অফ-ট্র্যাক বান্দরবান ২০১২ (কিস্তি ৬)

অন্ধকারের পথ ধরে আমরা চলছি কোনো এক অজানা পাড়ার সন্ধানে, কেউ জানিনা, আদৌ আছে কি নেই। পাড়া না পেলে অনেকটা পথ আবার ফিরে গিয়ে আস্তানা গাড়তে হবে নদীর বাঁকে। এমন সময়…

আবুবকর চিৎকার করে বললেন,পাড়া, পাড়া। পাড়া আছে এখানে।

সাথে সাথে মরুভূমির মধ্যে পানির কূপ পাবার মতো সবার মনে কী যে অনাবিল আনন্দ ছেয়ে গেল, বলে বোঝাবার নয়। সবার চলার গতি বেড়ে গেল দ্বিগুণ। ডানদিকের পাহাড়টা ধরে উপরে উঠতে লাগলাম আমরা। একসময় উপরে উঠে এলাম এক লোকালয়ে— হ্যা, এটা একটা পাড়া।

লোকজনের সাথে কথা বলতেই বেরিয়ে এলো, এটা “এনেঙ পাড়া”। আপেল নাকি নিচ থেকে বাচ্চাদের চিৎকার শুনে পাড়াটার সন্ধান পেয়েছে। ব্যস, আমাদের খুশি আর ধরে না। আবুবকর আর কামরুল আনন্দে উদ্বেলিত হলো, ওদের পরিকল্পনায় ভুল ছিল না— দুজন পরস্পরকে জড়িয়ে ধরলো খুশিতে। আবুবকর, পরিচিত একটা ঘর পেয়ে গেলেন, তাদের বাড়িতেই থাকার পরিকল্পনা করলেন। কামরুল ততক্ষণে আমাদেরকে একটা ব্রিফ দিয়ে দিল এই পাড়া সম্বন্ধে:

এনেঙ পাড়া, কেউ কেউ বলেন এনঙ পাড়া। এটা একটা ত্রিপুরা পাড়া। এই পাড়াটার অবস্থান ভৌগোলিকভাবে বেশ আকর্ষণীয়, কারণ চারদিকে উঁচু উঁচু পাহাড় দিয়ে ঘেরা এমন পাড়া আর সচরাচর নাকি দেখা যায় না। আরেকবার এসে কামরুল এখানেই ওদিকটার এক পাহাড়ের উপর দিয়ে য়্যাব্বড় একখানা রুটি, থুক্কু, চাঁদ দেখে একেবারে প্রেমে পড়ে গিয়েছিল সে। আজ অবশ্য চাঁদ দেখার কথা না, কৃষ্ণপক্কের রাত। আমরা ঘরে গেলাম।

সকালের এনেঙ পাড়া (ছবি: নাকিব)
সকালের এনেঙ পাড়া (ছবি: নাকিব)

জীবনে এই প্রথম কোনো পাহাড়িদের ঘরে থাকা। তাই প্রশ্নগুলো করে নিতে ভুলছিলাম না আবুবকরকে। জানলাম, প্রয়োজনীয় কিছু যদি এঁদের থেকে নিয়ে ব্যবহার করা হয়, এরা সেটা খুশিমনে দিবে, খুব সহায়তাপরায়ণ। যাবার সময় একটা গড়পড়তা হিসেব করে কিছু টাকা ধরিয়ে দিয়ে গেলেই এরা খুশি। কিছু না দিলেও এদের কোনো অভিযোগ থাকবে না, খুশিমনে বিদায় দিবে। জানলাম, এরা কিছুই করে না— না লেখাপড়া, না আড্ডাবাজি (তাই বলে সামাজিক গল্প-গুজব করে না বললে ভুল হবে, এদের মধ্যে ভালো-মন্দ আছে এবং দ্বন্দ্ব-কোন্দলও আছে), শ্রেফ বেঁচে থাকার সংগ্রাম করে। সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনি করে, সন্ধ্যা হলেই এরা খেয়ে-দেয়ে শ্রেফ ঘুমায়। আবুবকর বললেন, এই তো একটু পরেই দেখবেন, সবার চোখ ছোট ছোট হয়ে আসবে। আরো জানালেন, আমাদের জন্য তাদের ঘুমের ব্যাঘাতই ঘটছে, সবাই ঘুম বাদ দিয়ে আমাদের দেখছে বসে বসে।

এনেঙ পাড়ার ঘরের এক কোণে পরিবারের সবাই জড়ো হয়ে আমাদের গিলছে (ছবি: রাসেল)
এনেঙ পাড়ার ঘরের এক কোণে পরিবারের সবাই জড়ো হয়ে আমাদের গিলছে (ছবি: রাসেল)

ছোট্ট একটা বাচ্চা আছে, হামাগুড়ি দিয়ে গিয়ে এটা-ওটা মুখে নিচ্ছে। ওটাকে খুব আদর করতে ইচ্ছা হলো। কিন্তু যদি পেশাব করে দেয়, তাহলে মহা-ফ্যাসাদে পড়ে যাবো। তাই দূর থেকেই ঈশ্বরের ঐ আজব সৃষ্টিকে উপভোগ করলাম মন ভরে। শিশু, এই পৃথিবীর একটা অপূর্ব দৃশ্য।

শরীরটা বেশ ধরে গেছে। হাঁটতে হাঁটতে পায়ের পেশীগুলো ব্যথা করছে প্রচন্ড। যদিও যতটা মনে করেছিলাম, তার তুলনায় কম। কারণ হলো, অ্যাংকলেট, পায়ের গোড়ালিকে অধিক ব্যবহার-সত্ত্বেয় নড়তে দেয়নি জায়গা থেকে, নী-ক্যাপ, হাঁটুর বাটিকে ধরে রেখেছিল, তাই হাঁটার তুলনায় পেশিগুলো নড়াচড়া করেছে কম, ফলে তাদের পরিশ্রম কিছুটা হলেও শুষে নিয়েছে এই দুই বস্তু। তবু আমাদের দুই গাইড মাংসপেশীর ব্যথানাশক ওষুধ “মূভ” মাখার জন্য মরিয়া হয়ে উঠলো। মূভ আমরা কেউই নেইনি, জানা গেল নাকিব নিয়েছে। দুই গাইড ওটা দিয়ে রীতিমতো গোসল করলো। রাসেল তার পায়ে মাখিয়ে নিল। আমার কেন জানিনা বাম কাঁধে খুব ব্যথা করছে। বুঝতে পারলাম, ব্যাগ বহনের কারণে। কিন্তু দুই কাঁধে ব্যথা না করে এক কাঁধে ব্যথা করছে কেন? আমি, কাঁধে একটু মূভ মাখলাম; আর পেইনকিলার খেয়ে নেয়া জরুরি মনে করলাম, কারণ সামনের দিনগুলোও আমাদের হাঁটতে হবে।

তারও আগে আমরা সবাই পাহাড় থেকে নেমে ঝিরির পানিতে মুখ-হাত ধুয়ে নিয়েছিলাম। খুশির ঠ্যালায় যে মাগরিবের নামাযটা ছুটে গেছে, সেটা খেয়ালই ছিল না। খুব আফসোস হলো। যাহোক, মুখ-হাত ধুতে গিয়ে আবার বুঝলাম, আমার টর্চটা অসাধারণ কাজ করছে। এদিকে কামরুলের আনা ছুরি দিয়ে আমাদের দুই গাইড বিকাশ আর আপেল, কিনে আনা মাছগুলো কেটে-কুটে পরিষ্কার করতে লেগে গেল। এদিকে কামরুল জানালো, এখানে প্রাকৃতিক কৃতকর্মটি সারতে হবে এই খোলা জায়গায়, কোনো এক পাথরের আড়ালে। আশ্চর্য হলাম না। তবে সমস্যা হলো নাকিব। ওর আবার কোথাও গেলে এই জিনিসটা বেশ ভোগায়। অনেক সময়ই সে পায়খানা না হবার ঔষধ খেয়ে যায়। তাছাড়া ওর আবার এরাকনোফোবিয়া (arachnophobia) আছে, মানে মাকড়সাভীতি। মাকড়সা দেখলে খাওয়াতো দূরে থাক, পায়খানা-প্রস্রাবও বন্ধ হয়ে যায়। আমি ওকে তাই ‘ল্যাডিস’ বলে ক্ষেপাই।

যাহোক হাত-মুখ ধুয়ে যখন আকাশে তাকিয়েছি, আমি যেন হারিয়ে গেলাম মহাশূণ্যে…। সবগুলো তারা যেন কোনো এক জ্বলজ্বলে চাদর দিয়ে ঢেকে দিল আমায়। পাহাড়ের উপরে এত্তো এত্তো তারার ভিড়ে উরসা মেজর খুঁজতে মনে ছিল না।

ঘরে ফিরে আমরা বাসিন্দাদের থেকে একটা বড় কুমড়া নিলাম। তারপর সেটা কাটার পালা। পাহাড়িদের দা’র গঠনটা হলো কিরিচের মতো, ধারালো দিকটা লম্বাটে। তাই আমাদের দা দিয়ে তেমন একটা সুবিধা করা গেলো না কুমড়া কাটায়। কুমড়া কাটা শেষে পাহাড়ি ছোট্ট, এই এত্তটুকুন, কিন্তু ঝা–ল, মরিচ গুড়া করা হলো অন্যান্য মসলার সাথে (ছোট মরিচের ঝাল বেশি)। গুড়া করার জন্য এরা শিল-পাটা ব্যবহার না করে ব্যবহার করে ঘুটনি। বাঁশের ঘুটনির ভিতরে গাছের ডালের ছেচনি। ঘুটনি নামটা সিলেটে ব্যবহৃত হয়, ছেচনি নামটা আমি এখন দিলাম।

রান্না করছে আমাদের শেফ বিকাশ। সহায়তা করছে আপেল আর ঘরের একজন বাসিন্দা। রান্না করতে করতে আমরা ঘরের বাঁশের চাটাইয়ের মেঝেতে গামছা বিছিয়ে নামায পড়ে নিলাম। বিশ্রাম পেয়ে শরীরটা যেন ব্যথা একটু বেশি করছে। এর মধ্যে খাবার প্রস্তুত হয়ে গেল। আমরা সবাই পাহাড়ীদের প্লেটে খাবার নিয়ে বসলাম। তাদের প্লাস্টিকের বোতলে জমিয়ে রাখা পানি দিয়ে তৃষ্ণা নিবারণ করলাম। এদের পানি রাখার জন্য, বোতল ছাড়াও আরেকটা পাত্র আছে: একটা ফল থেকে এটা বানায় এরা। ফলটা ঠিক কলসের ছোট্ট আকৃতি। লাউয়ের ভিতর থেকে শাঁস বের করে চুলার উপর শুকিয়ে যেভাবে ডুগডুগি কিংবা পাত্র বানানো হয়, ঠিক এভাবেই এটাকেও পানি রাখার পাত্র বানানো হয়। তবে সত্যি বলছি, ওটাতে রাখা পানির মধ্যে একটা গন্ধ হয়, গন্ধটা আমার ঠিক ভালো লাগেনি। যাহোক, মেনু হলো মাছ দিয়ে এক তরকারি, আর কুমড়া দিয়ে এক তরকারি। বাড়তি তরকারি রেখে দেয়া হলো, যাতে সকালে নাস্তা করা যায়।

রাত্রে ঘুমানোর সময় ওরা আমাদেরকে দুটো ছোট কম্বল দিল; আমাদেরকে ভাগ করে নিয়ে ঘুমাতে হবে। মশা মোটেই নেই, তাই ওডোমস মাখার প্রয়োজন মনে করলাম না। কামরুল আর আবুবকর একটা স্লিপিং ব্যাগে থাকবে, বিকাশ আর আপেল একটা কম্বলের নিচে, নাকিব নিজের আনা ফুলানো বালিশ আর শীত-চাদরের নিচে, আমি আমার কাপড়গুলো দিয়ে বালিশ আর নিজের আনা চাদরটার নিচে, রাসেল নিজের ফিতা-ব্যাগ দিয়ে বালিশ আর এদের দেয়া কম্বলের নিচে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিলাম। খুব একটা ঠান্ডা কিন্তু না। …কিন্তু রাত যত গভীর হলো, ঠান্ডা আমাদেরকে জেঁকে ধরলো। পাতলা চাদরটা ঠিক তাল মেলাতে পারলো না। রাসেলেরও খুব কষ্ট হচ্ছে, নাকিবও স্বস্তি পাচ্ছে না। এর মধ্যে রাত তিনটার দিকে জেগে উঠলো প্রকৃতির অপূর্ব সৃষ্টিটা, ত্রাহী চিৎকার করে জানাতে থাকলো তার কোনো অবরুদ্ধ আবদার। সবার ঘুমেরই বারোটা।

পাহাড়ে ভোরের উজ্জ্বল চ্ছটা, এনেঙ পাড়া থেকে তোলা (ছবি: নাকিব)
পাহাড়ে ভোরের উজ্জ্বল চ্ছটা, এনেঙ পাড়া থেকে তোলা (ছবি: নাকিব)

সূর্য ওঠার আগে দেখি কামরুল আর আবুবকর উঠে পড়লো। পরে জেনেছি, এই আধো-অন্ধকারে ওরা কোথায় গেছিল। ওরা যাবার সময় রাতের ঠান্ডার কথা শুনে ওদের স্লিপিং ব্যাগটা আমাদের উপর দিয়ে গেল, ওটার উষ্ণতায় বেশ ভালো ঘুম হলো বাকি সময়টুকুতে। ভোর আটটায় বেরোবার কথা থাকলেও আমাদের উঠতে দেরি হয়ে গেল। উঠে, নাকিব চলে গেল নিজের কৃতকর্মটি সেরে পরিষ্কার হতে। গিয়ে বড় একটা পাথরের আড়ালে বসলো। কাজ প্রায় শেষ, এমন সময় নাকি দুজন লোক ওপাশ থেকে হেঁটে আসছিল। নাকিব, দ্রুত পরিষ্কার হয়ে লুঙ্গি তুলে অ্যাটেএএনশন্! ভাবটা এমন— আমি আসলে প্রকৃতি দেখতে বেরিয়েছি!!

বুঝে গেছেন নিশ্চয়, কামরুল আর আবুবকর কেন ভোরে উঠেছে?

রাতের বাড়তি খাবারটুকু গরম করে প্রস্তুত করলো বিকাশ। সবাই যখন খাবার খেতে বসবে, তখন রাসেলের দরকার পড়লো কৃতকর্মটি সারার। …আর সময় পেলো না। সবাই-ই একটু বিরক্ত হলো, ব্যাটা এতক্ষণ কী করেছিস!! সে আবার একা যাবে না, সঙ্গে নিলো আমাকে। কেন আমাকে? আমি নাকি ওকে পাহারা দিব, যাতে নাকিবের মতো কেউ এসে ওকে বিরক্ত না করে। যাহোক, আমি শেষ পর্যন্ত উন্মুক্ত-ল্যাট্রিনের পাহারাদার হলাম। কিছুক্ষণ হলো কাজ সারছে রাসেল, এর মধ্যে রাসেলকে দেখার লোভ সামলাতে পারলো না ‘একজন’!!!

এমন ‘একজন’, যার ব্যাপারে রাসেলকে আসলে ওয়ার্নিং দেয়ার ঠিক প্রয়োজন মনে করলাম না। সে গিয়ে পাথরের ওপারে অনতিদূরে দাঁড়িয়ে রাসেলের দিকে তাকিয়ে থাকলো। রাসেল পাথর ছুঁড়েও ওটাকে দূরে সরাতে পারলো না। শেষ পর্যন্ত অস্বস্তিতে বেচারা দ্রুত কৃতকর্ম সমাধা করে উঠে এলো। আর উঠতেই… উঠে আসতেই, ঐ ব্যাটা ধাড়ি শুকর দৌঁড়ে গিয়ে মুখ দিল ঐ…।

রাসেল, এই দৃশ্য দেখে সহ্য করতে পারলো না। রাতে যদি উষ্ণ একটা ঘুম হতো, তাহলে এতক্ষণে বেচারা সুস্থ থাকতো, কিন্তু রাতের ঠান্ডায় পা তার স্বাভাবিক হয়নি পুরোপুরি, ব্যথা নাকি যেমন ছিল তেমনই আছে। তার উপর এই দৃশ্য দেখে বমির উদ্রেক হলো তার। কিন্তু পেটে দানাপানি নেই এই ভোরে, কোনো রকমে রক্ষা পেলো।

উপরে উঠে এসে দেখি সবার খাওয়া শেষ, শুধু আমাদের দুজনের জন্য দুটো প্লেটে খাবার রাখা। খাবারটাও দেখে খুব একটা সুবিধার লাগছিল না, হয়তো এইমাত্র ঘটে যাওয়া বিষয়টা আমাদের দুজনকেই একটু মিশিয়ে দিয়েছে। কিন্তু মনের জোর আমার সবসময়ই আছে, এসব ঘেন্না একটু কম। দ্রুত খেয়ে নিলাম। রাসেল তেমন খেতে পারলো না। হাত ধুয়ে বেরিয়ে এলাম, দলের সবাই বাইরে বেরিয়ে গেছে। আবুবকর ভাই এর মধ্যে হিসাব নিকাশ করে গড়পড়তায় ৳৫০০ ধরিয়ে দিয়েছেন ঘরের বাসিন্দাদের। তারা মহা খুশি!

বাইরে বেরিয়ে তাকালাম ঘরটার দিকে, রাতের অন্ধকারে কিছুই বুঝিনি এটার। ঘরটা অবশ্যই বাঁশের উপরে, সব পাহাড়ীরাই যেভাবে বানায়। বেড়াগুলো বাঁশের চাটাইয়ের। আর শন বা খড়ের চাল। ঘরকে যতটুকু উঁচু করা হয়েছে বাঁশ দিয়ে, নিচে ততখানি জায়গা জুড়ে জ্বালানি কাঠ রাখা। নাকিব ওর ক্যামেরায় ধারণ করলো দূরের পাহাড়ের উপর সূর্যোদয়ের আগমনী আলোর চ্ছটা, আর এনেঙ পাড়ার কিছু ছবি। সবাই একসাথে দাঁড়িয়ে একটা গ্রুপ ছবি তুললাম। একটাতে আমি নেই, একটাতে নেই কামরুল।

এগুলোকে আমি বলি ‘মেটে-ঝরণা’, মেঝের খুব কাছাকাছি, তবু কলকল আওয়াজ তুলে মাতিয়ে রাখে (ছবি: লেখক)
এগুলোকে আমি বলি ‘মেটে-ঝরণা’, মেঝের খুব কাছাকাছি, তবু কলকল আওয়াজ তুলে মাতিয়ে রাখে (ছবি: লেখক)

সবার থেকে বিদায় নিয়ে আবার নেমে গেলাম আমরা ঝিরিতে, ততক্ষণে বেশ দেরি হয়ে গেছে: সকাল ৯টা। রাসেলকে নাকিব খাইয়ে দিয়েছে একটা পেইনকিলার। গত রাতের এই শীতে আমরা এই ঘরের ভিতর কাবু হয়ে বুঝেছি, যদি পাড়া না পেতাম, শ্রেফ একটা পলিথিনের শেল্টারে কী বিপদই না ডেকে আনতাম নিজেদের। একটা পাড়া আমাদের কিছু টাকা খসিয়েছে হয়তো, কিন্তু ফিরিয়ে দিয়েছে আগের মতো উদ্যম। তাই আজ এই সকালের মিষ্টি আলোয় হাঁটছি আমরা। এখনো সূর্য অতোটা উপরে উঠেনি বলে চলার পথে এখনও রোদ পড়েনি অতোটা। বেশিদূরে নয়, ছোট্ট একটা পাথুরে ঢালের দুপাশে ছোট্ট অনুচ্চ ঝরণা, এগুলোকে আমি বলি ‘মেটে-ঝরণা’। দেখে মন ভরবে না, মনে হবে ইশ! বর্ষায় কী যে দারুণ লাগবে জায়গাটা! আরো সামনে ডানদিকে দেখলাম একটা মৃত ঝরণা। বর্ষায় হয়তো এটা জেগে উঠবে। হাঁটতে হাঁটতে আরেকটা ছোট স্বর্গে চলে এলাম আমরা।

দ্বিতীয় স্বর্গে ভোরের আলোকচ্ছটা। এখানে কামরুলের ছবিগুলো আশা করি ভালো এসেছে। (ছবি: লেখক)
দ্বিতীয় স্বর্গে ভোরের আলোকচ্ছটা। এখানে কামরুলের ছবিগুলো আশা করি ভালো এসেছে। (ছবি: লেখক)

স্বর্গটায় একটু অপেক্ষা করলাম। খুব ভালো লাগলো জায়গাটা। সকালের সূর্য গাছের ফাঁক দিয়ে চ্ছটা দিয়ে পথটাকে পুরো স্বর্গ বানিয়ে রেখেছে। যাহোক, স্বর্গও ছাড়তে হলো সামনের স্বর্গ ধরার জন্য। কারণ সামনে অপেক্ষা করছে আরো আকাঙ্ক্ষিত স্বর্গ।

হাঁটতে হাঁটতে আমরা একটা পাড়া এলাকায় পৌঁছলাম। সেখানে একটা বরই গাছ পেয়ে ওটা থেকে বরই খাওয়ার জন্য উঠেপড়ে লাগলাম। ঢিল ছুঁড়ে তেমন একটা বরই পেলাম না, স্থানীয়রা সাবাড় করে দিয়েছে। তবু যে ক’টা পেলাম, ভালো মিষ্টি। বরই খেয়ে আবার চললাম। সামনের পাড়াটি হলো মেনদ্রুই পাড়া। প্রথমেই একটা স্কুল পেলাম, ওটার সাইনবোর্ডে লেখা অবশ্য “মেনডক পাড়া বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়” (২নং রুমা সদর ইউনিয়ন)। এই পাড়াটাও ত্রিপুরা পাড়া। বেশ সমতলেই (ঝিরি সমতল) থাকে এরা।

মেনদ্রুই পাড়ার অধিবাসী, পিঠে ঝোলানো বল্টু (ছবি: লেখক)
মেনদ্রুই পাড়ার অধিবাসী, পিঠে ঝোলানো বল্টু, সামনে আবুবকর জিপিএস রিডিং নিচ্ছেন (ছবি: লেখক)

রাসেলের অবস্থা আমাদেরকে একটু চিন্তিতই করলো। আমাদের এখনও আজকের দিনসহ আরো তিনদিনের পরিকল্পনা। সেখানে রাসেলকে এভাবে টেনে নেয়া ঠিক হবে কিনা বুঝতে পারছি না। তাই রাসেলকে যদি এখান থেকে রুমাতে পাঠিয়ে দেয়া যায় কোনোভাবে, তাহলে আমাদের সামনে চিন্তা করা সহজ হয়। দুজন বাসিন্দাকে পাওয়া গেল স্কুলের সামনে। একজন পুরোপুরি স্থানীয়, পিঠে একটা বল্টু ঝোলানো। বল্টু মানে ঐ যে, বিধাতার আশ্চর্য সৃষ্টি! পিঠে ঝুলে ঝুলেই অতটুকু মিনি মিনি চোখ দিয়ে দেখার চেষ্টা করলো আমাদেরকে। কী বুঝলো কে জানে, নিস্পৃহ চেহারা নিয়ে ঝুলেই থাকলো পিঠে।

পাড়ায় অপূর্ব আলোকচ্ছটা, আইফোন না হয়ে এসএলআর হলে... ওফ্‌!
পাড়ায় অপূর্ব আলোকচ্ছটা, আইফোন না হয়ে এসএলআর হলে… ওফ্‌! (ছবি: লেখক)

স্থানীয় ব্যক্তি আমাদেরকে একটা পথ বাতলে দিলেন, সামনের পাহাড়ের ওপাশের একটা পাড়ার সন্ধান দিলেন, ওখানে নাকি ট্রাক আসে মাল নামিয়ে দিতে, নিয়মিত না অবশ্য; ওখানে গেলে ট্রাকে করে যাওয়া যাবে রুমা। কিন্তু হিসাব-নিকাশ করে যে বিষয়টা উদ্ধার হলো, ওখানে যেতে পাড়ি দিতে হবে বড় বড় পাহাড় আর ও’পাড়ায় গিয়েও যে গাড়ি পাওয়া যাবে এমন নিশ্চয়তা নেই। রাসেল যদিও বেশ উৎসাহী ছিল চলে যাবার জন্য, কিন্তু টীমলিডার আবুবকরের সিদ্ধান্ত হলো এরকম অনিশ্চয়তায় ওকে ঠেলে দেয়া যায় না। তাছাড়া বড় বড় পাহাড় ডিঙানো চাট্টিখানি কথা না, তাও পা ভাঙা অবস্থায়। তাছাড়া এই পাড়ায়ও কোনো স্থানীয় গাইড পাওয়া গেল না, কারণ সবাই-ই এই জুম-মৌসুমে ব্যস্ত। অগত্যা, রাসেলকে নিয়েই সামনে চলার চিন্তা করলাম আমরা। আজকের লক্ষ্য: সন্ধ্যার আগে রুমানা পাড়া খুঁজে বের করা।

আবারো ঝিরিতে নামলাম আমরা। চলার পথে আগের মতোই বড় বড় পাথর, পাহাড় থেকে পড়া গাছ, ভেজা পাথরে শ্যাওলা, উঁচু উঁচু পাহাড়ে তীর্যক সূর্যের অপূর্ব খেলা —একই দৃশ্য, তবু মায়াময়! চলতে চলতে এক জায়গায় আমরা পেলাম দুটো গয়াল, গতকাল যেমনটি পেয়েছিলাম। গয়াল (Bos frontalis) হলো গরুর জাতভাই, কেউ ডাকে বনগরু বলে। নিরীহ প্রাণী, কিন্তু ইদানিং তেমন আর দেখা যায় না এদের। গৌর আর গয়ালে সামান্য পার্থক্য আছে।

ছবিটাতে একসাথে দেখা যাবে উঁচু পাহাড়ে গাছ, জঙ্গলে ঢুকে যাওয়া ঝিরি, আর মেটে-ঝরণা। ছবিটা দুটো ছবি জোড়া দিয়ে বানানো। (ছবি: লেখক)
ছবিটাতে একসাথে দেখা যাবে উঁচু পাহাড়ে গাছ, জঙ্গলে ঢুকে যাওয়া ঝিরি, আর মেটে-ঝরণা। ছবিটা দুটো ছবি জোড়া দিয়ে বানানো। (ছবি: লেখক)

যা হোক এগিয়ে চললাম। গভীরে, আরো গভীরে। কোথাও ঝিরির পানিতে পথচলা, কোথাও পাথুরে পাহাড়ে বেয়ে উঠা, কোথাও গাছে ঢাকা পথে শুকনো পাতা মাড়ানো তো কোথাও গাছের মগডাল মাড়ানো… ‘মগডাল মাড়ানো’ পড়ে আশ্চর্য হবেন না, কারণ সত্যিই মগডাল মাড়ানো লাগতে পারে আপনার। কারণ জুম চাষের কারণে একটা পাহাড়ের সব গাছ কেটে সাফ করে নামিয়ে দেয়া হয়েছে ঝিরিতে। গাছের কাটা, চিকন মগডালে সবকিছু ছেয়ে আছে পথটার। ওপথ দিয়ে খুব কষ্টে পাড়ি দিল দলটা, কিন্তু সবার শেষে থাকা আমি আর কামরুল জিতলাম। পরে দেখি বাম দিকে বনের ভিতর দিয়ে কন্টকবিহীন সুন্দর পথ আছে। অযথাই বেচারারা কষ্ট করলো!

কোথাও ঝিরির কাছেই এভাবে খানিক উঁচু পাথর ডিঙাতে হয়। (বাম থেকে: বিকাশ, আবুবকর, কামরুল, নাকিব) (ছবি: লেখক)
কোথাও ঝিরির কাছেই এভাবে খানিক উঁচু পাথর ডিঙাতে হয়। (বাম থেকে: বিকাশ, আবুবকর, কামরুল, নাকিব) (ছবি: লেখক)

সামনে পেলাম একদল পাহাড়ি কিশোর-কিশোরী, ঝিরিতে বাঁধ দিয়ে মাছ ধরছে। আমরা কাছাকাছি হতেই ওরা একটা মাছ পেয়ে গেল। আবুবকর চাক্ষুস করে আমাকে বললেন, ওরা মাছ দেখেই দা দিয়ে দিয়েছে কোপ, ব্যস, লেজে পড়ে আটকে গেছে বেচারা। ওটা দেখে আমার কাছে মনে হলো ‘কুইচ্চা’ (অনেকে ডাকে ‘কুচিয়া’), সাপ আর বাইন মাছের গোত্রের। আবুবকর কিনে নিতে চাইলেও ওরা বিক্রী করলো না।

মেনদ্রুই পাড়ার পথে অপূর্ব সূর্যের আলোকচ্ছটা (ছবি: কামরুল)
মেনদ্রুই পাড়ার পথে অপূর্ব সূর্যের আলোকচ্ছটা (ছবি: কামরুল)

সামনে এগিয়ে চললাম। এবারে বালুময় ঝিরির বদলে পাথুরে ঝিরির পরিমাণ একটু বাড়লো। এতে আমাদের আরো একটু সাবধান হতে হলো। কারণ ঝিরির পানিতে ভিজে থাকা প্রত্যেকটা পাথর শ্যাওলা জমে মৃত্যুকূপ হয়ে আছে। এর মাঝে কোনো কোনো পাথর আবার নড়বড়ে। সামনের পা শ্যাওলা-ধরা পাথরে রেখে, ভালোমতো স্থির করে, তারপর পিছনের পা তুলতে হচ্ছে। হাঁটতে হাঁটতে আবারো সামনে পেয়ে গেলাম গতকালকের মতো একটা পাথুরে বিছানা। কেন যে এটা বর্ষাকাল না, মনে করে আফসোস করা ছাড়া আর কিছুই ছিল না। তবে, গতকালকেরটা ছিল আরো ভাটিতে, তাই ওখানে শ্যাওলা ছিল না, কিন্তু এটাতে পিচ্ছিল পাথরের অভাব নেই।

আরেকটু সামনে এগিয়ে দেখি সবাই দাঁড়িয়ে গেছে। খুব মজা করে কী যেন খাচ্ছে। এগিয়ে গেলাম। গিয়ে দেখি বিকাশ একটা কাচা চালতা হাতে নিয়ে চামড়া ছিলছে আর সবাই সঙ্গে আনা লবণ বের করে তা মাখিয়ে খাচ্ছে। ক্ষুধার মধ্যে এই টকটুকুও যে স্বাদ হতে পারে বোঝা যাচ্ছিল এই ক্ষুধার্ত লোকগুলোকে দেখে। কষ থাকলেও খারাপ লাগেনি। তবে বেশি খাওয়া ঠিক হবে না। আবার পথ ধরলাম।

দেখে মনে হতে পারে জমজমের কূপ; বাম দিকে শুষ্ক-ঝরণা, ডান দিকে ঝরণার পানি যেখানে পড়ে (ছবি: লেখক)
দেখে মনে হতে পারে জমজমের কূপ; বাম দিকে শুষ্ক-ঝরণা, ডান দিকে ঝরণার পানি যেখানে পড়ে (ছবি: লেখক)

ডানদিকে চোখে পড়লো একটা পাথুরে ঝরণা, তবে সম্পূর্ণ শুষ্ক। কিন্তু এই ঝরণাটা যে বেশ আগের, সেটা খুব আন্দাজ করা যায়, কারণ পানির প্রবাহ পাথরে স্থায়ী খাঁজ বানিয়ে ফেলেছে। খাঁজটাও বেশ খানদানী খাঁজ। আবার যেখানে পানি পড়ে, সেখানখার খাঁজটাও বেশ কারুকাজমণ্ডিত। গাছের চিপায় কসরত করে ঢুকে ওটার ছবি তুলতে হলো।

কামরুল যেভাবে পার হচ্ছে, এভাবেই তিনটা পাথরের নিচ দিয়ে পার হতে হয় এখানটায় (ছবি: লেখক)
কামরুল যেভাবে পার হচ্ছে, এভাবেই তিনটা পাথরের নিচ দিয়ে পার হতে হয় এখানটায় (ছবি: লেখক)

সামনের পথটা পেরোতে হয় তিনটা পাথরের নিচ দিয়ে। আরো সামনে এগিয়ে চললাম। পাথরগুলো বিশ্রীভাবে ঝিরিপথে শুয়ে আছে। টপকাতে বেশ ঝক্কি পোহাতে হচ্ছে। একেতো একটা থেকে আরেকটার দূরত্ব বেশি, তার উপর একেকটার পুরুত্ব অনেক। তাই একটা থেকে আরেকটায় লাফিয়েই যেতে হচ্ছে, আবার ভয়ে থাকতে হচ্ছে, ভেজা স্যান্ডেল না আবার পিছলে যায়।

আমাদের পথটা এগিয়ে গেল সামনে। সামনে গিয়ে দেখি একটা ঝরণা। অনুচ্চ, তবে বেশ বেগ আছে পানিতে। ঝরণার নিচে দুজন পাহাড়ি মাছ ধরছেন। তাদের ভেলাটা বাঁশের। পানির তীব্র তোড় ভেলাটাকে যেন সরিয়ে না নেয়, সেজন্য বিশেষ কৌশল নিয়েছেন: অশ্বক্ষুরাকৃতি অঞ্চলটার তিন দিকে তিনটা বাঁশ আটকেছেন এরা পাথরের খাঁজে। যখন যেদিকে যেতে হয়, সেদিককার বাঁশ ধরে টান দিয়ে এগোন তারা। আর মাছ ধরার জন্য ব্যবহার করছেন কারেন্ট জাল। জাল পেতে রেখেছেন পানির নিচে। আর আরেকটা বাঁশ দিয়ে পানির নিচে, পাহাড়ের গভীর খাঁজগুলোতে গুতো দেন। এতে ওখানে আশ্রয় নেয়া মাছগুলো দ্রুত বেরিয়ে এসে আটকা পড়ে জালে। এদের মাছধরা দেখার চেয়ে ছায়াময় এই জায়গাটা, পানির সংস্পর্শ, বাতাস আর ঝরণার আওয়াজে আরো বেশি স্বর্গীয় আবেগে জড়িয়ে ফেলে।

স্বর্গীয় ঝরণায় মাছ ধরছেন দুই পাহাড়ি (ছবি: কামরুল)
স্বর্গীয় ঝরণায় মাছ ধরছেন দুই পাহাড়ি (ছবি: কামরুল)

কিন্তু সমস্যা অন্য জায়গায়। আমাদের পথটা এসে মিশেছে এই ঝরণায়। সামনে যেতে হলে ঝরণা পেরোতে হবে। কিন্তু ঝরণা পেরোন কি চাট্টিখানি কথা? পিচ্ছিল পাথর সোজাসাপ্টা বলে দিচ্ছে, উঠো আর পিছলে পড়ে মরো। এদের জিজ্ঞাসা করা হলো এরা কি জানে কিনা, উপরে উঠলে রুমানা পাড়া পাওয়া যাবে কিনা। এরা বললো জানে না, এরা অন্য পাড়া থেকে এসেছে।

আমি তখন তাকিয়ে আছি ডান দিকের একটা পাহাড়ের দিকে। একটা হালকা পায়ে-চলা-পথের মত রেখা মনে হচ্ছে। দেখলাম আপেল ওদিক দিয়েই পথ বের করেছে উপরে ওঠার। আমাদের আবারো খাড়া পাহাড় বেয়ে ওঠা। কিন্তু কেন জানি এবার বুক কাঁপলো না। বুঝতে পারলাম, বেশ মনোবল আসছে নিজের উপর, এটা ভালো লক্ষণ। তবে ওভার-কনফিডেন্ট না হয়ে যাই, সচেতন ছিলাম।

খাড়া পাহাড় বেয়ে ঝরণা পাড়ি দেয়া এবার যেন কষ্ট দেয়নি তেমন (ছবি: লেখক)
খাড়া পাহাড় বেয়ে ঝরণা পাড়ি দেয়া এবার যেন কষ্ট দেয়নি তেমন (ছবি: লেখক)

নাকিব খুব বিরক্ত। এতো পথ পাড়ি দিয়ে এসে এভাবে আবার পাহাড়ে চড়া মোটেই আকর্ষণীয় নয়। আমি, ওর পিছনে থেকে প্রতি মুহূর্তে বলে দিতে থাকলাম, না, ওটা না, বড় ডালটা ধর। না না, চিকন বাঁশ ধরিস না। হুঁ হুঁ, কক্ষণও গাছের উপরের দিকে না, গোড়ার কাছাকাছি জায়গায় ধর্। হুঁ হুঁহ, আরেকটু সামনে পা ফেল, ওখানে পাথর আছে। তবে আগের চেয়েও বেশ সহজেই পার পেয়ে গেলাম পাহাড়টা। উঠে এলাম ঝরণাটার উপরে।

'ধাপ-ঝরণা'র উপরের দুটো (ছবি: নাকিব)
‘ধাপ-ঝরণা’র উপরের দুটো (ছবি: নাকিব)

এখানে এসে তো আরো অবাক, উপরে আরো দুটো ঝরণা। এগুলোকে বোধহয় বলে ‘ধাপ-ঝরণা’, কে জানে? উপরেরগুলো তুলনামূলক ছোট ধাপের, ঐ-যে আমার ‘মেটে-ঝরণা’র মতো আরকি। নিচে থাকতে যদি খেয়াল করতাম, তাহলে দূর থেকে তিনটার একত্র ছবি তোলা যেত নাকিবের ১২এক্স অপটিক্যাল দিয়ে। যাহোক, আমরা ঝরণাটার কোনো নাম পেলাম না পাহাড়িদের থেকে। আন্দাজ করলাম, এটা এখনও কোনো ভ্রমণকারী আবিষ্কার করেননি, আমরাই প্রথম। তবে নাম আমরাও দিলাম না, ভ্রমণ বাংলাদেশ, এই দায়িত্ব তাদের কাছে রেখেছে। (তাদের স্বার্থে কোঅর্ডিনেটও শেয়ার করলাম না)

অনুভূতিটা এবার বেশ ভালো: যাক, অভিযানটা শুধু প্রথমবারেরই না, অভিযানটা সফলও। ফুরফুরে মন নিয়ে আরো সামনে এগোলাম আমরা। ঝিরি তার সৌর্যবীর্য দেখিয়েই যাচ্ছে। চলতে চলতে বেশি দূর যেতে হলো না, পথটা গিয়ে ঠেকেছে আরেকটা উঁচু ঝরণার পাদদেশে। একেবারে সাক্ষাৎ ডেড এন্ড

৮৫ ডিগ্রি খাড়া পাহাড়, পাহাড়ের খাঁজ দিয়ে উঁচু থেকে পানি পড়ছে, নিচে জলপতনে সৃষ্ট গভীর কূপে ভরাট পানি, উঠার কোনো পথ নেই: শুধু এই ঝরণা। আগের ঝরণাটার মতো পাশের পাহাড়টাও ডাকছে না, বরং এই পাহাড়ের গাছগুলো ৮৫ ডিগ্রির মধ্যে দাঁড়িয়ে আমাদের বলছে: যাও, বাছাধন, ফিরে যাও, এদিকে তাকিও না, ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিব

এই প্রথম…, হ্যা, এই প্রথমবারের মতো আমি খুব হতাশ হলাম। কারণ ১: ফেরার পথ হলো যতটুকু পেরিয়েছি, ততটুকু ফিরে গিয়ে মেনদ্রুই পাড়ায় যাওয়া। কারণ ২: ফিরে না গেলে এখানে পঁচে মরা। কারণ ৩: না-মরতে-চাইলে ঐ খাড়া ঝরণাটা বইতে না পারলেও বাইতে যাওয়া, এবং অবধারিত মৃত্যু কিংবা গুরুতর জখম। এতোটা হতাশ এই অভিযানে আমি আর একবারও হইনি।

দলনেতা গাইডদের নির্দেশ দিলেন, সে নির্দেশ অনুযায়ী আমরা আবার পিছিয়ে এসে একটা কম ঢালু পাহাড় বেছে নিলাম। গাইডরা ওটা বেয়ে উপরে উঠে গেল। আমরাও তাদের অনুসরণ করে উঠতে গিয়ে আটকে গেলাম মহা-ফ্যাসাদে: বেত কাঁটায় সবার হাত-পা-শরীর-ঘাঢ় ছড়তে থাকলো। পথটা মোটেই স্বাগত জানানোর নয়। সবারই রাগ পড়লো গিয়ে দুই গাইডের উপর, উঠার সময় বেতকাঁটাগুলো কেটে কেন উঠলো না!

মাঝপথে, পাহাড়ের ঢালে দলনেতা আবুবকর আটকে গেলেন। তাঁকে আটকাতে দেখে সবাই-ই নিজ নিজ জায়গায় আটকে থামলাম। মরার উপর খাড়ার ঘা হয়ে উপর থেকে দুই গাইড, বিকাশ আর আপেল যেন গর্ব করে জানালো: উপরে কোনো পথ নেই।

আমি একটা ঝরণা-পথের মতো দেখে, দলনেতার অনুমতি নিয়ে ওদিকটা দেখার চেষ্টা করলাম। জানালাম, কষ্ট করে উঠা যাবে, কিন্তু উপরে উঠে যে পথের দিশা পাব, তার কী গ্যারান্টি? এর মাঝে চেহারা দেখালো দুই গাইড, উপর থেকে নিশ্চিত করলো: কোনো পথ নেই!!!

আমার হতাশা আমাকে ঘিরে ধরছে। সার্ভাইভাল সিচুয়েশনে হতাশা… শ্রেফ, হতাশাই পারে একজন সার্ভাইভারকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে। এক্কেবারে ডেড এন্ডে দাঁড়িয়ে সামনে কি আর ভাবা যায়?

(চলবে…)

-মঈনুল ইসলাম

পরের পর্ব »

মন্তব্য করুন