অজানা লেকের অভিযানে বান্দরবান ২০১৩ : প্রথমাধ্যায় : পর্ব ৩

ধারাবাহিক:  অজানা লেকের অভিযানে বান্দরবান —এর একটি পর্ব

ভ্রমণের মাসখানেক আগে থেকে আমার আর বন্ধুদের দীর্ঘ অধ্যবসায়, ২০ ফেব্রুয়ারি রাত থেকে ৯জনের অবিরাম যাত্রা পথ, এবং শেষমেষ প্রধানমন্ত্রীর বান্দরবান আগমনহেতু আমাদের মূল উদ্দেশ্য বগালেক-রুমা-পথ বন্ধ থাকায় থানচির দিকে ১০জনের দলটার যাত্রার সিদ্ধান্তটা আমারই ছিল। থানচি যাবার পথ বন্ধ হয়ে যায় সন্ধ্যা ৬টায়, সূর্য অস্ত যায় সন্ধ্যা ৬টায়; আর আমরা যখন অনেক ঝামেলা উৎরিয়ে, ওংফু খিয়াং আর ড্রাইভার নাজমুলের (ছদ্মনাম) ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে একটা গাড়ি পেলাম, তখন সেই গাড়িই যাত্রা শুরু করলো সন্ধ্যা ৬টায়। অস্তমিত সূর্যের মতো আমাদের আশাও তখন ডুবে যেতে বসেছে এই বান্দরবানের পাহাড়ে ঝুপ করে নামা সন্ধ্যার আঁধারে।

গাড়ির ড্রাইভার সুজনের সাথে কথা বলেছি, বারবার একটা প্রশ্নই করেছি: সেনাবাহিনী কি আমাদেরকে ফিরিয়ে দিবে? যদি ফিরিয়ে দেয়, তাহলে আমও যাবে, ছালাও যাবে। সুজন আশা প্রকাশ করলেন, ফিরিয়ে দিবে না; কিন্তু তাঁর কণ্ঠের অনিশ্চয়তাটুকু তিনি ঢাকতে পারলেন না। ইফতি যখন তাঁকে ধীরে ধীরে গাড়ি চালানোর কথা বললো, তখন তিনি বললেন, “আস্তে আস্তে হবে আর্মি চেকপোস্ট পার হবার পরে… এর আগে না।” ড্রাইভার সুজন আমাদেরকে একটা মিথ্যা কথা শিখিয়ে দিলেন: নীলগিরি যেহেতু আর্মিদের, তাই বলবেন নীলগিরিতে যাচ্ছি। তাহলে ঝামেলা করবে না।

তাই সব চিন্তাকে খানিকটা সময়ের জন্য হলেও দূরে সরিয়ে রেখে বকেয়া নামাযগুলো আদায় করে নেয়া জরুরি মনে করলাম। অনেক বেশি কা’যা হয়ে গেছে, এটা খুবই অন্যায় পানির বোতল বের করে দ্রুতগতিতে এঁকেবেঁকে চলা গাড়ির দুলুনির সাথে মানিয়ে নিয়ে কোনো রকমে ওযুর শুধু ফরয আদায় করে ওযু সারলাম। এরপর ইশারায়, প্রথমে যোহরের দুই রাকা’ত, তারপর আসরের দুই রাকা’ত, এবং সবশেষে মাগরিবের তিন রাকা’ত ফরয কসর হিসেবে আদায় করলাম। এবারে কিছুটা প্রশান্তি নামলো পাহাড় জুড়ে… হৃদয় জুড়ে।

গাড়ি মিলনছড়ি ছাড়ালো। এদিকে রাসেল ছেলেটা অনবরত কথা বলে… বকবক বকবক করেই চলেছে দিবারা’র সাথে। মনের কত যে কথা জমিয়ে রেখেছে আল্লা’ মালুম। এই যন্ত্রণার সাথে যোগ হয়েছে শান্ত, তরুণ আর রাসেলের সিগারেট খাওয়ার মহোৎসব। পৃথিবীর এই একটা জিনিসকে আমি বড়ই ঘৃণা করি, কোনোভাবেই মেনে নিতে পারি না। খোলা চান্দের গাড়িতে বাতাসের তোড়ে শীত লাগার জোগাড় যেখানে, সেখানেও প্রাকৃতিক বাতাসকে গুলি করে মেরে সিগারেটের নিকোটিন এসে বিঁধতে লাগলো শরীরের সর্বত্র, আর নাকেতো অবশ্যই। এই অত্যাচার শেষ হতে না হতেই আবারো ধরালো ওরা সিগারেট। শেষ পর্যন্ত ইফতি বাধ্য হয়ে সিগারেট বন্ধ করতে বললো ওদেরকে। যাহোক, ওরা অন্তত আমাদের অনুভূতিকে সম্মান করলো। বন্ধ করলো সিগারেটের অত্যাচার।

অন্ধকার ঘিরে ধরছে আমাদেরকে। পাহাড়ি শীতল বাতাস এখন যেন গায়ে কাটা দিচ্ছে। ঠান্ডার অনুভূতি প্রকট হতে শুরু করলো কিছুক্ষণের মধ্যে। সবাইকেই শীত-পোষাক পরে নিতে এ’-ও’ স্মরণ করিয়ে দিতে লাগলো। ইফতি তো ক্লান্তি দূর করতে চাদর মুড়ি দিয়ে সীটের কোণায় বসে ঘুমেই তলিয়ে গেলো।

মনে মনে প্রার্থণা করতে থাকলাম আর্মির মনে যেন আল্লা’ দয়া ঢেলে দেন, তারা যেন আমাদেরকে ছেড়ে দেয়, ঝামেলা যেন না করে। একজন মুসলমান হিসেবে আমি বিশ্বাস করি আল্লাহ’র কাছে যা চাওয়া হয়, আল্লাহ তা দেন (তবে তিনপ্রকারে)

আঁকাবাঁকা, উঁচু নিচু পথ ধরে রোলার কোস্টারের মতো দ্রুত গতিতে দুটো হেড লাইটের আলোয় অন্ধকার চিরে সাঁইসাঁই করে চলেছে আমাদের খোলা গাড়িটা। এতো অপূর্ব কসরতে গাড়ি চালানো চাট্টিখানি কথা নয়। ড্রাইভারের পাশের সীটে বসে আছে প্রভা। ও আমাকে জানিয়েছে ওর অ্যাক্রোফোবিয়া (acrophobia), অর্থাৎ উচ্চতাভীতি আছে (টার্মটা ওর থেকেই শেখা) আমি তো শুনে থ’, তাহলে তুই সাকা হাফং এসেছিস কেন? সে জানায়, ভয়টা ভাঙাতে হবে না? …কে জানে, হয়তো সে সামনে বসে ভয়ের মধ্যে থ্রিল খুঁজছে।

অবশেষে একসময় গাড়ি চিম্বুকে পৌঁছালো (বান্দরবান সদর থেকে চিম্বুক সড়কপথে ২৪ কিলোমিটার)চিম্বুক আর্মি ক্যাম্পে রিপোর্ট করতে হবে। মনে মনে আল্লা-জপ চলছে আমার। মিথ্যা বলতে হবে? কেন যেন মন মানতে চাইছে না। একটা মিথ্যা হাজারটা সমস্যা নিয়ে আসে। ব্যারিকেডের ভিতরে গাড়ি দাঁড় করিয়ে ড্রাইভার নামলেন। ডাকলেন আমাদের একজনকে। কেন জানিনা এগিয়ে গেলাম আমিই (নেতা নাকি আমি?)আমাকে বললেন, মিথ্যা বলার দরকার নাই, যা সত্য সেটাই বলবেনশুনে আমি বড় আশ্বস্থ হলাম, মিথ্যা বলতে হবে ভেবে এতোক্ষণ বড়ই দুশ্চিন্তিত ছিলাম চেকপোস্টে একজন সৈনিক বসা, সামনের টেবিলে খাতা রাখা। এত রাতে গাড়ি এসেছে, খুব বিচলিত মনে হলো না তাকে। আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, কোথা থেকে এসেছেন? …বান্দরবান। …কোথায় যাবেন? …থানচি।

আমি খুব মাপামাপা উত্তর দিচ্ছিলাম, নিজেকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছিলাম, তুমি একজন মিসির আলী, দেয়ার ইয নাথিং ইন বিটউইন যিরো অ্যান্ড ওয়ানকারণ আমি নিজের কোনো বেফাঁশ কথার ফাঁদে আটকা পড়তে চাই না। তাছাড়া আর্মি বোধহয় একটু সরাসরি কথা বলাটাকে পছন্দ করে।

…এতো রাত করে কেন? …আমাদের বাসটা পথে একটা অ্যাক্সিডেন্ট করেছে, তাছাড়া মেঘনা-গোমতী সেতুতে কাজ চলছে বলে ঘুরপথে আসতে হয়েছে …ড্রাইভার কে? নাম কী? …জ্বি, সুজন। …ড্রাইভারের ফোন নাম্বার? …ফোন নাম্বার তো নেই; এই যে সুজন ভাই… সুজন ভাই এগিয়ে এসে বৃত্তান্ত বললেন। তাঁরও চাকা পাংচার হয়ে গিয়েছিল বলে দেরি হয়েছে জানালেন। (এটাও সত্যি কথা, উনি আমাকে আগেই বলেছেন)

খাতায় বৃত্তান্ত লিখে সৈনিক বললো, ঠিক আছে চলে যান। গাড়িতে এসে দেখি ওরা পেশাব করতে বেরিয়েছে সবাই। কিছুক্ষণ তাই রিল্যাক্স হতে চাইলাম। এমন সময় এক সৈনিক এগিয়ে এসে নিচুস্বরে বললো, “তাড়াতাড়ি চলে যান। নাহলে একটু পরে আপনাদেরকে যেতে দিবে না আর।”

সবগুলোকে আবারো খোয়াড়ে ভরার জন্য হাঁকডাক দিতে লাগলাম। এবং দ্রুতই আর্মি নামক কারাগার থেকে মুক্ত পাহাড়ে বেরিয়ে পড়লাম। এবার রাজ্যের প্রশান্তি এসে জমা হলো শরীরে। বেশ ঠান্ডা লাগতে লাগলো। শীতের কাপড়, মাথায় ক্যাপ পরে রীতিমতো এস্কিমো হয়ে গেলাম মুহূর্তের মধ্যে। আল্লাহ আমার ডাক শুনেছেন, আর্মি ঝামেলা করেনি বড় বাঁচা বেঁচেছি এযাত্রা।

রাতের অন্ধকারে প্রচন্ড গতিতে আইএসও সর্বোচ্চ করে তোলা ছবি। ঝাঁকুনির কারণে মান ভালো না হলেও আমাদের থ্রিলটা বোঝা যাবে: উইন্ডশিল্ড দিয়ে গাড়ির আলোয় দেখা রাস্তা। (ছবি: লেখক)
রাতের অন্ধকারে প্রচন্ড গতিতে আইএসও সর্বোচ্চ করে তোলা ছবি। ঝাঁকুনির কারণে মান ভালো না হলেও আমাদের থ্রিলটা বোঝা যাবে: উইন্ডশিল্ড দিয়ে গাড়ির আলোয় দেখা রাস্তা। (ছবি: লেখক)

এখন সবারই বড় আনন্দ লাগতে লাগলো, বুঝতে পারলাম বিপদ পেরিয়ে এসেছি আমরা। গাড়ির গতিও স্বাভাবিক করলেন সুজন ভাই। আর তখন সবাই-ই মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকলাম চারপাশে: শুক্লপক্কের চাঁদ তার সমস্ত সৌর্যবীর্য নিয়ে আলো করে আছে আদিগন্ত। ঐ আলোতে দেখা যাচ্ছে সারি সারি পাহাড়। আকাশ ভরা তারার চাদর যেনবা মিটমিট করে হাসছে আমাদের আনন্দে। প্রকৃতির বিশুদ্ধ বাতাসে বুক ভরে শ্বাস নিয়ে মনটা বলে উঠলো: বড় সুন্দর এই পৃথিবী! বড় সুন্দর এই বাংলাদেশ! বড় সুন্দর এই জীবনটা! আমি আরো বহু যুগ বাঁচতে চাই এদেশে।

এভাবে থানচির পথে রাতে গাড়ি ছুটিয়ে আর কোনো পর্যটক এর আগে যাত্রা করেছে কিনা জানি না, তবে এই দৃশ্য না দেখলে বর্ণনা করার ভাষা আমাদের নেই। কথাটা গাড়ির সবাইকে বললাম, সবাই একবাক্যে মেনে নিলো: এই সৌন্দর্য্য কাউকে বলে বোঝানো যাবে না। অপূর্ব! বড্ড বেশি সুন্দর! আর, অমোঘ তার আকর্ষণ।

বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সড়ক - Peak 69-এ গাড়ি থামিয়ে কার্বুরেটরে পানি দেয়ার দরকার পড়লো। (ছবি: দানিয়েল)
বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সড়ক – Peak 69-এ গাড়ি থামিয়ে কার্বুরেটরে পানি দেয়ার দরকার পড়লো। (ছবি: দানিয়েল)

পথে গাড়ি থামিয়ে সুজন ভাই যখন কার্বুরেটরে পানি দিচ্ছিলেন, তখন বগালেক থেকে ফেরার পথে কার্বুরেটরে পানি দেয়ার স্মৃতি মনে পড়ে গেল আমার আর নাকিবের। …চিম্বুকে যখন গাড়ি দাঁড় করানো ছিল, তখন সৈনিক জানতে চাইছিলেন, থানচিতে থাকবো কোথায়। আমি জানিয়েছিলাম, এখনও জানি না, গিয়ে ব্যবস্থা করতে হবে। তখন মাত্র এক ঘন্টা আগে পরিচিত এই সুজন ড্রাইভার বলছিলেন, তার ঘর বলিপাড়ায়, থানচির বেশ একটু আগে। তার ঘরে ব্যবস্থা করতে পারেন, কিন্তু এতোজন থাকাতো সম্ভব হবে না। পাহাড়ে আসার পর থেকে এদের এই দরদ দেখে যারপরনাই আরক্ত আমি। এরা এতো ভালো কেন?

অপূর্ব আঁকাবাঁকা পথ ধরে আমরা কিছুক্ষণ পরে পার করলাম নীলগিরি। নীলগিরির সামনের রাস্তাটাই চলে গেছে থানচির দিকে। পাহাড়ের উপরে আলোকিত নীলগিরি’র পাশ কাটাতে আমার তেমন কষ্ট হলো না, কারণ আমি আগে একবার ঘুরে গেছি। জানিনা বাকিদের কী অবস্থা।

সামনে আরো অনেকটা পথ হয়তো। জানিনা থানচি কতদূর। কে একজন বললো সবাই একটা করে কৌতুক বলি। দেখা গেলো সর্বকনিষ্ঠদের একজন আবির কৌতুক বলতে বেশ উৎসাহী। কিন্তু যে কৌতুকটা সে বললো, সেটা অশ্লীলতার মাত্রা ছাড়িয়ে উড়াল দিলো আকাশে দিবারাহ তো বলেই উঠলো, ইশ্‌, মনটা নর্দমার ভিতরে ডুবানো একেকজনের। সবাই-ই হাসলাম, তবে কৌতুকের রসে না, বরং এই পরিবেশে এই চরম অশ্লীল একটা কৌতুকের অবতারণা করায় আবিরের কর্মকান্ডে।

হাসি-তামাশা-ঠাট্টা করতে করতে সময় চলতে থাকলো। রাত সাড়ে আটটা নাগাদ গাড়ি গিয়ে থামলো কোনো এক স্থানে। সামনে একটা বাঁশের বেরিক্যাডড্রাইভার নিজে গিয়ে বেরিক্যাড তুলে গাড়ি সামনে নিয়ে আবার নিজেই নামিয়ে রাখলো। বিষয়টা নিয়ে সবাই-ই বেশ হাসাহাসি করলাম: এটা কেমন বেরিক্যাড! নিজেই পথ পরিষ্কার করে এগোতে হচ্ছে।

অনেকক্ষণ ড্রাইভার উধাও। তারপর কোথা থেকে ফিরে এসে ডাকলো কাউকে। স্বভাবতই এগিয়ে গেলাম আমি (হয়তো বাকিরা একজনের কাঁধে দায়িত্ব দিতে আগ্রহী) এগিয়ে জানলাম এটা বলিপাড়া বিজিবি ক্যাম্প (প্রাক্তন বিডিআর)টিলার উপরে চেকপোস্টে তিনজন জোয়ান। এগিয়ে গিয়ে কথা বললাম।

আমার পাশে আমাদের ড্রাইভার সুজন দাঁড়িয়ে, দাঁড়িয়ে আরো দুজনও। পরে জানলাম ওরা ফিরছে থানচি থেকে, যাবে বান্দরবান। ওরা গিয়েছিল বড় পাথর এলাকায়, সেখানে বন্ধু একজন পা মচকে ফেলেছে। সেটাকে পা ভেঙেছে মর্মে চালিয়ে দিতে চাইছে তারা। তাদের বিশেষ আর্জেন্সি দেখিয়ে তারা অনুমতি চাইছে। কিন্তু অফিসার অনুমতি দিতে নারাজ

আমাকে দেখে জিজ্ঞেস করলো অফিসার: আপনাদের সাথে মেয়ে আছে? …জ্বি। …মেয়ে কার কী হয়? …জ্বি, আমাদের ফ্রেন্ড হয়। …সবাই কি ফ্রেন্ড? …জ্বি স্যার। (আমি ‘স্যার’ ‘স্যার’ বলে কথা বলছি, যাতে আয়েব ধরতে না পারে এই তুচ্ছ অফিসারও) …এতোগুলো ছেলে, আর সাথে একটা মেয়ে নিয়ে…; ঐ মেয়ের হাযবেন্ড সাথে আছেন বা কোনো গার্জিয়ান? …জ্বি না, ওর বিয়ে হয়নি। …এভাবে তো তাহলে পার্মিশন দেয়া যাবে না। (আমার মুখে দাড়ি আছে দেখে বলে বসলো) আপনে কি মুসলমান? ও, আপনে তো মোল্লা। মোল্লা মানুষ জানেন না সাথে বেগানা মহিলা নিয়া ঘুরাঘুরি করা যায় না? (আমি খুবই অপমানিত বোধ করলামদাড়ি আছে বলে এভাবে ‘মোল্লা’ সম্বোধনটা জীবনে কখনও শুনতে হয়নি। তবু শীতল থাকলাম, মুখে ধরে রাখলাম কষ্টের হাসি। আমার এখন যে-করেই হোক পার্মিশন দরকার।)

আমাকে উত্তর দিতে হবে, তারা উত্তর আশা করছে। বললাম: …দেখুন এটা আমি জানি। কিন্তু এটা কে কাকে বোঝাবে? আমি কী করে বলবো, সাথে মেয়ে আছে, আমি যাবো না? ঢাকায় সিচুয়্যেশানটা একটু ভিন্ন।

তবু তারা বিষয়টা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারলো না। আমাকে ফিরিস্তি দিতে শুরু করলো কবে কখন থানচিতে এভাবে বন্ধুবান্ধবী পরিচয় দিয়ে একটা মেয়ে নিয়ে এসে রাতে কুকর্মে লিপ্ত হয়ে গিয়েছিল তারা। পরে সবগুলোকে ধরে মামলা দিয়েছিল বিজিবি। এভাবে তো একটা মেয়ে মানুষকে সাথে নিয়ে এতোগুলো ছেলেকে পার্মিশন দেয়া যাবে না। আপনারা এখানে বলিপাড়ায় থাকেন, এখানে রেস্টহাউয আছে, রাতে থাকেন, সকালে উঠে চলে যাবেন।

আমি তো নাছোড়বান্দা, এভাবে থাকলে সবকিছু ভজকট পাকিয়ে যাবে। আমি অত্যন্ত বিনয়ের সাথে বললাম, স্যার, উইথ ড্যু রেসপেক্ট আমি একটু বলার অনুমতি চাচ্ছি বলে বললাম কিভাবে রাস্তায় দেরি হয়েছে, কিভাবে দুর্ঘটনা ঘটেছে, কিভাবে রুমা বাদ দিয়ে থানচির পথ ধরেছি, এবং এখন সুজন ড্রাইভারকে থানচি পর্যন্ত ভাড়া করেছি, তাকে অ্যাভেইল না করলে বান্দরবানে অতো খরচ দিয়ে থাকা ঝামেলা হয়ে যেত।

আমার আবদার শুনে অফিসার মোবাইল ফোন তুলে নিলো, উর্ধ্বতন অফিসারকে ফোন করলো, একটু দূরে গিয়ে কথা বললেও আমি কান পেতে থাকলাম: স্যার, এখানে দুটা গাড়ি এসেছে [আরো কিছু]… একটাতে ৯জন ছেলে আর ১টা মেয়ে [আরো কিছু]… এত রাতে [আরো কিছু]…ফিরে এলো মুখে মৃদু হাসি নিয়ে, হাসিটা বড়ই কুৎসিত, কীসব অশ্লীল বিষয় তারা তিনজন চিন্তা করছে আল্লাই মালুম। এসে জানালো স্যার আসছেনআপনাদের ব্যাপারে স্যারই ডিসিশন নিবেন। এভাবে আপনাদের পার্মিশন দেয়া যাবে না।

আমি তবু চাপাচাপি চালিয়ে যেতে থাকলাম। এবারে প্রশ্ন এলো আপনি কী করেন? …জ্বি আমি আইটি প্রফেশনাল, একটা আইটি ফার্মে আছি। …বাকিরা কে কী করে? …একজন আছে রিসার্চ ফার্মে, আরেকজন… …দেখি সবাইকে ডাকেন। সবার নাম-ঠিকানা নিতে হবে। গার্জিয়ানের সাথে কথা না বলে এভাবে পার্মিশন দেয়া যাবে না।

আমি নিচে চলে গেলাম। গাড়ির কাছে গিয়ে হাঁক দিলাম, সবাই নিচে নেমে এলে কুইক একটা ব্রিফ দিলাম: দিবারাহ-কে নিয়ে প্রবলেম। আমি বলেছি ও’ আমাদের ফ্রেন্ড। আমরা সবাই-ই সত্য কথা বলবো। বাড়তি কোনো কথা কেউ বলবো না। কুইক! মূভ!

এমন সময় পাশে একটু তফাতে দাঁড়ানো দানিয়েল মোবাইল টিপতে টিপতে এগিয়ে এলো, কী হয়েছে? কী বলতে হবে? আমার কেন জানিনা খুব মেজাজ খারাপ হলো। মুখের উপর বলে দিলাম এতক্ষণ কই ছিলা? মোবাইল বন্ধ করো। নিজের এমন আচরণে নিজেরই লজ্জা পাওয়া উচিত, কিন্তু তখন কেন জানিনা এটাকেই উপযুক্ত আচরণ মনে হচ্ছিলো। (দানিয়েল, আই অ্যাম ভেরি স্যরি, ব্রাদার, ইউ নো দ্যা সিচ্যুয়েশান ওয়ায লাইক দ্যাট স্ট্রিক্ট অ্যান্ড ক্রুয়েল)

উপরে উঠার পরে শুরু হলো দিবারাহ’র রিমান্ড। ওকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছি আমরা ড্রাইভারসহ ১০জন। …আপনি, এভাবে এতগুলো ছেলের সাথে এতো রাতে এইসব পাহাড়-জঙ্গলে কেন? আপনার গার্জিয়ানের পার্মিশন লাগবে। আপনার কোনো গার্জিয়ানের সাথে কথা বলতে হবে।

আমি ভেবেছিলাম, যাক এখন বিষয়টার সহজ নিষ্পত্তি হবে, দিবারাহ ওর বাবা-মা’র সাথে কথা বলিয়ে দিলেই তাঁরা পার্মিশন জানালে বিজিবি ঝামেলা করার আর কিছুই পাবে না। কিন্তু দিবারাহ যা বললো… শুনে আমার মাথা ঘুরতে থাকলো: আমার বাবা-মা কেউ এখানে থাকেন না, তাঁরা এ্যামেরিকায় থাকেন।

“খোদা আমারে উডায়া নাও, নাইলে দড়ি ফালাও, বায়া উডি যাই!” *

(চলবে…)

-মঈনুল ইসলাম


পরের পর্ব »

_________________________________

* এরকম নামের একটা ফেসবুক পেজ^ থেকে ধার করা।

মন্তব্য করুন