কর্মক্লান্তি থেকে পালাতে – পাহাড়ের উল্টো পিঠে : পর্ব ১

ট্রেইলের শুরুতেই বিপত্তি – খাল পানিতে টইটুম্বুর, তাই উঁচু পাড় ধরে এগোনো ছাড়া কোনো গত্যান্তর নেই। সেই উঁচু পাড়ের কাছে গিয়ে থমকে দাঁড়াতে হলো। খাড়া ঢাল নেমে গেছে পানিতে, আর সামনেই ঘন ঝোঁপ। আর বেশি সামনে এগোলে পাড় ভেঙে সোজা পানিতে পড়তে হবে। এতো এতো ঢল যে, ওপাড়ে যাওয়ারও উপায় নেই। তাছাড়া বর্ষার কোনো প্রস্তুতিই আমাদের নেই, ব্যাগগুলোর কোনোটাই জলরোধী না। এখন আমাদের একটাই এগোবার পথ – সামনের ঐ জঙ্গলের ভিতর সেঁধিয়ে যেতে হবে…

আবু বকর প্রচন্ড ব্যস্ত। সামনে পূজা আর মহররমের ছুটি। তাঁর ব্যবসা, ইকো ট্র্যাভেলার্স থেকে ট্যুর বের হবে। ট্যুর-পরিকল্পনা করা, গাইড রেডি করা, থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থার চিন্তা করা – বেচারা একটু বেশিই ব্যস্ত। এর মধ্যেই জানান দিলেন, সামনে পূজা, মহররম আর শুক্র-শনি মিলিয়ে ভালো একটা টানা ছুটি আছে; অফিস থেকে একদিন ছুটি নিলে ভালো একটা ট্যুর দেয়া যাবে। আড়াই বছর ধরে মুখিয়ে আছি ট্রেকে বের হবো বলে। সুতরাং আমার সলতেতে আগুন লাগতে সময় লাগলো না।

বছরখানেক আগে আবু বকর একটা ক্যাম্পিং ট্যুর পরিকল্পনা করেছিলেন, এবারও সেটা দিয়েই শুরু। কিন্তু সেই ট্যুর পরিকল্পনায় অপহরণ হয়ে যাবার মতো একটা বড় ঝুঁকি ছিল, যেটা বিশেষ করে আমাকে খুব ভাবিয়ে তুলেছিল। তবু সেই ট্যুর পরিকল্পনা দিয়েই চিন্তা-ভাবনা শুরু করা হলো। কিন্তু দলগত কারণেই ট্যুর পরিকল্পনা মাত্র ১ দিন বাকি থাকতে বদলাতে হলো। …কেন? সেটা জানার আগে দলের চারজনের সাথে পরিচিত হওয়া যাক:

  1. আবু বকর সিদ্দীকইকো ট্র্যাভেলার্স-এর সহ-উদ্যোক্তা, ভ্রমণ দল ভ্রমণ বাংলাদেশ-এর সাংগঠনিক সম্পাদক, হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং অ্যান্ড ট্রেকিং ইন্সটিটিউট থেকে পর্বতারোহণে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত, সার্ফিং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত, এবং সর্বোপরি আমার পাহাড়-শিক্ষার গুরু।
  2. মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান (মোহন) – বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডারে একজন মেডিক্যাল অফিসার হিসেবে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে কর্মরত – সোজা বাংলায় একজন তরুণ অর্থোপেডিক ডাক্তার। আবু বকরের স্কুলজীবনের বন্ধু। পুরোন ট্রেকার, রেমাক্রি ধরে ট্রেক করে ভালুকের থাবার মধ্যে রাত কাটানো তার মধ্যে অন্যতম।
  3. তানভির মোর্শেদ – আদ্যোপান্ত একজন উইকিমিডিয়ান, বাংলা উইকিপিডিয়ার একজন প্রশাসক, উইকিমিডিয়া ফাউন্ডেশনের বাংলাদেশ অধ্যায় উইকিমিডিয়া বাংলাদেশ-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং বর্তমান কোষাধ্যক্ষ, এছাড়া উইকিমিডিয়া ফাউন্ডেশনের অ্যাফিলিয়েশন্স কমিটির সদস্য। বুয়েটে স্থাপত্য বিভাগের শেষ বর্ষের ছাত্র। একজন আঁকিয়ে, ফুটবলার, স্কেটার, স্কাউট। দেশে আলিকদম, আর নেপালে অন্নপূর্ণা বেসক্যাম্প ট্রেক করা একজন ট্রেকার।
  4. আমি কেউ না

র‍্যুট পরিকল্পনা বদলাতে হলো, কারণ:

  1. ডাক্তার মোহনের শনিবারে যে-করেই হোক চট্টগ্রামে, অফিসে হাজিরা দিতে হবে।
  2. তানভির মোর্শেদের ক্লাস শনিবারে শুরু হবে (তবে হাজিরা দিতেই হবে – এমনটা না)।
  3. গত বছর (২০১৫) ঠিক এই সময়েই (৩ অক্টোবর) মিয়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসী দলের সদস্যরা বাংলাদেশের দুই পর্যটককে (আবদুল্লাহ আল জুবায়ের আর জাকির হোসেন ওরফে মুন্না) ধরে নিয়ে যায়, আজ পর্যন্ত তাঁদের কোনো হদিস পাওয়া যায়নি, এমনকি সন্ত্রাসীরা কোনো দাবিও জানায়নি। আমরা প্রথমে যে পরিকল্পনা করেছিলাম, তাতে এই ঝুঁকিটা খুব বেশি থাকে। আবু বকরের এই ঝুঁকি নিতে কোনো আপত্তি নেই, কিন্তু আমি সত্যি বলছি, খুব ভয় পেয়েছি, এবং আমার ছেলেটাকে জেনেশুনে পিতৃহীন করতে চাইনি। তাই পরিচিত গন্ডির মধ্যে ট্রেক পরিকল্পনাকে নিয়ে আসতে চেয়েছিলাম মনেপ্রাণে।
  4. আমরা যে সময়ে পাহাড়ে যাচ্ছি (শরৎকাল), এবং আমরা যে জায়গাটা বেছে নিয়েছি, সেখানে যেতে হলে অধিকাংশ পথই পাহাড় বেয়ে চলতে হবে। এই প্রচণ্ড গরমে পাহাড়ে ট্রেক করা কষ্টকে তিনগুণ করে তুলবে।

এমতাবস্থায় আবু বকরই নতুন পরিকল্পনা দিলেন। আমরা পাইন্দু খাল ট্রেক করবো। এবং তিনাপ সাইতার (পাইন্দু ঝরণা) দেখবো। আবু বকরের পরিকল্পনাটাকে নিয়ে এবার চূড়ান্ত করতে বসলাম আমি। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি, তিনাপ সাইতার এতো প্রসিদ্ধ একটা ঝরণা হওয়াসত্ত্বেয় অনেক ঘাঁটাঘাঁটি করেও তিনাপের কোনো অবস্থানের স্থানাংক খুঁজে পেলাম না কোথাও। আমার এই দেশে সবাই-ই এখন ট্রেকার, দেশের আনাচে-কানাচে ঘুরেফিরে কত অজানাকে আবিষ্কার করে ফেলছেন অনেকেই। অথচ এগুলোর সঠিক কোনো ডকুমেন্টেশন নেই। তিন-চারটা তিনাপ অভিযানের ব্লগপোস্ট পড়ে পড়ে, যাওয়ার পথের বর্ণনাগুলো পড়ে পড়ে রনি পাড়া থেকে ডাউনহিল নামা এবং নামার পরে ঝিড়ি ধরে চলার ব্যাপারটাই সর্বোচ্চ পেলাম। ওটা ধরেই তিনাপের একটা সম্ভাব্য অবস্থান ধরে নিলাম মানচিত্রে। ঠিক করলাম, প্রথম দিনই ঝিড়ি ধরে আমরা তিনাপ সাইতারে গিয়ে ক্যাম্প করবো। তারপর বাকি পরিকল্পনাটা আমিই ঠিক করলাম, কিছুটা ঝিড়িতে, কিছুটা পাহাড়ে… ঘুরেফিরে রুমাকে ঘিরেই ট্রেইল। (কিন্তু এই পরিকল্পনায়ও একটা অবস্থা-বুঝে-ব্যবস্থার সুযোগ রেখে দেয়া হলো, যেখানে আরাকানদের হাতে ধরা পড়বার ঝুঁকি রইলো।)

সাথে তাবু থাকবে, রসদ থাকবে, “যেখানে রাইত-সেখানে কাইত” মর্মে পুরো ট্যুরের পরিকল্পনা ঠিক করা হলো। সুতরাং থাকা-খাওয়ার প্রশ্নে পাড়া-নির্ভরশীলতা অনেকটা কম থাকলো। আর, সাথে পুরোন ট্রেকাররা সব, সুতরাং যাবতীয় কষ্টসহিষ্ণুতার চিন্তা অবশ্যই করা লাগবে না – এটা আমরা নিশ্চিত।

লক্ষ করুন
এই ভ্রমণবৃত্তান্ত অন্যান্যবারের থেকে কিছুটা আলাদা হবে। এবার ট্যুরের কোনো খরচের হিসাব দিব না। আমাদের পূর্বতন শিক্ষা অনুযায়ী আমরা যথাসম্ভব গাইডদের আসল নাম উল্লেখ করবো না, ছদ্মনাম দিয়ে লিখবো। এবং ট্যুরের কিছু কিছু ডিটেল আমরা উল্লেখ করবো না, কারণ এখানে অনেক ক্ষেত্রে আবু বকরের কেরামতি আছে, যা একান্তই তাঁর নিজস্ব, এবং সেগুলো আমরা পাবলিক করতে চাই না। এছাড়া এবার ‘ঝিরি’র বদলে ‘ঝিড়ি’ বানানটি ব্যবহার করবো, কারণ পাহাড়ের অধিকাংশ সাইনবোর্ডে “ড়” দিয়ে শব্দটা লেখা দেখেছি। …এবং এই ধারাবাহিকে, নায়ক আর ভিলেনের অন্যরকম সংজ্ঞা নির্ধারণ করবো, ইনশাল্লাহ।

এমনই ছুটি যে, ঢাকা থেকে বান্দরবানের কোনো বাসেই সীট পাওয়া গেল না – বহু আগেই শেষ। শেষ পর্যন্ত আবু বকর তাঁর নিজস্ব টেকনিক কাজে লাগিয়ে বান্দরবান পর্যন্ত যাবার ব্যবস্থা করলেন। যাবার পথে, চট্টগ্রাম থেকে ঐ বাসেই সহঅভিযাত্রী মোহনকে তুলে নিলেন আবু বকর। বান্দরবান পৌঁছলাম আমরা সকাল ৭টায়। একটা রেস্টুরেন্টে ঢুকে খাবারের অর্ডার দিয়ে সবাই যখন একে একে দাঁত ব্রাশ করছিলাম, মোহনকে দেখে তখন এক পর্যটক নারী জিজ্ঞেস করে বসলেন, “আপনি কি এই হোটেলের স্টাফ?” উত্তর শুনে বললেন, “আসলে, আপনি দাঁত ব্রাশ করছেন তো, তাই জিজ্ঞেস করলাম।” 🙂

নাস্তা সারলাম সেখানে। তারপর আমরা নিজেদের শহুরে বেশ পরিবর্তন করে ট্রেক উপযোগী পোষাকে আবির্ভূত হতে থাকলাম সবাই। আর তখনই খটকা লাগলো – তানভির, যে কিনা তুখোড় ট্রেকার, সে একটা পিছন খোলা চপ্পল টাইপের রাবারের স্যান্ডেল নিয়ে এসেছে। একজন ফুটবলার হওয়াসত্ত্বেয় সে আনেনি নী-ক্যাপ কিংবা অ্যাংকলেট কিংবা মোজা। অথচ আমি জানি ও’ আমার অনেক লেখাই পড়েছে। যদি লেখা পড়েই থাকে, আর আলিকদম, অন্নপূর্ণা ট্রেকই করে থাকে, তাহলে ভুল করবে কেন সে!!

আমি বাটা থেকে কেনা একজোড়া পিছনে-ফিতা-দেয়া উয়েইনব্রেনার স্যান্ডেল পরে অফিস করি। সেই জোড়া পরে বান্দরবান গিয়েছি। তাই অফ-ট্র্যাক বান্দরবানে কেনা aramit রাবারের স্যান্ডেলজোড়া তবু সঙ্গে ছিল, ট্রেকে কাজে লাগবে বলে। তানভিরের অবস্থা দেখে ঐ জোড়া ওকে দিলাম, আর আমি বাটার স্যান্ডেলজোড়া পরেই ট্রেকে নামার প্রস্তুতি নিলাম। মনে মনে বললাম, যদি আমি না আনতাম এই জোড়া! কিন্তু একই সময়ে এটাও সত্য, তানভিরকে আমারই মতো করে পাহাড়ে চড়তে হবে কেন? অনেক, কিংবা অধিকাংশ পাহাড়িকে দেখেছি, খালি পায়ে কিংবা পিছন খোলা সাধারণ রাবারের স্যান্ডেল পায়ে পিচ্ছিল পাহাড় বেয়ে জীবনধারণ করতে। তাদের তো নী-ক্যাপ, অ্যাংকলেট, পিছন-আটকানো জুতা লাগে না। এমনও তো হতে পারে, এসব ছাড়াই দিব্যি পাহাড়ের ওস্তাদ তানভির – জানি না।

আমার অ্যাংকলেট-নীক্যাপ কিছুই নেই। তাই আবু বকরকে দিয়ে অ্যাংকলেট-নীক্যাপ, টর্চ, ছুরি কিনিয়ে নিয়েছি বিশেষ অনুরোধ করে। কিন্তু আবু বকর শেষ পর্যন্ত ছুরি কিনতে পারেননি। দেখা গেলো, আমরা ক্যাম্পিং ট্রিপে যাচ্ছি, অথচ পুরো দলে একটাও ছুরি নেই। শেষ মুহূর্তে মোহন একখানা ছুরি নিয়ে এসেছিল ওর আবাসস্থল থেকে – ওটাই সম্বল।

যাহোক, দল পুরোপুরি প্রস্তুত। আমরা যখন প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, আবু বকর তখন রসদ কিনতে গিয়েছিলেন। প্রস্তুত হয়ে, আবু বকরের আনা রসদ নিয়ে আমরা চললাম বাসস্ট্যান্ডে। সেখানে গিয়ে আবু বকর বাসের টিকেট করলেন। বাসস্ট্যান্ডেই কাপড় পাল্টে নেয়ার সময় বুঝলাম, ট্রেকে আন্ডারওয়্যার খুলে নেয়া উচিত – তানভির এটাও জানে না। আমি মনে মনে বড় একেকটা ধাক্কা খাচ্ছি তানভিরের এই আনাড়িপনায়।

বাসে চড়তে গিয়ে ঠিক করলাম, বাসের ভিতরে গরম হবে, তাই বাসের উপরে বসা যাক। কিন্তু আমাদের চেয়েও আগ্রগামী ছেলেপিলে আছে। তারা আগেই ছাদের লোহার ক্যারিয়ারটা জুড়ে বসে আছে। কোনোরকমে সেখানে দুয়েকটা ব্যাগ আঁটানো গেলেও, শুধু আবু বকর ছাড়া আর কারোরই ক্যারিয়ারটার ভিতরে জায়গা হলো না। আমরা পিছন দিকে, ক্যারিয়ারটার বাইরে বসলাম। বাস ছাড়লে পরে বোঝা গেল, কাজটা কত বড় ভুল হয়ে গেছে!

বৃষ্টির মৌসুম পরে বান্দরবান-রুমা রাস্তা খুবই খারাপ। একেতো, বান্দরবান শহর থেকে যত ওদিকে এগোচ্ছি, বাস একেবেঁকে উঠে যাচ্ছে উপরে, ক্রমশ আরো উপরে… তার উপর মাঝে মাঝেই রাস্তায় বড় বড় খানাখন্দ। বাস তখন একেবারে ধীরগতিতে একটা একটা করে চাকা গর্তের মধ্যে ফেলে, ঐ পাশটা চরমভাবে কাত হয়ে যায়, ক্যারিয়ারের বাইরে থাকা মোহন, আমি আর তানভিরের অবস্থা তখন তথৈবচ – পিছলে পড়ে যাবার উপক্রম হয় ডানে কিংবা বামে। তানভির তাও একটু বুদ্ধি করে বাম পাশের কিনারে একটা সামান্য উঁচিয়ে থাকা টুকরায় পা আটকে বসেছে বলে রক্ষা। নাহলে, একেক চাকা খাদে পড়লে যে হারে পিছলাচ্ছিলাম আমরা হাত দিয়ে কষে ধরে রাখলেও শরীরের ভারে প্রপাতধরণীতল হতে মুহূর্ত লাগতো না। তার উপর রয়েছে ডানে-বামে বেরিয়ে থাকা গাছের ডাল-পাতা-লতার থাপ্পড়। মাথার উপরে ডাল এগিয়ে এলেই সবাই চিৎকার করতে থাকি, “এই ডাল, এই ডাল”… কিছুক্ষণ পরে দেখা গেলো, এই হারেরেরে চিৎকার বদলে গেলো, “হেই মাথা, হেই মাথা…”। কে যেন বলে উঠলো, “ভাই, মাথা না, কন পাতা।” বলতে না বলতেই ঠাশ করে আরেকবার থাপ্পড়। গাছের থাপ্পড় খেতে খেতে ডান-বামের সবারই অবস্থা খারাপ। কারো হাত ছিলেছে, কারো গাল ছড়েছে। আমি এদিকে আবারও তানভিরকে দেখে শংকিত হলাম, ডাল লেগে হাতে সামান্য আঁচড়া লেগেছে বলে সে একটু বিচলিত। তানভিরকে আমি টাফ ছেলে ভেবেছিলাম, অন্তত একজন ফুটবল খেলোয়াড়ের জন্য হাতে সামান্য আঁচড়া লাগা কোনো বিষয়ই হওয়া উচিত না।

যাহোক, ডাল-মাথা-পাতা করতে করতে থাকলেও উপরে বসে আশপাশের যে দৃশ্য আমরা দেখতে পাচ্ছিলাম, সেটা কেউ কাউকে কিনে দিতে পারবে না। অসাধারণ লাগছিল বারবার দেখা এই বান্দরবানকে, একধরণের ঘোরে আটকে ফেলে যেন। এভাবেই একসময় বাস আর্মি চেকপোস্টে পৌঁছালো। সবাই কিছুক্ষণের বিরতি পেল। পথে কিছু পেয়ারা কিনে নেয়া হলো।

কর্দমাক্ত ব্রিজ পার হতে হলো হেঁটে
কর্দমাক্ত ব্রিজ পার হতে হলো হেঁটে

আবারও বাস চললো। পথে যেতে যেতেই পাহাড়ের আসল ঝুঁকি ভূমিধ্বসের (ল্যান্ডস্লাইড) ক্ষত চোখে পড়লো। পাশের পাহাড় থেকে বিশাল পাথরের চাই ঘষটে নেমে এসেছে রাস্তার উপর, আর রাস্তার একাংশ খসিয়ে নেমে গেছে আরো নিচে – ভয়ংকর সুন্দর! এভাবে চলতে চলতে একসময় পথে একটা স্টিলের ব্রিজের সামনে এসে ধীর করলো বাস। ব্রিজের আগেই এতোটা কাদা যে, বাসের চাকা আটকে গেলো। বামে খাড়া পাহাড়, বাস পড়লে নির্ঘাত সবার মৃত্যু। এমন সময় বাস চাইলো ব্যাকগিয়ার দিয়ে গর্ত থেকে চাকাটা বের করে আনতে। কিন্তু যতই ব্যাকগিয়ার দেয়, চাকা তো বের হইই না, বরং পিছলে বামদিকের ঐ পাহাড়ের কিনারের দিকে চলে যেতে থাকে। সবাই আতংকিত হয়ে উঠলাম। দু-তিনবার এই চেষ্টা করায় বাসের চাকা এখন একেবারে কিনারায়ই চলে এসেছে। আর বার দুয়েক চেষ্টা করলেই সবার সমাধি রচিত হবে। সবাই বাস বন্ধ করতে চিৎকার জুড়লো। চিৎকার শুনেই হোক কিংবা অবস্থা বুঝতে পেরেই হোক বাস ড্রাইভার বাসের স্টার্ট বন্ধ করলে সবাই পটাপট নেমে গেলাম নিচে। ব্রিজটার উপরেও কাদার গোড়ালি-সমান আস্তরণ। লোকজন নেমে যাওয়ায় হালকা বাসটা টেনে ব্রিজ পার করে এপারে আনলে আবার সবাই বাসে চাপলাম। কিন্তু এবারে দলনেতা আর ঝুঁকি নিতে চাইলেন না। উপরে গাছের থাপ্পড় খাওয়ার বদলে সবাই নিচে এসে দাঁড়ালাম। সীট থাকাসত্ত্বেয় অল্প একটু পথ দাঁড়িয়েই যেতে পারবো আমরা।

নৌকা ভাড়া করে সাঙ্গু পার হওয়া লাগলো : বামে তানভির, ডানে আবু বকর, মোহন
নৌকা ভাড়া করে সাঙ্গু পার হওয়া লাগলো : বামে তানভির, ডানে আবু বকর, মোহন

পথে যেতে যেতে দেখলাম, রাস্তা আসলেই খারাপ। কোথাও তক্তা দিয়ে গর্ত ঢেকে এগোতে হচ্ছে। সামনের গাড়িটা যাবার পরে তক্তাটা সরে গেছে। তাই বাস আটকে কন্ডাক্টরকে এগিয়ে গিয়ে তক্তাটা জায়গামতো রাখতে হচ্ছে, তারপর বাস এগোচ্ছে। এভাবেই একসময় আমরা গন্তব্যে পৌঁছে গেলাম। অনেকের অনেক প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে রুমার আগেই নেমে গেলাম আমরা। সাঙ্গু পার হলাম নৌকা ভাড়া করে। তারপর গন্তব্যের পথে ছুটলাম। শুরু হলো পাইন্দু খালে ট্রেক।

দুপুর ১:৩০

সাঙ্গুর পাশ দিয়ে লাফ দিয়ে ঝিড়ি পার হচ্ছে মোহন (ছবি: তানভির)
সাঙ্গুর পাশ দিয়ে লাফ দিয়ে ঝিড়ি পার হচ্ছে মোহন (ছবি: তানভির)

এতক্ষণ বাসের উপর বসে বসে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিচ্ছিলাম এই শরতের খরতাপের দিনে মেঘলা একটা দিন উপহার দেবার জন্য। একটিবারের জন্যও রোদ দেখিনি, মৃদু বাতাস আর মেঘাচ্ছন্ন আবহাওয়াটা খুব উপভোগ করছিলাম। কিন্তু সাঙ্গুতে নেমে যখন দেখলাম, থৈ থৈ করে পানি নামছে, তখন রক্ত গরম হয়ে গেলো। এবং… গরম রক্ত… কিছুক্ষণ পরে… পাইন্দু খালে নামতেই পানি হয়ে গেলো। 😛 যে পাইন্দু খাল দিয়ে আমরা হাঁটার পরিকল্পনা করে ট্রেকের পরিকল্পনা করেছি, সেই পাইন্দু খালে উপচে পড়ছে পানির ঢল। শরতের শুকনা খটখটে ট্রেইলে এসে বর্ষার রূপ দেখে হতবাক আমি!

পাইন্দু খালের মুখে ট্রেক শুরু - সামনে তানভির, পিছনে মোহনকে দেখা যাচ্ছে
পাইন্দু খালের মুখে ট্রেক শুরু – সামনে তানভির, পিছনে মোহনকে দেখা যাচ্ছে

এদিকে, পাইন্দু খালের মুখ থেকে ট্রেইল শুরু করতে গিয়ে শুরুতেই বিপত্তি – যেহেতু খাল পানিতে টইটুম্বুর, তাই উঁচু পাড় ধরে এগোনো ছাড়া কোনো গত্যান্তর নেই। কিন্তু উঁচু পাড়ের কাছে এগিয়ে গিয়ে থমকে দাঁড়াতে হলো। খাড়া ঢাল নেমে গেছে পানিতে, আর সামনেই ঘন ঝোঁপ। আর বেশি সামনে এগোলে পাড় ভেঙে সোজা পানিতে পড়তে হবে। এতো এতো ঢল যে, ওপাড়ে যাওয়ারও উপায় নেই। তাছাড়া বর্ষার কোনো প্রস্তুতিই আমাদের নেই, ব্যাগগুলোর কোনোটাই জলরোধী না। এখন আমাদের একটাই এগোবার পথ – সামনের ঐ জঙ্গলের ভিতর সেঁধিয়ে যেতে হবে।

ওকে, কোনো সমস্যাই না। জঙ্গলে সেঁধিয়ে যাও।

তানভিরের হাতে একটা তাঁবু, আমার হাতে আরেকটা। মোহনের পিঠের ব্যাগটা সবকিছু ঢুকিয়ে বিশাল হয়ে গেছে উচ্চতায়। একটু উঁচুতে উঠে আমরা জঙ্গলের দিকে এগিয়ে গেলাম। অন্যান্যবারের চেয়ে এবার আমি একটু সুবিধাজনক অবস্থানে আছি: আমার পরনে হাফহাতার বদলে এবারে ফুলহাতা একটা সুতি শার্ট, পায়ে থ্রিকোয়ার্টারের বদলে ফুল প্যান্ট। জঙ্গলের ভিতর ঢুকে বুঝলাম এগুলো কত কাজে এলো। শার্টের হাতা পুরোপুরি খুলে হাত ঢেকে নিলাম। আমাদের হাতে চাপাতি, দা থাকাতো দূরে থাক, একটা জাতের ছুরিও নেই। জঙ্গলের ডাল, লতা-পাতা হাত দিয়ে সরিয়ে সরিয়ে এগোতে রীতিমতো নাভিশ্বাস বেরিয়ে যাচ্ছে। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই হাঁপিয়ে উঠলাম একেকজন। এর মধ্যে কোথাও মোহনের ব্যাগটা আটকে যাচ্ছে, কোথাও আমার ব্যাগটা। সেগুলো ছাড়িয়ে দেবার জন্য পিছনে আরেকজনকে থাকা লাগছে – বিতিকিচ্ছিরি ব্যাপার!

কিন্তু এতো পরিশ্রম করেও হাত বিশেক এগোনর পরে বুঝলাম, সামনে জঙ্গল আরো ঘন হয়ে গেছে। এগোনর পথ বন্ধ ঠিক না, কিন্তু যে ঘন জঙ্গল সামনে, খালি হাতে গাছ, লতা-পাতা ঠেলে এভাবে এগোতে হলে, আদৌ কোনো দিশা পাবো কিনা, তার নাই ঠিক, তার উপর হাত, মুখের দফারফা হয়ে যাবে। পিছিয়ে এলাম আমরা। আরো খানিকটা পিছনের পথে এসে পাহাড়ের আরো একটু উপরের দিকে গিয়ে জঙ্গলে ঢোকার চেষ্টা করার পরিকল্পনা করা হলো।

সেভাবেই এগোন হলো। ঘন জঙ্গল দুহাত দিয়ে সরিয়ে সরিয়ে পথ করার চেষ্টা। কসরত করে সামনে এগোন। খালি হাতে কাজটা করা খুবই মারাত্মক হতে পারে যেকোনো সময়। বিশেষ করে গাছে যদি বিছাজাতীয় কোনো প্রাণী থেকে থাকে। কোথাও ডাল সরাতে না পেরে নিচু হয়ে, ব্যাগ বাঁচাতে আরো একটু নিচু হয়ে মাটির খুব কাছাকাছি হয়ে পার করতে হচ্ছে। অনেক কসরত করে আরো একটু সামনে এগোনোর পরও একই অবস্থা – পথরুদ্ধ।

বামদিকে একটু খোলা জায়গা দেখে জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এবারে সেদিকে গিয়েও চেষ্টা করা হলো। বেশিদূর এগোন গেলো না, আবারও পথরুদ্ধ।

এবং তখন তানভিরের কন্ঠ দিয়ে আবারও হতাশা ঝরে পড়লো, “এদিকে সামনে এগোন যাবে না।”

(চলবে…)

মঈনুল ইসলাম

পরের পর্ব »

One thought on “কর্মক্লান্তি থেকে পালাতে – পাহাড়ের উল্টো পিঠে : পর্ব ১

মন্তব্য করুন