ইংরেজিভীতি থেকে ইংরেজিপ্রীতি : ভাষা দেখা

আমরা দেখেছিলাম, ভাষাশিক্ষার জন্য ব্যাকরণ হচ্ছে সবচেয়ে পরের জিনিস। আর লুবাব সাহেবের অন্তর্দৃষ্টি অনুসারে ভাষা শিক্ষার প্রথম ধাপ হচ্ছে “ভাষা দেখা”। আজ আমরা এই প্রথম ধাপ নিয়েই আলোচনা করছি:

ফার্মেসি থেকে একটা ঔষধ কিনে এনেছেন। ঔষধের প্যাকেটের ভিতরে একটা কাগজ আছে, সেখানে সবকিছু বিস্তারিত লেখা আছে। আপনি আগ্রহভরে কাগজটা বের করেছেন – পড়ে, বুঝবেন বলে। কিন্তু কী করলেন? কাগজটা হাতে নিয়েই উল্টে, যে পাশে বাংলায় লেখা আছে, সেই পাশটা বের করলেন, পড়তে শুরু করলেন।

কেন?

আপনি কি পড়ালেখা করেননি? আপনি কি ইংরেজি, বানান করে করে পড়তে পারেন না? ক্লাস ফাইভের একটা বাচ্চাওতো ইংরেজি পড়তে পারে, আপনি কেন পড়লেন না?

কারণ, আপনি ইংরেজিকে ভয় পান। সেকারণে ইংরেজিকে আপনি এড়িয়ে চলেন। আমি বলছি, আপনি ইংরেজি দেখলে তাকানও না।

এর মানে কী? এর মানে, আপনি ইংরেজি দেখছেন না। আপনি ভাষা শিক্ষার পথে প্রথম সহজ ধাপেই অন্তরায় সৃষ্টি করছেন। ভাষাশিক্ষা আপনার জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে দিনের পর দিন।

ঘটনা ১:

আমার এক সহকর্মী আমার সাথেই কাজ করে। তো আমাদের কাছে একজন ব্যক্তির ইমেইল ঠিকানা এসেছে: someone@gamil.com, আমি প্রথম দেখাতেই দেখলাম ঠিকানাটা ভুল। আমি ওকে বললাম, দেখো, এই ঠিকানাটা ভুল। সে বললো, কই? আমি বললাম: পড়োতো। সে পড়লো: সামওয়ান-এট-জিমেইল-ডট-কম। আমি বললাম, আবার পড়ো। সে আবার পড়লো: সামওয়ান-এট-জিমেইল-ডট-কম। আমি বললাম, আবার পড়ো: সে আবারও একই কথাটাই পড়লো। আমি এবারে @ (উচ্চারণ: এট্‌) থেকে বাকি অংশটা সিলেক্ট করে হাইলাইট করে বললাম, পড়ো। সে তারপরও পড়লো: কেন, জিমেইল-ডট-কম

চিন্তা করতে পারেন, সে চোখের সামনে ভুল রেখে দেখতেই পারছে না। 😣 এবং সে শেষ পর্যন্ত আমি বলে দেয়ার আগ পর্যন্ত দেখতেই পেলো না।

কেন?

কারণ, সে ইংরেজিকে ভয় পায়। ইংরেজি দেখলেই সে জানা জ্ঞানে যতটুকু ধরে, ওতটুকু দিয়ে কোনোরকমে পার করে চলে যেতে চায়। তাই ইংরেজি সে দেখে, আসলে কিন্তু দেখে না।

ঘটনা ২:

কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে হকারদল - নিশাচর
কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে হকারদল

২০১২’র কথা – আমি তখন শান্তিনগরে অফিস শেষ করে ট্রেনের জন্য কমলাপুর রেলস্টেশনে অপেক্ষা করছি। সেদিন আমি আসতে একটু দেরি হলো, অনেকক্ষণ ঢাকা থেকে আর কোনো ট্রেন বের হবে না। অগত্যা অপেক্ষা করা ছাড়া গত্যান্তর নেই। সেদিন আবার বেশ বৃষ্টি হচ্ছে, তাই স্টেশনে লোকজনও কম। আমার হাতে নাইকন সেমি এসএলআর ক্যামেরা। ওটা দিয়ে ছবি তুলছি দেখে সব হকারগুলো জড়ো হয়েছে ছবি তুলবে বলে। ওদের আবদারে একটা ছবি তুলে দিলাম। ছবি তুলে, ডিসপ্লে-তে নিজেদের ছবিটা দেখে হাসতে হাসতে সবাই চলে গেল যে যার গন্তব্যে — একজন ছাড়া।

ইংরেজি দেখতে শেখা সেই হকার - নিশাচর
ইংরেজি দেখতে শেখা সেই হকার

একটা ছেলে আমার পাশে এসে বসলো। না, সে ক্যামেরার জন্য বসলো না। সে শ্রেফ বসলো। গল্প শুরু করলাম আমি। দুজনে গল্প করছি। জানলাম জীবনে সে একবার মৌলভীবাজারে একটা মাদ্রাসায় পড়তো। সেখানে ক্লাস থ্রি পর্যন্ত পড়ালেখা করে তার পড়ালেখার ইতি ঘটে (আমি বুঝে নিয়েছি আলিয়া মাদ্রাসা হবে)। সে কথাপ্রসঙ্গে আমাকে জানালো, সে ইংরেজি শিখছে।

আমি আগ্রহ পেলাম, কিভাবে শিখছো?

বললো, সাইনবোর্ড দেখে।

আমি যেন আকাশ থেকে পড়লাম, এ ছেলে বলে কী? 😕 মনের অবস্থা প্রকাশ না করে পারলাম না, সাইনবোর্ড দেখে কিভাবে ইংরেজি শিখো?

সে বললো, সাইনবোর্ডের বাংলা লেখাগুলো সে পড়তে পারে। অর্থাৎ, এখানে যে “সোনালী ব্যাংক” লেখা, সেটা সে পড়তে পারে। ঠিক নিচেই ইংরেজিতে একই কথা লেখা। সে এ-বি-সি-ডি জানে। তাই সে যা করে, ধীরে ধীরে পড়ে S-O-N-A-L-I, তারপর বুঝে নেয় ‘সোনালী’।

শুনে আমি যার-পর-নাই আশ্চর্য হলাম! ওর পদ্ধতিগত ভুলভাল নিয়ে অনেক কথাই হয়তো মাথায় আসছে, কিন্তু একবার ভাবুন তো, সে আসলে কী দারুণ একটা কাজ করছে? সে মনের অজান্তে ইংরেজিকে দেখা শুরু করে দিয়েছে। ইংরেজি-ভীতি নয়, বরং ইংরেজির প্রতি একপ্রকারের প্রীতি জন্ম নিয়েছে ওর মনে। আর এই ভীতিহীন প্রীতিই পারে ভাষাশিক্ষাকে সহজতর করে দিতে।

 

একটা ইংরেজি শব্দ লেখা দেখলে, ‘বুঝে ফেলেছি’, ‘পড়ে ফেলেছি’ ভাবটা না নিয়ে আসলেই পড়ে দেখা ওখানটাতে কী লেখা আছে। আমার এক মামা’র (বদরুল ইসলাম) একটা বৈশিষ্ট্য আমার খুব ভালো লাগে:

তিনি হয়তো রিকশায় কিংবা গাড়িতে বসে আছেন। আশপাশটা আমিও দেখছি, তিনিও দেখছেন। কিন্তু তিনি একটু পর পরই কোনো না কোনো একটা দোকানের সাইনবোর্ডে লেখা নামটা জোরে উচ্চারণ করে পড়েন: “কাউয়্যা এ্যান্ড কালিয়া ব্রাদার্স”, কিংবা “চাই পাই খাবার হোটেল”। শুনে মনে হবে, বিশেষ কোনো দোকানের নাম পড়ছেন, যেটা পড়াটা বিশেষ দরকার। আসলে এটা তিনি অভ্যাসবশতই করেন। অথচ আমিও দেখেছি লেখাটা, কিন্তু আমি ‘পড়ে ফেলেছি’ ভাবটা নিয়ে এড়িয়ে যাই। কিন্তু তিনি সাইনবোর্ডগুলো যত্নসহকারে পড়েন।

মামার এই টেকনিকটা কাজে লাগিয়ে ইংরেজি একটা সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড, লিফলেট, ব্রশিউর, ঔষধের স্ট্রিপ, খেলনার বাক্স, জুসের প্যাকেট – জগতের যে জিনিসে ইংরেজি লেখা আছে, সেটাই একটু পড়ে ফেলি না… দেখার অভ্যাসটা তৈরি করে ফেলি না…

 

তো ভাষা যা-ই হোক না কেন, তাকে দেখতে শেখাটা যদি শুরু করে দেয়া যায়, তাহলেই ভাষা শেখাটা শুরু করে দেয়া যায়…

(চলবে…)

– মঈনুল ইসলাম

মন্তব্য করুন