অফ-ট্র্যাক বান্দরবান ২০১২ (কিস্তি ৯)

গত রাতে রাসেলের অবস্থা পর্যালোচনা-পূর্বক, কারবারির কথা শুনে আবুবকর পরিস্থিতির স্বার্থে একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাঁর নেয়া সেই সিদ্ধান্ত যে আমাদেরকে আমাদের নিয়তির পরম আশ্চর্য অংশে নিয়ে যাবে, ঘুণাক্ষরেও জানতাম না। আবুবকর আমাদের গন্তব্য বদলেছেন। গত রাতেই কারবারির থেকে পথ জেনে নিয়ে ফিরতি পথ ধরার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। রাসেলের পায়ের এই অবস্থা নিয়ে আমাদের কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে যাওয়া সম্ভব হবে না, কারণ সামনে অজানা পথে কোন মারাত্মক পরিস্থিতির সম্মুখিন আমরা হবো, তার ঠিক নেই। তাই ফিরতি পথ ধরাই আমাদের উচিত হবে। কী সেই ফিরতি পথ?

লালহিম আমাদেরকে পথ দেখিয়ে নামিয়ে নিয়ে যাচ্ছে গতকালকের বাদ পড়া ঝরণাটা দেখাতে। তখনও আমরা রুমানা পাড়া থেকে নামিনি, কামরুল আমাদেরকে ডানদিকে তাকাতে বললো। দূরে একটা উঁচু পাহাড়ের চূঁড়া দেখা যাচ্ছে। কামরুল জানালো ওটা পাহাড় না, বরং ওটা পর্বত: কেওকারাডং পর্বত। আর ঐইই যে জিনিসটা চকচক করছে, ওটা হলো কেওকারাডংয়ের ল্যাট্রিন। কথাটা কামরুল খুব স্বাভাবিক আর ভাবলেশহীনভাবে বললো, যেন কথাটা সে এভাবে আরো অনেককে বলেছে।

রুমানা ঝরণা, দুই ধারায় ঝরছে পানি (ছবি: লেখক)
রুমানা ঝরণা, দুই ধারায় ঝরছে পানি (ছবি: লেখক)

আমরা কেওকারাডং-এর ছবি তুলে নিলাম, আহারে, ওখানেই যাবার কথা ছিল আমাদের, দেখা আর হলো না। লালহিম আমাদেরকে পথ দেখিয়ে নিচে নামতে নামতে একপর্যায়ে ডানদিকের একটা সরু পথ ধরলো। আমি, নাকিব আর আবুবকর অনুসরণ করছি তাকে। পথটা বেয়ে আরো কিছুদূর যাবার পর শোঁ শোঁ আওয়াজ কানে এলো। সামনে এগিয়ে দেখি একটা ঝরণা। খুব বেশি উঁচু না ঝরণাটা, ছোট। এটা হলো রুমানা ঝরণা। রুমানা ঝরণার উপর থেকে জিপিএস রিডিং নিলেন আবুবকর। তারপর নিচে নামতে গেলেন। নাকিব উপরেই রইলো, আমি আর আবুবকর, লালহিমকে অনুসরণ করে খুব সহজেই নিচে, ঝরণার পাদদেশে নেমে গেলাম। সেখান থেকে দেখলাম ঝরণাটা। দুইটা ধারা, পাথরের দুপাশ দিয়ে নিচে নেমেছে। বর্ষাকালে ঝরণার যৌবন অবশ্যই আরো সুন্দর হবে, এখনও পানি নেহায়েত কম না। লালহিম জানালো এখানে ভালোই মাছ পাওয়া যায়।

ঝরণা দর্শন শেষে আমরা উপরে উঠে এলে আবুবকর জানালেন, জিপিএস ট্র্যাক নিতে ভুলে গেছেন ঝরণাটার উচ্চতা কত। নিচ পর্যন্ত গিয়ে এলাম অথচ আমরা ঝরণাটার উচ্চতা না মেপে চলে যাব, এটা ভাবতেই মনটা খারাপ হয়ে গেল। তাই আমিই বললাম, আমি নিচে যাবো একা। জিপিএসটা হাতে নিয়ে ঐ পথেই আবার একা একা খুব দ্রুতই নিচে নেমে গেলাম। একা একা ঝরণাটা উপভোগ করতে মন্দ লাগছে না। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে জিপিএস যন্ত্রটাকে একটু সময় দিয়ে তারপর ফিরলাম উপরে। আবুবকর মার্ক করে নিলেন উচ্চতাটা।

আমরা ফিরতি পথ বেয়ে মুল পথে ফিরে এলাম। রাসেল, কামরুল, আপেল আর বিকাশ আগে-ভাগেই চলে গেছে, পথ এগিয়ে রাখতে চাইছে ওরা— ভালো। আমরা লালহিমের সাথে গলাগলি শেষ করে বিদায় নিলাম। আবুবকর তাকে লেখাপড়া শুরু করতে উপদেশ দিয়ে এলেন।

আমরা পথ নেমে একটা ব্রিজ পার হলাম। উঠতি সূর্যের তীর্যক আলো যখন গাছের ফাঁক গলে আমাদের স্বাগত জানিয়ে মনটা ভরিয়ে দিচ্ছে, তখন আবুবকরের মনটা একটু খারাপ। আমাদের কারণে, বিশেষ করে রাসেলের কারণে আমাদের গন্তব্য পর্যন্ত যাওয়া হলো না, ফিরতি পথ ধরতে হচ্ছে মাঝখান থেকে। আমি আবুবকরকে বললাম, এই ট্যুরটা কিন্তু আপনাদের জন্য একটা শিক্ষা। কক্ষণোও অজানা ট্রেইলে অচেনা মানুষকে সঙ্গে নিতে নেই। নাকিব আপত্তি করতে চাইলো, আমি বললাম, না, আমাকেও না। অচেনা মানুষ সম্পর্কে কিচ্ছু না জেনে, তারা পাহাড়ে চড়তে পারবে কিনা না জেনে এভাবে উৎসাহের বশে সঙ্গী করে নেয়াটা উচিত না, আমাকেও না। কারণ আমাকে সঙ্গে নিয়ে এতদূর না আসা পর্যন্ত তারা ঘুণাক্ষরেও জানতেন না, আমি পাহাড়ে কেমন চড়তে জানি। আবুবকর মেনে নিলেন কথাটা।

সকালের মিষ্টি রোদ চুইয়ে আসছে গাছের ফাঁক গলে (ছবি: লেখক)
সকালের মিষ্টি রোদ চুইয়ে আসছে গাছের ফাঁক গলে (ছবি: লেখক)

তখন তিনি জানালেন, আমাদের সামনের গন্তব্য সুংসাং পাড়া, তারপর পাসিং পাড়া হয়ে ফিরতি পথ। আবুবকরের জন্য মনটা খারাপই লাগছে। কিন্তু আমরা সবাই-ই আসলে একটা অবস্থার শিকার। রাসেলেরও কোনো দোষ নেই, আমাদেরও এতে কোনো হাত নেই। নিজেদের অদৃষ্টের উপর রাগ ঝাড়া ছাড়া আর কিছুই করার নেই।

পথটা এগিয়ে চললো। ব্রিজ পার হতেই পথটা আবার চড়াই ধরেছে। পথটা অবশ্য পাহাড়িরা খাঁজ কেটে সিঁড়ি করে রেখেছে। তবু, উপরের দিকে উঠা বলে কথা, কষ্ট লাগে বেশ। কিন্তু পাতলা শরীর আর ভরা ব্যাগ নিয়ে উঠতে পারলাম অনায়াসে। একসময় আবার কামরুলের সঙ্গী হলাম। পথটা আবার নেমে যাচ্ছে। কিন্তু পথটা কেমন জানি পানি যাবার নালার মতো, আর দুপাশে উঁচুতে রয়েছে শুষ্ক কাঁশবন। ভোরে শীত ছিল বলে জ্যাকেট চাপিয়েছিলাম, এখন সেটা খুলে হাতে নিয়ে নিলাম।

পাহাড়ের উপরে যেনবা কোনো শান্তির আবাস, কোনো বনলতা সেন... আহা! (ছবি: নাকিব)
পাহাড়ের উপরে যেনবা কোনো শান্তির আবাস, কোনো বনলতা সেন… আহা! (ছবি: নাকিব)

আবার পথটা খানিকটা উপরের দিকে উঠে সামনে এগোতেই একটা পাড়া নজরে এলো। এগিয়ে গিয়ে দেখি, ওটা পাড়া না, সেনা ক্যাম্প: সুংসাং পাড়া আর্মি ক্যাম্প। আর্মি ক্যাম্প সবসময়ই বেশ গোপনীয়, ছবি তোলা নিষেধ। কিন্তু কে কার নিষেধাজ্ঞা মানে, ছবি তুলে নিতে দ্বিধা করলাম না। আর্মি ক্যাম্পের বাঁশের বেড়া আর বাঁশের সুন্দর আয়তাকৃতি প্রধান ফটকের সামনেই একটা বড় ঝাউগাছ। ঝাউগাছ বা ক্রিসমাস ট্রিটা বেশ সুন্দর লাগছিল পিছনের নীলাকাশের দৃশ্যপটে। নাকিবের খুব শখ এরকম ছবিকে কম্পিউটারের ওয়ালপেপার বানাবে। তাই ওর জন্য ওয়ালপেপারের ছবি তুলে দিলাম।

সুংসাং পাড়া সেনা ক্যাম্প, দূর থেকে (ছবি: লেখক)
সুংসাং পাড়া সেনা ক্যাম্প, দূর থেকে (ছবি: লেখক)

ওদিকে সামনে গিয়ে পথটা আরো উঁচুতে উঠতে থাকলো। আবুবকররা এগিয়ে গেছেন ওতটুকু। সেই উঁচু পথের বাঁপাশে চোখে পড়লো একটা পাড়া। কামরুল জানালো ওটা সুংসাং পাড়া বা সংসং পাড়া। সুংসাং পাড়ায় আমরা উঠলাম না, পাশ কাটিয়ে চলে গেলাম পথ ধরে। পথটা উপরের দিকে উঠছে। আমাদের ধারণারও অতীত ছিল, পথটা কোথায় উঠে যাচ্ছে, কত উঁচুতে আমাদের নিয়ে যাচ্ছে…।

পথটা ধরে এগোতে থাকলাম। সামনে ডানদিকে অনেকগুলো কবর-ফলক দেখে বুঝলাম, ওটা এখানকার পাড়ার খ্রিস্টানদের কবরস্থান, লেখা: Welcome to Zawl, মানে বুঝলাম না। আরো সামনে এগিয়ে গিয়ে দেখি সুংসাং পাড়ার আরেক মাথায় এক জায়গায় আবুবকরসহ বাকিরা দাঁড়িয়ে আছে। কী হয়েছে? …রাসেলকে আবারো কৃতকর্ম সারতে হবে। কী আর করা, বিকাশের দিকে তাকানো যাচ্ছে না, সে চরম বিরক্ত।

আর যাই হোক, রাসেলের কারণে আমাদের সবারই খানিকটা বিশ্রাম হলো। ব্যাগ কাঁধ থেকে নামিয়ে একটু স্বস্থি পেতে চাইলাম। কামরুল তখন তার ব্যাগ থেকে চকলেট বের করে আমাদের সবাইকে দিলো। এই চকলেট সে আর আবুবকর খাবার জন্য এনেছিল, কিন্তু এখন ভ্রমণসঙ্গীদের সাথে ভাগ করে খাওয়াকে সে ভদ্রতা মনে করলো, যা না করলেও আমাদের কিছু মনে করার প্রশ্নই উঠতো না। কামরুলকে এজন্য বোধহয় ধন্যবাদের চেয়েও বড় কিছু— দোয়া দেয়া উচিত।

রাসেল যখন নিজেকে খুব দোষী ভাবতে ভাবতে বেরিয়ে আসছিল, তখন মায়াই হলো। তারপর আবার পথ চলা। পাহাড়ের উপরে পাসিং পাড়া, প্রচুর পথ বেয়ে উঠতে হবে। সবাই তৈরি। পথটা মাটির, ঢালু হয়ে উপরের দিকে উঠে গেছে। কিন্তু ঢালটা একটু খাড়াই। কিছুদূর উঠে পেছন ফিরে দেখি, রুমানা পাড়া, সুংসং পাড়া, আর আর্মি ক্যাম্প দেখা যাচ্ছে। অপূর্ব সে দৃশ্য। কিছুক্ষণ আগেই পার করে আসা একটা আস্ত পাড়াকে এখন একনজরে দেখা যাচ্ছে পুরোটাই… অপূর্ব, অপূর্ব!!

পথটা এগিয়ে চলেছে, কখনও সামান্য একটু নামছে, তো আবার তার দ্বিগুণ উপরের দিকে উঠছে। ডানদিকের মেঝেতে, রাস্তার পাশ ধরে একটা পাইপ, অনেকক্ষণ ধরেই দেখছি, অনেক দূর পর্যন্ত ওটা আমাদের পাশ দিয়ে সাপের মতো বয়ে চলেছে। কোথায় গেছে? আবুবকর বললেন, কাছের ঝরণা থেকে আর্মি ক্যাম্পে পানির সাপ্লাই করা হয়েছে পাইপ দিয়ে। …তারমানে, কাছে একটা ঝরণা আছে!

আমরা যখন আরেকটু সামনে এগোলাম, তখন একটা পথ পড়লো, রাসেল একটু বিশ্রাম চাইলো, চড়াই উঠতে ওর জানটা বেরিয়ে যাচ্ছে। ও যখন গাছের ছায়াঘেরা জায়গাটায় বিশ্রাম করছে, তখন উপরের দিকে তাকিয়ে দেখি…

…প্রজাপতি। অনেক অনেক প্রজাপতি। নাকিবের ক্যামেরাটা রীতিমতো চমৎকার, অনায়াসে ১২ গুণ অপটিক্যাল যুম করে প্রজাপতি ধরার চেষ্টা করলাম। কিন্তু ওরা কি আর আমাকে পোয দেয়ার জন্য বসে আছে? অনভিজ্ঞ হাতে শার্টার টিপে যাওয়া আরকি। অনেকগুলো ফুল চোখে পড়লো উপরের ডালগুলোতে। সাদা রঙের জাম ফুলের মঞ্জুরিগুলো যেন মৌমাছি আর প্রজাপতিদের জন্য মধুর আগার নিয়ে বসে আছে। প্রজাপতির ছবি তুলতে তুলতে হাতে ব্যথা হয়ে গেছে আমার। বেচারা কামরুল হয়তো ভালো কিছু ছবি পেত, কিন্তু ওর ক্যামেরার যুম অত উঁচুতে ধরে না।

জাম ফুলে প্রজাপতির অভয়ারণ্য (ছবি: লেখক)
জাম ফুলে প্রজাপতির অভয়ারণ্য (ছবি: লেখক)

বিশ্রাম শেষ, আবার আমাদের পথচলা শুরু। কিছুদূর এগিয়ে দেখি একটা ছোট্ট ঝিরি, আর তার উপর ব্রিটিশ আমলের একটা সিমেন্ট আর কাঠের ব্রিজ। ব্রিজটা আসলে কোন আমলের তা জানিনা— আসলে ওটার যে অবস্থা, ওটাকে ‘ব্রিটিশ আমল’ উপধায় বেশি ভালো সূচিত করা যায় আরকি।

কাঠের ব্রিজ, মনে করিয়ে দেয় ব্রিটিশ আমলের কথা (ছবি: লেখক)
কাঠের ব্রিজ, মনে করিয়ে দেয় ব্রিটিশ আমলের কথা (ছবি: লেখক)

আমাদেরকে আরো চড়াই উঠতে হবে, তাই নাকিব ওখানে দাঁড়িয়ে ছিল আমাদের জন্য। আমাদের সবাইকে পানি ভরে নিতে বললো ঝিরি থেকে। কথা সত্যি, তাই দ্বিধা না করে বোতলের পানিটুকু সাবাড় করে সবার সবগুলো বোতলই নিয়ে গিয়ে রিফিল করে আনলাম। পানি খুব একটা আহামরি না, কিন্তু পানি তো!

আবার হন্টন। এই একটা শব্দ শুনতে শুনতে পাঠক হয়তো বিরক্ত হতে পারেন, কিন্তু প্রকৃত অবস্থাটা ছিল… আর কী? …হন্টন। …এবার শুরু হলো খাঁটি চড়াই উঠা। চড়াই যাকে বলে আরকি। রাসেলের নাভিশ্বাস বেরিয়ে যাবার উপক্রম, কামরুলও শরীরের ওজনের কারণে কিছুটা হলেও ঝিম মেরেছে। ওদের কথা আর কী বলবো, এতোটা চড়াই যে, আমার মতো শুকনা কাঠিও রীতিমতো হাঁপিয়ে উঠেছে। নাকিবের কী অবস্থা কে জানে, ও বেশ আগে উঠে গেছে। আমি, রাসেলের সঙ্গ দিতে গিয়ে কামরুলেরই মতো পিছিয়ে গেছি।

উপরে উঠছি, একটু ঢালু-চড়াই ধরে সামনে এগোচ্ছি, আবার উপরে উঠছি। দাঁড়ালেই আরো বেশি ক্লান্তি লাগে, তাই উঠতে থাকাটাই সমিচীন মনে করলাম। নিজের ক্লান্তি নিজেকে বুঝতে দিতে নেই। তাই মনটাকে অন্যদিকে সরানোর প্রয়োজন মনে করলাম, আর সাথে সাথে কামরুল-আবুবকরের আনা খেজুরগুলোর গুরুত্ব মর্মে মর্মে উপলব্ধি করলাম। একেকটা খেজুর মুখের মাঝে অনেক কিছু দেয়, আর সাথে দেয় চিবিয়ে চিবিয়ে মন ফেরানোর প্রেষণা। তার সাথী হলো সাথে করে নিয়ে আসা ম্যাংগোবার। একটা ছোট্ট কামড় দিই, অনেকক্ষণ উপরে উঠি; আবার আরেকটা কামড়, আবার অনেকক্ষণ…।

পাসিং পাড়ায় উঠার পথে, রাসেলকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে কী কষ্ট হচ্ছে তার (ছবি: লেখক)
পাসিং পাড়ায় উঠার পথে, রাসেলকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে কী কষ্ট হচ্ছে তার (ছবি: লেখক)

যারা আবুবকরের ষড়যন্ত্র জানবার জন্য এই পর্ব পড়ছেন, তাদের জ্ঞাতার্থে বলি: বন্ধু কখনোও বন্ধুর সাথে ষড়যন্ত্র করতে পারে না। না, কক্ষণোই পারে না। যাদের এখনও বিশ্বাস হচ্ছে না, তারা গিয়ে দেখে আসুন, আগের পর্বে আপনারা একটা “যেন” মিস করে এসেছেন। আসলে, আবুবকর যেনবা ঈশ্বরের একটা ঘুটির মতোই একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, কিংবা নিতে বাধ্য হয়েছেন, যা, আমাদেরকে ঘুরে-ফিরে সেই প্রথম প্ল্যানের দিকেই নিয়ে যাচ্ছে।

রাতে, কারবারির থেকে পথ বাতলে নিয়ে তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, আমাদের আর গন্তব্যের দিকে যাওয়া হবে না, অসুস্থ একজনকে টেনে এভাবে যাওয়াটা ঝুঁকিপূর্ণ। তাই তিনি ওখান থেকে রুমা যাবার যে রাস্তাটা বেছে নিয়েছেন, তা আমাদেরকে নিয়ে যাচ্ছে সেখানে, যেখানে যাবার জন্য আমরা তিনজন মূলত এসেইছিলাম— হ্যা, সেই কেওকারাডং আর বগা লেক।

কে জানতো, ঈশ্বর, ঘুরেফিরে আমাদেরকে সেই পথে নিয়ে চলছেন, যে পথে না গেলে হয়তো, আবার বলছি ‘হয়তো’ আমাদের আক্ষেপ থেকে যেত। আর এখন, আমরা এই যে চড়াই উঠছি, তা বেয়ে আসলে পেছন থেকে উঠছি কেওকারাডং পর্বতে— প্রথম পর্বতারোহণ। আমাদের প্রথম লক্ষ্য অবশ্য পাসিং পাড়া। পাসিং পাড়াটা নাকি ঐ উপরে।

সাপের মতো আঁকাবাঁকা উপধাটা এবার স্বচক্ষে দেখুন (ছবি: লেখক)
সাপের মতো আঁকাবাঁকা উপধাটা এবার স্বচক্ষে দেখুন (ছবি: লেখক)

উপরে!! পর্বতের উপরে গিয়ে পাড়া বানিয়েছে, কামরুলের সূত্রমতে, তার মানেই হলো ওটা একটা বম পাড়া। এরা এই এত্ত উপরে অবশ্যই পানি পায় না, এদেরকে এই এখন আমরা যেদিক দিয়ে উঠছি, এদিক দিয়ে প্রতিদিন নেমে পানি জোগাড় করতে হয় নিচের ঐ ঝিরি থেকে। এদের অমানষিক জীবনযাত্রার কথা চিন্তা করেই আমার মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠলো।

আসলেই যদি চক্কর দিত, তাহলে আমি এতক্ষণে প্রপাতধরণীতল হয়ে যেতাম, কারণ পিছন ফিরে তাকিয়ে আমি যেন কোথাও হারিয়ে গেলাম। ফেলে আসা রুমানা পাড়া, সুংসাং পাড়া, সুংসাং পাড়া আর্মি ক্যাম্প —স-বগুলো পাড়া একসাথে দেখা যাচ্ছে এখান থেকে, এত্ত ছোট, এই এতটুকুন যেনবা। কতটা উপরে উঠে এসেছি ভেবে অন্যরকম একটা অনুভূতি হলো। তার চেয়েও সুন্দর, আমরা যে রাস্তাটা ধরে এসেছি, সেই রাস্তাটা। আঁকা-বাঁকা সাপের মতন পথ বলতে সারাজীবন যে উপমাটা শুনে এসেছি, তার জলজ্যান্ত উদাহরণ। আমি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে এই মোহময় অপরূপ রূপ দেখলাম। এ-যে পরম আকাঙ্ক্ষিত, পরম ত্যাগের ফসল আমাদের।

রাসেল, পিছিয়ে যায়, তার সাথে থেকে যায় কামরুল। আমি ম্যাংগোবার আর খেজুর খাচ্ছি, মাঝে মাঝে পানি খাচ্ছি, উপরে উঠছি। কিন্তু ডানদিকে, দূরে, কেওকারাডং পর্বতের একটা বাড়তি অংশ দেখা যাচ্ছে, ওখানটা দেখতে কেমন যেন। দেখে মনে হচ্ছে, কেমন যেন পাথরের মাথায় মুকুট পরানো। নাকিবের অসাধারণ ক্যামেরাটা তো আমার হাতে, তুলে নিয়ে যখন যুম-ইন করলাম, বুঝলাম, ওগুলো সব কাঁশবন। পাথরের একেবারে কিনারায় জন্মেছে বলে স্বাভাবিক মাধ্যাকর্ষণচ্ছেদ না করে মাধ্যাকর্ষণের দিকে ঝুলে আছে সবগুলো শুষ্ক গাছ। আর তাই সবগুলোতে মিলে মনে হচ্ছে চুলের মতো ঝুলে আছে, যেনবা পাথর পরেছে মুকুট

অনেকক্ষণ ধরে হেঁটে অবশেষে আমরা একটা প্রায় সমতলে এসে পৌঁছতে সক্ষম হলাম। এসেই দেখি কাঁশবাগানে নাকিব বাবাজি চিৎপটাং হয়ে শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে। তার পাশে এসে বসলাম আমি। জিরোবার দরকার হয়ে পড়লো। কিন্তু নাকিবের কথাগুলো কানে আসছে না, ঐ যে আরো উঁচু থেকে কিসের যেন ঢাকের আওয়াজ আসছে। গত রাতে, রুমানা পাড়ার অভিজ্ঞতা না থাকলে ওখান থেকে ন্যাঁজ ঘুটিয়ে পালাতে হতো। কারণ, ঢাক যুদ্ধের আহ্বান করে। কিন্তু গত রাতের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝতে কষ্ট হচ্ছে না, শব্দটা আসছে উপরের পাসিং পাড়া থেকে, ওখানকার চার্চে চলছে রবিবারের বিশেষ সমাবেশ। ঢাকের তালে তালে সুরে সুর মিলিয়ে কিছু একটা আওড়াচ্ছেও এরা বম ভাষায়।

রাসেল আর কামরুলও এসে আমাদের সঙ্গী হলো। আবুবকর, আপেল আর বিকাশের নাম নিশানাও নেই। এতো তাড়াহুড়ার একটা বিশেষ কারণও আছে। কারণ আজকে ভোরে আমরা, আবুবকর ভাইয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, টার্গেট নিয়ে বেরিয়েছি, যেহেতু আমাদের মূল উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না, তাই আমরা আর অযথা দেরি করবো না। যদি ঠিকমতো হাঁটতে পারি, তাহলে আজকেই আমরা রুমা ছেড়ে বান্দরবান গিয়ে ঢাকার বাস ধরবো। সেই লক্ষ্যটা একটু বেশি বেশি মনে হচ্ছিল কামরুলের। সে কোনোভাবেই হিসাবটা মেলাতে পারছে না। আসলেও তো, যে রাস্তা বম পাড়ার কারবারিরাই একদিনে পার করে রুমা বাজারে গিয়ে প্রথম দিন বাজার করতে পারে না, সেখানে আমরা কিভাবে দুপুরের আগে রুমা ছেড়ে বান্দরবান পর্যন্ত চলে যাব? তবু আমরা এখনও পরিকল্পনা থেকে পিছু হটিনি। কিছুক্ষণ জিরিয়ে নিয়ে আবার উঠে পড়লাম। পাশে রেখে দেয়া ব্যাগটা আবার তুলে কাঁধে নিলাম।

কামরুল গতকালকে ব্যাগটা ঠিক করে দেয়ায় ফিতার সমবন্টনে কাঁধে আর ব্যাথা করছে না। মনে মনে কামরুলকে ধন্যবাদই দিলাম। এখনও খানিকটা উপরে উঠতে হবে। উপরে পাড়া দেখা যাচ্ছে। হেঁটে উঠে এলাম আমরা পাসিং পাড়ায়।

পাসিং পাড়া, মাঝখানে রাস্তা, দুপাশে ঘর; পথ ধরে হাঁটছে নাকিব (ছবি: লেখক)
পাসিং পাড়া, মাঝখানে রাস্তা, দুপাশে ঘর; পথ ধরে হাঁটছে নাকিব (ছবি: লেখক)

পাড়াটা অন্যান্য বম পাড়ার মতোই সুন্দর। এই উচ্চতায় বাতাসের তান্ডব থেকে বাঁচবার জন্য টিনের চালগুলো আটকে রাখতে উপরে বাঁশ আড়াআড়ি করে দিয়ে বাঁধা হয়েছে। পাড়ার ঠিক মাঝ বরাবর একটা রাস্তা চলে গেছে, দুপাশে ঘর— যেনবা একটা বাজার এটা। চার্চটা খানিকটা উঁচু পাহাড়ের উপরে, আর ঠিক পিছনেই একটা একদিকে-মুখ-করা গাছ— দৃশ্যটা অপূর্ব!

পাসিং পাড়া থেকে আরো একটা জিনিস আমার আর নাকিবের নজরে এলো, দূ–রে, বহুদূ-রে যেসব পাহাড়শ্রেণী দেখা যাচ্ছে, সেগুলো কী অপূর্ব লাগছে। কিন্তু সৌন্দর্য্য সেখানেই না, সৌন্দর্য্য হলো তারও পিছনে। আকাশ আর ঐ পাহাড়শ্রেণীর মাঝখানে কিসের যেন একটা আভা। না সবুজ, না আকাশি, না নীল, বরং কেমন যেন মেটে। এই রেখাটা কিসের, আমি, নাকিব, কামরুল— কারো কাছেই জবাব ছিল না।

এগিয়ে গিয়ে আমি একটা ঘরে ঢুকলাম, যেখানে আবুবকর, আপেল, বিকাশ বিশ্রাম করছেন। আবুবকর আমার দিকে এক প্যাকেট বিস্কুট এগিয়ে দিয়ে কামরুলের কথা জানতে চাইলেন, ‘কামরুল কোথায়?’

আমি সত্য কথা বললাম, কামরুল, রাসেলকে সঙ্গ দিচ্ছে। এসে পড়েছে ওরা, অপেক্ষা করতে হবে না।

আবুবকর অনুযোগ করলেন, ‘আমি কতবার বলেছি, রাসেলকে এত সঙ্গ দেয়ার দরকার নেই। ও এত হেল্প পেতে পেতে আরো বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।’

আবুবকরের কথা সত্যি, একথা শুধু আবুবকর না, আমি, নাকিব, আপেল, বিকাশ সবাই-ই বুঝতে পারছি। কামরুল বুঝতে পারছে না কেন, জানি না। সম্ভবত দুজনেরই নেশা এক— সৌখিন ফটোগ্রাফার। আবুবকরের বক্তব্য হচ্ছে, রাসেল যেহেতু সহায়তা পেয়ে নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে ক্রমশ, তাই তাকে আর সহায়তা দেয়া যাবে না। বিপদগ্রস্থ মুহূর্তে মানুষ টিকে থাকার চরম আকাঙ্ক্ষায় এমনিতেই নিজের ব্যবস্থা করে নিবে। ওকে রেখে চলে আসো। কথাটা ফেলে দেয়ার মতো না।

আর এভাবেই রাসেল ইস্যুতে চূড়ান্ত নাটকটি এখানেই মঞ্চস্থ হয়ে গেল। কামরুল, আবুবকরের কর্মকান্ডে খুব ক্ষুব্ধ, আর আবুবকর, কামরুলের। গোস্‌সার চোটে কিছু না খেয়েই কামরুল বেরিয়ে গেল। বিষয়টা আমাদের কারো জন্যই স্বস্তিদায়ক ছিল না।

বিষয়টা বুঝতেই আমার লাগলো কিছুক্ষণ। আমরা সবাই-ই এক জায়গায় বসে আছি, কামরুল বেরিয়ে গেছে। যখন বিষয়টা বুঝে এলো, তখন দ্রুত আমি ব্যাগ কাঁধে তুললাম। দলের একজন সদস্য রাগ করে একা চলে গেছে, এটা কোনোভাবেই সুসংবাদ নয়। সে রাগের মাথায় অঘটন ঘটিয়ে দিতে পারে। বাকিরাও ততক্ষণে উঠে পেড়েছে। সবাই-ই বেরিয়ে পড়লাম। সবাইকে রেখে আমি অনির্দিষ্টের পথে হাঁটা ধরলাম। কারণ, সামনে কোথাও কামরুলকে দেখা যাচ্ছে না।

(চলবে…)

-মঈনুল ইসলাম

_________________________

বিশেষ দ্রষ্টব্য: কথা দিচ্ছি, ইনশাল্লাহ, যদি সব কিছু ঠিকঠাক থাকে, আগামী পর্বে দুটো প্যানোরামা আর একটা ভিডিও থাকবে।

শেষ পর্ব »

One thought on “অফ-ট্র্যাক বান্দরবান ২০১২ (কিস্তি ৯)

মন্তব্য করুন