কর্মক্লান্তি থেকে পালাতে – পাহাড়ের উল্টো পিঠে : পর্ব ৫

পাইন্দু হেডম্যান পাড়া থেকে একপ্রকারে বিতাড়িত আমরা বৃষ্টির মধ্যেই পায়দল পরবর্তি পাড়ার উদ্দেশ্যে একাকি রওয়ানা করে বিজিবি ক্যাম্প এড়াতে ফের ঐ পাড়ায়ই ফিরে এলাম। সময়ের সাথে পাল্লা দিতে আমরা বাড়তি দামেই জহির (ছদ্মনাম) মাঝির ইঞ্জিনচালিত নৌকায় করেই রওয়ানা দিয়েছি পরবর্তি পাড়ার উদ্দেশ্যে। কিন্তু কাল রাত থেকে আজ দুপুর পর্যন্ত টানা বৃষ্টি পড়েছে। খালে এসে সেই ঢলও দেখা গেলো। আর আমরা চলেছি ইঞ্জিনচালিত নৌকায় চড়ে সেই ঢল ঠেলে উজানে, পরবর্তি পাড়ায়। এই দুয়েকদিনের মধ্যেই এই পথে মালামালসহ নৌকা উল্টে গেছে। কী আছে আমাদের ভাগ্যে আল্লা’ মালুম।

নৌকার হাল ধরেছে জহির। কতক্ষণ লাগতে পারে পরের পাড়ায় যেতে? জহির জানালো দেড়-দুই ঘন্টা। যোহরের নামাজটা পড়া হয়নি। তাই দ্রুত হাত বাড়িয়ে খালের ঢলে ওযু করে নিয়ে, এক পা এক পা বের করে ওযু সেরে নিলাম। তারপর ইশারায় কেবলামুখি হয়ে নামাযটা সেরে নিলাম। মোহনের ব্যাগ থেকে এক প্যাকেট বিস্কুট বের করা হলো, সকালের নাস্তার পরে আর কিছুই খাওয়া হয়নি। বিস্কুট সাবাড় হয়ে গেলো।

আবু বকরের মোবাইলটা বৃষ্টির মধ্যেও আমাদের প্রচুর ছবি তুলতে হেল্প করেছে – এই ঝুঁকিটা নেয়ার জন্য তাকে ধন্যবাদ দিয়ে ছোট করবো না। চিন্তা করলাম, নৌকা উল্টে গেলে সবই জলে যাবে। তাহলে নো রিস্ক, নো গেইন। ছবি তুলছি না কেন? আবু বকরের ব্যাগ থেকে ক্যামেরাটা বের করে নিলাম। ছবি আর ভিডিও নিতে থাকলাম।

পাইন্দু খাল পেরিয়ে দূরের পাহাড় দেখা যাচ্ছে
পাইন্দু খাল পেরিয়ে দূরের পাহাড় দেখা যাচ্ছে

ঘোলাজলের ঢল ঠেলে নৌকা এগোচ্ছে। ঢলের ঠ্যালায় দুই পাড়েরই কোথাও কোথাও মাটি ধ্বসে গেছে। কোথাও উঁচু পাহাড়ের গায়ে গজিয়েছে গাছের সারি, আর সেই শিকড়ের টানে আটকে আছে মাটি। পাহাড়ি বেলে মাটির পাথরের শক্ত পাড় কোথাও পাহাড়কে রক্ষা করছে। সব নদীর মতোই খালটা বাঁক নিয়েছে কখনও ডানে, কখনও বামে। বাঁকগুলোতে কাছের পাহাড়ের উপরে গজানো গাছের সারির উপর দিয়ে দূরের পাহাড়গুলোর গাছের সারি দেখা যাচ্ছে – এই দৃশ্য কেবল পাহাড়ি নদী আর খালেই সম্ভব। দৃশ্যটা উপভোগ্য।

জহির, বাঁকগুলো সাবধানে ঘুরছে। সাধারণত সাইকেল কিংবা মোটরসাইকেল রেসে আমরা দেখি পথ কমিয়ে আনতে বাইকাররা বাঁকগুলোতে বাঁক যেদিকে গিয়েছে, সেদিকে চেপে আসেন। জহিরেরও তাই করা উচিত। কিন্তু ধাক্কা খেয়ে শিখেছে, এভাবে গিয়ে যখনই সে নৌকাটা আবার পরের বাঁকের সাথে সোজা করতে যায়, তখনই উল্টে যাবার সম্ভাবনা বাড়ে।  কারণ, তখন পাড়ে ধাক্কা খেয়ে পানির আরেকটা স্রোত পাশ থেকে ধাক্কা দেয়। কিন্তু কিছুটা মাঝখান দিয়ে গেলে পাশ থেকে আসা ঐ ধাক্কাটা থাকে না। তাই অনেকটা ঝুঁকিমুক্ত থেকে এগোন যায়। কিন্তু পাহাড়ি ঢলে কোনো পন্থাই ঝুঁকিমুক্ত না। ঢল এরচেয়েও বহুগুণ মারাত্মক হতে পারে। টিভিতে র‍্যাফ্‌টিং করতে দেখেছি কত মারাত্মক ঢলে। ঐ তুলনায় এই ঢল তো সিল্কের মতো মোলায়েম।

পথে যেতে মেটেঝরণা
পথে যেতে মেটেঝরণা

বৃষ্টির সময় পাহাড়ে এখানে-ওখানে পানির ধারা ঝিড়ি বেয়ে নেমে আসাটা একটা অতি সাধারণ বিষয়। আর সেগুলো একটু উঁচু থেকে পড়লেই ঝরণা মনে হয় – আমি এগুলোকে নাম দিয়েছিলাম মেটেঝরণা। পাহাড়ে যারা প্রথম যান (এমনকি আমার ক্ষেত্রেও এটা হয়েছিল) তারা এগুলো দেখে রীতিমতো উল্লসিত হন। সেরকই একটা-দুটা মেটে ঝরণা দেখা গেলো এখানে-ওখানে।

এক জায়গায় গাছগাছালির ভিতর থেকে পাহাড় বেয়ে বেশ উচ্চতা থেকে একটা জলধারা পড়তে দেখা গেলো। কিন্তু ঝরণা হিসেবে সুনাম করার মতো কিছু না ওটা। নৌকা স্বগতিতে এগিয়ে চললো পরের পাড়াটা লক্ষ করে। এক জায়গায় দেখি কলার কাঁদি কেটে জড়ো করে রাখা হয়েছে – মালিককে দেখা যাচ্ছে না। পাহাড়ে কলার কাঁদি অঢেল আছে – এগুলো চুরি হবে না। আর এভাবে খালের পাড়ে এনে রাখার কারণ হলো নৌকা ঠিক করে এগুলো রুমা বাজারে নিয়ে যাওয়া হবে বিক্রীর জন্য।

হঠাৎ আবু বকর চিৎকার করে উঠলেন আমার নাম ধরে, কিছু একটা দেখিয়ে। ক্যামেরাটা দ্রুত তাক করলাম সেদিকে। কিন্তু যুম করেও ধরতে পারলাম না কী দেখেছেন আবু বকর। পরে জানলাম বনমোরগ। যাই হোক, ধরতে পারলাম না ক্যামেরায়। সামনে আরো এগোতে থাকলাম আমরা। এক জায়গায় দেখলাম খালের ডান পাড়ে পাথরের উপর কিছু একটা রাখা। ভালো করে তাকিয়ে দেখি, গাছের পাতার উপরে একটা বাটি রাখা। বুঝলাম, জলকে নৈবেদ্য দেবার কোনো ধর্মীয় প্রথা।

নৌকাটা আরো এগিয়ে গিয়ে বাঁক ঘুরতেই দেখি বিশাল বিশাল স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে আছে একটা অর্ধনির্মিত ব্রিজের কাঠামো। তার মানে এখানেও সড়কপথ চলে এসেছে। ব্রিজের পিলার পার হতেই এপাশে দেখা গেল, বড় বড় গাছের গুড়ি এনে কিভাবে বানের পানি আছড়ে ফেলেছে। পানির টানে উজান থেকে এই গাছগুলো উপড়ে এসে আটকে গেছে এই ব্রিজের পিলারে। ব্রিজ পার হয়ে সামনে দেখা গেলো দুটো নৌকা দাঁড় করানো। এগিয়ে গিয়ে আমাদের নৌকাটাও সেখানেই ভিড়লো। …এবং আমরা পরবর্তি পাড়ায় চলে এসেছি।

জহির মাঝি যে আসলেই একটা বাটপার এবার আবারও প্রমাণ পাওয়া গেল। কই ঘন্টা, দুই ঘন্টা আর কই ৪৫ মিনিট!! মাত্র ৪৫ মিনিটের দূরত্বকে সে বাড়িয়ে বাড়িয়ে দেড় ঘন্টা, দুই ঘন্টা বলে আমাদের থেকে বড় অংকের টাকা হাতিয়ে নেয়ার ধান্দা করেছিল। ঘাটেই যে দুটো নৌকা ছিল, তার মাঝেই পাওয়া গেল পাড়ারই একজনকে। ছেলেটা পাহাড়ি, অমায়িক হাসি। জানালো এটা আমাদের কাঙ্ক্ষিত পরবর্তি পাড়াটিই। সে যখন শুনলো আমাদের কাছে বাড়তি ভাড়া চাওয়া হয়েছে, খুব অনুযোগ করলো জহিরের প্রতি। বললো, উনারা মেহমান, মেহমানদের থেকে এরকম বেশি আদায় করা মোটেও ঠিক হয়নি। শেষ পর্যন্ত আবু বকরের মধ্যস্থতায় এই ছেলেই অনুরোধ করে কিছু টাকা কমালো আমাদের পক্ষে। তবে জহির পয়সার জন্য হলেও অন্তত আমাদেরকে দ্রুততম সময়ে এই ঢলেও এই পাড়ায় নিয়ে এসেছে – সেজন্য তাকে ধন্যবাদ।

আবু বকর ওখানে দাঁড়িয়েই ওর সাথে কথা বলে জেনে নিলেন আমরা সঠিক পথে আছি কিনা, আর যা যা জেনেছি তাও কিছুটা ঝালাই করে নিলেন। জানতে চাইলেন, ওদের পাড়ায় থাকা যাবে কিনা। উত্তরে অমায়িক হাসি হাসলো ছেলেটা, “অবশ্যই থাকা যাবে”। পরক্ষণে হাসিটা একটু কমিয়ে কিছুটা হাস্যমুখো কাঠিন্য এনে আগের মতোই অমায়িকভাবে বললো, “কিন্তু আমাদের পাড়ায় কিছু নিয়ম আছে; আমাদের পাড়ায় হেডম্যান আছেন, মেম্বার আছেন, তাঁদের সাথে দেখা করেন। তাঁরাই ঠিক করে দিবেন কুথায় থাকতে পারবেন।” কথা আলবৎ সত্যি।

চান্দা হেডম্যান পাড়া, রুমা, বান্দরবান - নিশাচর
পাড়াটার ভিতরেই উঁচু-নিচু টিলা – এমনটা সচরাচর দেখা যায় না।

অল্প একটু উঠতেই পাড়ার ঘর দেখা গেল। পাড়ার ঘরগুলো পেরিয়ে, পাশ কাটিয়ে এগোচ্ছি আমরা। আবু বকরের কথায় লক্ষ করলাম, আসলেই তো: এই পাড়াটা অন্যসব পাড়া থেকে একটু বিচিত্র – পাড়ার ভিতরে কোথাও উঁচু টিলা, কোথাও নিচু সমতলভূমি – এমনটা সচরাচর দেখা যায় না। হয় টানা উপরে উঠে যেতে থাকে, নয়তো পাহাড়ের উপরে একই সমতলে ঘরগুলো থাকে। এই উঁচু এই আবার নিচু – এমনটা এই পাড়ায়ই দেখলাম আমরা।

চান্দা হেডম্যান পাড়ার বিশাল বটগাছ - নিশাচর
বিশাল একটা বটগাছ যেনবা মাতৃছায়া রেখেছে পাড়াবাসীকে।

ঘরগুলোর পাশ কাটিয়ে এগিয়ে একটা বিশা—ল বট গাছের সামনে উপনীত হলাম আমরা। এতোটাই বিশাল, আমি হা করে তাকিয়ে থাকলাম ওটার দিকে। একটু উঁচু পাহাড়ের গায়ে দাঁড়িয়ে বিস্তৃত ডালপালা ছড়িয়ে যেন পাড়াটাকে মায়ের মতো আঁচল পেতে আকড়ে রেখেছে গাছটা। বড় বটগাছ দেখলেই আমার অ্যাভাটার মুভির মাদার ট্রি-টার কথা মনে পড়ে যায়। ❤️ গাছটাকে বামে রেখে সামনে এগিয়ে একটা ঘরে ঢুকলাম, আসলে এটা একটা হোটেল।

ভিতরেই পরিচয় করিয়ে দেয়া হলো আমাদের সাথে, পাড়ার হেডম্যান আর মেম্বার দুজনেই আছেন ওখানে। আমরা বসলাম। আবু বকর প্রাথমিক কথা চালিয়ে গেলেন। জানালেন আমরা ওনাদের পাড়ায় থাকতে আগ্রহী, থাকা যাবে কিনা। চায়ের অর্ডার দিলেন আবু বকর, আমি চা খেতে চাইলাম না। মেম্বার আর হেডম্যানকেও চা দিতে বললেন তিনি; আর, আমাদের এই পাড়ার গাইডকেও। আরো ক’জন মানুষ আছেন ঘরটায়। আরো জনা কয়েক এসে জুটলেন ঘরটাতে। বেশ জোরালো আলোচনা চলছে। কিন্তু আমরা কিছুই বুঝতে পারছি না, সব তাদের ভাষায়।

কিন্তু একটা ব্যাপার পরিষ্কার – আমাদের আগমন এই পাড়ায়ও সুখের ঘটনা নয়। হলো কী আমাদের পরিচিত পাহাড়ের! 😞

অনেকক্ষণ কথাবার্তা চলার পর যা জানানো হলো, তা হলো আমাদেরকে স্কুলঘরে থাকতে হবে। শুনে আবু বকরের যে মাথা গরম সেটা আমি বুঝলাম না। ওঁরা জানালেন, আলো জ্বালাতে মোমবাতি লাগবে। কিন্তু আমি বোকার মতো পিছন থেকে নিচু গলায় আবু বকরকে বলে বসলাম, “আমার কাছে মোমবাতি আছে।” বলেই বুঝলাম, কিছু একটা গুবলেট করে ফেলেছি। আবু বকর অল্প একটু ফিরলেন আমার দিকে, তাতেই তার চেহারা দেখে যা বুঝার বুঝে নিলাম আমি। চুপ গেলাম। কিন্তু আমাদের ভাগ্য বদলাতে পারলেন না আবু বকর। সমস্যাটা আমরা নই, সমস্যাটা হলো, এর আগে এই পাড়ায় একদল ছেলে-মেয়ে এসেছিল। পাইন্দু পাড়ায়ও তাদের কথা শুনেছি। শীতকালে, ওরা ঐ পাড়ায় উঠে জল পান করে শুকনো পাইন্দু খালে ট্রেক করতে নেমেছিল। ওরাই এই পাড়ায় উঠে স্কুল ঘরে থেকে ট্রেডিশন ফেলে গেছে।

মেনে নেয়া ছাড়া গত্যান্তর নেই। বিকাল ৫টা। চায়ের বিল পরিশোধ করে আমরা একজন ব্যক্তির পিছু পিছু স্কুলঘরের দিকেই চললাম।

চান্দা পাড়া, চাইন্দা পাড়া, চাইন্দা হেডম্যান পাড়া, বান্দরবানের রুমা উপজেলার একটি পাড়া। ভৌগোলিক স্থানাংক 22° 5’11.48″N, 92°23’5.48″E। এটি পাইন্দু খালের সাথেই অবস্থিত। পাড়ায় হেডম্যান আছেন, আছেন প্রাক্তন মেম্বার। হেডম্যানের নাম: সাম-উঃ। কারবারির নাম: পাইঞ্চি। মেম্বারের নাম: উঠেন সাহ্‌‌। পাড়ার পাশেই একটা বিজিবি ক্যাম্প আছে। আছে বিদ্যুৎ সংযোগ। পাড়ার লোকজন মারমা সম্প্রদায়ের, এবং বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। আয়তনে বিশাল এই পাড়ায় আছে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, একটি খিয়াং ঘর, স্যাটেলাইট ক্লিনিক। এখান থেকে রুমা পর্যন্ত পাকা সড়ক আছে। আর, আমরা যে অর্ধনির্মিত ব্রিজ দেখেছিলাম, ওটা সম্পূর্ণ হয়ে গেলে এখান থেকে রোয়াংছড়ি পর্যন্ত সরাসরি পাকা সড়কে যাতায়াত করা সম্ভব হবে।

স্কুলঘরে যাবার পথে পড়লো খিয়াং – বিশাল খিয়াং ঘর বানিয়েছেন পাড়াবাসী। অনেকটা মাদ্রাসার মতো, সামনে বড় মাঠ আর সুন্দর খিয়াং ঘর। আগে দেখা খিয়াং ঘরের মতোই এরও ক্রমশ সরু হয়ে ওঠা চাল রয়েছে, তবে ছত্র কম। কিন্তু সিমেন্ট দিয়ে বানানো হলেও পাহাড়ি ঘরের ট্রেডিশন বজায় রেখে এই খিয়াংও উঁচু পিলার দিয়ে মেঝে থেকে উঁচু করে বানানো হয়েছে। খিয়াং ঘরের মাঠেই কয়েকটা পিচ্চি বিশাল বড় একটা ফানুস আগুনের উপর ধরে রেখেছে। খিয়াং ডানে রেখে সামনে এগিয়ে স্কুলঘরটা: চাইন্দা হেডম্যান পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, স্থাপিত ১৯৬৮। লম্বা স্কুলঘর, পুরোন জং ধরা টিনের চাল, বারান্দায় সবুজ রঙের খুব সুন্দর করে কাঠের বেড়া দেয়া, আর সামনেই আছে ফুলের বাগান – সুন্দর, ছিমছাম স্কুল।

স্কুলে কিছু যুবককে দেখলাম, একটা রুমে কী যেন করছে। ঐ ব্যক্তি পাশের রুমটা খুলে দিয়ে গেলেন আমাদেরকে। ঘরটাতে সবগুলো বেঞ্চ একপাশে নিয়ে একটার উপর আরেকটা তুলে রাখা হয়েছে, আরেকটা পাশ খালি। বেঞ্চগুলোর উপর নিজেদের ব্যাগ রেখে ফ্রি হলাম আগে। কয়েকটা ছেলে বারান্দার একপাশে বসে আড্ডা দিচ্ছে, মোহন আর তানভির কখন যে ওখানে গিয়ে ওদের সাথে গল্প করতে বসে গেছে, জানি না। আবু বকর কোথায়? আবু বকর খাবারের আয়োজনে ব্যস্ত। আমাকে বললেন, “আপনি ওনার সাথে যান। হেডস্যারের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে ল্যাট্রিনের চাবি নিয়ে আসতে হবে।”

আমি ঐ ব্যক্তিকে অনুসরণ করে আবার পাড়ার ভিতরে গেলাম। যেতে যেতেই শুনলাম, স্কুলে এখন পূঁজার ছুটি। স্কুলে তিনজন শিক্ষক, ছুটি পেয়ে চলে গেছেন। আর প্রধান শিক্ষক হলেন পাড়ার হেডম্যানের ছেলে। একটা সুন্দর কাঠের সিঁড়ি দেয়া ঘরে গিয়ে বারান্দায় দুজন ব্যক্তিকে বসা দেখলাম। করমর্দন করে নমস্কার জানালাম। বামদিকে বেশ ভারিক্কি নিয়ে একজন যুবক বসা, ইনিই হেডস্যার। আমাদের বৃত্তান্ত জানতে চাইলেন। আমি বললাম, পাহাড়ি ঢলে পর্যুদস্ত হয়ে আমরা আসলে আপনাদের পাড়ায় এসেছি। উনি বললেন, “পাহাড়ে সবাইকে বিশ্বাস করা যায় না, গাইড না নিয়ে আসা উচিত হয়নি আপনাদের।” আমি কিছু একটা বলে কাটালাম। তারপর স্কুলে থাকার অনুমতি চাইলাম। অনুমতিসহ টয়লেটের চাবিটা নিয়ে ফিরলাম। পাড়ায় আরো একটি বটগাছ নজরে এলো, গাছগুলো এই পাড়ার প্রাণ।

স্কুলের রুমটা ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার করে জুতাগুলো বাইরে রাখলাম আমরা। অ্যাংকলেট, নীক্যাপ খুলে পায়ের রক্ত চলাচল স্বাভাবিক করলাম। ওযু করে পাড়ায় উঠে এসেছিলাম, তাই ওয়াক্তের শেষ পর্যায়ে আসরের নামাযটা দ্রুত সেরে নিলাম। আবু বকর খাবারের ব্যবস্থা করতে দিয়েছেন। টয়লেটের ব্যবস্থাও হয়ে গেছে – না, বাঁশের তৈরি টয়লেট নয়, একেবারে পাকা করা পেন কোমড বসানো, লোহা আর টিনের তৈরি দরজা লাগানো আধুনিক টয়লেট। …এবারে গোসল করতে যাবো। একজন ব্যক্তি আমাদেরকে পথ দেখিয়ে নিয়ে চললেন। পাশের বাঁশের একটা ঘর থেকে বড় একটা পিপে ধার করে সাথে করে নিয়ে চললাম খাবার পানি ভরে নিয়ে আসার জন্য।

পথটা ইট স’লিং করা, একটু এগিয়ে বামদিকে নেমে গেলো। পথটা পিচ্ছিল, কাদায় মাখামাখি। পা, প্যাঁচ করে ঢুকে যাচ্ছে কাদার মধ্যে। নিচে নেমে যেতেই থাকলো লোকটা। আমরাও অনুসরণ করলাম। একটা পর্যায়ে লোকটা স্পঞ্জের জুতা জোড়া খুলেই ফেললো কাদায় ছিঁড়ে যাবার ভয়ে। অবশেষে নিচে নেমে এলাম। একটা ঝিরি বয়ে যাচ্ছে, এটার পানিও ঘোলা। কিন্তু লোকটা আমার হাত থেকে পিপেটা নিয়ে এগিয়ে গেলো এই ঝিরি থেকেই খাবার পানি নিতে। মনে মনে হাসলাম – যশ্বিন দেশে যদাচার – দেখতে ঘোলা এই পানিও এখন আমাদের জন্য ‘খাবার উপযোগী’।

আবু বকর, নামলেন না একেবারে নিচে। উপর থেকে চিৎকার করে জানালেন, এখানে গোসল করবেন না। কারণ এতো কাদা মাড়িয়ে গোসল করে ফিরে গিয়ে লাভের খাতা হবে শূণ্য। তাই গোসল না করেই পানি নিয়ে ফিরতি পথ ধরলাম। ঐ ব্যক্তিই এই পিচ্ছিল পথে পিপেটা বহন করলেন। উপরে উঠে এসে আবু বকর জানালেন, বরং পাইন্দু খালে গোসল করা যাক। স্কুল ঘরের সামনে দিয়েই একটা পথ পাইন্দু খালে নেমে গেছে। ওখানে গোসল করা যাবে। সন্ধ্যা হয়েই এসেছে প্রায়।

এমন সময় আমি প্রাকৃতিক বড় কর্মটির ডাক পেলাম। সবাইকে গোসল করতে পাঠিয়ে জরুরি কাজটি আগেই সেরে নিলাম। টয়লেটের ভিতরেই একটা বালতিতে পানি ছিল, বদনাও আছে। …গোসল করতে নেমে গিয়ে দেখি এখানে, খালে পাথর বসিয়ে ঘাট তৈরি করা হয়েছে। তাকিয়ে আশ্চর্য, আরে, এটাই তো সেই ঘাট! যেখানে পাতার উপর একটা বাটি রাখা ছিল – জলদেবতার নৈবেদ্য! এই দিক দিয়ে ঘুরে আমরা পাড়ার অন্য পাশে গিয়ে উঠেছিলাম। যাহোক, সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে, দ্রুত চারজন গোসল করলাম। ঐ ব্যক্তি ঘাট দেখিয়ে দিয়ে আমাদের থেকে অনুমতি পেয়ে চলে গেছেন। পাইন্দু খালের ঘোলাজলে নেমে গোসল করছি আমরা, সাবান মেখে। একটা-দুটা মশার আওয়াজ আসছে বলে সবাই একজন আরেকজনকে স্থির হয়ে না থাকার নির্দেশ দিলাম। গোসল করতে করতেই মাগরিবের আযান ভেসে এলো। আবু বকর জানালেন, পাশের বিজিবি ক্যাম্প থেকে আসছে।

পরিষ্কার কাপড়-চোপড় পরে আবার স্কুলঘরে ফিরে মাগরিবের নামাজ পড়ে নিলাম। ততক্ষণে আমাদের সৌভাগ্য যে, বিদ্যুৎ চলে এলো। ফ্যানটা ছেড়ে দেয়া হলো, গতি খুব ধীর, কিন্তু চললে অন্তত কাপড়গুলো শুকাবে। বেডিং বের করে মেঝেতে আগের মতো বিছিয়ে নেয়া হলো – একটু পিঠ ঠেকানো যায় এবারে।

শরীরটা এলিয়ে, কিছুটা গল্পগুজব শেষ করে আমরা চললাম খাবারের খোঁজে। আমি সাথে করে আনা মাল্টিপ্লাগ আউটপুটটাতে সবার মোবাইল ফোন, আমার ক্যামেরা চার্জে লাগালাম। তারপর বেরোলাম। স্কুলঘরের পাশেই একটা বাঁশের বেড়ার ঘর আছে, খুবই নগন্য অবস্থা। ঘরটাতে গিয়ে দেখলাম ছোট্ট ঐ ঘরে কুপির আলোয় দুইজন ব্যক্তি – একটা চৌকির উপর আবু বকর, তানভির আর মোহন বসে আছেন একজনের পাশে, আরেকজন চৌকির পাশেই চুলায় রান্না চড়িয়েছেন।

না, ওদিক দিয়ে নয়, উপরের দিক দিয়ে গাছে কোপ দেয়া হয় এই দা দিয়ে
না, ওদিক দিয়ে নয়, উপরের দিক দিয়ে গাছে কোপ দেয়া হয় এই দা দিয়ে

জানলাম, এঁরা দুজনেই মুসলমান (পাহাড়ি মুসলমান), এই পাড়ায় আরো কয়েকজনের সাথে এসেছেন গাছ কাটতে। অর্থাৎ এঁরা গাছ-কামলা। তাদের দলকে নেতৃত্ব দেন একজন, এঁরা ডাকেন “মাঝি”। তাঁদের দুজনের জায়গা হয়েছে এই ঘরে, বাকিরা পাড়ার ভিতরে কোথাও আছেন। আবু বকর, এঁদের খাবারের সাথেই আমাদের খাবার যোগ করতে বলে দিয়ে গেছেন, কী কী আনতে হবে টাকাও দিয়ে গেছিলেন গোসলে যাবার আগে। তা-ই রান্না হচ্ছে। ডাল ধুয়ে রেডি করা হয়েছে। পাহাড়ি মরিচ আছে। মসলাপাতি প্রস্তুত। আলু সেদ্ধ করা হয়েছে। আমরা সবাই-ই তাদের সাথে হাত লাগালাম, আলুগুলো ছিলে ফেলতে শুরু করলাম। …মরিচ কাটতে গিয়ে দেখা হলো তাদের হাতিয়ার – গাছ কাটার বিশাল একখানা দা। কিন্তু দা-এর চেহারাটা বিচিত্র – ধনুকের মতো বাঁকা। দেখে মনে হবে ও-দিকটা দিয়ে বোধহয় কোপ মারে, কিন্তু আশ্চর্য হয়ে শুনবেন, এই দায়ের পিঠ দিয়ে কোপ মারা হয়।

চান্দা পাড়ায় রান্না চলছে - নিশাচর
চান্দা পাড়ায় রান্না চলছে – নিশাচর

ওদিকে গল্প চলছে আমাদের মধ্যে। আবু বকরই সঞ্চালকের দায়িত্বে আছেন, চৌকির উপরে বসা ব্যক্তি যুবক বয়সী, উনিই কথা বলছেন, মোটামুটি বাংলা বলতে পারেন উনি, তাও বাক্য জোড়া দিয়ে দিয়ে বোঝাচ্ছেন আমাদেরকে। কিন্তু যিনি রান্না করছেন, তাঁর বাংলা বলতে খুব কষ্ট হয়, তিনি এঁর থেকে একটু বয়সী, থুতনিতে অল্প একটু দাড়ি আছে। জানা হলো, কিভাবে তারা গাছ কেটে এনে এই পাড়াতে খিয়াং ঘরটা তৈরি করে দিয়েছেন। গল্প হলো পাহাড়ের কোথায় কী আছে সেটা নিয়ে।

এই দুই দিন পাড়াগুলো কেন এরকম অদ্ভুত আচরণ করছিল, তার রহস্যের কিনারা হলো এঁদের সাথে আলাপ করে। গত বছরে, দুজন পর্যটক অপহরণের ঘটনা পাহাড়ে খুব ভীতি সঞ্চার করেছে। পাড়াগুলো এজন্যই খুব সতর্ক হয়ে গেছে, গাইড ছাড়া পর্যটক দেখলেই তাদের ভয় হয়। …এঁদের থেকে পাহাড়ের আরো একটা মারাত্মক তথ্য জানলাম, শুনে আমরা সবাই মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলাম, মনে মনেই কথা হয়ে গেলো আমাদের মধ্যে – শংকিত হলাম। কী সেই তথ্য? আমরা পাবলিক ব্লগে উল্লেখ করতে পারবো না, দুঃখিত।

কথাপ্রসঙ্গে টনির কথা উঠলো। টনি কে? বিকেলে স্কুলঘরে উঠার সময় বারান্দায় কয়েকটা ছেলের সাথে তানভির আর মোহন আলাপ জমিয়ে ফেলেছিল, এ হলো তাদেরই একজন। পরে বুঝলাম, দলনেতাগোছের। টনি (ছদ্মনাম), বয়স ২৫-২৬, ঢাকায় ছিল অনেকদিন, চাকরি করেছে ঢাকায়। সে নাকি মুসলমান হয়ে গেছে, কিন্তু পাড়ার লোকজন জানে না। আসলেই! 😮 …হায়াত আছে ছেলের, ওর কথাই চলছিলো, ও’ এসে হাজির। আবু বকর ডেকে তুললেন চৌকিতে। কথা শুনে যা বুঝলাম, ২০১৪-তে ঢাকায় গিয়েছিল। মিরপুরে পলিটেকনিকে ভর্তি হয়েছিল, কোর্স শেষ করেনি; গাজিপুরও ছিল। সেখানে যেমন মোবাইল-চোরদের সাথে চলাচল ছিল (সে মোবাইল চোর ছিল না, বুঝেছি), তেমনি সে তাবলিগ জামাতের সাথীদের সাথেও সময় ব্যয় করেছে, কাকরাইল মসজিদে গিয়ে থেকেছেও। তাদের কথাগুলো মুখস্থ করেছে খুব ভালো করে। খুব যত্ন করে বলে, “জান-মাল আল্লা’র রাস্তায় খরচ করা…” আর এসব শুনেই এরা হয়তো একে মুসলমান বলে ধরে নিয়েছে।

ও’ এই রাতের বেলা স্কুলঘরে কী করছে? পাহাড়ে আর দুদিন পরেই “প্রবারণা পূর্ণিমা”। বৌদ্ধ পাড়াগুলোতে খুশির অন্ত নেই। উৎসব এলেই বাচ্চা-কাচ্চাদের পড়ালেখা থেকে একটু ফুরসৎ মেলে – এরা সেই সময়টা উল্লাস করে উৎসবের প্রস্তুতি নিচ্ছে। টনির কাছ থেকে শোনা হলো চান্দা পাড়ায় প্রবারণা পূর্ণিমার প্রস্তুতির কথা: সন্ধ্যালগ্নে বল্টুগুলোকে যে ফানুস বানাতে দেখেছিলাম, এটা ছিল এরই প্রস্তুতি। শুধু তাই নয়, পাড়ার সব ইচড়েপাকা যু্বক/কিশোরগুলো জড়ো হয়েছে স্কুলঘরে; বৈদ্যুতিক আলোর নিচে আরো ফানুস বানাচ্ছে – সেকথা পরে বলছি। জানা গেলো, অনুষ্ঠান চলাকালীন দুতিনদিন, ভক্ত হিসেবে বয়োজ্যাষ্ঠরা খিয়াং ঘরেই থাকবেন। এছাড়া উৎসব উপলক্ষে বিভিন্ন জায়গা থেকে যেসকল অতিথি আসবেন, তাদের আপ্যায়ন করতে পাড়ায় পাড়ায় খাবারের আয়োজন থাকবে: মাছের ব্যবস্থা, মুরগির ব্যবস্থা – সোজা বাংলায় অতিথি আপ্যায়নে কমতি হবে না। টনি, এই পাড়ার ছেলেপিলের দায়িত্বে – টাকা যা উঠেছে, তারই জিম্মায়। কালকে (বৃহঃস্পতিবার) রুমা বাজারের ‘বাজারবার’ (হাটবার), কালকে সে উৎসবের জন্য বাজার করতে যাবে। …তার অনেক কাজ, বিদায় নিলো আমাদের থেকে। …কিন্তু টনির সাথে বড় একটা কাজ আছে আমাদের…

এদিকে আমাদের খাবারও তৈরি। আলুগুলো, একটা চামচ নিয়ে আবু বকর ভর্তা করে দিয়েছেন। সেগুলোতে পাহাড়ি ঝাল মরিচ, তেল মিশিয়ে আলুভর্তা করা হয়েছে। ডাল রাঁধা হয়েছে, ডালের মধ্যেই ডিম দিয়ে সিদ্ধ করা হয়েছে। আর, পাহাড়ি জুমের চাল। ওহো, সাথে একটা বিশেষ ভর্তা: মরিচ দরকার এতোটুকু, কিন্তু মরিচ কাটা হয়ে গেছে বেশি। শেষে সামান্য একটু পিঁয়াজ মিশিয়ে সেটা হয়ে গেলো মরিচ ভর্তা। আর, সেই অসম্ভব ঝাল ভর্তার ভোক্তা কে জানেন? শুনে আশ্চর্য হবেন – গতকালকে মরিচ খেতে অস্বীকৃতি জানানো আমাদের নবীন – তানভির 😮 – বেশিরভাগটাই সে খেয়েছে। খাবার খুব ভালো হয়েছে। পেট পুরে খেয়ে নিলাম আমরা। এবারে, ‘মাঝি’র দেখা পাওয়া গেলো, এবারে তাঁরা খাবেন।

আমরা, স্কুলঘরে ফিরে এলাম। এখানে মোবাইল ফোনে স্পীকার লাগিয়ে উচ্চস্বরে গান বাজিয়ে কিশোর-যুবকরা ফানুসের পর ফানুস বানিয়ে চলেছে। হেন গান নেই যে বাজছে না – বাংলা, হিন্দী, চাটগাইয়্যা, পাহাড়ি আঞ্চলিক ভাষার গান – সবই। ফানুস বানানোর কাগজ যে দুই ধরণের হয় – আবু বকরের কাছ থেকে শুনলাম; উনারা ইকো ট্র্যাভেলার্স থেকে সাজেকে ট্যুর অপারেট করার সময় ফানুস দিয়ে থাকেন পর্যটকদের। ফানুসের ভালো কাগজটা আসে মিয়ানমার থেকে, তাতে আগুন লাগলে পুরো ফানুসটা জ্বলে না, যতটুকুতে আগুন লাগে, ততটুকু জ্বলে। কিন্তু বাংলাদেশে যেসব কাগজ ব্যবহার করা হয়, সেগুলো সাধারণ মানের কাগজ। …দেখা গেল, এই ছেলেগুলো দিস্তা দিস্তা কাগজের বিশাল একটা তাড়া মেঝেতে বিছিয়ে রেখেছে। সেখান থেকে একেক তা তুলে আনছে, মেঝেতে বিছাচ্ছে, তারপর জোড়া দেয়া শুরু। এই কাগজের চেহারা দেখে আবু বকরের ধারণা, শাড়ির ভিতরে সাদা এক প্রকারের কাগজ দেয় – এটা সেই কাগজই।

গাছের পাতার মধ্যে আঠা নিয়েছে ওরা; কাগজগুলোর কোণা একত্র করে বড় বড় কাগজ বানায় প্রথমে। তারপর একই রকম দুটো কাগজ বানিয়ে একটার সাথে আরেকটা জোড়া লাগায়। তারপর চারপাশ মুড়ে দেয়। বাইরে একজন বসে বসে বাঁশের ফালি বাঁকিয়ে রিং বানাচ্ছে, তার দিয়ে সেই রিং শক্ত করে বাঁধে। চারকোণা যে কাগজের বাক্সটা (ফানুস) তৈরি হয়েছে, তাতে মাপ দিয়ে কেটে এই রিংটা বসানো হয়, এটাই হলো ফানুসের মুখ। এই মুখ দিয়ে আগুনের ধোঁয়া ঢুকিয়ে ফানুস ওড়ানো হয়। চারকোণা, গোলাকৃতি, বিকার-আকৃতি ইত্যাদি বিভিন্ন চেহারার ফানুস বানায় ওরা। বাইরে খড়কুটায় আগুন ধরিয়ে সেই ফানুস আবার পরখও করা হয়।

স্কুলঘরে আমাদের শোবার ব্যবস্থা - নিশাচর
স্কুলঘরে আমাদের শোবার ব্যবস্থা

ফানুসদর্শন শেষ, ঘুম দরকার। সমস্যা হলো, এরা যেঘরে ফানুস বানাচ্ছে, ঠিক পাশের ঘরটাতেই আমাদের শোবার ব্যবস্থা। কিন্তু যে উচ্চরবে গান বাজছে, ঘুম তো দূরের কথা, মনে হচ্ছে আমাদের ঘরেই সন্দীপন এসে বসে আছেন, “মধু হই হই বিষ হাওয়াইলা”। এশা’র নামাজও পড়া হয় নাই। গান কখন শেষ হবে, আল্লা তক মালুম, মনে হচ্ছে সন্দীপনকে জড়িয়ে ধরে ঘুমাতে হবে। তাই এই গানের মধ্যেই নামাজ সারলাম। তারপর এসে শুয়ে পড়লাম। …আল্লা’ বাঁচাইছে, নামাজ শেষ, নাহলে যে গান বেজে উঠলো, তা আমার লেখা তো দূরে থাক, উচ্চারণ করতেও লজ্জা লাগছে। চূড়ান্ত অশ্লীল গান, অশ্লীলের এক শেষ – বাংলা সিনেমার কাটপিসেও বোধহয় এইসব গান আসে না। …সম্ভবত রাত ১২টার দিকে গান বন্ধ হলো। ওরা চলে গেলো। কখন যে ঘুম লাগলো মনে নেই।

সূর্যোদয়ের আগেই ঘুম ভেঙে গেলো, সবাই ঘুমোচ্ছে। ফযর পড়ে বাইরে বেরিয়ে পড়লাম। আলো ফুটেছে। পাড়া সজাগ হয়ে গেছে ইতোমধ্যেই, কিন্তু স্কুলঘরের এদিকে কেউ আসছে না। ঝিঁঝিঁ পোকার আওয়াজ আসছে, বিভিন্ন পোকামাকড়, পাখির আওয়াজ – গ্রামের বাড়িতে গেলে ভোরে উঠে এই একই অনুভূতি পাই আমি: প্রচন্ড শান্তি, প্রচন্ড পরিতৃপ্তি। অদূরেই, আমাদের অবস্থান থেকে মাত্র ১০ফুট মতো উচ্চতা দিয়ে মেঘ উড়ে যাচ্ছে – কী অপূর্ব সেই আবহ!

সবাই-ই উঠে পড়েছে। আমরা অপেক্ষা করছি টনির জন্য। ওর সাথে আমাদের বিশেষ দরকার আছে। …টনিও চলে এলো। আবু বকর তাড়া দিয়ে দলের সবাইকে প্রস্তুত করে ফেললেন সেনাধ্যক্ষের মতো। দল তৈরি।

স্কুলঘরের দরজাটা টেনে দিলাম, চাবি নেই আমাদের কাছে। ব্যাগ থাকবে এই পাড়ায়… এই ঘরে… শ্রেফ বিশ্বাসের উপরে।

বেরিয়ে পড়া যাক…

কোথায়?

(চলবে…)

– মঈনুল ইসলাম

পরের পর্ব »

nanodesigns

মন্তব্য করুন