শবে মেরাজ ও বর্তমান ইসলাম

মাসজিদুল আকসা (ছবির উৎস: অজানা)
মাসজিদুল আকসা (ছবির উৎস: অজানা)

“শবে মেরাজ” বা “লাইলাতুল মি’রাজ” কথাটার মানে হলো “মে’রাজের রাত”। ইসলাম ধর্মমতে, ঈশ্বরের (আল্লাহ’র) শেষ বাণীবাহক (নবী/রাসূল) জনাব মুহাম্মদ [আল্লাহ তাঁর প্রতি শান্তি বর্ষণ করুন] পৃথিবী থেকে উর্ধ্বাকাশে আল্লাহ’র সাথে যে রাতে দেখা করতে যান, সে রাতকে মে’রাজের রাত বা উর্ধ্বারোহণের রাত বলা হয়।

মে’রাজের এক রাতেই মুহাম্মদ [স.]-কে ফেরেশতা জিবরাঈল [আল্লাহর শান্তি বর্ষিত হোক তাঁর উপর] ঘুরিয়ে নিয়ে আসেন পৃথিবীর বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান, মিশরের নীল নদ, তূর পর্বত ইত্যাদি। তারপর তাঁকে নিয়ে যান “মসজিদ-উল-আকসা”-তে। সেখানে অলৌকিকভাবে পূর্বতন সব নবী ও রাসূল জীবিতাবস্থায় উপস্থিত থাকেন। তিনি সকলকে নিয়ে দলবদ্ধভাবে (জামাতে) নামায আদায় করেন, যে নামাযে ইমাম (নেতা)-এর দায়িত্ব পালন করেন মুহাম্মদ [স.]। তারপর শুরু হয় প্রকৃত স্বর্গারোহণ। জিব্রাঈল [আ.] তাঁকে উর্ধ্বাকাশে নিয়ে যান আল্লাহর কাছে। সেখানে আল্লাহ’র পক্ষ থেকে মুহাম্মদ [স.]-এর উম্মতকে ৫০ ওয়াক্ত নামায দেয়া হয়। কিন্তু মুহাম্মদ [স.]-এর আর্জিতে তা ৫ ওয়াক্তে নামিয়ে আনা হয়। তাই মুসলমানদেরকে দৈনিক সময় করে পাঁচটি আলাদা আলাদা সময় নামাযে দন্ডায়মান হতে হয়। অর্থাৎ মে’রাজ থেকে মুহাম্মদ [স.] মানুষের জন্য নামায নিয়ে এসেছিলেন এবং তিনি এসেই প্রথম ফযরের নামায, জিব্রাঈলের [আ.] নির্দেশনা অনুসারে, আদায় করেছিলেন।

মুহাম্মাদ [স.]-এর মতো একজন সাধারণ মানুষের পক্ষে অনন্ত আকাশের উপরে উঠে যাওয়া সংক্রান্ত ব্যাপারটি আমাদের সাধারণ মানুষের বোধগম্য না হলেও একজন মুসলমানকে মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতে হবে যে, ঘটনাটি বাস্তব। মুহাম্মদ [স.] যখন উর্ধ্বারোহণ থেকে ফিরে মক্কার অমুসলিম ক্বোরায়েশদের কাছে বর্ণনা করলেন, তখন স্বভাবতই তারা বিশ্বাস করলো না।

তারা গিয়ে মুহাম্মদ [স.]-এর সহচর (সাহাবি) জনাব আবু বকরের [আল্লাহ’র তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট থাকুন] কাছে জিজ্ঞেস করলো, আচ্ছা, যদি কেউ বলে সে এক রাতের মধ্যে মসজিদুল আকসায় চলে গিয়েছিল, আকাশে উঠে গিয়েছিল, তবে সেটা কি বিশ্বাসযোগ্য?

আবু বকর [রা.] জানতে চাইলেন, আগে জানতে হবে কথাটা কে বলেছে?

তখন ক্বোরায়েশরা বললো, তোমার বন্ধু মুহাম্মদ।

আবু বকর [রা.] একবাক্যে বললেন, যদি মুহাম্মদ [স.] এমনটা বলে থাকেন, তবে তা অবশ্যই হয়েছে।

এভাবে জনাব আবু বকর [রা.] অমুসলিমদের থেকে মুহাম্মদ [স.]-এর অবিশ্বাস্য স্বর্গারোহণের কথা জেনেও পূর্ণ বিশ্বাস করেছিলেন।

বস্তুত মুসলমানদের বিশ্বাস এমনই, যেখানে যুক্তি, বিজ্ঞান সমর্থন করুক, চাই না করুক, তাকে অদৃশ্যে বিশ্বাস করতে হবে, যে অদৃশ্যের খবর মুহাম্মদ [স.] বহন করে এনেছিলেন মানুষের জন্য।

প্রসঙ্গত আরেক সাহাবি জনাব আলী’র [আল্লাহ তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট থাকুন] একটি উক্তি উল্লেখযোগ্য। তাঁকে একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, আপনার এক হাতে স্বর্গ (জান্নাত), আরেক হাতে নরক (জাহান্নাম) এনে দিলে কি আপনার বিশ্বাস বাড়বে না?

জনাব আলী একবাক্যে বলেছিলেন, আল্লাহর কসম, আমার এক হাতে জান্নাত, আর আরেক হাতে জাহান্নাম এনে দিলেও আমার বিশ্বাস না এক বিন্দু পরিমাণ বাড়বে, আর না এক বিন্দু পরিমাণ কমবে।

অর্থাৎ অদৃশ্য জান্নাত আর জাহান্নামের কথা জনাব আলী [রা.] এমনই দৃঢ়তার সাথে বিশ্বাস করেছিলেন যে, এখন তা দেখতে পেলেও তাঁর বিশ্বাস বাড়বেও না, কমবেও না। তাঁর বিশ্বাস এমনই স্থির, অটল।

তাই বিশ্বাসের প্রয়োজনে মুসলমানের উচিত নয় বিজ্ঞানের দ্বারস্ত হওয়া, উচিত নয় যুক্তির দ্বারস্ত হওয়া। তবে জানার জন্য হলে তাতে আপত্তি নেই। কেননা, বিজ্ঞান নিজেই কোনো স্বয়ংসিদ্ধ প্লাটফর্ম নয়। সে সকালে যে বিষয়কে প্রমাণ করবে, বিকেলেই হয়তো সেই বিষয়কে ভুল প্রমাণ করে নতুন আরেকটি বিষয়কে সত্য প্রমাণিত করবে। আর মানুষ যুক্তি আওড়ায় তার সীমাবদ্ধ জ্ঞান থেকে। তাই যুক্তি দিয়ে, বিজ্ঞান দিয়ে ইসলামকে বিশ্বাস করা অনুচিত; বরং ইসলামের বিশ্বাস হলো অদৃশ্যে বিশ্বাস, না দেখে, মুহাম্মদ [স.]-এর থেকে শুনে বিশ্বাস (ঈমান) করতে হবে একজন মুসলমানকে। আর সেই বিশ্বাস হতে হবে পাকাপোক্ত (এক্বীন)।

এখন প্রশ্ন হলো, কবে ঘটেছিল সেই মে’রাজ? ইসলামী ঐতিহাসিক ও বিশেষজ্ঞগণ মোটামুটিভাবে হিজরি রজব মাসের ২৭ তারিখকে নির্ধারণ করেছেন। কিন্তু ঘটনা হলো কেউই নিশ্চিত নন। এমনকি এই তারিখ বিষয়ে মতভেদ আছে। শুধু তারিখই নয়, মাস বিষয়েও মতভেদ আছে

“মতভেদ আছে” কথাটার উপর এতো জোর দেয়ার কারণ হলো, যদি মে’রাজ উপলক্ষে কোনো বিশেষ আমল পালনের কথা মুহাম্মদ [স.] বলে যেতেন, তাহলে ঐ নির্দিষ্ট রাতে সাহাবীগণ [রা.] তা যুগ যুগ ধরে পালন করতেন। তাহলে আর ঐ তারিখ, এমনকি মাস বিস্মৃত হওয়ার আশংকা থাকতো না।

বরং সত্য কথা হলো এই যে, মুহাম্মদ [স.] মে’রাজ থেকে ফিরে এসে সাহাবিদেরকে না ঐ রাতে কোনো আমল করতে বলেছিলেন, না নিজে পরবর্তি বছর ঐ রাতকে স্মরণ করে কোনো আমল করেছেন। বরং মে’রাজ থেকে ফিরে এসে মুহাম্মদ [স.] ৫ ওয়াক্ত নামাযকে মুসলমানদের জন্য ফরয (আবশ্যিকভাবে পালন করতেই হবে) করেছিলেন এবং তিনি নিজেও তাতে সচেষ্ট হয়েছিলেন।

তাই মে’রাজ উপলক্ষে যদি কোনো আমল করতেই হয়, তবে সেদিন মাগরিবের নামায পড়তে হবে, এশার নামায পড়তে হবে, ফযরের নামায পড়তে হবে, এবং এই ফরজ নামাযের ব্যাপারে যত্নবান হয়ে যেতে হবে।

জনৈক ব্যক্তি জানতে চাইলেন, হুজুর মে’রাজের রাত্রের নামাজটা যদি একটু বলে দিতেন?

মাওলানা: যে রাত নিজেই নির্দিষ্ট নয়, মুহাম্মদ [স.] যে রাতকে আলাদা আমলের রাত হিসেবে বলে যাননি, আর না সাহাবিদেরকে তাগিদ করেছিলেন, তাহলে কোত্থেকে সেই রাতে আলাদা বিশেষ নফল নামায এলো?

ব্যক্তি: হুজুর, সবাই যে পড়ে?

মাওলানা: সবাই কেন পড়ে? তারা কি নিজে থেকে বানিয়ে নিয়েছে?

ব্যক্তি: হুজুর তাহলে মে’রাজের দিনের যে রোযা (সূর্যোদয়ের পূর্ব থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত উপবাস ও সংযত থাকা) রাখতে হয়…

মাওলানা: যেখানে মে’রাজ দিবসই নির্দিষ্ট নয়, সেখানে মে’রাজের দিনে রোযা রাখবেন কিভাবে? আর রোযা যদি রাখতেই হয়, বছরের যে ৫ দিন রোযা রাখা নিষেধ ঐ পাঁচ দিন বাদে সারা বছর রোযা রাখুন গিয়ে। যে দিনে আলাদা করে রোযা রাখার কথা স্বয়ং মুহাম্মদ [স.] বলে যাননি, সে বিষয়ে আমি-আপনি কে, যে, সিদ্ধান্ত নিয়ে নিবো?

উল্লেখ্য, কতিপয় হাদিসে এই নামায এবং রোযা বিষয়ে বক্তব্য পাওয়া গেলেও সেগুলো বিশুদ্ধ নয় বলে ওলামাদের সম্মিলিত মত। এখন যারা এই কাজগুলো ঐ দিবস-রজনিকে কেন্দ্র করে করতে চান, তারা নিশ্চয়ই অশুদ্ধ হাদিসের উপর ভর করে ইসলাম রচতে চাইবেন না।

প্রশ্ন হলো, যদি একজন মানুষ নামায পড়েই, রোযা রাখেই, তাহলে খারাপটা কী? এই কাজগুলো তো আর খারাপ না?

কথা হলো, যে বিষয়ে আল্লাহ’র পক্ষ থেকে কোনো বিধান নেই, তাঁর পাঠানো বাণীবাহকের [স.] থেকে কোনো নির্দেশনা নেই, তাহলে সেই বিষয়ে আমি আপনি নিজে থেকে একটা বিধান চালু করে নিলে, তা কি আল্লাহ’র মনোনীত পথ হবে? দ্বিতীয় কথা, যে কাজ করতে বলা হয়নি, সে কাজ যখন আমার ইচ্ছা হলো বলে করছি, তখন সেটা কি আমার নিজের মতের অনুসরণ করা হলো না? সেটা কি আদৌ আল্লাহ’র ইচ্ছার অনুসরণ হলো?

বস্তুত আমরা বর্তমানে ইসলামের এমন সব বিধানগুলোকে মানি, যেগুলো আমার মতের সাথে মিলে যায়। খাবার শেষে মিষ্টি খাওয়া সুন্নত -এটা ঠিকই মানি, কারণ এতে আমার মতের সাথে সংঘাত নেই। ভালো পোষাক পরা সুন্নত -এটাও, হাতে অর্থ থাকলে ঠিকই মানি, কারণ এতেও আমার মতের সাথে অমিল নেই। কিন্তু দাড়ি রাখা ওয়াজিব (অবশ্যই করা উচিত), দৈনিক পাঁচবার নামায পড়া ফরয (অবশ্যই করতেই হবে), স্ত্রীকে পর্দার ভিতর রাখা ফরয -সেগুলো আমরা করি না, কারণ সমাজ তা চায় না, বা আমার মতের সাথে সেগুলো মিলে না। আমরা কি তবে আল্লাহ’র মতকে প্রাধান্য দিয়ে চলছি? আমরা কি নিজের মতের পূজা করছি না?

মোদ্দা কথা, “ইসলামে”, “ইসলামী শরি’আতে” মে’রাজ বলে একটা রাত আছে, কিন্তু সেই রাতে আলাদা করে কোনো উপাসনা বা সেই দিনকে উপজীব্য করে কোনো কাজ ইসলামে নেই। বস্তুত মুসলমানের মে’রাজ হলো তার নামায। কেননা হাদিসে বর্ণিত হয়েছে “আস্‌সালা-তু মী’রাজুল মু’মিনীন”, অর্থাৎ “নামায হচ্ছে মুসলমানের মে’রাজ”।

আমরা অনেকেই জানি না যে, নামাযে আমরা যে তাশাহ্‌হুদ পড়ি, সেটা হলো মে’রাজের কথোপকথন। আমরা যেভাবে নামাযের শেষ বৈঠকে বসি, ঠিক সেভাবে মুহাম্মদ [স.] আল্লাহর সামনে বসেছিলেন। সেখানে যে কথাবার্তা হচ্ছিলো, আমরা প্রতিবার নামাযে সেই কথাগুলো আওড়াই:

মুহাম্মদ [স.]: আত্তাহিয়্যাতু লিল্লা-হি, আস্ সোলাওয়া-তু, ওয়াত্ তোয়্যিবা-ত। (সকল প্রশংসা, কায়িক উপাসনা এবং আর্থিক আনুগত্য আল্লাহ’র জন্য)

আল্লাহ [সুবহানাহু ওয়াতা’আলা]: আস্‌সালা-মু ‘আলাইকা, আয়্যুহান নাবিয়্যু, ওয়ারহ্বমাতুল্লো-হী ওয়াবারাকা-ত। (হে নবী, আপনার উপর আল্লাহ’র সকল শান্তি, দয়া এবং বরকত বর্ষিত হোক)

মুহাম্মদ [স.]: আস্‌সালা-মু ‘আলাইনা, ওয়া ‘আলা ‘ঈবা-দিল্লা-হিস্ সোলিহীন। (আমাদের সকলের উপর এবং সকল সত্যিকারের উপাসকের উপর শান্তি বর্ষিত হোক)

উপস্থিত ফেরেশতাগণ [আ.]: (স্বাক্ষীস্বরূপ বলেন) আশ্‌হাদু আল্‌লা– ইলা-হা ইল্লাল্লোহু, ওয়া আশ্‌হাদু আন্না মুহ্বাম্মাদান্ ‘আবদুহ‌ূ ওয়া রাসূলুহ্। (আমরা স্বাক্ষ দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া উপাসনার যোগ্য আর কোনো উপাস্য নেই আর মুহাম্মদ [স.] আল্লাহ’র দাস ও বাণীবাহক)

(সিদরাতুল মুনতাহাতে জনাব জিব্রাঈল [আ.] থেকে যাবার পর, মুহাম্মদ [স.] একাকী আল্লাহ’র আরশে পৌঁছার পরে আল্লাহ তাঁকে সালাম দেন, এবং তিনি সমস্ত উম্মতের পক্ষ থেকে সালাম বিনিময় করেন।)

যদি কোনো মুসলমান নামাযের শেষ বৈঠকে এই কথাগুলো বলার সময় স্মরণ করে নেয় যে, সে মে’রাজের বক্তব্যগুলোই আওড়াচ্ছে, তবে কি সে মে’রাজের সেই জ্যোতি অনুভব করবে না?

প্রকৃতপক্ষে মুসলমানদের মে’রাজ হলো তার পাঁচ ওয়াক্ত নামাযকে সুসংহত করা সারা বছরের জন্য, সারা জীবনের জন্য।

আল্লাহ আমাকে, এবং পাঠকদেরকে নিজেদের নামাযকে প্রতিষ্ঠিত করার যোগ্যতা দিন। আমীন।

-মঈনুল ইসলাম

_____________________
এই লেখনীটি খতীব, মাওলানা জনাব শোয়ায়েব খান-এর জুম’আর খুৎবা থেকে সংক্ষিপ্তাকারে লিখিত। কোনো ভুল উদ্ধৃতির জন্য এই লেখক দায়ী, কেননা পুরো ব্যাপারটাই তিনি স্মৃতি থেকে উদ্ধৃত করেছেন।

মন্তব্য করুন