দর্শন কখনই মরবে না

গতকালকে আমি বিডিনিউয২৪-এ একটা নিবন্ধ^ পড়লাম। নিবন্ধটার মূল বিষয়বস্তু স্টিফেন হকিং-এর সাম্প্রতিক বই “দ্যা গ্র্যান্ড ডিযাইন” বিষয়ে আলোকপাত। সেখানে স্টিফেন হকিং নাকি বলেছেন (আমি ‘নাকি বলেছেন’ কথাগুলো ব্যবহার করবো, কারণ বইটি আমি পড়িনি):

দর্শনের মৃত্যু ঘটেছে।

তিনি নাকি দর্শনের স্থান দখলকারী হিসেবে পদার্থবিজ্ঞানকে উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ তাঁর বক্তব্যের সারকথা হলো: শুধু অলীক কল্পনা দিয়ে আর জগৎকে ব্যাখ্যা করা যায় না। জগৎকে ব্যাখ্যা করার জন্য দরকার অত্যাধুনিক পদার্থবিজ্ঞান আর নিখুঁত প্রমাণ। তাই দর্শনের স্থানটা এখন পদার্থবিজ্ঞানই দখল করে নিবে বা নিয়েছে।

সোজা বাংলায় বলি: আমি তাঁর এই কথাতে সমর্থন জানাতে পারছি না। কারণ আজও, এই যুগেও বিজ্ঞানের সুতিকাগার হলো দর্শন (Philosophy), এবং আজীবনই তা থাকবে। কিন্তু কেন থাকবে?

একটা উদাহরণ দেই: আমি যখন ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক চ্যানেলের ইউনিভার্স সিরিযটা দেখতে দেখতে বিশ্বাস করতে শুরু করেছি যে, মহাবিশ্ব আসলে অসীম (যদিও সেখানে সসীমতার কথাও ছিল), এর কোনো কুল-কিনারা নাই; ঠিক তখনই দর্শনভিত্তিক একটা বাংলা বই “প্রহেলিকাচ্ছন্ন মহাকালরূপ অচেতনে”-তে Lincoln Barnett-এর “The Universe and Dr. Einstein” বইয়ের উদ্ধৃতি উল্লেখ পেলাম:

মহাশূণ্যের প্রতি কিউবিক সেন্টিমিটারে রয়েছে ০.০,০০,০০,০০,০০,০০,০০,০০,০০,০০,০০,০০,০০,০০,০০১ [দশমিক লক্ষ কোটি কোটি কোটি এক] গ্রাম ম্যাটার বা বস্তু। এবং মহাবিশ্বের পরিধি (এমাথা-ওমাথায় সর্বোচ্চ দূরত্ব) হচ্ছে ৩৫ বিলিয়ন আলোকবর্ষের সমান বা ২,১০,০০,০০,০০,০০,০০,০০,০০,০০,০০,০০০ [দুই কোটি দশ লক্ষ কোটি কোটি] মাইল।

এর মানে হলো মহাবিশ্ব আসলে সসীম এবং শুধু সসীমই না, বিজ্ঞানীদের কাছে এর সঠিক (নাকি গাণিতিক-কল্পিত) একটা মাপও আছে। উল্লেখ্য, এই হিসাবটা এডউইন হাবল ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দে আরো কয়েকজন বিজ্ঞানীকে নিয়ে করেছিলেন, যাআইনস্টাইনের ক্ষেত্রসমীকরণনামে পরিচিত। অর্থাৎ উপরে উল্লেখিত পরিধির একটা বৃত্ত আঁকলে সেটা যেমন হবে, মহাবিশ্বটা আসলে ঠিক ততটুকু বিশাল- এর বেশি নয়। অর্থাৎ আমাকে নতুন করে বিশ্বাস করতে শুরু করতে হলো যে, মহাবিশ্ব অসীম নাও হতে পারে।

ঐ বইতেই (“..অচেতনে”) J. A. Hammerton-এর “Concise Universal Biography” বই থেকে দৃষ্টিকোণ নিয়ে লেখা আরেকটা তথ্য আমি পেলাম:

আলোর রহস্যময় আচরণ হলো… মহাজাগতিক বিপুল দূরত্ব অতিক্রমণে (পার করার সময়) আলো বেঁকে যায়…

কথাটা পড়েই আমার মাথায় একটা চিন্তা খেলা করলো। এখানে একটু বলে রাখি: উপরের দুটো তথ্যই খাঁটি দর্শন নয়, বরং বিজ্ঞান (খাঁটি বিজ্ঞান কিনা জানিনা)। এবারে যদি বিজ্ঞান প্রমাণ করে যে, হ্যা সত্যিই মহাবিশ্ব পাড়ি দেবার সময় আলো বেঁকে যায়, তাহলে আমিও ক্লাস এইটের অংক কষে মহাবিশ্বের সীমা বের করে দিতে পারবো।

যদি এবং কেবল যদি, বিজ্ঞান প্রমাণ করে যে, প্রতি 1 ফুট (30.48 সেন্টিমিটার) পার হতে আলো 2° [ডিগ্রি] বেঁকে যায়, তাহলে আমার পক্ষে একটু কষ্ট করতে হবে। ছবিটা বিশাল হয়ে যাবে। তাই আমি একটা ছোট্ট মডেলে ধরে নিয়েছি: 0.5 সেন্টিমিটার পার হতে আলো 50° বেঁকে যায়। এভাবে আমি চিত্র এঁকে দেখলাম যে বৃত্তটা হচ্ছে, তার পরিধি হলো 1.4 সেন্টিমিটার। এবারে ঐকিক নিয়মে করলে:

      0.5 cm-এ 50° বাঁক নিলে পরিধি        ≈ 1.4 cm

অতএব, 1 cm-এ 50° বাঁক নিলে পরিধি          ≈ 1.4×50×0.5 cm

অতএব, 30.48 cm-এ 50° বাঁক নিলে পরিধি    ≈ 1.4×50×0.5×30.48 cm

অতএব, 30.48 cm-এ 2° বাঁক নিলে পরিধি হলো ≈ {(1.4×50×0.5×30.48)/2} cm

≈ 533.4 cm

এই পুরো অংকটাই হলো একটা ভুয়া কাজ, কেননা পুরো ব্যাপারাটাই ধরে নেয়া হয়েছে। কিন্তু আমি এর মাধ্যমে যে বক্তব্যটা রাখতে চেয়েছি, তা হলো: যদি এবং কেবল যদি বিজ্ঞান বলে যে, আলো প্রতি ১ ফুট যেতে যেতেই ২ ডি্গ্রি বাঁক নেয়, তাহলে আমি বলে দিতে পারবো মহাবিশ্বের পরিধি হলো ৫৩৩.৪ সেন্টিমিটার বা ১৭.৫ ফুট মাত্র। (এই পুরো মানটিই ধরে নেয়া হয়েছে উদাহরণটা বোঝানোর জন্য)

এই যে, কাজটা আমার মাথায় এলো, অর্থাৎ “আলো বেঁকে যায়” কথাটা শোনামাত্রই আমি আলো’র বক্রতার হিসাব করে মহাবিশ্বের পরিধি মাপার চিন্তাটা করলাম, এটা কিন্তু তখন বিজ্ঞান ছিল না, ছিল একটা কল্পনা। এখন যখন সেই কল্পনাকে গাণিতিকভাবে একটা মান-এ বা ভ্যালুতে নিয়ে আসা গেলো, এখন তা হয়ে গেলো বিজ্ঞান। কিন্তু আমি যদি ঐ মুহূর্তে ঐ ভাবনাটা না ভাবতাম, তাহলে কিভাবে এই বিজ্ঞান জন্ম নিতো?

আমার কথাটা ঠিক সেখানেই। বিজ্ঞানের যেকোনো গবেষণাই শুরু হয় একটা আপাত ভুয়া কল্পনা দিয়ে। পরবর্তিতে কখনও সেই চিন্তাটা প্রমাণিত হয় এবং টিকে যায়, কখনও প্রমাণিত হয় না, হারিয়ে যায়। এই চিন্তাটা, হ্যা, এই প্রাথমিক চিন্তাটা যদি না জন্মায়, কোনো ক্লু পেয়ে যদি তা চিন্তায় পর্যবসিত না হয়, তাহলে কখনও বিজ্ঞান সামনে এগোবে না, বিজ্ঞান মুখ থুবড়ে পড়বে। …আর ঐ প্রাথমিক আপাত ভুয়া কল্পনাটিই হলো দর্শন।

দর্শনের বই পড়েই আইনস্টাইন এরকম আরেকটা আপাত ভুয়া দর্শন নিজে নিজে কল্পনা করছিলেন বলেই আজ আমরা বিখ্যাত E=mc2 পেয়েছি। আবার এরকম ভুয়া দর্শনই আজকের এই অধুনা বিশ্বেও বিজ্ঞানীরা কবচাচ্ছেন। যেমন: বিজ্ঞানীরা দেখলেন মহাকাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে মহাকাশীয় বস্তুগুলো নেই, বরং যেখানে আছে, সেখানে কেমন যেন একটু জট বেঁধে আছে। আর এই বিজ্ঞানের উপর ভিত্তি করেই বিজ্ঞানীরা কোনো প্রমাণ ছাড়াই একটা ভুয়া দর্শন দাঁড় করালেন যে, হয়তো ‘কিছু একটা’ মহাকাশীয় বস্তুগুলোকে সুপার গ্লু’র মতো আটকে রেখেছে একসাথে। তাঁরা সেই কিছু একটার নাম দিলেন Dark matter। পরবর্তিতে কিছু কিছু সিগন্যাল, এবং গাণিতিক যুক্তি এই কল্পনাটিকে সমর্থন করলো বটে, তবে আজ পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা ডার্ক ম্যাটার দেখতে পাননি।

আজকের পৃথিবীতে তাই Noetics, ক্ষেত্রবিশেষে Noetic Science নামে একটা নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে চলেছে। যার মূল সূত্র সেই হাজার হাজার বছর আগেকার আপাত ভুয়া দর্শন, ধর্মগ্রন্থ, পুঁথিসাহিত্য কিংবা আধ্যাত্মবাদের মধ্যে গেঁথে আছে। এই বিজ্ঞান (এখনও পুরোপুরি বিজ্ঞান নয়) আধুনিকতম বিজ্ঞানকে আবিষ্কার করছে সেই সব প্রাচীন কিংবা প্রাচীনতম লেখনীর ভিতরে, যেগুলো খাঁটি দর্শন বৈ আর কিছুই নয়, আজতক ছিল না বিজ্ঞানের চোখে।

তাহলে কী করে স্টিফেন হকিং দাবি করেন: দর্শনের মৃত্যু ঘটেছে!

দর্শন চিরঞ্জীব। মানুষ যতদিন না বিজ্ঞানের শেষ সীমায় পৌঁছে যাবে, ততদিন মানুষ দর্শনের হাত ধরেই বিজ্ঞানের জগতে হাঁটি-হাঁটি-পা-পা করবে। বিজ্ঞান, সেদিনের আগ পর্যন্ত কখনও দর্শন থেকে নিজেকে ছিন্ন করতে পারবে না।

-মঈনুল ইসলাম

[email protected]

মন্তব্য করুন