অফ-ট্র্যাক বান্দরবান ২০১২ (কিস্তি ৫)

দুই পাশে উলঙ্গ, ৯০ ডিগ্রি খাড়া পাহাড়, মাঝখানে কিছুটা গভীর পানি। এপাড়ে দাঁড়িয়ে আমরা সাতজন, যেতে হবে সামনে, যাবার জন্যেই এসেছি।

এরকম পরিস্থিতিতে আগেও পড়েছি, কিন্তু এরকম খাড়া নাঙ্গা পাহাড়ের সামনে পড়িনি সত্যি বলছি। একেবারে রক ক্লাইম্বার হওয়া লাগবে, যার প্রস্তুতি আমাদের নেই। সুতরাং আর একটাই সহজ পথ খোলা আছে আমাদের সামনে— সাঁতার। আবুবকর তাই সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করলেন না। দ্রুত সবাই প্রস্তুতি নিল। সত্যি বলতে কি প্রস্তুতি আমাদের ছিলই, তবু, পরনের কাপড়গুলোর সব ভিজানো ঠিক হবে না। নিম্নাঙ্গের কাপড় ভিজুক, কিন্তু উর্ধ্বাঙ্গের কাপড়গুলো শুকনো রাখতে পারলে ক্ষতি কী?

এমন সময় পানি যেখানে গিয়ে ওপাশের পাথরে মিশেছে, ওখানে দেখা গেল একটা কিছু পানির উপর ভাসছে। ভালো করে তাকিয়েই বুঝে গেলাম, ওটা একটা ভেলা। তবে কলা গাছের নয়, ওটা বাঁশের তৈরি ভেলা। একটু ডানদিকে সরতেই পাথরের আড়ালে দেখা গেল ভেলার মালিককে। এখান থেকেই ভেলাটা ব্যবহারের অনুমতি নিয়ে নিলেন আবুবকর আর আপেল মিলে।

কিন্তু ভেলাটা রয়েছে ওপারে, ওটা গিয়ে আগে কাউকে আনতে হবে। আপেল আর আবুবকর ওটা আনার দায়িত্ব নিলেন। নেমে গেলেন পানিতে। এদিকে আমি সব খুলে গামছা দিয়ে নিজের লজ্জা নিবারণ করলাম। ওরা ভেলাটা এপাশে নিয়ে আসতেই কামরুলকে সহায়তা করলাম ব্যাগগুলো উপরে তুলতে। কিন্তু খুব বেশি ব্যাগ ওতে তোলা গেলো না। ওটা বেশ হালকা, আর ফাঁক গলে পানি উঠে যাচ্ছিল। কামরুল বুদ্ধি করে আমাদের সাথে আনা বড় পলিথিনটা বিছালো ভেলার উপর, তারপর ব্যাগগুলো সন্তর্পনে রাখলাম। তবু কিছু পেছনে ফেলে যেতে হলো।

ভেলা এনে দিয়ে আবুবকর আর আপেল চলে গেলেন ওপাশে। সাথে করে নিয়ে গেলেন নাকিব আর রাসেলকে। আমাদের ভাগ্য সুপ্রসন্ন যে, দলের সবাই সাঁতার জানতাম। সাঁতারের ব্যাপারটা কেন যে আগে নিশ্চিত করে আসিনি আমরা, সেটা আসলেই একটা বোকামি হয়ে গেছে। যাহোক, ওরা ওপারে চলে গেলে খালি ভেলা নিয়ে ফিরে এলো বিকাশ। এবারে ব্যাগ নিয়ে চললাম আমি, কামরুল আর বিকাশ।

সাঁতার কেটে ঝিরি পার
সাঁতার কোনো ব্যাপারই না, কিন্তু পানি আমাদের অনুকূলে ছিল না (পিছনে বিকাশ, সামনে বামে আমি, ডানে কামরুল (ছবি: রাসেল)

ছোট্ট এক টুকরা গামছা দিয়ে নিজের লজ্জা নিবারণের চেষ্টা যে কী কষ্টকর, সেটা হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করছিলাম। আবার এই গামছাকে ধন্যবাদ না দিয়েও পারছিলাম না এর বহুধা ব্যবহারের জন্য: প্রথমে মাথা ঢাকলাম রোদ থেকে; তারপর নাক-মুখ ঢেকে নিনজা হয়ে গেলাম ধুলা থেকে বাঁচতে; তারপর ঘাম মুছলাম; তারপর হাত-মুখ ধুয়ে পানি মুছলাম; তাছাড়া ঠান্ডা বাতাস থেকে বাঁচতে গলাও প্যাঁচিয়ে রেখেছিলাম, যাতে কাশি না হয়; এবারে লুঙ্গি হিসেবে ব্যবহার করছি।

পানিতে পা দিয়েই কেঁপে উঠলাম। পানি যে ঠান্ডা, সেটা আমরা ঝিরির পানিতে হেঁটে আসার সময়ই বুঝেছিলাম, কিন্তু এই পানিতে সাঁতার কাটার চিন্তাটা তখন করিনি। আমি বরাবরই ঠান্ডায় বেশি কাবু হয়ে যাই। এবারেও ঠান্ডা পানিটা আমায় ঠিক স্বস্তি দিল না। পানিতে নেমে আমরা যখন ব্যাগসুদ্ধ ভেলাটা ঠেলে নিয়ে যাচ্ছিলাম, তখন হঠাৎ টান খেয়ে ডানদিকে পানি উঠতে চাইলো। তাই আমি ডুব সাঁতার দিয়ে এগিয়ে কামরুলের সঙ্গী হলাম, ধরলাম ভেলার ঐ কোণাটা। এপারে আসতে আসতে আমাদের একপ্রস্থ ফটোসেশন হয়ে গেছে নাকিব আর রাসেলের ক্যামেরায়।

এপারে এসে ব্যাগগুলো নামিয়ে যখন ঠান্ডা থেকে হাফ ছেড়ে বাঁচছিলাম, তখন কামরুল জানালো, ওপারের ব্যাগগুলো আনতে যেতে হবে। ও একা যেতে একটু দ্বিধাগ্রস্থ দেখলাম। অগত্যা দলগত কারণেই আবার চললাম ঐ প্রচন্ড ঠান্ডায় জমে মরতে। পরের ধাপের ব্যাগগুলো এনে আমি যখন জমে যাচ্ছি ঠান্ডায়, কামরুল তখন, একটু হাঁপিয়ে ওঠা ছাড়া তেমন কষ্ট পাচ্ছে বলে মনে হলো না। তখন বুঝলাম, স্বাস্থ্যবান মানুষের শরীরের তাপমাত্রা একটু বেশি থাকে।

ফেলে এলাম ভেলা, ফেলে এলাম লাবাখুম (ছবি: নাকিব)
ফেলে এলাম ভেলা, ফেলে এলাম লাবাখুম (ছবি: নাকিব)

এপাড়ে এসে আমরা যখন কাপড় বদলে আবার ট্রেকার হচ্ছিলাম, তখন আবুবকর ঐ পাহাড়ির সাথে আলাপ জমিয়ে জায়গাটার নাম বের করে ফেলেছেন: লাবাখুম। জিপিএস রিডারে আবুবকর দেখলেন, লাবাখুম, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৩৯৪ ফুট উঁচুতে (22° 1’36.80″N 92°28’26.91″E)। আরো একটা কাজ আবুবকর আর আপেল সেরে নিয়েছেন, ঐ পাহাড়ির কাছ থেকে ৪টা পাহাড়ি তাজা মাছ কিনে নিয়েছেন তারা (সাকুল্যে ৳১৫০.০০)। পাহাড়ি ব্যক্তি, মাছগুলোকে বাঁশের সুতায় একত্র করে আমাদের কাছে বিক্রী করে দিলেন।

পাহাড়ি ঝিরির মাছ, এই চারটা মাছ আমরা কিনেছিলাম
পাহাড়ি ঝিরির মাছ, এই চারটা মাছ আমরা কিনেছিলাম (ছবি: নাকিব)

মাছ নিয়ে আবার বাক্স-পেটরা পিঠে ঝুলিয়ে ট্রেকার হয়ে গেলাম সবাই। আমি, শুকনো কাপড়গুলো পরে যখন শরীরটাকে গরম করার জন্য একটু জোর দিয়ে হাঁটছি, তখন রাসেল ঘোষণা করলো, এই ঠান্ডা পানির গোসলটা তার জন্য পুরোপুরি রিফ্রেশিং— একেবারে ফাউন্টে’ন অফ ইয়ুথের মতো সে নাকি ডুব দিয়ে বুড়ো-রাসেল থেকে যুবক হয়ে গেছে। 🙂 হাঁটছে বেশ ঘটা করে। মাঝখানে আমি একটু হাসি, কারণ অনেকক্ষণ আগে খাওয়ানো পেইনকিলারটা কাজ করছে বেচারার।

আমাদের লক্ষ হলো, সন্ধ্যা নামার আগে যে-করেই হোক একটা পাড়ার সন্ধান বের করা। তখনও বুঝতে পারিনি, আবুবকর আর কামরুল কেন এতো মরিয়া হয়ে ‘পাড়া’ ‘পাড়া’ করছে। ওঁদের হিসাব ঠিক হলে আমরা এই পথেই আজ সন্ধ্যার আগে “এনেঙ পাড়া” নামে একটা পাড়া পাবার কথা। কিন্তু হিসাবটা খুব বেশি কাটাকাটা: যদি সবকিছু হয় সময়মতো, যদি হাঁটা হয় বিরামহীন, দ্রুত, কেবল তাহলেই…। একটু উচ্চাশা কি?

কিন্তু রাসেলের প্রাণ ফিরে পাওয়ায় দলটা এবার উদ্যোমই পেল। পথের সৌন্দর্য্য আলাদা কিছু নয়, নতুন কিছু নয়, তবু সুন্দর। একঘেয়ে পথেও আমরা মুগ্ধ হচ্ছি। প্রকৃতি জিনিসটাই শহুরেদের মন ভরিয়ে দেয়ার মতো। তাই একঘেয়ে পথেও “এনেঙ পাড়া” নামক সোনার হরিণ ধরতে আমরা ঠিকই উদ্যোম নিয়ে হাঁটছিলাম।

এবার আমি লক্ষ করলাম, আমার মুখটা হা করে শ্বাস নিচ্ছি আমি। তারমানে হাঁটতে হাঁটতে ঠিকই হাপিয়ে উঠেছি। কিন্তু শরীরটা এখনও বেশ সাপোর্ট দিচ্ছে দেখে আশ্চর্য হইনি। সব ট্যুরেই আমি সচল, একটু বেশি সচল থাকি। কিন্তু বিশ্রাম পেলে না আবার রোগ জেঁকে বসে!

হাঁটতে হাঁটতে আমাদের যোহরের ওয়াক্ত শেষ হবার মতো অবস্থা। তাই যাত্রাবিরতি নিয়ে আমরা নামাযের প্রস্তুতি নিলাম। আমি, নাকিব, কামরুল আর আবুবকর নামায পড়ার জন্য ওযু করে নিলাম ঝিরির পানিতে। নিজেদের কাঁধ থেকে গামছাটা পাতা-ঝরে-পড়া-মাটির উপর বিছিয়ে দিলাম, আর এতো কাজের কাজি গামছা হয়ে গেলো জায়নামায। নাকিবের আনা কম্পাসটা আমাদেরকে নির্ভুল দিক নির্ণয় করতে সহায়তা করলো। যদিও অচেনা জায়গায় দিক ঠিক করতে অসমর্থ হলে যেকোনো দিকে ফিরেই নামায আদায়ের অনুমতি ক্বোরআন-সিদ্ধ। সেদিন শুক্রবার হওয়াসত্ত্বেয় আমরা খুৎবা আর জামে মসজিদের অভাবে জোহরের নামায আদায় করলাম। তবে পড়লাম ক’সর নামায (পরিশিষ্ট ১): যোহরের ৪ রাকা’আত ফরযের বদলে ২ রাকা’আত ফরয।

নামায শেষ করে আবার পথ চলা। পাহাড়ের আড়ালে সূর্য ঢলে পড়ায় আলো কমে এসেছে। তবুও এখনও দিনের আলো আছে, তাই আমাদের পথচলা থামার নয়। মাঝে মাঝে কামরুল আমাকে জানায়, একটু অস্বস্তির কথা, একটু সংশয়ের কথা— সম্ভাব্য এনেঙ পাড়া পৌঁছবার পথ কিন্তু এখনও প্রায় ৩-৪ ঘন্টার। তবে আবুবকর কিছু একটা বলেও যেন বলতে চান না, শুধু বলেন হাঁটো; হাঁটার গতি দ্রুত করতে বলেন।

আবুবকরের এই জিনিসটা প্রশংসার দাবিদার। আমি এটাকে বলি “আর্মি ট্রিটমেন্ট”। সেনাবাহিনীতে যারা কাজ করেন, তারা কিন্তু আমার-আপনার মতোই মানুষ। কিন্তু অমানষিক কাজগুলো তারা করেন, শ্রেফ তাচ্ছিল্যের কারণে। তাদের উর্ধ্বতনরা সব সময়ই তাদের কাজকে অবজ্ঞা করেন, পড়ে গেলে চিৎকার করে বলেন, উঠো, হাত লাগাও। পড়ে যাওয়াটা সেখানে অপরাধ, সেজন্য পেতে হয় শাস্তি, চলতে থাকাটা সেখানে সাধুবাদের যোগ্য। আবুবকরও ঠিক একই ট্রিক কাজে লাগাচ্ছেন নাকিব আর রাসেলের উপর: নাকিব একটু মোটাসোটা, কোথাও হয়তো পাথরে পা লেগে একটু মাংস উঠে গেছে, আবুবকর বলেন, ও কিছু না, ওরকম কত হবে! উঠে পড়েন, ওগুলোর দিকে তাকাবেন না। (নাকিব নাকি বিষয়টা বুঝতে পেরেছিল, এবং এক সময় মনে মনে আবুবকরকে ধন্যবাদও দিয়েছিল)। আবুবকর, রাসেলকে বারবার তাগাদা দেন, আপনি [সবার সামনে হাঁটতে থাকা] আপেলকে ধরেন, যান; পা চালান। এই ব্যাপারটা যে কাজে দিয়েছিল, তা আপনারা বুঝতে পারবেন, অনেক ছবিতে যেখানে আমাদের অনেক সামনে আপেল আর বিকাশের সাথে রাসেলকে দেখবেন। নাকি এটা ঐ ফাউন্টেন অফ ইয়ুথের কীর্তি!! 😉

কামরুলের সংশয় আমি আবুবকরের মতোই নিজের মধ্যে কবর দিলাম। কারণ সার্ভাইভাল গাইড থেকে জেনেছি, দলের মধ্যে, ভয় যদি একজন সদস্য পায়, তবে তা দাবানলের মতো পুরো দলকে গ্রাস করে ফেলে। তাই যা-হয়-হোক ভেবে নিয়ে সামনে এগোনোটাই নিজের কর্ম বানিয়ে নিলাম। পথে আমরা অনেক জায়গায়ই ছোট ছোট ঝরণার মতো প্রপাত দেখেছি। নীরব প্রকৃতিতে আমাদের পায়ের আওয়াজ ছাপিয়ে পানির গমগম আওয়াজ কেমন যেন ভীতি সঞ্চারক। ভয়-ডর আমার বরাবর একটু কম। তাই পরিবেশ যেমনটাই হোক, আমি আছি আমার পথে— পথ চলতে হবে, বোঝা হওয়া যাবে না দলের ঘাঢ়ে।

ঝিরির ঝরণা
রাসেল আমাদের অনেক সামনে, আপেল আর বিকাশের সাথে এগিয়ে যাওয়ার ক্লান্তি বসে, বিশ্রাম করে কমিয়ে নিচ্ছে। (ছবি: কামরুল)

পথ যেখানে নেই, সেখানে পথ বানিয়ে নেয়া হচ্ছে। কিন্তু এমন একটা স্থানে এলাম, যেখানে উঁচু পাথরের উপর আমরা দাঁড়িয়ে, ওপাশে বেশ দূরে আরো উঁচু পাথর, মাঝখানে বেশ কিছুটা (গভীর?) পানি। লম্বা একটা বাঁশ জোগাড় করে পানির গভীরতা আন্দাজ করা হলো প্রথমে। দলের নেতৃত্ব দিল বিকাশ। তারপর পাথরের খাঁজ ধরে স্বচ্ছ পানির মধ্যে খুঁজতে থাকলো পাথরের মধ্যে পা রাখার জায়গা। এমনিতেই সূর্য গেছে ঢলে, তার উপর জায়গাটায় অনেক বেশি গাছ-গাছালি। খুব বেশি একটা দেখা যাচ্ছে না। তার উপর বিকাশের হেঁটে যাওয়া পথে কাদা উঠে ঘোলা হয়ে গেছে পানি। আপেল আগেই পানি দিয়ে পার হয়ে গেছে। বিকাশের পিছন পিছন আবুবকর, তারপর রাসেল, নাকিব, আমি চললেম। সবার শেষে থাকলো কামরুল। সবাই নিজেদের ব্যাগগুলোকে টেনে মাথার উপর তুলে নিলাম, যাতে পানি না লাগে। তারপর পানির মধ্যে পা দিয়ে আন্দাজ করে করে পাথরের নিশানা খুঁজে নিয়ে নিয়ে পার হয়ে গেলাম ওপারে।

জঙ্গলের বন্ধুর পথ
এভাবে গাছের ডাল, আর খাড়া পাথরের ভাঁজ পেরিয়ে পথ চলতে হয়েছে কোথাও। এখানে নাকিবকে পার হতে দেখা যাচ্ছে (ছবি: লেখক)

বেশ কিছুটা সময় খেয়ে নিল বন্ধুর পথটা। সামনের খাঁজটায় আমরা আসরের নামায পড়ে নিলাম। এই বিশ্রামস্থলে আমরা একপ্যাকেট বিস্কুট খেয়ে নিয়ে নিজেদের অ্যাংকলেট আর জুতা পরিষ্কার করে বের করে নিলাম জমে থাকা নুড়ি পাথরগুলো। তারপর আবার পথচলা। সামনের দৃশ্যটা আমাদের পাগল না করে পারলো না। ছবিটার দর্শকরা আমাদের জানিয়েছেন, এরকম দৃশ্য হাম হাম-এ যেতেও নাকি দেখা গিয়েছিল। পাড় ধরে এগোচ্ছি আমরা।

আমাদের পথ যেন আর ফুরাতেই চায় না। এদিকে সন্ধ্যা ছয়টা বাজতে আর মাত্র ১৫ মিনিট। আমি আমার ফোনের একটা অ্যাপ্‌স থেকে জেনে নিলাম বান্দরবানের ভৌগোলিক অবস্থানে সূর্যাস্ত হতে আর ৫-৭ মিনিট বাকি। সূর্য দেখছি না আমরা অনেকক্ষণ থেকে। অনেকেই বলে থাকেন, পাহাড়ে অন্ধকার নামে ঝুপ করে, হঠাৎ। বিষয়টা ঠিক কিনা, দেখার অপেক্ষায় থাকলাম।

আমি নিশাচর মানুষ বলে রাতকে ঠিক ভয় পাই না। কারণ রাতে ভূতের বাড়িতে অভিযান পরিচালনার অভিজ্ঞতা আমার আছে। কিন্তু তবু কেন জানি আবুবকর আর কামরুলের মতো খুব তাগাদা অনুভব করছিলাম একটা পাড়ার বড্ড প্রয়োজন। কেন? —আমাকে জিজ্ঞাসা করবেন না, আমি জানি না।

আশেপাশের পাথরের বিন্যাস, গাছ-গাছড়ার খোলামেলা ভাবসাব দেখে আমাদের মনে হতে লাগলো আশেপাশে কোনো পাড়া আছে। যে পাড়াই হোক না কেন, যদি পাড়া থাকে, তবে সেখানেই রাত কাটানো হবে; এনেঙ পাড়া পাবোই এমন নিশ্চয়তা আমাদের নেই। কারণ গুগল আর্থ দেখে করা পরিকল্পনা অনুযায়ী, আবুবকর আর কামরুলের ধারণা, এদিকে এনেঙ পাড়া থাকতে পারে। কিন্তু আমরা এই মুহূর্তে ম্যাপের কোন জায়গাটায় আছি, সেটা দেখা যাচ্ছে না, কারণ আসার সময় আবুবকরের নেয়া গুগল আর্থের ফাইলটা (.gpx) করাপ্টেড ছিল, ওটা জিপিএস রিডারে কাজ করছে না।

আশেপাশের পাহাড়গুলো বেশ উঁচু। আমাদের বিকল্প পরিকল্পনা হলো, যদি পাড়া না পাওয়া যায়, তবে এই মৌসুমে পাহাড়-চূঁড়ায় জুমঘর নিশ্চিত পাওয়া যাবে, কেননা এখন জুমের মৌসুম— পাহাড়ে পাহাড়ে জুমচাষ হচ্ছে। ‘জুমঘর’ হলো পাহাড়ের উঁচু ঢাল কিংবা চূঁড়ায় বানানো বিশ্রাম-ঘর। রোদের মধ্যে পরিশ্রম শেষে একটু বিশ্রাম নেয়ার জন্য এমন ঘর বানান পাহাড়িরা। এখানে জানিয়ে রাখি, “জুম” কোনো ফসলের নাম নয়, বরং পাহাড়ের ঢালে ভাঁজ সৃষ্টি করে চাষ করার পদ্ধতির নাম মাত্র। জুম পদ্ধতিতে প্রয়োজনীয় বিভিন্ন ফসল চাষ করে পাহাড়িরা।

এই সেই জায়গা, যেন কোনো বারমুডা ট্রায়াঙ্গ্যাল, ঘুরছি আমরা যেন এক চক্রে
এই সেই জায়গা, যেন কোনো বারমুডা ট্রায়াঙ্গ্যাল, ঘুরছি আমরা যেন এক চক্রে (ছবি: লেখক)

ডানদিকের একটা ঢালে বেড়া দেখে আন্দাজ করা গেল, পাড়া খুব কাছেই আছে। কিন্তু এটা রীতিমতো অসম্ভব যে, এই শরীরে একটার পর একটা পাহাড়ে উঠে উঠে যাচাই করে আসা, কোন পাহাড়ে একটা পাড়া আছে। সামনে, ঝিরিটা দুই ভাগ হয়ে গেলো। বামের পথটা বেশ গাছগাছালিতে পূর্ণ, ডানের পথটা পরিষ্কার। আমি খানিকটা দ্বিধান্বিত হয়ে পড়লাম। কিন্তু আবুবকর, কিভাবে যেন বললেন ডান দিকেরটা ধরতে। তাঁর কথার কনফিডেন্সকে সমীহ করলাম আমরা।

ডানদিকের পথটা ধরে চললাম। পাড়া পাবার আশা আমাদের মিইয়ে যায়নি এখনও। কারণ লক্ষণগুলো পাড়ার অস্তিত্বের কথাই বলছে। আমরা একটা পাহাড় ঘুরে এলাম। আমার কাছে মনে হলো আমরা যেন একটা পাক্কা ইউ-টার্ন নিলাম। কথাটা আবুবকরকে বলে বোধহয় একটু কনফিউজ করে ফেললাম।

সামনে, পাহাড়ের ঢালে হঠাৎ দেখি চারটা গয়াল। আবুবকর এক্কেবারে নিশ্চিত হয়ে গেলেন, অবশ্যই এখানে কোনো পাড়া আছে। কিন্তু পাহাড়ের গাছ-গাছালির আড়ালে কোত্থাও কোনো পাড়ার ঘর-বাড়ি কিংবা মানুষ দেখলাম না। তবু আমরা ঝিরিপথ ধরে এগিয়ে চললাম। অন্ধকার ধীরে ধীরে ঘিরে ধরতে থাকলো আমাদের। সূর্যাস্ত হয়ে গেছে পাঁচ মিনিট। এর মধ্যে আমাদেরকে বেশ দুর্গম বড় বড় কিছু পাথরের ভিতর দিয়ে পাহাড়ের ঢাল টপকাতে হলো। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো নাকিব, রাসেল কেউই কোনো সহায়তা ছাড়াই পার হয়ে গেলো পথটুকু। কোনো একটা পাড়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছি আমরা, বেশ বুঝতে পারছি।

এবারে ঝিরিটা ডানদিকে বাঁক নিল। নদীর নিয়মানুযায়ী যেদিকে বাঁক নিয়েছে, তার বিপরীত দিকে তৈরি করেছে একটা বিস্তৃত ঢাল। অন্ধকার ঘিরে ধরতে শুরু করেছে আমাদেরকে। বাঁকের ধরণ দেখে আমি নিশ্চিত হয়ে গেলাম যে, আমরা একটা পাহাড়কে মাঝখানে রেখে এমন একটা ঝিরি ধরেছি, যা ধরে আসলে এক জায়গায় ঘুরপাক খাচ্ছি।

অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে বলে আবুবকর সিদ্ধান্ত জানালেন, আমরা সবাই আরেকটু সামনে দেখে আসবো। যদি কোনো পাড়ার সন্ধান না পাই, তাহলে এই ঢালে এসে রাতের মতো আবাস গড়বো। যেই সিদ্ধান্ত, সেই কাজ। আমরা আরেকটু এগিয়ে দেখার জন্য চললাম। পথটা এখানেও পাহাড়ের উপর দিয়ে উঁচু-নিচু। অন্ধকারে শহুরে ছেলেদের চোখ ঘোলা হয়ে আসছে। রাসেল হাঁক দিল, কেউ টর্চ জ্বালো…। অন্ধকারে দেখি নাতো কিছু…।

নিশাচর আমি বিশ্বাস করি, যত বেশিক্ষণ অন্ধকারে থাকা যায়, তত চোখ সইয়ে নেয়া যায়। কিন্তু আলো জ্বাললেই আলোক-সংবেদী-চোখ অন্ধকারকে কিনে নেয়। তাই অসম্মতি থাকাসত্ত্বেয় দলের প্রয়োজনে টর্চটা বের করলাম। টর্চটা কিনেছিলাম বায়তুল মোকাররম থেকে মাত্র ৳১৭৫ [টাকা] দিয়ে। কিন্তু এক ব্যাটারির এই এলইডি বাল্বের টর্চটা যে এতো আলো দিবে, বুঝিনি। পথ দেখালো ওটা, রাসেলকে।

কিন্তু পাড়া কোথায়? আবুবকরের সিদ্ধান্ত শুনে বোধহয় শরীর হাল ছেড়ে দিতে চাইছে। কিন্তু পাড়া তো দেখছি না। অন্ধকারে, ঝিরিতে, আমরা সাতজন…

(চলবে…)

-মঈনুল ইসলাম

পরের পর্ব »

পরিশিষ্ট ১:

ক’সর নামায: আমরা যেহেতু আমাদের বাসস্থান (ঢাকা) থেকে ৪৮ কিলোমিটারের বেশি দূরত্বে ১৫ দিনের কম সময়ের জন্য রয়েছি, তাই আমাদের জন্য আল্লাহর একটা উপহার আছে, কম নামায। এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে মুসাফিরদের জন্য উপহারস্বরূপ, সব ৪ রাকা’ত ফরজ নামায হয়ে যাবে ২ রাকা’ত, আর ফযরের নামায বাদে আবশ্যকীয় সুন্নত-নফলগুলো হয়ে যাবে ঐচ্ছিক। আমরা তাই ট্যুরে থাকাকালীন যোহর, আসর আর এশার দুই রাকা’ত নামায পড়েছি।


বিশেষ দ্রষ্টব্য: যাবতীয় ভৌগোলিক কোঅর্ডিনেট “ভ্রমণ বাংলাদেশ”-এর সদস্য আবুবকর-এর সহায়তায় প্রাপ্ত।

৬ thoughts on “অফ-ট্র্যাক বান্দরবান ২০১২ (কিস্তি ৫)

    1. অত্যন্ত দুঃখিত। ভুলটা ধরিয়ে দেয়ার জন্য ধন্যবাদ।
      পরবর্তি পর্বের লিংকটা আসলে পরবর্তি পর্ব লেখার পরে দেয়া হয় কিনা, তাই ভুল পড়ে গিয়েছিল। এখন দিয়ে দিয়েছি। আপনার অসুবিধার জন্য আন্তরিকভাবে ক্ষমাপ্রার্থী।

মন্তব্য করুন