অজানা লেকের অভিযানে বান্দরবান ২০১৩ : প্রথমাধ্যায় : পর্ব ৬

ধারাবাহিক:  অজানা লেকের অভিযানে বান্দরবান —এর একটি পর্ব

নৌকা ভাড়ার অতিউচ্চমূল্য শুনে আমরা যখন ট্যুর বাতিল করার কথা ভাবছি তখন রাসেলই পায়দল থানচি থেকে রেমাক্রি হয়ে নাফা খুম পর্যন্ত যাবার বিধ্বংসী প্রস্তাব করেছিল, আর তা অনুসরণ করে যখন গাইড পাওয়া যাচ্ছিলো না, তখন গতরাতের আবাস-দাতা খইশামু মারমাকে গাইড করে আমরা শঙ্খ নদীর পাড়ে নেমে গেছি ১০জন তরুণ-তরুণী – হারাধনের দশ যক্ষের ধন। উদ্দেশ্য পায়ে হেঁটে চলে যাবো, যেখানে সবাই যায় ইঞ্জিন বোটে করে।

থানচি থেকে পায়ে হেঁটে ছুটে চলেছে দল, সাঙ্গুর অপূর্ব জলে পড়েছে তাদেরই প্রতিবিম্ব (ছবি: নাকিব আহমেদ)
থানচি থেকে পায়ে হেঁটে ছুটে চলেছে দল, সাঙ্গুর অপূর্ব জলে পড়েছে তাদেরই প্রতিবিম্ব (ছবি: নাকিব আহমেদ)

দলের সবাই-ই আমাদের পরামর্শমতো নিজেদেরকে এই দীর্ঘ পথের জন্য প্রস্তুত করে নিয়েছে। কেউ কেউ একটু পরে হলেও জিন্সের প্যান্ট-ট্যান্ট ছেড়ে ট্রেকিং-এর উপযোগী ঢিলেঢালা পোষাকে আবির্ভূত হয়েছে। হাঁটুতে সবাই-ই পরে নিয়েছে নী-ক্যাপ, আর গোড়ালিতে অ্যাংকলেট।

দলের সবাই-ই পুরুষ, একমাত্র দিবারাহ-ই নারী, তাই স্বভাবতই মনে হতে পারে ‘পারবে কি ও’? এবারে ওর সম্বন্ধে একটু বলে নেয়া দরকার: দিবারাহ কিন্তু এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে হাইকিং অ্যান্ড ট্রেকিং-এর একটা কোর্স করেছে। এই কোর্সের অংশ হিসেবে ও’ কোন এক উঁচু পাহাড় নাকি পর্বতেও আরোহণ করেছে। তাই ও’ যে উল্টো আমাদেরকেই চলতে চলতে কিছু একটা শিখিয়ে দিবে – সে অপেক্ষাতে আছি।

আফিম - পাহাড়িদের নিত্য সেবিত উপাদান (তারা বলে গোল্ডলিফ পাতা) (ছবি: নাকিব আহমেদ)
আফিম – পাহাড়িদের নিত্য সেবিত উপাদান (তারা বলে গোল্ডলিফ পাতা) (ছবি: নাকিব আহমেদ)

ডানে শঙ্খ নদী, আর বায়ে নদীর শুকিয়ে যাওয়া ঢালে চাষ করা হয়েছে আফিম। আফিমকে এরা বলে ‘গোল্ডলিফ পাতা’ (বাংলা করলে তা দাঁড়ায় স্বর্ণপাতা পাতা 🙂 ), এই পাতা কিনে নিয়ে যায় গোল্ডলিফসহ আরো অনেক টোব্যাকো কোম্পানী। সবুজ গাছের বাগানে কোনো কোনোটাতে আবার ফুলও ফুটেছে। এই ফুল দেখে শুদ্ধতার প্রত্যাশা করলেও বুঝতে বাকি থাকে না কী বিষ নিয়ে বসে আছে এই গাছগুলো; কারো কাছে তা অবশ্য সঞ্জীবনী শক্তি।

দলটা এগিয়ে চলেছে, গতি খারাপ না। প্রভা একটু পিছিয়ে পড়ছে। আবু বকর শিখিয়েছিলেন, ‘পিছনে যে থাকবে, সে ক্রমশ পিছিয়ে পড়তে থাকবে’, তাই প্রভাকে সামনে রেখে পিছনে আমিই থাকার চেষ্টা করলাম। ছবি তুলে তুলে এগোচ্ছি। দানিয়েলও ছবি তুলছে। মাঝখানে ছোট্ট ঝিরি পড়লে কেউ কেউ দেখলাম লাফ দিয়ে পার হবার চেষ্টা করছে।

অপূর্ব সব দৃশ্য সামনে। থানচি থেকে হেঁটে এভাবে আর কোনো অভিযাত্রী রেমাক্রির দিকে গিয়েছিল কিনা জানি না, না গেলে আমরাই প্রথম। দৃশ্যগুলো অপূর্ব: একে বেঁকে চলছে শঙ্খ, বাঁকগুলোতে কোথাও টিলা, কোথাও পাহাড়, কোথাও পর্বতসম পাহাড়; ঢালে আফিম চাষ; দূর দিগন্তে পাহাড়, তারও পরে আরো উঁচু পাহাড় গিয়ে নীল আকাশে ঠেকেছে। অপূর্ব দৃশ্য!

এই অপূর্ব দৃশ্যটা অপূর্ব করেছে সূর্যের প্রখর তাপ। আর সেই তাপ ঠেকানোর কোনো বন্দোবস্ত নেই, সরাসরি আমাদের মাথার উপর যেন চলে এসেছে সূর্যীমামা। প্রচণ্ড এই তাপ থেকে রক্ষা করলো ট্রেকারদের ব্র্যান্ড ‘গামছা’। মাথাটা প্যাঁচিয়ে ঘোমটা-টানা বউ হয়ে গেলাম আমি।

প্রভার গতি বরাবরের মতোই একটু কম। ও কিছু না, সময় গেলে ঠিক হয়ে যাবে। কোথাও পাড়ে পা রাখার জায়গা কম, আফিম ক্ষেতগুলো নদীর এতোটাই কাছে চলে এসেছে যে, কোনোরকমে পা রেখে জায়গাটা পাড়ি দিতে হচ্ছে।

এবারে পথটা সত্যিই কন্টকময় হয়ে উঠলো: পায়ের নিচে বালি। গতবার এসে পাথরের উপর দিয়ে হেঁটেছি, অনায়াসেই, কিন্তু এই বালি আমাদেরকে পর্যুদস্ত করে ফেলছে। সবারই দেখলাম একই অবস্থা। সমস্যা হলো বালিতে পা ঢুকে যাচ্ছে, এতে হাঁটার গতি কমে যাচ্ছে তো অবশ্যই, ডুবে যাওয়া পা আবার কষ্ট করে টেনে তুলে পরের ধাপ ফেলবার আগেই অন্য পা-টা শরীরের ভারে ডুবে যাচ্ছে। বালিতে হাঁটা একটা বিশ্রী ব্যাপার।

যাহোক কসরত করে করে সাঙ্গুর পার ধরে চলছি আমরা। সাঙ্গু নদীটা কিন্তু একটা কারণে নদীমাতৃক বাংলাদেশের অন্যান্য নদী থেকে আলাদা: এই নদীটা বাংলাদেশের একমাত্র নদী, যা দক্ষিণ থেকে উত্তর দিকে বয়ে চলেছে। এই নদীর উৎপত্তি বাংলাদেশের সীমান্ত সংলগ্ন মিয়ানমারের আরাকান পর্বতে। বাংলাদেশের ডি-ওয়ে এক্সপেডিটর্স সাঙ্গুর উৎস অনুসন্ধানে একটা অভিযান করেছিল (আর্কাইভ^)।

পথিমধ্যে বিশ্রাম এবং তৃষ্ণা-নিবৃত্তি (ছবি: লেখক)
পথিমধ্যে বিশ্রাম এবং তৃষ্ণা-নিবৃত্তি (ছবি: লেখক)

হাঁটতে হাঁটতে সামনে দেখা গেলো একটা খোলামেলা কুড়েঘর। দেখে মনে হয় এটা সমতলে বানানো একটা জুমঘর ঘরানার বিশ্রাম ঘর। আমাদের গাইড খইশামু পেছন থেকে আমাকে ডাকলো, “মোহন ভাই…” আমার এই নতুন নাম শুনে আমি হাসি, “এখানে বসেন।”

দলের কারোরই দেখলাম ক্লান্তি ধরেনি, তবু গাইড নিজেই বিশ্রাম চাইছে। বসলো সবাই ছায়ায়। এই ঘরের মাঝ বরাবর রাখা কিছু তরমুজ, এক্কেবারে সবুজ রঙের। পাশেই একটা ঘর, ওখানকার এক মহিলার সাথে খইশামু কথা বলে আমাদেরকে দুটো তরমুজ কিনে দিলো। তরমুজের দামটা অবশ্য একটু বেশিই (দুটো ৳১৫০) হয়ে গেল, তবু প্রচন্ড গরমে তরমুজগুলো বোধহয় সবার খুব আকাঙ্ক্ষিত ছিল।

ইফতির সাম্প্রতিক কেনা ছুরিটা এবারে কাজে লাগালো, এবং বলাই বাহুল্য মোক্ষম কাজে লাগলো। তরমুজ চিরে সবার হাতে হাতে চলে এলো। তরমুজটা দেখতে খুব একটা সুস্বাদু মনে হলো না, কারণ প্রচলিত তরমুজের রং যেখানে লাল, এই তরমুজের রং সেখানে গোলাপি-সাদা। কিন্তু মুখে দিয়ে সবারই আক্কেল গুড়ুম! মোটামুটি মিষ্টি, কিন্তু সব স্বাদ ছাপিয়ে এই প্রচন্ড গরমে তরমুজটা যেন সরাসরি ফ্রিজ থেকে বের করে আনা। এত্তো ঠান্ডা কী করে হয় এই খোলামেলা ঘরটায় রাখা তরমুজগুলো!! …তরমুজের বিচি ফেলতে ফেলতে সবারই একটু বিরক্তি এলেও এই ঠান্ডা, প্রচন্ড ঠান্ডা খাবারটা সবাই-ই বেশ উপভোগ করলো। এবং সবশেষে তরমুজের ছালটা খেতে দেয়া হলো সামনেই থাকা দুটো গরুকে। গপাগপ খেয়ে নিলো তারা।

ইফতি তার ছুরিখানা দিয়ে তরমুজ জবাই করছে, ঠান্ডা বরফ এই তরমুজ আমাদের বান্দরবান বারবার যাবার তৃষ্ণা আরো বাড়িয়ে দিয়েছিল (ছবি: দানিয়েল)
ইফতি তার ছুরিখানা দিয়ে তরমুজ জবাই করছে, ঠান্ডা বরফ এই তরমুজ আমাদের বান্দরবান বারবার যাবার তৃষ্ণা আরো বাড়িয়ে দিয়েছিল (ছবি: দানিয়েল)

বিশ্রাম শেষ, আবার চলা শুরু। আবারো বালুতে চলা। তবে বালুতে চলার একটা পরামর্শ দিয়েছে প্রভা: আগের জনের পদচিহ্নে পা দিয়ে চললে বালুতে চলতে কষ্ট হয় না। বালিতে বেশিক্ষণ চলতে হলো না, পথটা এবার একটু নুড়ি পাথর ধারণ করলো। পাশে নদীতে দেখি কোমরে ঝুড়ি বেঁধে মহিলারা পানিতে হাত দিয়ে কী যেন খুঁজছেন। আসলে তারা শামুক কুড়াচ্ছেন, নিজেরাই খাবার জন্যে হয়তো।

এবারে পথটা উঠে গেলো সামান্য পাহাড়ে। ডানে খাড়া ঢাল, এবং নিচে সাঙ্গুর গভীর জল। খুব গভীর না হলেও ভিজিয়ে দেয়ার মতো গভীর। কোথাও এক গাছের সাঁকো দিয়ে পার হতে হচ্ছে, তখন ইফতি কোথা থেকে সঙ্গে আনা একটা বিশাল বাঁশ এপাড়-ওপাড় বসিয়ে দিয়ে রেইলিং-এর মতো সবাইকে সহায়তা করছে – আমাদের বাঁশ বাবা। (নীলগিরি ট্যুরে ছিল গামছা বাবা)

হঠাৎ করে উপলব্ধি করলাম আমি এক মহা উপদ্রবের সাথে হাঁটছি, একেবারে পিছনে ছিলাম আর আমার পিছনে ছিল গাইড খইশামু মারমা। সে অনবরত কথা বলে। কথা বলার ধরণটার কারণেই বিরক্তিটা, মানুষ হেঁটে হেঁটে কথা বলে, এতে হাঁটাও হয়, কথাও বলা হয়। না, এই বান্দার, জায়গায় দাঁড়িয়ে তার চেহারার দিকে না তাকালে কথা বলা হয় না। পিছন থেকে হাঁক ছাড়ে “মোহন ভাই, মোহন ভাই” যতক্ষণনা আমি জায়গায় দাঁড়িয়ে তার দিকে ফিরছি, ততক্ষণ ডাকতে থাকে। তারপর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলে। কথা শেষে হাঁটা শুরু করি, তো আবার ডাকে। সিরিয়াস পেইন দিচ্ছে এই ব্যাটা!

অপূর্ব এই খাঁজ ধরে হাঁটা (ছবি: লেখক)
অপূর্ব এই খাঁজ ধরে হাঁটা (ছবি: লেখক)

আরেকটু সামনে যেতেই অপূর্ব একটা ট্রেইল চোখে পড়লো, পাহাড়ের একটা খাঁজ ধরে হাঁটা, খাঁজটা একেবারে সাঙ্গুর জল ছুঁয়েছে এসে, আর উপর দিয়ে পাথুরে ছাউনি, নিচ দিয়ে গুহাপথের মতো পথ তৈরি হয়েছে হাঁটার। অপূর্ব লাগলো ট্রেইলটা পার হতে, বাকিদের কাছে এরকম অপূর্ব লেগেছে কিনা ভয় লেগেছে আমি জানি না।

ইফতি বাবাজিকে দেখেই মনে হচ্ছে সে একাই ট্রেকার, তবে দৃশ্যটা আমার খুব পছন্দ হয়েছে। (ছবি: দানিয়েল)
ইফতি বাবাজিকে দেখেই মনে হচ্ছে সে একাই ট্রেকার, তবে দৃশ্যটা আমার খুব পছন্দ হয়েছে। (ছবি: দানিয়েল)

আবারো রোদে বেরিয়ে এলাম আমরা। খাড়া ঢালে পা বাঁকা করে হেঁটে এগোতে হচ্ছে কিছুটা জায়গা। এরপর পাওয়া গেল একটা মোটামুটি বড় ধরণের ঢাল, এখানে পাহাড়িরা একটা গাছে খাঁজ কেটে সেটা ফেলে নামার ব্যবস্থা করেছেন। রাসেল এখানে উদ্যোগী হয়ে ভলান্টিয়ার হয়ে গেল। সবার হাত ধরে ধরে নামাচ্ছে… সবার!!! …তবে আরো কয়েকটা খাড়া ঢালও যখন টীম অনায়াসে পার হয়ে এগোতে লাগলো তখন বেশ ভালো লাগলো, যাক টীমটা একেবারে মন্দ না।

খাঁজ কাটা একটা গাছ ফেলা, সেটা দিয়ে পা ফেলে নামছে সবাই, সহায়তা করছে রাসেল (ছবি: নাকিব আহমেদ)
খাঁজ কাটা একটা গাছ ফেলা, সেটা দিয়ে পা ফেলে নামছে সবাই, সহায়তা করছে রাসেল (ছবি: নাকিব আহমেদ)

এপর্যায়ে আমরা নদীকে আড়াআড়িভাবে পার করছি। এমন সময় পেছন থেকে ডাক ছাড়লো “মোহন ভাই, মোহন ভাই…” কোত্থেকে যে এই নাম উদ্ভাবন করেছে আল্লা’ মালুম। আমি পিছন ফিরলে সে আমাকে জোর করে নিয়ে গেলো পাশেই গোসল করতে থাকা কয়েকজন নারীর কাছে। এরা তারই আত্মীয়া হয়। আমাকে বললো, “এরা কাপড় পরে না, ছবি তুলেন।”

আমার তো চক্ষু চড়কগাছ! বলে কি বেকুবে!!

না… সে আমাকে প্রায় বাধ্য করলো ছবি তুলতে। মহিলাদের বললো, বসো, সবাই একসাথে বসো, ছবি তুলবে। মহিলাদের চেহারার দিকে তাকাচ্ছিলাম তখন আমি, তারা কি অনিচ্ছায় পোয দিচ্ছেন? না, তারা বেজায় খুশি ছবি তুলবো বলে। শেষে বাধ্য হয়ে আমি খইশামু মারমা নামক এই পাহাড়ি গর্ধবের মন রক্ষার্থে ছবি তুললাম। এরা উর্ধাঙ্গ উন্মুক্ত করে গোসল করতে নেমেছেন, কেউবা কাপড় ধুচ্ছেন, কেউবা গল্প করছেন। ছবিটা তুলতে আমার বেশ খারাপ লাগলো, কিন্তু কী আর করা। ছবিটা তুলে যখন ডিসপ্লেতে তাঁদেরকে দেখালাম, বৃদ্ধারা খুব খুশি হলেন। এটা তাদের সংস্কৃতি; আমাদের সাথে যার বিস্তর ফারাক। কিন্তু এই ঘটনাটাকে দলের বাকিরা যেভাবে রং চড়ালো, আমি পুরোই ভিলেন হয়ে গেলাম। 🙁

প্রভা তখনও পিছিয়ে... দলের সবাই একটা ভালো পোয দিয়ে দিয়েছে ততক্ষণে (ছবি: নাকিব আহমেদ)
প্রভা তখনও পিছিয়ে… দলের সবাই একটা ভালো পোয দিয়ে দিয়েছে ততক্ষণে (ছবি: নাকিব আহমেদ)

আমার তখন ইচ্ছে করছিল এই খাটাশটাকে লাগাই একটা লাত্থি। সে এই ছবি তোলাতে পেরে খুবই খুশি। আবার আমাকে বলে “এখানে পাড়া আছে”, নিজের লুঙ্গির একটা কোণা ধরে উপরে তুলে ধরে বলে “…এইখানে কাপড় পরে পুরুষরা”। বুঝলাম কৌপিন টাইপের কাপড় পরা আদিবাসী সম্প্রদায়ের কথা বলছে। আমি সাফ “না” করে দিলাম। ব্যাটা আস্ত একটা বজ্জাত!

নদীটা পার হলাম উরু পানি দিয়ে। এবারে নদীর ঢালে দেখা গেল বাদাম গাছ আর বাদাম গাছ। নাকিব তো একটা ডকুমেন্টারিই রেকর্ড করে ফেললো, যেখানে সে মাটির সাথে লেপ্টে থাকা একটা বাদাম গাছ তুলে শিকড়ের গোড়ায় সেঁটে থাকা বাদাম দেখিয়ে শাইখ সিরাজ^ হয়ে গেল। কাচা বাদাম আমরা সবাই-ই খেলাম, কাচা গন্ধটা ভালো লাগলো না, তবে সার্ভাইভাল খাদ্য হিসেবে পুষ্টিগুণ বিবেচনা করে দ্বিতীয়বার আর বিবেচনা না করে কিছু নিজের সাথেও নিয়ে নিলাম। বাদাম গাছের মাঝামাঝি আবার ভুট্টার গাছও আছে। গাইড খইশামু দেখলাম একটা ভুট্টাও নিয়ে নিলো।

বাদাম আর বাদাম - পাড় জুড়ে চাষ করা হয়েছে বাদামের গাছও। তার পাশ দিয়ে হাঁটা... (ছবি: লেখক)
বাদাম আর বাদাম – পাড় জুড়ে চাষ করা হয়েছে বাদামের গাছও। তার পাশ দিয়ে হাঁটা… (ছবি: লেখক)

সে বারবার আমাকে পিছিয়ে দিচ্ছে কথা বলে বলে, তাকে নিয়ে হানিফ সংকেত ঘুরতে গিয়েছিল, এই পাহাড়টা তার, ঐ পাহাড়টা তার ইত্যাদি কাহিনীর পর কাহিনী। আমি তাই জোর খাটিয়েই সামনে চলে গেলাম, এগিয়ে গিয়ে সবাইকে ওর ব্যাপারে সাবধান করলাম যেন ওর কাছেও কেউ না ঘেষে, গতি ধীর করে দিবে। আমাদের শাইখ সিরাজ নাকিব আবার মানুষের নাম দিতে খুব ওস্তাদ, খইশামু’র একটা নাম দিয়ে দিলো: “পেইন ম্রো”। ব্যস, সবার হাসি আর ধরে না।

বাদামের মডেল - দিবারাহ (আর কিছুর মডেল হতে পারলি না?) (ছবি: নাকিব আহমেদ)
বাদামের মডেল – দিবারাহ (আর কিছুর মডেল হতে পারলি না?) (ছবি: নাকিব আহমেদ)

এদিকে পেইন ম্রো’র সাথের যে ছোট ছেলেটা আছে, তার সাথে কথা বলা হয়নি। এগিয়ে গেলাম ওর কাছাকাছি। ও’ জানালো ওরও কালকে ফিরে আসা লাগবে থানচি, পরশু ওর পৌরনীতি পরীক্ষা আছে। বুঝলাম এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে ও’। জানলাম ওরা খ্রিস্টান। বললাম, তুমি তো মন দিয়ে পড়লে নটর ডেমে যেতে পারবে, কারণ চার্চের মাধ্যমে যাওয়া যায় নটর ডেমে। সে জানালো এ গ্রেড পেলেই নটর ডেমে ভর্তি হতে পারবে, তারও অনেক ইচ্ছে আছে এব্যাপারে। পেইন ম্রো’র বিপরীত এই ছেলেটিকে বেশ ভালো লাগলো।

হাঁটতে হাঁটতে আমরা চলে এলাম ছোট্ট এক বাজারের মতো জায়গায়। নদীর পাড়েই এখানে গড়ে উঠেছে কয়েকটি দোকানঘর। লোকজনকে জিজ্ঞেস করে নাম জানলাম – ছোট ইয়ারেঁ। পেইন ম্রো ওরফে খইশামু মারমা আমাদেরকে জানালো এখান থেকে বোট নিতে হবে। সে অল্প খরচে বোটের ব্যবস্থা করবে, চিন্তার কোনো কারণ নেই; সে আমাদের খরচ বাঁচাতে বদ্ধ পরিকর।

এখানে সঙ্গে করে আনা কাচা ভুট্টাটা আগুনে পুড়ে খাবার ব্যবস্থা করলো পেইন ম্রো। কাচা ভুট্টা পোড়ালেও স্বাদটা ছিল অপূর্ব। মোটামুটি সবাই-ই আগ্রহ নিয়ে খেলো। পেইন ম্রো এদিকে তার মায়ের সাথেও পরিচয় করিয়ে দিলো আমাদেরকে। ছবি তোলার পোকা একটা – মোহন ভাই ছবি তুলেন, এমনে তুলেন, ওমনে তুলেন। পুরাই মাথা নষ্ট!

অবশেষে ওখানে কলা (৳২০) আর “মেজলী” নামক প্যাকেটজাত পপকর্ন (৳৮০) খেয়ে বিশ মিনিট খুইয়ে মিললো একটা ইঞ্জিন বোট। সকাল থেকে ১০ জন এক বোটে হবে না শুনে এলেও এখানে দেখা গেলো এক বোটেই মাঝি-সাগরেদ, গাইডসহ মোট ১৪ জন উঠে পড়লাম। ইঞ্জিন চালু করলো ছোট্ট মাঝি, তারপর তো সব পাঙ্খা!

নৌকা যাবে বড় ইয়ারেঁ পর্যন্ত, ভাড়া জনপ্রতি ৳৫০, দুই গাইড বাবদও দিতে হলো, তাই সাকুল্যে নৌকা ভাড়া হলো ৳৬০০। ইঞ্জিন বোটের আওয়াজে কান তালা লেগে যাবার জোগাড় হলেও সাঙ্গুর সবুজ জল কেটে সাদা ফেনা তুলে যখন বোট চললো, তখন মনটাই ভরে গেলো।

বেশিদূর গেলো না, সামনেই আরেক বাজারমতো দোকানের সারিতে নৌকা জেটি করলো। আমরা ভাবলাম পথই বোধহয় শেষ, গাইড জানালো তেল নিতে থেমেছে বোট। ভাগ্য ভালো, এতো অল্প দূরত্বে জনপ্রতি পঞ্চাশ টাকা দিতে হলে সকালে পাঁচ হাজার টাকায় বোট নিয়ে বেরোনোই ভালো ছিল।

জানা গেল, এটা হলো পদ্মমুখ (স্থানাঙ্ক 21°45’36.49″N, 92°27’13.40″E) – নামটা শুনেছি আবু বকরের কাছে। এখানেই দোকানঘরগুলোর ছাউনিতে সবাই বিশ্রাম নিচ্ছিলাম, তখন এ’ – ও’ জিজ্ঞেস করতে লাগলো, কোত্থেকে এসেছি আমরা, যাচ্ছি কোথায়?

তাদেরকে সব বললে দেখা গেল তারা ঠিক খুশি হতে পারলেন না। অনেকক্ষণ এ নিয়ে বেশ কিছু ঘটনা ঘটে গেল, সারমর্ম হলো:

  • যে গাইড আমরা বাছাই করেছি, তাকে কেউই পছন্দ করছে না।
  • খইশামু আমাদেরকে আজকের ভিতরে হেঁটে নাফা খুম দেখাবার যে বর্ণনা করেছে, তা সম্ভব না।
  • সবচেয়ে চিন্তার কথা হলো, তারা সবাই-ই আমাদেরকে, খইশামুকে পরিত্যাগ করতে বলছে।

অকুল পাথারে পড়লাম!

(চলবে…)

-মঈনুল ইসলাম

পরের পর্ব »

২ thoughts on “অজানা লেকের অভিযানে বান্দরবান ২০১৩ : প্রথমাধ্যায় : পর্ব ৬

মন্তব্য করুন