জাদুর নল সেচ খরচ কমায়

‘‘ধান ফলাতে কতখানি পানি লাগে তা আগে কোনোদিন চিন্তা করিনি, কেউ শেখায়ওনি। ধানের জমিতে যতক্ষণ ভাসানো পানি না দেখা যায় ততক্ষণ কৃষকের চোখও ভরেনা, মনও ভরেনা। আমার ততক্ষণ মনের মধ্যে খালি অশান্তি লাগে।’’

বাংলাদেশের শেরপুরের চাষী মোয়াজ্জেম হোসেনের এই বক্তব্য সারা বাংলাদেশের অধিকাংশ কৃষকের, এমনকি অনেক শিক্ষিত লোকেরও। কিন্তু যদি প্রশ্নটা করি তাহলে আপনিও ধরতে পারবেন ফাঁকটা কোথায়: ‘‘গাছ পানি খায় কী দিয়ে?” ছোটবেলায় বইতে পড়েছেন, মনে করে দেখুন: সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় গাছ মাটির নিচ থেকে শিঁকড় দিয়ে টেনে পানি নেয়…। তাহলে সোজা কথা, গাছের শিঁকড়ে পানি পৌঁছালেই চলে। জমির উপরে পানি দেখার কোনো দরকার নাই।

কিন্তু প্রশ্নটা হলো মাটির নিচে শিঁকড়ে পানি লাগলো কিনা, কিভাবে বুঝবো? …এই প্রশ্নের উত্তর নিয়ে এসেছে স্বস্তা কিংবা বিনা পয়সার এই ‘জাদুরনল’ (magic pipe)। মনে রাখতে হবে: মাটির ৬ ইঞ্চি নিচে গাছের শিঁকড় থাকে। তাই এই ৬ ইঞ্চি নিচ পর্যন্ত পানি পৌঁছেছে কিনা তা দেখতে পারলেই হয়। সেটা করার জন্য প্রথমে আমাদেরকে একটা বা কয়েকটা জাদুর নল বানিয়ে নিতে হবে।

[চিত্র ১] জাদুর নল প্রস্তুতকরণ
[চিত্র ১] জাদুর নল প্রস্তুতকরণ
জাদুর নল বানানো: {চিত্র ১} একটু চওড়া পিভিসি পাইপ কিংবা মোটা বাঁশ কিংবা মিনারেল ওয়াটারের বোতল নিতে হবে। এক ফুট (১২ইঞ্চি) পরিমাণ রেখে বাকি অংশ কেটে নিতে হবে। (বাঁশের ক্ষেত্রে মাঝখানের আইক বা জোড়াগুলো ফাটিয়ে নিতে হবে) তারপর ওটার ৬ইঞ্চি জায়গা জুড়ে একটু বড় বড়, যত বেশি সম্ভব ছিদ্র করে নিতে হবে। ব্যস, জাদুর নল হয়ে গেলো।
[চিত্র ২] জাদুর নল বসানো আর কাজ করার পদ্ধতি
[চিত্র ২] জাদুর নল বসানো আর কাজ করার পদ্ধতি
কিভাবে বসাতে হয়: {চিত্র ২} জমির মাঝখানে আধা ফুট (৬ইঞ্চি) গভীর গর্ত খুঁড়তে হবে। এই গর্তে আগে তৈরি করে নেয়া জাদুর নলের ছিদ্রওয়ালা দিক নিচের দিকে দিয়ে মাটি দিয়ে চারপাশ থেকে আটকে দিতে হবে। জমি উঁচু-নিচু হলে জমির বিভিন্ন স্থানে কয়েকটা বসাতে পারেন চাইলে।
ব্যাপারটা কিভাবে কী হয়: {চিত্র ২}যখন জমিতে পানি দেয়া হবে, তখন মাটি তা শুষে নিচের দিকে নিয়ে যাবে। একটা পর্যায়ে নিচে জমতে থাকবে। জমে জমে যখন আধা ফুট (৬ইঞ্চি) নিচে চলে আসবে, তখন আপনি জাদুর নলের মুখে তাকালে নিচে পানি জমা দেখতে পাবেন। তার মানে শিঁকড় পর্যন্ত পানি পৌঁছে গেছে। বন্ধ করে দিন পানির পাম্প বা সেচকাজ। কেন আর অযথা খরচ করবেন? …মনে রাখতে হবে, আবার যখন নলের তলায় [পানির বদলে] মাটি দেখা যাবে তখন আরো ২[দুই] ইঞ্চি পরিমাণ সেচ দিতে হবে। আর ধানের ফুল আসার পর পরবর্তি ২ সপ্তাহ ২ ইঞ্চি পানি ধরে রাখতে হবে, এটা দরকার।
এই যন্ত্রণা কেন করবো: জাদুর নল ব্যবহার করে সেচ দিলে বোরো (বরুয়া) মৌসুমে ১৩বার সেচের জায়গায় মাত্র ৮বার সেচ দিলেই চলে। এটা ব্যবহার করলে বিঘাপ্রতি প্রায় আধা মন (০.৫মন) ফলন বাড়বে। জমি পানিতে ডুবিয়ে রাখলে জিঙ্ক (Zn) আর সালফারের (S) ঘাঁটতি হয়, তাছাড়া মাটিতে বাতাস ঢুকতে পারেনা। জাদুর নল ব্যবহার করলে সেই সমস্যা থাকে না। আর ডিযেল খরচ কিংবা বিদ্যুৎ খরচ কতটা কমে যাবে, সেকথা নিশ্চয়ই আমার আর বলা লাগবে না।
কৃষকরা লেখাপড়া জানেন না। শিক্ষিত হয়েছি আমরা, আমরা তাদের প্রতিনিধি। তাই এইসব জ্ঞান আমরা পাই। ছবিগুলো প্রিন্ট করা সম্ভব নাহলে হাতে-কলমে তাদেরকে জাদুর নল বানিয়ে তো সহায়তা করতে পারেন। তাদের কাছে এইসব প্রযুক্তি পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব আমাদের শিক্ষিতদের উপর। মনে রাখতে হবে, টেকনোলজি মানে কলকব্জা না, লোহার তার বা রড না। টেকনোলজি মানে বিজ্ঞানের ফলপ্রসু প্রয়োগ।

– মঈনুল ইসলাম
wz.islam@gmail.com

___________________________

তথ্যউৎস:

দৈনিক প্রথম আলো; পৃষ্ঠা ১; জুন ২৭, ২০০৯ খ্রিস্টাব্দ

চিত্রাঙ্কণ: লেখক

মন্তব্য করুন