতেই ড্রাইভার গতি কমাচ্ছে না, ক্যাঁচ ক্যাঁচ করে চাকা বাঁক নিচ্ছে প্রতিটা মোড়ে, আমাদের জান তখন যেন হাতে চলে আসছে। তবে প্রচণ্ড বাতাসের তোড়ে সবাই-ই এই যাত্রা উপভোগ করছি।বান্দরবান সদরে ফিরে মসজিদে মাগরিবের নামায পড়লাম, তারপর একটা হোটেলে খাঁটি গরুর দুধ খেলাম। হোটেলে ফিরে আর ক্লান্তি ধরে রাখতে পারলাম না, গোসল করার আগেই চোখ ঘুমে বুজে এলো। শাকিররা ওদিকে মাহিন্দ্র’র ঐ চালকের কাছ থেকে মোবাইল ফোনটা উদ্ধার করেছে -বেচারা ওটা গাপ করে দেয়নি, এটাই ফরহাদের সাত জনমের ভাগ্য। হয়তো লোকটা ভালোই ছিল। সেদিনের যাবতীয় খরচের হিসাব সারলাম আমরা। রাতে গোসল করে ভাই ভাই হোটেলে গিয়ে রাতের খাবার খেলাম। এখানে খাবারের মান কিছুটা ভালো। তারপর হোটেলে ফিরে পরদিনের পরিকল্পনা আঁটতে থাকলাম।তখন নিজের কাছে কঠিন প্রশ্ন এসে দানা বাঁধলো: বগা লেক কি যাবো আমরা?
চলবে…
-মঈনুল ইসলাম

মন্তব্য করুন