অজানা লেকের অভিযানে বান্দরবান ২০১৩ : দ্বিতীয়াধ্যায় : পর্ব ২

ধারাবাহিক:  অজানা লেকের অভিযানে বান্দরবান —এর একটি পর্ব

« অজানা লেকের অভিযানে বান্দরবান : প্রথমাধ্যায়

« আগের পর্ব

আমরা ছিলাম ১০জন, ৭জন তাদের ভ্রমণ শেষ করে ফিরে গেছে, বাকি তিনজন চলেছিলাম অজানা লেকের অভিযানে… কিন্তু শেষ একজনও বিদায় নিয়েছে আমাদের থেকে। হারাধনের রইলো আর বাকি ২জন, সাথে আছেন দুই গাইড: নুং চ মং (প্রধান গাইড) আর থং প্রি মুং (সহচর গাইড)। চারজনের এই দলটা চলছে নাফা খুম অভিমুখে… এমন সময় ভেজা বালুতে পা দিতে গিয়ে… আটকে গেলাম আমি।

ব্যালেন্স হারালাম মুহূর্তে, এক হাত দিয়ে পাশের শক্ত বালুতে দ্রুত ধরলাম, আরেক হাতে ক্যামেরা, আমি পানির এক্কেবারে কাছে। আরেকটু হলে ক্যামেরাতে লাগতো পানি। সবাই-ই তটস্থ হয়ে উঠলো। আমি নিজের অবস্থা দেখে বুঝে গেলাম, মারাত্মক কিছু না, হালকা কাদা…। রাসেল এগিয়ে এলো, ওর হাতে ক্যামেরাটা দিলাম। দাদারা সহায়তা করতে চাইলো, আমি মানা করলাম। নিজেকেই উঠতে হবে। পা তুলতে গিয়ে বুঝলাম, ভালোই আটকেছে কাদায়। যাক, ভাগ্য ভালো চোরাবালিতে পড়িনি, নাহলে আটকানোটা আরো মজবুত হতো। টেনেটুনে পা যখন তুললাম, জুতা রয়ে গেছে পা থেকে খুলে। আবার নিচু হয়ে ওখানা তুলে এগোলাম সামনে।

অপূর্ব দৃশ্য: ডুবো পাথরে পা ধু'তে গেছি আমি আর দুই গাইড (ছবি: রাসেল)
অপূর্ব দৃশ্য: ডুবো পাথরে পা ধু’তে গেছি আমি আর দুই গাইড (ছবি: রাসেল)

আগেই বলেছিলাম, বড় বড় পাথর দেখা যাচ্ছে স্বচ্ছ পানির নিচে, সেগুলোর একটাতে গিয়ে দাঁড়ালাম পা ধোয়ার জন্য। ঠান্ডা হীম পানিতে পা ভিজিয়ে উপরের রোদকে একটু বুড়ো আঙ্গুল দেখানো গেলো দেখে ভালোই লাগলো। সবাই-ই একটু হাত-মুখ ধুয়ে ঘামমুক্ত আর শীতল হয়ে নিলাম।

ঠিক ওখানটাতেই পেছনে বিশালাকায়, অপূর্ব লাংলপ তং (ছবি: রাসেল)
ঠিক ওখানটাতেই পেছনে বিশালাকায়, অপূর্ব লাংলপ তং (ছবি: রাসেল)

আবার পথ চলা। রাসেল বারবার একটা কথাই বলছে, ‘শেষ পর্যন্ত আমরা দুই জনই!’ হ্যা, এই ট্যুরে রওয়ানা করার সময় বারবার ফেসবুক গ্রুপে এই কথাটাই বলেছিলাম, কেউ যাক বা না যাক, শেষ পর্যন্ত আমরা দুজন যাচ্ছি ইনশাল্লাহ। সেকথাই যে ফলে যাবে, ভাবিনি। …পথচলা চলছে। মাথার উপরে কোথাও প্রজাপতি উড়ে যাচ্ছে, কোথাও পাখি উড়ে যাচ্ছে পানির উপর দিয়ে… প্রকৃতির কোলেই যেন মরি গো আল্লাহ – তোমার এক অপূর্ব দান এই প্রকৃতি! …এখানে এসে শঙ্খ আবার একটা স্থানীয় নাম ধারণ করেছে: ন’ব’, আবার বলে না’ – এর অর্থ হলো ‘মাছ’। নুং চ বললেন, এখানে প্রচুর মাছ পাওয়া যায়। প্রচুর চিংড়িও আছে, পানিতে ‘দারু’ ফেললে চিংড়ি ধরা খুব সহজ। সিলেটি ভাষায় ‘দারু’ মানে কাঠ, আমি ধরে নিলাম গাছের ডাল; কিন্তু মারমা ভাষায় ‘দারু’ মানে যে ওষুধ – সেটা বুঝেছি অনেক পরে।

এবারে ডানদিকে সাউদাঁউ তং রেখে হাঁটতে হাঁটতে একসময় বেরিয়ে এলাম বিশাল এক সমতটে (ঘড়িতে ১২:০৯)। আশেপাশে বেশ অনেকদূর পর্যন্ত গাছ নেই, সাঙ্গুও বেশ খানিকটা সরে গেছে। মাথার উপরে তাই সূর্যিমামা তারা দয়া বর্ষণ করছিলেন। মাথাটা গামছা দিয়ে ঢেকে বউ হয়ে গেলাম। পায়ের নিচে নুড়ি পাথর। বেশ কিছুদূর যাবার পরে সাঙ্গুতে গিয়ে মিশলাম আবার, এখানে সাঙ্গুতে এসে মিশেছে পিয়াতং ঝিরি, মারমা ভাষায় ‘পিয়াতং’ মানে মৌমাছি। পানি দিয়ে ভালোমতো গামছাটা ভিজিয়ে নিলাম, হাত-মুখ ধুয়ে শীতল করে নিলাম। গরম বড় বিশ্রী ব্যাপার!

মাথার উপরে খা খা রোদ, নিচে নুড়ি পাথর, সাঙ্গু এখানে একটু দূরে, তার মধ্যে পথ চলা - রাসেল, নুং চ মং, থং প্রি মুং (ছবি: লেখক)
মাথার উপরে খা খা রোদ, নিচে নুড়ি পাথর, সাঙ্গু এখানে একটু দূরে, তার মধ্যে পথ চলা – রাসেল, নুং চ মং, থং প্রি মুং (ছবি: লেখক)

আবারো সামনে যাওয়া, এবারে অবশ্য নদী পার হয়ে ওপাড় ধরে হাঁটছি। নদীর সামনের এই অংশটার নাম খাইংউয়াহ্‌ ঝিরি। একঘেয়ে পথ চলা…। রাসেল কিন্তু এবার ভালোই হাঁটছে। বেশ গতি নিয়েই হাঁটতে পারছে সমতলে। অবশ্য তার বেশ কিছু কাপড়-চোপড় সে দ্বিতীয় গাইডের ব্যাগে ইতোমধ্যেই ট্রান্সফার করে দিয়েছে, তাই তার নিজের কাঁধে ওজন কিছুটা হলেও কম।

আমাদের আশেপাশে নতুন নতুন সব পাখি। দৃশ্য দেখার শেষ নেই, পাহাড়, নদী, আকাশ, গাছ, পাখি, প্রজাপতি… এভাবে স্বর্গের মধ্যে দিয়ে হেঁটে একসময় আমরা এমন একটা জায়গায় পৌঁছলাম, দূর থেকে দেখা যাচ্ছিলো একটা সবুজ টিনের চালার ঘর, আর তারও আগে পানিতে গা এলিয়ে শুয়ে থাকা অপূর্ব সব পাথর…

সবুজ পাহাড়ের ছায়া আর গভীর পানির সবুজ রং অপূর্ব লাগলো আবারো। এখানকার পাথরগুলোর ভঙ্গিল চেহারার একটা কারণ হতে পারে পানির তোড়। গাইড নুং চ জানালেন নাম: নাফা খুমরয়; তবে এটা এই বিশেষ গভীর পানির জায়গাটুকুর নাম, নাকি ঐ যে ওখানকার খাঁজ খাঁজ পাথরটার নাম, তা আর স্পষ্ট মনে করতে পারছি না। তবে এতটুকু মনে আছে, পাথরের খাঁজে মাছ পাওয়া যায় বলে এই নাম – ‘মাছ বেঁধে রাখা’ থেকে নাফা খুমরয়। এখানেই ঐ-যে ওপাড়টাতে একটা বড় পাথর আছে, ওটাকে সবাই ‘ব্যাঙ পাথর’ বলেই ডাকে, আসলেও, একচোখ কানা ব্যাঙের মতোই দেখতে ওটা।

সামনে এগিয়ে গেলাম আমরা। ঐ সবুজ ঘরের পাদদেশে বেশ কিছু ছনের ঘর, এটা নাকি রেমাক্রি বাজার (১২:৪৫)। এখানেই আমরা দুপুরের খাবার খাবো। বড্ড ক্ষিধা পেয়েছে – এই ব্যাপারটা আমার জীবনে কদাচিৎই হয়, ক্ষিধা লাগে না। কিন্তু আজ লেগেছে। খাওয়ার জন্য উন্মুখ হয়ে আছি। আমাদের গাইড নুং চ বলে দিলেন, কেউ জিজ্ঞাসা করলে বলতে হবে আমরা জিন্না পাড়া যাচ্ছি। নাফা খুম বললে সমস্যা হলো নুং চ এখানকার গাইডদের কেউ না, তাই এরা ঝামেলা করতে পারে।

ঐ যে দূরে রেমাক্রি বাজার যেনবা স্বর্গের কুটির কোনো (ছবি: লেখক)
ঐ যে দূরে রেমাক্রি বাজার যেনবা স্বর্গের কুটির কোনো (ছবি: লেখক)

নুং চ হেঁটে হেঁটে একটা হোটেলে খাবার ব্যবস্থা করলেন। এই ঘরগুলো সবগুলোই খাবার হোটেল। গুগল আর্থের ২০০৪-এর ফুটেজে জায়গাটা পুরোপুরি ফাঁকা, অথচ ২০১৩-তে সেখানে গাদা গাদা ঘর। …যে ঘরটাতে, থুক্কু রেস্টুরেন্টটাতে বসলাম, তার পাশেরটাতেই কারা যেন জোরে জোরে চিৎকার করে গান গাইছে। এই হিন্দী গান তো এই বাংলা গান। আবার হিন্দী গানের মধ্যে ইচ্ছামতো কথা বানিয়ে নিচ্ছে নিজেদের মতো করে। কখনও বাংলায়, কখনও নিজেদের ভাষায়… মজা লাগার কথা, কিন্তু বিষয়টা বিরক্তিকর হয়ে উঠলো, কারণ কানের কাছে কেউ এভাবে চিল্লাচল্লি করলে ভালো লাগার কথা না। পরে বুঝলাম, কিশোর বয়সী ছেলে এগুলো, মদ খেয়ে মাতাল হয়ে প্রলাপ বকছে। রেস্টুরেন্ট থেকে একজন চিৎকার করে থামাতে চাইলো, কিন্তু তাদের একজন বেয়াদবের মতো তাকেই চুপ থাকতে বললো। বুঝলাম, বদলে যাওয়া পৃথিবীর রং এখানেও লেগেছে, মুরব্বিকে অশ্রদ্ধা করার রীতি এখানেও রং মেখেছে। বড্ড মায়া হলো অতীতের সুন্দর সময়ের জন্য।

খাবারের আয়োজন হতে একটু সময় লাগছে, এর মধ্যে পরিচিত একজন, নুং চ’র সাথে কথা বললেন। নুং চ জানালেন আমরা জিন্না পাড়া যাচ্ছি। …ঝাল করে রাঁধা পাতলা ঝোলের তাজা মাছ আর ডাল দিয়ে সে কী অপূর্ব খাবার হলো, বলে বোঝানো যাবে না (জনপ্রতি ৳৯০)। আমার চরম ক্ষিধে নিবৃত্তির পরে আবিষ্কার করলাম শরীরটা ভারি করে ফেলেছি ইচ্ছেমতো খেয়ে। এখন বিশ্রাম না নিলে আর চলছে না। রাসেলেরও একই খায়েশ। এদিকে দ্বিতীয় গাইড থং প্রি মুং সিগারেট কিনবেন। যেহেতু তিনি আমাদের সাথে রয়েছেন, তাছাড়া ওনাকে গাইড হিসেবে ভাড়াও করিনি, তাই স্বেচ্ছায়ই আমি আর রাসেল তাঁকে সিগারেট কিনে দিলাম (৳৬০)। নুং চ একটা পানও খেয়ে নিলেন (৳১০)। বেঞ্চের দুপাশে পা ছড়িয়ে বেঞ্চেই শুয়ে একটু জিরিয়ে নেয়ার চেষ্টা।

পাথরের ভঙ্গিল দৃশ্য : বর্ষায় অপূর্ব সাজে সাজে এগুলো (ছবি: লেখক)
পাথরের ভঙ্গিল দৃশ্য : বর্ষায় অপূর্ব সাজে সাজে এগুলো (ছবি: লেখক)

দুপুর ১৩:৪০, উঠে ব্যাগটা কাঁধে তুলে নিয়ে ক্যামেরাটা পেটে বেঁধে নিলাম। আবার পথচলা শুরু। এতক্ষণ যেপথে আসছিলাম, সে পথের হিসাব করলে আমরা এবারে বাঁয়ে বেঁকে যাচ্ছি। যে পথটা ধরে যাবার জন্য তৈরি, এদিকে সারি সারি পাথর একটা খাঁজ সৃষ্টি করে রেখেছে, দেখে মনে হবে পাথরের সোপান। মৃদু পানি লেপ্টে লেপ্টে পড়ছে এসে। রাসেল বললো, ভেবে দেখ, বর্ষায় এই জায়গাটা কেমন হবে? সত্যিই, বর্ষায় যখন এই ধাপগুলো দিয়ে পানি তীব্র বেগে আসবে, তখন দেখার মতোই দৃশ্য হবে একটা। গুগল আর্থে এরকম কিছু ছবি দেখা যাবে। অনেকে এই জায়গাকে রেমাক্রি খুম নাম দিয়েছেন, আমি এর কোনো যথার্থতা পাইনি।

উপরে খা খা রোদ, তাই ঝিরির পানিতে গামছাটা ভিজিয়ে নিলাম। এবার যখন মাথাটা প্যাঁচিয়ে নিলাম, তখন বেশ স্বস্তি লাগলো। ঝিরির পাড় ধরে হেঁটে চলেছি আমরা। পরে গুগল আর্থে দেখলাম এখানটাতে ডানদিকে একটা বড়সড় পাড়া আছে। যাহোক আমরা এগিয়ে চলেছি আরো সামনে।

সামনে থেকে যুবক বয়সী অনেক অভিযাত্রী আমাদেরকে পাশ কাটাচ্ছে এসে। বুঝতে পারলাম, নাফা খুম দেখতে এসেছে এরা। গোসল করে ফিরছে এরা নাফা থেকে। রাসেল এবারে আর অভিবাদন জানাচ্ছে না, গরমেই বোধহয় একটু অতিষ্ট। আমি আবার বাঙালি দেখলেই সালাম দিচ্ছি; অনেকেই উত্তর দিচ্ছেন – ইয়াং ফেলোরা ব্যতিক্রম।

এগিয়ে যেতে থাকলাম। পাথর আর বালুময় ঝিরি-সৈকত ধরে হাঁটার বর্ণনাটা বড্ড একঘেঁয়ে। আমি আর থং প্রি মুং দ্রুত হাঁটছি সামনে থেকে। আমার উদ্দেশ্য রাসেলকে গতিময় করে তোলা। আমি সমতলে যেমন দ্রুত হাঁটি, এখানেও সেভাবেই হাঁটছি। রাসেল অবশ্য কিছুক্ষণ পরপরই আমাকে ধীরে হাঁটতে বলে, কিন্তু কে শোনে কার কথা?

পথে পাহাড়ি কয়েকটা ছোট্ট বল্টু ঝিরির পানিতে গোসল করছে। আমরা পাশ দিয়ে যাবার সময় একটা পিচ্চি কী যেন বলছিলো; কান পাততেই মেজাজটা খিঁচড়ে গেলো, পিচ্চি বলে কী: “ট্যাগাদে… ট্যাগাদে…”। অর্থের লোভী সংস্কৃতি নাফা খুম নামক পর্যটন স্পটে বেশ জেঁকে বসেছে তাহলে। হয়তো কেউ কেউ এদেরকে টাকা দিয়ে দিয়ে লোভ শিখিয়েছে এভাবে।

চিনতোই ওং হ্যাডমেন পাড়ায় অপূর্ব বাগান বিলাস (ছবি: লেখক)
চিনতোই ওং হ্যাডমেন পাড়ায় অপূর্ব বাগান বিলাস (ছবি: লেখক)

একসময় বাম দিকে সিমেন্টের শান বাঁধানো সিঁড়ি দেয়া একটা পাড়া নজরে এলো। খেজুর গাছের লাগোয়া একটা কুড়েঘরের উপরে একটা গাছ প্যাঁচিয়ে খুব সুন্দর করে বাগান বিলাশ ফুটেছে। থং প্রি মুং জানালেন এটা চিনতোই ওং হেডম্যান পাড়া (১৪:১৮)। পাড়াকে পাশ কাটিয়ে এগোতে থাকলাম।

একঘেয়ে পথচলা, তবে এতটুকু হয়েছে, এখানে পাশের পাহাড়গুলো একটু উঁচু, তাই এখন খা খা রোদ আর সবসময় গায়ে লাগছে না। পথে অনেক পাহাড়িকে পেলাম, পুরুষরা নদীতে মাছ ধরছে, আর নারীরা শামুক কুড়াচ্ছে। এগোতে থাকলাম, একসময় ডানদিক থেকে একটা ঝিরি এসে মিশলো মূল ঝিরিপথে… ওটা পার হতে গিয়ে ডানদিকে তাকিয়ে দেখি পাহাড়ের পেটে একটা বিশাল খাঁজ। একপ্রকারের গুহা, তবে গুহা যেমন গভীর হয়, এটা ওরকম কিছু না, শ্রেফ একটা খাঁজ বলাই ভালো। এরকম খাঁজ, আমার মৌলভীবাজারের মাধবকুণ্ড ঝরণার উল্টো পাশের পাহাড়েও আছে। খাঁজটা দেখে রাসেল খুব আগ্রহী, ওটা দেখে যাবে। তাই ঝিরি পার হয়ে খাঁজের কাছে গেলাম। কাছে গিয়ে বুঝলাম খাঁজটা যথেষ্ট বড়। আমাদের মূল গাইড নুং চ মং তো খুব উৎসাহী এখানে রাত কাটানোর জন্য, ঝিরি থেকে মাছ ধরে এই খাঁজে শুয়ে রাত কাটানো – একজন পাহাড়িরই এরকম লোভ লাগছে! আর আমাদের? বলাই বাহুল্য হবে।

গুহার মতো পাথুরে খাঁজ, গাইড নুং চ মং-কে তার তুলনায় অনেক ক্ষুদ্র মনে হচ্ছে (ছবি: রাসেল)
গুহার মতো পাথুরে খাঁজ, গাইড নুং চ মং-কে তার তুলনায় অনেক ক্ষুদ্র মনে হচ্ছে (ছবি: রাসেল)

কিন্তু আমাদের উদ্দেশ্য আরো বড় কিছু করার। তাই উপেক্ষা করতে হলো প্রকৃতি থেকে করা আজকের এই আয়োজনকে (১৪:৩৩)। আবারো হাঁটা শুরু। নাফা খুম আর কত দূর জানি না। মনে হচ্ছে কাছাকাছিই হবে। এখনও একেকটা দল সামনে থেকে পাশ কাটাচ্ছে আমাদের। মাঝে মাঝেই বোতলটা বের করে পানি খেয়ে নিচ্ছি। ট্রেকিং-এ সচল থাকার মহৌষধ হলো জল। সার্ভাইভাল গাইডে ‘সার্ভাইভাল মেডিসিন’-এ প্রথম ঔষধটার নাম হলো ‘জল’।

একটা জায়গায় আমি আর থং প্রি মুং এগোতে এগোতে পাহাড়ের পাড় ধরে উপরের দিকে উঠে গেলাম; আরেকটু এগোতেই এক্কেবারে পাক্কা ডেড এন্ড। তখন পিছন থেকে মূল গাইড ডাক দিলেন, পিছনে, আসলে ঝিরিটা পার হয়ে ওপাড়ের পথ ধরতে হবে; থং প্রি মুং ভুল পথে নিয়ে এসে পড়েছেন। ফিরে গিয়ে সঠিক পথ ধরলাম। মাঝে মাঝে জিরিয়ে নিচ্ছি আমরা; আমার জিরাতে ইচ্ছা হয় না, রাসেল বলে বলেই জিরাতে হয়। তবে জিরাতে ভালোই লাগে, অন্তত কাঁধ থেকে বিশাল ওজনদার ব্যাগটা নামিয়ে রাখা বেশ প্রশান্তির।

আমাদের একঘেয়ে পথে ফুলেল শুভেচ্ছার মতো শুভেচ্ছা জানাচ্ছে গাছ থেকে ঝরা পাতা। সেই শুভেচ্ছা গ্রহণ করেই এগোচ্ছি আমরা। তবে এপথে লোকজনের চলাচল বেশি বলে জল থাকাসত্ত্বেয় পাখি আর প্রজাপতির বড় আকাল! পার করলাম রামাইখুং (কিংবা রামাই খুম); প্রায় ঘন্টাখানেক হয়ে যাচ্ছে মনে হয় হাঁটছি; সময় দেখতে পারছি না হাতঘড়ি না থাকায়।

পথে অনেকক্ষণ হলো কারো দেখা নেই। বেশ অনেকক্ষণ পরে একটা দলের সাথে দেখা হলো, একজন কথা বললেন; কোথায় যাচ্ছি জানতে চাইলেন না, উদ্দেশ্য পরিষ্কার: এদিকে সবাই নাফা খুম যায়। শুধু বললেন, “আপনারা তো দেরি করে ফেলছেন”। আমি জানালাম, না ভাই, আমরা আরো সামনে যাবো। …পথ চলছে তো চলছেই। নাফা খুমের তো আর দেখা নেই।

অবশেষে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর পানির আওয়াজ পাওয়া যেতে লাগলো: সামনেই কোথাও নাফা খুম। বাঁকটা ঘুরতেই ঐ–যে দেখা যাচ্ছে… নাফা খুম।

নাফা খুম ঝরণা - আমি একে "নাফাখুম" বলতে নারাজ (ছবি: লেখক)
নাফা খুম ঝরণা – আমি একে “নাফাখুম” বলতে নারাজ (ছবি: লেখক)

নাফা খুম, পাহাড়ের কোলে পাথুরে এক ঝরণা, বর্ষাকালে শুধু একটু প্রশস্ত হয় – এই যা, আহামরি কোনো বিশেষত্ব নেই। কে আবিষ্কার করেছিলেন -সেটা জানিনে, তবে গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রচার পায় পল্লব মোহাইমেন-এর দৈনিক প্রথম আলোতে ছাপা হওয়া একটি নিবন্ধ^ থেকে। ঐ নিবন্ধে অবশ্য একে নাফাখুম লেখা হয়েছিল, কিন্তু পাহাড়িদের বানান-প্রবণতা দেখেছি, তারা সমাসবদ্ধ পদও আলাদা করে লিখেন; তাই পাহাড়িদের রীতিকে অনুসরণ করেই আমি একে “নাফা খুম” বলার পক্ষে। তবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন মারমা ছাত্রের (Kong Chai) কাছে জেনেছি: সঠিক নাম ঙাফাখোং (Ngafakhong), যার অর্থ মারমা ভাষায়: বাঘাইর মাছের আধার। যাহোক, ঐ নিবন্ধে একে রেমাক্রি জলপ্রপাতও বলা হয়েছিল। তাছাড়া ঝরণার নিচে নাকি একটা গুহামতো আছে, যেখানে বিশাল কিছু মাছ থাকে, যাদের ধরতে গেলে কেউ আর ফেরে না। পল্লব ভাই লিখেছেন নাফা খুমের জলধারার উৎস নাকি ভাটিতে আরো দুই দিনের পথ, সেখানেও নাকি আছে আরো উঁচু ঝরণা।

নাফা খুম ঝরণার সামনেই নাফা খুম - জলক্ষেত্রের দুপাশে পাথরের এমন খাঁজকেই পাহাড়িরা "খুম" বলে (ছবি: লেখক)
নাফা খুম ঝরণার সামনেই নাফা খুম – জলক্ষেত্রের দুপাশে পাথরের এমন খাঁজকেই পাহাড়িরা “খুম” বলে (ছবি: লেখক)

এই শীতের শেষেও নাফা খুম দেখে মন্দ লাগলো না। কিছু ছবি তুলে নিলাম। ওদিকে দেখি দুই পাহাড়ি নাফা খুমের উপরে মাছ ধরছেন ছিপ দিয়ে। আমি এপাড় ধরে হেঁটে গিয়ে পাথর থেকে পাথরে লাফ দিয়ে নাফা খুমের জলধারা পেরিয়ে ওপাড়ে গেলাম। এখানে কিছুক্ষণ বিশ্রাম হবে। আমি ঠিক করলাম গোসলই করবো। ব্যাগটা একটু ছায়ার মধ্যে পাথরের উপর রেখে গোসলের প্রস্তুতি নিলাম। পরণের থ্রি-কোয়ার্টার পরেই নেমে যাওয়ার ইচ্ছা, পরে হাঁটতে হাঁটতে শুকিয়ে যাবে। ঘামে ভিজে থাকা শরীরটা এই জলে শুদ্ধ হবে – ভাবতেই ভালো লাগছিলো।

পাড়ে দাঁড়িয়ে ঝরণা থেকে ঝরা পানির মধ্যে তাকিয়ে আছি। আমার খুব ইচ্ছে হচ্ছে একটা পাক্কা ডাইভ দেই, কিন্তু ভয় হচ্ছে পানির নিচে যদি ডুবো পাথর থাকে, ভবলীলা সাঙ্গ হয়ে যাবে। বিয়ার গ্রিল্‌স-এর কাছে শিখেছি, এরকম ক্ষেত্রে একটা প্রাকৃতিক মাপুনি (gauge বা gage) বানিয়ে নিয়ে তা দিয়ে পানির গভীরতা মেপে দেখা যায়। বিয়ার গ্রিল্‌স, গাছের লতা নিয়ে পাথর বেঁধে তা পানিতে ছেড়ে দিয়ে পানির গভীরতা মেপে থাকেন। ঝাঁপটা দিতে খুব ইচ্ছে করছে। তাই পানিতে গভীর নজর বোলালাম, কোথাও কি ডুবো পাথর আছে?

আছে?

(চলবে…)

-মঈনুল ইসলাম
wz.islam@gmail.com

পরের পর্ব »

nanodesigns

৩ thoughts on “অজানা লেকের অভিযানে বান্দরবান ২০১৩ : দ্বিতীয়াধ্যায় : পর্ব ২

  1. নাফাখুম পর্যন্ত গিয়েছি। ওই রুটে আর কোন কোন দর্শনীয় স্থান আছে জানালে খুশি হব। এছাড়া বড় মদক/ছোট মদক এর কোথায় নাকি ব্যাট কেভ নামক একটি যায়গা আছে। যদি জানা থাকে তাহলে জানাবেন প্লীজ।

মন্তব্য করুন