অজানা লেকের অভিযানে বান্দরবান ২০১৩ : দ্বিতীয়াধ্যায় : পর্ব ৪

ধারাবাহিক:  অজানা লেকের অভিযানে বান্দরবান —এর একটি পর্ব

« অজানা লেকের অভিযানে বান্দরবান : প্রথমাধ্যায়

« আগের পর্ব

[ঘোষণা: এপর্বের বিভিন্ন স্থানে ভৌগোলিক স্থানাঙ্কের উল্লেখ করা হয়েছে। নিজস্ব, কিংবা অগ্রজ ট্রেকারদের সংগৃহীত স্থানাংকগুলোকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। যেখানে দুটোর কোনোটাই সহজলভ্য হয়নি, সেখানে গুগল আর্থে পিন নিয়ে তার স্থানাঙ্ক দেয়া হয়েছে। তবে সেক্ষেত্রে স্থানাঙ্কের আগে GE উল্লেখ করা হয়েছে।]

পায়দল তিন্দু থেকে রেমাক্রি হয়ে নাফা খুম। সেখান থেকে জিন্না পাড়ার দিকে রওয়ানা দিয়ে নতুন এক পাড়ায় – ঔলাওয়া পাড়ায় রাত্রিযাপন। অতঃপর ভোরে উঠে আমাদের অজানা লেকের অভিযানে বেরিয়ে পড়া… তারপর, সামনে দু’দুটো পাহাড়। কলিজা শুকিয়ে আসার আগে ঝিরি থেকে পানি নিয়ে পাহাড়ের চড়াই ধরা… এবং অতঃপর:

ফেব্রুয়ারি ২৪ (সূর্যবার) – ০৭:৩৫ – শুরু হলো আমাদের পাহাড়ে আরোহণ। পাহাড়ে উঠার অভিজ্ঞতা বলতে আমার, সিলেটে অনুচ্চ পাহাড়ে হাঁটাচলা, আর গতবছরের অফ-ট্র্যাক বান্দরবান; রাসেলেরও গত বছরের অফ-ট্র্যাকে পাহাড় বাওয়া, অবশ্য মচকানো পা নিয়ে। তাই পাহাড়কে ভয় না পেয়ে শুরু করলাম আমরা উর্ধ্বারোহণ। মনকে শক্ত করে নিলাম, কারণ পাহাড় বাওয়া আমারও খুব পছন্দের কাজ না, তবে উপর থেকে যখন আশপাশটা দেখি, তখন বারবার পাহাড়ে উঠতে মন চায়। এবারও হয়তো সেই নেশায়ই উঠতে শুরু করলাম।

পাহাড়ে উঠতেই সকালের রোদে ঝিরিটার অপূর্ব আবাহন (ছবি: লেখক)
পাহাড়ে উঠতেই সকালের রোদে ঝিরিটার অপূর্ব আবাহন (ছবি: লেখক)

বান্দরবানে “পাহাড়ে উঠা” বিষয়টা এমন না যে, খাড়া একটা দেয়ালে ঝুলে ঝুলে উঠা, বান্দরবানে পাহাড়ে উঠা মানে হলো ক্রমশ উঁচু হতে থাকা পথ ধরে ধীরে ধীরে উঠতে থাকা। কোথাও সেই ক্রমশ উঁচু হতে থাকার ব্যাপারটা খুব আকষ্মিক, কোথাও বেশ ধীর। পথ চলা, পথ চলা।

ব্যাগের ওজনটা বড্ড বেশি মনে হচ্ছে, হাতে ক্যামেরা ধরা। রাসেল দেখা গেলো কিছুক্ষণের মধ্যেই নিজের পিঠে যা কিছু অবশিষ্ট ছিল, তার থেকে ক্যামেরা আর সম্মিলিত রসদটুকু সরিয়ে নিল দ্বিতীয় গাইড থং প্রি মুং-এর ব্যাগে। তার কয়েকপ্রস্ত কাপড় ছাড়া পিঠের ব্যাগে কিছুই নেই আর। তবু তার বড্ড কষ্ট হচ্ছে পাহাড়ে উঠতে। জিজ্ঞেস করলেই বলে, “পাহাড়ে উঠাটাই আমার সবচেয়ে বড় শত্রু।”

পাহাড়ে এই বোঝা টেনে চলা সত্যিই কষ্টের (ছবি: রাসেল)
পাহাড়ে এই বোঝা টেনে চলা সত্যিই কষ্টের (ছবি: রাসেল)

রাতের শিশিরে পাহাড়ি ফুলগুলো সিক্ত, অথচ কড়া রোদ উঠছে পাহাড়ের কোলে। এখনও মৃদু শ্বৈত্য থাকলেও পাহাড়ে উঠার পরিশ্রমে আমাদের শীতবস্ত্র, পাড়া থেকেই খুলে এসেছি আমরা। আমাদের বামদিকে আরেকটা উঁচু পাহাড়, তাই আমাদের দৃষ্টিসীমা ডানদিকে বেশি প্রসারিত। ডানদিকে ঐতো দেখা যাচ্ছে জিন্না পাড়া, পাশেই চোখে পড়ছে জিন্না পাড়া আর্মি ক্যাম্প, উপরে হ্যালিপ্যাডও আছে। জিন্না পাড়াই উঁচু একটা পাহাড়ের উপর, আর আমরা এখন যে পাহাড়ের পেট দিয়ে হাঁটছি, সেটা জিন্না পাড়ার পাহাড়েরও খানিকটা উপরে। ডানদিকে একটা জুমঘর পেরিয়ে এগিয়ে চললাম। জিন্না পাড়া থেকে আরো সামনে ঐ দেখা যাচ্ছে আরেকটা পাড়া – গাইড নুং চ জানালেন, এটা নাইক্ষ্যং পাড়া। আর ঐ দূ–রে, ঐ যে দূ–রে যে পাড়াটা দেখা যাচ্ছে, ওটা হলো বাকলাইম পাড়া

বামে একটা পাহাড় রেখে আমাদের পথ চলা, ডানদিকে তখন জিনা পাড়া ছেড়ে যাচ্ছি (ছবি: লেখক)
বামে একটা পাহাড় রেখে আমাদের পথ চলা, ডানদিকে তখন জিনা পাড়া ছেড়ে যাচ্ছি (ছবি: লেখক)

আবার পথটা খাড়া হয়ে উঠে যাচ্ছে … এদিকে ক্যামেরার শেষ ব্যাটারি ক্ষয় হচ্ছে আমার। শেষ পর্যন্ত লেকের ছবি তুলতে পারবো তো? মনে সংশয়। তবু জিপিএসটা চালু করলাম, জানি জিপিএস চালু করলে ব্যাটারির ড্রেইন বেড়ে যাবে, তবু পথটার একটা নাম নিশানা থাকা দরকার। ক্যামেরার জিপিএস চালু করার পর এক মিনিট লাগে স্যাটেলাইটের সাথে যোগাযোগ করতে। পাহাড়ের উপর জিপিএস খুব ভালো কাজ করে। এক মিনিট ক্যামেরা চালু রাখলাম, কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখা গেল চারটা স্যাটেলাইটের সাথে যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছে। ঐসময় একটা ছবি তুলেছিলাম, মেটা ডাটায় স্থানাংক এসেছে:

অক্ষাংশ: N 21°45.474′ (21°45’28.4″)
দ্রাঘিমাংশ: E 92°31.607′ (92°31’36.4″)
উচ্চতা সমুদ্রসমতল থেকে 150.70 মিটার (494.42 ফুট)
[২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ০১:৪৮:৫৭.৬২]

ক্যামেরা কাঁধ সমান উচ্চতায় ধরে হাঁটতে থাকলাম। যে পথটা ট্রেক হলো, তার অবস্থান (মানে ছোট্ট একটা দাগ মাত্র) জানা যাবে এই জিপিএস ফাইল থেকে (.kmz)। বেশিক্ষণ চালু রাখলাম না জিপিএস – ক্যামেরাটা জীবিত রাখা দরকার।

kmz-iconএখানকার জীববৈচিত্র্য দেখে আমি মুগ্ধ। বহু বহুদিন পরে একটা টিয়া পাখি দেখলাম জঙ্গলে বিচরণ করতে। একটা গাছের ডালে চুপ করে বসে আছে। বুকটা কমলা, শরীরে টিয়া রঙের পালক, গলার ঠিক নিচে কালো পালক, মাথাটা ধূসর রঙের, আর দুটো চোখ বরাবর কালো পালকের একটা রেখা, আর সোজা লেজের শেষ মাথাটা মাছরাঙা-নীলাভ — এককথায় অসাধারণ!! এতো কিছুতো আর এখান থেকে দেখা সম্ভব না দূরবিন ছাড়া, তাই 42x যুম ক্যামেরাই সম্বল।

পাহাড়ে দেখা টিয়া - দেখা না বলে উপভোগ করা বললে ভালো বলা হবে (ছবি: লেখক)
পাহাড়ে দেখা টিয়া – দেখা না বলে উপভোগ করা বললে ভালো বলা হবে (ছবি: লেখক)

…আমার যাত্রা শুরু হয়েছিল চট্টগ্রাম থেকে, আর সেখান থেকেই আমি এর আকর্ষণ অগ্রাহ্য করতে পারছি না, বড় সুন্দর সে, বড্ড বেশি আকর্ষণীয় – টকটকে লাল, এক্কেবারে টকটকে লাল তার বর্ণ – আর কিছু নয় – শিমুল ফুল। এতো সুন্দর ক্যানরে বাবা! আর ভাল্লাগে না! বেশি সুন্দর বলেই হয়তো গাছের গা জুড়ে কাঁটা গজিয়ে রেখেছে ও ব্যাটা। অগ্রাহ্য করতে পারি না তার আকর্ষণ, হয়তো এরই টানে এগিয়ে চলি।

আকাবাঁকা পথটা ঢালু হয়ে উপরের দিকে উঠে যাচ্ছে ক্রমশ। আশপাশটায় চোখ পড়লে থমকে দাঁড়িয়ে দেখতে ইচ্ছে করে এই অপূর্ব মায়াময় বাংলাদেশকে – এতোটাই সুন্দর লাগে আদো কুয়াশাচ্ছন্ন পাহাড়-সারি যে, বিমুগ্ধ হয়ে শ্রেফ তাকিয়েই থাকতে হয়। কিন্তু এই মোহ থেকে নিজেকে মুক্ত করতেই হয় – সামনে অনেকটা পথ বাকি।

পাহাড়ের মধ্যে উর্ধ্বমুখী সাঁকো - জীবনে দেখননি? দেখে নেন! (ছবি: লেখক)
পাহাড়ের মধ্যে উর্ধ্বমুখী সাঁকো – জীবনে দেখননি? দেখে নেন! (ছবি: লেখক)

এর মধ্যে সামনে গিয়ে দেখি এক সাঁকো! পাহাড়ের উপরে সাঁকো?! হায়! হায়!! এ কী? আমি সত্যি বলছি, আমার জীবনে প্রথম এমনটা দেখলাম, একটা সাঁকো আকাশের দিকে উঠে গেছে। না, এতো আহামরি কিছু নয় – একটা গাছে খাঁজ কেঁটে তা পাহাড়ের চরম খাড়া অংশে বসিয়ে রেখেছে এপথে চলাচলকারী পাড়াবাসীরা। ধরে ধরে উঠার জন্য পাশেই একটা বাঁশও লাগানো। সাঁকো পার হয়ে আরোও উপরের দিকে উঠা।

একটু বেশি খাঁড়া জায়গাগুলো বিপদজনক, কারণ গাছ থেকে ঝরা পাতাগুলোতে পা পড়লে, ভর দেয়ামাত্রই পা পিছলে যেতে চায়, ভালোমতো গ্রিপ করতে পারে না। তাই একটু বেশি খাড়া জায়গায় যথাসম্ভব কম ভর দিয়ে চলার চেষ্টা করছি, একান্ত না পারলে পা ফেলার আগে পাতাগুলো সরিয়ে নিতে চেষ্টা করছি – কিন্তু পাতা সরিয়ে সরিয়ে হাঁটার বিষয়টা সময়সাধ্য আর চলার গতি ধীর করে দিচ্ছে – তাই তথইবচই সই।

ভূমি-সমতলে ক্যামেরাটা ধরলে পাহাড়ের চড়াইটা এভাবেই নজরে আসে (ছবি: লেখক)
ভূমি-সমতলে ক্যামেরাটা ধরলে পাহাড়ের চড়াইটা এভাবেই নজরে আসে (ছবি: লেখক)

অফ-ট্র্যাক বান্দরবান-এ আবুবকর আর কামরুলের কাছে শিখেছিলাম পাহাড়ে চড়ার কষ্ট কমিয়ে দেয়, যদি মুখে কিছু চিবানো যায়। চিবানোর কথা মনে হলেই আমাদের সবার আগে মনে পড়ে যে চ্যুইংগাম – সেটা কিন্তু নেয়া যাবে না, কারণ চ্যুইংগাম গলা শুকিয়ে দেয়। তাই আমরা এনেছি ম্যাংগো বার, খেঁজুর, চকলেট। কিন্তু এবারে আমার এগুলোর তেমন একটা দরকার হচ্ছে না। কেন জানি না, দলের সিদ্ধান্ত নিতে থাকলে টেনশনে এগুলোর কম দরকার হয় মনে হয়। …এদিকে রাসেল বরাবরের মতোই পিছনে, আর তার সমস্যা হলো নিজে যেমন পিছিয়ে থাকে, সঙ্গীকেও পেছন থেকে ধরে রাখে – ঐ নাকিবের পেইন ম্রো’র মতো। 🙂

আমার কাছাকাছি আছেন প্রধান গাইড নুং চ – আরেকটু সামনে গিয়ে আমাকে আশ্চর্য করে দিয়ে তিনি দেখি মেঝেতে একটা কলাপাতা বিছিয়ে শুয়ে পড়লেন। আমি তো দেখে হেসে বাঁচিনে, এই সামান্য একটা পাহাড় উঠতে একজন পাহাড়ি হাঁপিয়ে গেছেন! আমি হাসতে হাসতে বললাম, ‘দা-দা! আ-মি কিন্‌তু ঢা-কায় গিএ এই ছ-বি দে-খায়া বলবো, দে-খো দা-দাই টায়ার্ড হএ গেছেন!’ শুনে হাসলেন নুং চ।

পাহাড়ের গায়ে গজানো গাছগুলোর ফাঁক গলে দেখা নীলাভ আকাশে ভেসে থাকা পাহাড়ি জনপদ (ছবি: লেখক)
পাহাড়ের গায়ে গজানো গাছগুলোর ফাঁক গলে দেখা নীলাভ আকাশে ভেসে থাকা পাহাড়ি জনপদ (ছবি: লেখক)

সামনে এগোতে থাকলে নুং চ মেঝে থেকে একটা পাতা তুলে হাতে দিলেন। কী যেন নাম বললেন পাতাটার – তবে এতটুকু বুঝলাম উপাদেয় পাতা। দেখে মনে হলো পুদিনা পাতার মতো। বিয়ার গ্রিল্‌সের কথা মনে হলো – পথে পাওয়া সামান্য খাদ্যও ছাড়তে নারাজ – কোনো চিন্তা-ভাবনা না করেই সবার অলক্ষে পাতাটা মুখে পুরে দিলাম। না, পুদিনা পাতা না। স্বাদও তিতা। কিন্তু ঐ যে, সার্ভাইভাল ফুড বলে কথা – পুষ্টি হলো সবকিছু। দুবার চিবিয়েই গিলে ফেললাম। ঈশ্বরের অনেক কৃপা!

"কাঠবিড়ালি-কাঠবিড়ালি কোথায় তুমি যাও?..." - খুব বেশি দুষ্টু - ক্যামেরাই ধরাই কষ্ট (ছবি: লেখক)
“কাঠবিড়ালি-কাঠবিড়ালি কোথায় তুমি যাও?…” – খুব বেশি দুষ্টু – ক্যামেরাই ধরাই কষ্ট (ছবি: লেখক)

আবারো উর্ধারোহন। এবারে দূরে আরেক সৌন্দর্য! কাঁশফুলের বাগান যেন কোনো। পাহাড়ের গায়ে অনেক অনেক কাঁশফুল এক জায়গায় – বেশ সুন্দর দৃশ্য! কোনোও গাছের গায়ে দেখি কাঠবিড়ালি বিরামহীনভাবে নড়ে চলেছে, নাড়ছে তার চুলময় পুচ্ছটা; তো কোনো গাছে পাখিদের আনাগোনা – হলদে পাখি, ফিঙে, বুলবুল, টিয়া পাখি – আরো নাম-না-জানা পাখিরা। হঠাৎ এক জায়গায় এসে শুনি আশেপাশে গুননননন গুননননন শব্দ হচ্ছে – শব্দটা একটা চলছেই। বুঝতে কষ্ট হলো না – এখানেই আশেপাশে কোথাও আছে মৌমাছির ঝাঁক।

এদিক থেকে ডানদিকে বেশ কয়েকটা পাড়া দেখা যায় – কাছের পাড়াটা সাতিজন পাড়া (ত্রিপুরা পাড়া), অংফা পাড়া (মুরং), ঐ দূরেরটা চম্‌ঈ পাড়া বা চম্মী পাড়া (মুরং)। আমি পাড়াগুলোর নাম ঠিকই লিখে রেখেছি, কিন্তু ঢাকায় এসে যখন গুগল আর্থ নিয়ে বসেছি, দুয়েকটা জিপিএস ট্র্যাক থাকাসত্ত্বেয় পাড়াগুলোর নাম পিন-পয়েন্ট করতে পারিনি। কারণ আমাদের ট্র্যাকটাই সঠিক করে ঠাহর করা যায়নি ম্যাপের মধ্যে। যাহোক, আমাদের পথের বিবরণ দিই, ভবিষ্যতে কেউ হয়তো পাড়াগুলোর অবস্থান আরো পিনপয়েন্ট করবেন।

ঘড়িতে ০৯:০৫, আমি আর নুং চ মং উঠে এলাম পাহাড় চূঁড়ায়। রাসেলের দেখা নেই। ০৯:২০ রাসেল আর থং প্রি মুংও সামিট করলেন। এই ‘সামিট করা’, মানে ‘চূঁড়ায় চড়া’ ব্যাপারটা, এভারেস্টে হলে ‘বহু কিছু’। কিন্তু মাত্র কয়েকশ’ ফুট উঁচুতে উঠে আকাশ ছুঁয়ে ফেলেছি মনে করলে বোকাই বলা যায়। কিন্তু সত্যি বলছি, মাথার উপর অবারিত আকাশ দেখে তখন সত্যিই মনে হয়: আকাশে পেতেছি ঘরখানি মোর, আকাশে রেখেছি শিয়র। আমি, উড়ছি যেনবা আকাশ পানে, এ’ পাহাড়পুরির ’পর

কিছুটা জিরিয়ে তো নেয়াই যায়। ব্যাগ থেকে চকলেট, পানি, খেঁজুর দিয়ে একটা ছোটখাটো ভোজ সেরে বিশ্রাম করা হলো। এই ফাঁকে নুং চ’র সাথে কথা বললাম – এই পাহাড়ের পশ্চাৎপদ জীবনেও তিনি জানালেন: অধিক সন্তান থাকলে তাদের ‘মানুষ’ করা যায় না, যা করা যায় কম সন্তান থাকলে। শুনে আমি সত্যিই বেশ আশ্চর্য হলাম। কিছুক্ষণ নিঃস্তব্ধ হয়ে গেলাম এই নিতান্ত মুর্খ মানুষটার মাঝে সুশিক্ষিত একজন মানুষকে দেখে। ধন্যি, নুং চ হে, ধন্যি তোমার মনোবাঞ্চা!

এবারে আমাদেরকে পাহাড় থেকে নামতে হবে। আগেই বলেছি, পাহাড়ে উঠা মানে যেমন খাড়া দেয়াল বেয়ে উঠে যাওয়া না, তেমনি নামাও না। বিষয়টা হলো মাইল-কে-মাইল ধরে ক্রমশ ঢালু পথধরে উঠা কিংবা নামা। আবার উঠার পথেও সর্বত্রই উঠা না, বরং কোথাও উঠা-উঠা-নামা-উঠা.., তেমনি নামার পথেও সর্বত্র নামা না, বরং নামা-উঠা-নামা-নামা..।

বিশাল মহীরূহের জীবনাবসানের সাক্ষী হলেন গাইড নুং চ মং (ছবি: লেখক)
বিশাল মহীরূহের জীবনাবসানের সাক্ষী হলেন গাইড নুং চ মং (ছবি: লেখক)

সামনে একজায়গায় গিয়ে প্রচুর কাটা গাছ পড়ে থাকতে দেখা গেলো – বেশ কষ্টের বিষয়। নুং চা জানালেন, কাছেই কেদাগ ঝিরি দিয়ে, এখান থেকে কাটা গাছগুলো নামিয়ে সাবাড় করে ফেলা হয়। বড় বড় গাছগুলো তো আর টেনে নামানো যায় না, ছোট ছোট লগ করে কেটে নেয় যাওয়া হয়। …অবশ্য সামনে গিয়ে দেখি এক মহীরূহের প্রাকৃতিক মুত্যু – বয়স হয়েছে, উঁইপোকা কেটে ফেলেছে গোড়া, আর টিকে থাকতে না পেরে প্রপাতধরণীতল হয়েছে বেচারা। ভূপাতিত বিশাল গাছটার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা নুং চ’র ছবি তুললাম।

পাহাড়ের উপর থেকে দেখা সূর্যাস্তের পূর্বলগ্নে তোলা প্যানোরামা। (ছবি: লেখক)
পাহাড়ের উপর থেকে দেখা সূর্যাস্তের পূর্বলগ্নে তোলা প্যানোরামা। (ছবি: লেখক)

পথ চলা, ধীর উৎরাই, ধীর পতন। সামনে দেখা গেলো বেশ অনেকটা জায়গা বেশ উন্মুক্ত। সবাই-ই কিছুক্ষণ না দাঁড়িয়ে পারলাম না এই সৌন্দর্য্য উপভোগ করার জন্য। আশপাশে বেশ কয়েকটা পাড়া দেখা যাচ্ছে, তার কোনো কোনোটা আরো দূর থেকে দেখেছি এতক্ষণ। ক্যামেরা দিয়ে একটা প্যানোরামা তুললাম। …এরপর আবারো নামতে থাকা। সামনে কিঞ্চিৎ সমতলে বামদিকে একটা স্কুলঘর: দেপসা পাড়া কমিউনিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়। স্থাপিত ২০০৮, ইউএনডিপি আর সিএইচটিডিএফ-এর অর্থায়নে তৈরি, বাস্তবায়নে তৈমু। সাইনবোর্ডে ‘দেপসা পাড়া’ লেখা থাকলেও গাইড নুং চ বারবার আপত্তি করছেন, এটা আসলে থাইদং পাড়া (ত্রিপুরা) (স্থানাংক (GE): 21°45’25.41″N, 92°30’27.79″E)।

দেপসা পাড়া কিংবা থাইদং পাড়া - বামদিক ধরে গেলে দাদার পাড়া যাওয়া যায় (ছবি: লেখক)
দেপসা পাড়া কিংবা থাইদং পাড়া – বামদিক ধরে গেলে দাদার পাড়া যাওয়া যায় (ছবি: লেখক)

তাঁর কথা হয়তো সত্যিই, কারণ একটু সামনেই পড়লো বিশাল একটা পাড়া। পাহাড়ের বুকটা উলঙ্গ করে গড়ে উঠেছে একটা পাড়া, মাঝখান দিয়ে পথ, দুপাশে সারি সারি ঘর। ত্রিপুরারা বেশিরভাগই খ্রিস্টান হয়ে গেছেন – এপাড়াতেও তার নজির নজরে এলো: একটা ক্রুশ লাগানো ছোট্ট পাখির বাসার মতো ঘর, সম্ভবত যিশুকে ধারণ করে উপাসনার কোনো বিষয় – আমি একে বলি লৌকিক খ্রিস্টধর্ম – পৌত্তলিকতার বাতাবরণে ঈসায়ী খ্রিস্টধর্মের আরেক রূপমাত্র।

আজব বেড়া - আজব তার পারাপারের ব্যবস্থা (ছবি: লেখক)
আজব বেড়া – আজব তার পারাপারের ব্যবস্থা (ছবি: লেখক)

থাইদং পাড়ার ভিতর দিয়ে যে পথটা, ওদিকে যাওয়া যায় দাদার পাড়া, যাওয়া যায় তিন্দুও। কিন্তু গাইড থং প্রি মুং আমাদেরকে ডানদিকের সরু পথটা ধরতে বললেন। আমি বিভিন্ন হিসাব নিকাশ করে, ছবিগুলোতে ছায়া দেখে সূর্যের অবস্থান নির্ণয় করে, ফেব্রুয়ারিতে বান্দরবানের আকাশে সূর্যের গতিপথ সনাক্ত করে, দিক স্মরণ করে আন্দাজ করতে পারি যে, সূযটা দক্ষিণ আকাশে ছিল (পরে সেটা এই সিমুলেটর^ দিয়ে নিশ্চিত হয়েছি[১])। আর দাদার পাড়ার দিকে যাবার পথটাও ছিল দক্ষিণ দিকে, আমরা ডানদিকের পথটা ধরেছি বলে সেটা উত্তর দিকে। কিন্তু গুগল আর্থে মার্ক করা পাড়াগুলো দেখে সময়, আর পার করে আসা দূরত্বের হিসাব করলে কিছুতেই নিজেদের অবস্থান সনাক্ত করতে পারি না। কেন যে এসময়টায় একটা জিপিএস রিডিং নিলাম না – এখন বড় আফসোস লাগে। তবে এটা সত্যি, আমার ব্যাটারি যদি সাপোর্ট দিত আমি পুরো পথটারই জিপিএস রিডিং নিয়ে ফিরতাম। তবে প্যানোরামা ছবি তোলার জায়গায় দাঁড়িয়ে সাতিজন পাড়ার যে ছবি তুলেছি, সেখানে ছায়ার অবস্থান দেখে এই হিসাব থেকে আন্দাজ করতে পারি, আমাদের ট্রেইলটা সাতিজন পাড়া থেকে পশ্চিম দিকে।

যাহোক, সামনে পড়লো একটা আজব বেড়া (ঘড়িতে ১০:২১) – খাড়া বেড়াটার এপাশে একটা খাঁজ কাটা গাছ, ওপাশে আরেকটা। এগুলো দিয়ে বেড়াটা টপকাতে হয়। সম্ভবত পাড়ার পোষা প্রাণীকে আটকাতে কিংবা বন্য প্রাণীকে পাড়ায় আসতে বাধা দিতে এমন বেড়ার অবতারণা। সামনের আকাবাঁকা পথটা নেমে যাচ্ছে আরো নিচে। এপথ ধরে আরো সামনে এগোতে থাকলাম। হঠাৎ অনুভব করলাম আমার খানিকটা মাথাব্যথা করছে। সাথে সাথে বুঝে গেলাম কী করতে হবে। কারণ সার্ভাইভাল গাইডে পড়েছি, শরীরে পানিশূণ্যতা দেখা দেয়ার প্রাথমিক লক্ষণগুলোর একটি হলো মাথাব্যথা (১০% পানি বেরিয়ে গেলে দেখা দেয়)। নো কম্প্রোমাইজ – যেহেতু সাথে পানি আছে। সাথে সাথে ব্যাগ থেকে পানি বের করে অল্প অল্প করে কিছু পানি খেলাম। পানি, ঐ যে ঝিরি থেকে যতটুকু নিয়ে এসেছিলাম – তা-ই সম্বল।

পাহাড়ের পথগুলো এভাবেই কখনও সমতল, কখনও নামা, কখনও উঠা (ছবি: লেখক)
পাহাড়ের পথগুলো এভাবেই কখনও সমতল, কখনও নামা, কখনও উঠা (ছবি: লেখক)

পানি পান শেষে আরো সামনে এগোতেই কিসের যেন আওয়াজ পাওয়া গেল। সবাই দাঁড়িয়ে গেলাম, পাহাড়ের পাদদেশের কোনো জঙ্গল থেকে আসছে। নুং চ বললেন, এটা হরিণের ডাক। এদিকে হরিণ আছে জেনে বেশ আশ্চর্যই হলাম। কিন্তু হরিণ এখন দেখতে যাওয়া হবে না। তাই আবার পথ চলা শুরু। …পথের কষ্ট দেখে রাসেল তার বাৎসরিক বক্তৃতা দিচ্ছে – এবার গিয়ে ওজন কমাবো (ইহজীবনেও যদি কমে)। আমি দ্রুত হাঁটছি দেখলেই বলে – দৌঁড় দিছ না (সারাজীবনই বলবি)। হঠাৎ পড়ে গেলো, ব্যস হাতে সামান্য চোট লাগলো। যেখানে খাবার পানি পাওয়া যাচ্ছে না, সামনে আরো কমপক্ষে আধাঘন্টার ট্রেইল, সেখানে তার হাতে এখন পানি দেয়া লাগবে। আমি রাগ করলাম, তো নিবৃত্ত হলো। একটু ঢালু হলেই গাইডকে বিরক্ত করছে – আমাকে ধরেন, ব্যাগ ধরেন — এগুলো কোনোভাবেই একজন ট্রেকারের বৈশিষ্ট্য নয়। এদের কখনও ট্রেকে যাওয়া উচিত নয়। …আমি যে রাসেলের এতো দুর্নাম করছি, না জানি রাসেল আমার কত দুর্নাম বয়ে নিয়ে আসছে – তবে রাসেল আমার সম্পর্কে একটা দুর্নাম প্রায়ই করে – আমি নাকি হাঁটি না, দৌঁড়াই। :p

পাহাড় থেকে নামতে নামতে একটা ব্যাপার লক্ষ করলাম – আমি যখন পা ফেলছি, তখন আমার জুতার উপরের ভ্যাম্প আমার পায়ের আঙ্গুলের উপরাংশে ঘষা খাচ্ছে। এতে জায়গাটা জখম হচ্ছে। আমার পায়ে অ্যাংকলেট থাকায় কুশনিং ঠিকমতো হয়েছে ঠিক, তবে অ্যাংকলেটের সামনে দিয়ে আঙ্গুলগুলো বেরিয়ে থাকে। আমাদের অগ্রজ ট্রেকাররা একটা কথা সবসময়ই বলতেন – পায়ে মোজা পরার জন্য, প্রয়োজনে একাধিক প্রস্ত মোজা পরে নেয়ার জন্য। সত্যিই উপলব্ধি করলাম – মোজা পরে নিলে এমনটা হতো না। আমরা আজকে যে ট্রেক করছি, তা আমাদের অগ্রজ সেইসব ট্রেকারদের দেখানো পথ, যারা বহুদিন আগে বাংলাদেশে অফ-ট্র্যাকে ঘুরে দেশটা দেখেছিলেন – ভ্রমণ বাংলাদেশ, ন্যাচার অ্যাডভেঞ্চার ক্লাব, ট্রেকার্স অফ বাংলাদেশ, বিডি ট্রেকার্স ইত্যাদি কত জানা-না-জানা সংগঠন, দল কিংবা একক প্রচেষ্টা। তাঁদের জানাই সালাম।

চলতে চলতে পেয়ে গেলাম আরেক সার্ভাইভাল ফুড – বড়ই (ঘড়িতে ১০:৫৩)। গাছ থেকে ঢিল ছুঁড়ে কয়েকটা মাত্র বড়ই পাওয়া গেল – তা-ই সই। বড়ইয়ের সাথে একটু বিস্কুটও খেয়ে নিলাম সবাই। বড়ই মুখে পুরে হাঁটা। আবারো হাঁটতে থাকা। এখন আমাদের ডানদিকে যে পাহাড়টা, তার নাম ‘চিনচারতং পাহাড়’ (কিংবা ভুল শুনেছি, হবে চিনচার তং)। …সামনে পাওয়া গেল পায়খানা – আকার আর রং দেখে আন্দাজ করলাম গয়ালের গোবর হবে। আমাদের পথ চলছে। উৎরাই পেরিয়ে একটু হয়তো চড়াই চড়া, আবার উৎরাই – একসময় দেখলাম কয়েকটা গাছের ফাঁক দিয়ে নেমে এলাম একটা ঝিরিতে – ছোট পদ্ম ঝিরি। আমরা প্রথম পাহাড় অতিক্রম করলাম এইমাত্র (ঘড়িতে ১১:৩০)। কিন্তু মোবাইল বন্ধ, ঘড়ি নেই সাথে, কয়টা বাজলো দেখার জো নেই। ঝিরিতে নেমেই ঠান্ডা পানিতে মুখ-হাত ভালোমতো ধুয়ে নিলাম। বড্ড প্রশান্তি!

বংটো - বড় পাথর - নৈবেদ্য দিলে চোর মারা যায় বলে পাহাড়িদের বিশ্বাস (ছবি: লেখক)
বংটো – বড় পাথর – নৈবেদ্য দিলে চোর মারা যায় বলে পাহাড়িদের বিশ্বাস (ছবি: লেখক)

মুখ-হাত ধুতে গিয়ে পানির মধ্যে নির্জীব হয়ে পড়ে থাকা একটা পোকার দেখা পেলাম – তেলাপোকার মতো পিঠ, সামনে দুটো আঁকশি, দুপাশে দুটো-দুটো চারটে পা। এরকমই একটা পোকা দেখেছিলাম টঙ্গীতে – পঞ্চগড় থেকে ফেরার পথে। ঐ পোকাটা দেখেছিলাম ডাঙায়, উড়তে পারতো। …গাইড থং প্রি মুং ওদিকটাতে একটা পাথর দেখিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন, বললেন ‘বংটো’। একটা মাঝারি আকারের বড় পাথর,  বংটো মানে ‘বড় পাথর’ – সাধারণ একটা পাথরই। কিন্তু পাহাড়িদের কাছে এই পাথরটা বিশেষ গুরুত্ববহ: পাড়ায় যদি কিছু চুরি হয়, আর সেই চোরকে উদ্দেশ্য করে এই পাথরকে পূজা করা যায়, তাহলে চোর মারা যায়।

কথাটা শুনেই আমার ঠোঁটের কোণে মৃদু এক হাসির রেখা চলে এলো – বিদ্রুপের না, আবিষ্কারের। খানিকটা চিন্তামগ্ন হয়ে গেলাম: মীথগুলো বড্ড বেশি গায়ে-গা জড়িয়ে থাকে কেন? আমার গ্রামের বাড়িতে মানুষ বিশ্বাস করে, সন্দেহভাজন চোরের নামে মোমবাতি নিয়ে মসজিদে দিলে, সেই চোর মারা যায়। মোমবাতির যুগ বিদায় নিয়ে বিদ্যুতের আলো আসতেই বিশ্বাসে ফাঁটল ধরেছে বোধহয়। …তবু, এটাই হলো সংস্কৃতি, এটাই হলো সভ্যতার আচার। এটাই সমাজের নানান অংশের নান্দনিকতা। এসবের প্রতি আমার শ্রদ্ধার অন্ত নেই।

বিয়ার গ্রিল্‌সের খাওয়া সেই মাকড়শা - আমার কি ট্রাই কার উচিত ছিল? (ছবি: লেখক)
বিয়ার গ্রিল্‌সের খাওয়া সেই মাকড়শা – আমার কি ট্রাই কার উচিত ছিল? (ছবি: লেখক)

ঝিরি ধরে ডানদিকে যেতে হবে – ছায়ার হিসাব মিলালে পথটা পশ্চিম দিকে যাচ্ছে। ঝিরিতে অল্প পানি, তাই শুকনো জায়গা দিয়ে হাঁটা যাচ্ছে। ঝিরিটা একটু বাম দিকে বাঁক নিলো। মেঝেতে তাকিয়ে দেখি বিচিত্র এক লোমশ গোটা। চিনলাম না। পার করে সামনে এগোলাম। ঝিরিপথে মাকড়শা দেখা গেলো – আমি বিয়ার গ্রিল্‌স-কে এই মাকড়শা খেতে দেখেছি। আমার সিলেট অঞ্চলেও হলুদ-কালোর ডোরাকাটা এই মাকড়শা দেখতে পাওয়া যায়, খুব সামান্যই নাকি বিষাক্ত এরা।

পানিশূণ্য খুম-পথ (ছবি: লেখক)
পানিশূণ্য খুম-পথ (ছবি: লেখক)

সামনে এগোতেই একটা ঝিরিপথ, আর দুপাশের ঘিরে ধরা পাহাড়ের ভাঁজ দেখলে যে-কেউ বলবে পাহাড়ি ‘খুম’। বর্ষাকালে এই খুমটা যে কী দারুণ দৃষ্টিনন্দন হবে – তা সহজেই অনুমেয়। খুম পেরিয়ে আরো সামনে যেতেই পথটা আঁকাবাঁকা হয়ে এক জায়গায় গেল- সেখানে ক’জন নিকটবর্তি পাড়াবাসী একটা পাহাড় কেটে মাটি ফেলছেন নিচে, ঝিরিতে। কেন? কারণ মাটি দিয়ে ঝিরিতে বাঁধ দিয়ে মাছ ধরবেন তারা।

তাদেরকে রেখে সামনে এগোতেই ঝিরি দুদিকে বিভাজিত হলো, ডানদিকে গেলো বড় পদ্ম ঝিরি (স্থানাংক (আবুবকর): 21°46’0.44″N, 92°28’51.05″E), আর সোজা চললো ছোট পদ্ম ঝিরি। গাইড নুং চ মং জানালেন ডানদিকের ঝিরি ধরে গেলে হাব্রু হ্যাডম্যান পাড়া (স্থানাংক (আবুবকর): 21°46’44.66″N, 92°28’53.73″E) পড়বে (পাহাড়িরা লক্ষ করলাম হাব্রু উচ্চারণ করেন, আগের অভিযাত্রীরা একে আব্রু হ্যাডম্যান পাড়া হিসেবে উল্লেখ করেছেন) – পাহড়িদের হিসাবে এই মুখ থেকে ১ ঘন্টার পথ। আমরা ছোট পদ্ম ঝিরিতেই থাকলাম। বেশিদূর যাওয়া লাগলো না পেয়ে গেলাম বামদিকে একটা পাড়া, উঠে গেলাম আমরা। এটা হলো রুনাজন পাড়া (ত্রিপুরা পাড়া) (স্থানাংক (আবুবকর): 21°45’49.73″N, 92°28’41.47″E)। (আবুবকরদের জিপিএস ট্র্যাক-এ এই পাড়াকে নেতেন পাড়া হিসেবে মার্ক করা; তবে সন্দেহমুক্ত হয়েছি, কারণ তাঁরা ঝিরি ধরে চলে গেছেন এই পাড়ায় উঠেননি)

পাড়ায় গিয়ে দূরে একটা ঘর দেখে বেশ শান্ত-নিবীড় মনে হওয়ায় ওখানে গিয়ে বারান্দায় বুচকা-বাচকি রেখে বসলাম হাত-পা ছড়িয়ে – এটা হলো ইউনিসেফ আর পাড়াবাসীর সহায়তায় নির্মিত পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের সমন্বিত সমাজ উন্নয়ন প্রকল্পের রুনাজন পাড়া কেন্দ্র, যা এ পাড়ার স্কুল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এ পাড়ায়ই দেখা হয়ে গেলো একজনের সাথে, যে, আমাদের আসার সময় পদ্মমুখে পেইন ম্রো’র সাথে যেতে মানা করেছিলেন। আমাদেরকে বহাল তবিয়তে দেখে তিনিও বেশ খুশি। জানতে চাইলেন দলের বাকি সাতজন কোথায় – বললাম, ওরা ঢাকা ফিরে গেছে। তিনি আমাদেরকে আপ্যায়ন করতে কলার কাঁদি এনে দিলেন। পরে অনেক বলেও তাঁকে টাকা দিতে পারিনি এর বিনিময়ে।

রুনাজন পাড়া স্কুল - ছায়া সুনিবীড়, কাকলী-কুজনে মুখর এক স্থান (ছবি: লেখক)
রুনাজন পাড়া স্কুল – ছায়া সুনিবীড়, কাকলী-কুজনে মুখর এক স্থান (ছবি: লেখক)

পাড়ায় দেখলাম অনেক চ্যাপ্টা পাথর স্তুপ করে রাখা – জানতে পারলাম, স্থানীয় চার্চ পুণর্গঠনের কাজ চলছে। গাইড নুং চ স্থানীয় একজনের ঘরে কথা বলে রান্নার ব্যবস্থা করলেন, চাল কিনলেন এদের থেকে। আমি আর নুং চ মিলে আরেক ঘর থেকে ১ কেজি আলু কিনে আনলাম (৳৩০)। ঐ ঘরে সৌরবিদ্যুৎ আছে, আছে ইনভার্টারও, তাই অনুরোধ করে ক্যামেরাটাকে কিছুক্ষণ চার্জে দিয়ে দিলাম। আলু নিয়ে এসে দুজন লেগে গেলাম খাবার তৈরিতে – মেনু হলো আলুর তরকারি, ডাল আর ভাত। খাবার তৈরির অন্তর্বর্তি সময়ে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল একটা ‘বাঁশ’। এভাবে ‘বাঁশ’ খেতে হবে কল্পনাও করিনি… এই ‘বাঁশ’ মানে ব্যাম্বু নয়, এই ‘বাঁশ’ মানে বিপদ!

(চলবে…)

-মঈনুল ইসলাম
wz.islam@gmail.com

পরের পর্ব »


১. এই সৌর সিমুলেটরে তারিখ দিতে হবে “২৪ ফেবুয়ারি”, বান্দরবানের লাটিচিউড হলো 22.2 N, আর নিচে লুপ ডে-তে চেক করে দিলে গতিপথটা সঠিকভাবে বোঝা যাবে।

৪ thoughts on “অজানা লেকের অভিযানে বান্দরবান ২০১৩ : দ্বিতীয়াধ্যায় : পর্ব ৪

  1. প্রায়ই চেক করি পরবর্তী পার্ট লিখলেন কি না। আসলে খুব দেরী হয়ে যাচ্ছে যেন আপনার লেখাটি। একটি পড়ে পরেরটা পড়ার সময় আগেরটা ভুলে যাই। একটু তাড়াতাড়ি লিখে শেষ করুন প্লিজ। ওয়াসসালাম

    1. আপনি ঠিক বলেছেন। আপনার অপেক্ষার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ। আর বিরক্তি উদ্রেকের জন্য আন্তরিকভাবে ক্ষমাপ্রার্থী।
      ব্যক্তিগত ব্যস্ততা বেড়ে গেছে বহুগুণ। তাই্ ইচ্ছা থাকাসত্ত্বেয় সত্যি বলছি পারি না।
      একেকটা পোস্টের জন্য লিখে যাওয়া, ছবি বাছাই -বেশ শ্রম আর সমসাধ্য।
      তবে আন্তরিকভাবে চেষ্টা যে করছি -এতটুকু নিশ্চয়তা দিতে চাচ্ছি। বিশ্বাস রাখার জন্য ধন্যবাদ।

মন্তব্য করুন