অজানা লেকের অভিযানে বান্দরবান ২০১৩ : প্রথমাধ্যায় : পর্ব ৮

ধারাবাহিক:  অজানা লেকের অভিযানে বান্দরবান —এর একটি পর্ব

« আগের পর্ব

থানচি থেকে নাফা খুম রওয়ানা হয়ে দুষ্ট গাইডকে খসাতে শেষে উঠেছি তিন্দুতে। বহুকষ্টে তাকে খসিয়েও ঠিক খসাতে পারিনি, এখন চেষ্টা বিজিবি ক্যাম্পে আমাদের জন্য ক্ষতিকারক কোনো রিপোর্ট সে করার আগে আমরা একটা রিপোর্ট করি, তাতে আমাদের অবস্থা সম্পর্কে প্রশাসনের একটা স্বচ্ছ ধারণা থাকবে। তিন্দু পাড়ার পাহাড় থেকে নেমে পাশের উঁচু পাহাড়ে তিন্দু বিজিবি ক্যাম্প। আমি আর রাসেল, টীমের পক্ষে উঠতে থাকলাম বিজিবি ক্যাম্পে।

তিন্দু বিজিবি ক্যাম্প থেকে তোলা বহির্দৃশ্য (ছবি: রাসেল)
তিন্দু বিজিবি ক্যাম্প থেকে তোলা বহির্দৃশ্য (ছবি: রাসেল)

বিজিবি ক্যাম্পে উঠার পথে পিছন ফিরে তাকাতেই… অপূর্ব দৃশ্য: তিন্দুতে গেলে ভালো একটা ছবি তোলার জন্য উত্তম স্থান হলো তিন্দু বিজিবি ক্যাম্প কিংবা উঠার এই পথটা। পিছনে নদীর পুরো বাঁকটা দেখা যায় ক্যাম্প থেকে – সাধে কি আর বিজিবি এতো উপরে ক্যাম্প করেছে – এই প্লেইনের পাক্কা বার্ড আই ভিউ পায় তারা। নদীতে আমাদের দলটা গোসল করতে নেমেছে – বেশ হাকডাক শোনা যাচ্ছে।

ক্যাম্পে উঠার পথটা সিঁড়ি কাটা, উঠতে কষ্ট হলো না; তবে পরিশ্রমের পর উঁচুতে উঠায় যতটুকু পরিশ্রম আরকি। উপরে তাকালাম, ক্যাম্পের লোকজন আমাদের দিকে উৎসুক হয়ে তাকিয়ে আছে। উপরে উঠে গেলাম সাহস করে। আশপাশ থেকে লুঙ্গি পরা, বিজিবি’র ডোরাকাটা টিশার্ট আর প্যান্ট পরা জোয়ানরা ঘিরে ধরলো আমাদেরকে। আমি কথা বললাম: আসসালামু ‘আলাইকুম। আমরা একটু আগে তিন্দুতে এসেছি, আজকে এখানে থাকবো; আপনাদের সাথে একটু কথা বলবো।

একজন পাশ থেকে বললেন, ভালো, ভালো জায়গায় এসে পড়েছেন; এখানে বসেন, স্যারের সাথে কথা বলেন। পাশেই একটা তক্তা বিছিয়ে বেঞ্চের মতো বানানো হয়েছে, সেখানে একজন বয়স্ক ব্যক্তি লুঙ্গি, টিশার্ট আর টুপি পরে বসে আছেন। লোকটার গোঁফ আছে, আর আছে চেহারায় রাজ্যের সন্দেহ।

আমি সালাম করে এগিয়ে গেলাম। তখনই কথা বলে উঠলেন এই লোক: ওয়াআলাইকুম সালাম; আসেন, বসেন। মেহমান আসছে। ..এই লবণ পানি নিয়ে আয়, অনেক পরিশ্রম করে আসছে…

আমার তো আক্কেল গুড়ুম: এ কোন টর্চার! পানিতে লবণ মিশিয়ে গার্গল করতেই জানটা বেরিয়ে যায়, এখানে এসে দেখি বিপদে পড়লাম, এরাও এখন শাস্তি দিবে, তাও আবার সেই লবণ পানি দিয়ে!!

ব্যস, শুরু হলো প্রশ্নবান: কী পরিচয়, কী করেন, কোত্থেকে এসেছেন, কতজন এসেছেন ইত্যাদি। কাহিনীর পর কাহিনী! ধীরকণ্ঠে সব উত্তর দিয়ে তাদের প্রশাসনিক সন্দেহবাতিক মনকে প্রবোধ দিতে সক্ষম হলাম। এবারে আসল কথায় এলাম: দেখুন এই এই ঘটনা, তখন আমাদের গাইড আমাদের সহায়তা করে এবং পথে আমরা ওর সম্পর্কে এরকম রিপোর্ট পাই। তারপর আমরা এখানে উঠার সিদ্ধান্ত নেই, কারণ এরকম মাতাল একজনকে আমাদের সাথে রাখা নিরাপদ না, কারণ আমাদের সাথে একজন মেয়ে আছে। …তাদেরকে এটাও বললাম, বেরোবার সময় আমরা নামধাম লিখে প্রস্তুত করাসত্ত্বেয় বিজিবি ক্যাম্পে রিপোর্ট করে বেরোইনি।

এই সত্য স্বীকারোক্তিতে ওরা মনে হয় কিছুটা তাজ্জবই বনে গেলো – এভাবে কেউ এসে যেচে পাহাড় বেয়ে ক্যাম্পে উঠে নিজের দোষ কবুল করছে – এ-তো স্বপ্নেও ভাবা যায় না। বিজিবি ক্যাম্পে রিপোর্ট না করাটা খুব খারাপ হয়েছে, কারণ এটা আসলে আমাদেরই নিরাপত্তার জন্য – এধরণের একটু লম্বা কথা শুনতে হলো। তবে এতক্ষণে দুটো ঘটনা ঘটেছে: আমাদের দুজনের হাতে লবণ-পানি ভর্তি দুটো অ্যালুমিনিয়াম মগ, তাতে চুমুক দিয়ে বুঝেছি: এটা আসলেই আপ্যায়ন, কারণ তাতে চিনিও মিশিয়ে একটা শক্তিবর্ধক ওর‍্যালস্যালাইন বানানো হয়েছে; আর এই ক্যাম্প-প্রধান আমাদের সাথে এতক্ষণে নিজের কর্তৃত্বসুলভ কণ্ঠ ত্যাগ করে বাড়ির ড্রয়িংরুমের কণ্ঠে কথা বলছেন। তাই ক্যাম্পে রিপোর্টজনিত ভাষণটা বিস্বাদ লাগছিলো না।

আমার স্বীকারোক্তিতে উনি এটা বুঝে গেছেন, আমরা একটা মেয়ে নিয়ে “এনজয়” করবার জন্য এখানে আসিনি, আমরা তার ব্যাপারে সচেতন। স্বাভাবিকভাবেই এবারে তিনি গাইডের নাম জানতে চাইলেন। আমাদের পরামর্শমতোই তাই বললাম: স্যরি, তার নাম আমরা বলবো না, কারণ সে কিন্তু সত্যিকার অর্থে আমাদের উপকার করেছে। তার দোষ হলো সে মাতাল।

এই সত্য কথায় মনে হয় অফিসার বেশ দৃঢ়তা পেলেন এবং আমাদের সম্পর্কে উচ্চাশাই পোষণ করলেন। এবারে আলোচনাটা আরো বেশি প্রাণবন্ত হয়ে উঠলো। অফিসারের থেকে জানা গেলো বোট ভাড়া, থানচি থেকে তিন্দু পর্যন্ত জনপ্রতি ৳১২০; ওরা আমাদেরকে শ্রেফ জবাই করতে চেয়েছে পাঁচহাজার চেয়ে…।

জেনে রাখা দরকার: পাহাড়িরা খুব পরিশ্রমে নিম্নতর আয়ে দিনাতিপাত করে। আপনি একশ’ টাকা বের করলে তা তাদের কাছে একহাজার টাকা; তেমনি পাঁচশ পাঁচহাজার…। তাই অর্থ-প্রাপ্তির ন্যূনতম সুযোগ পেলে তা তারা ছাড়তে চায় না। তাই বলে পাহাড়িদেরকে লোভী বলা যাবে না – নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য এটা স্বাভাবিক। আবার পাহাড়িদের তোয়াজকে আপনি এই লোভের খাতে ফেললে ভুল করবেন – এরা যে মাটির মানুষ, সামনের অভিযাত্রায় আমি তা প্রমাণ করে দিবো ইনশাল্লাহ। যাহোক, পাহাড়ে গিয়ে তাই অর্থ খরচ করতে সাবধান, আপনি হয়তো তুড়ি মেরে পাঁচশ’ টাকা বের করে দিবেন, কিন্তু আপনি আসলে তাতে এটা বুঝিয়ে দিচ্ছেন – বাঙালিরা টাকার গাছ, ঝাকি দিয়ে হাতিয়ে নাও…। শেষটায় একটা গুতা দিয়ে তাই খইশামুও হাতিয়ে নিয়েছিল আরো দুইশ’ টাকা – দুইশ’ টাকাই তো, কত আর? – না, ওটা দুইহাজার টাকা॥

যাহোক, আমাদের উদ্দেশ্য সফল, এখন এই চ্যাপ্টার ক্লোয করা দরকার – রাসেল এবারে পরামর্শ চাইলো: আমরা চাচ্ছি নাফা খুম যেতে। তো ওদিকে যেতে হলে ভালো উপায় কী হবে?

অফিসার পরামর্শ দিলেন, আপনারা সবচেয়ে ভালো হয় এই পাড়ায় হেডম্যান আছেন, আর চেয়ারম্যান আছেন। এরা দুজন খুব রিলায়েবল মানুষ, এবং আপনাদেরকে হেল্প করবেন। তাঁদের কাছে গেলে আপনারা ভালো একটা পথ পাবেন। …আমাদের যে ডুবে ডুবে জল খাবার ইচ্ছা, সেটা আর মাইক লাগিয়ে ঘোষণা করবার কোনো মানেই হয় না। তাই চ্যাপ্টারের ইতি টানলাম। উঠে দাঁড়ালাম। তাঁকেসহ সবাইকে অসংখ্য ধন্যবাদ দিলাম – এতক্ষণ অনেকেই আমাদেরকে ঘিরে ধরে আমাদের কথা শুনছিলেন; একজন তো বিছানায় বসে জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে কথা শুনছিলেন আমাদের। আমরা আজকে তিন্দুতে থাকছি, আমাদের সাথে খাবার জন্য আপ্যায়ন করলাম সবাইকে। তখন অফিসার বললেন, আপনারা এখানে থাকেন, কোনো সমস্যা নেই, নিরাপদে থাকবেন ইনশাল্লাহ। রাতে, এক পাগল আছে, চিৎকার চেঁচামেচি করবে, ভয় পাবেন না। আমরা বিদায় নিলাম – পিছন থেকে বিজিবি ক্যাম্পের সবাই যেন তাদের কোনো আত্মার আত্মীয়দের বিদায় দিলো।

নিচে নামতে থাকার সময় আবার সেই দুজন জোয়ান আমাদের পাশ কাটালো, তারা এবার ক্যাম্পে উঠছে। ক্যাম্প থেকে নামার সময় স্বস্থির নিঃশ্বাস ফেললাম: যাক অনেক বড় ফাড়া কেটেছে। ঘাটের কোথাও খইশামুকে দেখা যাচ্ছে না; ওকে শেষ দেখেছি সাথের ছেলেটাসহ একটা নৌকায় উঠে যেতে। স্বস্থি অনেক বড় পাওয়া, সামনে আলোর পথ দেখায়।

এবারে তাই আবারো আমাদের কোর্সে ফিরে এলাম। নিচে নামার সময় হঠাৎই চোখে পড়লো মেঝেতে পড়ে থাকা ফলগুলোর দিকে: তেঁতুল। ডিসকভারি চ্যানেলের বিয়ার গ্রিল্‌সের কথা মনে পড়লো – ব্যাটা আপদকালীন সবই খায়, একদিন দেখেছি তেঁতুলও খেয়েছে: হাই ভিট্যামিন, অ্যাসিড, ক্যালশিয়াম…। তাই কার্পণ্য না করে কুড়িয়ে নিতে থাকলাম মহীরূহ থেকে ঝরা এই প্রকৃতির দান। পাকা তেঁতুল টক হলেও একটা-দুটা পেটের জন্য উপাদেয়ই হবে আশা করি। সামনে গিয়ে তিন্দু পাড়ায় উঠার মুখে আবার পেয়ে গেলাম বড়ই। কুড়িয়ে নিয়ে পকেটে ভরলাম, মুখে দিলাম; ধোয়াধুয়ির বালাই করলে কি চলে – কাপড়ে মুছে বিয়ার গ্রিল্‌স হয়ে গেলাম।

আমাদের ক্যাম্প এখন এই কটেজ, ক্যাম্পে গিয়ে শুনি এইমাত্র দুই বিজিবি জোয়ান এসেছিল, খোঁজ-খবর নিয়ে গেছে। মনে মনে হাসি – তোমরা খবর নিয়ে যাবে কি, আমরা খবর দিয়ে এসেছি। ওদেরও গোসল শেষ, প্রভা ছিল পাহারায়। এবারে সবারই নাড়িভুড়ি হজম হবার জোগাড় – তেঁতুলগুলো একজায়গায় রেখে খেতে বসলাম। পাহাড়ি মরিচে ঝাল করে মাছ, ডিমভাজা আর ডাল। অপূর্ব একটা ডাল রেঁধেছেন গিন্নি – পুরো ডেকচি শেষ করে ফেললাম সবাই মিলে, শেষে চেয়েও আর পাওয়া গেলো না – শেষ।

সন্ধ্যা হয়ে এসেছে প্রায়, আসরের নামায শেষ করে আমি আর রাসেল চললাম গোসল করতে। পুরো নদীতে আমি আর রাসেল – ঠান্ডা হীম পানিতে প্রথমে শরীর ডোবাতে যা একটা অস্বস্থি হচ্ছিলো, পরে ভালো একটা ডুব সাঁতার দিলাম। কিন্তু বেশিক্ষণ থাকলাম না, কারণ নতুন পানিতে ঠান্ডা লেগে যেতে পারে, আমাকে আবার ঠান্ডাই কাবু করে বেশি। সাবান-টাবান ঘষে আমার যখন গোসল শেষ, রাসেলের তখন গোসল শুরু – কেন? এর কারণ দয়া করে জানতে চেয়ে লজ্জিত করবেন না – সে সব সময়ই অফ-স্ক্যাজুল চলাকে রীতি বানিয়ে নিয়েছে। গোসলে এসে ওর সামান্য পেশাব করতে করতে আমি গোসল করে উঠে পড়েছি। মাগরিবের ওয়াক্ত চলে যাচ্ছে, আমি ছুটি চাইলে রাসেল ছুটিও দিবে না – তাকে একা ফেলে যাওয়া যাবে না – ভীতু একখান! তাই ঘাঁটে বাঁধা একটা নৌকায় ট্রেকারদের ব্র্যান্ড ‘গামছা’ বিছিয়ে নামাজে দাঁড়ালাম। টালমাটাল নৌকায় নামাজ – আগেও পড়েছি নদীতে; কিন্তু এবারে অন্যরকম এক অনুভূতি: কারণ পাশেই তাকিয়ে দেখি, আমার মৃদু একটা ছায়া পড়েছে। ঘাঢ় ঘুরিয়ে তাকিয়ে দেখি বিশাল একখান চাঁদ উঠেছে দিগন্তে। শান্ত নদীর মাথায় চাঁদ – সত্যি মনোহর!

পাড়া মানেই কুকুর, আর এদের, কুকুরের সাথে আছে ভালোই সখ্যতা (ছবি: দানিয়েল)
পাড়া মানেই কুকুর, আর এদের, কুকুরের সাথে আছে ভালোই সখ্যতা (ছবি: দানিয়েল)

গোসল করে এসে শুনি দুজন বিজিবি সদস্য এসেছিলেন, কোনো কাজে নয়, শ্রেফ গল্প করতে। বহুদিন পর বোধহয় তাদের গল্প করবার মতো কোনো বাঙালি পেয়েছেন তারা। বলিপাড়ার বিজিবির সাথে এদেরকে মিলিয়ে দলের সবাই-ই বেশ আপ্লুত। চুটিয়ে আড্ডা দিয়ে রাতে খাবারের দাওয়াতও দিয়ে দিয়েছে ওরা।

রাতে শুরু হলো মূল যজ্ঞ: নাকিব পুরো প্রস্তুতি নিয়ে এসেছে, বার্বিকিউ করবে। তিন্দু বাজার থেকে ছোট গেজের তার, সয়াবিন তেল, মোমবাতি আর প্রয়োজনীয় কী-সব কিনেছে। মসলা-পাতি, চিমটা, হাড্ডি কাটবার উপযোগী ভারি প্লায়ার্স ঘরাণার কেচি ইত্যাদি সে সাথে করে নিয়ে এসেছে। গ্রিল বানাবার জন্য দরকার কাঠ, সেটা নেয়া হয়েছে কটেজ-মালিকের সংগ্রহ থেকে; ইট পাওয়া মুশকিল, তারপরও কোত্থেকে পাথর আর ইট মিলিয়ে একটা চুলা বানিয়েছে কটেজের সামনের উঠানে, সেখানে কাঠ পুড়িয়ে কয়লা বানানো হয়েছে; চার টুকরা কাঠ দিয়ে একটা বর্গাকৃতি ফ্রেম বানানো হয়েছে আর তাতে তার প্যাঁচিয়ে বানানো হয়েছে গ্রিল। একটা মুরগি কেনা হয়েছে ৳৪৩৮ [টাকায়]। একেকজন একেক কাজ করছে, দানিয়েলকে তখন কে জানি উপরে রেখেছে পাহারা দিতে। সবাই-ই কাজে হাত লাগিয়েছে, কম আর বেশি।

নাকিব, ট্যুর থেকে ফিরে একটা ছড়া-কবিতা লিখেছে, সেখান থেকে উদ্ধৃত করছি:


ভাত,মাছ, ডাল আর ডিম খাচ্ছি অবিরত / পড়ছে মনে প্রভার হাঁসের ডিমের কথা যত
দানিয়েলের একটাই চিন্তা, বাসায় অসুস্থ বউ / বউয়ের সাথে কথা বলার উপায় বলতো কেউ?
নাই নেটওয়ার্ক, নাই বিদ্যুৎ এখন কি যে করি / বাদ দে ওসব চলতো এখন বারবি-কিউ টা ধরি
ইফতি, আজিজ লেগে গেল করতে মুরগী জবাই / বারেংবার শান্ত অং রে দোকানেতে পাঠাই
নয়ন,রাসেল দুই পন্ডিত হঠাৎ করেই হাওয়া / সবার তখন একটাই চিন্তা, কখন হবে খাওয়া
পাড়ার সকল বৃদ্ধ শিশু দেখছে আয়োজন / অং ম্রোং ম্রো সং হচ্ছে কথপোকথন
আমি, ড্যান, শান্ত ও প্রভা করছি চুলা ঠিক / মুরগী কেচে দিবারাহ তো এক্কেবারে হিট
ইফতি মামা চলে গেল করতে নুডুলস পাক / ভাবলাম আমি তিন্দু তে দেখলাম না তো কাক
তরুন মামু দিচ্ছে বাতাস, আগুন জ্বলছে না / রাসেল বলে সবই পারে, ব্যাটা কিছুই পারে না

আমার মনে হয় নাকিবের এই বর্ণনা, অবস্থা বোঝার জন্য যথেষ্ট – তাই আর কিছু বললাম না। …আমি আর রাসেল হাওয়া হয়েছিলাম আমাদের মুখ্য উদ্দেশ্য-সাধনে: গিয়েছিলাম হেডম্যানের কাছে।

আমরা যে উদ্দেশ্যে বান্দরবান এসেছি, সেই সাকা হাফং আমাদের জন্য আর সম্ভব হবে না, কারণ আমরা ইতোমধ্যেই সময়ের দিক থেকে পিছিয়ে গেছি। তাই বিকল্প একটা বিষয় মাথার মধ্যে ঘুরছিল সেই প্রথম থেকেই, ওপথেই যাবো ভেবে নিলাম। রাসেলও ব্যাপারটায় রাজি। তাই…

একে-ওকে জিজ্ঞেস করে হেডম্যানের ঘরটা খুঁজে পেলাম। হেডম্যান কিন্তু মামুলি কিছু না: প্রত্যেকটা পাড়ার প্রধান হলেন একজন ‘কারবারি’, আর একাধিক পাড়ার কারবারিরা একজন হেডম্যানের কাছে রিপোর্ট করেন। সুতরাং এই ব্যক্তি যে স্থানীয় একজন সংসদ সদস্যের মতোই মর্যাদাবান সেটা আমরা বুঝে গেছি।

নিচু হয়ে শরীর বাঁকিয়ে একটা ডালা পার হয়ে ঘরের ভিতরে ঢুকলাম। সামনে সিঁড়ি টপকে দোতলায় উঠতে হয়। ওখানে কয়েকজন লোক গোল হয়ে কথা বলছেন। আমি ‘আদাব’ বলে এগিয়ে গেলাম, বললাম: হেডম্যানের সাথে কথা বলবো, আমরা ঢাকা থেকে এসেছি। গোলগাল চেহারার একজন ছোটখাটো মানুষ এগিয়ে এলেন, হাত মেলালাম। বসতে বললেন হেডম্যান প্রেন থাং

কাঠের পুরু তক্তা বিছানো দোতলা ঘর। আমি কথা বললাম, আবু বকরের থেকে শেখা সেই পাহাড়ি-বাংলা অ্যাকসেন্টে; জানালাম আমাদের একজন গাইড দরকার, আমরা নাফা খুমের ওদিকে যাবো। সাথে সাথে তিনি উঠে দাঁড়ালেন, ঘরের এক কোণায় চলে গেলেন, ওখানে অ্যান্টেনায় লাগানো একটা মোবাইল ফোন, ওটা তুলে নিয়ে কাকে ফোন দিলেন। গাইডের ব্যবস্থা করছেন তিনি। ব্যর্থ হয়ে ফিরে এসে বললেন, চলেন, আপনাদেরকে চেয়ারম্যানের কাছে নিয়ে যাই, উনি বলতে পারবেন।

তিনি নিজে উঠে এসে আমাদেরকে চেয়ারম্যানের কাছে নিয়ে চললেন – একজন সংসদ সদস্যের মতো মর্যাদার পদ নিয়ে এভাবে সমাদর করছেন দেখে একটু লজ্জিতই বোধ করলাম। চেয়ারম্যানও খুব আন্তরিক, আমরা তাঁর সহায়তা চাচ্ছি জেনে খুবই লজ্জিত হলেন যেন। বললেন, আপনারা ওখানে উঠেছেন না, আমি ওখানেই আসছি, আপনারা যান। হেডম্যানকে অসংখ্য অসংখ্য ধন্যবাদ দিয়ে আমরা আমাদের ক্যাম্পে ফিরলাম।

ক্যাম্পে চেয়ারম্যান, হেডম্যানসহ পাড়ার আরো তিন-চারজন লোক জড়ো হয়েছেন; কুপির আলোয় বসলো আমাদের সভা। চেয়ারম্যান সম্পর্কে যা শুনেছি, তিনি এই অঞ্চল সম্পর্কে বেশ জ্ঞান রাখেন; তাছাড়া স্থানীয় গাইড অ্যাসোসিয়েশনেও কোনো এক পদে আছেন তিনি। মানচিত্রটা খুব মিস করছি, মনে মনে ঈশ্বর যপ করে প্যাডের সাদা কাগজে তিনটা বিন্দু দিলাম। তিনটা বিন্দুর নিচেরটা আর মাঝেরটাতে লিখলাম দুটো পাড়ার নাম, উপরেরটাতে কিছুই লিখলাম না – এই তিনটা পাড়া বরাবর একটা কল্পিত রেখা টেনে তৃতীয় বিন্দুটাতে বললাম – এখানে একটা লেক আছে, আমরা ওখানে যেতে চাই।

প্রথমবার চিন্তা করে নিরাস করলেও পরের বারের চেষ্টায় ঠিকই ধরতে পারলেন কোথায় যেতে চাচ্ছি আমরা – বললেন: আছে। এরপর একটা কাগজে লিখে দিলেন পুরো পরিকল্পনা – সুন্দর তাঁর বাংলা হাতের লেখা। তিনদিনের পরিকল্পনা সুন্দর করে গুছিয়ে লিখে দিলেন। উপস্থিত ব্যক্তি থেকেই একজনকে গাইড নির্বাচন করে দিলেন, আর আরেকজনকে দেখিয়ে বললেন, এর পাড়া নাফা খুমের দিকেই, এ’ আপনাদের সঙ্গী হবে অতটুকু পর্যন্ত। গাইডের খাওয়া-দাওয়া সব আপনাদের সাথে, আর এখানকার গাইডের হিসাবটা হলো প্রতিদিন ৳৫০০ [টাকা], তিনদিনে ৳১,৫০০। হালকা নাস্তা-পানি শেষে সভা ভঙ্গ হলো – একজন আমাদের কানে-মুখে বলে দিলেন: একে একটু ৳২০০-৳৩০০ [টাকা] দিয়ে খুশি করে দিয়েন আরকি (ইঙ্গিত করলেন দ্বিতীয় গাইডের দিকে)। সেটা তো আমাদের মাথায়ই আছে, বেচারা আমাদের পথে সঙ্গী হবে, কিছুতো সম্মান করবোই ইনশাল্লাহ। ধন্যবাদের সাথে বিদায় নিলেন তিন্দু ইউপি’র চেয়ারম্যান মং প্রুং অং মার্মা

প্ল্যান সেট, তাই ইফতি আর আমি গেলাম নুডল্‌স রান্না করতে। ঘটি-বাটি ধুয়ে বিশাল ডেকচিতে চড়ানো হলো ১০ প্যাকেট নুরুল। কটেজের মালিক আর মালকিন এতক্ষণে ঘুমিয়ে সারা… কিন্তু আমাদের যন্ত্রণায় তাদের কি আর ঘুম আসে? তাই মালিক মে- দাও উঠে এসে বসলেন আমাদের পাশে। গল্প চললো: তিন্দু পাড়ায় দুটো পানির কল আছে, সাপ্লাইয়ের পানি আসে সেগুলো দিয়ে। জানলাম এনজিও কারিতাস সতর তিন্দু থেকে পাইপ দিয়ে এই পানির ব্যবস্থা করে দিয়েছে পাড়ায়। খ্রিস্টীয় এই এনজিও জয় করে নিয়েছে এখানকার মানুষের মন।

রাতের খাবার একটা মুরগির বার্বিকিউ আর নুডল্‌স – বিজিবি থেকে কেউ আসেনি অবশ্য; মে- দাওকে দাওয়াত দিলাম। তাদের খাওয়া-দাওয়া আগেই হয়ে গেছে, তবুও আমাদের আপ্যায়ন রক্ষা করলেন। নুডল্‌স ঠিকমতো খেলেও এই আধোপোড়া মুরগি বোধহয় তাঁর মুখে রুচলো না, কাঠির আগায় লাগিয়ে চুলায় আরো খানিকটা পুড়িয়ে খেয়ে শুয়ে পড়লেন আবার। অথচ মসলাযুক্ত ঐ আধপোড়া মুরগিটাই আমাদের কাছে বার্বিকিউ – বিদেশ থেকে পাওয়া হুজুগগুলোর আরো একটা।

বার্বিকিউ আর নুডুল্‌স দিয়ে রাতের খাবার - ছবিটা এডিট করা (ছবি: লেখক)
বার্বিকিউ আর নুডুল্‌স দিয়ে রাতের খাবার – ছবিটা এডিট করা (ছবি: লেখক)

টেবিলে প্লেটপ্রতি নুডল্‌স, মুরগির টুকরা দেয়া হলো। আর একটা পাত্রে তেঁতুল চটকে তৈরি করা হলো বিশেষ চাটনি। মে- দাওয়ের কাছে আধপোড়া হতে পারে, কিন্তু অপূর্ব লাগছিলো খেতে – বিশেষ করে ঐ তেঁতুলের চাটনিটা খাবারকে আরো উপাদেয় করে দিয়েছিল। কিছু খাওয়া বেঁচে গেলো। দেখা গেল, তাও পড়লো না; আশেপাশেই ঘুরছিল তিন্দু পাড়ার পাগলটা, তাকে দেয়া হলে সে খেয়ে নিলো। খাওয়া শেষে সবাই উপরে উঠে গেলো।

হিসাব-নিকাশ সব মিটমাট করে নিলাম নিজেদের মধ্যে। নাকিবের কবিতা বলে:

সারাদিন ধকল গেছে, এখন সময় ঘুমুবার / দুষ্টামি আর ফাজলামোতে ঘুম আসছেনা যে আর
ঠিক তখনই ইফতির হাতে রেড-বুলের ক্যান / তরুণ ব্যাটা থেকে থেকে শুধায় “গুমাচ্চেন?”

তিন্দু পাড়ায় কটেজে আমাদের শয়ন-প্রস্তুতি (ছবি: লেখক)
তিন্দু পাড়ায় কটেজে আমাদের শয়ন-প্রস্তুতি (ছবি: লেখক)

দুষ্টামি আর ফাজলামির চূড়ান্ত করলো নাকিব নিজেই, এর নাম বলে, সাথে যোগ করে অং, কিংবা চং, কিংবা ম্রং – আর খ্যাকখ্যাকিয়ে হাসে। মোটামুটি যাদের নাম মনে পড়লো, সবাই-ই একটা একটা অংচংম্রংপ্রং উপাধি পেয়ে গেলো। ব্যক্তির নাম শেষ হলো তো শুরু হলো মুরগি, হাঁস, শুকর…। এই অংচংপ্রং-গাঁথা রেখে আমি ক্যামেরাটা নিয়ে ওযু করতে বেরিয়ে গেলাম একাই, নদীতে। নীরব পাড়া – পিনপতন নিঃস্তব্ধতা, প্যান্টের খসখসটাই বেশি লাগছে কানে। আকাশে বিশাল একখান চাঁদ, আর উন্মুক্ত অবারিত তারার চাদর। ক্যামেরার Hi1 আইএসও-তে দেখলাম সপ্তর্ষি স্পষ্ট হয়ে ধরা দিয়েছে। শান্ত নদীর বুকেও অপূর্ব দৃশ্য – আধো অন্ধকার পাহাড়গুলো যেন অনেক রহস্য নিয়ে ডাকছে হারিয়ে যেতে…।

মধ্যরাতে তিন্দুর আকাশে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে সপ্তর্ষি (ছবি: লেখক)
মধ্যরাতে তিন্দুর আকাশে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে সপ্তর্ষি (ছবি: লেখক)

রাতে বেশ ঠান্ডা লাগলো। যদিও ফুল প্যাকেট হয়ে, কটেজের পাতলা কম্বল গায়ে দিয়ে ঘুমিয়েছি, তবু এই ঠান্ডা কাবু করে ফেলার মতো। শেষে ভোরে একজন আরেকজনকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকলাম। তবু যেন কুলায় না। শেষে উঠে গিয়ে আগুন পোহাতে শুরু করলাম – আর তখনই… আমাদের আবির বাবাজির জন্য ইফতি একটা যুগান্তকারী নাম আবিষ্কার করে ফেললো: “টিনটিন”। তাকিয়ে দেখি আসলেই, মোজার ভিতরে প্যান্টের পা গুঁজে রীতিমতো টিনটিন হয়ে দাঁত ব্রাশ করছে…। হাসতে হাসতে গড়াগড়ি।

নাস্তা খেয়ে (৳১৬৫), পেশাব-পায়খানা শেষ করে প্রস্তুত। আমাদের গাইড বেচারা আশেপাশেই ঘুরাঘুরি করছে। প্রভাকে পাঠিয়ে দিলাম গাইডের সাথে গিয়ে প্রয়োজনীয় রসদ কিনে নিয়ে আসতে: ইফতি লিস্ট করে দিলো – ডাল ১ কেজি; তেল আধা লিটার; পেয়াজ ৭৫০গ্রাম; রসুন ১০০গ্রাম; লবণ আধা কেজি; বিস্কুট ১প্যাকেট – সাকুল্যে ৳৩০০+ [টাকা]। আরো কিছু রসদ নাকিবদের কাছে ছিল, বেঁচে গেছে, সেগুলোও সঙ্গে নিয়ে নিয়েছি, তার মধ্যে আছে নুডল্‌স, বিস্কুট ইত্যাদি।

তিন্দুতে গাছে আমের বোল (ছবি: লেখক)
তিন্দুতে গাছে আমের বোল (ছবি: লেখক)

শেষ মুহূর্তে আমি নী-ক্যাপ পরতে গিয়ে দেখি আমার নী-ক্যাপ দুইটা উধাও! খুঁজেই পেলাম না। শেষে নাকিবেরটা ধার নিলাম, ওরা যেহেতু আর ট্রেকে যাচ্ছে না। রাসেলেরও একই কাহিনী – সে নিলো ইফতিরটা।

টীম সেট – অজানা লেকের অভিযানে বান্দরবানের গহীনে বেরিয়ে পড়ার জন্য প্রস্তুত আমাদের তিনজনের ছোট দলটা – আমি, রাসেল আর প্রভা – সঙ্গে প্রধান গাইড নুং চ মং। গ্রুপ ছবি তুলে বেরিয়ে পড়লাম ওদের থেকে বিদায় নিয়ে। ওরাও প্রস্তুত, একটা বোট এলে চলে যাবে থানচিতে; ওখান থেকে বাসে যাবে বান্দরবান; সেখান থেকে বাসে চট্টগ্রাম, কারণ পীক টাইম হওয়ায় সরাসরি বান্দরবান থেকে ঢাকার কোনো বাস পাওয়া যায়নি; চট্টগ্রাম গিয়ে সেখান থেকে ট্রেনে ঢাকা – মেইল ট্রেনে দালাল ধরে বন্ধু নাজমুর রশিদ টিকেটের ব্যবস্থা করে দিয়েছে ওদেরকে।

হেডম্যানের থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম আমরা – উদ্দেশ্য: নৌকায় নয়, পায়ে হেঁটে নাফা খুম যাওয়া…। আর গভীর উদ্দেশ্য: ম্যাপের সেই অজানা লেকটার সন্ধান বের করা।

আসল যাত্রা তো সবে শুরু…

(চলবে…)
-মঈনুল ইসলাম

পরের পর্ব »

২ thoughts on “অজানা লেকের অভিযানে বান্দরবান ২০১৩ : প্রথমাধ্যায় : পর্ব ৮

মন্তব্য করুন