অজানা লেকের অভিযানে বান্দরবান ২০১৩ : প্রথমাধ্যায় : পর্ব ২

ধারাবাহিক:  অজানা লেকের অভিযানে বান্দরবান —এর একটি পর্ব

শহীদ দিবস-আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস-একুশে ফেব্রুয়ারি-সাপ্তাহিক ছুটির দিন, সেদিকে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপও নেই: আমরা ১৪জনের তিনটে দল একত্রে একটা মোটামুটি ধাঁচের বাসে করে চলেছি বান্দরবান, উদ্দেশ্য রুমা হয়ে বগা লেক এবং সাকা হাফং: কিন্তু প্রধানমন্ত্রী বান্দরবান যাবেন বলে রুমা-বগা বন্ধ করে দেয়ায় বিকল্প পরিকল্পনা করতে হলো মুহূর্তের মধ্যে এদিকে ড্রাইভার ব্যাটা মিসাইলের গতিতে গাড়ি চালাচ্ছে, চিৎকার করে বলেও তাকে নিরস্ত করা যাচ্ছে না; সে আসলে দুর্ঘটনা-কবলিত এলাকা দ্রুত পেরিয়ে পালিয়ে যেতে চাইছে।

আমাদের লক্ষ্য এবার থানচি

যাহোক বিকল্প পরিকল্পনায় ঠিক করলাম, রুমা বন্ধ থাকলে আমরা থানচি যাবো:

সাকা-দল থানচি থেকে সাকার দিকে পথ চলবে; আর বগা-দল থানচি বাজারে থেকে বার্বিকিউ করে মজা করে ফিরতি পথ ধরবে।

থানচির একটা ভাসা ভাসা পরিকল্পনা আমরা প্রথমদিকটায় করেছিলাম সাকা সামিটের জন্য, কিন্তু ভালো গাইড পাওয়া যাবে না বলে সে পরিকল্পনা বাতিল করা হয়েছিল। এবারে সেই পরিকল্পনাকেই প্রধান পরিকল্পনা বানানোর সিদ্ধান্ত নিলাম। কিন্তু থানচির ব্যাপারে কোনো প্রস্তুতিই ছিল না, তাই ফোন করলাম সাজ্জাদকে (সময় ১৫:১৪); সেও থানচি যাওয়াকে সমর্থন করলো ঢাকায় সে দ্রুততার সাথে এটা-ওটা খুঁজেও হারিয়ে যাওয়া মোবাইল নাম্বারগুলো উদ্ধার করতে পারলো না, শেষ পর্যন্ত রইলো আবু বকর। আবু বকরকে ফোন করতে যাবো, এমন সময়…

চারপাশে হই হল্লা, চিৎকার-চেঁচামেচি, “গাড়ি থামা”, “সাইড কর” রবে চিল্লাচিল্লি। ঘটনা বুঝতে বেশিক্ষণ লাগলো না: আক্রান্ত গাড়ির আশেপাশের লোকজন ফোন করে এই বাজারের কাউকে গাড়ির বিবরণ দিয়েছে এবং সেই বিবরণ অনুযায়ী আটক করা হয়েছে আমাদের দুর্ঘটনার কারিগর বাসটাকে। বাস যা করেছে অন্যায় করেছে, তাতে দ্বিতীয়বার চিন্তার কিছু নেই, কিন্তু আমরাও তো কোনো দোষ করিনি! আমাদের বাঁধাধরা সময় এবারে যেন বন্যার পানির মতো ধুয়ে যেতে লাগলো।

সিএনজি’র লোকজন আহত হয়েছেন, কোনো মৃত্যু ঘটেনি শুনে আশ্বস্থ হলাম; কিন্তু কোনোভাবেই স্থানীয়দেরকে বলে কয়েও গাড়ি ছাড়ানো গেলো না। ৳৬৭০ [টাকায়] বান্দরবান পর্যন্ত ঠিক করা গাড়ি থেকে আমাদের বাক্সপেটরা সম্বল নিয়ে নেমে যেতে হলো অজানা এক স্থানে: পটিয়া’য়।

এখানে আমরা চাইলাম সরাসরি থানচি পর্যন্ত কোনো গাড়ি ভাড়া করতে, কিন্তু ড্রাইভারদের সাথে কথা বলে তাজ্জব হয়ে গেলাম, কারণ কেউ ‘থানচি’ নামের কোনো জায়গাই চিনে না। এদিকে এখানে তৃতীয় দলের একজন মেয়েকে বেশ সক্রীয় দেখা গেলো; সে এগাড়ি-ওগাড়ি খুঁজে চলেছে, কোনো গাড়ি দিয়ে হলেও দ্রুত বান্দরবান যেতে চায় সে। এই দলটার এই অতিরিক্ত লাফালাফিতে কিছুটা বিরক্ত হলেও তাদের উদ্যোগটাতে সমর্থন ছিলো সবারই। ঐ মেয়েই দেখা গেলো অগ্রণী হয়ে, দলের আরেকটা মেয়ে আর দুটো ছেলেকে ডিঙিয়ে একটা গাড়িভাড়া করে ফেললো। সবাই যখন উঠে পড়লাম গাড়িতে আমি বিষয়টা পরিষ্কার করে ড্রাইভারের কাছে বুঝতে গেলে শুনি, গাড়ি যাবে কেরাণীরহাট পর্যন্ত, তার মধ্যে চাইছে ৳২,৫০০ রিযার্ভ ভাড়া। মাথা পুর্‌রাই নষ্ট!

সাথে সাথে নেমে গেলাম গাড়ি থেকে। এবারে দেখা গেলো তৃতীয় দলটা ওদিকে গিয়ে কী কানাঘুষা করছে। নাকিব আর রাসেলকে পাঠানো হলো হাইএস গাড়ি ভাড়া করা যায় কিনা দেখতে — সেও রিকশা-দূরত্বে গিয়ে ব্যর্থ হয়ে আসা ছাড়া কোনো আশাপ্রদ কিছু হলো না আমি এগিয়ে গেলাম তিনচাকার ম্যাক্সি ঘরাণার চান্দের গাড়ির দিকে। ওরাও ৳১,৮০০ [টাকা] রিযার্ভ যেতে চাইলো, তবে ঐ কেরাণীরহাট পর্যন্ত; কারণ বান্দরবান শহরে একজন ট্রাফিক সার্জেন্ট আছে, যে বাইরের, অননুমোদিত কোনো গাড়ি ঢুকলেই ফাইন করে দেয় (কিংবা নিজের পকেট ভরে নেয়) কিন্তু বন্ধু ইফতি এই বান্দরবানের পাহাড়ি পথে কোনোভাবেই এজাতীয় ত্রিচক্রযানে ঝুঁকি নিতে চাইলো না। এদিকে একজন লাইনম্যান আমাদেরকে অনেকক্ষণ ধরে পর্যবেক্ষণ করছেন, তিনি এগিয়ে এসে মধ্যস্থতা করতে চাইলেন। কিন্তু খুব একটা ফায়দা হলো না। “লাইনম্যান” হলো বিভিন্ন পার্কিং পয়েন্টে কিংবা ম্যাক্সি-চান্দের গাড়ির স্ট্যান্ডে গাড়ির লাইন ঠিক করার কাজে নিয়োজিত ব্যক্তি।

ওদিকে তৃতীয় দলটা তাদের নিজেদের পরামর্শ শেষ করে এসে জানালো, তারা কক্সবাজার চলে যাচ্ছে। ব্যস, দলে রইলাম আমরা ১০জন। এবারে লাইনম্যানই একটা গাড়ির ব্যবস্থা করে দিলেন: চার চাকার ছোট ম্যাক্সি ঘরাণার গাড়ি, বান্দরবান (স্থানীয়রা বলে বাঁদরবান) পর্যন্ত যাবে, রিযার্ভ ভাড়া ৳১,২০০ [টাকা] ড্রাইভার এর আগে কখনও বান্দরবান যায়নি, তবে হেল্পার গেছে। বাক্স-পেটরা গুছিয়ে উঠে পড়লাম ১০জনের দলটি: পিছনে ৯জন, ড্রাইভারের পাশে ১জন। থানচি পর্যন্ত আমাদের ১০জনের এই দলটা এখন ১টাই দল।

আমাদের ১০জনের পরিচিতিটা এবারে দেয়া যাক:

  1. আমি (ডাকনাম: নয়ন) : নিজের ব্লগে নিজের ঢোল তো পেটাবোই, একটু রয়েসয়ে
  2. জাহিদুল হক রাসেল : সফ্‌টওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, আমার প্রাক্তন সহকর্মী, একটু বেশিই ভ্রমণচণ্ডী (!)
  3. সৈয়দ নাকিব আহমেদ : রিসার্চ ফার্মের অ্যাকাউন্ট্‌স অফিসার, গিটারিস্ট, আমার বাল্যবন্ধু
  4. আতিকুর রহমান হলি (ইফতি) : আলিকো’র ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাসোসিয়েট, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট ফার্ম NilHouse-এর চেয়ারম্যান, আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের বন্ধু
  5. তানভির মোকাম্মেল প্রভা : কেরাণীগঞ্জের ভদ্র-ক্ষেপাটে ছেলে, যাকে আমি তার নামের কারণে মেয়ে সম্বোধন করে সম্ভ্রমহানী (?) করে ফেলেছিলাম ফেসবুকে (:p); পেশায় ছাত্র।
  6. আজিজুল কাদির (আবির) : নাকিবের সহকর্মী, পূর্ণকালীন ইনটার্ন এসোসিয়েট; এই বয়সেই তার অবসর বলে কিছু নেই (নিজের মোবাইল ফোনের চার্জারটা থাকে অফিসেই, কারণ সেখানেই বেশিক্ষণ থাকে বাসার চেয়ে)
  7. দিবারাহ মাহবুব : নাকিবের সহকর্মী, খন্ডকালীন ইনটার্ন এসোসিয়েট (দলের একমাত্র নারী সদস্য)এছাড়া দি ডেইলী স্টারে প্রদায়ক হিসেবে কাজ করে।
  8. কামরুল হাসান (শান্ত) : মার্চেন্ডাইযিং অ্যান্ড নিট ফ্যাক্টরিতে কর্মরত, অবসরপ্রাপ্ত কবি মানুষ; সাথে একটা গীটারও আছে।
  9. আহমেদ দানিয়েল চৌধুরী : মার্চেন্ডাইযিং অ্যান্ড নিট ফ্যাক্টরিতে কর্মরত, নীরবতা-প্রিয় মানুষ (দলের একমাত্র বিবাহীত ব্যক্তি)। এবং
  10. মাহমুদ আল ফয়সাল (তরুণ) : মার্চেন্ডাইযিং অ্যান্ড নিট ফ্যাক্টরিতে কর্মরত, রাফ-অ্যান্ড-টাফ ছেলে(বাস ছাড়ার ঘন্টাখানেক আগে দশ মিনিটের নোটিশে দলে ভিড়েছে)

দলের মধ্যে সবচেয়ে কমবয়সী হলো আবির, দিবারাহ আর প্রভা।

 

গাড়ি চলছে বান্দরবানের উদ্দেশ্যে, সামনে কতটা পথ, কতক্ষণ লাগবে জানিনা কেউই। আবু বকর জানালেন এখন আর থানচির বাস পাবেন না, থানচিগামী প্রথম বাস সকাল ৮:৩০। তিনি আমাদেরকে ওংফু খিয়াং-এর একটা মোবাইল নাম্বার দিয়ে বললেন, তাঁকে ফোন দিলে উনি কোনো সহায়তা করতে পারেন হয়তো (সময় ১৫:৪৬) একজন মানুষ তার আন্তরিকতা যে শত মাইল দূর থেকে শ্রেফ ফোনালাপেও দেখাতে পারে, তার প্রথম উদাহরণ ওংফু খিয়াং। তিনি যে পাহাড়ি মানুষ, সে তাঁর নাম শুনেই বোঝা যাচ্ছে, অত্যন্ত আন্তরিকভাবে তিনি জানালেন, কী করা যায় দেখছেন তিনি। থানচির পরিচিত গাড়িটা এইমাত্র থানচিতে পৌঁছে গেছে, তিনি চেষ্টা করবেন।

এবারে তিনিই ফোন দিলেন (সময় ১৬:০৮): বান্দরবান চান্দের গাড়ি স্ট্যান্ডে নাজমুল ড্রাইভারকে (ছদ্মনাম) খুঁজতে হবে এবং তাকে নির্দিষ্ট একটা কথা বলতে হবে। সম্ভব হলে উনিই ব্যবস্থা একটা করে দিবেন। কোনো ফোন নাম্বার পাওয়া গেল না। আরেকটা দুঃসংবাদও জানালেন তিনি, সন্ধ্যা ৫টার পরে থানচি সড়ক বন্ধ করে দেয় সেনাবাহিনী। মোবাইলের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে নিজেদের ধীরগতির গাড়িটাকে সম্মানজনক ভর্ৎসনা দিয়ে ওংফু খিয়াংকে ধন্যবাদ জানিয়ে অপেক্ষা করতে থাকলাম। সবাই যখন আশপাশের দৃশ্য উপভোগ করে পথ চলছে, আমার মাথার ভিতরে তখন আইনস্টাইনের থিওরি অফ রিলেটিভিটির হিসাব নিকাশ চলছে: যেনবা প্রতিটা মুহূর্ত একটা আরেকটার সাথে আপেক্ষিকতার সুতায় বড্ড বেশি লেপ্টে আছে।

অবস্থা হালকা করতে চাইলো শান্ত: একটা ম্যাংগো বার খেয়ে খালি প্যাকেটটা সুন্দর করে গুছিয়ে আমাকে বাড়িয়ে দিয়ে বললো, বন্ধু তোমার জন্য, এতো কষ্ট করছো, একটা কামড় দাও। আমি মানা করতে থাকলে সে বেশ জোর করেই গছিয়ে দিল। হাতে নিতেই পড়লো হাসির রোল। ই ইক্যুয়েলটু এমসি স্কয়্যার খানিকটা সময়ের জন্য হলেও গাঁট ছাড়লো। ইফতি তখন নিজেই স্পন্সর হয়ে সাথে করে আনা কমলা সবাইকে একটা করে খেতে দিলো।

গাড়ি হঠাৎ থেমে গেলো। এবারে হেল্পার গিয়ে সামনে বসলো, কারণ ড্রাইভার পথ চিনে না। প্রভা এতক্ষণ সামনে ছিল, সে পিছনে এসে রাসেলকে পাঠালো সামনে। রাসেলের বাবা বান্দরবান মৃত্তিকা গবেষণা ইন্সটিটিউটের বড় কর্মকর্তা ছিলেন, তাই তার ছোটবেলা কেটেছে এই পাহাড়ে দস্যিপনা করে – পথঘাট এদিকে তার ভালোই আয়ত্ব আছে।

আমাদের গাড়িটাও এক্কেবারে বান্দরবান সদরে যাবে না, সেখানকার মূর্তিমান আতঙ্ক ঐ ট্রাফিক সার্জেন্টের ভয়ে। তাই গাড়িটা আমাদেরকে নামিয়ে দিলো বান্দরবানের শেষ গভীর ঢালু রাস্তার আগেইড্রাইভার একটু বেশি ভাড়া চাইলে [৳৩০ [টাকা] অতিরিক্ত দিয়ে] ৳১,২৩০ [টাকায়] নিস্পত্তি করা হলো। ঘড়ি তখন বলছে ১৭:০০; আমি তবু আশা ছাড়লাম না, সবাইকে পিছনে রেখে পিঠে বিশাল একটা ব্যাগ নিয়ে বেশ দ্রুতগতিতে ছুটে চললাম সদরের দিকে। সেখানে গিয়ে সবাইকে জিজ্ঞেস করে বান্দরবানের চান্দের গাড়ির স্ট্যান্ডে গিয়ে খোঁজ করতে থাকলাম ড্রাইভার নাজমুলের একে-ওকে বলে তাঁর ফোন নাম্বার জোগাড় ফোন দিলাম।

আমি যখন গাড়ির ধান্ধায় ব্যস্ত, এই ফুল-ঝাড়ু শুকানোর দৃশ্যটা তখন ড্যানি'র চোখ এড়ায়নি। (ছবি: দানিয়েল)
আমি যখন গাড়ির ধান্ধায় ব্যস্ত, এই ফুল-ঝাড়ু শুকানোর দৃশ্যটা তখন ড্যানি’র চোখ এড়ায়নি। (ছবি: দানিয়েল)

ওদিকে নাকিব, পরিচিত একজনের সাথে দেখা করে গাড়ির ব্যবস্থা করার চেষ্টা করলো; কিন্তু ব্যর্থ মনোরথ এদিকে বেশ কিছুটা সময় অতিবাহিত হলে দেখা করলাম আমি ড্রাইভার নাজমুলের সাথে (সময় ১৭:২৩) দলের বাকিদের সাথে দেখা হলো (সারারাত পথে পথে থেকে সবাই পুরোপুরি বিধ্বস্থ: সবাই-ই আজ রাতে বান্দরবান থেকে যাবার পক্ষে মত দিচ্ছে; তাই), ওদেরকে আলাদা আলাদা হয়ে বিভিন্ন হোটেলে থাকার ব্যবস্থা করতে বেরিয়ে পড়তে বললাম; যদিও জানি এখন পীক সিযনে বান্দরবানের হোটেল ভাড়া হয়ে গেছে তিনগুণ।

নাজমুলের নিজের একটা গাড়ি আছে, হুড লাগানো- আবদ্ধ, ছোট গাড়ি, ল্যান্ড ক্রুযার ঘরাণার; কিন্তু ব্যাগসহ ১০জন এই পাহাড়ি পথে টানা সম্ভব না তাঁর পক্ষে। পাশেই আরেকজন ড্রাইভার এই সুযোগে আমাকে ৳৮,০০০ জানিয়ে দিতে সুযোগ ছাড়লো না। ড্রাইভার নাজমুল তখন কিভাবে যেন আমাদের অবস্থা আঁচ করে ফেললো। আন্তরিকতার শেষ নেই; আমাকে জানালো: আমি দেখি একটা গাড়ির ব্যবস্থা করা যায় কিনা; আপনি আমার সঙ্গে আসবেন না, নাহলে ভাড়া বাড়িয়ে দিবে। ৬টার আগে না গেলে তো থানচির পথ বন্ধ হয়ে যাবে; আমি দেখি কী করা যায়।

ড্রাইভার নাজমুলকে গাড়ির ধান্দায় লাগিয়ে আমি চললাম প্রেস ক্লাব অভিমুখে, ওরা সবাই ওদিকে আছে। খুব দ্রুত ঘটে গেলো বেশ গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাটা। ড্রাইভার নাজমুল জানালো, একটা গাড়ি পাওয়া গেছে, ৳৬,৫০০ দিতে হবে; আমি ফোন কেটে নাকিব আর রাসেলকে ফোন করে পরামর্শ করলাম, কোনো হোটেল খালি নেই, তাই তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিলাম (যা আমার জীবনে বিরল): নাজমুলকে ফোন দিয়ে গাড়ি নিশ্চিত করে জানালাম প্রেসক্লাবের সামনে চলে আসতে।

ওদিকে নাকিবকে ফোন দিয়ে শুনি ওরা সবাই খেতে বসে গেছে, না খেলে ওদের আর চলছে না: নাকিব আবার গতকাল দুপুর থেকেই প্রায় না-খাওয়া। ওদের অবস্থাও বুঝতে পারছি, আবার এদিককার তাড়াহুড়াও উপেক্ষা করতে পারছি না (ঘড়ির দিকে তাকালাম ১৭:৩৬) গাড়ি তার মাল খালাস করে প্রেসক্লাবে আসতে আসতে যতটুকু সময়, নাকিবরা ততক্ষণে পেটপূঁজো করে নিচ্ছে। টেনশনের উত্তেজনায় আমার ক্ষিধা পালিয়েছে, আর বন্ধু নাজমুর রশিদের বাসায় সকালের নাস্তাটা উচ্চমানের হওয়ায় আমি খাওয়া থেকে বিরত থাকলাম। প্রেসক্লাবের সামনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষার প্রহর গুণছিলাম আর থিওরি অফ রিলেটিভিটিকে স্মরণ করছিলাম।

যোহরের নামায কাযা হয়ে গেছে, আসরের নামায কাযা হয়ে যাচ্ছে, মাগরিবের আযান হতে আর মাত্র ১৫ মিনিট বাকি: কিন্তু জায়গা ছাড়তে পারছি না, যদি গাড়ি এসে কাউকে না পেয়ে ফিরে যায়! সফরে থাকলে সংক্ষিপ্ত নামাযের (কসর নামায) নির্দেশ আছে, এছাড়া কঠিন অবস্থাদৃষ্টে একাধিক ওয়াক্ত একসাথে পড়ার ব্যাপারেও ওলামাদের ঐক্যমত্য আছে বিধায় নিজেকে সেই স্লটে ফেলে ঈশ্বরের কাছে ক্ষমা চাওয়া ছাড়া আর করার কিছুই ছিল না।

ঘড়িতে ১৭:৪৫, গাড়ি হাজির; ড্রাইভার নাজমুল নিজে এসে গাড়ি বুঝিয়ে দিয়ে গেলেন। তাঁর আন্তরিকতায় মুগ্ধ এবং বিস্মিত, কিন্তু এই আন্তরিকতার কোনো বিনিময় হয় না, আমি অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে ধন্যবাদ এবং দোয়া করা ছাড়া আর কিছুই করতে পারলাম না। বিদায় নিলাম তাঁর থেকে। …আমাদের এই গাড়ির ড্রাইভারের নাম সুজন।

কিন্তু ওদিকে খাওয়া-দাওয়া আর শেষ হয় না ওদের, ‘এইতো শেষ’, ‘এইতো বিল দিচ্ছি’, ‘এইতো বেরিয়ে পড়েছি’ — এভাবে ঘড়িতে সময় গড়িয়ে ১৭:৫০। গাড়িকে আরেকটু এগিয়ে নিয়ে গেলাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে, ওখানেই কোথাও খাচ্ছে ওরা। ফোন দিয়ে অবস্থান জানালাম নাকিবকে। দেখি দলছুট হয়ে বেরোতে থাকলো ওরা, চারজন আসে তো বাকিরা গায়েব, রাসেল দেখি প্রেসক্লাবের দিকে যাচ্ছে, রাসেলকে পেলাম তো শান্তরা তিনজন গায়েব: পিঠে বিশাল ব্যাগ আর পেটের সামনে ক্যামেরার বড় ব্যাগটা নিয়েই ৫০০ মিটার স্প্রিন্ট লাগালাম বান্দরবান জুড়ে। ছন্নছাড়া মেষের পালকে যেমন রাখাল একত্র করে খোয়াড়ে নিয়ে যায়, সেভাবেই সবাইকে নিয়ে যখন গাড়িতে উঠলাম, ঘড়িতে তখন কাটায় কাটায় ১৮:০০।

সন্ধ্যা ৬টা – কানে প্রতিধ্বনি করছে একটাই কথা – “থানচির পথ ৬টার সময় বন্ধ!” “বন্ধ!” “বন্ধ!” “বন্ধ!”

(চলবে…)

-মঈনুল ইসলাম

দ্রষ্টব্য: পরপর দুটো পর্ব কোনো সিগনিফিক্যান্ট ছবি ছাড়া দেয়াতে আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত। শুধু এতোটুকু আশ্বস্থ করতে চাই: পর্বগুলো যত সামনে অগ্রসর হবে ছবিগুলো তত সুন্দর হবে এবং আপনাদের মন ভরাবেই ইনশাল্লাহ। তাই অপেক্ষনং অপেক্ষং তপঃ। 🙂

পরের পর্ব »

nanodesigns

মন্তব্য করুন