মন্দের ভালোয় নরম গরম সিলেট ভ্রমণ ২০০৭ ২/৩

« আগের পর্ব

ঘোড়াশালেই আমাদের গাড়িটা গিয়ে উঠে পড়লো একটা আইসক্রিমের ত্রিচক্রযানের উপর। কোনো রকমে নিজেদেরকে নিয়ে যখন গাড়ি পালাতে উদ্যত, তখন সামনে পথ আটকালো ট্রাফিক সার্জেন্ট। গাড়ি থামতেই দুই বন্ধু নেমে গেলো ব্যাপারটার দফারফা করার জন্য। শুরুতেই সার্জেন্টকে উৎকোচ সাধলো দুজনে। এরই ফাঁকে আইসক্রিমওয়ালাকে পঞ্চাশ টাকা দিয়ে বিদায় করে দিলো পণ্ডিত বাদল, যাতে ব্যাপারটা ঘোরতর না হয়। ওদিকে মনির নিজের গাড়ির জন্য মরিয়া হয়ে কথা বলছে সার্জেন্টের সাথে। সার্জেন্ট একসময় বাদলের দিকে তাকিয়ে বললো, ‘আপনি না গাড়ি চালায়তেছিলেন, আপনার লাইসেন্স দেখান।’

মনিরের মুখ বিবর্ণ হয়ে গেলো, লিগ্যাল পদ্ধতিতে অগ্রসর হচ্ছে সার্জেন্ট, এখন অবশ্যই লিগ্যাল চালই তাদের চালতে হবে। যাহোক ভাগ্য প্রসন্ন, বাদল তার মানিব্যাগ থেকে ড্রাইভিং লাইসেন্সটা বের করে দেখাতে পারলো। পাশাপাশি পণ্ডিত বাদল নিজেকে স্থানীয় লোক বলে পরিচয় দিলো, ‘আমার বাড়ি এই সামনেই, ফটিক মিয়া আমার চাচাতো ভাই।’ (আসলে ফটিক মিয়া ড্রাইভার মনিরের শ্যালক, তার বাড়ি এই ঘোড়াশালেই; আগেই বলেছি মনিরের শ্বশুড়বাড়ি ঘোড়াশালে।) অবশেষে সার্জেন্ট ছেড়ে দিলো বাদলকে, কেননা ফরিয়াদি আইসক্রিমওয়ালাকে খুঁজে পাওয়া গেলো না। শেষ মুহূর্তে বাদল পঞ্চাশ টাকা উৎকোচ দিতে চাইলে, সার্জেন্ট নিলো না।

আবার গাড়ি চললো। এবার নিজেদেরকে জয়ী ভাবতে থাকলো বাদল-মনির দুই বন্ধু; এই ফাঁড়া পার তো হওয়া গেছে। পণ্ডিত বাদল এবারে নিজের পণ্ডিতি জাহির করতে আরম্ভ করলো, ‘দেখলি, তোর শালারে চাচাতো ভাই বানায়া কেমনে পল্টি দিলাম। এলাকার পুলা মনে কইরা সার্জেন্টে ডরাইছে; মনে করছে, যা খাইবো তার তিন ডাবল আবার বাইর করমু; এর লাইগা টাকা নেয় নাই।’

মনির বললো, ‘দেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, ডান্ডা গরম। এর লাইগ্যাই হয়তো টাকা নেয় নাই।’ সে যাই হোক, পণ্ডিত বাদলের মুখে বিজয়ের একটা কৌণিক হাসি। মনিরের মুখ দেখে সে খুশি, না বেজার কিছুই বুঝা যাচ্ছে না। তবে সে যে কিছু একটা ভাবছে, সেটা স্পষ্ট, হয়তো ঘটনাটা আগাগোড়া ভাবছে সে; অন্তর্মুখি মানুষরা এরকমই হয়, কোনো কিছু নিয়ে বলার চেয়ে ভাবতে বেশি পছন্দ করে।

গাড়ি দীর্ঘক্ষণ চললো। একসময় মনির আর বাদল জানালো তারা দুজনেই খাবে। তাই সিদ্ধান্ত হলো, পার্শ্ববর্তী কোনো হোটেল থেকে খেয়ে নিবে। ভালো ভালো হোটেলগুলো পাশ কাটিয়ে তারা চললো আরো সামনে। কারণ পণ্ডিত বাদলের বিশ্বাস, সামনে আ-রো ভা-লো হোটেল আছে। কিন্তু নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাস, তারা যে হোটেলটায় নিয়ে গিয়ে শেষ পর্যন্ত গাড়ি থামালো, সেই হোটেলে তাদের খেতে হলো অর্ধ্বসিদ্ধ সাদা ভাত। সিলেটি একটা প্রবাদ আছে: “না-শুক্‌রির ভাত ফুটি চাউলি।” মানে, যাদের কৃতকর্মে শোকর গোজার নেই, তাদের ভাত অর্ধেক সিদ্ধ হয়। প্রবাদটার বাস্তব প্রতিফলন দেখলাম। পণ্ডিত বাদলকে তার আ-রো ভা-লো হোটেলের লোভের খেসারত দিতে হলো।

সেখানে আমরা তিনজন দুই বন্ধুসহ চা খেলাম। আমেরিকার চাচা কিছুই খাবেন না, তাঁর বিশ্বাস সেগুলো তাঁর শরীরে স্যুট করবে না। তাই তিনি মিনারেল ওয়াটার কিনে খেলেন। কে জানে অনিয়মসিদ্ধ বাংলাদেশের মিনারেল ওয়াটার কতটা নিয়মতান্ত্রিকতার মাঝে পরিশুদ্ধ! …এদিকে কিভাবে জানিনা সেখানকার নিম্নবিত্ত ছেলেমেয়েরা, ভিক্ষুক মহিলারা বুঝে ফেললো এই চাচা বিদেশ ফেরত। তারা গাড়ির জানালা দিয়ে হাত বাড়িয়ে ওনাকে বারবার বিরক্ত করতে লাগলো টাকার জন্য। কোনো রকমে ধমক দিয়ে তাড়ানো হলো। আমরা সেখান থেকে যখন ফের রওয়ানা করলাম, সাড়ে-চারটা বাজে তখন।

পেছনে আমার দুই চাচাকে আমেরিকা-ফেরত চাচা বলছেন, ‘এদেশের মানুষের বদভ্যাস হলো ভিক্ষা করা। প্রত্যেক দিন বারো ঘণ্টা কাজ করুক, সপ্তাহের সাত দিনই কাজ করুক, এদের আর উপোস মরতে হবে না।’ কিন্তু অনিয়মসিদ্ধ বাঙালিকে এরকম নিয়ম বুঝিয়ে লাভ কী হবে, সে ঈশ্বরই জানেন।

আমাদের গাড়ি আবারো চলছে। পথে সূর্যের তাপের তীব্রতার কারণে দূরে রাস্তার মধ্যে মরিচিকা দেখা যাচ্ছে। দূরে পিচঢালা পথের উপর মরিচিকা দেখতে অনেকটা আয়নার মতো লাগছে। রাস্তার সেই আয়নায় সামনে চলা বাস, ট্রাক প্রতিবিম্বিত হচ্ছে। প্রকৃতির এই বিশুদ্ধ কম্পমান আয়না দেখতে লাগছেও অবশ্য বেশ! আমি অনেকক্ষণ ধরে উপভোগ করলাম এই সৌন্দর্য্য।

রাস্তা ধরে চলা দুই সাইকেল আরোহী পরস্পরের সাথে গল্প করতে করতে পাশাপাশি সাইকেল চালাচ্ছে। আমার মনে হলো, তারা দুজনেই বন্ধু। বন্ধুত্বের গল্পের কোনো শেষ নেই। আমার দুপাশে বসা দুই বন্ধুকেই তো দেখছি। এদের গল্প যেন শেষই হবার নয়। কোনো না কোনো বিষয়ে গল্প চলছেই তাদের মাঝে। কখনও বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কথা, কখনও সেনাবাহিনীর কথা, কখনও গাড়ির গ্যারেজের কথা, কখনও গাড়ির দরদামের কথা, কখনও যাতায়াত ব্যবস্থার কথা। তবে পণ্ডিত বাদলের একটাই আক্ষেপ, সরকার কেন পথে অন্তত একটা সিএনজি পাম্প দিলো না। তার এই আক্ষেপের সাথে মনিরেরও আক্ষেপ যেন মিলে গেলো। দুজনের কথার মিল হওয়ায় তাদের বাতচিৎ এই বিষয় নিয়েই চলতে থাকলো। আর আমি নীরব শ্রোতা। পণ্ডিত বাদল গাড়ি চালিয়ে চালিয়ে বাকচারিতায় অংশগ্রহণ করছে।

আমাদের গাড়ি এবারে হবিগঞ্জ এলাকায় পড়েছে। ইতোমধ্যে দুই বন্ধুর মধ্যে একটা সূক্ষ্ম প্রবণতা কাজ করছে, দুজনেই উৎসুক হয়ে রাস্তার পাশে লাগানো মাইলেজ পিলারগুলোর দিকে তাকাচ্ছে। তারা দুজনে আবারো হিসাব করার চেষ্টা করছে, কুলাউড়া আর কতদূর (মানে, পণ্ডিতের পরিচিত এলাকা)?

হবিগঞ্জের একটা বাজারের ভিতর দিয়ে গিয়েছে রাস্তা। সেখানে একটা ছোট্ট ব্রিজ পার হতে হয়। ব্রিজের উপর একটা আইল্যান্ড। স্বভাবতই বাংলাদেশে বাম-হস্তচালিত ড্রাইভিং সিস্টেমে রাস্তার বামদিকে গাড়ি চলে। কিন্তু আমাদের সামনের মাইক্রোবাসটা কী কারণে জানিনা ডানদিকের লেনে ঢুকে পড়লো। যেহেতু পণ্ডিত গাড়ি চালাচ্ছিল, সেও ভাবলো পথটা বোধহয় ডানদিকে গেছে; সেও নিয়ে সামনের গাড়ির পিছনে রাখলো আমাদের গাড়ি।

আর, মুহূর্তের মধ্যে ঘটে গেলো কয়েকটি ঘটনা… দুর্ঘটনা।

সামনের গাড়িটা ডানদিকের লেনে ঢুকতেই বিপরীত দিক থেকে সামনে এসে হাজির হলো একটা বিশালাকায় ট্রাক, স্থানীয় ভাষায় এদেরকে ‘ডিষ্টিক’ বলা হয়; আমি জানি ‘ইন্টার-ডিস্ট্রিক্ট ট্রাক’ থেকে ‘ডিস্ট্রিক’ হয়ে এসেছে এই বিবর্তিত ‘ডিষ্টিক’। বিশাল বপু ট্রাকটা সামনে আসতেই সামনের গাড়ির ড্রাইভার ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। ওদিকে পণ্ডিত বাদল যেই বুঝলো সে ভুল পথে এসে দাঁড়িয়েছে, ওমনি সে বামদিকের লেনে যাবার জন্য স্টিয়ারিং ঘুরাতে লাগলো। এমন সময় সামনের গাড়িটা পিছু হটতে লাগলো- মাত্র এক মুহূর্তের কথা বলছি। পেছনে আসার দুটি কারণ থাকতে পারে, হয় সে ব্যাক-গিয়ার দিয়েছে, নতুবা হ্যান্ডব্রেক না থাকায় ঢালু জায়গার কারণে গাড়িটা পেছন দিকে আপনাআপনি চলে আসছে। যা-ই হোক, আমাদের পণ্ডিত ভাবলো ওই গাড়িটা আমাদের গাড়ির গা অবধি পৌঁছানোর আগেই সে সরে পড়তে পারবে, তাই সে এক্সেলারেটরে চাপ বাড়ালো, গাড়িটা আর এক সেকেন্ড সময় পেলে ঠিকই বেরিয়ে আসতো, কিন্তু ভাগ্য অপ্রসন্ন। পণ্ডিত বাদল আর ড্রাইভার মনির চিৎকার করাসত্ত্বেয় সামনের গাড়িটা সব চিৎকার উপেক্ষা করে এসে আমাদের গাড়িটার মাঝ বরাবর লাগলো, তারপর ছ্যাঁচড়িয়ে গাড়ির গায়ে ঘায়ের সৃষ্টি করে গিয়ে পেছনের বাম্পারটা ভেঙে ক্ষান্ত দিলো। আমরা মুহূর্তের জন্য বিচলিত হলেও অবশেষে আশ্বস্ত হলাম, আমাদের কিছু হয়নি দেখে। আক্রমণকারী গাড়িটিকে দেখা গেলো, সে ঢালু রাস্তা বেয়ে আরো পিছনে সরে যাচ্ছে, বোঝাই যাচ্ছে, গাড়িটার হ্যান্ডব্রেক নেই।

তারপর সেই পরিচিত দৃশ্য: দুই বন্ধুই নেমে গেলো। নিজেদের গাড়ির অবস্থা দেখলো, তারপর আক্রমণকারী গাড়ির ড্রাইভারের সাথে বাকবিতন্ডায় জড়াতে চলে গেলো। আমরা দূর থেকে দেখছি, বাজারের লোকজনও জড়ো হলেন একসাথে। বাকবিতন্ডা শুনে বুঝলাম ওই গাড়ির ড্রাইভার স্থানীয় লোক, তার পক্ষের লোকজনও বেশি। তাদের চাপে পড়ে আমাদের দুই বন্ধু কিছুটা মিইয়ে এসেছে। তাদের সেই মিইয়ে যাওয়াকে আরেকটু ত্বরান্বিত করতে এলাকার মধ্যস্থতাকারীরা এগিয়ে এলেন, তারা মিটমাট করতে চাইলেন, ‘যাওগিরেবা, ইতা হিসাব করি পারতায় না। হুদাহুদি মারামারি করি লাব(লাভ) আছেনি?’ দুই ড্রাইভারের পাশে গিয়ে আমাদের দাঁড়ানো উচিত ছিল, সেজো চাচা চাইছিলেনও; কিন্তু ছোট চাচা বাধা দিলেন। কেননা এধরণের ঝগড়াঝাটি কিছুক্ষণ পরই সাধারণ হিসাব-নিকাশের বাইরে অনেক দূর পর্যন্ত গড়ায়, তখন ঝগড়া রূপ নেয় হাতাহাতিতে। সেই হাতাহাতি রূপ নেয় গোত্রীয় দলাদলিতে, তারপরই সেটা পরিণত হয় গ্রামে গ্রামে রেষারেষিতে- সেসবে জড়ানোর কোনোই মানে হয় না।

দুই বন্ধু গজগজ করতে করতে যেন নিজেদের পরাজয়কে ধিক্কার দিলো মনে মনে। পণ্ডিত আবারো ড্রাইভিং সিটে, ড্রাইভার মনির বাম পাশে, আমি মাঝখানে। এবারে দুজনেই চুপ। মাঝে মাঝেই ড্রাইভার মনির কথা বলছে, তার কণ্ঠে অনুযোগ, ‘তুই কেন্‌ ওই সময় টানটা দিতে গেলি, ওই গাড়ির পিছে রাখলেই তো কিচ্চু অয়না গাড়িটার।’

পণ্ডিত তখন সেই কথা খন্ডানোর চেষ্টা করে, ‘আরে আমি মনে করছিলাম, আমি আগে সাইড কাইটা বাইর হইয়্যা যামু।’ একটু থেমে দোষ দেয় ওই নষ্টা গাড়িটার, ‘ওই শালার হ্যান্ডব্রেক নাই, এর লাইগ্যা আটকাইতে পারে নাই।’

অনেকটা পথ পার হচ্ছে গাড়ি, দুই বন্ধুর মধ্যে মৃদু তর্ক চলছে। ড্রাইভার মনিরের নিজের গাড়ি, তাই তার বুক চিড়ে আঘাত লেগেছে যেন। একটু পর পর দমকে দমকে তার ঐ দুঃসহ স্মৃতি মনে পড়ছে। সে দোষারোপ করছে তার বন্ধুকে। পণ্ডিত অনেকবার আত্মপক্ষ সমর্থন করে একসময় চুপ থাকাই শ্রেয় মনে করলো বোধহয়। একসময় ড্রাইভার মনির গজগজ করলো, ‘তুই আমার ক্ষতি করে দিলি, গাড়ির এই ট্যাপ খাওয়া (চেপে যাওয়া) বডি সারাইতে দুই হাজার ট্যাকা কমসে কম লাগবো।’

পণ্ডিত তখন তখনই তার পাণ্ডিত্যসুলভ উত্তর দিলো, ‘আরে চিন্তা করিস না, আমার বন্ধুর গ্যারেজে নিয়া আসিস, তোরে ফ্রি করাইয়া দিমুনে।’ কথাটা অবিশ্বাস্য হয়ে যাচ্ছে দেখে এবারে যোগ করলো, ‘আচ্ছা যা, যা লাগে আমি লাগাইয়া ঠিক করায়া দিমুনে।’

এভাবেই মৌন ঝড়ে গাড়ি এগিয়ে চলেছে সামনে। যে দুই বন্ধু কথার ফুলঝুরি ছুটিয়ে এতদূর এলো, তাদের হঠাৎ নিশ্চুপ হয়ে যাওয়া সত্যিই বিচিত্র লাগছে। ডানদিকে দূ-রে চা বাগান দেখা যাচ্ছে। আমার বাড়ি সিলেটে, চা-বাগান অনেক দেখেছি, তারপরও এই সৌন্দর্য্য নতুন করে মুগ্ধ করে প্রতিবারই। তাকিয়ে থাকলাম আমি ওদিকে। চা গাছকে ছায়া দেবার জন্য নির্দিষ্ট দূরত্বে বিশেষ গাছ লাগানো হয়, যাদের বলা হয় ‘ছায়াবৃক্ষ’। কিন্তু চা-বাগানের মাথায় ওই দলবাঁধা গাছগুলোকে দেখে ঠিক ‘ছায়াবৃক্ষ’ মনে হলো না। এই গাছগুলোর ওমন অবস্থা কেন? চা-বাগানের পুরোটা মাথার উপর ছেয়ে থাকা গাছগুলো যেন কোনো দুঃখে পুরো রিক্ত বাদামি রঙের হয়ে গেছে। আমি গাড়ির সবার উদ্দেশ্যেই প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিলাম, ‘ওও-ই গাছগুলোর ওরকম অবস্থা কেন? ওগুলো কি রাবার গাছ?’

পণ্ডিত বাদল প্রশ্ন লুফে নিবেই, ‘এইখানে গ্যাস খনি আছে, তাই গ্যাসের লাইগ্যা গাছের পাতা পইড়া গেছে।’ উত্তরটা অবশ্যই আমার মনঃপূত হলো না, কেননা আমার ছোটবেলার স্মৃতির সাথে গ্যাস আছে এমন গ্রামের স্মৃতি জড়িয়ে আছে, সেখানে এমন দৃশ্যতো দেখিনি; সুতরাং উত্তরটা পুরোপুরি ভিত্তিহীন।

তবে উত্তরটা না পেলেও প্রকৃতির এই সাযুজ্য আমাকে মুগ্ধ করলো। গাছগুলোর দিকে তাকিয়ে আমার মনে হলো গাড়ির ভিতরে দুই বন্ধুর মালিন্য যেন প্রকৃতির ঐ রিক্ত, মলিন রূপের সাথে একেবারে মিলে গেছে। আর কেউ এমন কাব্যমাখা দৃষ্টি নিয়ে না দেখলেও আমি দেখলাম। আরেকটু সামনে গিয়েই আমার উত্তরটাও পেয়ে গেলাম: ওগুলো ছিল রাবার গাছ। কেননা এখানে বামদিকে রাস্তার একেবারে ধার ঘেষে দাঁড়িয়ে আছে রাবার বাগান। রাবার গাছগুলোতে ছোট ছোট বাটি লাগানো। গাছগুলোর শাখায় একটা পাতাও অবশিষ্ট নেই বোধহয় শীতের কারণে। তারমানে হয়তো চা-বাগানের আয় বাড়িয়ে নিতে বাগানের মালিক চা গাছের ফাঁকে ফাঁকে রাবার গাছের চাষ করেছেন ওখানে। জানিনা আসলেই এভাবে চা বা রাবারের গুণগত মানের কোনো হেরফের হবে কিনা।

আমাদের গাড়ি শ্রীমঙ্গল এলে গাড়ি রাস্তার পাশে রেখে পণ্ডিত বাদল ড্রাইভার মনিরকে ড্রাইভিং করতে পাঠালো। দুজনে আসন পরিবর্তন করলে ড্রাইভার মনির নতুন করে যাত্রা শুরু করলো। পণ্ডিত বললো, ‘আমি আগেই কইছিলাম, তোর গাড়ি তুই-ই চালা।’ আমার মনে মনে খুব হাসি পেলো, মানুষ নিজের দোষ ঢাকতে কত প্রচেষ্টাই করে!

ড্রাইভার মনির বেশ সামলে গাড়ি চালায়। গাড়ি যখন কুলাউড়া পৌঁছলো তখন মাগরিবের নামায শেষ হয়েছে। কুলাউড়াতে সেদিন ওয়ায মাহফিল। রাস্তার বামদিকের মাঠ জুড়ে পাঞ্জাবি-টুপি পরা লোকে লোকারণ্য। রাস্তায়ও প্রচুর লোক ইতস্তত চলাফেরা করছে, সেজন্য গাড়ি একেবারে রিকশার গতিতে চলছে। মাইকে মাওলানা সাহেবের গলা শোনা যাচ্ছে, তিনি ব্যবসায়ীদের দাবিকৃত রবিবার ছুটির বিরোধিতা করছেন। তাঁর মতে, শুক্রবার ছুটি বাতিল করলে যারা অন্তত শুক্রবার নামাযে যেতো, তারাও স্যুট-টাই খুলে নামায পড়তে যাবেনা। আমাদের গাড়ি আরো সামনে চলে গেলো। সেখানে রাস্তার ডানদিকে দেখা গেলো মেলা বসেছে। এটা এসব এলাকার একটা অবিচ্ছেদ্য ঐতিহ্য। যেখানেই ওয়ায মাহফিল হবে, সেখানে অবশ্যম্ভাবি একটা মেলা বসবে, যেই মেলার আবহ বুঝতে হলে পাঠককে বৈশাখি মেলার কথা ভাবতে হবে। আর এটাও স্পষ্ট যে, চড়কপূজার সময় যেমন চড়ক মেলা বসে, ওয়াজকে মুসলমানরা সেখান থেকে খুব একটা বের করে আনতে পারেননি বঙ্গীয় মুসলমানরা।

গাড়ি কুলাউড়া যেই ছেড়েছে, ওমনি শুরু হলো নতুন উপদ্রব; দুই বন্ধু আমাকে বারবার জিজ্ঞেস করতে লাগলো, ‘কুলাউড়া থেকে বড়লেখা কতদূর?’

আমি অতো হিসাবে না গিয়ে আন্দাজমতো জানালাম, ‘আরো প্রায় পনেরো-ষোল কিলোমিটার।’

কিন্তু পণ্ডিত বাদল আমার কথা মানতে পারলো না, আমি নাকি তাকে আগে বলেছিলাম কুলাউড়া থেকে বিয়ানীবাজারই ষোল কিলোমিটার। তার সাথে আমাদের এ বিষয়ে তর্ক চললো কিছুক্ষণ, অবশ্যই আমি তা বলিনি (আন্দাজেও বলিনি), সে বুঝতে ভুল করেছে। একসময় বাকবিতন্ডা গজগজের পর্যায়ে পৌঁছলো। তাদের দুই বন্ধুর কথাবার্তা শুনে মনে হলো, লোকগুলো ভালো না, এদের সাথে কথা কাটাকাটি করা ঠিক হবে না। এখন হয়তো আমার পরিচিত এলাকায় রয়েছি, ঢাকায় গেলে এরা নিজেদের লোক নিয়ে আমাদের চাইলে দুমিনিটেই ঠ্যাঙ্গাতে পারে। তাদের এই বাকবিতন্ডায় আমরা একসময় বড়লেখায় পৌঁছলাম। সেখানে একটা সাইনবোর্ডে মাইলেজ লেখা রয়েছে, ড্রাইভার মনির গাড়ি থামিয়ে ভালো করে হিসাব করে নিলো: এখান থেকে বিয়ানীবাজার আরো ২০ কিলোমিটার, সিলেট ৬৮ কিলোমিটার।

সিট বদলে, ছোট চাচাকে সামনে দিয়ে আমি মাঝের সারিতে চলে এলাম। এবারে শুনলাম, ছোট চাচার সাথে তাদের বাকবিতন্ডা চলছে। এভাবেই বাকবিতন্ডার মধ্যে দিয়ে আমরা বিয়ানীবাজার বাজারে গিয়ে পৌঁছলাম। সেখানে গিয়ে আমার চক্ষু চড়কগাছ। পুরো বাজারটা যেন কালবৈশাখি ঝড়ে তচনচ হয়ে আছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ অভিযানের আওতায় বড় বড় বিল্ডিংও ধ্বসিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়া হয়েছে। যেন বিল্ডিংগুলো মাটির সাথে কথা বলার জন্য ঝুঁকে নেমে এসেছে।

আমেরিকার চাচাকে তাঁর বাড়িতে পৌঁছে দিলাম রাত ৮টায়; যেখানে আমাদের হিসাবে পৌঁছানোর কথা ছিল বিকেল ৫টায়। ও-বাড়িতে গিয়ে আমি আর ছোট চাচা দুজনেই সিদ্ধান্তে পৌঁছলাম, এই লোক দুজন ভালো নাও হতে পারে (যেহেতু আমারই মতো ছোট চাচাও গাড়ির সামনে বসায় তাদের আচরণের প্রকৃতি সম্পর্কে আঁচ করতে পেরেছিলেন)। সারা রাত এদের সাথে ড্রাইভ করে যাওয়া মোটেই নিরাপদ হবে না। তাছাড়া ছোট চাচার সাথে প্রায় এগারো হাজার টাকা (আপৎকালীন সমস্যা মেটানোর জন্যে)। আমেরিকার চাচা আমাদের কিছু টাকা দিলেন, তিনিও মনে করছেন এদের সাথে ফেরা ঠিক হবে না; টাকা দিলেন, যাতে আমরা বিকল্প পথে ঢাকা ফিরি।

ওদিকে দুই বন্ধু ঠিক করেছে, সিলেট শহরে যাবে, সেখান থেকে গ্যাস নিয়ে তবে ফিরবে। আমি বুঝতে পারলাম, এভাবেই তারা নিজেদের ক্ষতিটুকু পুষিয়ে নেবার চেষ্টা করছে। আমরা ঠিক করলাম তিনজনে এদের সাথে সিলেট পর্যন্ত যাব। সেখানে রাতে কোনো হোটেলে থেকে ভোরের ট্রেনে বা বাসে করে ঢাকা ফিরবো। আমরা ও-বাড়িতে চা-বিস্কুট খেয়ে আবার রওয়ানা করলাম সিলেট শহরের উদ্দেশ্যে। গাড়িতে সামনে দুই বন্ধু, মাঝখানে আমরা তিনজন- সেজ চাচা, ছোট চাচা আর আমি। শীতের কারণে ইতোমধ্যেই জড়িয়ে নিয়েছি শীতের কাপড়।

কিন্তু ঘটনা সবে তো শুরু…

-মঈনুল ইসলাম

[email protected]

শেষ পর্ব »

মন্তব্য করুন