আমি পরিবেশবান্ধব হবো কিভাবে?

আমি যদি এখন আপনাকে প্রশ্ন করি, “আচ্ছা বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় কোনটি?”

আপনি তখন খুব সহজেই উত্তর করতে পারবেন, “গ্লোবাল ওয়ার্মিং, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন”।

“বাহ্, আপনি তো বেশ ভালোই খবর রাখেন, তা এখন বলুনতো এই গ্লোবাল ওয়ার্মিং জিনিসটা কী?”

আপনি তখন আমাকে আশ্চর্য করে দিয়ে বলে দিবেন, “সারা পৃথিবীর যে তাপমাত্রা বাড়ছে, এইটাই হলো গ্লোবাল ওয়ার্মিং।”

“এতে সমস্যাটা কী?”

“এতে গরমের সময় গরম আরো অতীষ্ট হয়ে যাবে। বরফ গলবে, সমুদ্রের উচ্চতা বাড়বে, বাংলাদেশ ডুবে যাবে।”

“আপনি অনেক ভালো খবর রাখেন। আচ্ছা বলেন তাহলে, কী করতে হবে আমাদের গ্লোবাল ওয়ার্মিং ঠেকাতে?”

“প্রচুর গাছ লাগাতে হবে, আর কার্বন-ডাইঅক্সাইড নিঃসরণ কমাতে হবে।”

“খুব সুন্দর। আচ্ছা এবার বলুন তো আপনি কী করছেন?”

এবার আপনি হাত উল্টে বললেন, “আমি আর কী করবো? আমি সামান্য ভাড়াটিয়া মানুষ। ঢাকা শহরে একফোটা জমিজমাও নাই। গাছ লাগাবো কই? রাস্তায় লাগাবো, গরুয়ে খাবে, না ছাগলে খাবে, না মানুষই ক’দিন পরে কেটে ফেলবে তার ইয়ত্তা নাই। আমার এক বন্ধু তার বাসার সামনে গাছ লাগিয়েছিল। রাস্তার ছেলেগুলো ওখানে বসে আড্ডা দিতো, তারা গাছটা ছিড়েছুড়ে রাখেনি কিছু। …আর কার্বন-ডাইঅক্সাইডের কথাতো? আমি গরীব মানুষ, নিজের গাড়ি-টাড়ি নাই, গ্যাসের চুলা ব্যবহার করি, কার্বন-ডাইঅক্সাইড ছাড়ার জিনিসই নাই; এক আমি নিঃশ্বাস ফেলার সময় যা ছাড়ি, আপনি কি তাও আমাকে বন্ধ করে দিতে বলছেন!” চেহারায় একটা অদ্ভুত অনুভূতি। আমাকে চুপ থাকতে দেখে আপনি আবার মুখ খুললেন শেষ কথা বলতে, “বরং শোনেন, এইসব কথা ঐ গুলশান-বনানীতে গিয়া বলেন। সরকারের কানে গিয়া বলেন। ওদের কাড়ি কাড়ি টাকা আছে, আরো কাড়ি কাড়ি টাকা বানাতে ওরা পরিবেশের তেরোটা বাজিয়ে ছাড়ছে, সরকাররে বলেন যেন সরকার ওগুলোর উপর ট্যাক্স বসায়, তাহলে ঠিকই সবাই ঠিক হবে। লাঠি গরম তো বাংগালি ঠিক।”

পরিবেশ সচেতনতা, বিশ্ব উষ্ণায়ন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি -এইসব ক্ষেত্রে আমাদের নিজের করার প্রশ্নটি যখন আসে, তখন আমাদের করার গন্ডিটা এই এখানে এসে আটকে যায়, যেন আমাদের আর কী করার আছে, এটা তো ঐ ধনীদের কাজ। কোথায় নিজের দিকে আঙ্গুলটা থাকার কথা ছিল, সেখানে আঙ্গুলটা তাক করি অন্যের দিকে; ভুলে যাবেন না, যখনই আপনি হাতের একটা আঙ্গুল তাক করছেন অন্যের দিকে, তখন হাতের বাকি চারটা আঙ্গুল কিন্তু তাক করে আছে আপনার নিজের দিকে। …তাই এই সবই হলো ভুল ধারণা।

প্রথমেই আমাদেরকে জানতে হবে শুধু কার্বন-ডাইঅক্সাইড না, আরো কয়েকটা গ্যাস আছে, যা এই বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য দায়ী, যেমন: ক্লোরোফ্লরোকার্বন (CFC), হাইড্রোক্লরোফ্লরোকার্বন (HCFC), হাইড্রোফ্লরোকার্বন (HFC), সালফার ডাইঅক্সাইড, হাইড্রোজেন সালফাইড, কার্বন মনোক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড, অ্যামোনিয়া, নাইট্রেট অক্সাইড আর কার্বন ডাইঅক্সাইড তো আছেই… এই যাবতীয় গ্যাসগুলোকে একত্রে ডাকা হয় “গ্রীণহাইয গ্যাস” (Greenhouse Gas) নামে। কথা হলো এইসব বৈজ্ঞানিক বড় বড় কথাগুলোর মানে কী? মানে আর কিছু না, এই গ্রীণহাইয গ্যাসগুলো বাতাসে কার্বন-ডাইঅক্সাইডের মতোই আছে, আর এই গ্যাসগুলো সূর্যের তাপে খুব দ্রুত গরম হয় আর গরম থাকেও বেশিক্ষণ। যেমন লোহার একটা রড আগুনের কাছে খুব দ্রুত গরম হয়, আর পানির চাইতেও বেশিক্ষণ গরম থাকে, তেমনটাই ব্যাপার।

এখন ব্যাপার হলো, এই গ্যাস বাতাসে থাকার দরকার আছে, নাহলে পৃথিবী ঠান্ডা হয়ে যাবে, আর ডিপফ্রিজ হয়ে যাবে আশপাশ, তখন সবাই মারা যাবো। আবার এই গ্রীণহাউয গ্যাস বেশি পরিমাণে থাকলে এমন গরম হবে পৃথিবী, দোযখের সমান হয়ে যাবে, তাই দরকার একটা সুন্দর সমতার পরিমাণ, যা গরমও রাখবে, কিন্তু কষ্ট দিবে না।

আরো আলোচনা করার আগে তিনটা শব্দের সাথে পরিচয় করিয়ে দিই, যা আমাদেরকে পথ দেখাবে:

  1. Reduce (কমিয়ে ফেলা),
  2. Recycle (বর্জ্য পুণঃচক্রায়ণ), আর
  3. Reuse (পূণর্ব্যবহার)।

শব্দগুলো কেন আমরা জানলাম, তা একটু পরেই বুঝতে পারবো।

এখন আমাদেরকে জানতে হবে কী কী জিনিস থেকে এই গ্রীণহাউয গ্যাসগুলো বের হয়? CFC গ্যাসটা বের হয় এরকম তিনটা জিনিস আমাদের সবার ঘরেই আছে, এক্কেবারে গরীবদের ঘরে না থাকলেও মধ্যবিত্তের ঘরে ঠিকই আছে:

  1. রিফ্রিজারেটর বা ফ্রিজ;
  2. এয়ার কন্ডিশনার বা এ.সি., আর
  3. এরোসোল স্প্রে।

এখন কথা হলো, আমার ঘরে যে ফ্রিজ সেটা কি তাহলে আমি ফেলে দিব পরিবেশ রক্ষা করার জন্য? …না, আপনি যে ফ্রিজটা ব্যবহার করছেন, সেটা যদি CFC-মুক্ত না হয় তাহলে সেটা ফেলে দেয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ ছিল; কিন্তু আপনি যখন সেটা ফেলে দিবেন, তখন সেটা পরিবেশের জন্য আরো ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। তাই আপনি বড়জোর সেটাকে বর্জ্য পূণঃচক্রায়ণ বা রিসাইকেল কিংবা পুণর্ব্যবহারোপযোগী করে নিতে পারেন, যদি সেটা আপনার পক্ষে সম্ভব হয়। আর আপনি যদি সেটা ফেলে দেন, তবে সেটার বর্জ্য পরিবেশের ক্ষতি তো করবেই, তাছাড়া আপনি যে নতুন আরেকটা কিনবেন, সেটা উৎপাদনের জন্য পরিবেশের যতটুকু ক্ষতি হয়েছে, আপনি সেটাকেও সাপোর্ট দিলেন, তাই আমাদেরকে নতুন উৎপাদন যথাসম্ভব Reduce করতে হবে।

আমি সিএফসি-মুক্ত
আমি সিএফসি-মুক্ত

তবে নতুন আরেকটা ফ্রিজ, এ.সি. কিংবা এরোসল কিনবার সময় সেটা CFC-মুক্ত কিনা তা যাচাই করে কিনুন। আজকাল এসব পণ্যের গায়ে লেখাই থাকে CFC Free কথাটি। আর তার জন্য যদি সামান্য এক-দুই পয়সা অতিরিক্ত গুণতেই হয়, তবে সেটাও আপনি করবেন, কারণ আপনি কোনোভাবেই আপনার সন্তানের ক্ষতি দেখতে চান না। মোটকথা সামর্থ থাকলে আপনি যেকোনোভাবেই সিএফসিমুক্ত পণ্য কিনবেন, এই ইচ্ছা আপনার এক্কেবারে পাকাপোক্ত করে নিতে হবে।

আপনার গ্যাসের চুলা, মোমবাতি, গ্যাস লাইটার, ম্যাচ যা-ই জ্বালান না কেন, আগুন জ্বালানোর জন্য অক্সিজেন থাকতে হয় আশেপাশে। আপনি ম্যাচটা ঘষা দিতেই বাতাসের অক্সিজেনগুলো সেখানে আশেপাশে আছে বলেই আপনার ম্যাচ কাঠিটি স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়েই জ্বলে উঠে। নাহলে স্ফুলিঙ্গ ছড়ালেও কাঠিটা জ্বলতে পারতো না। আর এটা সবাই জানি যে, অক্সিজেন যখন আগুনের মধ্যে জ্বলে যায়, তখন সে আর অক্সিজেন থাকে না, হয়ে যায় কার্বন-ডাইঅক্সাইড। এখন একবার চিন্তা করে দেখুন তো, আপনি যখনই কোনো না কোনো আগুন জ্বালাচ্ছেন, তখন আপনি অক্সিজেন কমাচ্ছেন আর কার্বন-ডাইঅক্সাইড বাড়াচ্ছেন কিনা? …না আমি আপনাকে আগুন জ্বালানো বন্ধ করে দিতে বলছি না, আমি বলছি Reduce-এর কথা; সম্ভব হলেই কমিয়ে ফেলুন। গ্যাসের চুলার কাজ শেষ হলেই বন্ধ করে দিন, একটা ম্যাচের কাঠি অল্পক্ষণ জ্বলার জন্য যে পরিমাণ অক্সিজেন নষ্ট করবে আর যে পরিমাণ কার্বন-ডাই অক্সাইড ছাড়বে, চুলাটা জ্বালিয়ে রাখলে তার চেয়ে ঢের বেশি ক্ষতি হবে। অপ্রয়োজনে একটুকু আগুনও জ্বালিয়ে রাখা যাবে না। …তাহলে আপনি এবার সিগারেট ফুঁকবেন কিনা ভাবুন।

আপনাকে বিদ্যুতের ব্যবহার কমিয়ে ফেলতে হবে। মজার ব্যাপার হলো অনেকেই প্রয়োজন শেষ হতেই বৈদ্যুতিক জিনিস, বাতি, ফ্যান বন্ধ করে দেয়াকে মনে করে ‘কিপটামি’। আবার অনেকে মনে করেন ‘আমার টাকা আছে, বিদ্যুৎ ব্যবহার করছি, বিল দিব, আমি তো আর চুরি করে বিদ্যুৎ ব্যবহার করছি না’। না, এর কোনোটাই সঠিক যুক্তি না। বরং আপনি যখন বিদ্যুৎ খরচ করছেন, তখন আপনার জানা উচিত এই বিদ্যুৎটুকু উৎপাদনের পিছনে ব্যয় হয়েছে, যদি গ্যাস-কয়লা থেকে উৎপাদন হয়ে থাকে, তবে পরিবেশের ক্ষতি হয়েছে; তাই এই বিদ্যুৎ আপনি যত কম ব্যয় করবেন, তত কম উৎপাদন করেই কাজ চলবে, আর তত কম পরিবেশের ক্ষতি হবে। তাই যখনই সম্ভব, যেভাবে সম্ভব আপনাকে বিদ্যুতের ব্যবহার কমিয়ে ফেলতে হবে। এটা আপনার সন্তানের ভবিষ্যতের প্রশ্ন।

খুব ছোট্ট ছোট্ট কিছু জায়গায় বিদ্যুৎ সাশ্রয় করা যায়, যা আমরা জানি না। যেমন টিভি, মনিটর ইত্যাদিতে ছোট্ট বিন্দুর মতো যে বাতিটা জ্বলে তাকে বলা হয় LED বাতি। এই লেড বাতি খুব কম বিদ্যুৎ খরচ করলেও অনেকগুলো লেড বাতি যদি ঘরে জ্বলতেই থাকে, তবে দেখা যায় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বালুর কণা যেমন মহাদেশ গড়ে তোলে, এরাও সম্মিলিতভাবে বিদ্যুৎ বিল ঠিকই বাড়িয়ে দিয়েছে। তাই কাজ শেষ হওয়ামাত্র লেড বাতিগুলোও বন্ধ করে দিতে হবে। মোবাইলের চার্জার কেনার সময় অযথাই একটা লেড বাতিওয়ালা চার্জার না কনলেও চলে, কারণ মোবাইলে চার্জ হচ্ছে কিনা, সেটা মোবাইলের পর্দায়ই দেখা যায়।

পানি ব্যবহারে, গ্যাস ব্যবহারে, মোটকথা প্রাকৃতিক যেকোনো সম্পদ ব্যবহারে মিতব্যয়ী হতে হবে। ‘মিতব্যয়’ কী জিনিস? কঠিন সংজ্ঞাটা বলি:

জনাব মুহাম্মদ [স.]-এর সা’দ [রা.] নামের এক সহচর ওযুর পানি ব্যবহারে অপচয় করছিলেন দেখে মুহাম্মদ [স.] তাঁকে বললেন, তুমি পানি অপচয় করছো কেন? সা’দ [রা.] বললেন, ওযুর সময়ও কি পানি অপচয় হয়? মুহম্মদ [স.] বললেন, হ্যা, এমনকি যদি তুমি চলমান নদীতেও ওযু করো তাতেও পানির অপচয় হয়।

তাহলে নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, ওযুর মতো একটা পবিত্র কাজেও প্রয়োজনের অতিরিক্ত এক ফোঁটা পানি ব্যবহারেও ছাড় নেই, এমনকি অঢেল পানি (যেমন নদীতে) থাকাসত্ত্বেয় তা প্রয়োজনের অতিরিক্ত এক বিন্দুও ব্যবহারের অনুমতি নেই। সুতরাং আমাদেরকে কিভাবে পানিসহ অন্যান্য প্রাকৃতিক উপদান সংযতভাবে ব্যবহার করতে হবে, তা নিশ্চয়ই আর বুঝিয়ে বলতে হচ্ছে না।

আরও অনেক কিছু করার আছে, এই ব্লগ সাইটের ecomania বিষয়-সূচির অধীনে থাকা ব্লগ-নিবন্ধগুলোতে আপনারা এরকম করণীয় সম্বন্ধে প্রতিনিয়তই জানতে পারবেন। আর যারা গাছ লাগাতে পারছেন না বলে মনোকষ্টে ভুগছেন, তারা নিজেদের বারান্দাতেই টবের মধ্যে একটা-দুটো-তিনটে যতটা সম্ভব গাছ লাগিয়ে যত্নআত্তি করতে পারেন। পানি দেন, ব্যবহার করা চায়ের পাতা শুকিয়ে দেন গোড়ায়, যত্ন নিন…আপনার সন্তানের জন্য কিছু করে যান।

মনে রাখবেন, আমি না করে গেলে আমার সন্তানের জন্য ধনীরাও করবে না, সরকারও না, এমনকি আল্লাহও করবেন না…কারণ আল্লাহ বলেই দিয়েছেন:

“…নিশ্চয় আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যেপর্যন্ত না তারা নিজেরা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করার চেষ্টা করে;…” [সূরা (১৩) রা’দ: আয়াত ১১ (খন্ডিতাংশ)]

আমাকে আমার চেষ্টাটুকু করতে হবে, আমাকে আমার করার জন্য সক্ষমতাটুকু আল্লাহ’র কাছ থেকে দোয়া করে চেয়ে নিতে হবে, যখন আমি শুরু করবো, তখনই কেবল আল্লাহ আমাকে সহায়তা করবেন, আগে নয়।

-মঈনুল ইসলাম
______________________________
তথ্যসূত্র:


. ইবনে মাজা, ক্বিতাবুত-ত্বহারাত ওয়া সুনানূহা, হাদীস নং-৪১৯। আহমাদ, মুসনাদিল-মুকাসসিরীন, হাদীস নং-৬৮৬৮ (হাদিস সংকলন গ্রন্থদ্বয়)।

আলোকচিত্র উৎস:
http://rlv.zcache.com/

মন্তব্য করুন