দূরবীক্ষণ যন্ত্র: গ্যালিলিও, নিউটন, হাবল থেকে জেম্‌স ওয়েব (২)

~ একটা স্কুল বাস ভাসছে আকাশে ~

হাবল টেলিস্কোপ, মার্চ ২০০২
হাবল টেলিস্কোপ, মার্চ ২০০২

যে টেলিস্কোপ আমরা একটা স্ট্যান্ডের উপর দাঁড় করিয়ে আকাশের পানে তাক করেছিলাম, সামান্য একটু নড়াচড়ায় লক্ষ লক্ষ কোটি মাইল এদিক-সেদিক হয়ে যায় দৃষ্টি, সেই টেলিস্কোপকে মহাকাশে, বাতাসে… থুক্কু বায়ুশূণ্য অবস্থায় ভেসে বেড়ানোর কাজে পাঠানোর কল্পনা আজ আর নিছক কল্পনা নয়— সাক্ষাৎ বাস্তব। বুদ্ধিটা খুব সহজ, কিন্তু যথেষ্ট শ্রমসাধ্য, ব্যয়সাধ্য আর ঝুঁকিপূর্ণ তো বটেই। মহাকাশে একটা রকেট দিয়ে টেলিস্কোপ প্রেরণের প্রস্তাব প্রথম আসে জার্মান বিজ্ঞানী হারমান ওবার্থ (Hermann Oberth) কর্তৃক ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে, আর ফান্ড জোগাড় হয় ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দে।

এরই ধারাবাহিকতায় নাসার বিজ্ঞানীরা একটা বিশাল স্কুল বাস বানালেন, অর্থাৎ স্কুল বাসের সমান একটা বিশা-লাকায় টেলিস্কোপ: নাম তার হাবল স্পেস টেলিস্কোপ, সংক্ষেপে HST (হাবলের দৈর্ঘ্য ৪৩.৫ ফুট, ওজন ১১,১১০ কেজি, সর্বোচ্চ ব্যাস ১৪ ফুট)। তাঁদের উদ্দেশ্য হলো বাতাসে নয়, বরং বাতাসের স্তর পেরিয়ে মহাকাশে এই টেলিস্কোপটাকে স্থাপন করা। “স্থাপন করা” কথাটা চাট্টিখানি কথা নয়।

একটা রকেটে করে টেলিস্কোপটা পাঠানো হবে বায়ুমন্ডলের বাইরে (১৯৯০ খ্রিস্টাব্দে স্পেস শাটল ডিসকভারি দিয়ে কাজটি করা হয়); বায়ুমণ্ডলের বাইরে হলেও পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণের আয়ত্বের ভিতরে একটা নিরাপদ অঞ্চলে (ভূপৃষ্ঠ থেকে ৫৯৬ কিলোমিটার উঁচু দিয়ে) স্থাপন করা। সেখানে যেহেতু বাতাস নেই, তাই কোনো কিছু ঘষাঘষি করার নেই, মানে ফ্রিকশন নেই। সুতরাং শান্তিতে বায়ুমন্ডলের বাইরে, কিন্তু পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণের আয়ত্বের ভিতরে শূণ্যে ভেসে থাকবে টেলিস্কোপটি। এটিকে নিয়ন্ত্রণ করা হবে পৃথিবী থেকে। হাবল একটা প্রতিফলন টেলিস্কোপ, আয়নার প্রতিফলনে সে দূরবর্তি বস্তুর তথ্য ধারণ করে। ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দের জুলাইতে এতে জোড়া হয় চন্দ্র এক্স-রে টেলিস্কোপ। চন্দ্র’র ক্ষমতা এতটাই ব্যাপক যে, আপনি দেড় মাইল দূর থেকে ওটা দিয়ে দেড় ইঞ্চির কোনো লেখা পড়তে পারবেন অনায়াসে।

হাবল টেলিস্কোপের নামকরণ করা হয় বিজ্ঞানী এ্যাডউইন পি. হাব্‌ল-এর (১৮৮৯-১৯৫৩) নামানুসারে, তাঁকে সম্মান জানিয়ে। তিনিই প্রথম মহাজাগতিক বস্তুসমূহের ব্লু-শিফ্‌ট আর রেড-শিফ্‌ট দেখিয়ে প্রমাণ করেন যে, এই মহাবিশ্ব সম্প্রসারণশীল আর প্রতিটি বস্তু একটা আরেকটা থেকে ক্রমে দূরে সরে যাচ্ছে। এই প্রমাণের উপর ভিত্তি করেই পরে মহাবিষ্ফোরণ তত্ত্বের সূচনা হয়। (যদিও ক্রমসম্প্রসারণশীল মহাবিশ্বের ধারণা সর্বপ্রথম করেন একজন খ্রিস্টান যাজক, কিন্তু হাবল তা প্রমাণ করার কৃতীত্ব লাভ করেন)

হাবল টেলিস্কোপ যেহেতু পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণের বাইরে বসানো হয়নি, তাই এটি ঠিক চাঁদের মতোই পৃথিবী যেদিকে যায় (বার্ষিক গতি), পৃথিবীর সাথে সাথে সেদিকে যায়। তবে যেতে যেতে পৃথিবীকে চক্কর খায় বা পাক খায় (আহ্নিক গতি), যাতে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণের টানে ধুপ করে পড়ে না গিয়ে নিজের অবস্থানে টিকে থাকতে পারে। প্রতি ৯৭ মিনিটে হাবল স্পেস টেলিস্কোপ ঘন্টায় ২৮,০০০ কিলোমিটার বেগে পৃথিবীকে একবার ঘুরে আসে। এর যাবতীয় শক্তি’র প্রয়োজন সে মেটায় সূর্যের আলো থেকে, অর্থাৎ শুনতে অদ্ভুত শোনালেও এই হাবল টেলিস্কোপ একটা আলোখেকো, আর আলো খাওয়ার জন্য এর রয়েছে ২৫ ফুট লম্বা দুটো সৌরপ্যানেল। আর শক্তি সঞ্চয়ের জন্য রয়েছে ৬টি নিকেল-হাইড্রোজেন ব্যাটারি, যেগুলো একত্রে ২০টা গাড়ির বিদ্যুৎ সংরক্ষণ করতে পারে।

একটা টেলিস্কোপ কতটা উজ্জ্বল দৃশ্য দেখতে পাচ্ছে, তা জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা মাপেন টার্ম্‌স অফ ডিগ্রি’র হিসাবে। নিখুঁততার মাত্রা যত ব্যাপক, ডিগ্রি’র হিসাবটা তত ভাগ হতে থাকে আর্কমিনিট, আর্কসেকেন্ডে। যেমন:

১ ডিগ্রি = ৬০ আর্কমিনিট = ৩৬০০ আর্কসেকেন্ড।

আমাদের খালি চোখে দেখার ক্ষমতা হলো ৬০ আর্কসেকেন্ড। গ্যালিলিও’র টেলিস্কোপের ক্ষমতা ছিল ৩ আর্কসেকেন্ড। কেক টেলিস্কোপের ক্ষমতা হলো ১ আর্কসেকেন্ড। আর হাবলের ক্ষমতা হলো ০.০৫ আর্কসেকেন্ড।

The Majestic Sombrero Galaxy (M104) (উৎস: hubblesite.org)
মহাগ্যালাক্সি সোমব্রেরো (M104) (উৎস: hubblesite.org)

হাবল টেলিস্কোপ আল্ট্রাভায়োলেট থেকে ইনফ্রারেড পর্যন্ত (১১৫-২৫০০ ন্যানোমিটারে) আলোর সব তরঙ্গদৈর্ঘ্যে দেখতে সক্ষম। এই অত্যাশ্চর্য ক্ষমতা নিয়ে হাবল যা পর্যবেক্ষণ করে তার প্রেক্ষিতে প্রতি সপ্তাহে ১২০ গিগাবাইট তথ্য পাঠায়। এতো এতো তথ্য সংরক্ষণে তাই ম্যাগনেটো-অপটিক্যাল ডিস্ক ব্যবহৃত হয়। হাবল, তার তোলা প্রথম ছবি পাঠায় ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দের ২০ মে, সেটা ছিল স্টার ক্লাস্টার NGC 3532’র একটা দৃশ্য। সেই থেকে লক্ষাধিক ছবি পাঠিয়েছে পৃথিবীতে। আর সেসব ছবি বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত হওয়া গেছে মহাবিশ্বের বয়স, জানা গেছে কোয়াযারদের সম্বন্ধে আর ডার্ক এনার্জি বা কৃষ্ণশক্তি সম্বন্ধে। হাবলের চোখ দিয়ে বিজ্ঞানীরা একেকটা গ্যালাক্সির বিভিন্ন অবস্থা সম্বন্ধে জেনেছেন। হাবল আবিষ্কার করে মহা শক্তিশালী গামা রে বার্স্ট বা গামারশ্মির বিষ্ফোরণ। হাবল, মহাকাশে গ্যাসের কিছু কুন্ডলি এমনভাবে আবিষ্কার করেছে, যেনবা তারা কিছু একটার ফাঁদে আটকা পড়েছে, যা ব্ল্যাকহোল বা কৃষ্ণগহ্বরের প্রামাণ্য দলিল হিসেবে কাজ করে। হাবল, বৃহস্পতি’র উপগ্রহ ইউরোপার বাতাসে অক্সিজেনের উপস্থিতি সনাক্ত করেছে। এডউইন হাবল প্রমাণিত সম্প্রসারণশীল মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের মাত্রা আবিষ্কার করেছে হাবল টেলিস্কোপ। আর, হাবলের সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে রচিত হয়েছে ৬,০০০-এরও বেশি বৈজ্ঞানিক নিবন্ধ।

এই টেলিস্কোপটি নাসা পাঠালেও পৃথিবীর যেকোনো প্রান্ত থেকে যেকোনো বিজ্ঞানী হাবলকে ব্যবহারের অনুমতি চাইতে পারেন। অভিজ্ঞদের একটা প্যানেল তখন সেখান থেকে যোগ্যতমটি বাছাই করে সেদিকে হাবলকে ঘুরিয়ে সেখানকার ছবি তুলে পাঠান সেই বিজ্ঞানীকে বা সেই বিজ্ঞান মহলকে। প্রতিবছর এরকম বহু আবেদন জমা পড়ে, তবে সেখান থেকে বছরে প্রায় ১,০০০ আবেদন যাচাই করে প্রায় ২০০ আবেদন মঞ্জুর করা হয়, আর সেই আবেদন অনুযায়ী কাজ করতে হাবলকে মোটামুটি ২০,০০০ একক পর্যবেক্ষণ করতে হয়।

হাবল টেলিস্কোপ যেভাবে কাজ করে (সংগ্রহ: hubblesite.org)
হাবল টেলিস্কোপ যেভাবে কাজ করে (সংগ্রহ: hubblesite.org)

হাবল মূলত ক্যাসেগ্রেইন রিফ্লেক্টর ঘরাণার টেলিস্কোপ, মানে আলোর প্রতিসরণ নয়, প্রতিফলনে কাজ করে। …অনেকেই মনে করেন টেলিস্কোপ বড় হলে তার ক্ষমতা বেশি। আসলে টেলিস্কোপের দেখার ধরণ হলো যত বেশি আলো প্রতিফলন করতে পারবে, তত উজ্জ্বল ছবি পাবে টেলিস্কোপ। হাবলে ব্যবহৃত হয়েছে ওয়াইড ফিল্ড ক্যামেরা ৩ (WFC3), যা অতিবেগুনী রশ্মির কাছাকাছি রশ্মি, দৃশ্যমান আলোকরশ্মি, আর ইনফ্রারেডের কাছাকাছি রশ্মি দেখতে পারে। এর কস্‌মিক অরিজিন স্পেকট্রোস্কোপ (COS) অতিবেগুনীরশ্মিতে দেখতে পারে। এটা অনেকটা প্রিযমের মতো আলোকে ভাগ করে, ফলে এর দ্বারা দৃশ্যমান বস্তুর তাপমাত্রা, রাসায়নিক মিশ্রণ, ঘনত্ব, আর গতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। এর অ্যাডভান্সড ক্যামেরা ফর সারফেস (ACS) দৃশ্যমান আলো দেখতে পারে, আর এটা ব্যবহৃত হয় মহাবিশ্বের প্রথম দিককার দৃশ্যগুলো ধারণ করতে। এছাড়া ডার্কম্যাটার, মহাবিশ্বের দূ-রবর্তি বস্তু, গ্যালাক্সির চাকতি ইত্যাদি গবেষণায়ও ব্যবহৃত হয়। এর স্পেস টেলিস্কোপ ইমেজিং স্পেকট্রোস্কোপ (STIS) অতিবেগুনী, দৃশ্যমান আলোকরশ্মি আর ইনফ্রারেডের কাছাকাছি আলো দেখতে সক্ষম, এবং এই যন্ত্রটি কৃষ্ণগহ্বর অনুসন্ধানে বেশ সক্ষম। এর নিয়ার ইনফ্রারেড ক্যামেরা অ্যান্ড মাল্টি-অবজেক্ট স্পেকট্রোমিটার (NICMOS) হলো হাবলের তাপ পরিমাপক যন্ত্র, এর দ্বারা লুক্কায়িত বস্তুর অনুসন্ধান করা হয়, আর দূরবর্তি আকাশে দৃষ্টি দেয়া হয়। আর এর ফাইন গাইড্যান্স সেন্সর (FGS) একে গাইড স্টার বা ধ্রুব তারা চিহ্নিত করে হাবলকে সেদিকে স্থির দৃষ্টিতে তাক করে থাকতে সহায়তা করে। এর সহায়তায় আরো যে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করা হয় তা হলো দুটো তারার মধ্যকার দূরত্ব আর তাদের আনুপাতিক গতি পরিমাপ। আর এইসব অসাধারণ যন্ত্রপাতির সমন্বয়ে হাবল, মহাকাশে, এই পৃথিবীর একটি শক্তিশালী ইন্দ্রীয়।

Triplet Arp 274 গ্যালাক্সি'র ছবি (উৎস: hubblesite.org)
Triplet Arp 274 গ্যালাক্সি’র ছবি (উৎস: hubblesite.org)

হাবলের দেখভাল আর ভূমি থেকে নিয়ন্ত্রণ করার দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছে নাসা’র গডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টার, আর স্পেস টেলিস্কোপ সায়েন্স ইন্সটিটিউট (STScl)। হাবল দিয়ে কোনো নির্দিষ্ট টার্গেটে ছবি তোলাটা চাট্টিখানি কথা নয়, কারণ পৃথিবীটা সূর্যের চারপাশে ঘন্টায় ১,০৭,৮০০ কিলোমিটার গতিতে ঘুরছে, আর পৃথিবীকে ঘিরে হাবল ঘুরছে ঘন্টায় ২৮,২০০ কিলোমিটার গতিতে, সুতরাং চলমান একটা গাড়ির মধ্যে বসে পাশ দিয়ে চলে যাওয়া কোনো দৃশ্য তোলাটা যেমন সহজ নয়, তেমনি অবস্থা হয় হাবলের। তাই এই সমস্যা কাটিয়ে উঠা হয় অনেক জটিল হিসাব-নিকাশের মাধ্যমে। এজন্য প্রথমে টার্গেটের আশপাশের ধ্রুব তারাগুলো চিহ্নিত করা হয়। আকাশের ধ্রুব তারাগুলোর যে চিত্র (Guide Star Catalogue, Space Telescope Science Institute) তৈরি করা আছে বিজ্ঞানীদের কাছে, তা ব্যবহার করে, জটিল হিসাব-নিকাশের মাধ্যমে হাবলকে ঐ নির্দিষ্ট দিকে ফেরানো হয়। তারপর টার্গেটকে মাঝখানে রেখে ধ্রুব তারাগুলো অনুযায়ী হাবলকে লক্‌ করা হয়। তারপর ছবি তোলা হয়। ডিজিটাল ছবি কিন্তু আসলে কোটি কোটি গাণিতিক সংখ্যা। হাবল সেগুলো ওখানেই সংরক্ষণ করে, তারপর দৈনিক কয়েকবারে সেগুলো পৃথিবীতে পাঠায়।

পৃথিবীর চারপাশে ঘুরতে ঘুরতে হাবল যোগাযোগ করে নিকটবর্তি, তারই মতো ঘুরতে থাকা কোনো স্যাটেলাইটের সাথে। উপাত্তগুলো পাঠায় তার কাছে। সেই স্যাটেলাইট পাঠায় নিউ ম্যাক্সিকো’র হায়াইট স্যান্ড্‌সে অবস্থিত গ্রাউন্ড স্টেশনে। সেখান থেকে তা রিলে করা হয় গডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টারে। সেখানে নিখুঁতভাবে উপাত্ত গ্রহণের পর তা পাঠানো হয় স্পেস টেলিস্কোপ সায়েন্স ইন্সটিটিউটে উপাত্তগুলো থেকে ছবি বের করার জন্য। “ছবি” বলতে এখানে শুধু ছবিই নয়, বরং বিজ্ঞানসম্মত বিশ্লেষণের যাবতীয় উপাত্তও। উপাত্ত থেকে ব্রাইটনেস বা উজ্জ্বলতা, আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য ইত্যাদি বিবেচনা করে উপাত্ত থেকে ছবিতে রূপ দেয়া হয়। কিন্তু সেই ছবিগুলো হয় সাদাকালো। তারপর উপাত্ত অনুযায়ী সাদাকালো ছবিগুলোর বিভিন্ন অংশে আলোর বিভিন্ন মান বসিয়ে ছবির প্রকৃত রঙিন রূপ উদ্ধার করা হয়। কিন্তু এটাও সত্য যে, ছবির সব রং কিন্তু বাস্তবের রং নয়, মানে আপনি স্পেসক্রাফ্‌ট-এ বসে কোনো গ্যালাক্সিকে এই একই রঙে দেখতে পাবেন না, যেমনটা হাবলের ছবিতে দেখা যাচ্ছে। তার কারণ হলো হাবলের ছবিগুলোতে কোনো কোনো রং দেয়া হয় অর্থপূর্ণ কোনো কারণে, কোনো নির্দেশনা বোঝাতে, যেমন: তাপমাত্রা, দূরত্ব, শূণ্যস্থান, গ্যাস ইত্যাদি। তাছাড়া ছবির ক্ষেত্রে খুব কাছাকাছি কোনো গ্যালাক্সি হলে হাবল একবারে তার পুরোটা ধারণ করতে পারে না, তখন সে কয়েকবারে পুরো গ্যালাক্সিটা ধারণ করে। তাই তৈরি করা ছবিগুলো সেসব ক্ষেত্রে জোড়া লাগানো হয় আর বের করে আনা হয় ঐ গ্যালাক্সির পূর্ণাঙ্গ চিত্র। এভাবেই আমাদের সামনে ধরা পড়ে হাবলের তোলা অপূর্ব সব ছবি— মহাকাশের অজানা, অধরা সব অধ্যায়। (হাবলের উপাত্ত থেকে ছবি বানানোর প্রক্রিয়াটি পাওয়া যাবে এই ডকুমেন্টে: PDF^)

অনুধাবন: হাবলের বিভিন্ন ফিল্টার কিভাবে মহাকাশের একই স্থানকে বিভিন্নভাবে দেখায়, তা নিজেই দেখে নেয়া যাবে নিজেই ফিল্টার পরিবর্তন করে করে

হাবলের তোলা ছবি - সাদাকালো থেকে রঙিন [ছবি: ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক]
হাবলের তোলা ছবি – সাদাকালো থেকে রঙিন [ছবি: ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের ইমেইল আপডেট থেকে]

হাবলের পাঠানো এত্তো এত্তো ছবি এই জটিল প্রক্রিয়ায় পূর্ণাঙ্গ রূপ দেওয়া সম্ভব হয় না বলে অনেক ছবিই আর্কাইভ করে রেখে দেয়া হয়েছে বিভিন্ন স্থানে। আপনি চাইলেই সেগুলো বিশেষ প্রক্রিয়ায় রঙিন করে পাঠাতে পারেন, আর সেজন্য রয়েছে ফটোশপের বিশেষ একটি বিনামূল্যের প্লাগইন (FITS Liberator : ডাউনলোড^ব্যবহারবিধি^টিউটোরিয়াল^)। আর ছবি পাওয়া যাবে MAST Archive^, HLA Archive^-এ। (কিন্তু ছবিগুলো পাবলিকলি পাওয়া যায় কিভাবে, তা আমার জানা নেই, সাইটগুলোতে সার্চ খুব জটিল)

এই বিশালাকায় যন্ত্রদানবটি “যন্ত্র” তো, তাই এর কলকব্জার ক্ষয় আছে। উল্টাপাল্টা আচরণ করলে কিংবা ছবি ঝাপসা তুলতে থাকলেই এর মেরামতের দরকার হয়। কিন্তু একটা স্কুলবাসকে ঠেলে গ্যারেজে নেয়া সহজ হলেও পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে ৩৮০ মাইল উঁচুতে বায়ুশূণ্য অবস্থায় থাকা একটা টেলিস্কোপ মেরামত চাট্টিখানি কথা নয়, যেখানে একেক টুকরা লেন্সের ১ মাইক্রোমিটার নড়াচড়ার কারণে ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে পুরো টেলিস্কোপটি। কিন্তু তবু মেরামতের এই ধৈর্যসাধ্য, শ্রমসাধ্য, ব্যয়সাধ্য এবং প্রায়-অসম্ভব কাজটিই নাসা একবার নয়, দুবার নয়, চার চারবার করে সফল হয়েছে। এই কাজটা এতোটাই নিখুঁততার সাথে করতে হয় যে, একটা মাত্র বল্টু যদি ফস্কে যায়, তাহলে হাবলে আঘাত করে তা বড় ধরণের ক্ষতিগ্রস্থ করে দিতে পারে। তাই ১০ মাস, পানির নিচে ভরশূণ্য অবস্থায়, -১৮৪° সেলসিয়াস তাপমাত্রায় প্রশিক্ষণ শেষে এমন উদ্যোগে অগ্রণী হোন বিজ্ঞানীরা। ভুলে গেলে চলবে না, মহাকাশের বায়ুশূণ্য ঐ শীতল পরিবেশে মেরামতকারী বিজ্ঞানীদের পরণে ছিল ভারি-মোটাসোটা গ্লাব্‌স আর আপাদমস্তক বিশেষ পোষাক। কিন্তু তারা সফল হয়েছেন: ডিসেম্বর ১৯৯৩ থেকে ১০ দিনব্যাপী (1: STS-61), ফেব্রুয়ারি ১৯৯৭ (2: STS-82), ডিসেম্বর ১৯৯৯ (3A: STS-103) ও মার্চ ২০০২ (3B: STS-109) এবং মে ২০০৯-এ (4: STS-125)— চারটি মেরামত মিশনেই।

হাবলের অত্যাশ্চর্য এসব ক্ষমতাসত্ত্বেয় হাবল কিন্তু সূর্য আর [সূর্যের সবচেয়ে নিকটবর্তি গ্রহ] শুক্রকে পর্যবেক্ষণ করতে পারে না। হাবল যেহেতু প্রচলিত ধারার ক্যামেরার মতো কাজ করে না, বরং আলো’র মাত্রা ভেদে অনেক বেশি আলো গ্রহণ করে মাত্র, তাই হাবল, ভিডিও করতে পারে না। (হাবলের ভিডিও সংক্রান্ত বিষয়টা আমি হাবলসাইট-কে প্রশ্ন করেছিলাম, তারা আমাকে মেইল করে তার উত্তর পাঠিয়েছিল: পরিশিষ্ট দ্রষ্টব্য) হাবল তার এই দ্রুতগতির কারণে, সবচেয়ে নিকটবর্তি গ্রহ পৃথিবীর কোনো ছবি তুলতে পারে না।

হাবল টেলিস্কোপ, আধুনিক বিজ্ঞানের এক চরম উৎকর্ষ। এর বর্ণনা দিয়ে শেষ করা যাবে না। পাতার পর পাতা লিখে যেতে হবে এর প্রত্যেকটা খুঁটিনাটি লিখতে গেলে। খুব আকর্ষণীয় অথচ আগ্রহোদ্দীপক বিষয়গুলো এখানে তুলে ধরলাম। বাকিটা জানা যাবে হাবল টেলিস্কোপের বৃত্তান্ত নিয়ে তৈরি করা ওয়েবসাইট: www.hubblesite.org থেকে, কিংবা http://hubble.nasa.gov থেকে। আর হাবলের তোলা [পরিশুদ্ধ] কিছু ছবিও দেখা যাবে^

কিছুদিন আগে ৬ জুন ২০১২, যখন শুক্র গ্রহের ট্রানজিট হচ্ছিল, মানে শুক্র গ্রহ সূর্যের সামনে দিয়ে যাচ্ছে- এমনটা পৃথিবী থেকে দেখা যাচ্ছিল, তখন অস্ট্রেলিয়া থেকে দেখা যাচ্ছিল হাবল টেলিস্কোপকেও, সেও একই সময় সূর্যের সামনে দিয়ে যাচ্ছিল। সেই ছবি দেখা যাবে এখানে^

সবকিছুরই যেমন শুরু আছে, আছে তার শেষও। হাবল টেলিস্কোপেরও তেমনি মৃত্যু ঘনিয়ে এসেছে। কেননা হাবল যে উচ্চতায় থেকে ঘুরছে, সেখান থেকে ধীরে ধীরে পৃথিবীর দিকে নেমে আসছে। যদি এভাবে নামতে থাকে, তবে ২০১৯ থেকে ২০৩২ খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝি কোনো এক সময়ে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের মাঝে এসে পড়বে, আর তখন তাকে আটকানো যাবে না, ধেয়ে আসবে মৃত্যুদূত হয়ে পৃথিবীর দিকে একটা বিশাল স্কুলবাস হয়ে। তাই তার আগেই খ্রিস্টীয় ২০১৪ অব্দের কোনো একদিন তাকে টেনে আনা হবে পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে। আকাশে তখন দেখা যাবে উজ্জ্বল এক বিন্দু আলো, উড়ে যাচ্ছে যেনবা কোনো ধূমকেতু বা পরী। তারপর উড়ে গিয়ে আছড়ে পড়বে লোকালয়হীন কোনো মরুতে কিংবা সমুদ্রে। চিরসমাধি হবে এই মহাযজ্ঞের। …অনেকে প্রশ্ন করেন, হাবলকে আছড়ে ফেলে না দিয়ে অনন্ত মহাকাশের দিকে ঠেলে পৃথিবী থেকে বের করে দিলেইতো হয়, তাহলে আজীবন সে ছবি পাঠিয়ে যেতে পারবে। কিন্তু আসলে, হাবলের কর্মক্ষমতা শেষ হয়ে যাবে বলেই তাকে ধ্বংস করা হবে, শেষ নির্যাসটুকু থাকা পর্যন্ত তাকে ব্যবহার করা হবে। তাই বিনষ্ট একটা টেলিস্কোপকে ঠেলে মহাকাশে পাঠানোর আসলে কোনো মানে থাকবে না। হাবলকে তাই মরতেই হবে।

কিন্তু যেখানেই প্রবীণের শেষ, সেখান থেকেই নবীনের উত্থান। হাবল হারিয়ে যাবে, তাতে কী হয়েছে, তার জায়গা করে নিতে বেড়ে উঠছে হাবলের উত্তরসুরী। নিখুঁতভাবে তৈরি হচ্ছে তার প্রতিটা বিন্দু। অপেক্ষায় আছে, কবে পাবে ছাড়পত্র, উঠে যাবে পৃথিবী ছাড়িয়ে, মহাকাশের ঐ অনন্ত লোকালয়হীনতায়। যুদ্ধের নয়, মহাকাশ বিজয়ের দামামা ঐ শোনা যাচ্ছে হাবলের উত্তরসুরীর মুখে…। বাজিছে দামামা, উড়িছে কেতন, আসিছে আসিছে আসিছে নূতন… আসিছে ভূবন ভরায়ে।

আগামী পর্বে বাকিটা…

-মঈনুল ইসলাম

পরের পর্ব »


পরিশিষ্ট

প্রশ্ন

Hubblesite.org’র FAQ-তে উত্তর না পেয়ে আমি আমার প্রশ্নটি ই-মেইল করে পাঠিয়েছিলাম তাঁদেরকে। তাঁরা আমাকে ফিরতি মেইলে এর উত্তর দিয়েছিল। আমার প্রশ্নটা ছিল:

হাবল কেন ভিডিও করতে পারে না?

উত্তর

Because Hubble is a telescope, which means it works by using a large mirror to collect more light than the human eye can on its own. A video camera would not work the same way.

You can find out how Hubble works here: http://hubblesite.org/the_telescope/nuts_.and._bolts/

Best wishes

HubbleSite

মন্তব্য করুন