সেন্ট মার্টিন ভ্রমণ ২০১৪ (২)

ধারাবাহিক:  সেন্ট মার্টিন ভ্রমণ —এর একটি পর্ব

« আগের পর্ব

আমরা যখন সেন্ট মার্টিন পৌঁছে প্রথম দিন অতিবাহিত করা শেষ, তখনও রাস্তায় রয়েছে ঘুরবাজের হেকটিক ভ্রমণ দল। টেকনাফে, বিজিবি তাদের ট্রলার ছাড়ার অনুমতি দিল না, তারপর অনেক কাকুতি-মিনতি করে তারা যখন যাত্রা করবার অনুমতি পেল, তখন আঁধার নেমেছে চরাচরে… নাফ নদীতে… বঙ্গোপসাগরে…

সূর্য অস্ত যাবার কিছুক্ষণ আগে টেকনাফে পৌঁছালো আমাদের ঘুরবাজ দল। টেকনাফ থেকে ট্রলার পাওয়া গেল ঠিকই, কিন্তু নিয়মতান্ত্রিকভাবে বিজিবি, নিরাপত্তার খাতিরে বিকাল ৫টার পরে কোনো ট্রলার ছাড়ার অনুমতি দেয় না। বিজিবি সেখানে সিরিয়াল ডেকে ডেকে ট্রলার ঘাটে ঢোকায়, হিসাব রাখে। হিসাবে ভুল দেখা দিলেই বুঝে নেয় ট্রলারটা বিপদে পড়েছে, তখন কোস্টগার্ড আর নৌবাহিনীকে জানায় তারা। এদিকে ঘুরবাজ নিজেদের অবস্থার সর্বোচ্চ হাল তুলে ধরে কাকুতি-মিনতি চালিয়ে গেল। অবশেষে প্রায় ২৫ মিনিট আটকে রেখে, তাদের অবস্থা বুঝতে পারে, এবং উদ্দেশ্য সাধু বুঝে নিয়ে বিজিবি বিশেষ বিবেচনায় তাদেরকে অনুমতি দিল। ৭টা বাজার কিছুক্ষণ আগে রাতের অন্ধকারে ট্রলার যাত্রা শুরু করলো ঘুরবাজ আর বন্ধুদেরকে নিয়ে।

সন্ধ্যালগ্নে ট্রলারে টেকনাফ ছাড়ছে হেকটিক ভ্রমণ দল (ছবি: দানিয়েল)
সন্ধ্যালগ্নে ট্রলারে টেকনাফ ছাড়ছে হেকটিক ভ্রমণ দল (ছবি: দানিয়েল)

পুরো ঘটনাটাই অজানা লেকের অভিযানের অনুরূপ ঘটছে দেখে অভিযাত্রীরা বেশ বিস্মিত। তবে ঝুঁকির সাথে যেমন থাকে বিপদ, তেমনি থাকে রোমাঞ্চ আর নতুন অভিজ্ঞতা। ঘুটঘুটে কালো অন্ধকার নাফ নদীর বুক চিরে এগিয়ে চলেছে ট্রলার, ডানে টেকনাফের বাতি হারিয়ে গেছে, বামে মিয়ানমারের বাতি দেখা যাচ্ছে দূরে। এছাড়া সব অন্ধকার। নাকিব, ট্রলারের মাঝির কাছে জানতে চাইলো, কিভাবে অন্ধকারে পথ দেখেন তাঁরা? জানালেন, এখানে মিয়ানমারের বাতি দেখে ঠাহর করা যায়, মাঝ সমুদ্রে তারা (stars) দেখে দেখে, আর সেন্ট মার্টিনের কাছে গেলে দ্বীপের বাতিঘরের আলো দেখে পথ চিনেন তাঁরা। মেঘলা রাতে কিভাবে পথ চেনেন, সে প্রশ্নটা করা হয়নি নাকিবের। নাফ ছেড়ে যখন সমুদ্রে উঠলো ট্রলার, নাকিবের বর্ণনায় জানা যায়, ট্রলার কিছুটা লাফানো শুরু করে।

আরো কিছুদূর যাবার পরে হঠাৎ নাকিব আবিষ্কার করে, ট্রলারের দুপাশে সমুদ্রের পানিতে কিসের যেন আলো জ্বলছে। অমাবশ্যার ঘুটঘুটে অন্ধকার সমুদ্র, দূউউরে কোনো জাহাজের কিংবা ট্রলারের বাতি হয়তো দেখা যাচ্ছে, আর ট্রলারের পুচ্ছে একটা মৃদু সবুজ বাতি জ্বলছে নিজের অবস্থান সমুদ্রের মধ্যে জানান দিতে। পানিতে এভাবে আলো জ্বলার কথা না। নাকিব লক্ষ করলো, ট্রলারটা যখন লাফিয়ে উঠছে, আলো মিইয়ে আসছে, আবার যখন জলের সংস্পর্শ পাচ্ছে, আলো দেখা যাচ্ছে। ইফতির বক্তব্য হলো আলোটা বেশ পরিষ্কার ছিল, হাতের লোম পর্যন্ত দেখা যাচ্ছিল। ইফতি মাছ পর্যন্ত দেখেছে বলে জানিয়েছে। নাকিব বলছে ঐ আলোয় সে হাতঘড়িতে পৌনে আটটা বাজতে দেখেছে। নাকিব বলেছে সে যখন পিছনে তাকিয়েছে, তখন অন্ধকার সমুদ্রে প্রপেলারে কেটে আসা সাদা ফেনার এক সরলরেখা দেখেছে। আলোটার উৎস রহস্যজনক, যদি ফেনিল জলে কোনো আলো প্রতিফলিত হয়ই… কোন আলো প্রতিফলিত হবে, কোনো আলোতো ছিলই না। এমনই অদ্ভুত আলোর দৃশ্য এসেছে ‘লাইফ-অফ-পাই’ চলচ্চিত্রে…। তবে আলোর বর্ণনায় পরস্পর-বিরোধী কথাও পাওয়া গেছে – ইফতি বলেছে, আলোটা সাদাটে, তবে হালকা সবুজাভ আভা ছিল; আর নাকিব বলেছে সাদার মধ্যে হা-লকা নীলাভ।

আলোর রহস্য সমাধান করবার দায়িত্ব তো আর সম্মোহিত কারো দ্বারা সম্ভব নয়, দরকার প্রশ্নালু মনের একজন— শোনা যাক দানিয়েলের মুখ থেকে (হুবহু ওর ফেসবুক বার্তা থেকে লিখছি): ‘আমি, আজিজ, আদিল, রাসেল, আমরা তখন ট্রলারের একেবারে সামনে, বাকিরা ট্রলারের পেছনের দিকে কিঞ্চিত ভয়ে কুঁকড়ে আছে। আমরা সবাই খুব মজা করে গান গাইছি সাগরে তখন একটু একটু ঢেউ। যখন আমরা গানে একদম মগ্ন, হঠাৎ রাসেল আমাকে ডাকলো, ও’ তখন ট্রলারের একপাশে নুয়ে কী যেন দেখছে, আমি কাছে যেতেই দেখলাম এক অভাবনীয় দৃশ্যএই জিনিষ আমি ডিসকভারিতে দেখেছি বহু আগেই, কিন্তু এইভাবে সামনাসামনি দেখতে পাব আমি তা কখনোই ভাবিনি। দেখলাম ট্রলারের সাথে ক্রমাগত আছড়ে পড়া ঢেউগুলো যেন আগুনের মত জ্বলজ্বল করছে। একটা মুহূর্ত আমি যেন বাকরুদ্ধ হয়ে রইলাম। পরমুহুর্তেই বুঝতে পারলাম ঘটনাটা প্ল্যাঙ্কটনের কাণ্ড। হঠাৎ মাথায় দুষ্ট বুদ্ধি চাপল, দৌড়ে গেলাম ট্রলারের একেবারে পেছনে, ঠিক যা ভেবেছিলাম, ট্রলারের প্রপেলারের ধাক্কায় প্ল্যাঙ্কটনগুলো ঠিক যেন রকেটের মত ছুটে বেরোচ্ছে। রাতের সমুদ্রে এ এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা!’ (দানিয়েলের কথাটা আমরা খুব সহজেই প্রমাণ করে ফেলতে পারি…)

যাহোক এই অপূর্ব দৃশ্য দেখতে দেখতে নিজেদের সুদীর্ঘ যাত্রাপথের ক্লান্তি কখন যে মিইয়ে এসেছে তাদের, টেরই পায়নি তারা। তবে নাকিব বলেছে, সে আর্দ্রতার কারণে কিনা জানে না, ঘামছিল ট্রলারে বসে। দূরে দেখা যেতে লাগলো একটা বড়সড় জাহাজ, এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে (ওটা আসলে নৌবাহিনীর ঐ জাহাজটি)। আর সেন্ট মার্টিনের বাতিঘরের আলো দেখা যাচ্ছিলো। একসময় তাদের ট্রলারটা সেন্ট মার্টিনের জেটিতে নোঙর করলো।

যাবার পরে:

  • ভাটার সময় সমুদ্রে না নামা উত্তম। কারণ ভাটার সময় পানি তীরে আসে, তারপর চলে যায়, আবার আসতে চায় কিন্তু চলে যায়, আসতে চায় কিন্তু নেমে যায়। জোয়ারের সময় পানি তীরে আসে, চলে যেতে চায়, কিন্তু আবার আসে, নেমে যেতে চায়, কিন্তু আবার আসে। তাই ভাটা হলে তা আপনাকে সমুদ্রের দিকে নিয়ে যাবার সম্ভাবনা বেশি
  • পায়ে রাবারের জুতা পরে সমুদ্রে নামুন, কারণ সেখানে পায়ের নিচে এখানে-ওখানে প্রবাল ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, প্রবাল খুব ধারালো এবং আপনার পা কেটে দফারফা করে দিতে পারে, পড়ে গেলে হাত, মাথাও রেহাই পাবে না
  • ডাব খান- পানি, শ্বাস -যেভাবে পারেন। ৳৩০-৳৪০ [টাকায়] ভালো ডাব পাবেন, টাটকা আর প্রাকৃতিক
  • দ্বীপের কোনো কোনো নির্জন অংশে কচ্ছপ/কাছিমের নিরাপদ প্রজনন (জন্মদান) সুবিধা দিতে নির্জনতা দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, সেখানে রাতের বেলা বাতি জ্বালবেন না, আর দিনের বেলা ভিড় করবেন না। তাদেরকে তাদের মতো করে থাকতে দিন, দ্বীপের জীববৈচিত্র্য স্বাভাবিক রাখতে, দ্বীপকে স্বাভাবিক রাখতে এদের নিরাপদ বিচরণের সুযোগ করে দিয়ে সরে পড়ুন – পথ আগলে দাঁড়াবেন না
  • পানিতে জোয়ারের সময় প্রচুর জেলিফিশ পাবেন, এরা আপনার উদলা গায়ে মারাত্মক ইলেক্ট্রিক শক দিবে। চোখে পড়লে এদের থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখুন
  • সাধারণত হোটেলগুলোতে চায়ের ব্যবস্থা থাকে, কিন্তু এখানে অধিকাংশ হোটেলে নাস্তার ব্যবস্থা থাকলেও চায়ের ব্যবস্থা নেই কিংবা অপ্রতুল (আমাদের অভিজ্ঞতায় তাই দেখলাম আরকি)
  • এটা একটা দ্বীপ, সৈকতে ঘুরুন, কারণ চারদিকেই সৈকত – কিন্তু পলিথিনজাতীয় কিছু কিংবা আবর্জনা ফেলবেন না, সঙ্গে করে নিয়ে আসুন

এবারে পুরো কটেজটা গমগম করছে। জেনারেটর ছাড়া হয়েছে (ঠিক করা হয়েছে মনে হয়)। সবাই-ই যে যার মতো ফ্রেশ হলো। তারপর ময়নামতিতে খাবার খেতে গেলাম সবাই। দিনের মতোই দেড়শ’ টাকার প্যাকেজে খাওয়া-দাওয়া। খাওয়া-দাওয়া শেষ হলো – ভাতে সামান্য গন্ধ লাগছিল। যাহোক, ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময় (গদ্যময় কেন বলা হয়, আমি জানি না – ক্ষুধা লাগলে তো সব মজা লাগে, সেক্ষেত্রে পদ্যময় হতে পারতো…)। খাওয়া শেষ হতেই দেখি, একপাশে, স্থানীয় ক’জন বাউল কর্তাল, দোতারা আর ঢোল নিয়ে গানের আসর বসিয়েছেন। আমাদের আদিল বাবাজি দেখি এগিয়ে গিয়ে সেখানে নাচ শুরু করে দিল। তার সাথে যোগ দিল মুনিমও। একটু পরে দেখি শান্তও গলা মেলাচ্ছে। ওর আবার লালন আর বাউল গানে বেশ আগ্রহ আছে, গানের গলাও ভাল। গান শেষ হলো, কিন্তু শেষ হলো না – এবারে স্বয়ং শান্ত বাবাজি বাউল গান ধরলো – বাদক দল তাল মেলালো। আর দলগত নৃত্য তো চলতেই থাকলো – তাদের নাচের মুদ্রা দেখে আমরা একেকজন আরেকজনের গায়ে হেসে গড়িয়ে পড়ছি। কোমর দুলিয়ে দুলিয়ে, কিংবা সাপের মতো ফনা ধরে নাচ, কিংবা পিঠে পিঠে দুলুনি নাচ – সে যে কত রকম বিচিত্র ভঙ্গি। পিছনে হাসির শব্দ শুনে তাকিয়ে দেখি, এখানকার বোর্ডাররাও দূরে চেয়ার পেতে বসে এই আজিব নৃত্য উপভোগ করছেন আর হেসে গড়াগড়ি খাচ্ছেন। নাকিব ভাই আবার গিটার বাদনে ওস্তাদ – বিডিগিটার ওয়েবসাইটের প্রবক্তা সে – এবারে সে কনফিডেন্সের সাথে গিয়ে দোতারা হাতে নিল – ভাবটা এমন – সে না পারলে পারবে কে? কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যে আমাদের এই আধুনিক যন্ত্রশিল্পী হার মানলো আমাদের গ্রামীণ ওস্তাদদের কাছে – এই যন্ত্রে পাঁচ তারের বদলে শ্রেফ দুটো তারে সুর তোলা – ধারণার এক আমূল পরিবর্তন। …অনেকক্ষণ নর্তন-কুর্দন শেষে গায়ের জামা খুলেও চললো আরো কিছুক্ষণ। আমি তো এদেরকে দেখে অবাক – টানা এগারো ঘন্টা জার্নি করেও এত্তো এনার্জি এরা পায় কোথায় – সব হরলিক্‌স খাওয়া পাবলিক একেকটা! 😮

নর্তনকুর্দন শেষ করে এবারে রাতের অন্ধকারে সমুদ্র সৈকতে বিচরণ। মাথার উপরে অগণিত তারা, আর সামনে জোয়ারের প্রবল টানে এইতো এক্কেবারে সামনে এগিয়ে এসেছে সমুদ্রটা। বেশ কিছুটা সময় সমুদ্রে কাটিয়ে ফিরলাম কটেজে। যারা তাঁবু এনেছে, তারা সবাই এবারে সৈকতে তাঁবু খাটাবে। আমি সেদিন রাতে তাঁবু খাটানো থেকে বিরত থাকলাম, কারণ আমার গিন্নীর ঘুম দরকার, এর আবার মাথাব্যথা শুরু হলে ট্যুরটাই মাটি হয়ে যাবে – তাঁবুতে নতুন পরিবেশে যদি দুশ্চিন্তায় ঘুমই না হয়!

প্রবাল দ্বীপে তাঁবুর সারি - রাত্রি যাপনে প্রস্তুত হেকটিক দল (ছবি: নিশাচর)
প্রবাল দ্বীপে তাঁবুর সারি – রাত্রি যাপনে প্রস্তুত হেকটিক দল (ছবি: নিশাচর)

তাঁবু টাঙাতে গিয়ে দেখা গেল মহাযজ্ঞ – দুজন তাঁবু নিয়ে গেছে পপ-আপ টেন্ট – ছেড়ে দিলেই দাঁড়িয়ে যায়, কোনো ঝামেলাই নেই। কিন্তু এই তাঁবুর বাজে দিকটা হলো, এগুলো গুছিয়ে ফেলার পর বিশাল একটা রিং হয়ে থাকে, তখন সেগুলো বহন করাটা একটা বোঝা বটে। নাকিব আবার সম্পূর্ণ বাংলাদেশী মেড একটা তাঁবু নিয়ে গেছে, সেটা নিয়ে তার অনেক স্বপ্ন। কিন্তু টাঙাতে গিয়ে দেখা গেল, ওটা সুন্দর করে টাঙাতে হলে ওর দরকার মজবুত চারটা কাঠি-ঘরাণার লাঠি। কটেজ থেকে বাঁশ তুলে নিয়ে সেই চাহিদা পূরণ করা হলো। পপ-আপ টেন্টগুলো দাঁড়িয়ে আছে, আর নাকিব আর ইফতি মিলে ওদের তাঁবু টাঙাতে হিমশিম খাচ্ছে – তাদেরকে নিয়ে তামাশা করছে বাকিরা – শ্রেফ মজা করার জন্যই অবশ্য। অনেকক্ষণ লাগলো তাঁবু টাঙাতে। শাকিলও একই তাঁবু কিনেছে – তাই প্রায় একই ঘটনারই পূণরাবৃত্তি ঘটলো। বেশ সময় নিয়ে দুটো তাঁবু দাঁড়িয়ে গেল।

আমি এতক্ষণ ওদেরকে সহায়তা করছিলাম। সব শেষ হবার পর আমরা ফিরে এলাম কটেজে। আরো কয়েকজনও থাকলো কটেজের রুমগুলোতে। দশটা পর্যন্ত জেনারেটর চলবে, আমরা অনুরোধ করে সেটাকে এগারোটা পর্যন্ত বর্ধিত করেছিলাম। তাই অন্ধকারে টর্চ জ্বেলে বিছানা করে ঘুমাতে গেলাম। মশা থেকে বাঁচতে ওডোমস মেখে নিলাম। শুতেই প্রচন্ড ক্লান্তিতে কখন যে ঘুমিয়ে গেলাম টেরই পেলাম না। সকালে আশ্চর্য হয়ে আবিষ্কার করলাম, ছয়টার ওঠার কথা ছিল, ছয়টায়ই ঘুম ভেঙে গেছে। আরো আশ্চর্য হলাম, দলের সবগুলোরই একই হাল – উঠে হৈ হল্লা জুড়েছে!

দ্বীপের ভিতর দিয়ে এরকম পাকা সড়ক আছে (ছবি: নিশাচর)
দ্বীপের ভিতর দিয়ে এরকম পাকা সড়ক আছে (ছবি: নিশাচর)

যাহোক সকালের নাস্তা হলো খিচুড়ি আর ডিম সিদ্ধ। রান্নাটা অপূর্ব হয়েছে, বাসি কিছু ছিল না। খাওয়া শেষে, চা না খেয়েই দল রওয়ানা করলো – হেঁটে ছেঁড়াদ্বীপ যাবে। ফারুক ভাই এর আগে আরো দুবার এসেছে সেন্ট মার্টিন, রাসেলও – আমার আর ফারুক ভাইয়ের সিদ্ধান্ত হলো আমরা যে সৈকত ধরে হেঁটেছিলাম গতকাল, আজ সেই সৈকত ধরে যাবো না। তাই দ্বীপের ভিতরের একটা পাকা সড়ক ধরে হাঁটা শুরু হলো। পথে, একদল পর্যটক আদিল আর শান্তকে উদ্দেশ্য করে বললো: ‘গতকালকের নাচটা দারুণ ছিল‍!’ বাহ্! একেকজন ফেমাস হয়ে গেছে একরাত্রেই – মজা লাগলো। সবাই-ই মজা করতে এসেছে আমাদের মতো।

পাকা সড়কগুলো মূল দ্বীপের সমতল থেকে বেশ উঁচু করে বানানো – হয়তো জলোচ্ছাস আর বন্যার প্রকোপ থেকে চলাচলকে নির্বিঘ্ন করতে। হাঁটতে হাঁটতে স্থানীয় ক্লাব বা কিছু একটাতে লেখা দেখলাম:

ছাত্ররা আগামী দিনের ভবিষ্যত, ছাত্রদের টিভি দেখা নিষেধ।

মাছ থেকে শুঁটকি তৈরির একটি ভ্রাম্যমান কারখানা বলা যায় একে (ছবি: নিশাচর)
মাছ থেকে শুঁটকি তৈরির একটি ভ্রাম্যমান কারখানা বলা যায় একে (ছবি: নিশাচর)

সামনে গিয়ে দেখি, বামে ৬নং সেন্ট মার্টিন ইউনিয়ন পরিষদ অফিস। আরেকটু সামনে গিয়ে দেখি আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগার। এবারে বিশাল বিশাল নারিকেল বাগানের ভিতর দিয়ে গিয়ে আমরা বেরিয়ে এলাম সৈকতে। আমি ডানদিকে যাব, এমন সময় সবাই হাহাহাহা করে হাসাহাসি করে উল্টোপথ ধরতে বললো। আমি কোনোভাবেই বুঝতে পারলাম না, কিভাবে ভিতর দিয়ে চলার কারণে আমাদের পথটাই ঘুরে আবার আমাদের সৈকতেই আমাদেরকে নিয়ে এলো – ভেবেছিলাম উল্টোদিকের সৈকতে চলে এসেছি বোধহয়।

সৈকত ধরে হাঁটা শুরু, উদ্দেশ্য ছেঁড়াদিয়া দ্বীপ:

চেরাদিয়া, সেরাদিয়া, ছেঁড়াদিয়া কিংবা ছেঁড়া দ্বীপ, সেন্ট মার্টিন দ্বীপের অবিচ্ছিন্ন ভূখন্ড। জোয়ারের সময় এর সংযোগস্থলটি ডুবে যায় বলে এই দ্বীপটিকে মূল দ্বীপ থেকে ছিন্ন বা ছেঁড়া ধরে নিয়ে আলাদা দ্বীপ কল্পনা করা হয়। মূল দ্বীপ থেকে ছিন্ন থাকে বলেই এখনও প্রবাল দ্বীপের বিলুপ্তপ্রায় কিছু প্রাণীর আবাস আছে এই অংশ ঘিরে।

মাথার উপর প্রচন্ড রোদ, কিন্তু যখন সমুদ্র থেকে বাতাস এসে লাগে, তখন আর তেমন কষ্ট হয় না। কিন্তু তখন বুঝিনি, পরে বুঝেছি: এই রোদ আর নোনা বাতাস আমাদের সবার ত্বকের রং পুড়িয়ে কালো করে ফেলেছে। হাঁটছি তো হাঁটছি, হাঁটছি তো হাঁটছি… ছেঁড়াদ্বীপ যেন আরো দূরে সরে যাচ্ছে। তবে দ্বীপের সৈকত ধরে হাঁটার অভিজ্ঞতাটা অপূর্ব। কোথাও প্রবালের উপর দিয়ে হাঁটতে হয়, তো কোথাও বালুকাবেলা ধরে, তো কোথাও সমুদ্রে পা ডুবিয়ে…। প্রবালের বিবর্তন দেখে দেখে হাঁটতে থাকলে আমার কাছে মনে হতে থাকে আমরা সৃষ্টির প্রারম্ভের দিকে যাচ্ছি – দ্বীপের মধ্যাংশে (মধ্যপাড়ায়) তুলনামূলক প্রাচীন শৈবাল-পাথর দেখেছি; যত সামনে এগোচ্ছি, কোথাও তুলনামূলক কম কালচে, সাদাটে শৈবাল-পাথর দেখছি – সময়ের বিবর্তনে এগুলোই আরো কালচে আর কঠিন হয়ে পাথর হয়ে যাবে।…একসময় ছেঁড়া দ্বীপে পৌঁছলাম আমরা। কিন্তু বুদ্ধু’র দলে কেউই পানি সাথে না নেয়ায় সবারই শক্তি নিঃশেষ হয়ে গেছে। তাই ওখানে গিয়ে পানি পান না করে, একের পর এক ডাব কিনে তার জল আর শ্বাস খাওয়া শুরু করলো। সামান্য একটু নারকেল পাতার ছাউনির মধ্যে বসে সামুদ্রিক বাতাসে ডাব কিনে খাওয়ার মতো মজা আর কিসে আছে, জানি না।

আমরা যখন দ্বীপে, তখন দ্বীপে আরো একটা দল তাঁবু নিয়ে এসেছেন, ট্রেকার ফজলে রাব্বি ভাই দলবল নিয়ে এসেছেন ছেঁড়া দ্বীপেই তাঁবু করে থাকবেন বলে। যাবার আগে কথা হয়েছিল, দেখা হবে ওখানে, কিন্তু তিনি আমাকে না দেখলেও আমি হঠাৎ ওনার ব্যাগ দেখে এক বালককে জিজ্ঞেস করলাম, ওনারা কোথায়? জানলাম, আগেই ব্যাগ পাঠিয়ে দিয়েছেন ওনারা – আসছেন ছেঁড়া দ্বীপে – দেখা আর হলো না, উঠতে হলো আমাদেরকে।

কিন্তু মেজাজ খারাপ হয়ে গেল, যখন পুরো দলই ছেঁড়াদ্বীপের শেষ মাথা অবধি হেঁটে যাবার সিদ্ধান্ত বাতিল করলো। নাকিব একটা ট্রলারের সাথে চুক্তি করলো, সে আমাদেরকে নিয়ে শেষ মাথাটা দেখিয়ে জেটিতে নিয়ে যাবে – হাঁটার শক্তি হারিয়ে ফেলেছে অনেকেই। কী আর করা – পড়েছি মোঘলের হাতে, খানা খেতে হবে সাথে। ট্রলারে উঠতে গিয়ে আবিষ্কার করলাম আবারো ডাকাতের খপ্পরে পড়েছি, ট্রলার তো আর এক্কেবারে তীরে ভিড়তে পারে না, তাই সেই জায়গায় আছে নৌকা, ট্রলারে উঠতে জনপ্রতি গুনতে হয় ৳৩০ [টাকা]।

ছেঁড়াদ্বীপে শাকিল দম্পতি (ছবি: নিশাচর)
ছেঁড়াদ্বীপে শাকিল দম্পতি (ছবি: নিশাচর)

ওখানে হঠাৎ শুনি কি, ‘এই আল জাজিরার সব উঠে পড়েন এক নৌকায়। আল জাজিরা উঠেন। আল জাজিরা উঠেন।’ সবাই দেখি কমলা মতো রঙের গেঞ্জি পরা – আমি তো উঁকিঝুকি শুরু করে দিলাম এদের গায়ে-পিঠে কোথাও আল জাজিরা টেলিভিশনের লগো তো আর দেখি না। হিসাবটা মিললো না। আমরা আমাদের ট্রলারে গিয়ে উঠলাম। ট্রলার ছেড়ে দিলো। তখনই ভেদ ভাঙলো আমার – এখানকার একটা ট্রলারের নাম “আল জাজিরা”। লাও ঠ্যালা!

এভাবে নৌকায় গিয়ে ট্রলারে উঠতে হয় (ছবি: নিশাচর)
এভাবে নৌকায় গিয়ে ট্রলারে উঠতে হয় (ছবি: নিশাচর)

আমার জীবনের দুটা আক্ষেপ- কিওক্রাডাং-এ পা রেখেছি, কিন্তু শিরে উঠিনি, আর ছেঁড়া দ্বীপে এসেছি, অথচ বাংলাদেশের সর্বশেষ মাথাটায় পদচিহ্ন আঁকতে পারলাম না- আফসোস! তাই ট্রলার থেকে কী দেখেছি, সে বর্ণনা দেবার কোনো ইচ্ছা আমার নেই (আমার মেজাজ খারাপ, কথা বলবেন না)। …যাহোক, ছেঁড়াদ্বীপাভিমুখে পদযাত্রা আর কিছু দিক না দিক, আমাদের ফারুক ভাইকে একটা নাম দিয়ে দিয়েছে – ‘আঠাশ বাবা’। কী এক বিচিত্র কারণে দলের মধ্যে তাঁর এই নামকরণ হয়ে গেল, এবং জনপ্রিয়ও হয়ে গেলো। ব্যস, ফারুক নামটা সবাই ভুলে গিয়ে ২৮বাবা ডাকা শুরু করলো।

কটেজে ফিরে আর তর সইলো না – সূর্যস্নানে চ–ল! বল নিয়ে সবাই আমরা সৈকতে শুরু করে দিলাম ফুটবল খেলা। খেলা শেষ করে ঐ ফুটবল নিয়েই নেমে গেলাম সমুদ্রস্নানে। সেখানে ‘ফুটবল’ হয়ে গেল ‘ভলিবল’। তিনজনকে মাঝখানে বানানো হলো চোর, আর বাকিরা তাদেরকে নাচিয়ে একে-ওকে পাস দিতে হবে। দেখা গেল অধিকাংশ সময় জুড়েই আমি মাঝখানে চোরের ভূমিকায় ছিলাম। মজার ব্যাপার ঘটলো যখন আমি চোর থেকে সাধু হই, তখন আর আমাকে কেউ বিশ্বাস করে বল দেয় না, মনে রাখতে পারে না, আমি কি এখনও চোর নাকি সাধু। চোর হলে আর রক্ষে নেই, আমার গিন্নীও তখন আমার প্রতি দয়া পরবশ হয় না।

বুক সমান পানিতে এক ঝাঁক তরুণ-তরুণী, খেলার উত্তেজনায় জোয়ারের মধ্যে সমুদ্রের বেশ কিছুটা গভীর জলে চলে গেলাম। আর তাই, আমাদেরকে বরণ করে নিতে এগিয়ে এলো ঝাঁকে ঝাঁকে জেলিফিশ। জেলিফিশ জিনিসটা দেখতে অপূর্ব, স্বচ্ছ পেলব শরীর, কেমন করে তরঙ্গায়িত স্পন্দনে জলে ভেসে বেড়াচ্ছে তারা। কিন্তু এই বরণ যে সেই বরণ না তা তারা বুঝিয়ে দিলো হঠাৎই একেকজনকে বৈদ্যুতিক শকের মতো আঘাত করে। শ্যাঁৎ করে লাফ দিয়ে উঠে একেকজন এই শক খাওয়ার পরে। তারপরই সসন্দিঘ্ন চোখে দেখতে থাকে আশেপাশের জল। স্বচ্ছ জলে তাদের ভেসে থাকতে দেখলেই দানিয়েল পানিতে জোরে হাত চালিয়ে দূরে সরিয়ে দেয় এগুলোকে আর সাবধান করে দিতে থাকে সবাইকে। কিন্তু খেলায় মত্ত এরা কি আর সেদিকে তাকায়? তাই প্রায় সবাই-ই একবার করে জেলিফিশের শক খেলো, আর আমাদের ২৮বাবা তো তল্পিতল্পা গুটিয়ে সমুদ্র থেকেই দে দৌঁড় – আর নামেননি বেচারা। সে দৃশ্য দেখে আরেকবার হাসির পালা।

কাঁকড়া বাবাজি চোখ মেলে তাকিয়ে আছে আমার হাতে - রাতে এ-ই যাবে আমার পাতে (ছবি: নিশাচর)
কাঁকড়া বাবাজি চোখ মেলে তাকিয়ে আছে আমার হাতে – রাতে এ-ই যাবে আমার পাতে (ছবি: নিশাচর)

গোসল সেরে বিকেলটা কাটিয়ে দেয়া হলো সূর্যাস্ত দেখে, আর কাঁকড়া কিনে। মাছের দাম অত্যধিক মনে হওয়ায় (পর্যটকের চাপ দেখে কিনা আল্লা’ মালুম) মাছের বার্বিকিউ’র সিদ্ধান্তটা বাতিল করে দেয়া হলো। কাঁকড়া জীবনে কখনও খাইনি, খাওয়ার লোভ দীর্ঘদিনের। কিন্তু আমার গিন্নীকে কোনোভাবেই রাজি করাতে পারছি না। শেষ পর্যন্ত আমার যুক্তির কাছে হার মানলেন তিনি – যে যুক্তিতে চিংড়ি খাওয়া যাবে, সেই যুক্তিতে কাঁকড়াও খাওয়া যাবে। কিন্তু শর্ত হলো, আমি খাবো, তিনি খাবেন না। রাতের মেনু হলো: কাঁকড়া, ডিম সেদ্ধ আর ভুনা খিচুড়ি।

কাঁকড়া কিভাবে খেতে হয় – পাতে নিয়ে মোক্ষম প্রশ্নটা করলো আবির। শক্ত আবরণীটা খুলে নিয়ে ভিতরের মাংসতে যখন কামড় বসালাম, তখন আমাকে আর পায় কে? হারিয়ে গেলাম কোথায় যেন – অপূর্ব স্বাদ! মোটা মোটা মাংসল আঁকশিগুলোর ভিতরেও মাংস থাকে। আমি আমার গিন্নীকে বিরক্ত করতে চাইলাম না, আফটার অল, একজন একটা জিনিস পছন্দ করে না, তাকে সেটা জোর করে পছন্দ করানোর কোনো মানে হয় না। আমি যথাসম্ভব আড়াল করে কাঁকড়া খাচ্ছি। পাতে, তাঁর ভাগ, আমার ভাগ দুটোই নিয়েছি। একসময় বললাম, চিংড়ির মতো স্বাদ, দারুণ খেতে। আর আশপাশ থেকে তো উমম, ওয়াও শব্দ আসছেই। শেষে একটু চেখে দেখার লোভ সামলাতে পারলেন না গিন্নী – আর খেয়েই কুপোকাত! এই স্বাদ কি আর এড়িয়ে থাকা যায় – শেষে নিজের পুরো ভাগটাই খেলেন তিনি আমার সাথে ভাগ করে। একটা অপূর্ব অভিজ্ঞতা হলো আমার – জীবনে একটা নতুন জিনিসের স্বাদ নিলাম। ধন্যবাদ নাকিব, ধন্যবাদ ঘুরবাজ।

রাত বিরাতে ফটোসেশন - ফুয়াদ, রাসেল, আবির, আদিল - দ্বীপে তাঁবু যাপন (ছবি: দানিয়েল)
রাত বিরাতে ফটোসেশন – ফুয়াদ, রাসেল, আবির, আদিল – দ্বীপে তাঁবু যাপন (ছবি: দানিয়েল)

আজ রাতে আমিও তাঁবু করবো সৈকতে। আমার গিন্নীর প্রবল উৎসাহ। গতকালকের মতোই দুটো পপ-আপ তাঁবু ফশ করে দাঁড়িয়ে গেল। নাকিব, ইফতি আর ওদিকে শাকিল আর ভাবি মিলে তাদের তাঁবু দাঁড়া করতে কসরত করছেন। আমি, আবুবকরের ধার দেয়া আধুনিক তাঁবুটা বের করলাম। দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের লাঠির মতো ভিতরে-রশি-গোঁজা-কয়েকটা-জোড়া-দন্ড একত্রে জুড়ে নিলে একটা বিশাল দন্ড হয়ে যায়। এরকম দুটো দন্ড তাঁবুর লাইনিং-এর ভিতর দিয়ে ঢুকিয়ে দিয়ে চারপাশের চারটা হুকে আটকে দিতেই তাঁবু তৈরি। তারপর তাঁবুকে বাতাসে উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করতে রয়েছে চারটে আংটা, এগুলো দিয়ে তাঁবুকে মাটির সাথে (এখানে বালির সাথে) পুঁতে দিয়ে আটকে রাখতে হয়। ব্যস কাজ শেষ। পাঁচ মিনিটের মাথায় তাঁবু দাঁড়িয়ে গেল আর এই তাঁবুটা বেশ জনপ্রিয়তা পেল।

চক্র: দানিয়েল, আদিল, রাসেল, ফুয়াদ, আবির (ছবি: দানিয়েলের স্বয়ংক্রীয়)
চক্র: দানিয়েল, আদিল, রাসেল, ফুয়াদ, আবির (ছবি: দানিয়েলের স্বয়ংক্রীয়)

পাঁচটা তাঁবু পাশাপাশি রেখে আবারো নৃত্য-গীতে মেতে উঠলো আদিল, শান্ত, রাসেল, মুনিম, নাকিব আর ইফতি। কয়েকজন আবার তাঁবুর ভিতরে তাশ খেলায় মত্ত হয়ে উঠলো। দানিয়েল তখন ওর ক্যামেরা আর ট্রাইপড নিয়ে সৈকতে হাজির, স্টার-ট্রেইল, মানে তারার গতিপথ তুলবে ক্যামেরায়। সে আসার আগে মোটামুটি পড়ালেখা করে এসেছে: ভালো মানের একাধিক, মানে বেশ ততোধিক ছবি তুলে সেগুলো রেন্ডার করে এরকম স্টারট্রেইল বানানো হয়। অনেকক্ষণ লাগলো সঠিক এক্সপোযার, আইএসও, শাটার স্পীড আর অ্যাপার্চারের কম্বিনেশনটা খুঁজে পেতে। অবশেষে সফল হলো। এবার কাজ হলো এই সেটিংস বজায় রেখে আরো অনেক অনেক ছবি তুলে যাওয়া।

আমি আর জাগতে পারলাম না, ঘুমিয়ে যেতে হবে। সামনে বিশাল সমুদ্রের টানা গর্জন, মাতাল হাওয়া, মাথার উপরে অবারিত আকাশে তারার হাতছানি – অপার্থিব এক পরিবেশ – প্রেমিক হয়ে ওঠে মন। এর মাঝে তাঁবুতে রাত্রিযাপন – সে এক অপূর্ব অনুভূতি – ভুলে যাবার নয়!

বেশ ভোরেই ঘুম ভাঙলো, কিন্তু ফযরটা মিস করে ফেললাম। অনেক লোকজন সৈকত ধরে হেঁটে সমুদ্র দেখছেন। সৈকতে একঝাঁক তাঁবু পাতা দেখে তারা বেশ কৌতুহলী হয়ে তাকাচ্ছেন, হয়তো খানিকটা আফসোসই করছেন।আমাদের তাঁবুটা গুছিয়ে রুমে চলে গেলাম। ফযরের কা’যা নামায পড়ে নিয়ে আরেক দফা ঘুম দিয়ে চাঙা হয়ে উঠলাম।

সকালের নাস্তাটা আজ আর ময়নামতিতে না। গত দুই রাতেই এরা আমাদেরকে বাসি ভাত খাইয়েছে। তাই আজকে বাজারে চলে গেলাম, সেখানে রুটি, ডিম আর ভাজি দিয়ে জম্পেশ খানাদানা শেষ করে শেষবারের মতো দ্বীপে ফটোসেশন করে নিলাম আমরা তিন দম্পতি। …আজকেই ফিরতে হবে আমাদেরকে – আমার গিন্নীর মনটাই খারাপ – আজীবন কি থাকা যায় না এখানে?

এখানে সকাল এগারোটায় রুম ছেড়ে দেয়ার নিয়ম – কিন্তু নাকিবের পরিচিতি আর হৃদ্যতায় কটেজের কর্ণধার আমাদেরকে দুটো রুম ছেড়ে দিতে অনুরোধ করলেন। আমরা দুটো রুম ছেড়ে দিলাম। দুপুরে সীট্রাকে করে বড় একটা পরিবার এসে উঠলো ঐ রুমগুলোতে। আমরা ঠিক করেছি, আমরা ফেরার পথে সীট্রাকে ফেরত যাবো না। নাকিব তাই গতরাতেই একটা ট্রলার ভাড়া করে এসেছে জনপ্রতি ৳১৫০ [টাকা] করে। আমরা ঠিক করেছি আমাদের সীট্রাকের ফিরতি টিকেট বিসর্জন দিয়ে এই ট্রলারেই যাবো – সমুদ্রের উত্তাল রূপটা দেখা লাগবে না?

২৮বাবা, মানে ফারুক ভাই ট্রলারে যাবেন না, ভয়-সংবেদী মানুষ, তিনি সীট্রাকেই উঠলেন। জুম’আর নামায আদায় করে আমরা চললাম ট্রলারে উঠতে। জেটিতে গিয়ে মেজাজটাই খারাপ হয়ে গেল – এতো মানুষ কেন? পাঁচটা জাহাজে উঠার জন্য মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়েছে যেন (কারণ প্রতিদিন তিনটার দিকে সীট্রাকগুলো আবার সেন্ট মার্টিন ছেড়ে যায় টেকনাফে)। প্রচন্ড রোদের মধ্যে আমরা যখন গিয়ে আমাদের ট্রলারে উঠলাম, তখন আমাদের কয়েকজন কোথায় যেন খেতে বসে পড়েছে। আমরা খেলাম না কেন – কে জানে? হয়তো, শুনেছি, ট্রলারে সমুদ্র পাড়ি দিতে গেলে নাকি বমির উদ্রেক হয়। খাওয়া-দাওয়া করলে সে সম্ভাবনা বাড়বে বৈ কমবে না। …এদিকে কান ঝালাফালা করে দিচ্ছে কিছু মানুষ – চিৎকার করছে, হুড়াহুড়ি করছে, যেনবা কিছু একটা হয়ে গেছে। চিৎকারের একটাই রব: ‘কাজল’ ‘কাজল’ ‘ওই কাজল’ ‘এই কাজল’ ‘কাজল’ ‘কাজল’…। পরে বুঝলাম, এই কাজল হলো ঐ পাঁচ জাহাজের একটা – জেটি থেকে ট্রলারে করে লোক নিয়ে কাজলে তুলতে হচ্ছে, কারণ ওটা অন্যান্য জাহাজের পিছনে নোঙর করেছে। অজয় দেবগানের বউ যদি জানতো ওর নামে এতো যিকির হচ্ছে, বেচারি তাহলে আবেগাপ্লুত হয়ে সেন্ট মার্টিনেই বসতি করতো।

ফেরার সময়:

  • নিজের কৃত ময়লা, বিশেষ করে পলিথিন-জাতীয় আবর্জনা নিজের সাথে করে নিয়ে আসুন
  • এখানে-ওখানে প্রবাল (Coral) বিক্রী করে থাকে ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা, কিনবেন না; যদি কিনে থাকেন, সমুদ্রে বিসর্জন দিয়ে আসুন। কারণ আমি একটা, আপনি একটা, তিনি একটা, উনি একটা – এভাবে সেন্ট মার্টিন দ্বীপকে উজাড় করে আমরা আসলে একে বিপন্ন বৈ কিছু করছি না। একে যদি এর প্রতিবেশ, সৌন্দর্য্যসহ বাঁচিয়ে রাখতে পারি, তাহলে আমাদের পরবর্তি প্রজন্মও গিয়ে হাফ ছাড়ার একটা জায়গা পাবে
  • সেন্ট মার্টিন কিংবা টেকনাফ বার্মিজ মার্কেট থেকে পরিবার/আত্মীয়-স্বজনদের জন্য চাইলে কেনাকাটা করতে পারেন, শুঁটকি মাছ কিনতে পারেন। সেন্ট মার্টিন আর টেকনাফে দামের বিস্তর ফারাক চোখে পড়েনি, তবে সেন্ট মার্টিনে বেশি হবার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না

সবাই এসে গেলে ট্রলার তার যাত্রা শুরু করলো। ট্রলারটা বেশ ভালো, উপরে কাপড়ের একটা ছাউনিও আছে। তবে ইঞ্জিনের ভটভট আওয়াজটা কিঞ্চিৎ বিরক্তিকর। ট্রলার চালু হলে পরে সমুদ্রের জল কেটে যখন এগিয়ে চললো, তখন বেশ লাগলো – ছাউনির নিচে বসে, আমাদের উপভোগের শুরু মাত্র – ছেড়ে আসা সেন্ট মার্টিনকে ফেলে যেতে কষ্ট হচ্ছিল, কষ্ট লাগছিল ওদিকে তাকিয়ে, তবে সমুদ্রের ঐ নীল জলে তাকিয়ে মনটা ভরে উঠছিল। আমাদের ট্রলারের সাথে সাথেই পাঁচটা জাহাজ একসাথে জেটি ত্যাগ করলো। কিন্তু ট্রলারটা এগিয়ে থাকলো, কারণ তাকে গভীর জল খুঁজে চলতে হচ্ছে না।

কান ঝালাফালা করা মোটরের আওয়াজ ছাড়া সময়টা উপভোগ্যই বটে। আদিগন্ত সমুদ্রের বুক কেটে চলার অনুভূতিই আলাদা। কিন্তু সমুদ্রের মধ্যে ঢেউয়ের যে দুলুনি আশা করছিলাম, মোটেই তা পাওয়া যাচ্ছে না। জাহাজে আসতে যেমন এসেছিলাম, তার সাথে এই দুলুনির মোটেই ফারাক মনে হচ্ছে না। তবু নতুন একটা অনুভূতিতো হচ্ছে…। ট্রলারের (কিংবা সাম্পানের) পেটগুলো অনেক গভীর হয়, দুই পাশ বেশ উঁচু করে বানানো থাকে – নদীপথের নৌকাগুলোর সাথে এগুলোর বড় পার্থক্য এখানেই। আমরা সেই গভীর পেটের মধ্যে নিজেদের বাক্সপেটরা রেখে দুপাশের রেলিং-এর সাথে লাগোয়া পায়ে-চলা সরু পথটাকে বেঞ্চের মতো ব্যবহার করে বসে আছি। ট্রলারের সামনের দিকটা চৌকো আর উঁচু, আর সেখানে একটা চওড়া পাটাতন আছে। এরকম চওড়া পাটাতন পিছনেও আছে, ওখানে একটা লগি হাতে নিয়ে বসে আছেন আমাদের চালক-মাঝি — ডান-বাম করে নিয়ন্ত্রণ করছেন গতিপথ।

এর মধ্যে কত নাটক মঞ্চায়ন হচ্ছে- কলি দেখা গেল মেকাপ বক্স নিয়ে বিউটি প্যাজেন্ট প্রতিযোগিতায় যেতে চাচ্ছে, আদিল আবার কলির মেমসাহেবী হেটটা পরে ছাতা মাথায় নিয়ে একটু পোয দিয়ে দিলো, শান্ত তখন ড্রাইভারের হাত থেকে লগিটা নিয়ে দুইপা ক্যালিয়ে বেশ একটা উড়াল মাঝি হবার ভান করছে, নাকিব তখন এতোসবে নেই- নিচে রাখা ব্যাগের মধ্যে শুয়ে একটু জিরিয়ে নিচ্ছে। আমরা যখন সমুদ্র থেকে নাফ নদীর কাছাকাছি হচ্ছিলাম, তখন উপরের ছাউনিটা সরিয়ে নেয়া হলো। কড়া রোদ মাথার উপর থাকলেও সমুদ্রের চলতি হওয়ায় তা মোটেও গায়ে বসতে পারছে না।

আমার গিন্নীকে আরেকটু উপভোগ করানোর জন্য নিয়ে গেলাম ট্রলারের একেবারে সামনে, বলা চলে টাইটানিকের যেখানটায় কে’ট আর জ্যাক দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে উড়ছিল। আমরা অবশ্য অতো রোমান্টিক পোয পাবলিকলি দেয়ার চিন্তাও করলাম না। তবে তিনি সেখানে গিয়ে রীতিমতো উল্লসিত – সমুদ্রের আসল স্বাদতো সেখানেই পাওয়া যায়। আমাদেরকে দেখে, যে শান্ত হাঁটু পানিতে নৌকা খামচে বসে থাকে সেই, শান্তও সামনে এসে দাঁড়ালো। আমি হাসছি দেখে জানালো, সে আসলে সাঁতার জানে, কিন্তু ওর জীবনে পানি নিয়ে একটা দুর্ঘটনা আছে, সেখান থেকেই ফোবিয়াটা গেঁথে বসে আছে মনে – তাই পানিতে ঠিক জুৎ করতে পারে না।

এর মধ্যে খবর এলো, আমাদের ২৮বাবা’র এমভি কুতুবদিয়া একটা ডুবোচরে আটকা পড়েছে। আমরা দূর থেকে দেখলাম, একটা বাদে বাকি জাহাজগুলো এগিয়ে আসছে। কিছুক্ষণ হলো আমরা নাফ নদীতে ঢুকেছি, ডানদিকে মিয়ানমার সীমান্ত, আর বামে ঐ দূরে, একটু সামনের দিকে টেকনাফের পাহাড় দেখা যাচ্ছে। একটা জায়গায় দেখা গেলো, সমুদ্রের পানিই সমুদ্রের পানির সাথে আছাড় খাচ্ছে। ইফতি জানালো, এটা হলো নাফ নদীর মোহনা – এখানে এসেই নাফ নদী সমুদ্রে মিশেছে। কিন্তু পরে ছবিগুলো দেখে আন্দাজ করলাম, ইফতি ভুল করেছে। এটা সম্ভবত শাহ পরীর দ্বীপ – যাবার সময় জাহাজ থেকে যুম করে এখানকারই ছবি তুলেছিলাম, এখানে তখন ভূমি দেখা গিয়েছিল, আর পাথরের মধ্যে সমুদ্রের আছড়ে পড়ার দৃশ্য উঠেছিল। এখন পানির নিচে পাথরগুলো থাকায় ওগুলো দেখা যাচ্ছে না, তাই মনে হচ্ছে পানির মধ্যে পানি আছাড় খাচ্ছে।

আমরা যখন ট্রলারের সামনে, ইফতি তখন ট্রলারের এক্কেবারে পিছনে, টয়লেটের মতো ছোট একটা ঘর আছে পিছনে, চালকের বাম পাশে, ওটার উপরে বসে বসে সমুদ্র দেখছে। এই পুরোটা সময় ট্রলারের মধ্যে যে যার অবস্থান থেকে সরলেও শাকিল আর ভাবি, ঐ টয়লেট-মতো ঘরটার সামনে শুরু থেকে শেষ অবধি ঠায় বসেই ছিল। সেন্ট মার্টিনেও আমরা যখন ভলিভল খেলছিলাম বুক সমান পানিতে, তখন শাকিল আর ভাবি ঐ কোমর পানিতে…। তার অবশ্য একটা কারণ আমরা জানি, ভাবি সাঁতার জানেন না, তাই সমুদ্রকে ভয় পান – আর শাকিল বেচারা অগত্যা…।

নাকিব ভাই এই ট্যুরে জনপ্রতি খরচের হিসাব রেখেছে – বেচারা এখনও সেই হিসাব করতেই ব্যস্ত – বেচারার অ্যাকাউন্টিং এমবিএ উসুল। ওদিকে আবির (মানে আজিজ) অনবরত ধূমপান করেই চলেছে (ছ্যাঁকা খেলো নাকি ব্যাটা!)। দানিয়েল কিছুক্ষণ ছবি তোলার চেষ্টা করে কেন জানিনা বিফল হয়ে ক্যামেরা রেখে সমুদ্র উপভোগ করছে। আর দানিয়েল-ভাবি (শারমিন) তখন ঢাকায় নিজের সন্তানের কাছে যেতে পারছেন বলে সমুদ্রের মধ্যেই মনে হয় মানসপটে সন্তানকে দেখছেন। রাসেল বাবাজিকে দূর থেকে মিয়ানমারের সীমানাপ্রহরীরা দূরবিন দিয়ে দেখলে দেখবে সাক্ষাৎ আলকায়েদা জঙ্গী – মাথায় একটা হ্যাট, চোখে রোদচশমা, আর নাক-মুখ গামছা দিয়ে প্যাঁচিয়ে সটান। ক্যামেরা তাক করতে দেখলেই ইমরানের চেহারায় কিছু কাঠিন্য-হাসি (কোষ্ঠকাঠিন্য?) আর ভা-ব আসে, এর মধ্যে ফেসবুকে চেকইন করেছে কিনা খেয়াল করিনি। মুনিম কখনও সামনে, কখনও পিছনে, আসছে-যাচ্ছে। আর আমাদের চশিমুদ্দিন অরফে ফুয়াদ…

সে দেখা গেল ট্রলারের একপাশে হাঁটু মুড়ে বসে… ঝিমাচ্ছে। দেখে মনে হচ্ছে পীরবাবা ধ্যানে আছেন। সেই দৃশ্য দেখে বানর ইফতি গাছ থেকে নেমে এসে তার পাশেই চুপিচুপি সহায়ক বাবা হয়ে বসলো ধ্যানে। বাবার ডানদিকে বসলো সাগরেদ মুনিম। আর বাবার সামনে ফরিয়াদ নিয়ে হাজির আদিল। সে তো নিজের আহাজারি প্রকাশ করতে করতে শেষ পর্যন্ত বাবাকে সিগারেটও সেধে ফেললো। এতে বাবা বেশ প্রসন্ন হয়ে ঈশ্বরের ধ্যানমুক্ত হয়ে ধরায় ফিরে এলেন। পুরো ট্রলার এই দৃশ্য দেখে হাসতে হাসতে দুলতে লাগলো… দুলুনিটা একটু বেশিই…!

নাফ নদীর মোহনায় ঘুরবাজ দল (ছবি: নিশাচর)
নাফ নদীর মোহনায় ঘুরবাজ দল (ছবি: নিশাচর)

আসলে এতক্ষণ পিছু পিছু আসতে থাকলেও জাহাজগুলো আমাদেরকে পাশ কেটে চলে যাচ্ছে, আর যে উত্তাল সমুদ্র দেখবার খায়েশে ট্রলারে চড়েছি, তা খানিকটা দেখিয়ে দিয়ে যাচ্ছে আমাদেরকে। ট্রলারটা ঢেউয়ের দাপটে বেশ অনেকটুকু উঠে আবার সমুদ্রসমতলে পড়ে… সমুদ্রের আসল রূপটা আসলে এমনই – উত্তাল। কিন্তু মার্চের শেষেও আমাদের জন্য সমুদ্র এখনও শান্ত।

এর মধ্যে ঘুরবাজের একটা বিশাল প্যানা ব্যানার নিয়ে সবাই ট্রলারের পিছনে গিয়ে বেশ পোয দিয়ে ছবি তুলে ফেললো – ঘুরবাজ আসলে কী? একটা সংগঠন? এটা কি তাদের সেই সংগঠনের একটা সফল ট্যুর হতে যাচ্ছে? -তা-ইতো মনে হচ্ছে। এর মধ্যে ইফতি-স্পেশাল লেবুর-শরবত খাওয়া হলো সবারই। নাফের মধ্যে দিয়ে গিয়ে জাহাজগুলো যখন আরো ভিতরে চলে যাচ্ছে, তখন আমাদের ট্রলারটা বামদিকে ম্যানগ্রোভের পাশ দিয়ে একটা খাড়ির ভিতর দিয়ে ঢুকলো। খাড়ি-পথটা অপূর্ব লাগলো – টেকনাফে ট্রলারগুলো এই পথেই ঢুকে।

এখানে দেখা গেল, মিয়ানমারের একটা ট্রলার দাঁড় করানো, এক কিশোরকে সেখানে পেয়ে বাংলাতেই জানতে চাইলাম। সে জানালো, সে মিয়ানমারের, ট্রলার নিয়ে সে-ই এসেছে, লোকজন নামিয়ে দিয়েছে। আমাদের ট্রলারটা আরেকটু সামনে যেতেই বামদিকে দেখলাম মানবেতর দৃশ্য: একদল লোক সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, বিজিবি জোয়ানরা তাদেরকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন। কিন্তু পদ্ধতিটা বিশ্রী: সেখানে উচ্চবাচ্য চলছে, লোকজনের শার্ট, জামা ধরে টানাহেঁচড়া করে ঠেলে সরিয়ে দেয়া হচ্ছে, মহিলাদেরকে টেনে সরিয়ে দেয়া হচ্ছে – দূর থেকে এগুলোর অর্থ করলে দাঁড়ায়- এরা মিয়ানমার থেকে আগত রোহিঙ্গা (এরা কেন আসে, কোথায় আসে – জানিনা), যাদের সম্ভবত এখানে অনুপ্রবেশের অনুমতি দেয়া হচ্ছে না, কিন্তু তারা ফিরে যেতে নারাজ, তাই এই অসুন্দর দৃশ্যের অবতারণা। …কিন্তু আমাদেরও জানা ছিল না, আমাদের জন্য কী অসুন্দরতর দৃশ্য অপেক্ষা করছে সামনে… অন্যান্য ট্রলারের ভিতর দিয়ে খাড়ি ধরে আমাদের ট্রলার গিয়ে থামলো। আমরা নামলাম সবাই, নামার বিষয়টা একটু ঝক্কির বটে। ঘাটে নেমেও আবার চাঁদা দিতে হলো জনপ্রতি ৳১০ [টাকা] করে (এই সমপরিমাণ চাঁদা সেন্ট মার্টিনেও দিতে হয় বলে জানিয়েছে নাকিব)। …ফিরতি পথে আমরা ফিরলাম শ্যামলী বাসে। আসল হেকটিক ট্যুর তো সেখানেই শুরু…

বিরাট ঘটনা – সেই বাস খারাপ রাস্তা দিয়ে রাতের অন্ধকারে কক্সবাজার যেতে যেতে সিটের হাতলে আঘাত দিয়ে আমাদের একজনের হাতে ফ্র্যাকচার ঘটিয়ে দিলো, অথচ ড্রাইভার আর হেল্পার নিজেদের দোষ মানতে নারাজ, উল্টো খিস্তি-খেউড় করে আমাদের দিকেই মুখিয়ে উঠে। কক্সবাজার পেরিয়ে একটা হোটেলে বিরতি দিলো, তখনই প্রথম দেখি বাঁশ দিয়ে চূর্ণ হয়ে আটকে থাকা উইন্ডশিল্ড আটকে রাখছে ঠেক দিয়ে। ঘটনার আরো বাকি ছিল – সেই বাস চট্টগ্রাম ছেড়ে ফযরের শেষাংশে কুমিল্লায়, ডানদিকের লেনের একটা ট্রাকের সাথে পাশ থেকে মারাত্মক সংঘর্ষ করলো – অল্পের জন্য সামনের দিকে বসা আমরা বেঁচে গেলাম – পিছনের দিকে বসা একটা ছেলের মাথার ধমনী ছিড়ে অনর্গল রক্ত পড়তে থাকলো – আরো অনেকে ছোটখাটো আহত হলো। ভাগ্য ভালো বাস, ধাক্কার পরে নিয়ন্ত্রণ নিতে পেরেছিল, নাহলে পাশের খাদে পড়ে ঘটনা আরো মারাত্মক হতো। কুমিল্লায় ড্রাইভার-হেলপার-অ্যাটেনডেন্টকে আটকে পুলিশ ডাকা হলো, শ্যামলীর লোকজনকে ডেকে বিকল্প বাস দিতেই হবে বলে দাবি করে বাস আদায় করা হলো। তখন অ্যাটেনডেন্টের কাছে শুনে আশ্চর্য হলাম এই ড্রাইভারই টেকনাফ যাবার সময় নাকি দুর্ঘটনা ঘটিয়ে উইন্ডশিল্ডের এই হাল ঘটিয়েছে। – আমরা কিছুতেই ক্ষমা করতে পারলাম না শ্যামলীকে – এদের বিরুদ্ধে অনেক অনেক অনেক অভিযোগ – ঢাকা-চট্টগ্রাম র‍্যুটে এদের সুনাম করে এমন কাউকে পাইনি। আর আজ তা সাক্ষাৎ দেখিয়ে দিলো।

আহত ছেলেটা বাকি পথ এভাবে বসে বসে আসে অবশ্য (ছবি: নিশাচর)
আহত ছেলেটা বাকি পথ এভাবে বসে বসে আসে অবশ্য (ছবি: নিশাচর)

ঘটনাকে আরো ঘোলাটে করে দিলো, যখন পুলিশ আসার সাথে সাথে ড্রাইভার আর হেলপার আমাদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে পালিয়ে গেলো। বাসের বাকি পরিবারগুলো নীরব, তারা বেঁচে আছে বলে নিজেদের নিয়তিকে ধন্যবাদ দিচ্ছে, আর ঘটনার মোড় যেন ভালোর দিকে যায় সেজন্যে দোয়া করে বিষয়টা আমাদের উপর ছেড়ে দিয়ে বসে আছে – সবাই কথা বলতে হয় না, যারা বলছে, বলতে দিতে হয়। ঘুরবাজসহ পুরো দলটাই একজোট হয়ে ঘটনার এস্পার-ওস্পার করতে কাজ করেই চলেছে। এদিকে কুমিল্লায় একটা সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে মারাত্মক আহত ছেলেটা আর আরেকজনকে – সেখানে রাসেল আর দানিয়েলকে রেখে আসা হয়েছে সহায়ক হিসেবে। আমরা অবশ্য এর আগে যথাসম্ভব ফার্স্ট-এইড দিয়ে রক্ত বন্ধ করার চেষ্টা করেছি – কাজে দেয়নি।

শেষে পুরো দিন খুইয়ে কুমিল্লা থেকে নতুন একটা বাসে উঠে, আহত ছেলেটাকেও সাথে নিয়ে আমাদের দলটা ঢাকামুখী হলো। দুপুর নাগাদ আমরা সহিসালামতে ঢাকায় ফিরে এলাম। দানিয়েল আর শারমিন ভাবি, ছেলেটাকে ওর নানার বাসায় পৌঁছে দিয়ে এলো। আর, মুনিম প্রতিজ্ঞা করলো – ভবিষ্যতে ট্যুরের নামের মধ্যে ‘হেকটিক’ ‘ফেকটিক’ থাকলে সে আর নেই। আদিল আপত্তি করলো, ঘুরবাজকে এবারে একটা সংগঠনে রূপ দেয়া দরকার – বিপদে পড়লে ওসব সার্টিফিকেটের অনেক ভ্যালু। ঘুরবাজ কি তাহলে কোনো সংগঠন না!! …আমার ভুল হচ্ছিলো – আসলে ওরা কয়েকজন বন্ধু একসাথে কয়েকবার ঘুরাঘুরি করে ভাবলো একটা পতাকাতলে থাকলে কেমন হয়? ব্যস, বসে বসে পতাকার একটা নাম দিলো ‘ঘুরবাজ’ – একজোট হয়ে ভ্রমণ আয়োজন করে বেরিয়ে পড়া ছাড়া এর আর কোনো অস্তিত্বই নেই। তাই ভুলত্রুটি ক্ষমার্হ।

সবচেয়ে বড় কথা: আমার প্রথম সস্ত্রীক ভ্রমণে মৃত্যুর এতোটা কাছাকাছি থেকে ফিরে আসা আমার গিন্নীকে শারমিন ভাবি প্রশ্ন করলেন, “ভাবি নিশ্চয়ই আর কোনো ট্যুরে বেরোবেন না…?” কিন্তু তিনি আমাদের সবাইকে আশ্চর্য করে দিয়ে হেসে বললেন, “না, বেরোব।”

যাক, বিয়ে করে বুড়িয়ে যেতে হলো না… ইনশাল্লাহ সামনে দেখা হবে অন্য কোনোখানে… অজানারই পানে…

-মঈনুল ইসলাম

wz.islam@gmail.com

nanodesigns

২ thoughts on “সেন্ট মার্টিন ভ্রমণ ২০১৪ (২)

    1. ভাই, প্রথমত আমি কারো বস নই। 🙂
      খরচের হিসাব আমি ইনলাইনে দেয়ার চেষ্টা করি। খরচ ব্যক্তিবিশেষে, পছন্দবিশেষে একেকরকম:
      কেউ আয়েশ করে ট্যুর দেয়, কেউ আলপাইন স্টাইলে ট্যুর দেয়। তাই আমি বিভিন্ন জায়গায় কোথায় কত খরচ হয়েছে, তা দেয়ার চেষ্টা করেছি। একটু কষ্ট করে সেগুলো যোগ করে নিতে হবে। 🙂

মন্তব্য করুন